📘 গল্পে আঁকা সীরাত হে মুহাম্মদ > 📄 আমি ওহুদ পাহাড়

📄 আমি ওহুদ পাহাড়


আমার নাম ওহুদ। আমি মদীনা থেকে মাত্র তিন মাইল দূরে। তৃতীয় হিজরীতে অর্থাৎ বদর যুদ্ধের এক বছর পরে হঠাৎ দেখতে পেলাম আমার কাছে এসে জড়ো হচ্ছে কোরাইশ বাহিনী। সংখ্যায় তারা অনেক। তিন হাজার। দু'শ ঘোড়সওয়ার। আরো দু'শ দুর্ধর্ষ বর্মধারী। এরা এসেছে বদর যুদ্ধের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে। মদীনার উপকণ্ঠে চরে বেড়াচ্ছে ওদের ঘোড়া ও উটের পাল। একদল নারীকেও তাদের সাথে দেখা যাচ্ছে। কবিতা বলে বলে আর গান গেয়ে গেয়ে পুরুষদেরকে যুদ্ধ-মাতাল করে তোলার জন্যে এরা এসেছে।

আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও এক হাজার সৈনিক নিয়ে তাদেরকে প্রতিরোধ করতে বের হয়েছেন। বদরের মতো এখানেও সৈন্য কম। অস্ত্র কম। বর্মধারী সৈন্যের সংখ্যা মাত্র একশ'। ঘোড়সওয়ার মাত্র দু'জন। আমি ভীষণ বিস্মিত হলাম মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে একদল ক্ষুদে সৈনিক দেখে। একজন তো বেশ ছোট। তাকে বাদ দেয়ারই চিন্তা করা হলো। কিন্তু বাদ না-পড়তে সে একেবারে মরিয়া। আঙুলের মাথায় ভর দিয়ে ও নিজের 'উচ্চতা'র প্রমাণ দিচ্ছে! আরেক পিচ্চি তো যুদ্ধে যেতে আরো মরিয়া! নিজের সঙ্গী যাচ্ছে আর সে বাদ পড়বে- তা মানতে ও একেবারেই নারাজ! ওর স্পষ্ট বক্তব্য: ও গেলে আমিও যাবো! কেনো যাবো না? আমাদের দু'জনের মধ্যে লড়াই হলে আমি ওকে ঠিকই হারিয়ে দেবো!

অবশেষে দু'জনের মাঝে লড়াইও হলো, বিস্ময়কর লড়াই! যুদ্ধে যাওয়ার যুদ্ধ!! সত্যি সত্যি সে জিতে গেলো! আশ্চর্য! যার হারার কথা ছিলো সে হারলো না! যার জিতার কথা ছিলো সে জিতলো না! আসলে কেউ হারে নি, যুদ্ধে যেতে দু'জনই জিতেছে! কিন্তু আমার জানতে ইচ্ছে করে, ওদের মাঝে কি কোনো চুক্তি হয়েছিলো? যুদ্ধের আগে যুদ্ধে যেতে ঐ যে দু'জনের যুদ্ধটা, তার আগে দু'জনের মাঝে ফিসফিস যে-কানাকানিটা, সেটা কী নিয়ে ছিলো? হার-জিতের রহস্যটা কি তবে ঐ কানাকানিতেই লুকিয়েছিলো!

আমি আরো বিস্মিত হয়েছি বৃদ্ধ কিছু মানুষকে শরীক হতে দেখে! অথচ এটা তাঁদের যুদ্ধে যাওয়ার বয়স নয়! যুদ্ধে যাওয়ার শ্রেষ্ঠ সময়টা তাঁরা অনেক আগেই পেরিয়ে এসেছেন! তবু কেনো তাঁরা? কী আশ্চর্য! যুদ্ধে না গেলে কে তাঁদেরকে কী বলতো? আসলে তাঁরা কারো বলা-কওয়ার ভয়ে যুদ্ধে যাচ্ছেন— এমনটা নয়, তাঁরা যুদ্ধে যাচ্ছেন লড়ে-লড়ে শহীদ হতে! শহীদ হয়ে-হয়ে জান্নাতে চলে যেতে! জান্নাতের পথটাকে আরো অনেক অনে-ক ছোট্ট করে ফেলতে! একটা লাফ দিলেই যেখানে জান্নাতে চলে যাওয়া যাচ্ছে সেখানে হাত-পা গুটিয়ে কেনো তাঁরা বার্ধক্যের অজুহাতে ঘরে বসে বসে কালক্ষেপণ করবেন? জান্নাতের সফরকে বিলম্বিত করবেন? বুড়োদের জন্যে আগে আগে জান্নাতে যেতে বুঝি মানা! আহা! কী সুন্দর আমাদের সোনালী যুগের সেই সোনালী ইতিহাস! জিহাদে যেতে ছোটরাও প্রতিযোগিতা করে! বুড়োরাও ঘরে বসে থাকতে অস্বস্তি বোধ করে! যে জাতির ছোট-বুড়োরা এমন, সে জাতিকে কে হারাতে পারে?!

মুসলিম বাহিনীর সংখ্যা এবার বদরের চেয়ে বেশী হলেও কোরাইশ বাহিনীর তুলনায় ঐ তিন ভাগের এক ভাগই। এদিকে এক হাজার ওদিকে তিন হাজার। এই এক হাজারও আবার ময়দান পর্যন্ত আসতে-না-আসতেই হয়ে গেলো সাতশ'। মুনাফিক নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই খোঁড়া অজুহাত তোলে সদলবলে মদীনায় ফিরে গিয়েছিলো। কিন্তু মুনাফিকরা মুনাফেকি করলেও মুসলিম বাহিনীর মধ্যে বিন্দুমাত্র চিড় ধরলো না। হতাশা দানা বাঁধলো না। উল্টো খড়কুটো ভেসে যাওয়াতে তাঁরা বরং খুশীই, আরো বলীয়ান। আরো মরিয়া। বীরত্বের রাঙা আবীর শোভা ছড়াচ্ছে তাঁদের চোখে-মুখে সকাল বেলার রাঙা রবির মতো!

আল্লাহর নবী একটা উঁচু জায়গা বেছে নিলেন যুদ্ধ-পরিচালনার সুবিধের জন্যে। আমি ওহুদ পাহাড় দাঁড়িয়ে আছি ঠিক তাঁর পেছনে— তাঁকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্যে। আমার মাঝখানে একটা ফাঁকা জায়গা আছে। এদিকটা দিয়ে দুশমন ভিতরে ঢুকে পড়তে পারে যে-কোনো অলস ও অসতর্ক মুহূর্তে। এ বিষয়টি আমাকে বেশ ভাবিয়ে তুললো। মুসলিম বাহিনী বিষয়টা আমলে না নিলে বিপদ ঘটতে পারে। কিন্তু একটু পরই আমার দুশ্চিন্তা দূর হয়ে গেলো। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে বিষয়টির দিকে দৃষ্টি দিলেন। তিনি পঞ্চাশজন দক্ষ তীরন্দাজকে সেখানে একটা ছোট্ট পাহাড়ে সতর্ক প্রহরায় নিয়োজিত করলেন। তিনি তাদেরকে বলে দিলেন:
-মুসলমানদের জয়-পরাজয় যাই হোক, কোনো অবস্থাতেই এ-স্থান ত্যাগ করা যাবে না।¹

মুসলিম বাহিনীকে কাতারবদ্ধ করলেন আল্লাহর রাসূল। ওদিকেও সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে কোরাইশ বাহিনী। একটু পর শুরু হলো লড়াই। ওদের চোখে জ্বলছে প্রতিশোধের আগুন। আর মুসলিম বাহিনীর দৃষ্টিতে জ্বলজ্বল করছিলো জিহাদী চেতনা। সে দৃষ্টি যেনো বলছিলো:
-আমরা জালিমকে ভয় পাই না। আমরা জানি, কেমন করে জালিমের বিষদাঁত ভেঙে দিতে হয়। কীভাবে জুলুমের মূলোৎপাটন করতে হয়।

শুরু হলো ভয়ানক লড়াই। প্রথমেই একক যুদ্ধ। এদিক থেকে এগিয়ে গেলেন হযরত হামযা-বদর যুদ্ধের প্রথম বীর। ওদিক থেকে যে এসেছিলো তাঁর মুকাবিলায়, সে ছিলো কোরাইশ বাহিনীর নিশানবরদার। কিন্তু অল্পক্ষণেই তার হাত থেকে নিশানটা পড়ে গেলো। মহাবীর হামযা তাকে এক আঘাতেই পাঠিয়ে দিলেন জাহান্নামে। এরপরই শুরু হলো সম্মিলিত আক্রমণ। আমি অবাক বিস্ময়ে দেখে যাচ্ছিলাম মুসলিম বাহিনীর বীরত্ব। আমার চোখে এ-যুদ্ধের তিনটি চিত্র আকাশের তারকার মতো জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। এ তিনটি চিত্রের কথাই আমি আগে বলি।

চিত্র-১ মুসলিম বাহিনী দুশমনের সাথে লড়ে যাচ্ছিলো বীর-বিক্রমে। যেদিক দিয়েই তাঁরা দুশমনের কাতার ভেদ করছিলেন সেদিকেই তাঁদের বীরত্ব আগুনের ফুলকির মতো জ্বলছিলো। সৃষ্টি হচ্ছিলো শত্রু-শিবিরে ত্রাস, মহাত্রাস। কোরাইশ সৈন্যরা সংখ্যায় ত্রিগুণ হওয়া সত্ত্বেও মুসলমানদের হামলা ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছিলো। মুসলমানরা লড়ছিলেন শাহাদতের ব্যাকুলতা বুকে নিয়ে, আর মুশরিকরা লড়ছিলো— জান বাঁচিয়ে অস্ত্র বাগিয়ে 'লেজ' গুটিয়ে। ইতিমধ্যে কোরাইশ বাহিনীর সাত পতাকাধারীর সবাই একে একে 'ভূতলশায়ী' হয়েছে। কোরাইশ বাহিনী বেসামাল হয়ে গেলো। পালিয়ে বাঁচা ছাড়া আর কোনো রাস্তাই তাদের নজরে এলো না। সুতরাং সবাই পালাতে লাগলো। মুসলমানরা তাদেরকে তাড়া করে বেশ খানিকটা পথ যাওয়ার পর আবার ফিরে এলেন। মুসলিম শিবিরে বিজয়ের আলো ফুটে উঠলো!

