📘 গল্পে আঁকা সীরাত হে মুহাম্মদ > 📄 আমি বকরী বলছি

📄 আমি বকরী বলছি


আমি আমার স্বামীকে নিয়ে মুক্ত মরুর বুকে বেশ ছিলাম। মেষপালের সাথে ঘুরে বেড়াতাম হলুদাভ মরুবালির মাঝে। সেখানে রাখালেরা আমাদেরকে নিয়ে চষে বেড়াতো সবুজ ঘাসের খোঁজে, একটু পানির তালাশে, কোনো কূপের সন্ধানে। মেষপালেরা সময় কাটাতো যতোটা না ঘাস-পানিতে, তারচে' বেশী ছোটোছুটিতে। কখনো তারা কান খাড়া করে শুনতো রাখালের বাঁশি। কখনো আবার ভীড় করতো মক্কার রাখালের গল্প শুনতে। মক্কার রাখালের নাম মুহাম্মদ। বাল্যকালে তিনি রাখালি করেছেন। বকরী ও উট চরিয়েছেন মক্কার পাহাড়ি উপত্যকায়।

এই রাখাল-বন্ধু-মুহাম্মদের কথা আমরা যতো শুনতাম ততোই ভালো লাগতো। শুনে শুনে কান ভরতো কিন্তু মন ভরতো না। তাঁর উন্নত চরিত্র, তাঁর মানবতা, তাঁর আমানতদারী আমাদেরকে ভীষণ মুগ্ধ করতো। তাঁর কথা শুনতে শুনতে আমরা না- দেখেই তাঁকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম। আমরা আমাদের রাখালের মুখে শুনেছি, মুহাম্মদ যখন মেষ চরাতেন তখন মেষগুলোকে খুব আদর করতেন। সারাক্ষণ ওদেরকে চোখে চোখে আগলে রাখতেন। দলছুট হয়ে কোনো মেষ দূরে কোথাও চলে গেলে পেছনে পেছনে তিনিও ছুটে যেতেন, আদর করে ধরে আনতেন। কোথায় গেলে কী করলে ঘাস পাওয়া যাবে, পানি পাওয়া যাবে- এ নিয়েও তাঁর ব্যাকুলতার কোনো সীমা ছিলো না। অন্য রাখাল ছেলেদের মতো দৌড়-ঝাঁপ ও খেলাধুলায় তাঁর মন ছিলো না। বরং নিজের মেষপালের পেছনেই তিনি সময় দিতেন। ফলে নেকড়ে বলো আর ঐ শৃগাল বলো, কেউ কাছে ভিড়তে সাহস পেতো না। কখনো কোনো ভেড়া ক্লান্ত হয়ে গেলে তিনি তাকে পথচলায় সাহায্য করতেন, তার ব্যাপারে আলাদা গুরুত্ব দিতেন। আর এই ক্লান্তিটা অসুস্থতায় রূপ নিলে তিনি শুধু সাহায্যই করতেন না একেবারে তাকে কাঁধে করে গৃহে ফিরে আসতেন। তারপর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা দিয়ে তাকে সুস্থ করে তুলতেন। সুস্থ হয়ে আবার ঐ মেষটা যখন ছুটোছুটি করতো, দলের সাথে লাফিয়ে লাফিয়ে আনন্দ প্রকাশ করতো, তখন গিয়ে তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতেন। সুস্থতার পর মেষদের এই-যে লাফালাফি ও আনন্দ প্রকাশ, সেও যেনো রাখাল মুহাম্মদকে ঘিরেই ছিলো। ওরা যেনো তাদের প্রিয় রাখালকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলতো-

হে মুহাম্মদ! পেয়েছি তোমার সেবা! হয়েছি আমরা সুস্থ! এই দেখো এখন কেমন সুন্দর লাফাচ্ছি! শরীরে কী শক্তি শক্তি লাগছে! যেনো অসুখই ছিলো না আমাদের! এইসব হে মুহাম্মদ, বরকত তোমার! তুমি কতো ভালো! রাখালদের সেরা রাখাল! তোমাকে ধন্যবাদ, অনে-ক ধন্যবাদ! মুহাম্মদ ছিলেন আসলেই এক বরকতময় রাখাল। একটা দিনের জন্যেও তাঁর মেষপালকে না-খেয়ে কিংবা পেটে খিদে নিয়ে ফিরতে হয় নি। মুহাম্মদ যেখানেই মেষ চরাতেন সেখানেই নেমে আসতো আল্লাহ্ পক্ষ থেকে বরকত। ঘাস-পানির কোনো অভাব হতো না। তাই মুহাম্মদের মেষপালের স্বাস্থ্য ছিলো যেমন সুঠাম-সতেজ তেমনি দুধও দিতো তারা প্রচুর।

হ্যাঁ, এ-সব কারণেই আমরা মুহাম্মদকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম। তাঁর নতুন ধর্মের কথাও আমাদের কানে এসেছে। আমরা শুনেছি, মক্কার সেই রাখাল-বন্ধু এখন নবী হয়েছেন, প্রথমে মক্কার মানুষকে এক আল্লাহ্র ইবাদতের দিকে ডেকেছেন। কিন্তু এতে কোরাইশ তেমন সাড়া দেয় নি। উল্টো তাঁকে এবং সাহাবীদেরকে কষ্ট দিয়েছে। ঈমান বাঁচাতে তাঁরা দেশছাড়া হতে বাধ্য হয়েছেন। সে সব কথা তোমরা জেনে এসেছো। এখন আমি মদীনার ইহুদীদের বজ্জাতি ও শত্রুতার কথা তোমাদেরকে বলবো। পরে আমার নিজের একটা কাহিনী বলবো।

ইহুদীরা সব সময় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিরুদ্ধে এ কথা সে কথা বলে বেড়াতো। আসলে ইসলামের আগমনে এই বজ্জাতরা ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলো। তাদের এই ভয়— নিজেদের ধর্ম নিয়ে, নিজেদের সম্পদ নিয়ে, নিজেদের সরদারি ও কর্তৃত্ব নিয়ে, নিজেদের ভবিষ্যত নিয়ে। তাই এরা গোপনে গোপনে মানুষকে আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিরুদ্ধে উসকে দিতে লাগলো। তাঁর বিরুদ্ধে নানা রকম ষড়যন্ত্র করতে লাগলো। আমরা সবাই দুশমনের অনিষ্ট ও ষড়যন্ত্র থেকে তাঁর মুক্তি কামনা করছিলাম। তাঁর জয় কামনা করছিলাম। তাঁর প্রচারিত ইসলামের প্রসার কামনা করছিলাম। করবো না কেনো? তিনি যে সত্যবাদী, বিশ্বস্ত! তিনি যে সবার প্রতি—সবকিছুর প্রতি দয়ালু! অতি দয়ালু!

এবার শোনো আমার নিজের কাহিনী—
আমি একটু আগেই চারণভূমি থেকে ফিরেছি। মনটা ছিলো ভীষণ ফুরফুরে। একটা অজানা আনন্দে আমি ভাসছিলাম। আমার মনের জগতে কী যেনো একটা ফিসফিসানি আমি শুনতে পেলাম, যা শব্দায়িত হলে ভাবটা হতো এমন— ঐ দেখো, চারণভূমি থেকে ফিরে এসেছে ভাগ্যবান বকরীটা! হায়! আমাদেরও যদি এমন ভাগ্য হতো!

আমি ধীরে ধীরে আমার মালিকের নিকটবর্তী হচ্ছি আর এই ফিসফিসানিটা ততোই এসে আমার কানে বাজছে। আমার মনকে আলোড়িত করছে! আমি থমকে দাঁড়াই, ভাবি— এমন তো আগে কখনো হয় নি! কিসের এই ফিসফিসানি? কেনো আমি এখন এতো আলোড়িত অনুভব করছি? অবশ্য আমার মালিকের কাছে যেতেই রহস্যটা উন্মোচিত হলো! কী রহস্য আবার? আরেকটু খুলে বলছি—

আমার মালিক ছিলেন এক ইহুদী নারী। আমি তার কাছে এসেই জানতে পারলাম, তিনি আজ মুহাম্মদকে একটা বকরী রান্না করে খাওয়াবেন এইখানে—তার বাড়িতে। আর সেই বকরীটি হলাম আমি! আনন্দ-শিহরণে আমার তনুমন দুলে উঠলো! আমি আত্মহারা হয়ে গেলাম! আমি আমার 'প্রাণী-অস্তিত্ব' নিয়ে অমন বিরলতম সৌভাগ্য ও বিমলতম আনন্দ লাভ করবো— ওহ! ভাবতেই পারছি না!! এতোক্ষণে বুঝলাম আমার কানের কাছে কেনো বাজছিলো ঐ ফিসফিসানি!

কিন্তু আমি প্রিয় মুহাম্মদের খাদ্য হতে যাচ্ছি—তাঁর রক্ত-মাংসের সাথে মিশে একাকার হতে যাচ্ছি— এটা আমার হৃদয়ে আনন্দ-অনুভূতির একটা মধুর শিহরণ সৃষ্টি করলেও একটু পরই তা একটা উদ্বেগজনক কালো আশঙ্কার ছায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেলো!! আমার আতঙ্কগ্রস্ত মন বললো- নিশ্চয়ই কোথাও গোলমাল আছে! আমার সজাগ প্রাণী-অনুভূতি জেগে উঠলো! অনুসন্ধান শুরু করে দিলো! এক ইহুদীনি কেনো ইসলামের নবীকে বকরী খাওয়াতে যাবে?! এ কি ভালোবাসা না ষড়যন্ত্র? ভালোবাসা তো হতেই পারে না! কারণ এই ইহুদীনি কেনো, সব ইহুদীর মনই তো ইসলাম-বিদ্বেষে ঠাসা?!

