📄 আমি সেই বকরী
আমার মতো বকরী তোমরা অনেক দেখেছো, কিন্তু ঠিক আমাকে দেখো নি। কারণ আমার জন্ম সে-ই কবে, যখন আল্লাহ্র রাসূল হিজরত করেন মক্কা থেকে মদীনায়। আমি মক্কায়ও নয়, মদীনায়ও নয়, থাকতাম এ দু' শহরের মধ্যিখানে—উম্মে মা'বাদের তাঁবুতে। এক মহিয়সী নারী তিনি। তাঁবুবাসিনী হলেও তিনি ছিলেন ভীষণ উদার ও মায়াবিনী। উদারতা ও দয়ামায়ায় তিনি রাজপুরবাসিনীদেরকেও হার মানান। অনেক আদর-যত্নে আমাদেরকে পালতেন তিনি, যেনো আমরা তার হৃদয়ের টুকরো। কতোকালের আদুরে সন্তান।
একদিন উম্মে মা'বাদ তাঁবুতে বসে ছিলেন। সেদিন আমিও ছিলাম তাঁবুতে। তার স্বামী বেরিয়ে গিয়েছিলেন একটু আগে অন্যান্য বকরীর পাল নিয়ে, খাদ্যের খোঁজে। ঠিক সেই মুহূর্তে তাঁবুর সামনে এসে থামলেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবু বকর। তাঁরা উম্মে মা'বাদের কাছে এসে বিনয়-ধোওয়া ভঙ্গিতে জানতে চাইলেন:
খাওয়ার মতো কিছু হবে কি? খেজুর কিংবা গোশত বা অন্য কিছু? উপযুক্ত মূল্য দিয়ে তাঁরা তা কিনতে চান! কেননা ভীষণ ক্ষুধার্ত তাঁরা! এদিকে যেতে হবে আরো বহু দূরে, সেই ইয়াসরিবে!
তখন মহিয়সী উম্মে মা'বাদ দরদমাখা কণ্ঠে বললেন:
-আফসোস! আমার কাছে কিছুই-যে নেই! থাকলে তোমাদের মেহমানদারী করতাম! আমাদের অভাবের সংসার, এই আছে এই নেই! এখন আছি আমি 'নেই'-এর মাঝে কিছুই 'নেই'-এর মাঝে!
আমি তাঁবুতে বসে সব শুনলাম। মনটা কেমন যেনো ব্যাকুল হয়ে উঠলো। ক্ষুধায় কষ্ট পাবে তাঁরা, সে কেমন করে হয়? আমি চীৎকার জুড়ে দিলাম— ম্যাঁ.. ম্যাঁ.. ম্যাঁ ম্যাঁ!
এতোক্ষণ তো আমি নীরবই ছিলাম! তাহলে এখন কেনো এই চীৎকার? এর সঠিক ব্যাখ্যা আমার জানা নেই! তবে মনের ভিতর থেকে আমি একটা প্রেরণা ও তাগিদ অনুভব করছিলাম। মনে হচ্ছিলো, কে যেনো আমাকে ফিসফিসিয়ে বলছে:
-এই! চুপ করে আছো কেনো? কথা বলো! তোমার উপস্থিতি তাঁদের জানাও, জলদি জানাও!
তাই আমি 'ম্যাঁ-ম্যাঁ' করে উঠলাম! মুহাম্মদ আমার আওয়াজ শুনে উম্মে মা'বাদের কাছে আমার সম্পর্কে জানতে চাইলেন। উম্মে মা'বাদ জানালেন:
-এটি আমার অসুস্থ বকরীটি, ঠিকমত দাঁড়াতেই পারে না। অন্যান্য বকরীর সাথে চারণভূমিতেও যেতে পারছে না।
তাঁরা জিজ্ঞাসা করলেন:
-আসাছে, তোমার এই বকরীর ওলানে কি একটু দুধ হবে না!
উম্মে মা'বাদ বিস্ময়ঝরা কণ্ঠে বললেন: -দুধ! কোত্থেকে আসবে দুধ!! ও তো নিজেই ভীষণ দুর্বল! প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত!!
তবু আমি শুনলাম আল্লাহ্র রাসূল বললেন: -আমাকে একটু অনুমতি দেবে দোহন করার?
উম্মে মা'বাদ বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বললেন: -যদি তোমার মনে হয় ওর দুধ আছে তবে দোহন করো!'
আমি যখন শুনলাম উম্মে মা'বাদ অনুমতি দিয়েছেন, আমার আনন্দের কোনো সীমা রইলো না! আমি আবার 'ম্যাঁ-ম্যাঁ' বলে চীৎকার (না হর্ষধ্বনি?) করে উঠলাম! দুধ আমার ওলানে আছে কি নেই- সে বড় কথা নয়। আমি-যে আল্লাহ্র রাসূলের হাতের ছোঁয়া ও পরশ পেতে যাচ্ছি, সে-ই ভাগ্য! এদিকে উম্মে মা'বাদ নবীজীর আগ্রহের কারণে অনুমতি দিলেও তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে এক কাতরা দুধও আমার ওলান থেকে বের হবে না! তবু তিনি অনুমতি দিলেন! না দিয়ে পারলেন না! প্রার্থীর মুখের উপর 'না' বলে দেওয়া তার ধাঁচেই ছিলো না। তার তাঁবুতে এসে কেউ কিছু চাইবে আর তিনি 'না' করে দেবেন, সে কেমন করে হয়?
তাঁর বরকতপূর্ণ শ্রেষ্ঠ হাত এইমাত্র আমার ওলানকে স্পর্শ করলো! আর মুখে তখন উচ্চারিত হলো-
اللهُمَّ بَارِكْ لَهَا فِي عَنْزَتِها
হে আল্লাহ! তার বকরীতে বরকত দান করো!
আমি বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেলাম! বিশ্বাস করতে আমার কষ্ট হলো, এতো দুধও লুকিয়েছিলো আমার ওলানে! একটা পাত্র একেবারে টইটম্বুর! দুধপূর্ণ পাত্রটা তিনি এগিয়ে দিলেন বিস্মিত উম্মে মা'বাদের দিকে, পান করতে! উম্মে মা'বাদ কী আর পান করবেন! বিস্ময়ের ঘোরই-যে তার কাটছে না!! অবাক বিস্ময়ে পাত্রটির দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি বড় বড় চোখে, তাকিয়েই রইলেন! চোখের ভাষায় তিনি যেনো বলছিলেন: অবিশ্বাস্য, কী করে ওর ওলানে দুধ এলো! এবং এতো দুধ? একেবারে চর্বি-বাওয়া?! ফেনিল-শুভ্র?!
উম্মে মা'বাদ সামান্য একটু পান করেই মুখ উঠিয়ে নিলেন, যদি শেষ হয়ে যায়! কিন্তু আল্লাহ্র রাসূল তাকে আশ্বস্ত করলেন। আরো পান করতে বললেন। দুধে পূর্ণ আরেকটা পাত্র তাকে দেখালেন! এবার উম্মে মা'বাদ তার পাত্রের সবটুকু দুধ পান করলেন তৃপ্তিভরে। অপর পাত্রটি থেকে আবু বকর পান করলেন। সবার শেষে পান করলেন আল্লাহ্র রাসূল। এরপর আবার তিনি আমার কাছে এলেন। আবার আমার ওলানে হাত রাখলেন। আবার অনেক দুধ দোহন করলেন। এ-দুধটুকু তিনি উম্মে মা'বাদের হাতে তুলে দিলেন। তারপর তার সহৃদয় মেহমানদারির শোকর আদায় করে বিদায় নিয়ে আবার পথচলা শুরু করলেন মদীনার দিকে!
আবু মা'বাদ (উম্মে মা'বাদের স্বামী) সন্ধ্যে বেলায় ফিরে এলেন। ফিরলো দুবলা- পাতলা বকরীগুলোও। এদিকে ফিরেই স্ত্রীর হাতে পাত্রভরা দুধ দেখে তিনি তো অবাক! বললেন:
-দুধ! দুধ পেলে কোথায়? একটা দুধেল বকরীও তো তোমার কাছে রেখে যাই নি!
উম্মে মা'বাদ মুগ্ধতা ছড়ানো কণ্ঠে জবাব দিলেন: -আমাদের তাঁবুতে এসেছিলেন এক বরকতময় ব্যক্তি! এ-সব তাঁরই বরকতের 'বৃষ্টি'!
