📄 ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহঃ)-এর সাদাসিধে জীবনযাপন
খলীফা ওমর বিন আব্দুল আযীয (রাঃ) আড়াই বছর খেলাফতে থাকার পর মাত্র সাড়ে ৩৯ বছর বয়সে শত্রুদের বিষ প্রয়োগে শাহাদত বরণ করেন। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হ'ল যে, তিনি দুটি বদ্ধ ঘরে সোনা-দানা ভর্তি করে রেখে গিয়েছেন, যার সবই রাষ্ট্রীয় বায়তুল মাল থেকে তিনি আত্মসাৎ করেছেন। পরবর্তী খলীফা ইয়াযীদ বিন আব্দুল মালেক অভিযোগকারীকে সাথে নিয়ে ওমরের বাড়ীতে গিয়ে উক্ত কক্ষ দু'টি খুললেন। দেখা গেল সেখানে আছে কেবল একটি চামড়ার চেয়ার, একটি পিতলের বদনা, ৪টি পানির কলসি। অন্য ঘরে আছে একটি খেজুর পাতার চাটাই, যা মুছাল্লা হিসাবে রাখা হয়েছে। আর আছে ছাদের সঙ্গে ঝুলানো একটি শিকল। যার নীচে গোলাকার একটি বেড়ী রয়েছে, যার মধ্যে মাথা ঢুকানো যায়। ইবাদতে রাত কাটানোর সময় কাহিল হয়ে পড়লে বা ঝিমুনি আসলে এটা তিনি মাথায় ঢুকিয়ে দিতেন, যাতে ঘুমিয়ে না পড়েন। সেখানে একটি সিন্দুক পেলেন, যার মধ্যে একটি টুকরী পেলেন। যাতে ছিল একটি জামা ও একটি ছোট পাজামা।
আর তাঁর পরিত্যক্ত বস্তুর মধ্যে তাঁর স্ত্রীর কাছ থেকে পেলেন, তালি দেওয়া একটা জামা ও একটি মোটা জীর্ণশীর্ণ চাদর। এ অবস্থা দেখে খলীফা কেঁদে ফেললেন এবং অভিযোগকারী ভাতিজা ওমর ইবনে ওয়ালীদ ইবনে আব্দুল মালেক লজ্জিত হয়ে বললেন, 'আসতাগফিরুল্লাহ'। আমি কেবল লোকমুখে শুনেই অভিযোগ করেছিলাম (আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৯/২২৩)।
শিক্ষা : ইসলামী খিলাফতের খলীফাগণ এমনই মহত্তম দৃষ্টান্ত পৃথিবীবাসীর জন্য রেখে গেছেন, যা শত্রু-মিত্র সকলের জন্য এক চিরন্তন শিক্ষা বহন করে।
📄 আলী বিন হুসায়েন (রহঃ)-এর গোপন আমল
আলী (রাঃ)-এর পৌত্র আলী বিন হুসায়েন (রহঃ) বলতেন, 'রাতের অন্ধকারে কৃত ছাদাক্বা আল্লাহ্ ক্রোধ দূরীভূত করে'। তাই রাতের আঁধারে তিনি ছাদাক্বার খাদ্যসমূহ পিঠে বহন করে শহরের ফকীর-মিসকীন ও বিধবাদের গৃহে পৌঁছে দিতেন; অথচ তারা জানতে পারতো না কে তাদেরকে সেসব খাদ্যসামগ্রী দিয়ে গেল। আর সবার অজান্তে যাতে এ কাজ করতে পারেন, সেজন্য তিনি কোন খাদেম, দাস বা কারোরই কোন সহযোগিতা নিতেন না। এভাবে অনেক বছর যাবৎ তিনি গোপনে এ কাজ করে যাচ্ছিলেন। অথচ ফকীর ও বিধবারা ঘুণাক্ষরেও জানতে পারেনি যে, কিভাবে তাদের নিকটে এ খাদ্য আসে। অতঃপর তিনি মৃত্যুবরণ করলে তারা তার পৃষ্ঠদেশে কালো দাগ দেখে বুঝতে পারল যে, তিনি তাঁর পিঠে কিছু বহন করার ফলে এই দাগের সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে তাঁর মৃত্যুর পর শহরে উক্ত গোপন দান বন্ধ হয়ে গেল।
রাবী ইবনে আয়েশা বলেন, তাঁর মৃত্যুর পর শহরবাসী বলতে লাগল, আলী বিন হুসায়েন মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা গোপন দান থেকে বঞ্চিত হইনি (হিলইয়াতুল আওলিয়া ৩/১৩৬; ছিফাতুছ ছাফওয়াহ ২/৯৬; আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ ৯/১১৪; তাহযীবুল কামাল ১৩/২৪২, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা ৪/৩৯৩)।