আমি কেঁপে উঠলাম! আমি শিউরে উঠলাম!! শত শত শঙ্কা আমার মনের একটু আগের কোমল অনুভূতিটাকে দুমড়ে মুচড়ে দিলো! বরং মুহূর্তেই তা এক মহা শঙ্কায় রূপ নিলো! আমি নিশ্চিত হয়ে গেলাম, আমার মালিক কোনো গভীর চক্রান্তে লিপ্ত। এক ইহুদীনি ইসলামের নবীর কল্যাণ চাইতে পারে না-তাকে বকরী হাদিয়া দিতে পারে না। আমি চারদিকে অন্ধকার দেখতে লাগলাম। নবীজীর কোনো ক্ষতি হয়ে যেতে পারে- এ আশঙ্কায় আমি নিঃশব্দে আর্তনাদ করতে লাগলাম! একটু পরই কসাই এসে গেলো। তড়িৎ গতিতে সব করে ফেললো। চুলোয় আগুন জ্বালানো হলো। আমাকে চুলোয় চড়ানো হলো! আমি ভুনা হতে লাগলাম। একটু পর! হ্যাঁ, একটু পরই আমার গায়ে কী যেনো একটা ছিটিয়ে দিলো আমার মালিক, সাথে সাথে আমার সারা অঙ্গে প্রচণ্ড জ্বালা শুরু হয়ে গেলো! একটু পরই আমার কাছে পরিস্কার হয়ে গেলো যে আমার মধ্যে মারাত্মক বিষ মেশানো হয়েছে, আর তা করা হয়েছে প্রিয় মুহাম্মদকে হত্যা করার জন্যেই! কেননা এটা পরিস্কার যে, আমার এ বিষ-মেশানো খানিকটা অংশ কারো পেটে গেলে তার বেঁচে থাকা অসম্ভব! আগুনে আমি পুড়ছিলাম ঠিকই, কিন্তু তাতে যতোটা না যন্ত্রণা হচ্ছিলো, তারচে' হাজার গুণ বেশী যন্ত্রণা হচ্ছিলো আমার- সেই বিষের নীল দংশনে! আমি বিষ-দংশনে জ্বলতে জ্বলতে.. নীল হতে হতে আগুনে জ্বলার কথা ভুলে গেলাম! আমি এখন আর আমার কথা ভাবছি না, ভাবছি শুধু আল-আমীনের কথা। আমার মুহাম্মদের কথা। আমার রাখাল বন্ধুর কথা। এই খবিস মহিলা তো এখন একটু পরই এই বিষের জ্বালা ও নীল-বেদনা ছড়িয়ে দেবে তাঁর দেহেও! আমার জন্যে সবচে' বেদনাদায়ক হলো, আমি মুহাম্মদকে বাঁচাতে পারবো না! তাঁর সাহাবীদেরকেও বাঁচাতে পারবো না! উল্টো আমিই হায়, আমিই তাঁদের বিষাক্ত মৃত্যুর, নীল মৃত্যুর কারণ হবো! আল্লাহ! তুমি সাহায্য করো! আল্লাহ! তুমি রক্ষা করো!!

একটু পর মেজবানরূপী ইহুদীনি এগিয়ে এলো। আমাকে নবীজী ও সাহাবীদের সামনে এনে রাখলো। তখন তার মুখে লেগে ছিলো মেজবানের নির্মল হাসি কিন্তু হৃদয়ে ছিলো শত্রুর জিঘাংসা। সাহাবীদের মধ্যে হযরত বিশর ইবনে বারা রা. নবীজীর আগেই হাত বাড়ালেন আমার দিকে। গোশত খেতে উদ্যত হলেন। এমনকি এক টুকরো মুখেও দিয়ে দিলেন। আমি অন্ধকার দেখতে লাগলাম। আমি তাঁকে বলতে চাচ্ছিলাম— বিশর! কেনো তুমি নবীজীর আগেই খেতে শুরু করলে? কিন্তু তিনি তো আমার কথা শুনবেন না, শোনা সম্ভবও না। কিন্তু খোদ নবীজীও যখন খাওয়া শুরু করলেন, তখন আমি আর স্থির থাকতে পারলাম না, আমার কোনো ভাষা নেই, আমি এক নির্বাক প্রাণী— এ-সব ভাবার আর অবকাশ পেলাম না, বরং ঠিক বাকসম্পন্ন মানুষের মতোই জোরে চিৎকার করে উঠলাম—

'আমি বিষাক্ত! আমি বিষাক্ত!! আমি বিষাক্ত!!!'

সে ছিলো এক মহা বিস্ময়! আমি লক্ষ্য করলাম যে আল্লাহ্র নবী মুখে-পুরা টুকরোটি সাথে সাথে ফেলে দিলেন! সাহাবায়ে কেরাম অবাক চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন! তিনি কি তাহলে আমার আওয়াজ শুনতে পেয়েছেন! আল্লাহু আকবার! এমনটা হবে আমি ভাবতেই পারি নি! আসলে এটা ছিলো আল্লাহ্র কুদরত! তাঁর নবীর মু'জিযা! নইলে আমি কেনো কথা বলবো? তিনি কেনো শুনবেন? স-বই আল্লাহ্র ইচ্ছায় হয়েছে! আল্লাহ চেয়েছেন আমি 'বিষ! বিষ!' বলে চিৎকার করে উঠবো, আর তিনি তা প্রিয় নবীর কানে পৌঁছে দেবেন! তাই হয়েছে! আল্লাহ তাই করেছেন! আল্লাহ সব করতে পারেন! নিষ্প্রাণ বকরীকে দিতে পারেন কণ্ঠ! সে কণ্ঠ পৌঁছে দিতে পারেন নবীজীর কানে! আল্লাহ্র রাসূল সাথে সাথে বলে উঠলেন: -হাত ওঠাও! কেউ খাবে না! এ গোশত বিষাক্ত!

সবাই হাত উঠিয়ে ফেললেন। কিন্তু হযরত বিশর ইবনে বারা রা. আগেই খেয়ে ফেলেছিলেন! তীব্র বিষক্রিয়ায় তিনি ঢলে পড়লেন মৃত্যুর কোলে-শাহাদতের সবুজ বিছানায়! নবীজীকে সতর্ক করতে পারার আনন্দে আমার হৃদয় উল্লাস করলেও এই সাহাবীর মৃত্যুতে আমি ছিলিম নীরব অশ্রুময়! নবীজীও বিশরের মওতে খুব দুঃখ পেলেন। তিনি শোকমথিত কণ্ঠে ঐ ইহুদীনিকে ডেকে জানতে চাইলেন: -কেনো তুমি এমন করলে?

মহিলাটা তখন জবাবে বললো: -আমি দেখতে চেয়েছিলাম, তুমি আসল নবী না ভণ্ড নবী! আসল নবী হলে বিষ তোমার কোনো ক্ষতিই করতে পারবে না! আর যদি মিথ্যা নবী হও, দুনিয়ার রাজত্বের জন্যে নবী হওয়ার দাবি করে থাকো, তাহলে সব মানুষ তোমার হাত থেকে বেঁচে যাবে, তোমার মৃত্যুর ভিতর দিয়ে!

এই ইহুদীনি তো তাহলে বুঝতে পেরেছিলো- মুহাম্মদ ছিলেন সত্যিকারের নবী। তাহলে কি সে তাঁকে নবী বলে মেনে নিয়েছিলো? অসম্ভব! ইহুদীরা এমনই! সত্য প্রকাশ পাওয়ার পরও ওদের কপালে হিদায়াত জুটে না। ওরা ইসলামের চিরদুশমন, চির ইসলাম-বিদ্বেষী। এরপর আমাকে দাফন করে দেয়া হলো বালির বুকে। সমাধিস্থ হওয়ার পর আমি অনুভব করলাম চরম এক সুখ, অবর্ণনীয় এক প্রশান্তি। আহা! সেই সুখ ও প্রশান্তি জীবনে আমি আর কখনো অনুভব করি নি! এ নিশ্চয়ই আল্লাহ্ নবী'র প্রতি আমার ভালোবাসা ও দায়িত্ব পালনের পুরস্কার! আল্লাহ কতোজনকে কতোভাবে পুরস্কৃত করেন! কিন্তু আমার এ-প্রশান্তি হঠাৎ বেশ হুমকির মুখে পড়ে গিয়েছিলো যখন ঐ বজ্জাত ইহুদিনীকে আমার পাশেই দাফন করা হলো! হায়! ও যদি আমার কাছে সমাহিত না হতো! ওর গা থেকে-যে বিষের গন্ধ আসছে! ও-যে অভিশপ্ত! ও আমার প্রিয় নবীকে বিষ খাইয়ে হত্যা করতে চেয়েছিলো! আমি রাগে ক্ষোভে চিৎকার করে উঠলাম- হে অভিশপ্ত ইহুদিনী! ভোগ করো এবার নবী-হত্যার অপচেষ্টার শাস্তি!!

