📘 গল্পে আঁকা সীরাত হে মুহাম্মদ > 📄 আমি সেই খেজুর গাছ

📄 আমি সেই খেজুর গাছ


আমি ছিলাম একটা আস্ত খেজুর গাছই। আরব দেশে খেজুর গাছের অভাব নেই। এর ফল অর্থাৎ খেজুর খেতে ভীষণ মজা ও উপকারী। আরবের মরু রাখালেরা ভর দুপুরের খর-তাপে আশ্রয় নেয় এই খেজুর গাছের শীতল ছায়ায়। ছোট্ট বেলায় যখন মুহাম্মদ মেষ চরাতেন তখন কতো বসেছেন এই ছায়ায়। বয়সে তখন রাখাল মুহাম্মদ ছোট্ট হলে কী হবে, বুদ্ধিতে আচরণে সুচরিত্রে তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়। ছোট ছোট রাখালেরা খেজুর গাছের ছায়ায় এসে বসতো ছোট্ট মুহাম্মদকে ঘিরে। তখন কী শান্ত ভঙ্গিতে, সুবচনে, সুহাসিতে তিনি ওদের সাথে কথা বলতেন। মুগ্ধতায় ভরিয়ে দিতেন ওদের সুকুমার মন-মানস। সবার দৃষ্টি যেনো তখন বলতো—

প্রিয় মুহাম্মদ! তুমি আসলে কে? তুমি কি আমাদের মতো শুধুই রাখাল? মনে তো হয় না! তাহলে আমরা কেনো তোমার মতো অমন সুন্দর করে কথা বলতে পারি না! আমরা কেনো সুনীল আকাশপানে উদাস নয়নে নীলিমা দেখতে দেখতে মুগ্ধ হতে পারি না? আমাদের মেষপাল কেনো তোমার মেষপালের মতো অমন মোটাতাজা ও সুঠাম হয় না! বলো তো, তুমি আসলে কে? এই রাখাল বেশের আড়ালে কে লুকিয়ে আছে? কী লুকিয়ে আছে? সে কি কোনো মহা মানব? সে কি কোনো মহা সূর্য?

সেই বরকতময় শৈশব পেরিয়ে তারপর এলো স্নিগ্ধ কৈশোর তারপর এলো শান্ত যৌবন। মুহাম্মদ বড় হলেন। নবী হলেন। ইসলাম প্রচার করলেন প্রথম তিন বছর গোপনে, তারপর প্রকাশ্যে। তারপর জুলুম-নির্যাতনের মাত্রা যখন বেড়ে গেলো, মক্কায় আর থাকা গেলো না, হিজরত করতে হলো মদীনায়। মদীনায় আসার পরই আমি প্রথম মুহাম্মদকে দেখতে পাই—চোখের দেখা। ধন্য হই তাঁর মোহন পরশে। কেননা এখানে এসে প্রায়ই তিনি আমার গায়ে হেলান দিয়ে বসতেন। সাহাবায়ে কেরামের সামনে ইসলামের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলতেন। কুরআনের আয়াতের তাফসীর করতেন। আমি এবং আমার কাছে বসা সবাই মন দিয়ে তাঁর কথা শুনতাম। নামাজের সময় হলে সেখানে দাঁড়িয়ে তিনি সবাইকে নিয়ে নামাজ পড়ে নিতেন। দু'আ করতেন, আল্লাহ যাতে বাড়িয়ে দেন মুসলমানদের সংখ্যা। সবাই যেনো উঠে আসতে পারে আলোর পথে, হিদায়াতের রাস্তায়। অসার মূর্তিপূজা ত্যাগ করে আশ্রয় নিতে পারে এক আল্লাহ্র ইবাদতের ছায়ায়। আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোযা রাখলে ইফতার করতেন আমারই তাজা খেজুর দিয়ে। সঙ্গে থাকতেন সাহাবীরাও। তখন সাহাবীদের সংখ্যা তো আর বেশী ছিলো না, তাই আমার একার খেজুরই সবার জন্যে যথেষ্ট ছিলো।

আমার বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাহাবীদের সংখ্যাও বাড়তে লাগলো এবং আমি যখন ফলদানে অক্ষম হয়ে গেলাম, আমার সবুজ শাখাগুলোতেও যখন খরা দেখা দিলো, তখন তাঁরা আমাকে কেটে ফেললেন! আমার লম্বা লম্বা শাখাগুলো তাঁরা বিভিন্ন কাজে লাগিয়ে ফেললেন। বাড়ির ছাদে ব্যবহার করে ফেললেন। শুধু আমার গোড়াটা তাঁরা রেখে দিলেন। মাটি থেকে একটু উচ্চতায় আমি যেখানে ছিলাম সেখানেই পড়ে থাকলাম। ভাবতাম, জীবন কতো ছোট্ট! সেদিন-না আমি ছিলাম সবুজ পাতায় ছাওয়া! ফলে-ফলে ভরা! আজ কিছুই নেই! পাতা নেই! ফল নেই! আছে শুধু গোড়াটা! হয়তো এটাও কিছুদিন পরে থাকবে না! মহান সেই সত্ত্বা, যাঁর কোন ক্ষয় নেই, লয় নেই-চিরবিরাজমান!

আমি আগেই তোমাদেরকে বলেছি যে আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদেরকে নিয়ে মাঝে মাঝে আমার এখানে এসে বসতেন এবং তাঁদেরকে দীনি তা'লিম দিতেন। যখন তাঁদের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়তে লাগলো, তখন তিনি তাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলতেন যাতে সবাই তাঁর কথা শোনেন এবং তাঁকে দেখেন। তারপর এ-সংখ্যা যখন আরো বেড়ে গেলো, আল্লাহ্ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার দিকে তাকালেন এবং আমার উপরে এসে দাঁড়ালেন, যাতে একটু দূরে উপস্থিত সাহাবায়ে কেরামও তাঁকে দেখতে পারেন এবং তাঁর কথা শুনতে পারেন। আমি দেখতাম, তাঁর কথা শুনতে শুনতে সবার চোখ অশ্রু-ছলোছলো হয়ে উঠছে। কী গভীর মায়া ও মনোযোগ দিয়ে তাঁরা শুনতেন! এ-ই যেনো তাঁদের কাছে শেষ নবীর শেষ কথা! এ-ই যেনো তাঁদের শেষ শোনা! আমি -খেজুর গাছের অবশিষ্টাংশ গোড়া- আল্লাহ্ নবীর এই মহা সান্নিধ্য পেয়ে বড়ো গর্ববোধ করছিলাম। তিনি যখন আমার উপরে দাঁড়িয়ে উচ্চকণ্ঠে অধিক সংখ্যক সাহাবীকে লক্ষ্য করে কথা বলতেন তখন আমার মনে হতো, আমি ধন্য, চিরধন্য! আগে ছিলো আমার সবুজ সবুজ পাতা, লম্বা লম্বা সবুজাভ শাখা! এখন আমার কিছুই নেই! শুকনো কাঠের মতো পড়ে আছি মাটি কামড়ে। তাতে কী হয়েছে! আমার মুহাম্মদ তো আছেন! তাঁর নিবিড় সান্নিধ্য তো আছে! এখন তিনিই আমার শাখা! কোন্ শাখার জন্যে তবে এখন আমি শোক-তাপ করবো? হারিয়ে যাওয়া সেই শাখার জন্যে, এই মুহাম্মদী শাখার বদলে? না, অসম্ভব! এ-ই আমার সবচে' প্রিয় 'শাখা'! আহা! কী যে ভালো লাগে আমার, যখন কথা বলার জন্যে নবীজী আমার উপর পা রেখে নিবিড় হয়ে দাঁড়ান, সাহাবীরা তা শোনার জন্যে আমার কাছে-আশপাশে নিবিড় হয়ে বসেন! সবাই তাকিয়ে থাকেন নবীজীর দিকে, তখন তো দৃষ্টি পড়ে যায় আমারও উপরে! এই সৌভাগ্য আমি কী দিয়ে মাপবো?

আমার সৌভাগ্য দিনে দিনে বাড়ছিলো, কেননা আমি দেখছিলাম যে মুসলমানদের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে। বাড়তে বাড়তে এক সময় এমন পর্যায়ে চলে গেলো যে আমার উপর দাঁড়ালে আল্লাহ্র রাসূলকে সবাই দেখতে পারতেন না। তাঁর কথা সবার কানেও পৌঁছতো না। ফলে তিনি আমাকে ছেড়ে চলে গেলেন পাশে, আমার চেয়ে উঁচু একটা মিম্বরে! মুসলমানদের সংখ্যাধিক্যে আমার আনন্দ যতো-না বাড়লো তারচে' বেশী বেড়ে গেলো আমার বিরহ-যাতনা! আল্লাহ্র নবী'র বিরহ আমি সইতে পারলাম না, পারলামই না। মনকে বোঝাই- তোমাকে তো ইচ্ছে করে মুহাম্মদ ছেড়ে চলে যান নি! প্রয়োজন হয়েছে, তাই গিয়েছেন! মুসলমানদের সংখ্যা বেড়েছে, তাই গিয়েছেন! এ জন্যে অমন ভেঙে পড়লে-জে! তুমি কি যুক্তির ভাষা বোঝো না?! এখনও যদি তোমার উপর দাঁড়িয়েই নবীজী কথা বলেন, তাহলে অনেকেই-জে তাঁর বাণী শুনতে পাবেন না! অনেকেরই যে কষ্ট হবে! তোমার একার কষ্ট তোমার কাছে কষ্টদায়ক না আরো অনেকের কষ্ট বেশী কষ্টদায়ক!