এই চিত্রটা আমার চোখে কেবলই রাঙা আলো ছড়াচ্ছিলো। কিন্তু এই রাঙা আলো-যে একটু পরই গাঢ় অন্ধকারে তলিয়ে যাবে তা আমি ভাবতেও পারি নি। এখন বলি সে অন্ধকার চিত্রের কথাই।

চিত্র-২ এই দ্বিতীয় চিত্রের কথা বলতে আমি দুরুদুরু কাঁপছি। আমার কণ্ঠ কেঁপে কেঁপে উঠছে। আমার মাঝখান দিয়ে যে গিরিপথটা ছিলো যেখানে সতর্ক প্রহরায় নিয়োজিত ছিলেন পঞ্চাশ জন তীরন্দাজ, সে কথা আমি আগেই বলেছি। তাঁরা বিজয়ের প্রথম প্রহরেই এতোটা উল্লসিত হয়ে উঠলেন যে আল্লাহ্র নবীর সতর্কবাণীর গুরুত্বের কথা তাঁরা আমলেই নিলেন না। দশজন ছাড়া সবাই স্বস্থান ত্যাগ করে মালে গণিমত কুড়াতে ছুটে গেলেন। আল্লাহ্র রাসূলের শিক্ষা তাঁরা ভুলে গেলেন। আর ওই দিকে ওঁত পেতে-থাকা কোরাইশ বাহিনীর ঘোড়সওয়াররা খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে ঐ গিরিপথ দিয়েই ধেয়ে এলো। অবশিষ্ট দশজন তাদেরকে কোনভাবেই ঠেকাতে পারলেন না, সবাই শহীদ হয়ে গেলেন। খালিদ বিন ওয়ালিদ সসৈন্যে একেবারে আল্লাহ্ নবীর কাছাকাছি চলে এলেন। মুহূর্তেই মুসলমানদের বিজয়ের উপর নেমে এলো কোরাইশ বাহিনীর ঝড়ো আক্রমণ। মালে গণিমত সংগ্রহে ব্যস্ত মুসলমানরা কোমর সোজা করে দাঁড়াতেও পারলেন না, এর মাঝেই শুরু হয়ে গেলো প্রতিপক্ষের সাঁড়াশি আক্রমণ। একটু আগে যে-কোরাইশ পালিয়ে জান বাঁচাতে ব্যস্ত ছিলো, তারাও এখন নতুন উদ্যমে ফিরে এলো এবং মুসলমানদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো।

আমি -ওহুদ পাহাড়- এ দৃশ্য দেখছিলাম আর দুঃখে বেদনায় ফেটে পড়ার উপক্রম হচ্ছিলাম। হায়! ছোট্ট দলের একটা ছোট্ট ভুল কী ভয়ঙ্করভাবে নিশ্চিত বিজয়কে বিপর্যয়ে বদলে দিলো! আল্লাহ্র রাসূলের উপরও এলো আঘাত! আহ! তাঁর রক্ত দেখে আমি কী-যে কষ্ট অনুভব করছিলাম! আল্লাহ্র রাসূল আমার একটা ফাটলে গিয়ে আশ্রয় নিলেন আহত হয়ে! এদিকে তখন শয়তান এ-কথা মশহুর করে দিলো যে মুহাম্মদ 'মারা গেছে'! উত্তেজনায় উন্মাদনায় কাফেররা উল্লাস করতে লাগলো। তারা যেনো ধরেই নিয়েছিলো যে ইসলামের দিন শেষ। মুসলমানদের আর কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। ওহুদেই রচিত হবে তাদের শেষ সমাধি।

চিত্র-৩ আল্লাহ্র রাসূলের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আবেগভরে এক সাহাবী বলে উঠলেন: -মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি সত্যি সত্যি মারা গিয়ে থাকেন তাহলে আমরা জীবন দিয়ে কী আর করবো?! যে পথে তিনি চলে গেছেন সে পথে তোমরাও জীবন বিলিয়ে দাও!

এ-ঘোষণার পর আবার সবাই একত্রিত হতে লাগলেন। সবার মাঝে মনোবল ফিরে এলো। আবার তাঁরা সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ালেন। এর মাঝেই ভেসে এলো একজনের কণ্ঠে সুসংবাদ- মিথ্যে, সব মিথ্যে! আল্লাহ্র রাসূল মারা যান নি! তিনি জীবিত আছেন, সুস্থ আছেন!

সাথে সাথে সবার মন আনন্দে দুলে উঠলো! আবার তারা জীবনপণ লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। আমার উপরে উঠে এসে তাঁরা বিপদমুক্ত অবস্থান নিলেন। খালিদ বিন ওয়ালিদের সৈন্যরা উপরে উঠে আসতে চাইলো। কিন্তু মুসলিম বাহিনীর তীরবৃষ্টি ও পাথরবৃষ্টি তাদেরকে বাধাগ্রস্ত করলো। দূরে হটিয়ে দিলো। এরপর কোরাইশ বাহিনী আর সুবিধে করতে পারলো না, তারা বারবার আক্রমণ শাণিত করতে চাইলো, কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হলো।

তীরন্দাজদের একটা ভুলের কারণে যুদ্ধে সাময়িকভাবে ফিরে এলেও এখন তারা ভালোই বুঝতে পারছে- না, মুসলমানদেরকে শেষ করা যাবে না! বরং সময় যতো গড়াবে মুসলমানরা ততোই ফুঁসে উঠতে থাকবে। তার আগেই ময়দান ছাড়তে হবে। সোজা মক্কার পথ ধরতে হবে। কোথাও আর থামা যাবে না। অবশ্য মদীনায় এখন আক্রমণ করা যায়। কেননা মদীনা এখন ফাঁকা প্রায় বীরশূন্য। কিন্তু মদীনায় আমাদের ভাগ্যে কী লুকিয়ে আছে তা এই মুহূর্তে অজানার আঁধারে ঢাকা। বরং এখন বিজয়ের যে গৌরবটা নিয়ে মক্কায় ফিরা যাবে, মদীনা আক্রমণ করলে তাও উল্টো বদলে যেতে পারে। বদর যুদ্ধের প্রতিশোধ নিতে পারার আনন্দটা একেবারেই ভেস্তে যেতে পারে—ধুলোয় মিশে যেতে পারে। সুতরাং জয় হোবল, জয় হোবল! মক্কা চলো, দ্রুত মক্কা চলো!

আবু সুফিয়ান চলে যেতে যেতে মুসলমানদের উদ্দেশ্যে বললেন: -আজ আমরা বদরের প্রতিশোধ নিলাম। বদর ছিলো তোমাদের। ওহুদ হলো আমাদের। যুদ্ধ হলো জয়-পরাজয়ের খেলা। একদিন তোমাদের, একদিন আমাদের। আবার দেখা হবে তোমাদের সাথে।

যুদ্ধ এখানেই শেষ। আমি অশ্রু ছলোছলো চোখে আমার আশেপাশে তাকালাম। আহ! আর সইতে পারছি না! ঐ-যে ওখানে পড়ে আছে বীর হামযার ক্ষত-বিক্ষত দেহ! হিন্দা কী পিশাচিনীর মতো বুক চিরে তাঁর কলিজাটা বের করে চিবিয়েছে! আরো পড়ে আছে অন্যান্য শহীদানের দেহ। আশেপাশে পড়ে ছিলেন আহতরাও।

কোরাইশ বাহিনী ময়দান ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আবার আমার মাথায় সেই দুশ্চিন্তাটা ফিরে এলো— এরা সব এখন মদীনায় গিয়ে চড়াও হবে না তো! মদীনার রাস্তা একদম ফাঁকা। রুখে দাঁড়াবার বিশেষ কেউ নেই ওখানে। মুসলমানরা সবাই এখানে আমার কাছে। এদের মদীনায় ফিরে যেতে একটু সময়ও লাগবে। শহীদদের দাফন-কাফন বাকি। আহতদের প্রাথমিক পরিচর্যা বাকি। তারপর ধীরে ধীরে মদীনায় যেতে হবে। এর মাঝে তো কাফেররা মদীনায় গিয়ে তুলকালাম কাণ্ড ঘটিয়ে দিতে পারে! আমি আবার কেঁপে উঠলাম! উদ্বেগভরে কোরাইশ বাহিনীর গতিবিধিটা বোঝার চেষ্টা করলাম। একটুপর আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। না, ওরা মদীনা নয়— মক্কার পথ ধরছে!