📘 গল্পে আঁকা সীরাত হে মুহাম্মদ > 📄 আমি সেই খেজুর গাছ

📄 আমি সেই খেজুর গাছ


আমি ছিলাম একটা আস্ত খেজুর গাছই। আরব দেশে খেজুর গাছের অভাব নেই। এর ফল অর্থাৎ খেজুর খেতে ভীষণ মজা ও উপকারী। আরবের মরু রাখালেরা ভর দুপুরের খর-তাপে আশ্রয় নেয় এই খেজুর গাছের শীতল ছায়ায়। ছোট্ট বেলায় যখন মুহাম্মদ মেষ চরাতেন তখন কতো বসেছেন এই ছায়ায়। বয়সে তখন রাখাল মুহাম্মদ ছোট্ট হলে কী হবে, বুদ্ধিতে আচরণে সুচরিত্রে তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়। ছোট ছোট রাখালেরা খেজুর গাছের ছায়ায় এসে বসতো ছোট্ট মুহাম্মদকে ঘিরে। তখন কী শান্ত ভঙ্গিতে, সুবচনে, সুহাসিতে তিনি ওদের সাথে কথা বলতেন। মুগ্ধতায় ভরিয়ে দিতেন ওদের সুকুমার মন-মানস। সবার দৃষ্টি যেনো তখন বলতো—

প্রিয় মুহাম্মদ! তুমি আসলে কে? তুমি কি আমাদের মতো শুধুই রাখাল? মনে তো হয় না! তাহলে আমরা কেনো তোমার মতো অমন সুন্দর করে কথা বলতে পারি না! আমরা কেনো সুনীল আকাশপানে উদাস নয়নে নীলিমা দেখতে দেখতে মুগ্ধ হতে পারি না? আমাদের মেষপাল কেনো তোমার মেষপালের মতো অমন মোটাতাজা ও সুঠাম হয় না! বলো তো, তুমি আসলে কে? এই রাখাল বেশের আড়ালে কে লুকিয়ে আছে? কী লুকিয়ে আছে? সে কি কোনো মহা মানব? সে কি কোনো মহা সূর্য?

সেই বরকতময় শৈশব পেরিয়ে তারপর এলো স্নিগ্ধ কৈশোর তারপর এলো শান্ত যৌবন। মুহাম্মদ বড় হলেন। নবী হলেন। ইসলাম প্রচার করলেন প্রথম তিন বছর গোপনে, তারপর প্রকাশ্যে। তারপর জুলুম-নির্যাতনের মাত্রা যখন বেড়ে গেলো, মক্কায় আর থাকা গেলো না, হিজরত করতে হলো মদীনায়। মদীনায় আসার পরই আমি প্রথম মুহাম্মদকে দেখতে পাই—চোখের দেখা। ধন্য হই তাঁর মোহন পরশে। কেননা এখানে এসে প্রায়ই তিনি আমার গায়ে হেলান দিয়ে বসতেন। সাহাবায়ে কেরামের সামনে ইসলামের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলতেন। কুরআনের আয়াতের তাফসীর করতেন। আমি এবং আমার কাছে বসা সবাই মন দিয়ে তাঁর কথা শুনতাম। নামাজের সময় হলে সেখানে দাঁড়িয়ে তিনি সবাইকে নিয়ে নামাজ পড়ে নিতেন। দু'আ করতেন, আল্লাহ যাতে বাড়িয়ে দেন মুসলমানদের সংখ্যা। সবাই যেনো উঠে আসতে পারে আলোর পথে, হিদায়াতের রাস্তায়। অসার মূর্তিপূজা ত্যাগ করে আশ্রয় নিতে পারে এক আল্লাহ্র ইবাদতের ছায়ায়। আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোযা রাখলে ইফতার করতেন আমারই তাজা খেজুর দিয়ে। সঙ্গে থাকতেন সাহাবীরাও। তখন সাহাবীদের সংখ্যা তো আর বেশী ছিলো না, তাই আমার একার খেজুরই সবার জন্যে যথেষ্ট ছিলো।

আমার বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাহাবীদের সংখ্যাও বাড়তে লাগলো এবং আমি যখন ফলদানে অক্ষম হয়ে গেলাম, আমার সবুজ শাখাগুলোতেও যখন খরা দেখা দিলো, তখন তাঁরা আমাকে কেটে ফেললেন! আমার লম্বা লম্বা শাখাগুলো তাঁরা বিভিন্ন কাজে লাগিয়ে ফেললেন। বাড়ির ছাদে ব্যবহার করে ফেললেন। শুধু আমার গোড়াটা তাঁরা রেখে দিলেন। মাটি থেকে একটু উচ্চতায় আমি যেখানে ছিলাম সেখানেই পড়ে থাকলাম। ভাবতাম, জীবন কতো ছোট্ট! সেদিন-না আমি ছিলাম সবুজ পাতায় ছাওয়া! ফলে-ফলে ভরা! আজ কিছুই নেই! পাতা নেই! ফল নেই! আছে শুধু গোড়াটা! হয়তো এটাও কিছুদিন পরে থাকবে না! মহান সেই সত্ত্বা, যাঁর কোন ক্ষয় নেই, লয় নেই-চিরবিরাজমান!

আমি আগেই তোমাদেরকে বলেছি যে আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদেরকে নিয়ে মাঝে মাঝে আমার এখানে এসে বসতেন এবং তাঁদেরকে দীনি তা'লিম দিতেন। যখন তাঁদের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়তে লাগলো, তখন তিনি তাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলতেন যাতে সবাই তাঁর কথা শোনেন এবং তাঁকে দেখেন। তারপর এ-সংখ্যা যখন আরো বেড়ে গেলো, আল্লাহ্ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার দিকে তাকালেন এবং আমার উপরে এসে দাঁড়ালেন, যাতে একটু দূরে উপস্থিত সাহাবায়ে কেরামও তাঁকে দেখতে পারেন এবং তাঁর কথা শুনতে পারেন। আমি দেখতাম, তাঁর কথা শুনতে শুনতে সবার চোখ অশ্রু-ছলোছলো হয়ে উঠছে। কী গভীর মায়া ও মনোযোগ দিয়ে তাঁরা শুনতেন! এ-ই যেনো তাঁদের কাছে শেষ নবীর শেষ কথা! এ-ই যেনো তাঁদের শেষ শোনা! আমি -খেজুর গাছের অবশিষ্টাংশ গোড়া- আল্লাহ্ নবীর এই মহা সান্নিধ্য পেয়ে বড়ো গর্ববোধ করছিলাম। তিনি যখন আমার উপরে দাঁড়িয়ে উচ্চকণ্ঠে অধিক সংখ্যক সাহাবীকে লক্ষ্য করে কথা বলতেন তখন আমার মনে হতো, আমি ধন্য, চিরধন্য! আগে ছিলো আমার সবুজ সবুজ পাতা, লম্বা লম্বা সবুজাভ শাখা! এখন আমার কিছুই নেই! শুকনো কাঠের মতো পড়ে আছি মাটি কামড়ে। তাতে কী হয়েছে! আমার মুহাম্মদ তো আছেন! তাঁর নিবিড় সান্নিধ্য তো আছে! এখন তিনিই আমার শাখা! কোন্ শাখার জন্যে তবে এখন আমি শোক-তাপ করবো? হারিয়ে যাওয়া সেই শাখার জন্যে, এই মুহাম্মদী শাখার বদলে? না, অসম্ভব! এ-ই আমার সবচে' প্রিয় 'শাখা'! আহা! কী যে ভালো লাগে আমার, যখন কথা বলার জন্যে নবীজী আমার উপর পা রেখে নিবিড় হয়ে দাঁড়ান, সাহাবীরা তা শোনার জন্যে আমার কাছে-আশপাশে নিবিড় হয়ে বসেন! সবাই তাকিয়ে থাকেন নবীজীর দিকে, তখন তো দৃষ্টি পড়ে যায় আমারও উপরে! এই সৌভাগ্য আমি কী দিয়ে মাপবো?

আমার সৌভাগ্য দিনে দিনে বাড়ছিলো, কেননা আমি দেখছিলাম যে মুসলমানদের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে। বাড়তে বাড়তে এক সময় এমন পর্যায়ে চলে গেলো যে আমার উপর দাঁড়ালে আল্লাহ্র রাসূলকে সবাই দেখতে পারতেন না। তাঁর কথা সবার কানেও পৌঁছতো না। ফলে তিনি আমাকে ছেড়ে চলে গেলেন পাশে, আমার চেয়ে উঁচু একটা মিম্বরে! মুসলমানদের সংখ্যাধিক্যে আমার আনন্দ যতো-না বাড়লো তারচে' বেশী বেড়ে গেলো আমার বিরহ-যাতনা! আল্লাহ্র নবী'র বিরহ আমি সইতে পারলাম না, পারলামই না। মনকে বোঝাই- তোমাকে তো ইচ্ছে করে মুহাম্মদ ছেড়ে চলে যান নি! প্রয়োজন হয়েছে, তাই গিয়েছেন! মুসলমানদের সংখ্যা বেড়েছে, তাই গিয়েছেন! এ জন্যে অমন ভেঙে পড়লে-জে! তুমি কি যুক্তির ভাষা বোঝো না?! এখনও যদি তোমার উপর দাঁড়িয়েই নবীজী কথা বলেন, তাহলে অনেকেই-জে তাঁর বাণী শুনতে পাবেন না! অনেকেরই যে কষ্ট হবে! তোমার একার কষ্ট তোমার কাছে কষ্টদায়ক না আরো অনেকের কষ্ট বেশী কষ্টদায়ক!