কিন্তু মন আমার বুঝলো না। শান্ত হলো না। স্থির হলো না। না প্রবোধে, না যুক্তিতে! আমি নিজের উপর সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললাম! একদিন দেখলাম- আমি না-চাইতেই কাঁদছি! অঝরে কাঁদছি! কেঁদে কেঁদে অস্থির হয়ে পড়ছি! যেনো একটা অবোধ শিশু কাঁদছে! মা'কে খুঁজে খুঁজে না-পেয়ে!! আমার বুক ফেটে কেবল উদগীরিত হচ্ছিলো- 'আহ্! আহ্!-এর লাভা! এভাবে আমি 'আহ্! আহ্! আহ্!' বলে কেঁদে কেঁদে সারা! বুকের জ্বলনে-দহনে চোখ আমার অবিরত শুধুই ভেজা ভেজা! আমার এ কান্না- ভালোবাসার কান্না! নবী প্রেমের নাযরানা! চুপ থাকি কেমনে? নীরব থাকি কেমনে? ভালোবাসবো না আমার নবীকে! তাঁর ভালোবাসায় যদি আমার আঁখিজলে বুক ভাসে, ভাসুক না! কেনো আমি থামবো? কেনো আমি বলবো- হে চোখ! শান্ত হও! বন্ধ করো তোমার অশ্রুপাত! না, এ আমি বলতে পারবো না! পারবোই না! ভালোবাসার দাবি আমি ছাড়তে পারবো না!

তাই কান্নাও আমি বন্ধ করতে পারবো না! আর এটা তো আমি পারবোও না! কারণ এ-জে সম্পূর্ণরূপে আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে! আমি কাঁদছি ইচ্ছায় নয়, অনিচ্ছায়! আমি কাঁদছি লোক-দেখানো কান্না নয়, নবীজীর ভালোবাসায়! ভালোবাসার কান্না বন্ধ হয় না! ভালোবাসার কান্না বন্ধ করা যায় না! ভালোবাসার কান্না থামে না, থামানো যায় না! ভালোবাসার কান্না বাঁধ মানে না—চিরঅবাঁধ! কিন্তু তাই বলে কি আমি কেঁদে কেঁদেই ‘শেষ’ হয়ে যাবো?!

হঠাৎ দেখলাম— সাহাবীরা বারবার আমার দিকে তাকাচ্ছেন। অবাক চোখে! তাঁরা কি আমার কান্না শুনতে পাচ্ছেন? মনে হয় পাচ্ছেন! হ্যাঁ, তাঁরা আমার দুঃখ বুঝতে পারছেন! তাঁরা আমার বিরহ-জ্বালা উপলব্ধি করতে পারছেন! তখনো আমি ‘আহ্! আহ্! আহ্!’ করছি! নিজেকে থামাতে পারছি না!

আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবার এগিয়ে এলেন, আমার দিকে! কাছে এলেন, অনেক কাছে! একেবারে কাছে! তারপর গভীর মমতায়, অনন্ত স্নেহময়তায় আমাকে জড়িয়ে ধরলেন! সান্ত্বনা দিলেন! জান্নাতে আমি তাঁর পাশে থাকবো— এ সুসংবাদও শোনালেন! থামতে বললেন! আমি থেমে গেলাম! কেনো থামবো না? এতোক্ষণ কেঁদেছি, সে তো বিরহের কান্না! এখন তো বিরহ নেই! তার জ্বালাও নেই! তবে কেনো আর কান্না? মিলনে কি কাঁদতে আছে! যার জন্যে এ কান্না, তিনিই তো এখন আমার সান্ত্বনা! তাই আমি শান্ত হলাম! আমার অশান্ত প্রহর কেটে গেছে। আমার বিরহ-কাতরতা আর নেই। কেননা আমি আমার ভালোবাসার পয়গাম পৌঁছে দিয়েছি আমার প্রিয়ের কাছে হাবীবের কাছে। আমার জীবনে এখন আর কান্না নেই, আছে শুধু হাসি। সুখের হাসি। আনন্দের হাসি। তৃপ্তির হাসি। পূর্ণতার হাসি। ইতিহাসের সেরা খেজুর গাছ হওয়ার হাসি। সেরা কেনো? সেরা শুধু এ জন্যে যে আমি কাঁদতে পেরেছি। আমার কান্না নবীজীকে, তাঁর প্রিয় সাহাবীদেরকে শোনাতে পেরেছি! এমন কোনো খেজুর গাছ খুঁজে পাবে তুমি! তবেই বলো, সেরা আমি! শুধুই আমি!!

📘 গল্পে আঁকা সীরাত হে মুহাম্মদ > 📄 আমি রিদওয়ান বৃক্ষ

📄 আমি রিদওয়ান বৃক্ষ


জাযিরাতুল আরবে গাছ-গাছালি নেই বললেই চলে। হঠাৎ কোথাও দেখা যায় দু'একটি খেজুর গাছ দাঁড়িয়ে নিজেদের অস্তিত্বের ঘোষণা দিচ্ছে। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে আমাদের - গাছ-গাছালির- অনেক কাহিনী জড়িয়ে আছে। ইতিহাসের পাতায় সংরক্ষিত আছে সে-সব কাহিনী। আমার নিজের কাহিনী বলার আগে আমার বোনেরটা প্রথমে বলি।

একদিন আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুশমনের খবর ও গতিবিধি জানার জন্যে মদীনার একটু বাইরে এলেন। সেখানেই ছিলো আমার বোন-ঐ গাছটা। নবীজী তার ছায়ায় গিয়ে বসলেন একটু বিশ্রামের উদ্দেশ্যে। খানিক পর সেখানে তিনি শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন। এর মধ্যেই চুপিসারে সেখানে এক মুশরিক এসে হাজির। হাতে নাঙা তলোয়ার। তলোয়ার উঁচিয়ে সে বললো: -বলো, আমার হাত থেকে তোমাকে কে রক্ষা করবে?

আল্লাহ্র রাসূল লোকটার হত্যা-হুমকিতে একটুও ভয় পেলেন না, মোটেই বিচলিত হলেন না বরং দৃঢ় ও শান্ত কণ্ঠে বললেন: -আল্লাহ!

'আল্লাহ' শব্দ শুনতেই লোকটা ভয়ে থরথর কাঁপতে লাগলো। তার হাত থেকে তলোয়ারটা খসে পড়ে গেলো। আল্লাহ্র রাসূল তখন সেটি উঠিয়ে বললেন: -বলো, তোমাকে এখন কে বাঁচাবে?

ভীত কম্পিত লোকটি লা-জওয়াব দাঁড়িয়ে রইলো। তার ভয় ও কম্পন ধীরে ধীরে বাড়তে লাগলো। আল্লাহ্র রাসূল তাকে মাফ করে দিলেন। জানের দুশমনকেও তিনি ছেড়ে দিলেন। তার নাম ছিলো দা'সূর - دعثور। পরে সে মহানবীর মহানুভবতায় মুগ্ধ হয়ে ইসলাম কবুল করে ধন্য হয়। এই ছিলো আমার বোনের কাহিনী। এবার বলি আমার কথা। আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে আমার যে কাহিনী তা নিয়ে আমি হাজার বার গর্ব করি। এ গর্বের উৎস হলো, আমার কথা আল্লাহ কুরআনে উল্লেখ করেছেন! আমি এখন স্মরণীয়, চির স্মরণীয়। জন্মেছিলাম মাটিতে-ঊষর মরুতে। তারপর নবীজীর পরশে উঠে গেলাম আকাশে, লওহে মাহফুযে সংরক্ষিত ফলকে! কী সৌভাগ্য!!

হিজরতের পর অনেকদিন আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবীরা মক্কায় যান নি। যেতে পারেন নি। অথচ মন টানছিলো ভীষণ। দু' চোখ ভরে মক্কা দেখার জন্যে কা’বা অবলোকন করার জন্যে সবার মন আঁকু-পাঁকু করছিলো। তাই একদিন সাহাবীদের নিয়ে আল্লাহ্র রাসূল মক্কায় রওয়ানা হলেন। হোদায়বিয়া পৌঁছে তিনি হযরত উসমানকে মক্কার কাফেরদের নিকট এই বার্তা দিয়ে পাঠালেন যে, আমরা কা’বা যিয়ারত করতে এসেছি, যুদ্ধ-বিগ্রহ আমাদের উদ্দেশ্য নয়।

হযরত উসমান গেলেন। অনেকটা সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর সবাই তাঁর ফিরে আসার অপেক্ষায় প্রহর গোনতে লাগলেন। কিন্তু উসমানের আসতে দেরী হচ্ছিলো, অনেক দেরী। এমনকি ওদিক থেকে তিনি তো এলেনই না, এলো এক দুঃসংবাদ, মহা দুঃসংবাদ! হযরত উসমানকে নাকি ওরা কতল করে ফেলেছে!! ভাবো তো একটু! হযরত উসমানের মতো মাটির মানুষকে মেরে ফেলার খবর এলে নবীজী এবং সাহাবীদের মনে কী বেদনা ও ক্ষোভ সৃষ্টি হতে পারে! সুতরাং এ-খবরে আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া হলো। আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোরাইশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। মুসলমানদেরকে জিহাদের জন্যে বাইয়াত নিতে ডাকলেন। সবাই বাইয়াত গ্রহণ করলেন ‘আমার নিচে’ বসে! আমার ছায়ায় বসে! এ-বাইয়াত ও আমাকে নিয়েই নাযিল হলো তখন এ আয়াত- لَقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ

‘অবশ্যই আল্লাহ মু’মিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন, যখন তারা বৃক্ষতলায় বসে তোমার কাছে যুদ্ধের শপথ নিচ্ছিলো।’ -সূরা ফাতহ

