📄 পীরভক্তি
জনৈক পীর পীরগিরিতে যদিও সফলকাম হয়েছিলেন, তথাপি তাঁর ছেলেকে ঐ বিদ্যায় পারদর্শী না করে সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে ইচ্ছুক হলেন। এসএসসি পাশের পর ছেলেকে কলেজে ভর্তি করে দিলেন এবং তাকে বিয়ে দিয়ে দিলেন। অতঃপর কিছুদিন পর তিনি মারা গেলেন।
ছেলের নাম আব্দুল্লাহ। ছেলের আইএ ফাইনাল পরীক্ষার সময় ঘনিয়ে এলো। পিতার আর্থিক অবস্থা মোটেও ভাল ছিল না। পীরগিরি করেই তিনি সংসার চালাতেন। পিতার মৃত্যুতে ছেলে আর্থিক দিক দিয়ে চরম ক্ষতির মধ্যে পড়ল। কিন্তু পড়াশুনা ত্যাগ করল না। পরীক্ষার ফী বাবদ শ্বশুরের নিকট থেকে টাকা পাবার প্রত্যাশায় সে একদিন শ্বশুর বাড়ীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করল। মাঝ পথে তার পিতার অনেক মুরীদ রয়েছে। ক্বাসেম গোলদার নামে এক বুড়ো অবস্থাপন্ন মুরীদের বাড়ীতে ঠিক দুপুরে আব্দুল্লাহ ক্লান্ত-ঘর্মাক্ত হয়ে উঠল। উদ্দেশ্য এখানে একটু বিশ্রাম নিয়ে বিকেলের দিকে পুনরায় যাত্রা করা।
বুড়ো ক্বাসেম গোলদার আব্দুল্লাহকে দেখতে পেয়েই ব্যস্ত হয়ে তার কদমবুসি করার জন্য অগ্রসর হ'ল। পথ চলতে চলতে হঠাৎ সাপ দেখে মানুষ যেভাবে আঁতকে উঠে এক পাশে সরে দাঁড়ায়, ঠিক তেমনিভাবে আব্দুল্লাহ সরে দাঁড়াল। ক্বাসেম গোলদারের মনে হ'ল, অল্পের জন্য জান্নাতের দুয়ারের চাবি তার হাতের কাছ থেকে সরে গেল। সে মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে বলল, 'আমাদেরকে কি পায়ে ঠেললেন হুযূর?' আব্দুল্লাহ জবাব দিল, 'আপনি আমার মুরুব্বী, তাই আমারই উচিত আপনার কদমবুসি করা'। শুনে ক্বাসেম গোলদার তওবা তওবা বলতে লাগল এবং বলল, 'আমাদেরকে আর গোনাহগার করবেন না হুযূর। আপনি যে বংশে জন্মেছেন, সে বংশের একজন বালকের পদধূলি পেলেও আমাদের জান্নাতের পথ খোলাসা হয়ে যায়'।
প্রসংগ পাল্টানোর জন্য আব্দুল্লাহ বলল, 'দেখুন! আমি খুবই ক্লান্ত। আগে আমার একটু বিশ্রামের দরকার'। তখন বুড়ো ক্বাসেম গোলদার পানি নিয়ে আনো, পাখা আনো ইত্যাদি বলে হাকডাক শুরু করে দিল। সঙ্গে সঙ্গে ওযূর পানি এলো, পাখাও আনা হ'ল। ওযূর পর একটি সুন্দর ঘরে আব্দুল্লাহকে বসিয়ে পাখা দিয়ে বাতাস করতে লোক নিয়োজিত হ'ল। উপস্থিত মোরগের গোশত দিয়ে দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা হ'ল। কিন্তু রাতের জন্য একটি খাসী জবাই করা হ'ল এবং গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিদেরও দাওয়াত করা হ'ল। গ্রামবাসী সকলে আব্দুল্লাহর পিতার মুরীদ। পিতার অবর্তমানে আব্দুল্লাহই তার স্থলাভিষিক্ত। অন্ততঃ মুরীদগণ আব্দুল্লাহকে মনে মনে সেই আসনে বসিয়েছে।