কিন্তু মন আমার বুঝলো না। শান্ত হলো না। স্থির হলো না। না প্রবোধে, না যুক্তিতে! আমি নিজের উপর সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললাম! একদিন দেখলাম- আমি না-চাইতেই কাঁদছি! অঝরে কাঁদছি! কেঁদে কেঁদে অস্থির হয়ে পড়ছি! যেনো একটা অবোধ শিশু কাঁদছে! মা'কে খুঁজে খুঁজে না-পেয়ে!! আমার বুক ফেটে কেবল উদগীরিত হচ্ছিলো- 'আহ্! আহ্!-এর লাভা! এভাবে আমি 'আহ্! আহ্! আহ্!' বলে কেঁদে কেঁদে সারা! বুকের জ্বলনে-দহনে চোখ আমার অবিরত শুধুই ভেজা ভেজা! আমার এ কান্না- ভালোবাসার কান্না! নবী প্রেমের নাযরানা! চুপ থাকি কেমনে? নীরব থাকি কেমনে? ভালোবাসবো না আমার নবীকে! তাঁর ভালোবাসায় যদি আমার আঁখিজলে বুক ভাসে, ভাসুক না! কেনো আমি থামবো? কেনো আমি বলবো- হে চোখ! শান্ত হও! বন্ধ করো তোমার অশ্রুপাত! না, এ আমি বলতে পারবো না! পারবোই না! ভালোবাসার দাবি আমি ছাড়তে পারবো না!

তাই কান্নাও আমি বন্ধ করতে পারবো না! আর এটা তো আমি পারবোও না! কারণ এ-জে সম্পূর্ণরূপে আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে! আমি কাঁদছি ইচ্ছায় নয়, অনিচ্ছায়! আমি কাঁদছি লোক-দেখানো কান্না নয়, নবীজীর ভালোবাসায়! ভালোবাসার কান্না বন্ধ হয় না! ভালোবাসার কান্না বন্ধ করা যায় না! ভালোবাসার কান্না থামে না, থামানো যায় না! ভালোবাসার কান্না বাঁধ মানে না—চিরঅবাঁধ! কিন্তু তাই বলে কি আমি কেঁদে কেঁদেই ‘শেষ’ হয়ে যাবো?!

হঠাৎ দেখলাম— সাহাবীরা বারবার আমার দিকে তাকাচ্ছেন। অবাক চোখে! তাঁরা কি আমার কান্না শুনতে পাচ্ছেন? মনে হয় পাচ্ছেন! হ্যাঁ, তাঁরা আমার দুঃখ বুঝতে পারছেন! তাঁরা আমার বিরহ-জ্বালা উপলব্ধি করতে পারছেন! তখনো আমি ‘আহ্! আহ্! আহ্!’ করছি! নিজেকে থামাতে পারছি না!

আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবার এগিয়ে এলেন, আমার দিকে! কাছে এলেন, অনেক কাছে! একেবারে কাছে! তারপর গভীর মমতায়, অনন্ত স্নেহময়তায় আমাকে জড়িয়ে ধরলেন! সান্ত্বনা দিলেন! জান্নাতে আমি তাঁর পাশে থাকবো— এ সুসংবাদও শোনালেন! থামতে বললেন! আমি থেমে গেলাম! কেনো থামবো না? এতোক্ষণ কেঁদেছি, সে তো বিরহের কান্না! এখন তো বিরহ নেই! তার জ্বালাও নেই! তবে কেনো আর কান্না? মিলনে কি কাঁদতে আছে! যার জন্যে এ কান্না, তিনিই তো এখন আমার সান্ত্বনা! তাই আমি শান্ত হলাম! আমার অশান্ত প্রহর কেটে গেছে। আমার বিরহ-কাতরতা আর নেই। কেননা আমি আমার ভালোবাসার পয়গাম পৌঁছে দিয়েছি আমার প্রিয়ের কাছে হাবীবের কাছে। আমার জীবনে এখন আর কান্না নেই, আছে শুধু হাসি। সুখের হাসি। আনন্দের হাসি। তৃপ্তির হাসি। পূর্ণতার হাসি। ইতিহাসের সেরা খেজুর গাছ হওয়ার হাসি। সেরা কেনো? সেরা শুধু এ জন্যে যে আমি কাঁদতে পেরেছি। আমার কান্না নবীজীকে, তাঁর প্রিয় সাহাবীদেরকে শোনাতে পেরেছি! এমন কোনো খেজুর গাছ খুঁজে পাবে তুমি! তবেই বলো, সেরা আমি! শুধুই আমি!!

📘 গল্পে আঁকা সীরাত হে মুহাম্মদ > 📄 আমি রিদওয়ান বৃক্ষ

📄 আমি রিদওয়ান বৃক্ষ


জাযিরাতুল আরবে গাছ-গাছালি নেই বললেই চলে। হঠাৎ কোথাও দেখা যায় দু'একটি খেজুর গাছ দাঁড়িয়ে নিজেদের অস্তিত্বের ঘোষণা দিচ্ছে। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে আমাদের - গাছ-গাছালির- অনেক কাহিনী জড়িয়ে আছে। ইতিহাসের পাতায় সংরক্ষিত আছে সে-সব কাহিনী। আমার নিজের কাহিনী বলার আগে আমার বোনেরটা প্রথমে বলি।

একদিন আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুশমনের খবর ও গতিবিধি জানার জন্যে মদীনার একটু বাইরে এলেন। সেখানেই ছিলো আমার বোন-ঐ গাছটা। নবীজী তার ছায়ায় গিয়ে বসলেন একটু বিশ্রামের উদ্দেশ্যে। খানিক পর সেখানে তিনি শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন। এর মধ্যেই চুপিসারে সেখানে এক মুশরিক এসে হাজির। হাতে নাঙা তলোয়ার। তলোয়ার উঁচিয়ে সে বললো: -বলো, আমার হাত থেকে তোমাকে কে রক্ষা করবে?

আল্লাহ্র রাসূল লোকটার হত্যা-হুমকিতে একটুও ভয় পেলেন না, মোটেই বিচলিত হলেন না বরং দৃঢ় ও শান্ত কণ্ঠে বললেন: -আল্লাহ!

'আল্লাহ' শব্দ শুনতেই লোকটা ভয়ে থরথর কাঁপতে লাগলো। তার হাত থেকে তলোয়ারটা খসে পড়ে গেলো। আল্লাহ্র রাসূল তখন সেটি উঠিয়ে বললেন: -বলো, তোমাকে এখন কে বাঁচাবে?

ভীত কম্পিত লোকটি লা-জওয়াব দাঁড়িয়ে রইলো। তার ভয় ও কম্পন ধীরে ধীরে বাড়তে লাগলো। আল্লাহ্র রাসূল তাকে মাফ করে দিলেন। জানের দুশমনকেও তিনি ছেড়ে দিলেন। তার নাম ছিলো দা'সূর - دعثور। পরে সে মহানবীর মহানুভবতায় মুগ্ধ হয়ে ইসলাম কবুল করে ধন্য হয়। এই ছিলো আমার বোনের কাহিনী। এবার বলি আমার কথা। আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে আমার যে কাহিনী তা নিয়ে আমি হাজার বার গর্ব করি। এ গর্বের উৎস হলো, আমার কথা আল্লাহ কুরআনে উল্লেখ করেছেন! আমি এখন স্মরণীয়, চির স্মরণীয়। জন্মেছিলাম মাটিতে-ঊষর মরুতে। তারপর নবীজীর পরশে উঠে গেলাম আকাশে, লওহে মাহফুযে সংরক্ষিত ফলকে! কী সৌভাগ্য!!

হিজরতের পর অনেকদিন আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবীরা মক্কায় যান নি। যেতে পারেন নি। অথচ মন টানছিলো ভীষণ। দু' চোখ ভরে মক্কা দেখার জন্যে কা’বা অবলোকন করার জন্যে সবার মন আঁকু-পাঁকু করছিলো। তাই একদিন সাহাবীদের নিয়ে আল্লাহ্র রাসূল মক্কায় রওয়ানা হলেন। হোদায়বিয়া পৌঁছে তিনি হযরত উসমানকে মক্কার কাফেরদের নিকট এই বার্তা দিয়ে পাঠালেন যে, আমরা কা’বা যিয়ারত করতে এসেছি, যুদ্ধ-বিগ্রহ আমাদের উদ্দেশ্য নয়।

হযরত উসমান গেলেন। অনেকটা সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর সবাই তাঁর ফিরে আসার অপেক্ষায় প্রহর গোনতে লাগলেন। কিন্তু উসমানের আসতে দেরী হচ্ছিলো, অনেক দেরী। এমনকি ওদিক থেকে তিনি তো এলেনই না, এলো এক দুঃসংবাদ, মহা দুঃসংবাদ! হযরত উসমানকে নাকি ওরা কতল করে ফেলেছে!! ভাবো তো একটু! হযরত উসমানের মতো মাটির মানুষকে মেরে ফেলার খবর এলে নবীজী এবং সাহাবীদের মনে কী বেদনা ও ক্ষোভ সৃষ্টি হতে পারে! সুতরাং এ-খবরে আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া হলো। আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোরাইশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। মুসলমানদেরকে জিহাদের জন্যে বাইয়াত নিতে ডাকলেন। সবাই বাইয়াত গ্রহণ করলেন ‘আমার নিচে’ বসে! আমার ছায়ায় বসে! এ-বাইয়াত ও আমাকে নিয়েই নাযিল হলো তখন এ আয়াত- لَقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ

‘অবশ্যই আল্লাহ মু’মিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন, যখন তারা বৃক্ষতলায় বসে তোমার কাছে যুদ্ধের শপথ নিচ্ছিলো।’ -সূরা ফাতহ