মক্কার মুশরিকরা এ-বাইয়াতের কথা জানতে পারলো। সঙ্গে সঙ্গে তাদের ভিতরে ভীতি ও কম্পন ছড়িয়ে পড়লো। তারা ভালো করেই জানে, বীরপুরুষদের যুদ্ধ-শপথের অর্থ কী! এদিকে একটু পর হযরত উসমান ফিরে এলেন। তাঁর কতলের খবরটি নিছক একটি গুজব ছিলো। হযরত উসমানের সঙ্গে কোরাইশের এক দূতকেও দেখা গেলো। দূত এসে বললো: -আমরা চাই নতুন করে আমাদের মাঝে এখন আর কোনো যুদ্ধ না হোক। এ লক্ষ্যে আগামী দশ বছর আমাদের মাঝে একটি যুদ্ধ-বিরতি চুক্তি হবে। সে চুক্তিতে উভয় পক্ষের শর্তাবলী লেখা থাকবে।

চুক্তি সম্পাদিত হলো। ইতিহাসে যা ‘হোদায়বিয়া চুক্তি’ নামে পরিচিত। এ-চুক্তির উল্লেখযোগ্য শর্তগুলো ছিলো এমন:
► আগামী দশ বছর উভয় পক্ষ যুদ্ধ থেকে বিরত থাকবে।
► এ বছর মুসলমানগণ মক্কায় প্রবেশ করতে পারবে না। উমরাও করতে পারবে না। হোদায়বিয়া থেকেই তাদেরকে ফিরে যেতে হবে মদীনায়।
► আগামী বছর উমরা করার সুযোগ থাকবে। তলোয়ার ও ধনুক ছাড়া অন্য কোনো যুদ্ধাস্ত্র সাথে আনা যাবে না। তিন দিনের মধ্যেই উমরা পালন করে সবাইকে মদীনায় ফিরে যেতে হবে।
► কোরাইশের কেউ মুসলমানদের কাছে চলে গেলে তাকে ফেরত দিতে হবে। মুসলমানদের কেউ কোরাইশের কাছে চলে এলে তারা তাকে ফেরত দেবে না।
► কেউ কারো মিত্রকে আক্রমণ করতে পারবে না।
► কারো মিত্রপক্ষ আক্রান্ত হলে তাদেরকে সাহায্য করা যাবে।

সাহাবীদের অনেকেই এ-চুক্তিকে মন থেকে মেনে নিতে পারলেন না। কেননা এ চুক্তিতে অনেক অন্যায় শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছিলো। এতে মুসলমানদের দুর্বলতা প্রকাশ পাচ্ছিলো। কিন্তু আল্লাহ্র রাসূল সব শর্ত মেনে নিয়েই চুক্তি সই করলেন। সাহাবীদের দৃষ্টি ছিলো কাছে আর রাসূলের দৃষ্টি ছিলো দূরে, বহু দূরে। তাই সময় যতোই গড়াতে লাগলো এ-চুক্তির সুফল ততোই প্রকাশ পেতে লাগলো। আমার কাছেও তাই মনে হলো। দিনে দিনে নবীজীর দূরদৃষ্টি আলো ছড়াতে লাগলো। নমুনা লক্ষ্য করো-

এক. চুক্তি অনুযায়ী মক্কা থেকে কেউ মদীনায় চলে এলে তাকে মক্কায় কোরাইশের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার কথা ছিলো। সে অনুযায়ী অনেককেই আল্লাহ্র রাসূল ইসলাম কবুল করে মদীনায় তাঁর কাছে চলে আসার পরও ফিরিয়ে দিলেন। মক্কায় চলে যেতে বললেন। কিন্তু এরা তো একবার ইসলাম কবুল করে ধন্য হয়েছেন। আলোর পথের যাত্রী হয়েছেন। তাঁদের বিবেকের চোখ খুলে গেছে। তাঁরা এখন আলোকে আলো আর অন্ধকারকে অন্ধকারই মনে করেন। তাঁদের কাছে ঈমান ও ইসলাম এখন আলো, শুধুই আলো আর কুফরি ও শিরক এখন অন্ধকার, কেবলই অন্ধকার। সুতরাং তাঁরা কেনো নতুন করে 'অন্ধকার জগতে' ফিরে যাবেন? অন্ধকারের বাসিন্দাদের কাছে আত্মসমর্পণ করবেন?! কিন্তু এদিকে আল্লাহ্র রাসূল তো চুক্তি করেছেন যে, তাঁদেরকে তিনি নিজের কাছে রাখতে পারবেন না। সে হিসাবে মদীনায় থাকাও তাঁদের জন্যে সম্ভব হবে না এবং আল্লাহ্র রাসূলেরও তাঁদেরকে রাখা ঠিক হবে না। অগত্যা তাঁরা মদীনা থেকে বের হয়ে মক্কার দিকে যেতেন ঠিকই, কিন্তু কোরাইশের কাছে যেতেন না, মক্কায়ও যেতেন না। তাঁরা বরং আশ্রয় নিতেন বিভিন্ন পাহাড়ে। কিংবা তাঁবু টানিয়ে বসবাস শুরু করতেন মক্কা মদীনার রাস্তার আশপাশে। আর সুযোগ পেলেই কাফির মুশরিকদের উপর আক্রমণ করতেন, ওদের বিশদাঁত উপড়ে ফেলতেন! এভাবে তাঁদের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়তে লাগলো। কোরাইশের জন্যে তাঁরা আতঙ্ক হয়ে উঠলেন। এদিকে কোরাইশ যে উদ্দেশ্যে তাঁদেরকে ফেরত চাইছিলো, তা তো ব্যর্থ হলোই, যারা মক্কায় আছে তাদের ভিতরেও অনেকেই তাঁদের প্রভাবে ইসলাম কবুল করে কোরাইশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছিলো। তাই কোরাইশের এখন 'ছেড়ে দেয় মা কেঁদে বাঁচি' অবস্থা। কয়েকদিন পরই তারা এ-শর্ত প্রত্যাহার করে নিলো। বললো: -না, আমাদের কাছে আর কাউকে ফেরত পাঠাতে হবে না!

দুই. শুধু এ শর্তই না, পূর্ণ চুক্তিটাই কাফির মুশরিকদের জন্যে দুর্বিষহ হয়ে উঠলো। ফলে তারা চুক্তি বিরোধী কাজে জড়িয়ে পড়লো, চুক্তি ভেঙে ফেললো। আরেকটু খুলে বলছি- মসজিদে নববীতে বসে আছেন আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তাঁকে ঘিরে বসে আছেন সাহাবায়ে কেরাম। এমন সময় সেখানে এসে হাজির হলো আমর ইবনে সালেমের নেতৃত্বে বনু খোযা'আর এক প্রতিনিধি দল। দলপতি আমর ইবনে সালেম আল্লাহ্ নবীকে জানালেন: -কোরাইশ-মিত্র বনু বকর আমাদের উপর রাতের আঁধারে আক্রমণ করেছে এবং বেশ কয়েকজনকে হত্যা করেছে। আর মিত্র হিসাবে কুরাইশরা তাদেরকে অস্ত্র দিয়ে ও লোক পাঠিয়ে গোপনে সাহায্য করেছে। অথচ তা হোদায়বিয়া সন্ধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

এ-খবরে নবীজী যেমন দুঃখ পেলেন তেমনি ক্ষুব্ধ হলেন। আমর ইবনে সালেমকে তিনি বললেন: -তোমরা নিশ্চিত থাকো, আমরা এর বদলা নেবো। কিছুদিন যেতে-না-জেতেই আমি দেখলাম দশ হাজারের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার উপকণ্ঠে এসে শিবির স্থাপন করেছেন। আমার মন বললো, কোরাইশ কি পারবে এ-বিশাল বাহিনীর মুকাবিলা করতে? এরা তো বদরে ওহুদে খন্দকে শাণিত করে এসেছেন নিজেদের বীরত্ব! এরা এখন শুধু বীর না, মহাবীর! কোরাইশ যতো ভালোবাসে জীবনকে এরা তারচে' অনেক বেশী ভালোবাসে শহিদী মওতকে!

আমার ধারণাই ঠিক হলো। মক্কাবাসী এদের সাথে লড়াই করা ছাড়াই রাস্তা ছেড়ে সরে দাঁড়ালো। বরং ভীত-কম্পিত হয়ে যে যেদিকে পারলো, ছোটে পালাতে লাগলো। আল্লাহ্র রাসূল বিজয়ীর বেশে মক্কায় প্রবেশ করলেন! হ্যাঁ, তখন কেউ আমার কথা.. আমার নিচে বসে সেই বজ্র-কঠোর জিহাদী শপথের কথা ভুলে যান নি। কী দৃপ্তকণ্ঠে সেদিন তাঁরা উচ্চারণ করেছিলেন- হয় বিজয় নয় 'বিলয়'!

না বিলয় নয়, এলো আল্লাহ্ সাহায্য ও বিজয়। মানুষ দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে লাগলো। রাসূলের মহানুভবতায় মুগ্ধ হয়ে। বিজয়ী মুহাম্মদের দয়া-মায়া-করুণা-মানবতা-উদারতায় প্লাবিত হয়ে। রাসূলের মক্কা প্রবেশকালীন ঘোষণা আওড়াতে লাগলো মানুষ— রক্তপাত নিষিদ্ধ! গাছ কাটা যাবে না! এ-কথা শোনে আমার শাখা-প্রশাখারা দুলে উঠলো আনন্দে! মর্মর ধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠলো আমার পত্র-পল্লব! হায় হায়! কী দয়ার নবী তুমি হে মুহাম্মদ! একটু পর আমার কানে এলো আরেকটি মহা ঘোষণা! হৃদয় আমার আনন্দে ব্যাকুল! মাতোয়ারা! মনে হলো; আমার সবগুলো মরা পাতা ঝরে গিয়ে এই মাত্র যেনো জন্ম নিয়েছে নতুন নতুন কিশলয়! এতো মায়া! এতো দরদ তোমার কণ্ঠে হে মুহাম্মদ! অমন সুন্দর করে নিজের জানের দুশমনের কাছে কে জানতে চায়? ... তুমি চেয়েছো! তুমিই চাইবে! তুমিই তো চাইতে পারো! এ তোমার ক্ষমতা, শুধু তোমার! যখন কানে এলো তোমার এ মহা ঘোষণা—

-হে কোরাইশ সম্প্রদায়! তোমরা আমার কাছে কেমন আচরণ আশা করছো! তারা বললো: -উত্তম আচরণ ছাড়া আর কিছুই না! আপনি যে চিরউত্তম! তারপর তুমি কী বললে হে মুহাম্মদ! তুমি বললে তা-ই, যা শুধু তুমিই বলতে পারো-হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম ছাড়া! বললে: -যাও, আমি তোমাদেরকে মাফ করে দিলাম, তোমরা মুক্ত!!