বিজয়ের আনন্দ কি ছিলো ওদের মনে? না, ছিলো না। থাকার কথাও না। প্রকৃত বিজয়টা তো আসলে ওরা অর্জন করতে পারে নি। প্রকৃত বিজয় ছিলো মুসলমানদেরই। তবে এ বিজয়টায় অনেক রক্ত ঝরেছে, ছোট্ট ঐ ভুলটার কারণে। এ জন্যে ওরা মক্কায় যেতে যেতে বলাবলি করছিলো— আমরা কি বিজয়ী! তাহলে আমাদের মালে গণিমত কোথায়? কই, একজন বন্দিও তো আমাদের সঙ্গে নেই! কোথায় আমাদের বিজয়?! কেনো আমরা এখন মদীনায় না গিয়ে মক্কায় ফিরে যাচ্ছি? আমরা তো এসেছিলাম ইসলাম ও মুসলমানদেরকে একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দিতে! তাহলে তা না করে আমরা মক্কার পথ ধরলাম যে!

আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শহীদানের দাফন সম্পন্ন করলেন। চাচাজান হামযার বিকৃত লাশ দেখে তিনি অঝরে কাঁদলেন। সাহাবীরা অমন করে কাঁদতে দেখেন নি প্রিয় নবীকে কখনো!! তারপর ভেজা চোখে আল্লাহ্র রাসূল মদীনায় ফিরে গেলেন। আমার চোখও ছিলো তখন ভেজা। রাসূলের ভালোবাসায়, শহীদানের ভালোবাসায়, শহীদানের স্বজনদের কান্নায়! কিন্তু মদীনায় ফিরার পরে রাতটা পার হতে-না-হতেই আবার এলো নতুন যুদ্ধের নতুন ঘোষণা। জানা গেছে আবু সুফিয়ান নাকি সহ-যোদ্ধাদের গরম গরম কথায় আবার মদীনা আক্রমণের জন্যে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। সুতরাং ১৬ই শাওয়াল ফজর শেষে আবার আল্লাহ্র রাসূলের নেতৃত্বে এগিয়ে চললেন বীর সাহাবীরা, আবু সুফিয়ানের উদ্দেশে। 'হামরাউল আসাদ' পৌঁছে তাঁরা থামলেন। এমনকি সেখানে তিনদিন আবু সুফিয়ানের অপেক্ষাও করলেন। কিন্তু আবু সুফিয়ানের আর কোনো পাত্তা পাওয়া গেলো না। আসলে তিনি দ্বিতীয়বার আল্লাহ্ নবীর বের হওয়ার সংবাদ পেয়ে ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। সে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে আবার মক্কার দিকে ছুটে যেতে লাগলেন। 'হামরাউল আসাদ' এসে মুসলিম বাহিনীর মুখোমুখি হওয়া তো দূরের কথা; বরং পরাজিত সৈন্যদের সেনাপতির মতো তিনি ক্রমেই 'পলায়নের' গতি বাড়িয়ে দিচ্ছিলেন। বলা তো যায় না, মুসলিম বাহিনী 'হামরাউল আসাদ' থেকে এদিকেই আবার ছুটে না আসে!

'হামরাউল আসাদ'-এ তিনদিন অবস্থান করে ১৯ তারিখ আবার ফিরে এলেন আল্লাহ্র রাসূল মদীনায়। আমার কোল ঘেঁষেই মদীনায় প্রবেশ করছিলেন আল্লাহ্র রাসূল ও সাহাবীরা। তাঁরা আমার দিকে তাকাচ্ছিলেন কৃতজ্ঞতাভরা দৃষ্টিতে, ভালোবাসাপূর্ণ দৃষ্টিতে! তাঁরা আমাকে ভালোবাসেন, আমিও তাঁদেরকে ভালোবাসি! এ-ভালোবাসার কথা আমার মুখের দাবি নয়- এর ঘোষণা দিয়েছেন আল্লাহ্ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে এই বলে-
جبل أحد يحبنا ونحبه وهو من جبال الجنة
ওহুদ পাহাড় ভালোবাসে আমাদেরকে আমরাও ভালোবাসি তাকে। ওহুদ জান্নাতের একটি পাহাড়।

যুদ্ধ যখন ওদের হাতের মুঠোয় চলে গিয়েছিল তখন আমি তাঁদের পেছন দিকে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম-যে! কিন্তু মুসলিম উম্মাহর জন্যে আমি একটি শিক্ষাও বটে। এ-শিক্ষা হলো- সেনাপতির নির্দেশ অলঙ্ঘনীয়। পাশাপাশি এ-শিক্ষাও লুকিয়ে আছে আমার চোখের সামনে ঘটে-যাওয়া এ যুদ্ধে- যদি থাকে ইসলামের আদর্শের জন্যে আত্মনিবেদনের দৃঢ় প্রত্যয় ও দীপ্ত অঙ্গীকার, তাহলে হাজার বিপর্যয়েও সাফল্য অনিবার্য! যুদ্ধের হিসাবে মুসলিম বাহিনী সীমাহীন ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আত্মনিবেদনের এ-প্রত্যয়ই শেষ পর্যন্ত তাঁদেরকে সব বিপর্যয় কাটিয়ে বিজয় পাইয়ে দিয়েছিল।

হ্যাঁ, আমি এখনো আছি। ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে, সেই ত্যাগময় বীরত্বময় যুদ্ধের সাক্ষী হয়ে। দাঁড়িয়ে আছি একেবারে মদীনার কোল ঘেঁষেই। আমাকে যারা দেখতে আসে, আমার পাশে শুয়ে থাকা শহীদানের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে যারা অশ্রু ঝরায়, বাতিলের মুকাবিলায় জীবনপণ লড়াইয়ের শপথ নেয়, তাদের কানে কানে আমার বলতে ইচ্ছে করে- তোমরাও বুঝি আমাকে ভালোবাসো, নবীকে ভালোবাসো, নবীর সাহাবীদেরকে ভালোবাসো!

তাহলে শোনো- আমিও তোমাদেরকে ভালোবাসি!

টিকাঃ
১. إن رأيتمونا تخطفنا الطير فلا تبرحوا مكانكم هذا حتى أرسল إليكم وإن رأيتمونا هزمنا القوم وأوطأناهم فلا تبرحوا حتى أرسل إليكم . (صحيح البخاري)

📘 গল্পে আঁকা সীরাত হে মুহাম্মদ > 📄 আমি একটি পাথরখণ্ড

📄 আমি একটি পাথরখণ্ড


পাথরখণ্ড! তোমরা তো জানোই, সে ভীষণ শক্ত ও কঠিন। টলে যায় না, গলে তো যায়ই না। কুঠারাঘাতেও তা ভেঙে পড়তে চায় না, একটু কেঁপেও ওঠে না। কিন্তু আমি কোন্ পাথরখণ্ড? কোথায় আমার অবস্থান? হ্যাঁ.. এ-সব বলতেই তোমাদের সামনে 'হাজির' হয়েছি। শোনো আমার কাহিনী—

আমার অবস্থান মদীনার কাছেই। এখানে অবস্থান করেই আমি দেখেছি মদীনার দিন-রাত, তার অসংখ্য ঘটনা-প্রবাহ। আরো দেখেছি হিজরতের আগের মদীনা এবং হিজরতের পরের মদীনা। হিজরতের পর মদীনা কতো বদলে গিয়েছে। আল্লাহ্ রাসূলের আগমনে মদীনা যেনো রূহ পেয়েছে। মদীনার খেজুর বাগানে যেনো নতুন করে শ্যামলিমা ফিরে এসেছে।

আমি শুনেছি বদরের ঐতিহাসিক বিজয়ের কথা। আমি আরো শুনেছি ওহুদের রক্তঝরা বিজয়ের কথা। আমি আরো শুনেছি ইহুদীদের ষড়যন্ত্রের কথা। দ্বিমুখী আচরণের কথা। ওদের অমার্জনীয় বজ্জাতির কথা। কানে কানে শুনেছি আর মর্মে মর্মে জ্বলেছি। মানুষ এতো বজ্জাত হয়? মানুষ এতো বিদ্বেষী হয়?!

এখন আমি তোমাদেরকে বলবো খন্দক যুদ্ধের কাহিনী। এ খন্দক যুদ্ধের ইন্ধনদাতা ছিলো এই বজ্জাত ইহুদীরা। এরা বদর-ওহুদের পর গোপনে গোপনে মদীনার বিভিন্ন গোত্রে ঘুরে ঘুরে মানুষকে আল্লাহ্র রাসূলের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলছিলো। এভাবে মদীনায় ষড়যন্ত্রের বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিয়ে ওরা গিয়েছে মক্কায়, ঐ একই উদ্দেশ্যে। সেখানে গিয়েও তারা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিরুদ্ধে কোরাইশসহ বিভিন্ন গোত্রকে উসকে দিতে লাগলো। একটা চূড়ান্ত লড়াইয়ে সংঘবদ্ধভাবে ঝাঁপিয়ে পড়তে সবাইকে প্ররোচিত করতে লাগলো। তারা সবাইকে এ-কথাও বিশ্বাস করাতে চাইলো যে, যদি সবাই এখন কোরাইশের নেতৃত্বে সংঘবদ্ধ হয়ে মদীনা আক্রমণ করে, তাহলে ইসলাম ও মুসলমানরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। আর যদি কেউ তাদের এ-ডাকে সাড়া না দেয়, তাহলে কেউ-ই বাঁচতে পারবে না, কোনোদিন তারা কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারবে না। ভবিষ্যত হবে শুধু মুসলমানদের। নেতৃত্ব হবে কেবল মুহাম্মদের।