উম্মে মা'বাদ এরপর সবকিছুই স্বামীকে বললেন। তার স্বামী বলে উঠলেন:
-আহা! মনে হচ্ছে এ-ব্যক্তিই সেই মুহাম্মদ! তাঁকেই কোরাইশ হন্যে হয়ে খুঁজে ফিরছে। তাঁকে ওরা ধরতে চায়। তুমি আমাকে তাঁর একটা বর্ণনা দিতে পারো? দেখতে কেমন? আচরণ কেমন?
তাঁবুবাসিনী উম্মে মা'বাদ-এর 'কবিমনটা' যেনো এমনি একটা প্রশ্নের অপেক্ষায় ছিলো! তাই মুহাম্মদের কথা নিখুঁত ও সুন্দরভাবে বর্ণনা করতে তাকে একটুও বেগ পেতে হলো না—ভাবতে হলো না। এমনভাবে তিনি স্বামীকে শুনিয়ে গেলেন মুহাম্মদের কথা, যেনো তিনি চোখের সামনে মেলে-ধরা কোনো অলংকারসমৃদ্ধ হস্তলিপি পড়ছেন! তিনি বললেন: -তাঁর চেহারা নূর-ছাওয়া—আলোকোদ্ভাসিত! মুখে লেগে ছিলো মৃদু হাসির মিষ্টি টুকরো! কণ্ঠস্বর ভীষণ মনকাড়া, কথায় যেনো মধু ঝরে! দেখতে না লম্বা না খাটো! তাঁর দিকে তাকালে চোখ ফেরাতে মন চায় না— কেবল তাকিয়ে থাকতেই ইচ্ছে করে! তখন মনে খেলে যায় অদ্ভুত মজার একটা শিহরণ! সঙ্গীরা তাঁকে ভীষণ সম্মান করে! তিনি ভদ্র মার্জিত অভিজাত!!! মহান চরিত্রের অধিকারী! দুধ দোহনের পর সবার পান করা যখন শেষ, তাঁর পান করা তখন শুরু !!..
আবু মা'বাদ পান করতে লাগলেন সেই বরকতময় হাতের দোহন-করা দুধ, মুহাম্মদী বরকতের প্রতি আসক্ত ও লালায়িত হয়ে। শুধু দুধে নয়, তাঁবু ও তার আশপাশ—সর্বত্রই যেনো মুহাম্মদ রেখে গেছেন তাঁর বরকতের ছাপ! আবু মা'বাদ আবেগ-প্লাবিত কণ্ঠে বললেন: -ইনিই আল্লাহ্র রাসূল। তাঁর কথাই আমরা শুনেছি। আহা! তাঁর সাথে যদি আমার দেখাটা হয়ে যেতো! তাঁর মুখের একটু কথা যদি আমি শুনতে পারতাম! তাঁর সাথে যদি একটু কথা বলতে পারতাম! যদি তাঁর সাথে আমিও চলে যেতে পারতাম সেই সেখানে, যেখানে তিনি যাচ্ছেন! হায়! আমি যদি তাঁর হাতে ঈমান কবুল করতে পারতাম!
উম্মে মা'বাদ বললেন: -তিনি তো হারিয়ে যাচ্ছেন না, যে কোনো সময় আপনি তাঁকে খুঁজে বের করতে পারবেন! তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারবেন!
আমি এতোক্ষণ নীরবেই তাঁদের কথা শুনছিলাম। নীরবতা ভেঙে আবু মা'বাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলি চাইলাম। আবার বলে উঠলাম আমার ভাষায়— ম্যাঁ.. ম্যাঁ.. ম্যাঁ ম্যাঁ!
ফলটা ভালই হলো। আবু মা'বাদ উঠে আমার কাছে এলেন এবং আদর করে আমার গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। আর আবেগমথিত গলায় বলতে লাগলেন:
-আমাদের প্রিয় বকরী! তোমাকে অনে-ক ধন্যবাদ! তোমার কারণেই তো আমরা এক মহা মানবের পরশ পেলাম! তোমার মর্যাদা এখন অনেক উঁচু। মানুষ তোমাকে ভুলবে না। ইতিহাস তোমাকে ভুলবে না। আজ যা ঘটে গেলো এই তাঁবুকে ঘিরে .. আমাদেরকে ঘিরে.. বরং তোমাকে ঘিরে, তা কি কখনো ভোলা যায়?!
আবু মা'বাদের কথার উত্তরে আমি বলতে চাচ্ছিলাম: মনিব! আমার কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই! আমি কেবল বিস্ময় ও মুগ্ধতা নিয়ে স-ব দেখে গেছি!
শ্রেষ্ঠত্ব যা, স-ব তাঁরই! সেই বরকতময় হাতের, যা আমাকে স্পর্শ করেছে। সেই হাতের মালিকের, যিনি দু'আ করেছেন আর সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ তা কবুল করেছেন! আমার ওলান পূর্ণ হয়ে গেলো দুধে!
আমি ভীষণ গর্ব অনুভব করি। কেননা আমার দুধ পান করেছেন আল্লাহ্র রাসূল। তাও আবার এক গুরুত্বপূর্ণ সফরে। মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে। যে হিজরত বদলে দিয়েছিলো সবকিছু। মুসলমানদের সংখ্যা এতো বাড়িয়ে দিয়েছিলো যে, যখন আমি তাঁদেরকে দীর্ঘ দিন পর মক্কায় ফিরে যেতে দেখলাম বিজয়ীর বেশে, ইসলামের মহান পতাকা হাতে, তখন আমি তাঁদের সংখ্যা গোনে গোনে শেষ করতে পারি নি! কেবল তাকিয়েছিলাম অবাক বিস্ময়ে এবং আনন্দ-বিগলিত চিত্তে। আর বারবার ফিরে যাচ্ছিলাম আমার সেই মধুময় স্মৃতির কাছে! আহা! এই স্মৃতিটিই তো এখন আমার সবচে' বড় ধন!
📄 আমি ‘কাসওয়া’
আমিও আমার স্বামীর মতো মরু-জাহাজ। মরুভূমিতে ছুটে বেড়াই ক্লান্তিহীন শ্রান্তিহীন পিপাসাহীন। এভাবে অনায়াসে আমি পাড়ি দিতে পারি— দূরের, অ-নেক দূরের পথ। আমি থাকতাম মক্কাতেই, যখন মক্কায় সবাইকে আল্লাহ্র রাসূল ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছিলেন। আমার মালিক ছিলেন হযরত আবু বকর। আরো বিস্তারিত বলছি, শোনো—
কাফেররা অনেক গোপনে আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করার চক্রান্ত করলো। নবীজী ওহীর মাধ্যমে যথা সময়ে ওদের ষড়যন্ত্রের কথা জেনে ফেললেন। তখন তিনি আল্লাহ্র হুকুমে মদীনা হিজরতের সিদ্ধান্ত নিলেন। একদিন ভর দুপুরে তিনি আবু বকরের গৃহে এলেন, তাঁকে হিজরতের কথা জানাতে। এ দিকে আমার মনিব পূর্ব থেকেই হিজরতের জন্যে, বিশেষ করে আল্লাহ্ নবীর সফরসঙ্গী হওয়ার আশায় অধীর অপেক্ষায় সময় পার করছিলেন। তাই আল্লাহ্র রাসূলের মুখে যখন তিনি জানতে পারলেন আজই হিজরত হবে এবং তিনি নবীজীর হিজরত-সঙ্গী হবেন, তখন আমার মনিব খুশিতে কেঁদেই ফেললেন! আম্মাজান আয়েশা তাঁর এ-কান্না দেখে ভীষণ আলোড়িত হলেন। পরবর্তীতে হিজরতের হাদীস বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন: 'আমি আনন্দের আতিশয্যে আর কাউকে কাঁদতে দেখি নি— আমার বাবা ছাড়া!'