আমি আমার জায়গায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই এরপর ইসলামের বিভিন্ন অগ্রযাত্রার খবর শুনতে পেতাম। আমি এখানে দাঁড়িয়েই শুনেছি হযরত আবু বকর রা. -এর শাসনকালের অগ্রযাত্রার খবর। আরো শুনেছি হযরত উমর রা.-এর সময়কার বিজয়গাথার কথা। আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সব ভবিষ্যতবাণীই একে একে বাস্তবায়িত হতে লাগলো। রোম-পারস্য মুসলমানদের হাতে এলো। এই পরাশক্তিদ্বয়ের অহঙ্কার ও দাপট ধুলোয় মিশে গেলো। এ সব খবর আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই পাচ্ছিলাম আমার দর্শনার্থীদের মুখে। আমার ছায়াতলে এসে এরা বসতো আর আমাকে সব জানাতো। এরা ছুটে আসতো আমার কাছে ব্যাকুলতা ও ভালোবাসা নিয়ে। আমার নিচে রাসূল বসেছেন। তাঁর সাহাবীরা বসেছেন। তাঁরা আমার নিচে বসে জিহাদের শপথ নিয়েছেন। আমার কথা কুরআনে আলোচিত হয়েছে- এ-সবই সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতো আমার কাছে ছুটে আসতে। ভীড় করতে। এই ভীড় দিনে দিনে বাড়তে লাগলো। হযরত উমর ভীষণ ভয় পেয়ে গেলেন, সীমালঙ্ঘনের ভয়। তিনি আমাকে আমূল কেটে ফেলার নির্দেশ দিলেন। তাই হলো। আমাকে কেটে ফেলা হলো!

না, আমি কোনো ব্যথা পাই নি! ব্যথা পাওয়ার আছেই-বা কী! আমি নিজের স্বার্থে খুশি বা ব্যথিত হই নি কোনোদিন, হতে চাইও নি! আমি ব্যথিত হলে হয়েছি রাসূলের ব্যথায়.. সাহাবীদের ব্যথায়! আমি খুশি হয়েছি এবং হয়ে চলেছি ইসলামের অগ্রযাত্রায়! আজ ইসলামের সেই চারা গাছটি রূপ নিয়েছে বিশাল এক মহীরুহে! ছায়া দিচ্ছে লক্ষ লক্ষ মুসলমানকে বরং কোটি কোটি মুসলমানকে, এ-ই আমার আনন্দ, এ-ই আমার গর্ব! আমি থাকলাম কি থাকলাম না— এটা কোনো বিষয়ই না! কুরআনে তো আমি আছি! যতোদিন কুরআন আছে ততোদিন আমি থাকবো। কুরআন থাকবে চিরকাল আমিও থাকবো চিরকাল। আহা! কুরআনের পরশ কী মজা! বন্ধু, কুরআনকে ভালোবেসে বিলীন হয়ে যাও কুরআনে, আমার মতো! দেখবে, কী মজা!

আমার কাহিনী এখানেই শেষ। এখন তোমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে— স্বর্ণমুদ্রা! বিদায় বন্ধুরা, ভালো থেকো!

টিকাঃ
১. এই মহিয়সীকে নিয়ে আমার একটি কিতাব লেখার স্বপ্ন আছে। স্বপ্নটা যদি তাড়াতাড়ি বাস্তব হতো!-অনুবাদক

📘 গল্পে আঁকা সীরাত হে মুহাম্মদ > 📄 আমি স্বর্ণমুদ্রা বলছি

📄 আমি স্বর্ণমুদ্রা বলছি


আমি স্বর্ণমুদ্রা। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ আমার পেছনে ছুটে চলেছে, লোভ-কাতর হয়ে। 'আরো চাই আরো চাই' লোভযন্ত্রে চালিত হয়ে। আমার ঝলমলানি মানুষকে যেনো যাদুস্পর্শে মোহাচ্ছন্ন করে ফেলে। মাঝে মাঝে দেখি, আমাকে নিয়ে মানুষ যুদ্ধ পর্যন্ত বাধিয়ে বসে। কিছু কিছু মানুষ তো আমাকে অর্জন করতে সাদা-কালো বৈধ-অবৈধ- সব পথ বেছে নেয়। কেউ কেউ আবার আমাকে সঞ্চয় করে রাখে দিনের পর দিন। ওরা এভাবে ধনী হতে চায়। ধনই ওদের কাছে শেষ চাওয়া-পাওয়া।

কিন্তু স-ব মানুষের ভীড়ে এমন একজন মানুষকে আমি দেখেছি, যিনি আমাকে চান না, একেবারেই না। তাঁর কাছে আমার কোনো গুরুত্ব ছিলো না। হ্যাঁ, তাঁর দেখা পেয়েছিলাম আমি আজ থেকে প্রায় পনের শ' বছর আগে মক্কায়। মক্কার লোকেরা মূর্তিপূজা করতো। ওরা আমারো পূজা করতো। কিন্তু তাঁকে আমি কখনো মূর্তির সামনে যেতে দেখি নি, মুহূর্তের জন্যেও না। বরং মূর্তির প্রতি ছিলো তাঁর ভীষণ ঘৃণা ও অভক্তি। একবার চাচাজান আবু তালিব তাঁকে ছোট্ট বেলায় প্রায় জোর করেই মূর্তিখানায় নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি মূর্তির নিকটবর্তী হতে পারেন নি। বড় মূর্তিটার আশেপাশের ছোট মূর্তিগুলোর কাছে যেতেই তিনি দেখলেন সাদা পোশাকের একটা লোক চীৎকার করে বলছে, 'মুহাম্মদ! কাছে এসো না, জলদি পিছিয়ে যাও! এক্ষুণি বেরিয়ে যাও!'

মক্কার মানুষ তাঁকে ভীষণ সমীহ করতো, ভালোবাসতো, বিশ্বাস করতো। মায়াভরে ডাকতো ‘আল-আমীন’ ‘আল-আমীন’ বলে। দেখলেই শ্রদ্ধাভরে বলতো, ঐ-জে মুহাম্মদ-আমাদের আল-আমীন! আল-আমীন সব কিছুতেই আল-আমীন -বিশ্বাসী- ছিলেন। কথায় ছিলেন বিশ্বাসী। কাজে ছিলেন বিশ্বাসী। জন-আচরণেও ছিলেন বিশ্বাসী। কখনো তিনি এমন দীনারের দিকে হাত বাড়ান নি, যা নিজের নয়। এ জন্যেই মানুষ তাঁর কাছে কতো দীনার, কতো সম্পদ আমানত রাখতো। তাঁর শত্রুরাও তাঁকে বিশ্বাস করে আমানত রাখতো। অনেকেই তাঁকে নিজের ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজে লাগাতে চেয়েছে। আর এ-সবই তাঁর আমানতদারী ও বিশ্বস্ততার কারণে। তাঁর প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার কারণে। যুগপৎ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ক'জনের ভাগ্যে জুটে?

সান'আ বলো আর দামেস্ক বলো কিংবা মক্কা, কোথাও জুড়ি ছিলো না আল-আমীনের বিশ্বস্ততার। কারো মাঝেই দেখা যেতো না অমন বিশ্বস্ততা। আল-আমীনের জুড়ি শুধু আল-আমীনই। এ জন্যেই বিবি খাদিজা তাঁকে ডেকে নিয়েছিলেন ব্যবসার কাজে। খাদিজার হয়ে গেলেন তিনি শামে। বয়ে আনলেন অনেক লাভ। খাদিজার জন্যে, নিজের জন্যে, চাচাজানের জন্যে। খাদিজা তাঁর বিশ্বস্ততায় আশ্চর্য হলেন। খাদিজা তাঁর গুণে মুগ্ধ হলেন। মুগ্ধতার ঘোর-আবেশে এক সময় তিনি আল-আমীনকেই চেয়ে বসলেন! নিজের জন্যে, একান্ত নিজের জন্যে! অর্থাৎ তাঁর স্ত্রী হয়ে ধন্য হওয়ার জন্যে! আল্লাহু আকবার! বিশ্বস্ততার কী মিষ্টি ফল! এ-বিবাহের কারণে আল-আমীনের জীবনের মোড় ঘুরে গেলো। আকাশ থেকে যেনো বরকতের বৃষ্টি নেমে এলো। সে বর্ষণে সিক্ত হলেন চাচা আবু তালিব, হাসি ফুটলো তাঁর অভাবের সংসারে! চাচাজানের হাসিতে আল-আমীনের মুখেও হাসি ফুটলো! প্রিয় আল-আমীনের হাসিতে খাদিজার মুখেও হাসি ফুটলো! সব হাসির সম্মিলনে পৃথিবীও যেনো হেসে উঠলো! আর এ-সব হাসির উপর ঐ সুদূর আকাশ থেকেও যেনো বর্ষিত হলো পুষ্পময় হাসির হাজার হাজার রেণু! তাই বুঝি একদিন আরশ থেকেও সালাম এসেছিলো খাদিজাকে খোঁজে! ধন্য তুমি হে মহিয়সী খাদিজা! আল-আমীনকে চিনতে তুমি একটুও ভুল করো নি! ধন দিয়ে, মায়া দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে, সর্বপ্রকার সহযোগিতা দিয়ে তুমি আল-আমীনের অবিচ্ছিন্ন অংশ হয়ে গেলে! তাই আল-আমীনের নাম উচ্চারিত হলেই এসে পড়ে তোমার নাম!! সত্যিই তুমি মহিয়সী!!

