📄 মৃত্যুর দুয়ারে ত্যাগের মহিমা
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, 'তোমাদের মধ্যে কেউ ততক্ষণ মুমিন হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত সে তার ভাইয়ের জন্য তা-ই ভালবাসবে যা সে নিজের জন্য ভালবাসে' (বুখারী হা/১৩)।
ইয়ারমুক যুদ্ধের বিশাল ময়দান। এক প্রান্তে ক্ষুদ্র মুসলিম সেনাদল আর অপর প্রান্তে রোমকদের বিশাল সৈন্যবাহিনী। উভয় দলই ভয়াবহ এক যুদ্ধের মুখোমুখি দণ্ডায়মান। যুদ্ধ শুরুর পূর্বমুহূর্তে আবু ওবায়দাহ, মু'আয বিন জাবাল, আমর ইবনুল আছ, আবু সুফিয়ান, আবু হুরায়রা প্রমুখ ছাহাবী সৈন্যদের উদ্দেশ্যে হৃদয়গ্রাহী উপদেশ দেন। আবু ওবায়দাহ উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন, 'হে আল্লাহ্র বান্দাগণ! তোমরা আল্লাহকে সাহায্য করো, আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পদযুগলকে স্থির রাখবেন। হে মুসলিম সেনাবাহিনী! তোমরা ধৈর্যধারণ করো। কেননা ধৈর্য কুফরী থেকে বাঁচার, আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভের এবং লজ্জা নিবারণের উপায়। তোমরা তোমাদের যুদ্ধের সারি থেকে সরে দাঁড়াবে না। কাফেরদের দিকে এক ধাপও অগ্রসর হবে না এবং আগ বেড়ে তাদের সাথে যুদ্ধের সূচনাও করবে না। শত্রুদের দিকে বর্শা তাক করে থাকবে এবং বর্ম দিয়ে আত্মরক্ষা করবে। তোমাদেরকে যুদ্ধের নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত তোমরা মনে মনে আল্লাহ্র যিকির করতে থাকবে'।
যুদ্ধ শুরু হ'ল এবং প্রচণ্ড আকার ধারণ করল। যুদ্ধের সময় হুযায়ফা (রাঃ) আহতদের মধ্যে তার চাচাতো ভাইকে খুঁজতে শুরু করলেন। তার সাথে ছিল সামান্য পানি। হুযায়ফার চাচাতো ভাইয়ের শরীর দিয়ে অবিরত ধারায় রক্ত ঝরছিল। তার অবস্থা ছিল আশংকাজনক। হুযায়ফা (রাঃ) তাকে বললেন, তুমি কি পানি পান করবে? সে তার কথার কোন উত্তর দিতে সক্ষম না হয়ে হ্যা সূচক ইঙ্গিত করল। আহত ব্যক্তি হুযায়ফার কাছ থেকে পানি পান করার জন্য হাতে নিতেই তার পাশে এক সৈন্যকে পানি পানি বলে চিৎকার করতে শুনল। পিপাসার্ত ঐ সৈনিকের বুকফাটা আর্তনাদ শুনে তার পূর্বে তাকে পানি পান করানোর জন্য হুযায়ফাকে ইঙ্গিত দিলেন। হুযায়ফা তার নিকট গিয়ে বললেন, আপনি কি পানি পান করতে চান? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তিনি পান করার জন্য পাত্র উপরে তুলে ধরতেই পানির জন্য অন্য একজন সৈন্যের চিৎকার শুনতে পেলেন। তিনি পানি পান না করে হুযায়ফা (রাঃ)-কে বললেন, তার দিকে দ্রুত ছুটে যাও এবং সে পানি পান করার পর কিছু অবশিষ্ট থাকলে আমাকে দিয়ো। হুযায়ফা আহত সৈন্যটির কাছে গিয়ে দেখলেন, সে মারা গেছে। অতঃপর দ্বিতীয় জনের কাছে ফিরে এসে দেখলেন, সেও মারা গেছে। অতঃপর চাচাতো ভাইয়ের কাছে ফিরে আসলে দেখেন তিনিও শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করে জান্নাতবাসী হয়েছেন। পানির পাত্রটি তখনও হুযায়ফার হাতে। এতটুকু পানি। অথচ তা পান করার মত এখন আর কেউ বেঁচে নেই। যাদের পানির প্রয়োজন ছিল তারা আরেক জনের পানির পিপাসা মিটাবার জন্য এতই পাগলপরা ছিলেন যে, অবশেষে কেউ সে পানি পান করতে পারেননি। অথচ সবারই প্রাণ ছিল ওষ্ঠাগত (আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ৭/৮- ১১ প্রভৃতি দ্রঃ)।
শিক্ষা: মুমিন ব্যক্তি সর্বদা মানুষের জন্য অন্তঃপ্রাণ থাকে। সে নিজেকে কখনো পরের উপরে প্রাধান্য দেয় না। বরং সর্বদা অপরের কল্যাণকেই ধ্যান- জ্ঞান করে। জীবনের চরম ঝুঁকিপূর্ণ মুহূর্তে পর্যন্ত সে তার কর্তব্য ভুলে যায় না। এমনকি পরার্থে নিজের জীবন বিলিয়ে দিতেও সে সামান্যতম কুণ্ঠাবোধ করে না। সর্বদাই তাঁর হৃদয়কন্দরে গুঞ্জরিত হতে থাকে, 'সকলের তরে আমরা সবে, প্রত্যেকে মোরা পরের তরে'।