তিনি আল্লাহ্র রাসূলকে জানালেন যে, হিজরতের জন্যে তিনি দু'টি উটনী ঠিক করে রেখেছেন— আমি এবং আমার বোন। আমাকে পেশ করলেন আল্লাহ্র রাসূলের জন্যে। কিন্তু আল্লাহ্র রাসূল বিনামূল্যে আমাকে নিতে রাজি হলেন না। অগত্যা মূল্যের বিনিময়েই তিনি আমাকে আল্লাহ্র রাসূলের জন্যে পেশ করলেন।
আল্লাহ্র রাসূলের বাহন হতে যাচ্ছি আমি মক্কা থেকে মদীনা হিজরতের পুণ্য সফরে— এ আনন্দে আমি রীতিমত আটখানা! যাই হোক; আল্লাহ্র রাসূল সে বৈঠকেই আবু বকরকে নিয়ে হিজরতের পূর্ণ পরিকল্পনা গ্রহণ করলেন এভাবে— ১. কখন বের হবেন, ২. কীভাবে বের হবেন, ৩. কোত্থেকে বের হবেন, ৪. কোন্ পথে বের হবেন, ৫. কোথায় গিয়ে প্রথমে আশ্রয় নেবেন, ৬. আশ্রয়কালীন সময়ে কে তাঁদেরকে মক্কার অবস্থা জানাবে, ৭. গারে সাওরে কে তাঁদের জন্যে খাবার নিয়ে যাবে, ৮. তারপর সেখান থেকে কখন মদীনায় রওয়ানা হবেন, ৯. আবু বকর ছাড়া আর কে সঙ্গে থাকবে, ১০. কে তুলনামূলক ঝুঁকিমুক্ত পথে তাদেরকে মদীনায় নিয়ে যাবে— এ সব কিছুই তাঁরা এক সঙ্গে বসে ঠিক করে ফেললেন। কী সুন্দর নিখুঁত পরিকল্পনা!
নির্ধারিত দিনে আমাকে এবং আমার বোনকে নিয়ে গারে সাওরে হাজির হলেন পথ-প্রদর্শক আবদুল্লাহ ইবনে উরাইকিত। তখন সময়টা ছিলো রাতের শেষ প্রহর। আল্লাহ্র রাসূল আরোহণ করলেন আমার পিঠে আর আবু বকর আরোহণ করলেন আমার বোনের পিঠে। আমরা পথচলা শুরু করলাম মদীনার দিকে। আমরা চলতে লাগলাম ক্লান্তিহীন। প্রচণ্ড গরমেও আমার কোনো কষ্ট হচ্ছিলো না। কতো পাহাড়-উপত্যকা আমরা মাড়িয়ে যাচ্ছি, কতো মরুভূমি ও বালিয়াড়ি আমরা পেরিয়ে যাচ্ছি, তবু ক্লান্তি আমাকে কিংবা আমার বোনকে স্পর্শ করছে না। বরং আমরা পথ চলছিলাম আনন্দভরে, গর্বভরে। ছুটে ছুটে.. দৌড়ে দৌড়ে। আর এমন তো হবেই! আমার পিঠে-যে বসে আছেন শ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আর আমার বোনের পিঠে শ্রেষ্ঠ উম্মত হযরত আবু বকর রা.! আমরা বাহন হয়েছি শ্রেষ্ঠ সফরের শ্রেষ্ঠ আরোহীর! শ্রেষ্ঠ নবীর শ্রেষ্ঠ উম্মতির! তাই আমরাও শ্রেষ্ঠ! শ্রেষ্ঠ আরোহীর পরশে শ্রেষ্ঠ বাহন! ফুলের গন্ধে মাটির মতন!
এই পুণ্য সফরে আমি আল্লাহ্র রাসূলের অনেক মু'জিযা দেখেছি। আমি দেখেছি কবুতর ও মাকড়সাকে গারে সাওরের মুখে ঝুঁকি নিতে- রাসূলকে এবং রাসূলের বন্ধুকে ঝুঁকিমুক্ত রাখতে! গারে সাওরের মুখে কবুতর আর মাকড়সাকে নিজেদের 'কাজে' ব্যস্ত না দেখলে ওরা-কাফির মুশরিকরা- কি এতো সহজে ফিরে যেতো? গুহাটা তো একবার হলেও একটু উঁকি দিয়ে দেখতো! আমি আরো দেখেছি কেমন করে সুরাকা বিন মালিক আল্লাহ্র রাসূলের পিছু নিয়েছিলো, শত উটের পুরস্কার- উন্মাদনায় উন্মাদ হয়ে। এগিয়ে আসছে কাছে, আরো কাছে, আরো কাছে। তখন আল্লাহ্র রাসূল হাত দিয়ে ইশারা করলেন, সঙ্গে সঙ্গে সুরাকার ঘোড়ার পা' মাটিতে দেবে গেলো! এমন হলো একবার দুইবার তিনবার! আমি দেখেছি উম্মে মা'বাদের সেই বকরী। কী দুর্বল ছিলো, ঠিকমত দাঁড়াতেই পারতো না! দুধ দেওয়া যার জন্যে ছিলো অসম্ভব, তার ওলানই যখন আল্লাহ্র রাসূলের মুবারক হাতের স্পর্শ পেলো, তখন দুধের যেনো নহর বয়ে গেলো! এক পাত্র উম্মে মা'বাদ পান করলেন। আরেক পাত্র তার স্বামী পান করলেন। আরেক পাত্র পান করলেন শ্রেষ্ঠ নবী ও তাঁর শ্রেষ্ঠ সাহাবী।
এ সব কিছুই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করছিলো। আরো প্রমাণ করছিলো যে, আল্লাহ আছেন তাঁর সাথে। কাফেররা কিছুতেই তাঁকে পরাস্ত করতে পারবে না। তোমাদেরকে আরেকটা কথা বলি; আমি এ-পথ এর আগে বহুবার মাড়িয়েছি। অন্যান্য বার এ-পথ মাড়াতে আমার সময় লাগতো ১১ দিন, তাও দিনে-রাতে অবিশ্রান্ত পথ চলে। আর এ-সফরে আমার সময় লেগেছে মাত্র ৮ দিন, তাও শুধু রাতে চলে। দিনের বেলায় তো দুশমনের ভয়ে লুকিয়েই থাকতে হতো আমাদের! দুশমন সর্বত্রই ওঁত পেতে বসে ছিলো। কিন্তু আল্লাহ্র ইচ্ছায় এ-মহান সফরে আমরা নিরাপদেই মঞ্জিলে পৌঁছে গেলাম, আল-হামদুলিল্লাহ! সবই আল্লাহর ইচ্ছা!
আমরা একদম কাছে চলে এলাম ইয়াসরিবের। দূর থেকে চোখে পড়ছিলো খেজুর বাগানের সবুজাভ দৃশ্য। আমি খুশিতে মাতোয়ারা। আমার বোন বিভোর আত্মাহারা। কেননা আল্লাহ্র রাসূল এখন শত্রুমুক্ত। আমি আপন মনে কথা বলতে লাগলাম- আচ্ছা, আমরা তো এখন মদীনার দ্বারপ্রান্তে। একটু পরই প্রবেশ করবো মদীনায়। মদীনাবাসী আল্লাহ্র রাসূলকে কেমন করে স্বাগত জানাবে? এর মধ্যে তো রাসূলের ইয়াসরিবের উদ্দেশে মক্কা ছাড়ার কথা নিশ্চয়ই তারা জেনে গেছে!
সূর্যটা তখন ঠিক মধ্য আকাশে। আমরা ইয়াসরিবের আরো কাছে চলে এসেছি। হঠাৎ আমার কানে এলো একটা হর্ষধ্বনি: -ওই যে তোমাদের প্রতীক্ষিত মানুষটি এসে গেছেন! তোমাদের ভাগ্য-দুয়ার খুলে গেছে!
পথ কমতে লাগলো! আওয়াজ ও গুঞ্জরন বাড়তে লাগলো! সবাই আল্লাহু আকবার.. আল্লাহু আকবার বলে আকাশের শূন্যতায় ইথারে ইথারে ভাসিয়ে দিতে লাগলো তাকবীর-ধ্বনির তরঙ্গমালা! আমার মনে হচ্ছিলো— এ নিনাদে জমিনও কাঁপছে! আরো মনে হলে— সারা দুনিয়াই যেনো ইয়াসরিববাসীর কন্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলছে— আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার!
আমার উপর থেকে নেমে আল্লাহ্র রাসূল একটা খেজুর গাছের ছায়ায় গিয়ে বসলেন, আবু বকরকে সঙ্গে নিয়ে। ছুটে আসতে লাগলো মদীনার মানুষ, দলে দলে। এর আগে অনেকেই নবীজীকে দেখে নি। তবুও তাঁর ভালোবাসায় হৃদয়ে তাদের বান ডেকে গেলো। মরুর বুকে যেন ঝরনা বয়ে গেলো। স-ব এসে এক মোহনায় মিলে গেলো!
এক মহিলা পাশের আরেক মহিলাকে জিজ্ঞাসা করলেন: -এই, কোন্জন নবীজীরে! কোন্জন আবু বকর?! একটু পর আল্লাহ্র রাসূলের গায়ে এসে রোদ পড়লে আবু বকর যখন তাঁকে ছায়া দিতে রুমাল মেলে ধরলেন, তখন তাঁরা বুঝলেন— কে নবীজী আর কে আবু বকর! শ্রেষ্ঠ নবী আর শ্রেষ্ঠ উম্মতের মধ্যে কী আশ্চর্য মিল! একজন থেকে আরেকজনকে আলাদা করতে তাই তো মদীনার মানুষের কষ্ট হয়েছে!
