📘 গল্পের মাধ্যমে জ্ঞান > 📄 আবুবকর (রাঃ)-এর ঈমানী দৃঢ়তা

📄 আবুবকর (রাঃ)-এর ঈমানী দৃঢ়তা


(১) খলীফা আবুবকর (রাঃ) খেলাফতের গুরু দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছেন। রাসূল (ছাঃ)-এর প্রেরিত সেনাবাহিনী তাঁর মৃত্যু সংবাদ শুনে মদীনায় ফিরে এসেছে। এক্ষণে তাদের রাজধানী রক্ষার জন্য মদীনায় রাখা হবে, না পুনরায় প্রেরণ করা হবে- এ নিয়ে শীর্ষস্থানীয় ছাহাবীগণের মধ্যে আলোচনা হ'ল। অধিকাংশের পরামর্শ হ'ল, এ মুহূর্তে রাজধানী মদীনাকে রক্ষা করাই হবে সবচেয়ে বড় কর্তব্য। তাছাড়া সেনাপতি পরিবর্তন করাও আবশ্যক। কেননা সে হ'ল বয়সে তরুণ এবং গোলামের পুত্র উসামা বিন যায়েদ বিন হারেছাহ (রাঃ)। আনছার ও মুহাজির সেনারা তাঁর নেতৃত্ব মানতে চাইবে না। খলীফা আবুবকর ছিদ্দীকু (রাঃ) দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বললেন, 'মদীনার রক্ষাকর্তা আল্লাহ। যুদ্ধে বিজয় দানের মালিকও আল্লাহ। আর ইসলামে সাদা-কালোর কোন ভেদাভেদ নেই। অতএব মৃত্যুর পূর্বে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যার মাথায় জিহাদের পাগড়ী বেঁধে যে উদ্দেশ্যে তাকে প্রেরণ করেছিলেন, আমি সে পাগড়ী খুলে নিতে পারব না'। অতঃপর আল্লাহ্ নামে তিনি সেনাবাহিনীকে খৃষ্টান পরাশক্তির বিরুদ্ধে রওয়ানা হবার নির্দেশ দিলেন এবং যুদ্ধ শেষে যথারীতি তারা বিজয়ী বেশে মদীনায় ফিরে এল। চারিদিকে শত্রু-মিত্র সবার মধ্যে নতুন মাদানী রাষ্ট্র সম্পর্কে শ্রদ্ধার আসন দৃঢ় হ'ল (আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৭/৪২০)।

(২) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর মৃত্যুর পর যাকাত জমা দিয়ে তাঁর দো'আ পাবার সুযোগ নেই- এই অজুহাতে একদল লোক নতুন খলীফার নিকটে যাকাত জমা করতে অস্বীকার করল। শূরার বৈঠক বসল। খলীফা আবুবকর (রাঃ) ওদের বিরুদ্ধে সৈন্য প্রেরণ করতে চাইলেন। কিন্তু শূরা দ্বিমত পোষণ করল। এমনকি ওমর (রাঃ) বললেন, হে খলীফা! তারা যে কলেমাগো মুসলমান। আপনি কিভাবে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করবেন? খলীফা বলে উঠলেন, আল্লাহ্র কসম! আমি ঐ ব্যক্তির বিরুদ্ধে অবশ্যই যুদ্ধ করব, যে ব্যক্তি ছালাত ও যাকাতের দু'টি ফরয (একটি হাক্কুল্লাহ অন্যটি হাক্কুল ইবাদ)-এর মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে? আল্লাহ্র কসম! রাসূল (ছাঃ)-এর সময়ে যাকাত হিসাবে জমাকৃত একটি বকরীর দড়িও যদি কেউ আজকে দিতে অস্বীকার করে, আমি অবশ্যই তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করব'। ওমর (রাঃ) বলেন, আল্লাহর কসম, আমি দেখলাম আল্লাহ আবুবকরের বক্ষকে যুদ্ধের জন্য সুপ্রশস্ত করে দিয়েছেন। ফলে আমি বুঝতে পারলাম তিনি হক-এর উপরই প্রতিষ্ঠিত আছেন' (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/১৭৯০)। এই যুদ্ধের ফলে ভবিষ্যতে আর কেউ কোন ফরয বিধানকে হালকা করে দেখার সাহস পায়নি এবং এভাবে হাক্কুল ইবাদ রক্ষার ফলে ইসলামী রাষ্ট্রের আর্থিক ভিত মযবুত হ'ল। গরীবদের অধিকার রক্ষা পেল।

শিক্ষা: আবুবকর (রাঃ)-এর অপূর্ব ঈমানী দৃঢ়তার স্বাক্ষর উপরোক্ত ঘটনা দু'টি। এর মাধ্যমে তিনি হাক্কুল ইবাদ কঠোরভাবে রক্ষা করলেন। সাথে সাথে ইসলামের কোন ফরয ইবাদতকে হালকা করে দেখার যে কোন অবকাশ নেই-সেটিও জনগণকে বুঝিয়ে দিলেন।