শিক্ষা: মানুষের যেকোন কাজের মূল লক্ষ্য হবে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জন। সে লৌকিকতার জন্য কোন কাজ করবে না।
📄 ইমাম মাওয়ার্দী (রহঃ)-এর গোপন আমল
ইরাকের বিখ্যাত মুসলিম পণ্ডিত ইমাম মাওয়ার্দী (৯৭২-১০৫৮ খ্রিঃ)-এর গোপন আমল সম্পর্কে একটি কাহিনী প্রসিদ্ধ রয়েছে। তিনি তাফসীর, ফিকুহ, সমাজ ও রাষ্ট্রনীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে অনেক মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেন। কিন্তু তাঁর জীবদ্দশায় সেসব গ্রন্থের কোনটিই প্রকাশিত হয়নি। পরে মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে তিনি তাঁর একজন বিশ্বস্ত অনুচরকে ডেকে এনে বললেন, 'অমুক স্থানে যে বইগুলি রয়েছে সবগুলিই আমার রচিত। যখন আমার মৃত্যুযন্ত্রণা উপস্থিত হবে, তখন তুমি তোমার হাতকে আমার হাতের মধ্যে রাখবে। এসময় যদি আমি আমার হাত টেনে নেই, তাহ'লে তুমি বুঝবে যে, আমার কিছুই আল্লাহ্র নিকটে কবুল হয়নি। এমতাবস্থায় তুমি রাতের আঁধারে আমার সমস্ত লেখনী দজলা নদীতে নিক্ষেপ করবে। আর যদি আমি আমার হাত প্রসারিত করি, তাহ'লে বুঝবে যে, আমার লেখাগুলো আল্লাহ্র নিকটে কবুল হয়েছে। আর আমি আমার খালেছ নিয়তে কৃতকার্য হয়েছি'। অতঃপর মৃত্যুকালে তিনি স্বীয় হাত প্রসারিত করে দিলেন। ফলে তাঁর অছিয়ত মোতাবেক পরবর্তীতে তাঁর সকল লেখনী প্রকাশিত হ'ল (অফায়াতুল আ'ইয়ান ৩/২৮৩; তারীখু বাগদাদ ১/৫৪; তাবাকাতুশ শাফেঈয়্যাহ ৫/২৬৮)।
শিক্ষা: মানুষের প্রতিটি কাজই নিয়তের উপর নির্ভরশীল। নিয়ত পরিশুদ্ধ হলেই কেবল তার নেক আমল আল্লাহ্র নিকট গৃহীত হয়।
📄 কুরআনের ইলাহী সংরক্ষণ ও একজন ইহুদী পণ্ডিতের ইসলাম গ্রহণ
আব্বাসীয় খলীফা মামুনুর রশীদের দরবারে মাঝে মাঝে শিক্ষা সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হ'ত। এতে তৎকালীন বিভিন্ন বিষয়ের বিদগ্ধ পণ্ডিতগণ অংশগ্রহণ করতেন। একদিন এমনি এক আলোচনা সভায় সুন্দর চেহারাধারী, সুগন্ধযুক্ত উত্তম পোষাক পরিহিত জনৈক ইহুদী পণ্ডিত আগমন করলেন এবং অত্যন্ত প্রাঞ্জল, অলংকারপূর্ণ এবং জ্ঞানগর্ভ আলোচনা রাখলেন। বিস্মিত খলীফা সভা শেষে তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি ইহুদী? তিনি স্বীকার করলেন। মামুন তাকে বললেন, আপনি যদি মুসলমান হয়ে যান তবে আপনার প্রতি সুন্দরতম আচরণ করা হবে। তিনি উত্তরে বললেন, পৈতৃক ধর্ম বিসর্জন দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এই বলে তিনি প্রস্থান করলেন।
কিন্তু এক বছর পর তিনি মুসলমান হয়ে আবার দরবারে আগমন করলেন এবং আলোচনা সভায় ইসলামী ফিক্বহ সম্পর্কে সারগর্ভ ও যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য উপস্থাপন করলেন। সভা শেষে মামুন তাকে ডেকে বললেন, আপনি কি ঐ ব্যক্তি নন, যিনি গত বছর এসেছিলেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ আমিই ঐ ব্যক্তি। মামুন জিজ্ঞেস করলেন, তখন তো আপনি ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছিলেন। এখন মুসলমান হওয়ার কারণ কি?