লোকেরা এসে তাঁকে সালাম দিতে লাগলো। সবাই তাঁকে অনুরোধ করতে লাগলো উপদেশ দিতে। আলোর কথা বলতে। সত্যের কথা বলতে। তিনি তখন সবার মাঝে সালাম-এর আমল ছড়িয়ে দিতে বললেন। অন্যকে খাবার খাওয়াতে বললেন। একে অপরকে দান করতে বললেন। পরস্পরকে ভালোবাসতে বললেন। আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্যে নামাজ পড়তে বললেন এবং এ-সব পুণ্য কাজের সেঁতু ধরে সোজা জান্নাতে চলে যেতে বললেন!
কিছুক্ষণ পর আল্লাহ্র রাসূল আবার আমার পিঠে এসে বসলেন। কিন্তু কী আশ্চর্য! এখন তিনি আর আমার লাগাম ধরে হাঁকিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন না, লাগাম ছেড়ে দিয়েছেন। এদিকে মদীনাবাসী আমাদেরকে উষ্ণ ভালোবাসায় ঘিরে রেখেছে। আমাদেরকে ওরা ঘিরে রেখেছে ভালোবাসার 'বেষ্টনী' দিয়ে! আমরা চলছি, ঐ বেষ্টনীও চলছে! কী অপূর্ব! অমন শোভাযাত্রা কে কোথায় কখন দেখেছে? একটু পরই ধ্বনিময় হয়ে উঠলো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ স্বাগত সঙ্গীতটা, একঝাঁক কচি কণ্ঠে! ওফ! দফ যোগে সেই স্বাগত সঙ্গীত শুনতে আমার কী-যে মজা লাগছিলো! তোমরাও শুনবে?
طلع البدر علينا من ثنيات الوداع
وجب الشكر علينا ما دعا لله داع
أيها المبعوث فينا جئت بالأمر المطاع
جئت شرفت المدينة مرحبا يا خير داع
'ঐ দেখো! 'সানিয়্যাতুল ওদা' থেকে উদিত হয়েছে আমাদের আকাশে- পূর্ণিমার চাঁদ! আল্লাহ্ পথের আহ্বানকারী যতোদিন আহ্বান করবে, ততোদিন শুকরিয়া আদায় করা আমাদের মহান দায়িত্ব! আমাদের মাঝে প্রেরিত হে মহান রাসূল! আপনি এসেছেন এমন বিষয় নিয়ে, যা আমাদেরকে অনুসরণ করতেই হবে! আপনি এসেছেন, ধন্য করেছেন মদীনা, হে শ্রেষ্ঠ আহ্বানকারী! স্বাগতম আপনাকে, সুস্বাগতম!
‘শোভাযাত্রা’ এগিয়ে চললো। আর আমি আনন্দাতিশয্যে বেশ হেলে-দোলে চলতে লাগলাম মদীনার নবী-প্রেমিকদের বেষ্টনীতে বেষ্টিত হয়ে। আহা! কী ভালোবাসা! কী মায়া মমতা! কী মানবতা! কী আতিথেয়তা! ভালোবাসা যেনো সবার চোখ থেকে ঠিকরে ঠিকরে পড়ছে! আর সবার মুখের ঐ মৃদু হাসিটি! তুলনা তার কী দিয়ে করি?
সবাই চায় ‘আমার ঘরেই মেহমান হবেন আল্লাহ্র রাসূল’। সে কি জোরালো আবেদন! সে কি মিষ্টি কাড়াকাড়ি! আমার ‘কবিতা’ বলতে ইচ্ছে করছে— ভালোবাসার এ কর-কোমলে, ছিঁড়ে যাবে কি মোর লাগামখানি! ছেড়ে দাও না— বন্ধু! জানো না বুঝি, আমি চলেছি আমার পায়ে, আমার অনিচ্ছায়! হ্যাঁ.. থামতে হবে, সেও ঐ অনিচ্ছায়! আজ নেই কোনো ইচ্ছে— আসমানের ইচ্ছে ছাড়া! সব ইচ্ছের মোহনা আজ শুধু ঐ ইচ্ছে!
আমি অবাক বিস্ময়ে ভাবছিলাম— মক্কা আর মদীনার কন্ঠে এতো বৈপরীত্য কেনো? ‘উষ্ণতায়’ উষ্ণতায় এতো তফাত কেনো? মানুষে মানুষে এতো ব্যবধান কেনো? মক্কা থেকে কোন্ অবস্থায় বের হয়েছি? ধরো মারো কাটো শেষ করে দাও! আর এখানে! কী মিষ্টি ঝগড়া—
-এসো না হে রাসূল! আমার দুয়ারে রাখো না পা!
-না, তা কেনো? আমাদের কাছে থাকবেন রাসূল!
-মানে? আমরা তবে কী দোষ করলাম! ছাড়বো না তাঁকে! উটনীর লাগাম ধরে টেনে নিয়ে যাবো আমার ঘরে!
নবীজী এই মিষ্টি ঝগড়ায়-এই আন্তরিকতায় সীমাহীন আপ্লুত হলেন। ছলোছলো ঝরনার মতো প্রবাহিত হলেন। বললেন: -ছেড়ে দাও না তোমরা উটনীটিকে, তাকে যে বলে দেয়া হয়েছে (কোথায় গিয়ে থামতে হবে)!
আশ্চর্য! আমি আসলেই নিজের ইচ্ছায় পথ চলছিলাম না! চলতে পারছিলাম না! কী যেনো আমাকে টেনে টেনে নিয়ে যাচ্ছে! আমি আমার পায়ের উপর কোনো নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারছিলাম না! হ্যাঁ, এভাবে চলতে চলতে হঠাৎ একটা জায়গায় এসে মনে হলো এখানেই থামতে হবে! এখানেই বিশ্রাম! নাহ! জায়গাটা অতিক্রম করে যাওয়া যাচ্ছে না! কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না! আমি বসে গেলাম, বসে যেতে বাধ্য হলাম!
আল্লাহ্র রাসূল নীচে নেমে জানতে চাইলেন: -এ জায়গাটা কার?
সবাই জানালো: -দুই এতিমের!
সেখানে আল্লাহ্র রাসূল মসজিদ নির্মাণ করতে আগ্রহ প্রকাশ করলেন। তখন ঐ এতিম বালকদ্বয় বিনা মূল্যে তাঁকে জায়গাটা উপহার দিতে চাইলো। কিন্তু আল্লাহ্ রাসূল মূল্য পরিশোধ করেই জায়গাটি কিনলেন। এরপর তিনি গিয়ে উঠলেন পাশের গৃহে! আবু আইয়ূব আনসারীর গৃহে! ভাগ্যবান এক সাহাবীর গৃহে! আল্লাহ্র মনোনীত করা সাহাবীর মনোনীত গৃহে!
মক্কা থেকে হিজরত করে-আসা মানুষের প্রতি মদীনার মানুষের প্রাণঢালা ভালোবাসা দেখে আমি অভিভূত! এ ভালোবাসার সুবাদেই তাঁদেরকে বলা হয় 'আনসার' আর এই ভালোবাসায় সিক্ত যাঁরা, ধন-সম্পদ-বিত্ত-বৈভব-স্বদেশ-ভিটে ফেলে এসেছেন। তাঁরা হলেন মুহাজিরিন। আনসারদের ভালোবাসার ভাগ আমিও পেলাম। অনেক পেলাম। আমার বিশেষ সেবা-যত্নের জন্যে নবীজী আমাকে তুলে দিলেন প্রিয় সাহাবী আসআ'দ ইবনে যুরারাহ রা.-এর হাতে।
এমনিতে আমার কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। আমার শ্রেষ্ঠত্ব ঐ একটাই- আমি আল্লাহ্ রাসূলকে বহন করেছি, একটা ঐতিহাসিক সফরে। আমার আরেকটা বৈশিষ্ট্য হলো, আমি আল্লাহ্র ইচ্ছায় পথ চলেছি। আল্লাহ্র ইচ্ছায় পথচলা বন্ধ করেছি। এ ছাড়া আমার আরেকটা বৈশিষ্ট্য হলো, আল্লাহ্ রাসূলকে আমি আরো একাধিকবার বহন করেছি! সে আরেক কাহিনী! বিস্তারিত বলতে পারবো না, সময় নেই। এখন আমার একটু বিশ্রামের প্রয়োজন। ঘুমে চোখ বুজে বুজে আসছে। তবে ঘুমোতে যাওয়ার আগে ছোট্ট করে বলেই নিই! পরে আবার তোমরা যদি ঘুমোতে চলে যাও!