📘 গল্পের মাধ্যমে জ্ঞান > 📄 আবুবকর (রাঃ)-এর মৃত্যুকালীন অছিয়ত

📄 আবুবকর (রাঃ)-এর মৃত্যুকালীন অছিয়ত


ইসলামের ১ম খলীফা আবুবকর ছিদ্দীক্ব (রাঃ)-এর মৃত্যুক্ষণ উপস্থিত হ'লে তিনি সূরা ক্বাফ-এর ১৯নং আয়াতটি তেলাওয়াত করেন ('মৃত্যুযন্ত্রণা অবশ্যই আসবে; যা থেকে তুমি টালবাহানা করে থাক')। অতঃপর তিনি স্বীয় কন্যা আয়েশা (রাঃ)-কে বললেন, আমার পরিহিত দু'টি কাপড় ধুয়ে তা দিয়ে আমাকে কাফন পরিয়ো। কেননা মৃত ব্যক্তির চাইতে জীবিত ব্যক্তিই নতুন কাপড়ের অধিক হকদার (মুসনাদে আবী ইয়া'লা হা/৪৪৫১)। অতঃপর তিনি পরবর্তী খলীফা হযরত ওমর (রাঃ)-কে অছিয়ত করেন এই মর্মে যে, 'নিশ্চয়ই রাত্রির জন্য আল্লাহ এমন কিছু হক নির্ধারণ করে রেখেছেন, যা তিনি দিবসে কবুল করেন না। আবার দিবসের জন্য এমন কিছু হক নির্ধারণ করেছেন, যা রাতে কবুল করেন না। কোন নফল ইবাদত কবুল করা হয় না, যতক্ষণ না ফরযটি আদায় করা হয়। নিশ্চয়ই আখেরাতে মীযানের পাল্লা হালকা হবে দুনিয়ার বুকে বাতিলকে অনুসরণ করা এবং নিজের উপর তা হালকা মনে করার কারণে। অনুরূপভাবে আখেরাতে মীযানের পাল্লা ভারী হবে দুনিয়াতে হক অনুসরণ করা এবং তাদের উপর তা ভারী হওয়ার কারণে' (মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বা, হা/৩৫৫৭৪)।

শিক্ষা : রাষ্ট্রীয় গুরুদায়িত্ব পালনকারীর জন্য অলসতা ও বিলাসিতার কোন সুযোগ নেই। তাকে কোন অবস্থাতেই বাতিলের সাথে আপোষ করা চলবে না। বরং যেকোন মূল্যে সর্বাবস্থায় হক তথা আল্লাহ প্রেরিত সত্যকে কঠিনভাবে আঁকড়ে ধরে থাকতে হবে। কেননা দুনিয়াতে সকল কাজের উদ্দেশ্য হবে আখেরাতে মীযানের পাল্লা ভারী করা।

📘 গল্পের মাধ্যমে জ্ঞান > 📄 আবুবকর (রাঃ)-এর গোপন আমল

📄 আবুবকর (রাঃ)-এর গোপন আমল


ইসলামের প্রথম খলীফা আবুবকর (রাঃ) ফজরের ছালাত আদায় করে মরুভূমির দিকে হাঁটাহাঁটি করতেন এবং কিছুক্ষণ সেখানে অবস্থানের পর শহরে ফিরে আসতেন। ওমর (রাঃ) তাকে প্রতিদিন শহরের বাইরে ঘোরাফেরা করতে দেখে কৌতূহল বোধ করলেন। তাই একদিন ফজরের ছালাতের পর আবুবকর (রাঃ) যখন বের হ'লেন, তখন তিনি পায়ে পায়ে তাঁকে অনুসরণ করতে লাগলেন। অতঃপর আবুবকর (রাঃ) মরুভূমিতে হাঁটতে হাঁটতে একটি পুরাতন তাঁবুতে প্রবেশ করলে ওমর (রাঃ) একটি টিলার পিছনে লুকিয়ে থাকলেন সন্তর্পণে। কিছুক্ষণ পর আবুবকর (রাঃ) সেই তাঁবু থেকে বেরিয়ে এসে আবার শহরের পথ ধরলেন। এদিকে ওমর (রাঃ) টিলার আড়াল থেকে বের হলেন এবং উক্ত তাঁবুতে প্রবেশ করলেন। সেখানে তিনি এমন একজন অন্ধ দুর্বল মহিলাকে দেখতে পেলেন, যার কয়েকটি শিশু সন্তান রয়েছে। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি জান, তোমার নিকটে কে আসে? মহিলা বলল, আমি তাকে চিনি না। তিনি একজন মুসলিম। প্রতিদিন সকালে তিনি আমাদের বাড়িতে এসে আমাদের গৃহ পরিষ্কার করেন। তারপর রুটি তৈরীর জন্য আটা পিষে এবং গৃহপালিত পশুগুলির দুগ্ধ দোহন করে চলে যান। একথা শুনে ওমর (রাঃ) বিস্ময়াভিভূতভাবে বেরিয়ে আসলেন এবং স্বগতোক্তি করলেন, لَقَدْ أَنْعَبْتَ الْخُلَفَاءَ مِنْ بَعْدِكَ يَا أَبَا بَكَر 'হে আবুবকর! পরবর্তী খলীফাদের উপর তুমি কত কষ্টই না চাপিয়ে দিলে'! (তারীখু মাদীনাতি দিমাশক ৩০/৩২২)।