ইহুদীরা এ-অপতৎপরতায় সফল হলো। কোরাইশ নেতা আবু সুফিয়ানসহ সব গোত্র-নেতাই তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিলো— শিগগির তারা মদীনা আক্রমণ করবে। এই আশ্বাস পেয়ে ইহুদী প্রতিনিধি দলটি মদীনায় ফিরে এলো, অভিযান সাফল্যের তৃপ্তি নিয়ে। এরপর তারা ভিতরে ভিতরে অপেক্ষা করতে লাগলো কখন আসবে আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বাধীন বিশাল সম্মিলিত আরব বাহিনী।

বেশী দিন অপেক্ষা করতে হলো না। তারা খবর পেলো যে, আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে দশ হাজারের এক বিশাল বাহিনী মদীনার দিকে ধেয়ে আসছে। আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও কোরাইশসহ অন্যান্য গোত্রের মদীনা আক্রমণের মহা রণপ্রস্তুতির কথা এবং মদীনার দিকে ওদের ধেয়ে আসার খবর যথা সময়েই জানতে পারলেন। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে ইসলামের নবী জরুরী পরামর্শসভা তলব করলেন। সাহাবীদের কাছে তিনি জরুরী পরামর্শ চাইলেন— কেমন করে এই বিশাল বাহিনীকে প্রতিহত করা যায়। মদীনার ভিতরে থেকেই না মদীনার বাইরে গিয়ে। হযরত সালমান ফারসী রা. এক গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিলেন। তিনি বললেন: -আমরা মদীনার ভিতরে থেকেই শত্রুকে প্রতিহত করতে পারবো, ইনশা আল্লাহ। আমরা মদীনাকে একটি সুরক্ষিত দূর্গে পরিণত করবো। আর এ জন্যে আমাদেরকে শুধু মদীনার অরক্ষিত জায়গাটিতে একটি পরিখা¹ খনন করতে হবে। তাহলে দুশমন সংখ্যায় যতো বেশীই হোক, কিছুতেই সেই পরিখা অতিক্রম করে মদীনা আক্রমণ করতে পারবে না। আমাদের কাছে ঘেঁষতে চাইলে কঠিন মূল্য দিতে হবে তাদেরকে, আমাদের প্রচণ্ড 'তীরবৃষ্টি'র মুখোমুখি হতে হবে তাদেরকে। আল্লাহ্র রাসূল এই প্রিয় সাহাবীর পরামর্শ খুব পছন্দ করলেন এবং অবিলম্বে সবাইকে নিয়ে পরিখা খননের কাজও শুরু করে দিলেন।

পরিখা- সে মোটেই সহজ কাজ ছিলো না। এই কঠিন বিশাল ও অচেনা কাজটি করতে সাহাবীদেরকে সীমাহীন কষ্ট করতে হয়েছিলো। আল্লাহ্ নবীও বসে থাকেন নি, এ-কাজে পুরোদমে প্রিয় সাহাবীদেরকে তিনি সহযোগিতা করেছেন। একেবারে 'মাটি-কাটা কামলা'র বেশে তিনিও লেগে গেলেন মাটি খোঁড়ায়। টুকরি ভরে ভরে মাটি উপরে তুলতে লাগলেন অন্য সবার মতো। ধুলো আর মাটিতে ঢেকে গিয়েছিলো তাঁর সাদা পেট! কর্মব্যস্ত নবী সাহাবীদেরকে উৎসাহ দিতে আবৃত্তি করছিলেন এই কালজয়ী কবিতা-

اللهم لولا أنت ما اهتدينا ولا تصدقنا ولا صلينا فأنزلن سكينة علينا وثبت الأقدام إن لاقينا إن الأعادي قد بغوا علينا وإن أرادوا فتنة أبينا

'হে আল্লাহ! যদি না পেতাম তোমার হিদায়াত, কী করে তোমার পথে করতাম দান আর পড়তাম নামায! এখন চাই আমাদের উপর বর্ষিত হোক তোমার শান্তিধারা। আর অটল-অবিচল রেখো আমাদেরকে দুশমনের মুকাবিলায়। মুশরিকরা আমাদের বিরুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে ষড়যন্ত্রে। কিন্তু কী হয়েছে তাতে? তারা বিশৃঙ্খলা চাইলেও আমরা তো আর চাইতে পারি না!'

পনের দিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পর শেষ হলো গভীর পরিখা বা খাদ খননের কাজ। তিন হাজার গজ দীর্ঘ এবং পাঁচ গজ গভীর। প্রস্থটাও একেবারে কম ছিলো না, সৈন্য বলো আর ঘোড়া বলো, কারো পক্ষেই তা অতিক্রম করা সম্ভব ছিলো না। তবে খনন কাজ এক জায়গায় এসে আটকে পড়লো। ঐ দিকটায় ছিলাম আমি—পাথর খণ্ড। এখানে খননের দায়িত্ব পড়ে ছিলো পরামর্শদাতা হযরত সালমান ফরসী রা. এবং একদল সাহাবীর। হযরত সালমান রা. অনেক ঘাম ঝরিয়েও আমার কিছুই করতে পারলেন না। যেমন ছিলাম তেমনি রইলাম। আগেও আমি তোমাদেরকে বলেছি, আমি ভীষণ শক্ত ও কঠিন। অগত্যা তিনি ছুটে গেলেন নবীজীর কাছে, ঘামতে ঘামতে। 'অভিযোগ' জানালেন আমার অটলতা ও অনড়তার বিরুদ্ধে! নবীজী সব শুনে এগিয়ে এলেন। হযরত সালমানকে একটু পানি আনতে বললেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি পানি নিয়ে এলেন। আল্লাহ্র রাসূল তখন পানির পাত্রটা হাতে নিয়ে আমার গায়ে কিছুটা পানি ঢেলে দিলেন! তখন আমার মনে হলো, তাঁর পবিত্র হাতের সেই বারি-শীতলতায় আমার ভিতরটা মধুর এক সঞ্জীবনীতে প্রাণোচ্ছল হয়ে উঠেছে! পাশাপাশি আমার ভিতর থেকে যেনো একটা আওয়াজ শুনতে পেলাম আমি—সাবধান! এখন বিসর্জন দিতে হবে তোমার অনড়তা-কঠোরতা! এখন কুঠার হাতে নেবেন প্রিয় মুহাম্মদ! নরম হও, ভেঙে পড়ো! এখন নবীজীর আঘাতে আঘাতে তুমি দ্যুতি ছড়াবে। সে দ্যুতিতে দ্যুতিময় হয়ে ওঠবে সুদূর শামের লাল প্রাসাদগুলো—তাঁর চোখের সামনে! আরো ভেসে ওঠবে পারস্যের শুভ্র প্রাসাদগুলো—তাঁর চোখের সামনে! আরো ভেসে ওঠবে সান'আর প্রবেশদ্বার!

হযরত সালমানের কাছ থেকে কুঠারটা নিলেন আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তারপর আঘাত করলেন- একবার! দুইবার!! তিনবার!!! প্রথম আঘাতে ভেঙে গেলাম কিছুটা! দ্বিতীয় আঘাতে ভেঙে গেলাম আরো কিছুটা!! তৃতীয় আঘাতে ভেঙে গেলাম পুরোটা!!! প্রতিটি আঘাতের সঙ্গে সঙ্গে একটা বিদ্যুত-ঝলকে আলোকিত হয়ে উঠছিলো কুঠারের নিচটা এবং আশপাশ! তৃতীয় আঘাতে আমি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়তেই সমবেত সাহাবীরা হর্ষধ্বনি করে উঠলেন- আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার!! আল্লাহু আকবার!!!

পরিখা খনন শেষ হতে-না-হতেই ১০ হাজার বাহিনীর বিশাল বহর নিয়ে সম্মিলিত আরব বাহিনীর সর্বাধিনায়ক আবু সুফিয়ান পৌঁছে গেলেন। কিন্তু পরিখার পাড়ে এসে তিনি সবিস্ময়ে থমকে দাঁড়ালেন! এ অভিনব যুদ্ধ-কৌশল দেখে দৃষ্টি তার ছানাবড়া! তাঁর বিস্ময়ভরা চোখ যেনো বলছিলো- এটা পেরিয়ে মদীনা আক্রমণ করা কী করে সম্ভব! এ-পরিখা অতিক্রমের চেষ্টা, সে-তো আরো কঠিন! কারণ ওপারেই দাঁড়িয়ে আছে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)- এর নেতৃত্বে ৩ হাজার বীর লড়াকু সাহাবী, তীর তলোয়ার নিয়ে! রাতের অন্ধকারে অবশ্য পরিখা পার হওয়ার একটা চেষ্টা করা যায়, কিন্তু সেখানেও তো বিপদ, মহা বিপদ। কারণ তখনো নিশ্চিত কেঁপে আসবে তীরবৃষ্টি! একে তো গভীর খাদ পেরোনোর প্রশ্ন, দ্বিতীয়ত: রাতের অন্ধকার, তৃতীয়ত: হাজার হাতের ঝড়ো বেগের তীরবৃষ্টি, সাথে আছে হাড়-ভেদ-করা প্রচণ্ড ঠাণ্ডা! নাহ, সব এলোমেলো মনে হচ্ছে! আমরা পৌঁছতে কি দেরী করে ফেললাম!