মক্কার মুশরিকরা এ-বাইয়াতের কথা জানতে পারলো। সঙ্গে সঙ্গে তাদের ভিতরে ভীতি ও কম্পন ছড়িয়ে পড়লো। তারা ভালো করেই জানে, বীরপুরুষদের যুদ্ধ-শপথের অর্থ কী! এদিকে একটু পর হযরত উসমান ফিরে এলেন। তাঁর কতলের খবরটি নিছক একটি গুজব ছিলো। হযরত উসমানের সঙ্গে কোরাইশের এক দূতকেও দেখা গেলো। দূত এসে বললো: -আমরা চাই নতুন করে আমাদের মাঝে এখন আর কোনো যুদ্ধ না হোক। এ লক্ষ্যে আগামী দশ বছর আমাদের মাঝে একটি যুদ্ধ-বিরতি চুক্তি হবে। সে চুক্তিতে উভয় পক্ষের শর্তাবলী লেখা থাকবে।

চুক্তি সম্পাদিত হলো। ইতিহাসে যা ‘হোদায়বিয়া চুক্তি’ নামে পরিচিত। এ-চুক্তির উল্লেখযোগ্য শর্তগুলো ছিলো এমন:
► আগামী দশ বছর উভয় পক্ষ যুদ্ধ থেকে বিরত থাকবে।
► এ বছর মুসলমানগণ মক্কায় প্রবেশ করতে পারবে না। উমরাও করতে পারবে না। হোদায়বিয়া থেকেই তাদেরকে ফিরে যেতে হবে মদীনায়।
► আগামী বছর উমরা করার সুযোগ থাকবে। তলোয়ার ও ধনুক ছাড়া অন্য কোনো যুদ্ধাস্ত্র সাথে আনা যাবে না। তিন দিনের মধ্যেই উমরা পালন করে সবাইকে মদীনায় ফিরে যেতে হবে।
► কোরাইশের কেউ মুসলমানদের কাছে চলে গেলে তাকে ফেরত দিতে হবে। মুসলমানদের কেউ কোরাইশের কাছে চলে এলে তারা তাকে ফেরত দেবে না।
► কেউ কারো মিত্রকে আক্রমণ করতে পারবে না।
► কারো মিত্রপক্ষ আক্রান্ত হলে তাদেরকে সাহায্য করা যাবে।

সাহাবীদের অনেকেই এ-চুক্তিকে মন থেকে মেনে নিতে পারলেন না। কেননা এ চুক্তিতে অনেক অন্যায় শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছিলো। এতে মুসলমানদের দুর্বলতা প্রকাশ পাচ্ছিলো। কিন্তু আল্লাহ্র রাসূল সব শর্ত মেনে নিয়েই চুক্তি সই করলেন। সাহাবীদের দৃষ্টি ছিলো কাছে আর রাসূলের দৃষ্টি ছিলো দূরে, বহু দূরে। তাই সময় যতোই গড়াতে লাগলো এ-চুক্তির সুফল ততোই প্রকাশ পেতে লাগলো। আমার কাছেও তাই মনে হলো। দিনে দিনে নবীজীর দূরদৃষ্টি আলো ছড়াতে লাগলো। নমুনা লক্ষ্য করো-

এক. চুক্তি অনুযায়ী মক্কা থেকে কেউ মদীনায় চলে এলে তাকে মক্কায় কোরাইশের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার কথা ছিলো। সে অনুযায়ী অনেককেই আল্লাহ্র রাসূল ইসলাম কবুল করে মদীনায় তাঁর কাছে চলে আসার পরও ফিরিয়ে দিলেন। মক্কায় চলে যেতে বললেন। কিন্তু এরা তো একবার ইসলাম কবুল করে ধন্য হয়েছেন। আলোর পথের যাত্রী হয়েছেন। তাঁদের বিবেকের চোখ খুলে গেছে। তাঁরা এখন আলোকে আলো আর অন্ধকারকে অন্ধকারই মনে করেন। তাঁদের কাছে ঈমান ও ইসলাম এখন আলো, শুধুই আলো আর কুফরি ও শিরক এখন অন্ধকার, কেবলই অন্ধকার। সুতরাং তাঁরা কেনো নতুন করে 'অন্ধকার জগতে' ফিরে যাবেন? অন্ধকারের বাসিন্দাদের কাছে আত্মসমর্পণ করবেন?! কিন্তু এদিকে আল্লাহ্র রাসূল তো চুক্তি করেছেন যে, তাঁদেরকে তিনি নিজের কাছে রাখতে পারবেন না। সে হিসাবে মদীনায় থাকাও তাঁদের জন্যে সম্ভব হবে না এবং আল্লাহ্র রাসূলেরও তাঁদেরকে রাখা ঠিক হবে না। অগত্যা তাঁরা মদীনা থেকে বের হয়ে মক্কার দিকে যেতেন ঠিকই, কিন্তু কোরাইশের কাছে যেতেন না, মক্কায়ও যেতেন না। তাঁরা বরং আশ্রয় নিতেন বিভিন্ন পাহাড়ে। কিংবা তাঁবু টানিয়ে বসবাস শুরু করতেন মক্কা মদীনার রাস্তার আশপাশে। আর সুযোগ পেলেই কাফির মুশরিকদের উপর আক্রমণ করতেন, ওদের বিশদাঁত উপড়ে ফেলতেন! এভাবে তাঁদের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়তে লাগলো। কোরাইশের জন্যে তাঁরা আতঙ্ক হয়ে উঠলেন। এদিকে কোরাইশ যে উদ্দেশ্যে তাঁদেরকে ফেরত চাইছিলো, তা তো ব্যর্থ হলোই, যারা মক্কায় আছে তাদের ভিতরেও অনেকেই তাঁদের প্রভাবে ইসলাম কবুল করে কোরাইশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছিলো। তাই কোরাইশের এখন 'ছেড়ে দেয় মা কেঁদে বাঁচি' অবস্থা। কয়েকদিন পরই তারা এ-শর্ত প্রত্যাহার করে নিলো। বললো: -না, আমাদের কাছে আর কাউকে ফেরত পাঠাতে হবে না!

দুই. শুধু এ শর্তই না, পূর্ণ চুক্তিটাই কাফির মুশরিকদের জন্যে দুর্বিষহ হয়ে উঠলো। ফলে তারা চুক্তি বিরোধী কাজে জড়িয়ে পড়লো, চুক্তি ভেঙে ফেললো। আরেকটু খুলে বলছি- মসজিদে নববীতে বসে আছেন আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তাঁকে ঘিরে বসে আছেন সাহাবায়ে কেরাম। এমন সময় সেখানে এসে হাজির হলো আমর ইবনে সালেমের নেতৃত্বে বনু খোযা'আর এক প্রতিনিধি দল। দলপতি আমর ইবনে সালেম আল্লাহ্ নবীকে জানালেন: -কোরাইশ-মিত্র বনু বকর আমাদের উপর রাতের আঁধারে আক্রমণ করেছে এবং বেশ কয়েকজনকে হত্যা করেছে। আর মিত্র হিসাবে কুরাইশরা তাদেরকে অস্ত্র দিয়ে ও লোক পাঠিয়ে গোপনে সাহায্য করেছে। অথচ তা হোদায়বিয়া সন্ধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

এ-খবরে নবীজী যেমন দুঃখ পেলেন তেমনি ক্ষুব্ধ হলেন। আমর ইবনে সালেমকে তিনি বললেন: -তোমরা নিশ্চিত থাকো, আমরা এর বদলা নেবো। কিছুদিন যেতে-না-জেতেই আমি দেখলাম দশ হাজারের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার উপকণ্ঠে এসে শিবির স্থাপন করেছেন। আমার মন বললো, কোরাইশ কি পারবে এ-বিশাল বাহিনীর মুকাবিলা করতে? এরা তো বদরে ওহুদে খন্দকে শাণিত করে এসেছেন নিজেদের বীরত্ব! এরা এখন শুধু বীর না, মহাবীর! কোরাইশ যতো ভালোবাসে জীবনকে এরা তারচে' অনেক বেশী ভালোবাসে শহিদী মওতকে!

আমার ধারণাই ঠিক হলো। মক্কাবাসী এদের সাথে লড়াই করা ছাড়াই রাস্তা ছেড়ে সরে দাঁড়ালো। বরং ভীত-কম্পিত হয়ে যে যেদিকে পারলো, ছোটে পালাতে লাগলো। আল্লাহ্র রাসূল বিজয়ীর বেশে মক্কায় প্রবেশ করলেন! হ্যাঁ, তখন কেউ আমার কথা.. আমার নিচে বসে সেই বজ্র-কঠোর জিহাদী শপথের কথা ভুলে যান নি। কী দৃপ্তকণ্ঠে সেদিন তাঁরা উচ্চারণ করেছিলেন- হয় বিজয় নয় 'বিলয়'!

না বিলয় নয়, এলো আল্লাহ্ সাহায্য ও বিজয়। মানুষ দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে লাগলো। রাসূলের মহানুভবতায় মুগ্ধ হয়ে। বিজয়ী মুহাম্মদের দয়া-মায়া-করুণা-মানবতা-উদারতায় প্লাবিত হয়ে। রাসূলের মক্কা প্রবেশকালীন ঘোষণা আওড়াতে লাগলো মানুষ— রক্তপাত নিষিদ্ধ! গাছ কাটা যাবে না! এ-কথা শোনে আমার শাখা-প্রশাখারা দুলে উঠলো আনন্দে! মর্মর ধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠলো আমার পত্র-পল্লব! হায় হায়! কী দয়ার নবী তুমি হে মুহাম্মদ! একটু পর আমার কানে এলো আরেকটি মহা ঘোষণা! হৃদয় আমার আনন্দে ব্যাকুল! মাতোয়ারা! মনে হলো; আমার সবগুলো মরা পাতা ঝরে গিয়ে এই মাত্র যেনো জন্ম নিয়েছে নতুন নতুন কিশলয়! এতো মায়া! এতো দরদ তোমার কণ্ঠে হে মুহাম্মদ! অমন সুন্দর করে নিজের জানের দুশমনের কাছে কে জানতে চায়? ... তুমি চেয়েছো! তুমিই চাইবে! তুমিই তো চাইতে পারো! এ তোমার ক্ষমতা, শুধু তোমার! যখন কানে এলো তোমার এ মহা ঘোষণা—

-হে কোরাইশ সম্প্রদায়! তোমরা আমার কাছে কেমন আচরণ আশা করছো! তারা বললো: -উত্তম আচরণ ছাড়া আর কিছুই না! আপনি যে চিরউত্তম! তারপর তুমি কী বললে হে মুহাম্মদ! তুমি বললে তা-ই, যা শুধু তুমিই বলতে পারো-হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম ছাড়া! বললে: -যাও, আমি তোমাদেরকে মাফ করে দিলাম, তোমরা মুক্ত!!