হ্যাঁ, হোদায়বিয়ার সন্ধির কথা তোমাদের মনে পড়ে? আমিই তখন তাঁর বাহন ছিলাম। সে সময় উমরা না করেই তাঁকে ফিরে আসতে হয়েছিলো। হোদায়বিয়ার কাহিনী নিয়ে একটু পরই হাজির হবে রিদওয়ান বৃক্ষ। তারপর আমিই ছিলিম তাঁর বাহন মক্কা বিজয়ের সময়ে। বিদায় হজ্বের সময়েও আমার মহান সওয়ারী ছিলেন নবীজী। নবীজীর ওফাতের পরও আমি বেঁচে ছিলাম অনেক দিন। কিন্তু প্রিয়হারানোর দুঃখ-জ্বালা বুকে নিয়ে। আপন হারানোর শোক-স্তব্ধতা চোখে নিয়ে। এ-সবে জ্বলতে জ্বলতেই অবশেষে আমি বিদায় নিয়েছিলাম হযরত আবু বকরর খিলাফতকালে। মৃত্যু আমাকে ভাবায় নি। দুশ্চিন্তাগ্রস্তও করে নি। প্রিয় চলে গেছে যে পথে সে পথে কিসের আবার বেদনা?.. এবার তবে একটু ঘুমিয়ে নিই?.
📄 আমি ‘বদর’ বলছি
আমার নাম বদর—বদর কূপ। আমার অবস্থান মক্কা ও মদীনার মাঝে। পরিব্রাজক ও রাখালেরা আমার কাছে আসে পানির খোঁজে। এ-সব দেখে দেখেই আমার দিন কাটে। কখনো দেখা হয় রাখাল বন্ধুদের সাথে আবার কখনো দেখা হয় মুসাফির ভাইদের সঙ্গে। কিন্তু একদিন ঘটলো ব্যতিক্রম ঘটনা। ভোর হতেই দেখলাম সৈন্য সমাবেশ। আগে এসে সৈন্য সমাবেশ করলেন নবীজী ও সাহাবীরা এবং খুবই সুবিধাজনক স্থানে। আর পরে এসে সমাবেশ করলো কোরাইশ বাহিনী। না, ওদের জায়গাটা ভালো পড়ে নি। পানির কষ্ট হবে নিশ্চিত। আরেকটু বিস্তারিত বলি— বদর যুদ্ধের নাম শুনেছো? সে-যুদ্ধের ইতিহাসটা কি পড়েছো? আমি এখন সে যুদ্ধের কথাই তোমাদেরকে বলবো।
আমার নামেই এ-যুদ্ধের নামকরণ করা হয়েছে, সবাই বলে— বদর যুদ্ধ। এ-যুদ্ধের সূচনা হয়েছিলো ১৭ই রমজান দ্বিতীয় হিজরীতে। হিজরতের ঘটনাটা মক্কার কাফির মুশরিকদেরকে ভীষণ ক্ষুব্ধ করে তুলেছিলো। তাদের এই ক্ষোভকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছিলো হিজরতের পর মদীনায় মুহাজিরদের কোনো রকম কষ্ট-ক্লেশের মুখোমুখি না হওয়াটা। আর এ ক্ষোভের মাত্রাটা আরো তীব্র করে তুলেছিলো আনসার-মুহাজির ভাই-ভাই সম্পর্ক, তাঁদের পারস্পরিক হৃদ্যতা ও সম্প্রীতি, যা ছিলো নজিরবিহীন, অতুলনীয়। যেনো তাঁরা একে অপরের আপন ভাই! কিন্তু মুহাজিররা আনসারদের এ প্রাণঢালা ভালোবাসা, স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতা ও আতিথেয়তায় মুগ্ধ ও আপ্লুত হলেও আনসারদের উপর তারা বোঝা হতে চাইলেন না কেউ। বরং স্বাধীনভাবে জীবন-জীবিকার একটা পথ ও উপায় বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন তাঁরা এবং সে জন্যে সবাই চেষ্টাও করে যাচ্ছিলেন। না, সে জন্যে তাঁদেরকে বেশী বেগ পেতে হলো না। কিছুদিনের মধ্যেই তাঁরা যে যার মতো করে আয়-রোজগারের একটা পন্থা বের করে নিলেন।
মুহাজিররা সঙ্গে করে তেমন কিছুই নিয়ে আসতে পারেন নি। আর তা সম্ভবও ছিলো না। কেননা সবাইকেই কাফির মুশরিকদের চোখ এড়িয়ে কোনো রকমে মক্কা ত্যাগ করতে হয়েছে। রাতের আঁধারে। সঙ্গোপনে। এ জন্যেই প্রথম প্রথম মদীনায় এসে তাঁদেরকে একটু অর্থকষ্টে পড়তে হয়েছিলো। যদিও আনসারদের আন্তরিক সহযোগিতায় এ-সঙ্কট সহজেই তাঁরা কাটিয়ে উঠতে পেরেছিলেন। আনসাররা একেবারে নিজের ভাইয়ের মতো করে সবকিছুতেই তাঁদেরকে ভাগ দিয়েছিলেন। ফলে মুহাজিরদের অভাব আর অভাব থাকে নি। কোনো শূন্যতাই তাঁদেরকে স্পর্শ করতে পারে নি। অথচ অপরদিকে মক্কায় পড়ে ছিলো মুহাজিরদের নিজস্ব সহায়- সম্পদ ও ঘর-বাড়ি। সে সব এখন ভোগ করছে মক্কার কাফির মুশরিকরা। এ বিষয়টি তাঁদেরকে খুবই পীড়া দিতো। দেবারই কথা; কী করে এটা কল্পনা করা যায় যে তাঁদেরই সম্পদে ওরা ফুলে-ফেঁপে ওঠবে তারপর তাঁদের উপরই এসে হামলে পড়বে, যে কোনো মুহূর্তে! দিনে অথবা রাতে, জাঁকালো সমরায়োজন নিয়ে! না, এটা মেনে নেয়া যায় না, কিছুতেই না! তাই আক্রান্ত হওয়ার আগেই ওদেরকে রুখে দাঁড়ানো প্রয়োজন। এমন একটা সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিলেন সাহাবায়ে কেরাম। হ্যাঁ.. একদিন অমন একটা সুযোগ এসে গেলো। একেবারে হাতের কাছে। আরেকটু পরিস্কার করে বলছি।
একদিন নবীজীর কাছে সংবাদ এলো, আবু সুফিয়ান এক বাণিজ্য কাফেলা নিয়ে সিরিয়া রওয়ানা হয়েছেন এবং সে কাফেলা এখন মদীনার দিকে এগিয়ে আসছে। নবীজী সাথে সাথে তা প্রতিরোধ করার নির্দেশ দিলেন। কিন্তু সুচতুর আবু সুফিয়ান তা সময় মতো জেনে ফেললেন এবং অন্য আরেকটি নিরাপদ পথে সিরিয়া পৌঁছে গেলেন। নবীজী হাল ছাড়লেন না। ফিরতি পথে আবু সুফিয়ানকে প্রতিরোধ করার সিদ্ধান্ত নিলেন।
সিরিয়ায় বেচা-কেনার পর্ব শেষ করে আবু সুফিয়ান বিপুল পণ্য-সামগ্রীসহ একদিন মক্কার উদ্দেশে রওয়ানা হলেন। সময় মতোই আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে খবর পেয়ে গেলেন। বললেন: -আবু সুফিয়ানের বাণিজ্য কাফেলা এখন তোমাদের হাতের নাগালে। দ্রুত অগ্রসর হও। সম্ভবত আল্লাহ গণিমতের মাল হিসাবে তোমাদেরকে তা পাইয়ে দেবেন।
লোকসংখ্যা তেমন নয়, মাত্র চল্লিশজন। কিন্তু সাথে রয়েছে বিপুল পরিমাণ পণ্য। আল্লাহ্র রাসূলের পক্ষ থেকে এ কাফেলাকে প্রতিহত করার নির্দেশ জারি হওয়ার সাথে সাথে সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে সাড়া পড়ে গেলো। মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতকালে এ-জালিমরাই তাঁদের সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছিলো। আজ সময় হয়েছে সে সবের কিছুটা হলেও বদলা নেওয়ার। এ ছাড়া এটা তো জানা কথাই যে, এরা এই বাণিজ্যে রাজ্যের মুনাফা লুটে ইসলামের বিরুদ্ধেই তা ব্যবহার করবে! ঢাল- তলোয়ার কিনবে, উট-ঘোড়া কিনবে আরো কতো সমরোপকরণ কিনবে! তারপর সুযোগ পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে মদীনায়। শেষ করে দিতে মুসলমানকে, ইসলামকে। সে সুযোগ কেনো তাদেরকে দেওয়া হবে! সাপ ফুঁস করার আগেই.. ছোবল মারার আগেই বিষদাঁত ভেঙে দিতে হবে!