কিন্তু সেনাপতি ঘাবড়ালেন না। পিছু হটারও চিন্তা করলেন না। বরং খাদের এ-পাড়ে বসে অবরোধ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিলেন। দিশেহারা সম্মিলিত আরব বাহিনী'র সামনে এ ছাড়া আর কোনো পথও ছিলো না। সুতরাং তারা অবরোধ গড়ে তুললো। ক্ষণে ক্ষণে চলতে লাগলো উভয় পক্ষের মাঝে তীর বিনিময়। এভাবে বিশ দিন কেটে গেলো। অবরোধ ধীরে ধীরে কঠোর হতে লাগলো। মুসলিম শিবিরে খাদ্য সঙ্কট দেখা দিলো। অনাহারে অর্ধাহারে কাটতে লাগলো- কষ্ট-প্রহর। ত্যাগ-প্রহর। ধৈর্য-প্রহর।... এদিকে এ সঙ্গিন অবস্থায় এলো আরেক দুঃসংবাদ, ভয়াবহ দুঃসংবাদ! নবীজী জানতে পারলেন যে, চুক্তি ভেঙে মদীনার ইহুদীরা মুশরিক বাহিনীর সাথে যোগ দিয়েছে! পেছন দিক থেকে মুসলমানদের উপর হামলা করারও তারা ষড়যন্ত্র করছে! ওদের আচরণ বদলে গেছে। ওদের ভাষাও বদলে গেছে। যে কোনো মুহূর্তে ওরা হামলে পড়তে পারে। সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন। বিপদের উপর বিপদ, মহা বিপদ! শত্রুর পাশে শত্রু, মহা শত্রু! সামনে শত্রু, পেছনে শত্রু! দুশ্চিন্তায় আশঙ্কায় মুসলমানদের লবেজান অবস্থা! দৃষ্টি তাদের বিস্ফারিত! প্রাণ তাদের কণ্ঠাগত! মনে তাঁদের প্রশ্ন- আল্লাহ্ সাহায্য কখন্ আসবে? সাহায্য কি আসবে না?! বিপদ কি কাটবে না?! আরশ কি দোলবে না?!

আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো নবী। আল্লাহ্ পক্ষ থেকে সাহায্যপ্রাপ্ত। তাই তিনি ভেঙে পড়লেন না। হতাশ হলেন না। দক্ষতার সাথে, প্রজ্ঞার সাথে পরিস্থিতি সামাল দিতে লাগলেন। দ্রুত ইহুদীদের দিকটায় সতর্ক ও শক্ত প্রহরা বসিয়ে দিলেন। অন্য দিকে তিনি কথা বলছিলেন আরব বাহিনীর বিভিন্ন গোত্রের সাথে, সন্ধি নিয়ে। আরেক দিকে শুনাচ্ছিলেন মুসলমানদেরকে সুসংবাদ, বিজয়ের সুসংবাদ। তবে শর্ত হলো, তাদেরকে সবর করতে হবে। অবিচল থাকতে হবে। আল্লাহ্ নবী দু'আও করতে লাগলেন। আল্লাহ্র সকাশে সকাতর প্রার্থনায় অশ্রুতে ভেসে যেতে লাগলেন। উত্তাপময় গলায় তিনি বলছিলেন—

اللهم منزل الكتاب، سريع الحساب اهزم الأحزاب، اللهم اهزمهم وزلزلهم.

'হে আল্লাহ! তুমিই তো নাযিল করেছো কুরআন! তুমিই তো দ্রুত বিচার-আদালতের আহকামুল হাকিমীন মহা বিচারক! এই সম্মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করো! আমার আল্লাহ! তুমি এদেরকে পরাজিত করো! এদের ভিত কাঁপিয়ে দাও!'

হাজার হাজার দুশমন, কূটিল কূটিল ষড়যন্ত্র, বাইরের দুশমন, ভিতরের দুশমন, বাইরের ষড়যন্ত্র, ভিতরের ষড়যন্ত্র- সব ভেদ করে আল্লাহ্ সাহায্য নামতে লাগলো! সদ্য ইসলাম কবুল করা সাহাবী নু'আইম ইবনে আবদুল্লাহর সহযোগিতায় আল্লাহ্র রাসূল ইহুদী শিবির এবং কোরাইশ শিবিরের মধ্যে অবিশ্বাস অনাস্থা ও সন্দেহ তৈরী করে তাদের ঐক্যে বিরাট ফাটল ধরিয়ে দিলেন। পাশাপাশি আসমান থেকেও নেমে এলো সাহায্য, মহা সাহায্য! এ সাহায্যের নাম- বৃষ্টি! কেমন করে বৃষ্টি নামলো? টাপুর-টুপুর কিংবা রিমঝিম? না, বরং বৃষ্টি নামলো- দমকা হাওয়ায় 'পাগল' হয়ে, মাতাল হাওয়ায় 'দানব' হয়ে! প্রবল বেগে বয়ে গেলো তা গভীর রাতের তিমির আঁধারে! 'পরশ' বুলিয়ে গেলো আরব বাহিনীর তাঁবুতে! সে পরশে সব তছনছ হয়ে গেলো, লণ্ডভণ্ড হয়ে গেলো! শত শত তাঁবু সেই ঝড়ো হাওয়ার তাড়া খেয়ে কোন্ দিকে-জে ছুটে গেলো, তার আর কোনো হদিসই রইলো না। রান্না করে খাওয়ার জন্যে সঙ্গে নিয়ে-আসা হাড়ি-পাতিলগুলোরও একই দশা! ভয়ে কম্পনে সেনাপতি আবু সুফিয়ানসহ সবার অবস্থা আরো করুণ, আরো অবর্ণনীয়! তাই রাতটা শেষ হতে-না-হতেই সেনাপতি আবু সুফিয়ান বাকিদেরকে এক রকম না-বলেই সসৈন্যে মক্কার পথ ধরলেন— পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে! ঝড়ো বৃষ্টির তাড়া খেয়ে!! দুঃসহ সব স্মৃতি নিয়ে!!!

টিকাঃ
১. অর্থাৎ মাটি কেটে গভীর খাদ তৈরী করা

📘 গল্পে আঁকা সীরাত হে মুহাম্মদ > 📄 আমি বকরী বলছি

📄 আমি বকরী বলছি


আমি আমার স্বামীকে নিয়ে মুক্ত মরুর বুকে বেশ ছিলাম। মেষপালের সাথে ঘুরে বেড়াতাম হলুদাভ মরুবালির মাঝে। সেখানে রাখালেরা আমাদেরকে নিয়ে চষে বেড়াতো সবুজ ঘাসের খোঁজে, একটু পানির তালাশে, কোনো কূপের সন্ধানে। মেষপালেরা সময় কাটাতো যতোটা না ঘাস-পানিতে, তারচে' বেশী ছোটোছুটিতে। কখনো তারা কান খাড়া করে শুনতো রাখালের বাঁশি। কখনো আবার ভীড় করতো মক্কার রাখালের গল্প শুনতে। মক্কার রাখালের নাম মুহাম্মদ। বাল্যকালে তিনি রাখালি করেছেন। বকরী ও উট চরিয়েছেন মক্কার পাহাড়ি উপত্যকায়।

এই রাখাল-বন্ধু-মুহাম্মদের কথা আমরা যতো শুনতাম ততোই ভালো লাগতো। শুনে শুনে কান ভরতো কিন্তু মন ভরতো না। তাঁর উন্নত চরিত্র, তাঁর মানবতা, তাঁর আমানতদারী আমাদেরকে ভীষণ মুগ্ধ করতো। তাঁর কথা শুনতে শুনতে আমরা না- দেখেই তাঁকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম। আমরা আমাদের রাখালের মুখে শুনেছি, মুহাম্মদ যখন মেষ চরাতেন তখন মেষগুলোকে খুব আদর করতেন। সারাক্ষণ ওদেরকে চোখে চোখে আগলে রাখতেন। দলছুট হয়ে কোনো মেষ দূরে কোথাও চলে গেলে পেছনে পেছনে তিনিও ছুটে যেতেন, আদর করে ধরে আনতেন। কোথায় গেলে কী করলে ঘাস পাওয়া যাবে, পানি পাওয়া যাবে- এ নিয়েও তাঁর ব্যাকুলতার কোনো সীমা ছিলো না। অন্য রাখাল ছেলেদের মতো দৌড়-ঝাঁপ ও খেলাধুলায় তাঁর মন ছিলো না। বরং নিজের মেষপালের পেছনেই তিনি সময় দিতেন। ফলে নেকড়ে বলো আর ঐ শৃগাল বলো, কেউ কাছে ভিড়তে সাহস পেতো না। কখনো কোনো ভেড়া ক্লান্ত হয়ে গেলে তিনি তাকে পথচলায় সাহায্য করতেন, তার ব্যাপারে আলাদা গুরুত্ব দিতেন। আর এই ক্লান্তিটা অসুস্থতায় রূপ নিলে তিনি শুধু সাহায্যই করতেন না একেবারে তাকে কাঁধে করে গৃহে ফিরে আসতেন। তারপর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা দিয়ে তাকে সুস্থ করে তুলতেন। সুস্থ হয়ে আবার ঐ মেষটা যখন ছুটোছুটি করতো, দলের সাথে লাফিয়ে লাফিয়ে আনন্দ প্রকাশ করতো, তখন গিয়ে তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতেন। সুস্থতার পর মেষদের এই-যে লাফালাফি ও আনন্দ প্রকাশ, সেও যেনো রাখাল মুহাম্মদকে ঘিরেই ছিলো। ওরা যেনো তাদের প্রিয় রাখালকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলতো-