📄 শত্রুর জিঘাংসা
হাফেয ইবনুল ক্বাইয়িম আল-জাওযিয়্যাহ কর্তৃক বর্ণিত, হযরত আলী বিন আবু ত্বালিব (রাঃ)-এর হত্যাকারী আব্দুর রহমান বিন মুলজিম বন্দী অবস্থায় (হযরত আলীকে হত্যার পর তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল) থাকাকালীন সময়ে হযরত হাসান বিন আলী (রাঃ)-এর নিকট যখন নিয়ে আসা হ'ল, তখন সে বলল, হে হাসান! আমি তোমার সাথে কানে কানে কিছু কথা বলতে চাই। তিনি অস্বীকার করলেন এবং সাথীদেরকে বললেন, তোমরা জান সে কি চেয়েছে? তারা উত্তর দিলেন, না। হযরত হাসান বললেন, সে চেয়েছিল আমি আমার কান তার মুখের কাছে নিয়ে গেলে সে দাঁত দিয়ে আমার কানটি কেটে নিবে। ঐ পাপী একথা শুনে বলল, আল্লাহ্র কসম আমি ঠিক এমনটাই ইচ্ছা পোষণ করেছিলাম। চিন্তা করে দেখুন, সবেমাত্র হযরত হাসান (রাঃ)-এর পিতৃবিয়োগ হয়েছে। মুসলিম উম্মাহ এখন বিব্রতকর অবস্থায় আছে। এমন পরিস্থিতিতে তিনি কিভাবে ঐ বদমায়েশের কূট-কৌশলের রহস্যটি বুঝতে পেরে সতর্ক হয়ে গেলেন এবং ঐ শয়তান মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও কি ধরনের জঘন্য চাল চালতে চাইল!! (ইবনুল কাইয়িম, আত-তুরুক আল-হুকমিইয়্যাহ ১/৩৭)।
শিক্ষা: শত্রু সুযোগ পেলেই ক্ষতি করার চেষ্টা করবে। অতএব সর্বদা সাবধান থাকতে হবে।
📄 বুদ্ধিমান বালক
(১) খলীফা মামুনুর রশীদ তাঁর একটি ছোট্ট ছেলের হাতে হিসাবের খাতা দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, বৎস এটা কি? বাচ্চা উত্তরে বলল, এটা এমন একটি বস্তু যাতে মানুষের মস্তিষ্ক তীক্ষ্ণ হয়, অলসতা দূরীভূত হয় ও সচেতনতা ফিরে আসে এবং একাকী থাকার সময় সঙ্গী হয়। খলীফা আল্লাহ্র শুকরিয়া আদায় করে বললেন, আল-হামদুলিল্লাহ, আল্লাহ আমাকে এমন ছেলে দিয়েছেন, যে চর্মচক্ষুর চেয়ে জ্ঞানের চক্ষু দিয়ে বেশী দেখে।
(২) আছমা'ঈ বলেন, আমি আরবের একজন কিশোরকে বললাম, হে বৎস! তুমি কি এটা পছন্দ কর যে, তোমাকে এক লক্ষ টাকা দিব এবং তুমি আহাম্মক (বোকা) হবে। সে উত্তরে বলল, না। আমি বললাম, কেন? সে বলল, হ'তে পারে একদিন এই টাকা শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু আহাম্মক দোষটি আমার সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে যাবে।
শিক্ষা: অনেক সময় ছোট্ট বাচ্চাদের মুখ থেকে এমন জ্ঞানগর্ভ কথা বের হয়, যা কল্পনাও করা যায় না।
📄 মহাকবি আল্লামা ইকবাল ও জনৈক ভিক্ষুক
একবার আল্লামা ইকবাল জনৈক ভিক্ষুককে ভিক্ষা দেন। লোকটি যাবার সময় তাঁকে দো'আ করল এই মর্মে যে, 'মৃত্যুর পরে আপনার আত্মা যেন মহান পরমাত্মার দয়ার সাগরে মিশে যায়'। ইকবাল তাকে ডেকে বললেন, 'বরং তুমি এই দো'আ কর যে, ইকবালের আত্মা যেন বৃষ্টি বিন্দুর ন্যায় মহাসাগরে বিলীন না হয়ে তার উপরে মুক্তার ন্যায় ভেসে থাকে'।
এর দ্বারা মহাকবি আল্লামা ইকবাল (রহঃ) মা'রেফতী ছুফীদের প্রচারিত ভ্রান্ত অদ্বৈতবাদী আক্বীদার প্রতিবাদ করেছেন। যারা বলে যে, 'সকল সৃষ্টিই সৃষ্টিকর্তার অংশ। আহাদ ও আহমমাদের মধ্যে মীমের একটি পর্দা ব্যতীত কোন পার্থক্য নেই। যত কল্লা তত আল্লা। তিনি নিরাকার। তিনি সবার মধ্যে সর্বত্র বিরাজমান'। অথচ প্রকৃত আক্বীদা হ'ল এই যে, সৃষ্টি ও সৃষ্টা সম্পূর্ণ পৃথক দু'টি সত্তা। আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাস, আনুগত্য ও কর্মপ্রচেষ্টার মাধ্যমে মানুষ আল্লাহ্র রঙে রঞ্জিত হ'তে পারে। কিন্তু সে আল্লাহ্র সত্তায় বিলীন হয়ে যায় না। আল্লাহ নিজ সত্তা নিয়ে আসমানের উপরে আরশে সমুন্নত। কিন্তু তাঁর ইল্ম ও কুদরত সর্বত্র বিরাজমান।
শিক্ষা : আল্লাহ সম্পর্কে সঠিক আক্বীদা পোষণ পরকালে মুক্তির সোপান। পক্ষান্তরে বিভ্রান্ত আক্বীদা মানুষকে পথভ্রষ্ট করে দেয় এবং জাহান্নামকে অবধারিত করে দেয়।