আল-আমীনকে আমাকে উপার্জন করতেন ঘামঝরা শ্রম দিয়ে। হালাল উপায়ে, বৈধ পথে। না, আমি আগেই বলেছি, আমার প্রতি তাঁর কোনো টান ও আকর্ষণ ছিলো না। কিছু মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্যেই তাঁর এই শ্রম, এই খাটুনি। কিন্তু যখনই শ্রমের বিনিময়ে আমি তাঁর হাতে উঠে আসতাম, তখনই তিনি তা উপযুক্ত খাতে ব্যয় করে ফেলতেন, হাতে রাখতেন না। সঞ্চয় তো করতেনই না। খরচের খাতেরও তাঁর অভাব ছিলো না।

সবারই টাকা খরচের খাত আছে। কিন্তু অনেক মানুষ হাতের টাকা খরচ করতে চায় না। মায়া লাগে। টাকার গায়ে হাত বুলাতে তাদের ভালো লাগে। টাকার দিকে মোহাচ্ছন্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে তাদের আয়েশ লাগে। টাকা সঞ্চয়ের পেছনে ছুটোছুটি করতে করতে তাদের আশ্ আর মিটে না। কিন্তু মুহাম্মদ এমন ছিলেন না। টাকা হাতে এলেই খরচ করে ফেলতেন, উপযুক্ত খাতে। আল-আমীন বিনিময় না দিয়েও কোনো কিছু গ্রহণ করতে চাইতেন না। নমুনা দেখো—

যখন তিনি মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করার সিদ্ধান্ত নিলেন, তখন বন্ধু আবু বকর তাঁকে একটি উট উপহার দিতে চাইলেন। কিন্তু তিনি বিনামূল্যে তা গ্রহণ করলেন না। যখন তিনি মদীনায় গিয়ে পৌঁছলেন, তখন মসজিদ নির্মাণের জন্যে, পরিবারের থাকার ঘর বানানোর জন্যে একটা জায়গা তাঁর পছন্দ হলো, তাও তিনি বিনামূল্যে নিতে চাইলেন না। উম্মতে মুহাম্মদীর এমন অনেক 'সদস্য'ই আমি দেখতে পাই চলতে ফিরতে যারা টাকার লোভে, টাকার খোঁজে আদর্শ বিকিয়ে দেয়, এমন কি মহা দৌলত- ঈমানটাও কেউ কেউ বিকিয়ে দেয়! দুনিয়ার তুচ্ছ মায়ায় পরকালের সওদা করে বসে— হাসতে হাসতে! হায়রে উম্মতে মুহাম্মদী! হায়রে লোভ! হায়রে ক্ষমতার মোহ! কেনো তোমাদের এতো মায়া, কেনো তোমাদের এতো লোভ— এই পচা দুর্গন্ধযুক্ত টাকার জন্যে!

আল্লাহ্র রাসূল আমাকে অর্জন করার ব্যাপারে মোটেই মরিয়া ছিলেন না। যতোটুকু প্রয়োজন ঠিক ততোটুকু। এ জন্যেই তাঁর গৃহে অবস্থান করার সৌভাগ্য কখনো আমার হয় নি! তাঁর সাথে আমার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। এ-সব স্মৃতির কথা মনে পড়লে আজো আমি বিস্মিত হই, পুলকিত হই। এসো, তোমাদেরকে শোনাই সে সব স্মৃতির কয়েকটি টুকরো টুকরো কথা।

এক. একবার যুদ্ধ-বিজয়ী সাহাবায়ে কেরাম মালে গণিমতের নব্বই হাজার দিরহাম নিয়ে এলেন তাঁর কাছে। এখানে আমিও ছিলাম। তিনি তা একটা চাটাইয়ের উপর রাখলেন। তারপর একে একে স-ব দান করে দিলেন, একটি দিরহামও নিজের জন্যে রাখলেন না! অন্যের উপর নিজের পরিবারকে প্রাধান্য দিলেন না। নিয়ে নয়— বিলিয়েই ছিলো তাঁর আনন্দ।

দুই. একদিন তাঁর কাছে এক ফকির এলো। কিন্তু হাতে তখন কিছুই ছিলো না। তাই বলে তিনি তাকে ফিরিয়েও দিলেন না, দিতে পারলেন না বরং পাশে বসিয়ে রাখলেন। এই আশায় যে, হয়তো আল্লাহ কোনো ব্যবস্থা করবেন, পাঠিয়ে দেবেন কোনো দানশীল ব্যক্তিকে তাঁর কাছে, একটু পর। না হলে আরেকটু পর। কিন্তু কী আশ্চর্য! একটু পর আরো দু'জন এলো সাহায্যের জন্যে। সাহায্যপ্রার্থী জমা হয়ে গেলো তিনজন। কাউকেই দয়ার নবী ফিরিয়ে দিলেন না। সবাইকে বসতে বললেন। একটু পর আরেকজন এলেন! তিনিও কি প্রার্থী? না, তিনি তাঁর এক প্রিয় সাহাবী! এসে তাঁকে চারটি দীনার দিলেন তিনি! তারপর বিনয়-ধোওয়া কণ্ঠে অনুরোধ করলেন— যে-কোনো খাতে তা খরচ করার! আল্লাহ্ নবী তিনজনকে তিনটি দীনার দিয়ে দিলেন। আর আমি থেকে গেলাম তাঁর হাতেই। আনন্দে আমার মনটা ভরে গেলো। আহা! নবীজীর স্পর্শ কী মধুর! কিন্তু নবীজী আমাকে বেশিক্ষণ হাতে রাখলেন না। সাহাবীদেরকে লক্ষ্য করে বললেন: -কে নেবে এই দীনারটা?

কিন্তু কেউ সাড়া দিলেন না। কে সাড়া দেবেন! দিরহাম-দীনারের প্রতি কারো-জে লোভ নেই! অগত্যা আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে নিয়ে গৃহে চলে গেলেন। এনে বালিশের নীচে রেখে দিলেন। তারপর শুয়ে পড়লেন। শুয়ে তো পড়লেন, কিন্তু ঘুমোতে পারলেন না। সারা রাত অস্থিরতায় এপাশ-ওপাশ করলেন। এভাবেই রাত কেটে গেলো। নতুন দিন শুরু হলো। তাঁর নতুন দিনের প্রথম কাজ ছিলো- একজন হাজাতমন্দকে খুঁজে বের করা তারপর আমাকে তার হস্তগত করা। তিনি তাই করলেন। তারপর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন!

তিন. নবীজী ছিলেন শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থী। স-ব শিখেছেন তাঁরা নবীজীর কাছে। স-ব সময় শিখেছেন। যখন সুযোগ এসেছে তখনই শিখেছেন। নবীজীর কাছে তাঁরা শিখেছেন- আমাকে ভালো না-বাসতে। আমাকে গুরুত্ব না-দিতে। আমার দিকে লোভ-কাতর দৃষ্টিতে না-দিতে। হাতে এলে আল্লাহ্র পথে, সত্যের পথে, কল্যাণের পথে, জনস্বার্থে, মানবতার সেবায় বিলিয়ে দিতে।

হযরত উসমান রা.-এর একটি ঘটনা শোনো। একবার শাম থেকে মদীনায় এসে পৌঁছলো তাঁর বিশাল বাণিজ্য বহর। তখন মদীনায় খুব অভাব-অনটন চলছিলো। খাদ্য সঙ্কটে অনেকে কষ্ট পাচ্ছিলো। এদিকে খাবারের বাজার-মূল্যও ব্যবসায়ীরা বাড়িয়ে দিয়েছে। এক দীনারে আগে যা পাওয়া যেতো এখন তা কিনতে গেলে গোনতে হয় অনেক দীনার। ঐ বছরটিকে তাই 'দুর্ভিক্ষের বছর' বলা হয়। এই অবস্থায় হযরত উসমান রা. সবাইকে জমা করলেন। পাশেই স্তূপাকারে রাখলেন সিরিয়া থেকে-আনা বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য। তারপর তিনি সবাইকে লক্ষ্য করে বললেন:
-তোমরা এর আগে যে-খাবার এক দীনার দিয়ে কিনতে এখন তা ক'দীনার দিয়ে কিনো?
তখন কেউ বললেন, দুই দীনার, কেউ বললেন, তিন দীনার। হযরত উসমান রা. মৃদু হেসে বললেন:
-কিন্তু আমার পণ্যের মূল্য-জে অনেক বেশী, দশ গুণ! তোমরা কে কে তা কিনতে প্রস্তুত দশ গুণ মূল্য দিয়ে?
সবাই চুপ করে রইলেন, কেউ কথা বলতে পারলেন না। এতো মূল্য! কেমন করে তাঁরা পরিশোধ করবেন? এ-জে তাঁদের ক্রয়-ক্ষমতার বাইরে! অক্ষমতায় ও দুশ্চিন্তায় তাঁরা পেটের বেসামাল ক্ষুধা নিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন হযরত উসমান রা.-এর হাসি-জড়ানো মুখের দিকে। একটু পর হযরত উসমান নীরবতা ভেঙে বলে উঠলেন:
-ভাইয়েরা আমার! আল্লাহ তো একটি নেক কাজের বিনিময়ে দশটি নেকী দান করেন, তাই না? শোনো, আমি স-বই সেই নেকী লাভের আশায় তোমাদেরকে দিয়ে দিলাম!!