আবু সুফিয়ানের কাফেলা আক্রান্ত হতে যাচ্ছে- এমন খবরে কোরাইশ শিবিরে আগুন জ্বলে উঠলো। তারা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাহাবীদের প্রতি সীমাহীন ক্ষুব্ধ হলো। বিশেষ করে তারা যখন জানতে পারলো যে, মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-প্রেরিত আব্দুল্লাহ বিন জাহাশ রা. -এর নেতৃত্বে একটি ঝটিকা দল মক্কা ও তায়েফের মাঝে 'নাখলা' নামে একটি জায়গায় মুশরিকদের এক বাণিজ্য কাফেলাকে আক্রমণ করে দু'জনকে বন্দি করে মদীনায় নিয়ে গেছে, আরেকজনকে হত্যা করেছে। এ-ঘটনা কোরাইশ শিবিরকে ভীষণ ক্ষুব্ধ করে তোলে। তাই তারা আবু সুফিয়ানের বিপদাক্রান্ত হওয়ার কথা শুনে আর দেরী করলো না, সাজসাজ রবে যুদ্ধ প্রস্ততি শুরু করে দিলো। দেখতে দেখতে প্রস্তুত হয়ে গেলো এক হাজার যোদ্ধার বাহিনী। ১০০ ঘোড়া আর ৭০০ উটে সজ্জিত ছিলো সেই বাহিনী। এ ছাড়া অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র তো আছেই। মুসলিম বাহিনী এ-খবর শুনে জিহাদী চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে উঠলো। আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নেতৃত্বে তাঁরা বেরিয়ে পড়লেন। সংখ্যায় ছিলেন তাঁরা দুশমনের তিনভাগের এক ভাগ, অর্থাৎ তিনশ' তেরজন। সাথে মাত্র দু'টি ঘোড়া।
মুসলিম বাহিনী আমার কাছে—বদর কূপের কাছে—আসার পূর্বেই আল্লাহ্র রাসূল আমার কাছ থেকে বেশ খানিকটা দূরে শিবির স্থাপনের আগ্রহ প্রকাশ করলেন। কিন্তু প্রিয় সাহাবী আলহুবাব ইবনুল মুনযির রা. তাঁকে আমার একদম কাছে এসে তাঁবু স্থাপনের পরামর্শ দিলেন, যাতে প্রয়োজনের মুহূর্তে মুসলিম বাহিনী আমার পানি যতো ইচ্ছে পান করতে পারে আর কাফির মুশরিকরা তীব্র প্রয়োজনেও পানির ছিটে- ফোঁটাও না পায়। আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ-পরামর্শ খুব পছন্দ করলেন এবং আমার কাছে এসে তাঁবু স্থাপনের নির্দেশ দিলেন। হাউজে পানি আটকে রাখতে বললেন, নিজেরা পান করার জন্যে এবং ঘোড়া (সংখ্যা ২) ও উটকে (সংখ্যা ৭০) পান করানোর জন্যে।
কোরাইশ বাহিনী রণাঙ্গনে এসে পৌঁছলো বেশ হেলে-দোলে খোশ মেযাজে হামবড়া ভাব নিয়ে। আগেই বলেছি; ওদের সাথে ১০০ ঘোড়া আর ৭০০ উটের বহর। কিন্তু এসেই তারা হোঁচট খেলো, প্রথম হোঁচট। কেননা রণ-কৌশলে তারা হেরে গেছে। তারা এসে দেখলো মুসলিম বাহিনী তাদেরকে 'পানিতে মারা'র সব ব্যবস্থা পাকা করে রেখেছে। এতোটা পথ মাড়িয়ে এসে এ-অবস্থা দেখলে কার মাথা ঠিক থাকে? ওদের মাথাও ঠিক থাকলো না, আওলাঝাওলা হয়ে গেলো। ওদের ভিতরে ঘুমিয়ে থাকা পিপাসাটা হা করে ঘুম থেকে জেগে উঠলো। বদরাগী এ- পিপাসার ভাবখানা যেনো এই— 'এই বেটারা! জলদি আমারে পানি দে, নইলে তোদের রক্ত খাবো!'
সুতরাং তারা পানির জন্যে অস্থির হয়ে উঠলো। একজন কসম করে বললো, সে নাকি আমার কোল পর্যন্ত আসবেই—পানি পান করবেই। অথবা মুসলিম বাহিনীর হাউজটা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবে, যাতে ওরা পানির সুবিধা ভোগ করতে না পারে। কিন্তু সে আশা আর পূর্ণ হলো না, তার পথ রুখে দাঁড়ালেন নবী-পিতৃব্য (চাচা) মহাবীর হামযা রা.! মহাবীর হামযার এক আঘাতেই সেই 'বীরপুরুষের' 'বদর কূপের' পানি পানের শখ চিরতরে মিটে গেলো। দুনিয়া থেকে বিদায় হলো শেষ নবীর সাথে লড়তে-আসা এক অভিশপ্ত মূর্তিপূজারী। আমিও মুক্তি পেলাম এক দুর্ভাগাকে পানি পান করানোর লজ্জা থেকে।
প্রাচীনকালে যুদ্ধের রেওয়াজ ছিলো, প্রথমে তা শুরু হতো এককভাবে। এ-দল থেকে একজন আর ও-দল থেকে একজন। এই একক যুদ্ধের পর শুরু হতো ব্যাপক যুদ্ধ। তুমুল যুদ্ধ। সম্মিলিত যুদ্ধ। এক পক্ষ আরেক পক্ষের কাতার ভেদ করে ঢুকে পড়তো ভিতরে, আরো ভিতরে। তারপর শুরু হয়ে যেতো মার-মার কাট-কাট অবস্থা।
এখানেও হলো তাই। প্রথমে শুরু হলো একক লড়াই। হযরত হামযা রা.-এর আঘাতে ঐ লোকটা শেষ হয়ে গেলো, তখন ওদিক থেকে ছুটে এলো ওতবা—তায়েফের সেই আঙুর বাগানের মালিক। এগিয়ে এলো তার ভাই শায়বাও। এসেই শুরু করে দিলো হাঁক-ডাক— কে আছো, সাহস থাকলে এসো লড়তে! তখন মদীনাবাসী আনসারদের মধ্য থেকে কেউ কেউ এগিয়ে গেলে তারা লড়তে অস্বীকার করে বললো:
-না, তোমাদের সাথে আমরা লড়বো না! লড়াই হবে সমানে সমানে— কোরাইশে কোরাইশে! তখন এগিয়ে গেলেন হামযার পর হযরত আলী ও উবায়দাহ ইবনে হারিস। তাঁরা দু’জনও মহাবীর হামযার মতো সফল হলেন। তখন আবু জেহেল বলে উঠলো: -এক সঙ্গে হামলা করো হে মক্কাবাসী!
এভাবেই আগে আক্রমণ শুরু করলো মুশরিক বাহিনী। আল্লাহ্র রাসূল নিষেধ করে দিয়েছিলেন, যেনো মুসলিম বাহিনী আগে হামলা না করে। বরং দুশমন হামলা শুরু করলেই জওয়াবী হামলা শুরু হবে। তাই হলো। দুশমনের সম্মিলিত হামলার সাথে সাথে জানবায মুসলিম ফওজ প্রতিরোধ লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো। শত্রু শিবিরের কাতার ভেদ করে ভিতরে ঢুকে পড়লেন তাঁরা। ঢাল-তলোয়ারের আওয়াজ আর 'আল্লাহু আকবার' তাকবীর ধ্বনির মিশেলে সৃষ্টি হলো 'শহিদী-আনন্দের' অদ্ভুত এক ব্যঞ্জনা! সবার মন যেনো ছড়া কেটে কেটে বলছিলো— মরলে শহীদ বাঁচলে গাজী.. চলো চলো যুদ্ধ করি! কা'বার রবের শপথ.. জান্নাতই আমার পথ!