রাতের খাওয়া-দাওয়া বেশ সুন্দরভাবেই সম্পন্ন হ'ল। ক্বাসেম গোলদার আমন্ত্রিত ব্যক্তিদের নিয়ে আলোচনায় বসল। আব্দুল্লাহকে লক্ষ্য করে ক্বাসেম বলল, হুযূর আপনাদের পূর্বপুরুষ সুদূর আরব থেকে মাছের পীঠে চড়ে এদেশে এসেছিলেন। তাই তাকে 'মাহী সওয়ার' বলা হ'ত। তাঁর কেরামতির কথা লোকের মুখে মুখে। নদীতে নৌকা ডুবে গেলে তিনি বৈঠকখানায় বসে থেকে তা টেনে তুলতেন। ফলে তার আস্তীন ভিজে যেত। হাতে কিছু খাবার নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে 'আও আও' করলে লক্ষ লক্ষ কবুতর এসে জমা হ'ত। তিনি সেগুলিকে ঐভাবে খাওয়াতেন। আব্দুল্লাহ অতি মনোযোগ সহকারে বৃদ্ধ ভক্তের কথাগুলি শুনছিল।
এক সময় ক্বাসেম বলল, হুযূর! আপনাদের বংশে সবাই কামেল পীর হয়েই জন্মায়। এক পীর নিজ হাতে একটি কাঁঠাল গাছ রোপণ করে সেবা-যত্নে সেটি বড় করেছেন। গাছে প্রথমবার মাত্র একটি কাঁঠালই ধরেছে। পীর মনে মনে স্থির করেছেন, কাঁঠালটি তিনি খাবেন। তার অনুপস্থিতির সুযোগে তার এক নাবালক ছেলে কাঁঠালটি খেয়ে ফেলে। বাড়ী এসেই তিনি কাঁঠালের খোঁজে যান। দেখেন, গাছে কাঁঠাল নেই। তিনি খুব রাগান্বিত হয়ে যান। ফলে কেউ বলে না, কাঁঠাল কে খেয়েছে। ঐ নাবালক ছেলের বিমাতার কাছ থেকে পীর জানতে পারলেন, কাঁঠালটি কে খেয়েছে। পীর ছেলেকে ডাকলেন। ছেলে এলে পিতা বললেন, 'তুমি কাঁঠাল খেয়েছ কেন?' ছেলে কিছুমাত্র ইতস্ততঃ না করে জবাব দিল, 'কেন, আব্বা, গাছের কাঁঠাল তো গাছেই আছে'। পিতা তখন পুনরায় গাছের কাছে গিয়ে বিস্মিত নয়নে দেখলেন, সত্যিই তো কাঁঠাল গাছেই রয়েছে। পিতার বুঝতে বাকী রইল না। তিনি অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হয়ে বললেন, 'কিয়া, এক ঘরমে দো পীর? যাও বাছা শুয়ে রও'। বাছা সেই যে শুইল। আর উঠল না।
আব্দুল্লাহ তার পিতার মুরীদের পীরদের কেরামতির অতিরঞ্জিত গল্প শুনে একেবারে তাজ্জব বনে গেল। আর একটা ভাবনা তার মনকে আলোড়িত করতে থাকল যে, পুত্রের পীরগিরিতে পিতার হিংসার কাহিনী তারা কিভাবে ব্যক্ত করতে পারে! আর এহেন পীরকে তারা মাথায় নিয়ে জান্নাতের পথ খোলাসা করতে চায়!