শিক্ষা : অসহায় গরীব-দুঃখীদের খোঁজ-খবর নেয়া ও তাদেরকে সহযোগিতা করা রাষ্ট্র প্রধানের কর্তব্য।

📘 গল্পের মাধ্যমে জ্ঞান > 📄 নীলদলের প্রতি ওমর (রাঃ)-এর পত্র

📄 নীলদলের প্রতি ওমর (রাঃ)-এর পত্র


২০ হিজরী সনে দ্বিতীয় খলীফা ওমর (রাঃ)-এর শাসনামলে বিখ্যাত ছাহাবী আমর ইবনুল 'আছ (রাঃ)-এর নেতৃত্বে সর্বপ্রথম মিসর বিজিত হয়। মিসরে তখন প্রবল খরা। নীলনদ পানি শূন্য হয়ে পড়েছে। সেনাপতি আমরের নিকট সেখানকার অধিবাসীরা অভিযোগ করে বলল, হে আমীর! নীলনদ তো একটি নির্দিষ্ট নিয়ম পালন ছাড়া প্রবাহিত হয় না। তিনি বললেন, সেটা কি? তারা বলল, এ মাসের ১৮ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর আমরা কোন এক সুন্দরী যুবতীকে নির্বাচন করব। অতঃপর তার পিতা-মাতাকে রাযী করিয়ে তাকে সুন্দরতম অলংকারাদি ও উত্তম পোষাক পরিধান করানোর পর নীলনদে নিক্ষেপ করব।
আমর ইবনুল 'আছ তাদেরকে বললেন, ইসলামে এ ধরনের কাজের কোন অনুমোদন নেই। কেননা ইসলাম প্রাচীন সব জাহেলী রীতি-নীতিকে ধ্বংস করে দিয়েছে। অতঃপর তারা পর পর তিন মাস পানির অপেক্ষায় কাটিয়ে দিল। কিন্তু নীলনদের পানি বৃদ্ধির কোন লক্ষণ দেখা গেল না। অতঃপর সেখানকার অধিবাসীরা দেশত্যাগের কথা চিন্তা করতে লাগল। এ দুর্যোগময় অবস্থা দৃষ্টে সেনাপতি আমর ইবনুল আছ (রাঃ) খলীফা ওমর (রাঃ)-এর নিকটে পত্র প্রেরণ করলেন। উত্তরে ওমর (রাঃ) লিখলেন, হে আমর! তুমি যা করেছ ঠিকই করেছ। আমি এ পত্রের মাঝে একটি পৃষ্ঠা প্রেরণ করলাম। এটা নীলনদে নিক্ষেপ করবে।' ওমরের পত্র যখন আমরের নিকটে পৌছাল, তখন তিনি পত্রটি খুলে দেখলেন সেখানে এ বাক্যগুলি লেখা রয়েছে- من عمر أمير الْمُؤْمِنِينَ إِلَى نيل مصر أما بعد فإن كنت تجرى من قبلك فلا تجر وَإِن كَانَ الله الواحد القهار هُوَ الَّذِي يُجْرِيكَ فَنَسْأَلُ اللَّهَ تَعَالَى أَنْ يُجْرِيَكَ মুমিনীন ওমর-এর পক্ষ থেকে মিসরের নীলনদের প্রতি। যদি তুমি নিজে নিজেই প্রবাহিত হয়ে থাক, তবে প্রবাহিত হয়ো না। আর যদি একক সত্তা, মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ তোমাকে প্রবাহিত করান, তবে আমরা আল্লাহ্ নিকটে প্রার্থনা করছি, তিনি যেন তোমাকে প্রবাহিত করেন'।
অতঃপর আমর (রাঃ) পত্রটি নীলনদে নিক্ষেপ করলেন। পর দিন শনিবার সকালে মিসরবাসী দেখল, আল্লাহ তা'আলা এক রাতে নীলনদের পানিকে ১৬ গজ উচ্চতায় প্রবাহিত করে দিয়েছেন। তারপর থেকে আজও পর্যন্ত নীলনদ প্রবাহিতই রয়েছে। কখনো বিশুষ্ক হয়নি (আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৭/১০০; তারীখু মাদীনাতি দিমাশক ৪৪/৩৩৭; তাবাকাতুশ শাফিইয়‍্যাহ আল-কুবরা ২/৩২৬)।

শিক্ষা : আল্লাহ্ হুকুমেই পৃথিবীর সবকিছু পরিচালিত হচ্ছে। তাঁর নির্দেশ ব্যতীত গাছের একটা পাতাও নড়ে না। অতএব যেকোন দুর্যোগে কেবল তাঁর কাছেই সাহায্য চাইতে হবে। কোন জাহেলী ও শিরকী পন্থার আশ্রয় নেয়া যাবে না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00