লড়াই আরো তীব্র হলো। হযরত আবু বকর একটু অস্বস্তিতেই পড়ে গেলেন। কাফেরদের সৈন্যসংখ্যা আর অস্ত্রবল-যে অনে-ক! আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তিনি বললেন দু'আ করতে আল্লাহ্র কাছে, আসমানের সাহায্য চেয়ে। তখন হাত ওঠালেন নবীজী— ইয়া আল্লাহ! ইয়া হাইয়্যু, ইয়া কাইয়্যুম! হে চিরঞ্জীব চিরন্তন!... একটু পরই আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবু বকর এবং অন্য সাহাবীদেরকে এই সুসংবাদ শোনালেন যে, বিজয় হবে মুসলমানদেরই!
আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ-ঘোষণা প্রচারিত হওয়ার সাথে সাথে মুসলিম বাহিনীর মনোবল আরো অনেক বেড়ে গেলো। আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে আল্লাহু আকবার তাকবীর দিতে দিতে তাঁরা দুশমনের কাতারে ঢুকে পড়ে প্রাণপণ লড়তে লাগলেন। আল্লাহ্ নবী সবাইকে বীরত্বের সাথে লড়ে যেতে উৎসাহ দিতে লাগলেন। সবাইকে তিনি মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন- গাযী যারা বিজয়ী তারা, শহীদ যারা জান্নাতী তারা!
এক সাহাবীর হাতে কিছু খেজুর ছিলো। আল্লাহ্র রাসূলের ঘোষণায় উদ্দীপিত হয়ে তিনি তা ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। বললেন: -জান্নাতের যাত্রা বিলম্বিত করার কোনো মানে হয়?! দুশমনের উপর তিনি ঝাঁপিয়ে পড়লেন। লড়তে লড়তে-মারতে মারতে অবশেষে পৌঁছে গেলেন তিনি জান্নাতের ঠিকানায়-সবুজ পাখির দেশে!
এক অসম যুদ্ধ, একদিকে এক হাজার। তাও সশস্ত্র। আরেক দিকে মাত্র ৩১৩ জন। যাদের নেই ওদের মতো অস্ত্রবল। নেই ওদের মতো বিশেষ যুদ্ধ-অভিজ্ঞতা। একদিকে আছে অস্ত্রবল ও জনবল কিন্তু ওরা বাতিল। আরেকদিকে নেই তেমন অস্ত্রবল ও জনবল কিন্তু তাদের সাথে আছে হক, ঈমান ও বীরত্ব। কারা তাহলে বিজয়ী হবে? শেষ বেলায় কাদের আকাশে বিজয়ের রাঙা রবি লালিমা ছড়াবে?
কেউ যদি সেদিনের এই অসম যুদ্ধটা প্রত্যক্ষ করতো, যেমন আমি-বদর কূপ-করেছি, তাহলে অবশ্যই সে বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে যেতো! সবাই তো এটাই জানে যে কোরাইশ বীর-বাহাদুরীতে সেরা, যুদ্ধে পাকা। কিন্তু সেই তারাই-যে আমার চোখের সামনে কুপোকাত হয়ে এখন পালানোর পথ খুঁজছে! লাশের পর লাশ ফেলে! যে লাশের সারিতে রক্তে-মাটিতে একাকার হয়ে পড়ে আছে ওদের সেনাপতি খোদ আবু জেহেলের লাশটাও! না, ওরা আর ময়দানে টিকতে পারলো না। আমার পাশ ঘেঁষেই মক্কার দিকে পালিয়ে গেলো! সত্তরটা মৃত লাশের পাশাপাশি আরো সত্তরটা জীবন্ত লাশ পেছনে ফেলে!
আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নেতৃত্বে ফিরে এলো মুসলিম বাহিনী মদীনায়, বিজয়ের আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে। কৃতজ্ঞতায় আল্লাহ্র সামনে মাথা নুইয়ে। ১৪জন বীর শহীদকে আমার পাশে সমাহিত করে। শহীদ বলছি আমি তাঁদেরকে, মৃত বলছি না। কেনো বলবো, তাঁরা মৃত?! তাঁরা বরং শহীদ, আল্লাহ্র কাছে চিরজীবন্ত! এমনকি আল্লাহ্র কাছে রয়েছে তাঁদের জন্যে বিশেষ খাওয়া- দাওয়ার অফুরান আয়োজন!
এ-বিজয় ছিলো ইতিহাসের সেরা বিজয়।
এ-বিজয় ছিলো আল্লাহর নবীর এক শ্রেষ্ঠ মু'জিযা।
এ-বিজয় আল্লাহ্ শক্তি ও ক্ষমতার এক ঝলমলে প্রকাশ।
এ-বিজয় সব সময় বাতিলকে ভাবিয়ে তোলে আর হকপন্থীদেরকে অনুপ্রেরণা যোগায়।
পরে যখন নবীজী মদীনায় এসে পৌঁছলেন বিজয়ীর বেশে, সারা মদীনা আনন্দে ভাসতে ভাসতে তাঁকে স্বাগত জানালো। তাঁর প্রতি তখন অনেকেই ঈমান আনলো। তারা ঈমান আনলো এ-বিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে যে, মাত্র ৩১৩ জনের বল নিয়ে যে বাহিনী ১০০০ জনের বাহিনীকে পরাস্ত করতে পারে, এক রকম অস্ত্রবল ছাড়াই, সে বাহিনী নিঃসন্দেহে আল্লাহ্র সাহায্যপ্রাপ্ত ও সমর্থনপুষ্ট! সে বাহিনীর বিশ্বাসই সেরা বিশ্বাস। তাঁদের আক্বিদাই অনুসরণীয় আক্বিদা। তাঁদের আদর্শই সর্বকালের শ্রেষ্ঠ আদর্শ। তাঁদের আদর্শকেই আকড়ে ধরে নির্দ্বিধ কণ্ঠে উচ্চারণ করা যায়- এখন থেকে আমিও তোমাদের একজন! আমিও এখন মুসলমান!! আমিও এখন লড়বো সত্যের পথে অন্যায়ের বিরুদ্ধে!!
কয়েদীদের সাথে ভীষণ কোমল আচরণ করলেন আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। অবস্থা ভেদে ১০০০ থেকে ৪০০০ হাজার দিরহাম মুক্তিপণের বিনিময়ে তিনি একেকজনকে ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দিলেন। কেউ কেউ নির্ধারিত মুক্তিপণ দিতে পারলো না। তাদেরকেও আল্লাহ্র রাসূল আটকে রাখলেন না, মদীনার দশজন মুসলমানকে পড়ালেখা শিখিয়ে দেওয়ার শর্তে মুক্তি দেওয়ার কথা জানিয়ে দিলেন।
মুসলিম বাহিনী সর্ব প্রথম লড়াইয়ে সর্ব প্রথম বিজয়টা অর্জন করেছিলো আমার কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়েই- এ কথা ভাবতে আমার ভীষণ গর্ব হয়। আরো গর্ব হয় এই ভেবে যে, আল্লাহ্ পবিত্র কুরআনে আমার কথা উল্লেখ করেছেন! সত্যি, এ এক মহা সৌভাগ্য! অথচ আমি মরুপথের এক ছোট্ট কূপ। মক্কা-মদীনার পথে প্রায় পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে ছিলাম। কারো পানির প্রয়োজন হলেই শুধু আমার কাছে আসতো। নইলে মরুচারীরা কখনো আমার দিকে তাকাতো, কখনো তাকাতো না। কুরআনে বিবৃত হই- সে ভাগ্য আমার কই!
আল্লাহ্ কী অসীম দয়া! আমাকে তুলে নিলেন মাটি থেকে আকাশে! সসীম থেকে অসীমে! 'আঁধার' থেকে আলোয়! এ-সৌভাগ্য আমি রাখি কোথায়?
ইসলামের ইতিহাসে হক ও বাতিলের প্রথম লড়াইয়ের আমি এক নীরব সাক্ষী হয়ে রইলাম। আজ বদর মানেই- হকের বিজয় আর বাতিলের পরাজয়। আজ বদর মানেই ঈমান ও বীরত্বের চিরন্তন বিজয়, হোক তা অস্ত্রবল কিংবা জনবলে দুর্বল। আজ বদর মানেই- মিথ্যা ও কাপুরুষতার পরাজয়। এ-পরাজয় বাতিলের ললাট-লিখন, হোক তা যতোই অস্ত্রসজ্জিত, আধুনিক সমরোপকরণে সুসমৃদ্ধ। হে দুনিয়ার মুসলমান! হে আগামী দিনের ছোট ছোট সেনাপতিরা! আমার কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলে ওঠো: সত্য চির ভাস্বর! মিথ্যা চিরঅপসৃত!
