📄 রাষ্ট্রপ্রধানের জবাবদিহিতা
মুহাম্মাদ বিন ওবায়দুল্লাহ হ'তে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা দ্বিতীয় খলীফা ওমর (রাঃ)-এর নিকটে কিছু কাপড় আসলে তিনি সেগুলি হকদারগণের মাঝে বণ্টন করে দেন। এতে আমাদের প্রত্যেকে একটি করে কাপড় পেল। কিন্তু তিনি নিজে দু'টি কাপড় দিয়ে তৈরী একটি পোষাক পরিধান করে খুৎবা দিতে মিম্বরে আরোহণ করলেন। কিন্তু শ্রোতাদের অন্যমনস্কতা লক্ষ্য করে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, হে লোকসকল! তোমরা কি আমার কথা শ্রবণ করছ না? এমতাবস্থায় বিখ্যাত ছাহাবী সালমান ফারেসী (রাঃ) উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, জি না, আমরা শ্রবণ করব না। ওমর (রাঃ) বললেন, কেন হে আবু আব্দুল্লাহ? তিনি বললেন, আপনি আমাদেরকে একটি করে কাপড় দিয়েছেন। অথচ আপনি পরিধান করেছেন (দুই কাপড়ের) বড় পোষাক! ওমর (রাঃ) বললেন, ব্যস্ত হয়ো না হে আবু আব্দুল্লাহ! অতঃপর তিনি ছেলে আব্দুল্লাহ বিন ওমর (রাঃ)-এর দিকে ইশারা করলে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। অতঃপর ওমর (রাঃ) বললেন, আমি আল্লাহ্র কসম করে জিজ্ঞেস করছি, আমার পোষাকে যে অতিরিক্ত কাপড় রয়েছে, সেটা কি তোমার নয়? আব্দুল্লাহ বিন ওমর (রাঃ) বললেন, জি, আমার। অতঃপর সালমান ফারেসী (রাঃ) বললেন, এখন আপনি বক্তব্য শুরু করুন, আমরা শ্রবণ করব (ইবনুল ক্বাইয়িম, ই'লামুল মুওয়াক্কেঈন ২/১২৩; ছিফাতুছ ছাফওয়াহ ১/২০৩)।
শিক্ষা: রাষ্ট্রপ্রধান জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে নন। তাঁকে পরকালে যেমন আল্লাহ্র কাছে তাঁর দায়িত্ব সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে, তেমনি দুনিয়াতেও তিনি জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন।
📄 আমানতদারিতার অনন্য দৃষ্টান্ত
ওমর (রাঃ)-এর খেলাফতকালে ১৬ হিজরীতে মুসলিম সৈন্যদল মাদায়েন জয় করেছে। গণীমতের মাল জমা হচ্ছে। এমন সময় এক ব্যক্তি মহামূল্যবান ধন-রত্ন নিয়ে এল। জমাকারী বললেন, এমন মূল্যবান সম্পদ তো আমরা ইতিপূর্বে দেখিনি। তুমি এখান থেকে নিজের জন্য কিছু রেখে দাওনি তো ভাই? লোকটি বলল, والله لولا الله ما آتيتكم به 'আল্লাহ্র কসম! যদি আল্লাহ্র ভয় না থাকত, তাহ'লে আমি কখনোই এ সম্পদ আপনাদের কাছে নিয়ে আসতাম না'। সবাই তার পরিচয় জানতে চাইলে তিনি অস্বীকার করে বলেন, যদি আমি পরিচয় দেই, তাহ'লে আপনারা আমার প্রশংসা করবেন। অথচ আমি কেবল আল্লাহ্ প্রশংসা করি এবং তাঁর নিকটেই প্রতিদান কামনা করি। এরপর তিনি চলে গেলেন। তখন তার পিছনে একজন লোককে পাঠানো হ'ল এবং জানা গেল যে, তিনি হলেন, আমের বিন আবদে কায়েস (তারীখুত তাবারী ২/৪৬৫)।
শিক্ষা: আমানতদারিতা মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। পক্ষান্তরে আমানতের খেয়ানত করা মুনাফিকের অন্যতম লক্ষণ।
📄 পাত্রী নির্বাচন
ওমর (রাঃ) জনসাধারণের সঠিক অবস্থা জানার জন্য রাত্রিতে ঘুরে বেড়াতেন। এক রাতে একটি ছোট্ট কুটিরের সামনে এলে তিনি বাড়ীর ভিতরের কথাবার্তা শুনতে পেলেন। মা মেয়েকে আদেশ করছেন, 'দুধের সাথে পানি মিশাও। ভোর হয়ে এল'। মেয়েটি উত্তর দিল, 'না মা, ওমর (রাঃ) দুধে পানি মিশাতে নিষেধ করেছেন। তিনি জানতে পারলে শাস্তি দিবেন'।
মা বললেন, 'ওমর দেখতে পেলে তো'? মেয়ে বলল, 'আমি প্রকাশ্যে তাঁর আনুগত্য করব, আর গোপনে তাঁর অবাধ্যতা করব? আল্লাহ্র কসম! এটা আমার পক্ষে মোটেই সম্ভব নয়। অন্য বর্ণনায় এসেছে, সে বলল, ওমর (রাঃ) হয়ত আমাদেরকে দেখছেন না, কিন্তু তাঁর প্রভু তো আমাদেরকে দেখছেন! গোপনে সব শুনে ওমর (রাঃ) বাড়ীটি চিহ্নিত করে ফিরে এলেন। পরে তার ছেলে আছেমের সাথে ঐ মেয়ের বিবাহ দিলেন। তার গর্ভে দু'টি কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করল, যাদের একজনের গর্ভে ওমর বিন আব্দুল আযীয (রহঃ)-এর জন্ম হয়েছিল (তারীখু মাদীনাতি দিমাশক ৭০/২৫৩)।