আমি আমার জায়গায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই এরপর ইসলামের বিভিন্ন অগ্রযাত্রার খবর শুনতে পেতাম। আমি এখানে দাঁড়িয়েই শুনেছি হযরত আবু বকর রা. -এর শাসনকালের অগ্রযাত্রার খবর। আরো শুনেছি হযরত উমর রা.-এর সময়কার বিজয়গাথার কথা। আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সব ভবিষ্যতবাণীই একে একে বাস্তবায়িত হতে লাগলো। রোম-পারস্য মুসলমানদের হাতে এলো। এই পরাশক্তিদ্বয়ের অহঙ্কার ও দাপট ধুলোয় মিশে গেলো। এ সব খবর আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই পাচ্ছিলাম আমার দর্শনার্থীদের মুখে। আমার ছায়াতলে এসে এরা বসতো আর আমাকে সব জানাতো। এরা ছুটে আসতো আমার কাছে ব্যাকুলতা ও ভালোবাসা নিয়ে। আমার নিচে রাসূল বসেছেন। তাঁর সাহাবীরা বসেছেন। তাঁরা আমার নিচে বসে জিহাদের শপথ নিয়েছেন। আমার কথা কুরআনে আলোচিত হয়েছে- এ-সবই সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতো আমার কাছে ছুটে আসতে। ভীড় করতে। এই ভীড় দিনে দিনে বাড়তে লাগলো। হযরত উমর ভীষণ ভয় পেয়ে গেলেন, সীমালঙ্ঘনের ভয়। তিনি আমাকে আমূল কেটে ফেলার নির্দেশ দিলেন। তাই হলো। আমাকে কেটে ফেলা হলো!

না, আমি কোনো ব্যথা পাই নি! ব্যথা পাওয়ার আছেই-বা কী! আমি নিজের স্বার্থে খুশি বা ব্যথিত হই নি কোনোদিন, হতে চাইও নি! আমি ব্যথিত হলে হয়েছি রাসূলের ব্যথায়.. সাহাবীদের ব্যথায়! আমি খুশি হয়েছি এবং হয়ে চলেছি ইসলামের অগ্রযাত্রায়! আজ ইসলামের সেই চারা গাছটি রূপ নিয়েছে বিশাল এক মহীরুহে! ছায়া দিচ্ছে লক্ষ লক্ষ মুসলমানকে বরং কোটি কোটি মুসলমানকে, এ-ই আমার আনন্দ, এ-ই আমার গর্ব! আমি থাকলাম কি থাকলাম না— এটা কোনো বিষয়ই না! কুরআনে তো আমি আছি! যতোদিন কুরআন আছে ততোদিন আমি থাকবো। কুরআন থাকবে চিরকাল আমিও থাকবো চিরকাল। আহা! কুরআনের পরশ কী মজা! বন্ধু, কুরআনকে ভালোবেসে বিলীন হয়ে যাও কুরআনে, আমার মতো! দেখবে, কী মজা!

আমার কাহিনী এখানেই শেষ। এখন তোমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে— স্বর্ণমুদ্রা! বিদায় বন্ধুরা, ভালো থেকো!

টিকাঃ
১. এই মহিয়সীকে নিয়ে আমার একটি কিতাব লেখার স্বপ্ন আছে। স্বপ্নটা যদি তাড়াতাড়ি বাস্তব হতো!-অনুবাদক

📘 গল্পে আঁকা সীরাত হে মুহাম্মদ > 📄 আমি স্বর্ণমুদ্রা বলছি

📄 আমি স্বর্ণমুদ্রা বলছি


আমি স্বর্ণমুদ্রা। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ আমার পেছনে ছুটে চলেছে, লোভ-কাতর হয়ে। 'আরো চাই আরো চাই' লোভযন্ত্রে চালিত হয়ে। আমার ঝলমলানি মানুষকে যেনো যাদুস্পর্শে মোহাচ্ছন্ন করে ফেলে। মাঝে মাঝে দেখি, আমাকে নিয়ে মানুষ যুদ্ধ পর্যন্ত বাধিয়ে বসে। কিছু কিছু মানুষ তো আমাকে অর্জন করতে সাদা-কালো বৈধ-অবৈধ- সব পথ বেছে নেয়। কেউ কেউ আবার আমাকে সঞ্চয় করে রাখে দিনের পর দিন। ওরা এভাবে ধনী হতে চায়। ধনই ওদের কাছে শেষ চাওয়া-পাওয়া।

কিন্তু স-ব মানুষের ভীড়ে এমন একজন মানুষকে আমি দেখেছি, যিনি আমাকে চান না, একেবারেই না। তাঁর কাছে আমার কোনো গুরুত্ব ছিলো না। হ্যাঁ, তাঁর দেখা পেয়েছিলাম আমি আজ থেকে প্রায় পনের শ' বছর আগে মক্কায়। মক্কার লোকেরা মূর্তিপূজা করতো। ওরা আমারো পূজা করতো। কিন্তু তাঁকে আমি কখনো মূর্তির সামনে যেতে দেখি নি, মুহূর্তের জন্যেও না। বরং মূর্তির প্রতি ছিলো তাঁর ভীষণ ঘৃণা ও অভক্তি। একবার চাচাজান আবু তালিব তাঁকে ছোট্ট বেলায় প্রায় জোর করেই মূর্তিখানায় নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি মূর্তির নিকটবর্তী হতে পারেন নি। বড় মূর্তিটার আশেপাশের ছোট মূর্তিগুলোর কাছে যেতেই তিনি দেখলেন সাদা পোশাকের একটা লোক চীৎকার করে বলছে, 'মুহাম্মদ! কাছে এসো না, জলদি পিছিয়ে যাও! এক্ষুণি বেরিয়ে যাও!'

মক্কার মানুষ তাঁকে ভীষণ সমীহ করতো, ভালোবাসতো, বিশ্বাস করতো। মায়াভরে ডাকতো ‘আল-আমীন’ ‘আল-আমীন’ বলে। দেখলেই শ্রদ্ধাভরে বলতো, ঐ-জে মুহাম্মদ-আমাদের আল-আমীন! আল-আমীন সব কিছুতেই আল-আমীন -বিশ্বাসী- ছিলেন। কথায় ছিলেন বিশ্বাসী। কাজে ছিলেন বিশ্বাসী। জন-আচরণেও ছিলেন বিশ্বাসী। কখনো তিনি এমন দীনারের দিকে হাত বাড়ান নি, যা নিজের নয়। এ জন্যেই মানুষ তাঁর কাছে কতো দীনার, কতো সম্পদ আমানত রাখতো। তাঁর শত্রুরাও তাঁকে বিশ্বাস করে আমানত রাখতো। অনেকেই তাঁকে নিজের ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজে লাগাতে চেয়েছে। আর এ-সবই তাঁর আমানতদারী ও বিশ্বস্ততার কারণে। তাঁর প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার কারণে। যুগপৎ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ক'জনের ভাগ্যে জুটে?

সান'আ বলো আর দামেস্ক বলো কিংবা মক্কা, কোথাও জুড়ি ছিলো না আল-আমীনের বিশ্বস্ততার। কারো মাঝেই দেখা যেতো না অমন বিশ্বস্ততা। আল-আমীনের জুড়ি শুধু আল-আমীনই। এ জন্যেই বিবি খাদিজা তাঁকে ডেকে নিয়েছিলেন ব্যবসার কাজে। খাদিজার হয়ে গেলেন তিনি শামে। বয়ে আনলেন অনেক লাভ। খাদিজার জন্যে, নিজের জন্যে, চাচাজানের জন্যে। খাদিজা তাঁর বিশ্বস্ততায় আশ্চর্য হলেন। খাদিজা তাঁর গুণে মুগ্ধ হলেন। মুগ্ধতার ঘোর-আবেশে এক সময় তিনি আল-আমীনকেই চেয়ে বসলেন! নিজের জন্যে, একান্ত নিজের জন্যে! অর্থাৎ তাঁর স্ত্রী হয়ে ধন্য হওয়ার জন্যে! আল্লাহু আকবার! বিশ্বস্ততার কী মিষ্টি ফল! এ-বিবাহের কারণে আল-আমীনের জীবনের মোড় ঘুরে গেলো। আকাশ থেকে যেনো বরকতের বৃষ্টি নেমে এলো। সে বর্ষণে সিক্ত হলেন চাচা আবু তালিব, হাসি ফুটলো তাঁর অভাবের সংসারে! চাচাজানের হাসিতে আল-আমীনের মুখেও হাসি ফুটলো! প্রিয় আল-আমীনের হাসিতে খাদিজার মুখেও হাসি ফুটলো! সব হাসির সম্মিলনে পৃথিবীও যেনো হেসে উঠলো! আর এ-সব হাসির উপর ঐ সুদূর আকাশ থেকেও যেনো বর্ষিত হলো পুষ্পময় হাসির হাজার হাজার রেণু! তাই বুঝি একদিন আরশ থেকেও সালাম এসেছিলো খাদিজাকে খোঁজে! ধন্য তুমি হে মহিয়সী খাদিজা! আল-আমীনকে চিনতে তুমি একটুও ভুল করো নি! ধন দিয়ে, মায়া দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে, সর্বপ্রকার সহযোগিতা দিয়ে তুমি আল-আমীনের অবিচ্ছিন্ন অংশ হয়ে গেলে! তাই আল-আমীনের নাম উচ্চারিত হলেই এসে পড়ে তোমার নাম!! সত্যিই তুমি মহিয়সী!!