হে মুহাম্মদ! পেয়েছি তোমার সেবা! হয়েছি আমরা সুস্থ! এই দেখো এখন কেমন সুন্দর লাফাচ্ছি! শরীরে কী শক্তি শক্তি লাগছে! যেনো অসুখই ছিলো না আমাদের! এইসব হে মুহাম্মদ, বরকত তোমার! তুমি কতো ভালো! রাখালদের সেরা রাখাল! তোমাকে ধন্যবাদ, অনে-ক ধন্যবাদ! মুহাম্মদ ছিলেন আসলেই এক বরকতময় রাখাল। একটা দিনের জন্যেও তাঁর মেষপালকে না-খেয়ে কিংবা পেটে খিদে নিয়ে ফিরতে হয় নি। মুহাম্মদ যেখানেই মেষ চরাতেন সেখানেই নেমে আসতো আল্লাহ্ পক্ষ থেকে বরকত। ঘাস-পানির কোনো অভাব হতো না। তাই মুহাম্মদের মেষপালের স্বাস্থ্য ছিলো যেমন সুঠাম-সতেজ তেমনি দুধও দিতো তারা প্রচুর।

হ্যাঁ, এ-সব কারণেই আমরা মুহাম্মদকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম। তাঁর নতুন ধর্মের কথাও আমাদের কানে এসেছে। আমরা শুনেছি, মক্কার সেই রাখাল-বন্ধু এখন নবী হয়েছেন, প্রথমে মক্কার মানুষকে এক আল্লাহ্র ইবাদতের দিকে ডেকেছেন। কিন্তু এতে কোরাইশ তেমন সাড়া দেয় নি। উল্টো তাঁকে এবং সাহাবীদেরকে কষ্ট দিয়েছে। ঈমান বাঁচাতে তাঁরা দেশছাড়া হতে বাধ্য হয়েছেন। সে সব কথা তোমরা জেনে এসেছো। এখন আমি মদীনার ইহুদীদের বজ্জাতি ও শত্রুতার কথা তোমাদেরকে বলবো। পরে আমার নিজের একটা কাহিনী বলবো।

ইহুদীরা সব সময় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিরুদ্ধে এ কথা সে কথা বলে বেড়াতো। আসলে ইসলামের আগমনে এই বজ্জাতরা ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলো। তাদের এই ভয়— নিজেদের ধর্ম নিয়ে, নিজেদের সম্পদ নিয়ে, নিজেদের সরদারি ও কর্তৃত্ব নিয়ে, নিজেদের ভবিষ্যত নিয়ে। তাই এরা গোপনে গোপনে মানুষকে আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিরুদ্ধে উসকে দিতে লাগলো। তাঁর বিরুদ্ধে নানা রকম ষড়যন্ত্র করতে লাগলো। আমরা সবাই দুশমনের অনিষ্ট ও ষড়যন্ত্র থেকে তাঁর মুক্তি কামনা করছিলাম। তাঁর জয় কামনা করছিলাম। তাঁর প্রচারিত ইসলামের প্রসার কামনা করছিলাম। করবো না কেনো? তিনি যে সত্যবাদী, বিশ্বস্ত! তিনি যে সবার প্রতি—সবকিছুর প্রতি দয়ালু! অতি দয়ালু!

এবার শোনো আমার নিজের কাহিনী—
আমি একটু আগেই চারণভূমি থেকে ফিরেছি। মনটা ছিলো ভীষণ ফুরফুরে। একটা অজানা আনন্দে আমি ভাসছিলাম। আমার মনের জগতে কী যেনো একটা ফিসফিসানি আমি শুনতে পেলাম, যা শব্দায়িত হলে ভাবটা হতো এমন— ঐ দেখো, চারণভূমি থেকে ফিরে এসেছে ভাগ্যবান বকরীটা! হায়! আমাদেরও যদি এমন ভাগ্য হতো!

আমি ধীরে ধীরে আমার মালিকের নিকটবর্তী হচ্ছি আর এই ফিসফিসানিটা ততোই এসে আমার কানে বাজছে। আমার মনকে আলোড়িত করছে! আমি থমকে দাঁড়াই, ভাবি— এমন তো আগে কখনো হয় নি! কিসের এই ফিসফিসানি? কেনো আমি এখন এতো আলোড়িত অনুভব করছি? অবশ্য আমার মালিকের কাছে যেতেই রহস্যটা উন্মোচিত হলো! কী রহস্য আবার? আরেকটু খুলে বলছি—

আমার মালিক ছিলেন এক ইহুদী নারী। আমি তার কাছে এসেই জানতে পারলাম, তিনি আজ মুহাম্মদকে একটা বকরী রান্না করে খাওয়াবেন এইখানে—তার বাড়িতে। আর সেই বকরীটি হলাম আমি! আনন্দ-শিহরণে আমার তনুমন দুলে উঠলো! আমি আত্মহারা হয়ে গেলাম! আমি আমার 'প্রাণী-অস্তিত্ব' নিয়ে অমন বিরলতম সৌভাগ্য ও বিমলতম আনন্দ লাভ করবো— ওহ! ভাবতেই পারছি না!! এতোক্ষণে বুঝলাম আমার কানের কাছে কেনো বাজছিলো ঐ ফিসফিসানি!

কিন্তু আমি প্রিয় মুহাম্মদের খাদ্য হতে যাচ্ছি—তাঁর রক্ত-মাংসের সাথে মিশে একাকার হতে যাচ্ছি— এটা আমার হৃদয়ে আনন্দ-অনুভূতির একটা মধুর শিহরণ সৃষ্টি করলেও একটু পরই তা একটা উদ্বেগজনক কালো আশঙ্কার ছায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেলো!! আমার আতঙ্কগ্রস্ত মন বললো- নিশ্চয়ই কোথাও গোলমাল আছে! আমার সজাগ প্রাণী-অনুভূতি জেগে উঠলো! অনুসন্ধান শুরু করে দিলো! এক ইহুদীনি কেনো ইসলামের নবীকে বকরী খাওয়াতে যাবে?! এ কি ভালোবাসা না ষড়যন্ত্র? ভালোবাসা তো হতেই পারে না! কারণ এই ইহুদীনি কেনো, সব ইহুদীর মনই তো ইসলাম-বিদ্বেষে ঠাসা?!

আমি কেঁপে উঠলাম! আমি শিউরে উঠলাম!! শত শত শঙ্কা আমার মনের একটু আগের কোমল অনুভূতিটাকে দুমড়ে মুচড়ে দিলো! বরং মুহূর্তেই তা এক মহা শঙ্কায় রূপ নিলো! আমি নিশ্চিত হয়ে গেলাম, আমার মালিক কোনো গভীর চক্রান্তে লিপ্ত। এক ইহুদীনি ইসলামের নবীর কল্যাণ চাইতে পারে না-তাকে বকরী হাদিয়া দিতে পারে না। আমি চারদিকে অন্ধকার দেখতে লাগলাম। নবীজীর কোনো ক্ষতি হয়ে যেতে পারে- এ আশঙ্কায় আমি নিঃশব্দে আর্তনাদ করতে লাগলাম! একটু পরই কসাই এসে গেলো। তড়িৎ গতিতে সব করে ফেললো। চুলোয় আগুন জ্বালানো হলো। আমাকে চুলোয় চড়ানো হলো! আমি ভুনা হতে লাগলাম। একটু পর! হ্যাঁ, একটু পরই আমার গায়ে কী যেনো একটা ছিটিয়ে দিলো আমার মালিক, সাথে সাথে আমার সারা অঙ্গে প্রচণ্ড জ্বালা শুরু হয়ে গেলো! একটু পরই আমার কাছে পরিস্কার হয়ে গেলো যে আমার মধ্যে মারাত্মক বিষ মেশানো হয়েছে, আর তা করা হয়েছে প্রিয় মুহাম্মদকে হত্যা করার জন্যেই! কেননা এটা পরিস্কার যে, আমার এ বিষ-মেশানো খানিকটা অংশ কারো পেটে গেলে তার বেঁচে থাকা অসম্ভব! আগুনে আমি পুড়ছিলাম ঠিকই, কিন্তু তাতে যতোটা না যন্ত্রণা হচ্ছিলো, তারচে' হাজার গুণ বেশী যন্ত্রণা হচ্ছিলো আমার- সেই বিষের নীল দংশনে! আমি বিষ-দংশনে জ্বলতে জ্বলতে.. নীল হতে হতে আগুনে জ্বলার কথা ভুলে গেলাম! আমি এখন আর আমার কথা ভাবছি না, ভাবছি শুধু আল-আমীনের কথা। আমার মুহাম্মদের কথা। আমার রাখাল বন্ধুর কথা। এই খবিস মহিলা তো এখন একটু পরই এই বিষের জ্বালা ও নীল-বেদনা ছড়িয়ে দেবে তাঁর দেহেও! আমার জন্যে সবচে' বেদনাদায়ক হলো, আমি মুহাম্মদকে বাঁচাতে পারবো না! তাঁর সাহাবীদেরকেও বাঁচাতে পারবো না! উল্টো আমিই হায়, আমিই তাঁদের বিষাক্ত মৃত্যুর, নীল মৃত্যুর কারণ হবো! আল্লাহ! তুমি সাহায্য করো! আল্লাহ! তুমি রক্ষা করো!!

একটু পর মেজবানরূপী ইহুদীনি এগিয়ে এলো। আমাকে নবীজী ও সাহাবীদের সামনে এনে রাখলো। তখন তার মুখে লেগে ছিলো মেজবানের নির্মল হাসি কিন্তু হৃদয়ে ছিলো শত্রুর জিঘাংসা। সাহাবীদের মধ্যে হযরত বিশর ইবনে বারা রা. নবীজীর আগেই হাত বাড়ালেন আমার দিকে। গোশত খেতে উদ্যত হলেন। এমনকি এক টুকরো মুখেও দিয়ে দিলেন। আমি অন্ধকার দেখতে লাগলাম। আমি তাঁকে বলতে চাচ্ছিলাম— বিশর! কেনো তুমি নবীজীর আগেই খেতে শুরু করলে? কিন্তু তিনি তো আমার কথা শুনবেন না, শোনা সম্ভবও না। কিন্তু খোদ নবীজীও যখন খাওয়া শুরু করলেন, তখন আমি আর স্থির থাকতে পারলাম না, আমার কোনো ভাষা নেই, আমি এক নির্বাক প্রাণী— এ-সব ভাবার আর অবকাশ পেলাম না, বরং ঠিক বাকসম্পন্ন মানুষের মতোই জোরে চিৎকার করে উঠলাম—

'আমি বিষাক্ত! আমি বিষাক্ত!! আমি বিষাক্ত!!!'