তিনি বললেন, এখান থেকে ফিরে যাওয়ার পর আমি সমকালীন বিভিন্ন ধর্মগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখার মনস্থ করি। আমি একজন সুন্দর লিপিকার। স্বহস্তে গ্রন্থাদি লিখে উঁচু দামে বিক্রয় করি। তাই পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যে তাওরাতের তিনটি কপি লিপিবদ্ধ করলাম এবং এগুলির অনেক জায়গায় নিজের পক্ষ থেকে কিছু কমবেশী করে লিখলাম। অতঃপর কপিগুলো নিয়ে আমি ইহুদীদের উপাসনালয়ে উপস্থিত হ'লাম। তারা অত্যন্ত আগ্রহ সহকারে আমার কপিগুলো কিনে নিল। অতঃপর একইভাবে ইঞ্জীলের তিন কপি করলাম এবং তাতে কমবেশী করে লিখে খৃষ্টানদের গীর্জায় নিয়ে গেলাম। সেখানেও তারা খুব আগ্রহভরে কপিগুলো ক্রয় করে নিল। এরপর আমি কুরআনের ক্ষেত্রেও একই কাজ করলাম এবং এতেও কম-বেশী করে লিখলাম এবং বিক্রয়ের জন্য নিয়ে গেলাম। কিন্তু ক্রয়কারীকে দেখলাম, সে প্রথমে আমার লেখা কপিটি নির্ভুল কি না যাচাই করে দেখল। অতঃপর সেখানে কমবেশী দেখতে পেয়ে ক্রয় না করে কপিগুলো ফেরত দিল।
এ ঘটনা দর্শনে আমি এ শিক্ষাই গ্রহণ করলাম যে, নিশ্চয়ই এ গ্রন্থ সংরক্ষিত, আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং এর সংরক্ষক। আর এই উপলব্ধিই আমার ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ালো।
এই ঘটনা বর্ণনাকারী কাযী ইয়াহ্ইয়া বিন আকছাম বলেন, ঘটনাক্রমে সে বছরই আমার হজ্জব্রত পালন করার সৌভাগ্য হয়। সেখানে প্রখ্যাত আলেম সুফিয়ান ইবনে উয়ায়নার সাথে সাক্ষাত হ'লে ঘটনাটি আমি তার নিকটে ব্যক্ত করলাম। তিনি বললেন, নিঃসন্দেহে এরূপ হওয়াই যথার্থ। কারণ কুরআনেই তো এ চিরন্তন সত্যের সমর্থনে আয়াত রয়েছে। তিনি বললেন, কোথায় রয়েছে? সুফিয়ান বললেন, কুরআনে যেখানে তাওরাত ও ইঞ্জীলের আলোচনা এসেছে, সেখানে এসেছে, بِمَا اسْتَحْفِظُوْا مِنْ كِتَابِ الله وَكَانُوا عَلَيْهِ شُهَدَاء ‘তাদেরকে আল্লাহ্ কিতাবের হেফাযতের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল এবং তারা এ ব্যাপারে সাক্ষী ছিল' (মায়েদা ৫/৪৪)। অতঃপর যখন তারা দায়িত্ব পালন করেনি তখন গ্রন্থদ্বয় বিকৃত ও পরিবর্তিত হয়ে বিনষ্ট হয়ে গেছে। পক্ষান্তরে কুরআনের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُوْنَ ‘আমি স্বয়ং এ উপদেশ গ্রন্থ অবতরণ করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক’ (হিজর ১৫/৯)। আল্লাহ নিজেই আমাদের জন্য কুরআনকে সংরক্ষণ করেছেন ফলে তা বিনষ্ট হয়নি (আল-মুনতাযাম ১০/৫১; কুরতুবী ১০/৫; ইবনু হাজার, লিসানুল মীযান ১/৩৮৮)।
শিক্ষা : অন্যান্য আসমানী গ্রন্থসমূহ কালের বিবর্তনে বিকৃত হয়ে গেলেও কুরআন রয়ে গেছে সম্পূর্ণ অবিকৃত। এটা কুরআনের অন্যতম মু'জিযা।