আল-আমীনকে আমাকে উপার্জন করতেন ঘামঝরা শ্রম দিয়ে। হালাল উপায়ে, বৈধ পথে। না, আমি আগেই বলেছি, আমার প্রতি তাঁর কোনো টান ও আকর্ষণ ছিলো না। কিছু মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্যেই তাঁর এই শ্রম, এই খাটুনি। কিন্তু যখনই শ্রমের বিনিময়ে আমি তাঁর হাতে উঠে আসতাম, তখনই তিনি তা উপযুক্ত খাতে ব্যয় করে ফেলতেন, হাতে রাখতেন না। সঞ্চয় তো করতেনই না। খরচের খাতেরও তাঁর অভাব ছিলো না।

সবারই টাকা খরচের খাত আছে। কিন্তু অনেক মানুষ হাতের টাকা খরচ করতে চায় না। মায়া লাগে। টাকার গায়ে হাত বুলাতে তাদের ভালো লাগে। টাকার দিকে মোহাচ্ছন্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে তাদের আয়েশ লাগে। টাকা সঞ্চয়ের পেছনে ছুটোছুটি করতে করতে তাদের আশ্ আর মিটে না। কিন্তু মুহাম্মদ এমন ছিলেন না। টাকা হাতে এলেই খরচ করে ফেলতেন, উপযুক্ত খাতে। আল-আমীন বিনিময় না দিয়েও কোনো কিছু গ্রহণ করতে চাইতেন না। নমুনা দেখো—

যখন তিনি মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করার সিদ্ধান্ত নিলেন, তখন বন্ধু আবু বকর তাঁকে একটি উট উপহার দিতে চাইলেন। কিন্তু তিনি বিনামূল্যে তা গ্রহণ করলেন না। যখন তিনি মদীনায় গিয়ে পৌঁছলেন, তখন মসজিদ নির্মাণের জন্যে, পরিবারের থাকার ঘর বানানোর জন্যে একটা জায়গা তাঁর পছন্দ হলো, তাও তিনি বিনামূল্যে নিতে চাইলেন না। উম্মতে মুহাম্মদীর এমন অনেক 'সদস্য'ই আমি দেখতে পাই চলতে ফিরতে যারা টাকার লোভে, টাকার খোঁজে আদর্শ বিকিয়ে দেয়, এমন কি মহা দৌলত- ঈমানটাও কেউ কেউ বিকিয়ে দেয়! দুনিয়ার তুচ্ছ মায়ায় পরকালের সওদা করে বসে— হাসতে হাসতে! হায়রে উম্মতে মুহাম্মদী! হায়রে লোভ! হায়রে ক্ষমতার মোহ! কেনো তোমাদের এতো মায়া, কেনো তোমাদের এতো লোভ— এই পচা দুর্গন্ধযুক্ত টাকার জন্যে!

আল্লাহ্র রাসূল আমাকে অর্জন করার ব্যাপারে মোটেই মরিয়া ছিলেন না। যতোটুকু প্রয়োজন ঠিক ততোটুকু। এ জন্যেই তাঁর গৃহে অবস্থান করার সৌভাগ্য কখনো আমার হয় নি! তাঁর সাথে আমার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। এ-সব স্মৃতির কথা মনে পড়লে আজো আমি বিস্মিত হই, পুলকিত হই। এসো, তোমাদেরকে শোনাই সে সব স্মৃতির কয়েকটি টুকরো টুকরো কথা।

এক. একবার যুদ্ধ-বিজয়ী সাহাবায়ে কেরাম মালে গণিমতের নব্বই হাজার দিরহাম নিয়ে এলেন তাঁর কাছে। এখানে আমিও ছিলাম। তিনি তা একটা চাটাইয়ের উপর রাখলেন। তারপর একে একে স-ব দান করে দিলেন, একটি দিরহামও নিজের জন্যে রাখলেন না! অন্যের উপর নিজের পরিবারকে প্রাধান্য দিলেন না। নিয়ে নয়— বিলিয়েই ছিলো তাঁর আনন্দ।

দুই. একদিন তাঁর কাছে এক ফকির এলো। কিন্তু হাতে তখন কিছুই ছিলো না। তাই বলে তিনি তাকে ফিরিয়েও দিলেন না, দিতে পারলেন না বরং পাশে বসিয়ে রাখলেন। এই আশায় যে, হয়তো আল্লাহ কোনো ব্যবস্থা করবেন, পাঠিয়ে দেবেন কোনো দানশীল ব্যক্তিকে তাঁর কাছে, একটু পর। না হলে আরেকটু পর। কিন্তু কী আশ্চর্য! একটু পর আরো দু'জন এলো সাহায্যের জন্যে। সাহায্যপ্রার্থী জমা হয়ে গেলো তিনজন। কাউকেই দয়ার নবী ফিরিয়ে দিলেন না। সবাইকে বসতে বললেন। একটু পর আরেকজন এলেন! তিনিও কি প্রার্থী? না, তিনি তাঁর এক প্রিয় সাহাবী! এসে তাঁকে চারটি দীনার দিলেন তিনি! তারপর বিনয়-ধোওয়া কণ্ঠে অনুরোধ করলেন— যে-কোনো খাতে তা খরচ করার! আল্লাহ্ নবী তিনজনকে তিনটি দীনার দিয়ে দিলেন। আর আমি থেকে গেলাম তাঁর হাতেই। আনন্দে আমার মনটা ভরে গেলো। আহা! নবীজীর স্পর্শ কী মধুর! কিন্তু নবীজী আমাকে বেশিক্ষণ হাতে রাখলেন না। সাহাবীদেরকে লক্ষ্য করে বললেন: -কে নেবে এই দীনারটা?

কিন্তু কেউ সাড়া দিলেন না। কে সাড়া দেবেন! দিরহাম-দীনারের প্রতি কারো-জে লোভ নেই! অগত্যা আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে নিয়ে গৃহে চলে গেলেন। এনে বালিশের নীচে রেখে দিলেন। তারপর শুয়ে পড়লেন। শুয়ে তো পড়লেন, কিন্তু ঘুমোতে পারলেন না। সারা রাত অস্থিরতায় এপাশ-ওপাশ করলেন। এভাবেই রাত কেটে গেলো। নতুন দিন শুরু হলো। তাঁর নতুন দিনের প্রথম কাজ ছিলো- একজন হাজাতমন্দকে খুঁজে বের করা তারপর আমাকে তার হস্তগত করা। তিনি তাই করলেন। তারপর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন!

তিন. নবীজী ছিলেন শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থী। স-ব শিখেছেন তাঁরা নবীজীর কাছে। স-ব সময় শিখেছেন। যখন সুযোগ এসেছে তখনই শিখেছেন। নবীজীর কাছে তাঁরা শিখেছেন- আমাকে ভালো না-বাসতে। আমাকে গুরুত্ব না-দিতে। আমার দিকে লোভ-কাতর দৃষ্টিতে না-দিতে। হাতে এলে আল্লাহ্র পথে, সত্যের পথে, কল্যাণের পথে, জনস্বার্থে, মানবতার সেবায় বিলিয়ে দিতে।

হযরত উসমান রা.-এর একটি ঘটনা শোনো। একবার শাম থেকে মদীনায় এসে পৌঁছলো তাঁর বিশাল বাণিজ্য বহর। তখন মদীনায় খুব অভাব-অনটন চলছিলো। খাদ্য সঙ্কটে অনেকে কষ্ট পাচ্ছিলো। এদিকে খাবারের বাজার-মূল্যও ব্যবসায়ীরা বাড়িয়ে দিয়েছে। এক দীনারে আগে যা পাওয়া যেতো এখন তা কিনতে গেলে গোনতে হয় অনেক দীনার। ঐ বছরটিকে তাই 'দুর্ভিক্ষের বছর' বলা হয়। এই অবস্থায় হযরত উসমান রা. সবাইকে জমা করলেন। পাশেই স্তূপাকারে রাখলেন সিরিয়া থেকে-আনা বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য। তারপর তিনি সবাইকে লক্ষ্য করে বললেন:
-তোমরা এর আগে যে-খাবার এক দীনার দিয়ে কিনতে এখন তা ক'দীনার দিয়ে কিনো?
তখন কেউ বললেন, দুই দীনার, কেউ বললেন, তিন দীনার। হযরত উসমান রা. মৃদু হেসে বললেন:
-কিন্তু আমার পণ্যের মূল্য-জে অনেক বেশী, দশ গুণ! তোমরা কে কে তা কিনতে প্রস্তুত দশ গুণ মূল্য দিয়ে?
সবাই চুপ করে রইলেন, কেউ কথা বলতে পারলেন না। এতো মূল্য! কেমন করে তাঁরা পরিশোধ করবেন? এ-জে তাঁদের ক্রয়-ক্ষমতার বাইরে! অক্ষমতায় ও দুশ্চিন্তায় তাঁরা পেটের বেসামাল ক্ষুধা নিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন হযরত উসমান রা.-এর হাসি-জড়ানো মুখের দিকে। একটু পর হযরত উসমান নীরবতা ভেঙে বলে উঠলেন:
-ভাইয়েরা আমার! আল্লাহ তো একটি নেক কাজের বিনিময়ে দশটি নেকী দান করেন, তাই না? শোনো, আমি স-বই সেই নেকী লাভের আশায় তোমাদেরকে দিয়ে দিলাম!!