শিক্ষা: পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে অন্যান্য সকল গুণের উপর দ্বীনদারী ও আল্লাহভীরুতাকে প্রাধান্য দিতে হবে।
📄 ন্যায়পরায়ণ শাসক
ওমর ফারুক (রাঃ) কুফায় একজন গভর্ণর নিয়োগ করেছিলেন। এমনিতেই সমস্ত ছাহাবা ন্যায়পরায়ণ, সৎ ও নিষ্ঠাবান ছিলেন। কিন্তু এক্ষেত্রে গভর্ণর আরো একধাপ অগ্রগামী ছিলেন। তাঁর চোখে বিচারাদি সহ সকল বিষয়েই ধনী-গরীব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, উঁচু-নীচু এবং ছোট-বড় সমান ছিল। কোন ব্যাপারে কারো কোন তোয়াক্কা না করে ন্যায়সঙ্গতভাবে বিচারাদি ও শাসন কাজ চালাতেন। এতে করে এক শ্রেণীর হোমড়া-চোমড়া ও ধনাঢ্য ব্যক্তি অসন্তষ্ট হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে চক্রান্ত শুরু করল। তারা বিশ্বস্তসূত্রে জানতে পারল, গভর্ণর ওমর (রাঃ)-এর সাথে সাক্ষাত করার জন্য মদীনা যাবেন। এই সুযোগে চাঁদা তুলে দুই হাযার দীনার জমা করে তাদের কয়েকজন মদীনা যাত্রা করল। সেখানে পৌঁছে গভর্ণর যখন ওমর ফারুক (রাঃ)-এর সাথে দেখা করার জন্য গেলেন, তখন তারাও সেখানে হাযির হল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনারা কারা? কোথা থেকে এসেছেন? কি চান? তারা বলল, আমরা কুফার নাগরিক এবং সেখান থেকেই এসেছি। তেমন কোন কাজ নেই। বেড়াতে এসেছি এবং সামান্য একটি ব্যাপার নিয়ে আপনার সাথে দেখা করতে আসলাম। তিনি বললেন, কোন্ ব্যাপারে? তারা বলল, আপনার এই অলী (গভর্ণর) বায়তুল মালের সম্পদ আত্মসাৎ করে আমাদের নিকট এই দুই হাযার দীনার জমা রেখেছিল। ওটা আপনাকে ফেরৎ দিতে এলাম। ফারূকে আযম (রাঃ) গভর্ণরকে প্রশ্ন করলেন, তাদের অভিযোগ কি সত্য? তিনি বললেন, না তারা মিথ্যা বলেছে। আমি ওদের নিকট চার হাযার দীনার জমা রেখেছিলাম। কিন্তু তারা দুই হাযার আত্মসাৎ করে বাকী দুই হাযার জমা দিতে এসেছে। ওমর ফারুক (রাঃ) বললেন, তুমি একাজ কেন করলে? তিনি উত্তরে বললেন, আমি মরে যাবার পর ছেলে-মেয়েদের জীবিকা যেন ভালভাবে চলে সেজন্য। তারা গভর্ণরকে বিপদে ফেলতে এসে নিজেরাই বিপাকে পড়ে গিয়েছে ভেবে আমীরুল মুমিনীন ওমর ফারুক (রাঃ)-এর নিকট ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়ে বলল, হে আমীরুল মুমিনীন, আপনার এই অলী (গভর্ণর) খুবই কড়া শাসক। শাসন কাজ চালাতে গিয়ে আমাদের কোন পরামর্শ নেন না এবং আমাদের মান-সম্মানের দিকে লক্ষ্য রেখে একটুও এদিক-ওদিক করেন না। এতে করে আমাদের মান-সম্মান ক্ষুণ্ণ হচ্ছে, কাজেই তাকে আমাদের ওখান থেকে সরাবার জন্য আমরা চাঁদা তুলে দুই হাযার দীনার জমা করে এই ষড়যন্ত্রের জাল বুনেছিলাম। আসলে উনি আমাদের নিকট দুই হাযার তো দূরের কথা দুই দীনারও রাখেননি। ওমর ফারুক (রাঃ) উক্ত গভর্ণরকে লক্ষ্য করে বললেন, কি ব্যাপার! তিনি উত্তরে বললেন, এখন ওরা ঠিক বলছে। ফারুকে আযম তাঁর গভর্ণরের বুদ্ধিমত্তা দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলেন। সে কিভাবে শত্রুর মুখ থেকেই তার সততা ও ওদের চক্রান্তের কথা বের করে নিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, হে অলী! তুমি কেন এ ধরনের কৌশল অবলম্বন করলে? তিনি উত্তরে বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন, তারাতো কয়েকজন। একজন দাবী পেশ করেছে, তার সাথে ক'জন সাক্ষী আছে। কিন্তু আমারতো সাক্ষী নেই। কাজেই কৌশল অবলম্বন ছাড়া আরতো কোন উপায় ছিল না। আমীরুল মুমিনীন তাঁকে ধন্যবাদ জানালেন।
শিক্ষা: ন্যায়পরায়ণ শাসকের কাছে ধনী-গরীব সবাই সমান। তিনি সৎভাবে রাষ্ট্র চালালে আল্লাহপাক তাকে যেকোন বিপদ-আপদে সাহায্য করবেন।