সে ছিলো এক মহা বিস্ময়! আমি লক্ষ্য করলাম যে আল্লাহ্র নবী মুখে-পুরা টুকরোটি সাথে সাথে ফেলে দিলেন! সাহাবায়ে কেরাম অবাক চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন! তিনি কি তাহলে আমার আওয়াজ শুনতে পেয়েছেন! আল্লাহু আকবার! এমনটা হবে আমি ভাবতেই পারি নি! আসলে এটা ছিলো আল্লাহ্র কুদরত! তাঁর নবীর মু'জিযা! নইলে আমি কেনো কথা বলবো? তিনি কেনো শুনবেন? স-বই আল্লাহ্র ইচ্ছায় হয়েছে! আল্লাহ চেয়েছেন আমি 'বিষ! বিষ!' বলে চিৎকার করে উঠবো, আর তিনি তা প্রিয় নবীর কানে পৌঁছে দেবেন! তাই হয়েছে! আল্লাহ তাই করেছেন! আল্লাহ সব করতে পারেন! নিষ্প্রাণ বকরীকে দিতে পারেন কণ্ঠ! সে কণ্ঠ পৌঁছে দিতে পারেন নবীজীর কানে! আল্লাহ্র রাসূল সাথে সাথে বলে উঠলেন: -হাত ওঠাও! কেউ খাবে না! এ গোশত বিষাক্ত!

সবাই হাত উঠিয়ে ফেললেন। কিন্তু হযরত বিশর ইবনে বারা রা. আগেই খেয়ে ফেলেছিলেন! তীব্র বিষক্রিয়ায় তিনি ঢলে পড়লেন মৃত্যুর কোলে-শাহাদতের সবুজ বিছানায়! নবীজীকে সতর্ক করতে পারার আনন্দে আমার হৃদয় উল্লাস করলেও এই সাহাবীর মৃত্যুতে আমি ছিলিম নীরব অশ্রুময়! নবীজীও বিশরের মওতে খুব দুঃখ পেলেন। তিনি শোকমথিত কণ্ঠে ঐ ইহুদীনিকে ডেকে জানতে চাইলেন: -কেনো তুমি এমন করলে?

মহিলাটা তখন জবাবে বললো: -আমি দেখতে চেয়েছিলাম, তুমি আসল নবী না ভণ্ড নবী! আসল নবী হলে বিষ তোমার কোনো ক্ষতিই করতে পারবে না! আর যদি মিথ্যা নবী হও, দুনিয়ার রাজত্বের জন্যে নবী হওয়ার দাবি করে থাকো, তাহলে সব মানুষ তোমার হাত থেকে বেঁচে যাবে, তোমার মৃত্যুর ভিতর দিয়ে!

এই ইহুদীনি তো তাহলে বুঝতে পেরেছিলো- মুহাম্মদ ছিলেন সত্যিকারের নবী। তাহলে কি সে তাঁকে নবী বলে মেনে নিয়েছিলো? অসম্ভব! ইহুদীরা এমনই! সত্য প্রকাশ পাওয়ার পরও ওদের কপালে হিদায়াত জুটে না। ওরা ইসলামের চিরদুশমন, চির ইসলাম-বিদ্বেষী। এরপর আমাকে দাফন করে দেয়া হলো বালির বুকে। সমাধিস্থ হওয়ার পর আমি অনুভব করলাম চরম এক সুখ, অবর্ণনীয় এক প্রশান্তি। আহা! সেই সুখ ও প্রশান্তি জীবনে আমি আর কখনো অনুভব করি নি! এ নিশ্চয়ই আল্লাহ্ নবী'র প্রতি আমার ভালোবাসা ও দায়িত্ব পালনের পুরস্কার! আল্লাহ কতোজনকে কতোভাবে পুরস্কৃত করেন! কিন্তু আমার এ-প্রশান্তি হঠাৎ বেশ হুমকির মুখে পড়ে গিয়েছিলো যখন ঐ বজ্জাত ইহুদিনীকে আমার পাশেই দাফন করা হলো! হায়! ও যদি আমার কাছে সমাহিত না হতো! ওর গা থেকে-যে বিষের গন্ধ আসছে! ও-যে অভিশপ্ত! ও আমার প্রিয় নবীকে বিষ খাইয়ে হত্যা করতে চেয়েছিলো! আমি রাগে ক্ষোভে চিৎকার করে উঠলাম- হে অভিশপ্ত ইহুদিনী! ভোগ করো এবার নবী-হত্যার অপচেষ্টার শাস্তি!!

📘 গল্পে আঁকা সীরাত হে মুহাম্মদ > 📄 আমি সেই খেজুর গাছ

📄 আমি সেই খেজুর গাছ


আমি ছিলাম একটা আস্ত খেজুর গাছই। আরব দেশে খেজুর গাছের অভাব নেই। এর ফল অর্থাৎ খেজুর খেতে ভীষণ মজা ও উপকারী। আরবের মরু রাখালেরা ভর দুপুরের খর-তাপে আশ্রয় নেয় এই খেজুর গাছের শীতল ছায়ায়। ছোট্ট বেলায় যখন মুহাম্মদ মেষ চরাতেন তখন কতো বসেছেন এই ছায়ায়। বয়সে তখন রাখাল মুহাম্মদ ছোট্ট হলে কী হবে, বুদ্ধিতে আচরণে সুচরিত্রে তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়। ছোট ছোট রাখালেরা খেজুর গাছের ছায়ায় এসে বসতো ছোট্ট মুহাম্মদকে ঘিরে। তখন কী শান্ত ভঙ্গিতে, সুবচনে, সুহাসিতে তিনি ওদের সাথে কথা বলতেন। মুগ্ধতায় ভরিয়ে দিতেন ওদের সুকুমার মন-মানস। সবার দৃষ্টি যেনো তখন বলতো—

প্রিয় মুহাম্মদ! তুমি আসলে কে? তুমি কি আমাদের মতো শুধুই রাখাল? মনে তো হয় না! তাহলে আমরা কেনো তোমার মতো অমন সুন্দর করে কথা বলতে পারি না! আমরা কেনো সুনীল আকাশপানে উদাস নয়নে নীলিমা দেখতে দেখতে মুগ্ধ হতে পারি না? আমাদের মেষপাল কেনো তোমার মেষপালের মতো অমন মোটাতাজা ও সুঠাম হয় না! বলো তো, তুমি আসলে কে? এই রাখাল বেশের আড়ালে কে লুকিয়ে আছে? কী লুকিয়ে আছে? সে কি কোনো মহা মানব? সে কি কোনো মহা সূর্য?

সেই বরকতময় শৈশব পেরিয়ে তারপর এলো স্নিগ্ধ কৈশোর তারপর এলো শান্ত যৌবন। মুহাম্মদ বড় হলেন। নবী হলেন। ইসলাম প্রচার করলেন প্রথম তিন বছর গোপনে, তারপর প্রকাশ্যে। তারপর জুলুম-নির্যাতনের মাত্রা যখন বেড়ে গেলো, মক্কায় আর থাকা গেলো না, হিজরত করতে হলো মদীনায়। মদীনায় আসার পরই আমি প্রথম মুহাম্মদকে দেখতে পাই—চোখের দেখা। ধন্য হই তাঁর মোহন পরশে। কেননা এখানে এসে প্রায়ই তিনি আমার গায়ে হেলান দিয়ে বসতেন। সাহাবায়ে কেরামের সামনে ইসলামের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলতেন। কুরআনের আয়াতের তাফসীর করতেন। আমি এবং আমার কাছে বসা সবাই মন দিয়ে তাঁর কথা শুনতাম। নামাজের সময় হলে সেখানে দাঁড়িয়ে তিনি সবাইকে নিয়ে নামাজ পড়ে নিতেন। দু'আ করতেন, আল্লাহ যাতে বাড়িয়ে দেন মুসলমানদের সংখ্যা। সবাই যেনো উঠে আসতে পারে আলোর পথে, হিদায়াতের রাস্তায়। অসার মূর্তিপূজা ত্যাগ করে আশ্রয় নিতে পারে এক আল্লাহ্র ইবাদতের ছায়ায়। আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোযা রাখলে ইফতার করতেন আমারই তাজা খেজুর দিয়ে। সঙ্গে থাকতেন সাহাবীরাও। তখন সাহাবীদের সংখ্যা তো আর বেশী ছিলো না, তাই আমার একার খেজুরই সবার জন্যে যথেষ্ট ছিলো।

আমার বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাহাবীদের সংখ্যাও বাড়তে লাগলো এবং আমি যখন ফলদানে অক্ষম হয়ে গেলাম, আমার সবুজ শাখাগুলোতেও যখন খরা দেখা দিলো, তখন তাঁরা আমাকে কেটে ফেললেন! আমার লম্বা লম্বা শাখাগুলো তাঁরা বিভিন্ন কাজে লাগিয়ে ফেললেন। বাড়ির ছাদে ব্যবহার করে ফেললেন। শুধু আমার গোড়াটা তাঁরা রেখে দিলেন। মাটি থেকে একটু উচ্চতায় আমি যেখানে ছিলাম সেখানেই পড়ে থাকলাম। ভাবতাম, জীবন কতো ছোট্ট! সেদিন-না আমি ছিলাম সবুজ পাতায় ছাওয়া! ফলে-ফলে ভরা! আজ কিছুই নেই! পাতা নেই! ফল নেই! আছে শুধু গোড়াটা! হয়তো এটাও কিছুদিন পরে থাকবে না! মহান সেই সত্ত্বা, যাঁর কোন ক্ষয় নেই, লয় নেই-চিরবিরাজমান!