না, বিনিময়ে তিনি একটি দীনারও নিলেন না! মানুষের ক্ষুধা-কাতর মুখ দেখেও কী করে তিনি মূল্য নিতে পারেন? আল্লাহ কি তাঁকে কম দিয়েছেন? কতো ধন দিয়েছেন! কতো বড় মন দিয়েছেন! কেনো তবে তিনি অমন মন উজাড় করে হাত খোলে দান করবেন না? অভাবী মানুষের মুখে প্রাপ্তি ও তৃপ্তির হাসি ফোটাবেন না? মূল্য যদি নিতেই হয় তাহলে আল্লাহ্র কাছ থেকেই নেবেন! মানুষের মূল্য তো কম, অনেক কম! এক দীনারের পণ্যে এক দীনারই পাওয়া যায়। আল্লাহ্র কাছে পাওয়া যায় এক দীনারের পণ্যে শত শত গুণ বেশী, সাতশ' গুণ বেশী! কখনো আরো অনে-ক বেশী!! কোন্ ব্যবসাটা তাহলে লাভজনক?

কী সুন্দর শিক্ষা তিনি লাভ করেছিলেন নবীজীর কাছ থেকে! যারা মানুষের তীব্র প্রয়োজনের মুহূর্তেও খাদ্য ও পণ্য আটকে রেখে মুনাফা লুটতে চায় তাদেরকে আল্লাহ্ নবী তুলনা করেছেন এমন সব মানুষের সাথে যারা আমার পূজা করে! নবীজী বলেছেন- تعس عبد الدينار والدرهم - ধ্বংস হোক দীনার-দিরহামের পূজারী! যেদিন আমি এ-হাদীস শুনেছি সেদিন থেকে আমিও আমার পূজারীকে ঘৃণা করতে শুরু করেছি। সত্যি তো ওরা হতভাগা! ওরা জানে না কাকে বলে আনন্দ ও সৌভাগ্য! কাকে বলে সফলতা, প্রকৃত সফলতা!

চার. কী আর বলবো, জীবন আমাদের বড়ো অদ্ভুত। এই আনন্দ, আবার এই বেদনা। আমাদেরকে নিয়ে কিছু মানুষ মেতে ওঠে জঘন্য খেলায়। তখন আমরা বড়ো অসহায় বোধ করি, অস্বস্তি বোধ করি। আবার অপরদিকে আমরা যখন পুণ্যকর্মে ব্যয় হই, সত্যের পথে বিলীন হই, তখন আনন্দের আর সীমা থাকে না। এই-জে কখনো আমরা ভালো কাজে আবার কখনো মন্দ কাজে ব্যবহৃত হই, তার কিছু নমুনা দেখো: আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও এই দীনারের ফাঁদে আটকানোর অপচেষ্টা করেছে কোরাইশ। তাঁকে লোভ দেখিয়ে বলা হয়েছে, তুমি সম্পদ চাও? হাজার হাজার দীনার আমরা তোমার পায়ের কাছে এনে রেখে দেবো! তবু তুমি এই নতুন ধর্মের প্রচারটা বন্ধ করো!

সাহাবায়ে কেরাম মালে গণিমত (যুদ্ধ-জয়ের পর দুশমনের কাছ থেকে প্রাপ্ত সম্পদ) হিসাবে আমাদেরকে আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট পেশ করেছেন। কেউ কেউ আমাদেরকে পেশ করেছেন তাঁর কাছে খরচ করতে- নিজের জন্যে, নিজের পরিবারের জন্যে। কিন্তু তিনি গ্রহণ করেন নি। আমরা তাঁর হাতে যেতে চাইলেও তিনি আমাদেরকে নিতে চান নি। এখন না, তখন না, কখনো না। ফিরিয়ে দিয়ে তিনি বলতেন:
-না হে আমার প্রতিপালক! আমি 'দিরহাম দীনার' চাই না। একদিন খাবো আরেকদিন খাবো না। যেদিন খাবো না সেদিন সবর করবো। যেদিন খাবো সেদিন তোমার শোকর করবো!

পাঁচ. আল্লাহ্ নবী সারা জীবনই সম্পদ-নিস্পৃহ ছিলেন। জীবনের বেলা শেষে সাহাবীদেরকে ডেকে বললেন:
-কে কী পাবে তোমরা আমার কাছে? এই-জে আমার সম্পদ! এখান থেকে নিজেদের পাওনা নিয়ে যাও! একজন দাঁড়িয়ে বললেন:
-হে আল্লাহ্র রাসূল! আমি আপনার কাছে তিনটি দিরহাম পাই!
নবীজী সাথে সাথে তা পরিশোধ করে দিলেন।

সেদিনের কথা আমি কখনো ভুলতে পারবো না। আল্লাহ্ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন প্রচণ্ড অসুস্থ। উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশার হুজরায় তিনি শুয়ে আছেন। হঠাৎ বলে উঠলেন:
-আয়েশা! ঐ দিরহামগুলো কী করেছো?
-কোন্ দিরহামগুলোর কথা বলছেন?!
-ঐ-জে ছয়টা দিরহাম!
-সেগুলো আমার কাছেই আছে!
-মুহাম্মদ কেমন করে নিজের রব-এর কাছে যাবে, এই দিরহামগুলো নিজের কাছে রেখে! জলদি তুমি তা দান করো!
-অবশ্যই আমি তা দান করে দেবো, হে আল্লাহ্র রাসূল!
-হে আল্লাহ! আমাকে বাঁচিয়ে রাখো নিঃসম্বল! মৃত্যুও দাও নিঃসম্বল! আর হাশরের মাঠেও আমি হতে চাই নিঃসম্বলদের দলে!

আল্লাহ নবীজীর দু'আ কবুল করেছেন। তাই তো দেখি— মৃত্যুকালে রেখে যান নি তিনি একটি দীনারও .. একটি দিরহামও! যা কিছু রেখে গেছেন তার একটা তালিকা দেখবে? দেখো!
► সামান্য যব, হযরত আয়েশার কাছে।
► সেই সাদা গাধাটি, যাতে সওয়ার হতেন তিনি।
► একখণ্ড জমি, তাও দান করে গিয়েছিলেন মুসাফিরদের জন্যে।
► তাঁর অস্ত্রটি।

এদিকে তাঁর বর্মটি তখন বন্ধক ছিলো এক ইহুদীর কাছে, নিজের জন্যে এবং পরিবারের জন্যে সামান্য খাবারের বিনিময়ে। সাহাবায়ে কেরাম সবাই নবীজীর কাছে শিখেছেন— এই দুনিয়ার জীবন আসলে কোনো জীবনই না। আসল জীবন তো শুরু হবে পরকালে। যার সূচনা আছে কিন্তু শেষ নেই। এখানকার জীবন অমর অক্ষয়! চিরঅব্যয়! জান্নাতের নায-নেয়ামত ও হুর-গিলমানরা কেবলই হাতছানি দিয়ে ডেকে চলেছে অবিরত— চির-জীবনের চির সবুজ জান্নাতে! অমন জান্নাতের অবিরাম হাতছানি যাঁদের কানে বাজে, তাঁরা কেমন করে আমি দীনারের প্রেমে মজে? অর্থ-সম্পদের মায়ায় জড়ায়? দুনিয়ার মরীচিকাময় পথে পা বাড়ায়? দিরহাম-দীনারের ছলনায় বিভ্রান্ত হয়? পার্থিব জীবনের চাকচিক্যে পথ হারায়?

ছয়. আল্লাহ্ নবী একদিন মেয়ে ফাতেমাকে দেখতে গেলেন। গিয়ে দেখলেন তাঁর হাতে স্বর্ণের একটা হার। পাশে-বসা এক মহিলাকে তিনি সেটি দেখিয়ে বলছেন—আবুল হাসান আমাকে এটি উপহার দিয়েছেন! আল্লাহ্ নবী তখন বললেন: -ফাতেমা! তুমি কি খুশি হতে পারবে, মানুষ যখন বলবে—আল্লাহ্র রাসূলের মেয়ের হাতে জাহান্নামের ‘শেকল’! এরপর নবীজী মেয়ের কাছে আর বসলেন না, বেরিয়ে গেলেন। হযরত ফাতেমা বুঝলেন, সব বুঝলেন। তিনি আর দেরী করলেন না, স্বর্ণের হারটি বিক্রি করে দিলেন। মূল্য দিয়ে একটি গোলাম খরিদ করলেন। তারপর সেই গোলামটিকে আযাদ করে দিলেন। আল্লাহ্র নবী এ-খবর শুনলেন, ভীষণ খুশি হলেন। বললেন: -সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্, যিনি ফাতেমাকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করেছেন!

আল্লাহ্র নবীর মুখে উচ্চারিত হতো: اللَّهُمَّ اجْعَلْ رِزْقَ آلِ مُحَمَّدٍ كَفَافاً. হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মদের পরিবারের রিযিক বরাদ্দ করো শুধু ততোটুকুই, যতোটুকুতে তাদের প্রয়োজন সেরে যাবে, একটুও বেশী হবে না!