না, বিনিময়ে তিনি একটি দীনারও নিলেন না! মানুষের ক্ষুধা-কাতর মুখ দেখেও কী করে তিনি মূল্য নিতে পারেন? আল্লাহ কি তাঁকে কম দিয়েছেন? কতো ধন দিয়েছেন! কতো বড় মন দিয়েছেন! কেনো তবে তিনি অমন মন উজাড় করে হাত খোলে দান করবেন না? অভাবী মানুষের মুখে প্রাপ্তি ও তৃপ্তির হাসি ফোটাবেন না? মূল্য যদি নিতেই হয় তাহলে আল্লাহ্র কাছ থেকেই নেবেন! মানুষের মূল্য তো কম, অনেক কম! এক দীনারের পণ্যে এক দীনারই পাওয়া যায়। আল্লাহ্র কাছে পাওয়া যায় এক দীনারের পণ্যে শত শত গুণ বেশী, সাতশ' গুণ বেশী! কখনো আরো অনে-ক বেশী!! কোন্ ব্যবসাটা তাহলে লাভজনক?

কী সুন্দর শিক্ষা তিনি লাভ করেছিলেন নবীজীর কাছ থেকে! যারা মানুষের তীব্র প্রয়োজনের মুহূর্তেও খাদ্য ও পণ্য আটকে রেখে মুনাফা লুটতে চায় তাদেরকে আল্লাহ্ নবী তুলনা করেছেন এমন সব মানুষের সাথে যারা আমার পূজা করে! নবীজী বলেছেন- تعس عبد الدينار والدرهم - ধ্বংস হোক দীনার-দিরহামের পূজারী! যেদিন আমি এ-হাদীস শুনেছি সেদিন থেকে আমিও আমার পূজারীকে ঘৃণা করতে শুরু করেছি। সত্যি তো ওরা হতভাগা! ওরা জানে না কাকে বলে আনন্দ ও সৌভাগ্য! কাকে বলে সফলতা, প্রকৃত সফলতা!

চার. কী আর বলবো, জীবন আমাদের বড়ো অদ্ভুত। এই আনন্দ, আবার এই বেদনা। আমাদেরকে নিয়ে কিছু মানুষ মেতে ওঠে জঘন্য খেলায়। তখন আমরা বড়ো অসহায় বোধ করি, অস্বস্তি বোধ করি। আবার অপরদিকে আমরা যখন পুণ্যকর্মে ব্যয় হই, সত্যের পথে বিলীন হই, তখন আনন্দের আর সীমা থাকে না। এই-জে কখনো আমরা ভালো কাজে আবার কখনো মন্দ কাজে ব্যবহৃত হই, তার কিছু নমুনা দেখো: আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও এই দীনারের ফাঁদে আটকানোর অপচেষ্টা করেছে কোরাইশ। তাঁকে লোভ দেখিয়ে বলা হয়েছে, তুমি সম্পদ চাও? হাজার হাজার দীনার আমরা তোমার পায়ের কাছে এনে রেখে দেবো! তবু তুমি এই নতুন ধর্মের প্রচারটা বন্ধ করো!

সাহাবায়ে কেরাম মালে গণিমত (যুদ্ধ-জয়ের পর দুশমনের কাছ থেকে প্রাপ্ত সম্পদ) হিসাবে আমাদেরকে আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট পেশ করেছেন। কেউ কেউ আমাদেরকে পেশ করেছেন তাঁর কাছে খরচ করতে- নিজের জন্যে, নিজের পরিবারের জন্যে। কিন্তু তিনি গ্রহণ করেন নি। আমরা তাঁর হাতে যেতে চাইলেও তিনি আমাদেরকে নিতে চান নি। এখন না, তখন না, কখনো না। ফিরিয়ে দিয়ে তিনি বলতেন:
-না হে আমার প্রতিপালক! আমি 'দিরহাম দীনার' চাই না। একদিন খাবো আরেকদিন খাবো না। যেদিন খাবো না সেদিন সবর করবো। যেদিন খাবো সেদিন তোমার শোকর করবো!

পাঁচ. আল্লাহ্ নবী সারা জীবনই সম্পদ-নিস্পৃহ ছিলেন। জীবনের বেলা শেষে সাহাবীদেরকে ডেকে বললেন:
-কে কী পাবে তোমরা আমার কাছে? এই-জে আমার সম্পদ! এখান থেকে নিজেদের পাওনা নিয়ে যাও! একজন দাঁড়িয়ে বললেন:
-হে আল্লাহ্র রাসূল! আমি আপনার কাছে তিনটি দিরহাম পাই!
নবীজী সাথে সাথে তা পরিশোধ করে দিলেন।

সেদিনের কথা আমি কখনো ভুলতে পারবো না। আল্লাহ্ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন প্রচণ্ড অসুস্থ। উম্মুল মু'মিনীন হযরত আয়েশার হুজরায় তিনি শুয়ে আছেন। হঠাৎ বলে উঠলেন:
-আয়েশা! ঐ দিরহামগুলো কী করেছো?
-কোন্ দিরহামগুলোর কথা বলছেন?!
-ঐ-জে ছয়টা দিরহাম!
-সেগুলো আমার কাছেই আছে!
-মুহাম্মদ কেমন করে নিজের রব-এর কাছে যাবে, এই দিরহামগুলো নিজের কাছে রেখে! জলদি তুমি তা দান করো!
-অবশ্যই আমি তা দান করে দেবো, হে আল্লাহ্র রাসূল!
-হে আল্লাহ! আমাকে বাঁচিয়ে রাখো নিঃসম্বল! মৃত্যুও দাও নিঃসম্বল! আর হাশরের মাঠেও আমি হতে চাই নিঃসম্বলদের দলে!

আল্লাহ নবীজীর দু'আ কবুল করেছেন। তাই তো দেখি— মৃত্যুকালে রেখে যান নি তিনি একটি দীনারও .. একটি দিরহামও! যা কিছু রেখে গেছেন তার একটা তালিকা দেখবে? দেখো!
► সামান্য যব, হযরত আয়েশার কাছে।
► সেই সাদা গাধাটি, যাতে সওয়ার হতেন তিনি।
► একখণ্ড জমি, তাও দান করে গিয়েছিলেন মুসাফিরদের জন্যে।
► তাঁর অস্ত্রটি।

এদিকে তাঁর বর্মটি তখন বন্ধক ছিলো এক ইহুদীর কাছে, নিজের জন্যে এবং পরিবারের জন্যে সামান্য খাবারের বিনিময়ে। সাহাবায়ে কেরাম সবাই নবীজীর কাছে শিখেছেন— এই দুনিয়ার জীবন আসলে কোনো জীবনই না। আসল জীবন তো শুরু হবে পরকালে। যার সূচনা আছে কিন্তু শেষ নেই। এখানকার জীবন অমর অক্ষয়! চিরঅব্যয়! জান্নাতের নায-নেয়ামত ও হুর-গিলমানরা কেবলই হাতছানি দিয়ে ডেকে চলেছে অবিরত— চির-জীবনের চির সবুজ জান্নাতে! অমন জান্নাতের অবিরাম হাতছানি যাঁদের কানে বাজে, তাঁরা কেমন করে আমি দীনারের প্রেমে মজে? অর্থ-সম্পদের মায়ায় জড়ায়? দুনিয়ার মরীচিকাময় পথে পা বাড়ায়? দিরহাম-দীনারের ছলনায় বিভ্রান্ত হয়? পার্থিব জীবনের চাকচিক্যে পথ হারায়?

ছয়. আল্লাহ্ নবী একদিন মেয়ে ফাতেমাকে দেখতে গেলেন। গিয়ে দেখলেন তাঁর হাতে স্বর্ণের একটা হার। পাশে-বসা এক মহিলাকে তিনি সেটি দেখিয়ে বলছেন—আবুল হাসান আমাকে এটি উপহার দিয়েছেন! আল্লাহ্ নবী তখন বললেন: -ফাতেমা! তুমি কি খুশি হতে পারবে, মানুষ যখন বলবে—আল্লাহ্র রাসূলের মেয়ের হাতে জাহান্নামের ‘শেকল’! এরপর নবীজী মেয়ের কাছে আর বসলেন না, বেরিয়ে গেলেন। হযরত ফাতেমা বুঝলেন, সব বুঝলেন। তিনি আর দেরী করলেন না, স্বর্ণের হারটি বিক্রি করে দিলেন। মূল্য দিয়ে একটি গোলাম খরিদ করলেন। তারপর সেই গোলামটিকে আযাদ করে দিলেন। আল্লাহ্র নবী এ-খবর শুনলেন, ভীষণ খুশি হলেন। বললেন: -সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্, যিনি ফাতেমাকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করেছেন!

আল্লাহ্র নবীর মুখে উচ্চারিত হতো: اللَّهُمَّ اجْعَلْ رِزْقَ آلِ مُحَمَّدٍ كَفَافاً. হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মদের পরিবারের রিযিক বরাদ্দ করো শুধু ততোটুকুই, যতোটুকুতে তাদের প্রয়োজন সেরে যাবে, একটুও বেশী হবে না!

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00