শিক্ষা: তথাকথিত পীররা মিথ্যা কেরামতির দোহাই দিয়ে মুরীদদের ঈমান হরণ করে। অতএব এদের থেকে সাবধান।
📄 সম্পদের মোহ
সম্পদের মোহ মানুষের জন্মগত। সম্পদের প্রতি মানুষের মোহ থাকা খুবই স্বাভাবিক। কেননা সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন যাপনের জন্য সম্পদের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। আবার সম্পদের অত্যধিক মোহ মানুষের জন্য চরম দুর্ভোগ ও অশান্তির কারণও বটে। সম্পদের মোহ মানুষকে ধ্বংসের চোরাগলিতে নিয়ে যায়। সম্পদ সংগ্রহে কখনো কখনো মানুষ অন্যায় পথে পা বাড়ায়। মানুষের সম্পদ প্রাপ্তির আকাংখার কোন সীমা-পরিসীমা নেই। সে যতই পায়, ততই চায়। ক্ষুধা নিবারণের পর অতি লোভনীয় খাবার গ্রহণে মানুষের অনিচ্ছা প্রকাশ পেতে পারে। কিন্তু যদি কোন মানুষের সামনে অগণিত সম্পদ রেখে দিয়ে বলা হয়, এ থেকে তোমার প্রয়োজন মতো গ্রহণ কর। তাহলে দেখা যাবে, সে তখন তার বহন ক্ষমতার অতিরিক্ত সম্পদ আগলে নিয়ে বসে রয়েছে।
এক বাদশাহ অফুরন্ত সম্পদের মালিক। তিনি তার সে সম্পদ একটি ঘরে সংগোপনে সংরক্ষিত রেখেছেন। মাঝে মাঝে সে সম্পদ দেখার জন্য একাকী তিনি সেখানে যান। সম্পদ দেখে তার চোখ জুড়িয়ে যায়, মনও ভরে যায়। তিনি সব ঠিকঠাক দেখে প্রশান্তি অনুভব করেন এবং মনে মনে বলেন, তিনি যদি একাধারে এ সম্পদ ব্যয় করেন তাহলে বিশ হাযার বছরেও ফুরাবে না। তিনি মনে মনে এও আশা করেন, এ সম্পদ তাকে বিশ হাযার বছর ধরে বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করবে।
এক রাতে তিনি সম্পদ দেখে মনে প্রশান্তি লাভের উদ্দেশ্যে গোপন ঘরের তালা খুলে সেটি বাইরে রেখে দরজাটি ভিতর থেকে বন্ধ করে দিয়ে ঘরের ভিতরে পায়চারি করছেন আনমনে। এমন সময় তার একমাত্র শাহযাদা কি প্রয়োজনে যেন সেখানে উপস্থিত হ'ল। সে তালাটি বাইরে দেখে ভাবল, তার বাবা হয়তো তালাটি খুলে লাগাতে ভুলে গেছেন। তখন সে দরজায় তালা লাগিয়ে দিল। কিছুক্ষণ পর বাদশাহ বাইরে আসার জন্য দরজার কাছে এলেন। কিন্তু তিনি আর বের হ'তে পারলেন না। ঘরটি এমন গোপনীয় ও সুরক্ষিত যে, ভিতর থেকে শত ডাকাডাকি করলেও কোন শব্দ বাইরে বের হয় না। তিনি বুঝতে পারলেন, এ ঘরেই তার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। সম্পদ মানুষকে বাঁচায়, কিন্তু সরাসরি বাঁচায় না। ঘরে সম্পদের ছড়াছড়ি অথচ একটুও খাদ্য নেই। অনাহারে তাকে মরতে হ'ল।
এদিকে রাজবাড়ীতে বাদশাহকে না পেয়ে স্ত্রী-পুত্র মনে করল, তিনি হয়তো কোথাও গিয়েছেন। তারা সম্ভাব্য স্থানসমূহে খোঁজাখুঁজি করল, কিন্তু কোথাও তাকে পাওয়া গেল না। রাজকার্য পরিচালনা করতে মন্ত্রীবর্গ শাহযাদাকে রাজমুকুট পরিয়ে সসম্মানে সিংহাসনে বসালেন। রাজকার্য পরিচালনা করতে সম্পদের প্রয়োজন দেখা দিল। বাদশাহ নিখোঁজ হওয়ার পর বেশ কিছুদিন কেটে গেছে। ধন-ভাণ্ডারের তালা খোলার সাথে সাথে এক বীভৎস গন্ধে চারিদিক ভরে গেল। দেখা গেল, বাদশাহ-ই স্বয়ং মরে পচে রয়েছেন। ধুলা ধূসরিত তার নিথর-নিস্তব্ধ-অসাড় দেহ।
শিক্ষা: মাত্রাতিরিক্ত সম্পদের নেশা মানুষকে বিবেক-বোধহীন পশুতে পরিণত করে। ফলে সে হালাল-হারাম বিবেচনা না করে শুধু দু'হাতে সম্পদ উপার্জন করতে থাকে। অথচ সে চিন্তা করে না যে, মৃত্যু বরণের সাথে সাথে সেই সম্পদ একটি মুহূর্তের জন্যও তার কোন কাজে আসবে না।