আমি আগেই তোমাদেরকে বলেছি যে আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদেরকে নিয়ে মাঝে মাঝে আমার এখানে এসে বসতেন এবং তাঁদেরকে দীনি তা'লিম দিতেন। যখন তাঁদের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়তে লাগলো, তখন তিনি তাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলতেন যাতে সবাই তাঁর কথা শোনেন এবং তাঁকে দেখেন। তারপর এ-সংখ্যা যখন আরো বেড়ে গেলো, আল্লাহ্ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার দিকে তাকালেন এবং আমার উপরে এসে দাঁড়ালেন, যাতে একটু দূরে উপস্থিত সাহাবায়ে কেরামও তাঁকে দেখতে পারেন এবং তাঁর কথা শুনতে পারেন। আমি দেখতাম, তাঁর কথা শুনতে শুনতে সবার চোখ অশ্রু-ছলোছলো হয়ে উঠছে। কী গভীর মায়া ও মনোযোগ দিয়ে তাঁরা শুনতেন! এ-ই যেনো তাঁদের কাছে শেষ নবীর শেষ কথা! এ-ই যেনো তাঁদের শেষ শোনা! আমি -খেজুর গাছের অবশিষ্টাংশ গোড়া- আল্লাহ্ নবীর এই মহা সান্নিধ্য পেয়ে বড়ো গর্ববোধ করছিলাম। তিনি যখন আমার উপরে দাঁড়িয়ে উচ্চকণ্ঠে অধিক সংখ্যক সাহাবীকে লক্ষ্য করে কথা বলতেন তখন আমার মনে হতো, আমি ধন্য, চিরধন্য! আগে ছিলো আমার সবুজ সবুজ পাতা, লম্বা লম্বা সবুজাভ শাখা! এখন আমার কিছুই নেই! শুকনো কাঠের মতো পড়ে আছি মাটি কামড়ে। তাতে কী হয়েছে! আমার মুহাম্মদ তো আছেন! তাঁর নিবিড় সান্নিধ্য তো আছে! এখন তিনিই আমার শাখা! কোন্ শাখার জন্যে তবে এখন আমি শোক-তাপ করবো? হারিয়ে যাওয়া সেই শাখার জন্যে, এই মুহাম্মদী শাখার বদলে? না, অসম্ভব! এ-ই আমার সবচে' প্রিয় 'শাখা'! আহা! কী যে ভালো লাগে আমার, যখন কথা বলার জন্যে নবীজী আমার উপর পা রেখে নিবিড় হয়ে দাঁড়ান, সাহাবীরা তা শোনার জন্যে আমার কাছে-আশপাশে নিবিড় হয়ে বসেন! সবাই তাকিয়ে থাকেন নবীজীর দিকে, তখন তো দৃষ্টি পড়ে যায় আমারও উপরে! এই সৌভাগ্য আমি কী দিয়ে মাপবো?

আমার সৌভাগ্য দিনে দিনে বাড়ছিলো, কেননা আমি দেখছিলাম যে মুসলমানদের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে। বাড়তে বাড়তে এক সময় এমন পর্যায়ে চলে গেলো যে আমার উপর দাঁড়ালে আল্লাহ্র রাসূলকে সবাই দেখতে পারতেন না। তাঁর কথা সবার কানেও পৌঁছতো না। ফলে তিনি আমাকে ছেড়ে চলে গেলেন পাশে, আমার চেয়ে উঁচু একটা মিম্বরে! মুসলমানদের সংখ্যাধিক্যে আমার আনন্দ যতো-না বাড়লো তারচে' বেশী বেড়ে গেলো আমার বিরহ-যাতনা! আল্লাহ্র নবী'র বিরহ আমি সইতে পারলাম না, পারলামই না। মনকে বোঝাই- তোমাকে তো ইচ্ছে করে মুহাম্মদ ছেড়ে চলে যান নি! প্রয়োজন হয়েছে, তাই গিয়েছেন! মুসলমানদের সংখ্যা বেড়েছে, তাই গিয়েছেন! এ জন্যে অমন ভেঙে পড়লে-জে! তুমি কি যুক্তির ভাষা বোঝো না?! এখনও যদি তোমার উপর দাঁড়িয়েই নবীজী কথা বলেন, তাহলে অনেকেই-জে তাঁর বাণী শুনতে পাবেন না! অনেকেরই যে কষ্ট হবে! তোমার একার কষ্ট তোমার কাছে কষ্টদায়ক না আরো অনেকের কষ্ট বেশী কষ্টদায়ক!

কিন্তু মন আমার বুঝলো না। শান্ত হলো না। স্থির হলো না। না প্রবোধে, না যুক্তিতে! আমি নিজের উপর সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললাম! একদিন দেখলাম- আমি না-চাইতেই কাঁদছি! অঝরে কাঁদছি! কেঁদে কেঁদে অস্থির হয়ে পড়ছি! যেনো একটা অবোধ শিশু কাঁদছে! মা'কে খুঁজে খুঁজে না-পেয়ে!! আমার বুক ফেটে কেবল উদগীরিত হচ্ছিলো- 'আহ্! আহ্!-এর লাভা! এভাবে আমি 'আহ্! আহ্! আহ্!' বলে কেঁদে কেঁদে সারা! বুকের জ্বলনে-দহনে চোখ আমার অবিরত শুধুই ভেজা ভেজা! আমার এ কান্না- ভালোবাসার কান্না! নবী প্রেমের নাযরানা! চুপ থাকি কেমনে? নীরব থাকি কেমনে? ভালোবাসবো না আমার নবীকে! তাঁর ভালোবাসায় যদি আমার আঁখিজলে বুক ভাসে, ভাসুক না! কেনো আমি থামবো? কেনো আমি বলবো- হে চোখ! শান্ত হও! বন্ধ করো তোমার অশ্রুপাত! না, এ আমি বলতে পারবো না! পারবোই না! ভালোবাসার দাবি আমি ছাড়তে পারবো না!

তাই কান্নাও আমি বন্ধ করতে পারবো না! আর এটা তো আমি পারবোও না! কারণ এ-জে সম্পূর্ণরূপে আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে! আমি কাঁদছি ইচ্ছায় নয়, অনিচ্ছায়! আমি কাঁদছি লোক-দেখানো কান্না নয়, নবীজীর ভালোবাসায়! ভালোবাসার কান্না বন্ধ হয় না! ভালোবাসার কান্না বন্ধ করা যায় না! ভালোবাসার কান্না থামে না, থামানো যায় না! ভালোবাসার কান্না বাঁধ মানে না—চিরঅবাঁধ! কিন্তু তাই বলে কি আমি কেঁদে কেঁদেই ‘শেষ’ হয়ে যাবো?!

হঠাৎ দেখলাম— সাহাবীরা বারবার আমার দিকে তাকাচ্ছেন। অবাক চোখে! তাঁরা কি আমার কান্না শুনতে পাচ্ছেন? মনে হয় পাচ্ছেন! হ্যাঁ, তাঁরা আমার দুঃখ বুঝতে পারছেন! তাঁরা আমার বিরহ-জ্বালা উপলব্ধি করতে পারছেন! তখনো আমি ‘আহ্! আহ্! আহ্!’ করছি! নিজেকে থামাতে পারছি না!

আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবার এগিয়ে এলেন, আমার দিকে! কাছে এলেন, অনেক কাছে! একেবারে কাছে! তারপর গভীর মমতায়, অনন্ত স্নেহময়তায় আমাকে জড়িয়ে ধরলেন! সান্ত্বনা দিলেন! জান্নাতে আমি তাঁর পাশে থাকবো— এ সুসংবাদও শোনালেন! থামতে বললেন! আমি থেমে গেলাম! কেনো থামবো না? এতোক্ষণ কেঁদেছি, সে তো বিরহের কান্না! এখন তো বিরহ নেই! তার জ্বালাও নেই! তবে কেনো আর কান্না? মিলনে কি কাঁদতে আছে! যার জন্যে এ কান্না, তিনিই তো এখন আমার সান্ত্বনা! তাই আমি শান্ত হলাম! আমার অশান্ত প্রহর কেটে গেছে। আমার বিরহ-কাতরতা আর নেই। কেননা আমি আমার ভালোবাসার পয়গাম পৌঁছে দিয়েছি আমার প্রিয়ের কাছে হাবীবের কাছে। আমার জীবনে এখন আর কান্না নেই, আছে শুধু হাসি। সুখের হাসি। আনন্দের হাসি। তৃপ্তির হাসি। পূর্ণতার হাসি। ইতিহাসের সেরা খেজুর গাছ হওয়ার হাসি। সেরা কেনো? সেরা শুধু এ জন্যে যে আমি কাঁদতে পেরেছি। আমার কান্না নবীজীকে, তাঁর প্রিয় সাহাবীদেরকে শোনাতে পেরেছি! এমন কোনো খেজুর গাছ খুঁজে পাবে তুমি! তবেই বলো, সেরা আমি! শুধুই আমি!!

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00