📘 গল্পে আঁকা সীরাত হে মুহাম্মদ > 📄 আমি ইসলামের পতাকা

📄 আমি ইসলামের পতাকা


কখনো আমি কাপড়ের তৈরী। কখনো কাগজের। কখনো একটিরও না। আমি ইসলামের পতাকা— এটিই আমার আসল রূপ। এটিই আমার আসল পরিচয় এটিই আমার আসল ছবি। এ-রূপেই আমি রূপময়। এ-ছবিতেই আমি ছবিময়। সত্যিকারের ইসলামই আমার জীবন, যে ইসলামের পয়গাম শুনিয়ে গেছেন পৃথিবীর মানুষকে সায়্যিদুল মুরসালিন (সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল), খাতামুন নাবিয়্যিন (সর্বশেষ নবী)।

আমার জীবনে আছে কিছু অবিস্মরণীয় ঘটনার মধুময় স্মৃতি। ইতিহাসের পাতায় সে সব লেখা আছে নূরের হরফে—স্বর্ণাক্ষরে। যে শহরের উদার আকাশে আমি প্রথম উড়েছি, পতপত করে ইসলামের জয়যাত্রার ঘোষণা দিয়েছি, সে আকাশটা হলো ইয়াসরিবের আকাশ। পরবর্তীর্তে যে ইয়াসরিবের নাম বদলে হয়ে যায়- মদীনাতুর রাসূল—রাসূলের শহর—মদীনা মুনাওয়ারা। তখন সেখানে এসে আশ্রয় নেন ঈমান নিয়ে, ইসলাম নিয়ে আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরাম। কোরাইশের অমানবিক অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে। তাদের সকল ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের জাল ছিন্ন করে। আমি মদীনার আকাশে তখন পতপত করে ওড়ছিলাম আর আনন্দে আকাশের নিঃসীম নিলীমায় তাকিয়ে তাকিয়ে আল্লাহ্র মহিমা ঘোষণা করছিলাম।

আহা! মদীনার মানুষের কী মায়া! মদীনার আকাশের কী ছায়া! মদীনার পরিবেশের কী দয়া! মুহূর্তেই তাঁরা কী আপন করে নিয়েছেন মক্কা থেকে-আসা মুহাজির ভাইদেরকে! ভালোবাসা দিয়ে, স্নেহ-মমতা দিয়ে, সম্পদ-সহায়তা দিয়ে! কী নিবিড় টানে সবাই একজন করে মুহাজিরকে বুকে টেনে নিয়েছিলেন! আল্লাহ্র নবীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে ভাই হিসাবে বরণ করে নিয়েছিলেন! এভাবেই তাঁরা 'আনসার' হয়ে গিয়েছিলেন- আল্লাহ্র কুরআনের ভাষায়! রাসূলের হাদীসের ভাষায়! ক'জনের ভাগ্যে জুটে 'আকাশের উপাধী'?

ইসলামের ইতিহাসে প্রথম যে লড়াইটা বদর-প্রান্তরে হয়েছিলো সেখানে আমিই ছিলাম পতাকা। বদরের আকাশে পতপত করে আমি সেদিন ওড়ছিলাম আর ইসলামের মহিমা প্রকাশ করে যাচ্ছিলাম। ইসলামের চিরন্তনতা ও বিশ্বজনীনতার ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছিলাম। সেদিন বীর লড়াকুরা আমাকে- ইসলামের পতাকাকে উড্ডীন রাখতে বীর-বিক্রমে লড়াই করেছিলেন। রক্ত দিয়েছিলেন। জীবন দিয়েছিলেন। আর মাটির এই বীরদের সাহায্য করতে নেমে এসেছিলেন আসমানের 'বীররা'ও! ফলে মক্কার অহঙ্কারী কাফির মুশরিকদের পরিণতি যা হওয়ার তাই হলো, তারা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হলো। বাঘা বাঘা নেতারা নিহত হলো। ওদেরকে 'ক্বালীব' কূপে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হলো। আল্লাহ্র ফেরেশতাদের সরাসরি অংশগ্রহণে অর্জিত এ-বিজয়ে মুসলিম বাহিনী আমাকে ঊর্দ্ধাকাশে তুলে ধরে আল্লাহ্র মহিমা প্রকাশ করতে লাগলেন। তাঁর অযুত-নিযুত গুণগানে মুখর হয়ে উঠলেন। আমি বদরের আকাশে পতপত করতে লাগলাম- আনন্দে আবেগে উত্তেজনায়।

ওহুদ যুদ্ধেও আমি পতপত করে ওড়ছিলাম। কিন্তু হঠাৎ মুসলিম শিবিরে সাময়িক বিপর্যয় নেমে এলে আমি প্রায় উল্টে যেতে বসেছিলাম। কিন্তু বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে মুসলমানরা বেশী সময় নিলেন না, আবার তাঁরা সংঘবদ্ধ হলেন। রক্ত দিয়ে জীবন দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিলেন। আমার মর্যাদা রক্ষা করলেন।

খন্দকেও আমি হুমকির মুখে পড়েছিলাম। কিন্তু আল্লাহ্ সাহায্যে হুমকি দূর হয়ে গেলো। মুসলিম বাহিনীর অশ্রুময় মুনাজাত এবং রক্তময় প্রতিরোধে কাফেররা পালিয়ে গেলো। আমি সমহিমায় সগৌরবে আবার মদীনার আকাশে উড়তে লাগলাম। আমার নিচে এসে আশ্রয় নিতে লাগলো প্রতিদিন নতুন নতুন মুখ, ঈমানের নূরে নূরানি হয়ে। জিহাদের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে। নবীজীর সান্নিধ্যের পরশে ঝলকিত হয়ে।

কিন্তু বন্ধু, মক্কা বিজয়ের সময় আমি মক্কার আকাশে.. কা'বার কাছে কেমন করে ওড়ছিলাম? ওহ! সে কথা বলতে আমি একেবারে মুখিয়ে আছি! কিন্তু কোন্ ভাষায় বলি? সেদিন সত্যি আমি ছিলাম গর্বিত, আনন্দ-বিহ্বল! নিজের চোখে দেখেছি নবীজীর বিজয়। মহা বিজয়। আরো দেখেছি কেমন করে তিনি মক্কার এইসব 'জানি দুশমন'কেও কী আকাশ-উদারতায় মাফ করে দেয়ার মহা ঘোষণা দিলেন! আমি তাঁর এই মহত্ত্বে তাঁর এই উদারতায় আরো জোরে জোরে পতপত করে উড়তে লাগলাম! মক্কায় সেদিন ভূলুণ্ঠিত হলো প্রতিমাপূজার অভিশপ্ত পতাকা। ছিলাম শুধু আমি একা, শুধুই একা! এরপর আর কোনোদিন মক্কায় প্রতিমা আর প্রতিমাপূজারীদের ঠাঁই হয় নি। কোনোদিন হবেও না!! প্রতিমাপূজারীরা সেখানে আর কোনোদিন ঢুকতেই পারবে না।

মক্কা বিজয়ের পর এক বছর পেরুতে-না-পেরুতেই আমি জাযিরাতুল আরবের সবখানে উড়তে লাগলাম। দলে দলে তখন মানুষ আল্লাহ্র রাসূলের কাছে এসে ঈমান কবুল করে ধন্য হচ্ছিলো। আমার ছায়ায় এসে জড়ো হচ্ছিলো। যেনো প্রবল বেগে এক স্রোতধারা বয়ে চলছে। এই স্রোতধারার মোহনা ছিলেন আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। হ্যাঁ, এই মোহনায় এসে সবাই আছড়ে পড়তে লাগলো। জীবনের আশায়। মুক্তির আশায়। আলোর খোঁজে। চিরকালীন জান্নাতের 'লোভে'। ক্ষণকালীন দুনিয়ার স্বার্থ ও লোভকে 'চিরবিদায়' বলে।

হিজরী দশম বছরের কথা বলি। আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এলেন আবার মক্কায়। আগে এসেছিলেন মক্কা বিজয় করতে এখন এলেন মক্কায় হজ্ব করতে। কা'বা তাওয়াফ করতে। সাফা-মারওয়া সাঈ করতে। আরাফায় 'ওকূফ'-অবস্থান করতে। মিনা-মুযদালিফায় ছুটে যেতে। জামারায় শয়তানকে পাথর মারতে। তৃপ্তিভরে জমজম পান করতে। আমি তাঁর শেষ ভাষণের সময়-বিদায় হজ্বের ভাষণের সময় পতপত করে ইসলামের মহিমা ও গৌরবগাথা ছড়িয়ে দিচ্ছিলাম আকাশের নিঃসীমতায়.. মহা শূন্যতায়। আমার আনন্দের তখন কোনো সীমা ছিলো না। যদিও সেদিন প্রিয় নবীর কথায় বারবার বিরহের সুর বেজে উঠছিলো, তবুও লক্ষাধিক সাহাবীর মাথার উপরে আমার উড়তে পারা পেছনের সব আনন্দকে বুঝি ম্লান করে দিলো! আহা, কী আনন্দ! মক্কা থেকে মাত্র দশ বছর আগে-না আল-আমীনকে সঙ্গোপনে মদীনায় গিয়ে আশ্রয় নিতে হয়েছিলো- ঈমান নিয়ে, আমল নিয়ে! আজ এখানে দশ বছর আগের সেই নিষ্ঠুরতাকে হার মানিয়ে কী ছায়া, কী মায়া! কী দরদ-ভালোবাসা!