📄 তিন লোভী ডাকাত
একবার একদল লোক বিপুল স্বর্ণমুদ্রা ও অর্থ-সম্পদ নিয়ে ব্যবসার উদ্দেশ্যে বাড়ী থেকে রওয়ানা হয়। পথিমধ্যে তিন জন ডাকাতের খপ্পরে পড়ে নিজেদের সর্বস্ব হারিয়ে তারা রিক্ত হস্তে বাড়ী ফেরে। ডাকাত তিন জন বিপুল স্বর্ণমুদ্রা ও টাকা-কড়ি পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ে। চলতে থাকে নানা পরিকল্পনা। সম্পদ বণ্টনের নীলনকশা।
এমন সময় ডাকাত সর্দার বলল, আমরা ক্ষুধার্ত। আগে ক্ষুধা নিবারণ করি। তারপর সম্পদ বণ্টন হবে। অতএব সর্বাগ্রে বাজার থেকে কিছু খাবার নিয়ে আসা হৌক। ডাকাতের একজন তখন খাদ্য ক্রয়ের অনুমতি চাইলে সর্দার তাকে অনুমতি দিলেন। অনুমতি পেয়ে সে বাজারে রওয়ানা হ'ল। পথে যেতে যেতে সে ঐ ছিনতাইকৃত স্বর্ণমুদ্রা ও অর্থ-কড়ি কি করে একাই ভোগ করা যায় সে পরিকল্পনা আঁটতে লাগল। অনেক চিন্তা-ভাবনার পর স্থির করল যে, খাদ্যের সাথে বিষ মিশিয়ে দুই বন্ধুকে হত্যা করব। তখন সব সম্পদই আমার হয়ে যাবে। বাকী জীবন এই সম্পদ দিয়ে সানন্দে কেটে যাবে। মুছে যাবে দুঃখ-দুর্দশা। বউ-বাচ্চা নিয়ে খেয়ে পরে ভালভাবেই দিনাতিপাত করতে পারব। সম্পদের এই মোহে পড়ে সে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী খাবারের সাথে বিষ মিশিয়ে বাজার থেকে ফিরে আসছে।
অপরদিকে ঐ দুইজন চিন্তা করল যে, এতগুলো সম্পদ দুই বন্ধুর মধ্যে বণ্টন করতে পারলে পরিমাণে বেশী হবে। তারা স্থির করল যে, খাদ্য নিয়ে আসা মাত্রই তাকে হত্যা করব। তখন সমস্ত সম্পদ দুই বন্ধু ভাগ করে নিব। কথামতো অস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত থাকল তারা। খাদ্য নিয়ে সে ফিরা মাত্রই অপেক্ষমাণ দুই বন্ধু অস্ত্রাঘাত করে তাকে শেষ করে ফেলল।
এবারে অবশিষ্ট দুই ডাকাতের মধ্যে যে অধিক শক্তিশালী ছিল সে চিন্তা করল, যদি আমি একাই এই বিশাল ধন ভাণ্ডারের মালিক হই তবে আমার চেয়ে আর কে ধনবান হতে পারে? আমার জীবন ধন্য হবে। সমস্যা দূরীভূত হবে। দারিদ্র্য বিমোচিত হবে। জীবনে আর কোন সমস্যা থাকবে না। এই দুরভিসন্ধি অনুযায়ী অপর সাথীকে সে হত্যা করে ফেলল। পর পর দুই সাথীকে হত্যা করে সে আনন্দে উদ্বেলিত। তার লোলুপ দু'চোখ অপলক নেত্রে তাকিয়ে আছে ছিনতাইকৃত সম্পদের দিকে। একাই এত সম্পদের মালিক, এই আনন্দে সে পাগলপারা। সাথীদ্বয়কে হত্যা করে স্বভাবতই পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছিল সে। সামনে খাবার মওজুদ। ভাবল, আগে ক্ষুধা মিটিয়ে নেই, তারপর সম্পদ নিয়ে বাড়ী ফিরব। অতঃপর প্রত্যাশার পরিসমাপ্তি ঘটল, যখন সে বিষ মিশ্রিত খাদ্য গ্রহণ করে জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটাল।
শিক্ষা: অত্যধিক সম্পদের লোভ মানুষকে ধ্বংস করে।
📄 জনৈক মহিলা ও সোনার ডিম
এক মহিলার একটি মুরগী প্রতিদিন একটি করে সোনার ডিম পাড়ত। মহিলা মনে মনে বুদ্ধি আঁটল, আমি যদি তার খাবার বেশি করে দেই তাহলে সে প্রতিদিন দু'টি করে ডিম পাড়বে। অতঃপর সে যখন তার খাবার বৃদ্ধি করে দিল, তখন পাকস্থলী ফেটে মুরগীটি মরে গেল।
শিক্ষা: অতি লোভে তাঁতি নষ্ট।