আরো কতো স্মৃতি এখন আমার মাঝে তোলপাড় করছে! আমাকে নিয়ে বাঁকে বাঁকে ঘুরছে! কোথাও বা থমকে দাঁড়াচ্ছে! শহীদানের কবরের পাশে অশ্রু ফেলছে! আমি নবীজীর কাছ-ছাড়া হই নি মুহূর্তের জন্যেও। যেখানে তিনি গেছেন সেখানে আমিও গেছি। হোক তা জিহাদের ময়দানে কিংবা কা'বার আঙ্গিনায়। আমি জানি- কেমন ছিলো তাঁর সকাল-সন্ধ্যা ও দিবস-রজনী! আমি দেখেছি তাঁর আমল। আমি শুনেছি তাঁর কথা। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে- তিনি ছিলেন মহান, সবকিছুতে মহান। তিনি ছিলেন মহা মানব। সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা। বিশ্বস্ত পথিকৃৎ। কল্যাণকামী, বিশ্বস্ত। অকৃত্রিম জনদরদি। বীর সিপাহসালার। শ্রেষ্ঠ দয়ালু। অতুলনীয় দাতা। শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞ। শ্রেষ্ঠ প্রাজ্ঞ। মানবিকতার পূর্ণ আধার। অদ্বিতীয় ভদ্র সভ্য মার্জিত অভিজাত। না, এভাবে গোনে গোনে আমি তাঁর অফুরন্ত গুণভাণ্ডার ফুরোতে পারবো না। বরং আল্লাহ তাঁর সম্পর্কে এক কথায় যেমন স-ব বলে দিয়েছেন- এখন সে বাণীই আমি তিলাওয়াত করছি আনন্দোদ্বেল কণ্ঠে-

وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ

নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।

আমি তাঁকে ভীষণ ভালোবেসে ফেলেছিলাম। যেমন অন্যরা তাঁকে ভালোবাসেন। হৃদয় দিয়ে ভালোবাসেন। জীবন দিয়ে ভালোবাসেন। নিজের চেয়ে ভালোবাসেন। পরিবার-পরিজন- সবার চেয়ে ভালোবাসেন। বিদায় হজ্বের পর একেকটি দিন যাচ্ছিলো আর মুসলমানদের সংখ্যা কী মজা কেবলই বাড়ছিলো। দলে দলে ছুটে আসছিলেন আলোর সন্ধানীরা। এসে এসে দিয়ে যাচ্ছিলেন ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা। এ যেনো এক উৎসব— আঁধার থেকে আলোয় ফিরে আসার। তাঁরা আবেগ-প্লাবিত কণ্ঠে নবীজীর হাতে হাত রেখে বাইয়াত গ্রহণ করছিলেন। সবখানে ইসলামকে ছড়িয়ে দেয়ার শপথ করছিলেন আমাকে—ইসলামের পতাকাকে— চির উন্নত রাখতে।

তারপর এলো সেই দিনটি। আমার জীবনের সবচে' কালো দিনটি। সবচে' শোকের দিনটি। সবচে' অশ্রুময় দিনটি। আমি যেনো কাঁপতে ভুলে গেলাম। আমি যেনো পতপত করতে ভুলে গেলাম। আমার কাছে যখন পৌঁছলো এই মহা শোকবার্তা- নবীজী আর নেই, তখন মনে হলো, আমি যেনো নিজের অস্তিত্বই হারিয়ে ফেলেছি! আমি শোক-স্তব্ধতায় বিমূঢ় হয়ে গেলাম! নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না! আমার মতো অন্যরাও শোকে স্তব্ধ হয়ে গেলেন! হযরত উমর রা. তো শোকের আতিশয্যে নবীজীর ওফাতকে মানতেই পারলেন না, তরবারি উঁচিয়ে ঘোষণা দিলেন:
-যে বলবে মুহাম্মদ নেই, আমি তাকে আস্ত রাখবো না!

সাহাবায়ে কেরাম সবাই শোকে মুহ্যমান। কিংকর্তব্যবিমূঢ়। পিতৃহারা এতিমের বোবা দৃষ্টি নিয়ে সবাই তাকিয়ে আছেন। কেউ কেউ অঝরে কেঁদে চলেছেন। একটা কঠিন শোকাবহ পরিস্থিতির ভিতরে সময় যেনো আটকে আছে। পৃথিবী যেনো থমকে আছে। সূর্যটাও যেনো অস্তাচলের দিকে অগ্রসর হতে ভুলে গেছে। স-বই যেনো থেমে আছে। চলছে শুধু শোকের গতি। শোকের নদী। শোকের বন্যা। কিন্তু এ অবস্থা তো বেশিক্ষণ চলতে পারে না! হযরত উমর রা.-এর মতো নতুন করে কেউ যদি শোক-পরাস্ত হয়ে তরবারি খাপমুক্ত করে বসেন? উমরের এমন হলে অন্য কারো এমন হবে না কেনো? হতেই পারে!

এ শোক-সাগর থেকে শোক-ডুবন্ত সাহাবীদেরকে উদ্ধার করতে অবশেষে এগিয়ে এলেন সবচে' বড় সাহাবী সিদ্দীকে আকবার হযরত আবু বকর রা.! তিনি পরিস্থিতি সামাল দিতে, বিশেষত উমর রা.-এর শোক-কাতরতা ভেঙে দিতে ঘোষণা করলেন-

يَا أَيُّهَا النَّاسُ! مَنْ كَانَ يَعْبُدُ مُحَمَّدًا فَإِنَّ مُحَمَّدًا قَدْ مَاتَ. وَ مَنْ كَانَ يَعْبُدُ اللَّهَ فَإِنَّ اللَّهَ حَيَّ لَا يَمُوْتُ.

হে লোকেরা! যারা মুহাম্মদ-পূজা করতে তারা কান খুলে শোনো- মুহাম্মদ চলে গেছেন! আর যারা আল্লাহ্র ইবাদত করো তাদেরকে বলছি- আল্লাহ্র কোনো মৃত্যু নেই, তিনি চিরন্তন চিরঞ্জীব। এরপর তিনি এ-আয়াত পড়লেন-

( وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ أَفَإِنْ মَاتَ أَوْ قُتِلَ انْقَلَبْتُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ وَمَنْ يَنْقَلِبْ عَلَى عَقِبَيْهِ فَلَنْ يَضُرَّ اللَّهَ شَيْئًا وَسَيَجْزِي اللَّهُ الشَّاكِرِينَ )

'আর মুহাম্মদ একজন রাসূল বৈ তো নয়। তাঁর পূর্বেও বহু রাসূল অতিবাহিত হয়ে গেছেন। তাহলে তিনি যদি মৃত্যুবরণ করেন অথবা নিহত হন, তবে কি তোমরা পশ্চাদপসরণ করবে? বস্তুত: কেউ যদি পশ্চাদপসরণ করে, তবে তাতে আল্লাহ্ কিছুই ক্ষতি-বৃদ্ধি হবে না। আর যারা কৃতজ্ঞ, আল্লাহ তাদের সওয়াব দান করবেন।' -সূরা আলে ইমরান।

এই আয়াত শোনে হযরত উমরের ঘোর কাটলো। তিনি বললেন: -মনে হচ্ছিলো আমি যেনো কখনো এই আয়াত তিলাওয়াত করি নি!

ধীরে ধীরে শুকিয়ে এলো শোক-নদী। ধীরে ধীরে শান্ত হলো সবার অশান্ত মন। নবীজী চলে গেছেন কিন্তু তাঁর কাজ তো রেখে গেছেন! এই নবীওয়ালা কাম- কে আদায় করবে সবাই এগিয়ে না-এলে? সবাই এগিয়ে এলেন। পরবর্তী খলীফা মনোনীত করলেন। তিনি আর কেউ নন- গারে সাওরের সাথী হযরত আবু বকর রা.! হযরত আবু বকর খিলাফতের দায়িত্ব নিয়েই নবীজীর রেখে যাওয়া কাজ একে একে আঞ্জাম দিয়ে যেতে লাগলেন। সবার আগে উসামা বিন যায়দের নেতৃত্বাধীন সেনাদলকে তিনি সিরিয়া পাঠিয়ে দিলেন। ওফাতের আগ মুহূর্তে নবীজীই এই বাহিনী প্রস্তুত করেছিলেন।

এদিকে নবীজীর ওফাতের পর মুনাফিক ও দুর্বল ঈমানের লোকেরা বেশ গোলমাল শুরু করে দিলো। তারা দলে দলে ইসলাম ত্যাগ করে পূর্ব-ধর্মে ফিরে যেতে লাগলো। কেউ-বা যাকাত দিতে অস্বীকার করলো। কেউ-বা আবার নিজেকে নয়া নবী বলে দাবি করে বসলো। এরা এই জোটবদ্ধ মুরতাদরা আমাকে -ইসলামের পতাকাকে- নীচে নামিয়ে ফেলার জন্যে তোড়জোড় শুরু করে দিলো। কিন্তু আমি তো চির উন্নত। নত হতে ঊর্দ্ধমুখী হই নি! তাই যে যে-করেই আমার পতন চাইলো, তাদের চাওয়া চাওয়াই রইলো, আমি যেমন ছিলাম উন্নত, তেমনি আছি উন্নত। আমি চির উন্নত ‘শির’! নবীজীর ওফাতের পর তাই দুশমনের চাওয়া আর পাওয়া হলো না। আমি উড়তে লাগলাম পতপত করে মক্কায় মদীনায়—সবখানে! মহাবীর খালিদের হাতে আমি পৌঁছে গেলাম এক শহর থেকে আরেক শহরে। এক দেশ থেকে আরেক দেশে। এমন করেই আমি আরো ছড়িয়ে পড়লাম দেশে দেশে, ইসলামের মহিমা ছড়াতে ছড়াতে। কখনো হযরত আবু উবায়দাহ ইবনুল জাররাহ রা.-এর হাতে। কখনো সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা.-এর হাত ধরে। কখনো আমর ইবনুল আ’স রা., উসামা বিন যায়দ রা.সহ আরো অসংখ্য বীর সেনাপতির হাত ধরে। এভাবে যেতে যেতে রোম পারস্যের আকাশকেও আমি স্পর্শ করেছি। ইসলামী বিজয়ধারা যেদিকে ছুটে গেছে সেদিকেই আমি ছুটে গিয়েছি। আন্দালুস ও চীনের আকাশও তন্ময়চিত্তে দেখেছে আমার আনন্দোদ্বেল কম্পন! বর্তমানে আমার ছায়ায় যারা আশ্রয় নিয়েছে তাদের সংখ্যা সাতশ মিলিয়ন! এ সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছেই। বাড়বেই। আমার ছায়া অনেক বড়! অনেক শীতল! অনেক মায়াময়!

সমাপ্ত

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00