وَلَقَدْ نَصَرَكُمْ اللَّهُ بِبَدْرٍ وَأَنْتُمْ أَذِلَّةٌ فَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
'বস্তুত: আল্লাহ বদরের যুদ্ধে তোমাদের সাহায্য করেছেন, অথচ তোমরা ছিলে দুর্বল। কাজেই আল্লাহকে ভয় করতে থাকো, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হতে পারো।' -সূরা আল-ইমরান
📄 আমি ওহুদ পাহাড়
আমার নাম ওহুদ। আমি মদীনা থেকে মাত্র তিন মাইল দূরে। তৃতীয় হিজরীতে অর্থাৎ বদর যুদ্ধের এক বছর পরে হঠাৎ দেখতে পেলাম আমার কাছে এসে জড়ো হচ্ছে কোরাইশ বাহিনী। সংখ্যায় তারা অনেক। তিন হাজার। দু'শ ঘোড়সওয়ার। আরো দু'শ দুর্ধর্ষ বর্মধারী। এরা এসেছে বদর যুদ্ধের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে। মদীনার উপকণ্ঠে চরে বেড়াচ্ছে ওদের ঘোড়া ও উটের পাল। একদল নারীকেও তাদের সাথে দেখা যাচ্ছে। কবিতা বলে বলে আর গান গেয়ে গেয়ে পুরুষদেরকে যুদ্ধ-মাতাল করে তোলার জন্যে এরা এসেছে।
আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও এক হাজার সৈনিক নিয়ে তাদেরকে প্রতিরোধ করতে বের হয়েছেন। বদরের মতো এখানেও সৈন্য কম। অস্ত্র কম। বর্মধারী সৈন্যের সংখ্যা মাত্র একশ'। ঘোড়সওয়ার মাত্র দু'জন। আমি ভীষণ বিস্মিত হলাম মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে একদল ক্ষুদে সৈনিক দেখে। একজন তো বেশ ছোট। তাকে বাদ দেয়ারই চিন্তা করা হলো। কিন্তু বাদ না-পড়তে সে একেবারে মরিয়া। আঙুলের মাথায় ভর দিয়ে ও নিজের 'উচ্চতা'র প্রমাণ দিচ্ছে! আরেক পিচ্চি তো যুদ্ধে যেতে আরো মরিয়া! নিজের সঙ্গী যাচ্ছে আর সে বাদ পড়বে- তা মানতে ও একেবারেই নারাজ! ওর স্পষ্ট বক্তব্য: ও গেলে আমিও যাবো! কেনো যাবো না? আমাদের দু'জনের মধ্যে লড়াই হলে আমি ওকে ঠিকই হারিয়ে দেবো!
অবশেষে দু'জনের মাঝে লড়াইও হলো, বিস্ময়কর লড়াই! যুদ্ধে যাওয়ার যুদ্ধ!! সত্যি সত্যি সে জিতে গেলো! আশ্চর্য! যার হারার কথা ছিলো সে হারলো না! যার জিতার কথা ছিলো সে জিতলো না! আসলে কেউ হারে নি, যুদ্ধে যেতে দু'জনই জিতেছে! কিন্তু আমার জানতে ইচ্ছে করে, ওদের মাঝে কি কোনো চুক্তি হয়েছিলো? যুদ্ধের আগে যুদ্ধে যেতে ঐ যে দু'জনের যুদ্ধটা, তার আগে দু'জনের মাঝে ফিসফিস যে-কানাকানিটা, সেটা কী নিয়ে ছিলো? হার-জিতের রহস্যটা কি তবে ঐ কানাকানিতেই লুকিয়েছিলো!
আমি আরো বিস্মিত হয়েছি বৃদ্ধ কিছু মানুষকে শরীক হতে দেখে! অথচ এটা তাঁদের যুদ্ধে যাওয়ার বয়স নয়! যুদ্ধে যাওয়ার শ্রেষ্ঠ সময়টা তাঁরা অনেক আগেই পেরিয়ে এসেছেন! তবু কেনো তাঁরা? কী আশ্চর্য! যুদ্ধে না গেলে কে তাঁদেরকে কী বলতো? আসলে তাঁরা কারো বলা-কওয়ার ভয়ে যুদ্ধে যাচ্ছেন— এমনটা নয়, তাঁরা যুদ্ধে যাচ্ছেন লড়ে-লড়ে শহীদ হতে! শহীদ হয়ে-হয়ে জান্নাতে চলে যেতে! জান্নাতের পথটাকে আরো অনেক অনে-ক ছোট্ট করে ফেলতে! একটা লাফ দিলেই যেখানে জান্নাতে চলে যাওয়া যাচ্ছে সেখানে হাত-পা গুটিয়ে কেনো তাঁরা বার্ধক্যের অজুহাতে ঘরে বসে বসে কালক্ষেপণ করবেন? জান্নাতের সফরকে বিলম্বিত করবেন? বুড়োদের জন্যে আগে আগে জান্নাতে যেতে বুঝি মানা! আহা! কী সুন্দর আমাদের সোনালী যুগের সেই সোনালী ইতিহাস! জিহাদে যেতে ছোটরাও প্রতিযোগিতা করে! বুড়োরাও ঘরে বসে থাকতে অস্বস্তি বোধ করে! যে জাতির ছোট-বুড়োরা এমন, সে জাতিকে কে হারাতে পারে?!
মুসলিম বাহিনীর সংখ্যা এবার বদরের চেয়ে বেশী হলেও কোরাইশ বাহিনীর তুলনায় ঐ তিন ভাগের এক ভাগই। এদিকে এক হাজার ওদিকে তিন হাজার। এই এক হাজারও আবার ময়দান পর্যন্ত আসতে-না-আসতেই হয়ে গেলো সাতশ'। মুনাফিক নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই খোঁড়া অজুহাত তোলে সদলবলে মদীনায় ফিরে গিয়েছিলো। কিন্তু মুনাফিকরা মুনাফেকি করলেও মুসলিম বাহিনীর মধ্যে বিন্দুমাত্র চিড় ধরলো না। হতাশা দানা বাঁধলো না। উল্টো খড়কুটো ভেসে যাওয়াতে তাঁরা বরং খুশীই, আরো বলীয়ান। আরো মরিয়া। বীরত্বের রাঙা আবীর শোভা ছড়াচ্ছে তাঁদের চোখে-মুখে সকাল বেলার রাঙা রবির মতো!
আল্লাহর নবী একটা উঁচু জায়গা বেছে নিলেন যুদ্ধ-পরিচালনার সুবিধের জন্যে। আমি ওহুদ পাহাড় দাঁড়িয়ে আছি ঠিক তাঁর পেছনে— তাঁকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্যে। আমার মাঝখানে একটা ফাঁকা জায়গা আছে। এদিকটা দিয়ে দুশমন ভিতরে ঢুকে পড়তে পারে যে-কোনো অলস ও অসতর্ক মুহূর্তে। এ বিষয়টি আমাকে বেশ ভাবিয়ে তুললো। মুসলিম বাহিনী বিষয়টা আমলে না নিলে বিপদ ঘটতে পারে। কিন্তু একটু পরই আমার দুশ্চিন্তা দূর হয়ে গেলো। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে বিষয়টির দিকে দৃষ্টি দিলেন। তিনি পঞ্চাশজন দক্ষ তীরন্দাজকে সেখানে একটা ছোট্ট পাহাড়ে সতর্ক প্রহরায় নিয়োজিত করলেন। তিনি তাদেরকে বলে দিলেন:
-মুসলমানদের জয়-পরাজয় যাই হোক, কোনো অবস্থাতেই এ-স্থান ত্যাগ করা যাবে না।¹
মুসলিম বাহিনীকে কাতারবদ্ধ করলেন আল্লাহর রাসূল। ওদিকেও সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে কোরাইশ বাহিনী। একটু পর শুরু হলো লড়াই। ওদের চোখে জ্বলছে প্রতিশোধের আগুন। আর মুসলিম বাহিনীর দৃষ্টিতে জ্বলজ্বল করছিলো জিহাদী চেতনা। সে দৃষ্টি যেনো বলছিলো:
-আমরা জালিমকে ভয় পাই না। আমরা জানি, কেমন করে জালিমের বিষদাঁত ভেঙে দিতে হয়। কীভাবে জুলুমের মূলোৎপাটন করতে হয়।
শুরু হলো ভয়ানক লড়াই। প্রথমেই একক যুদ্ধ। এদিক থেকে এগিয়ে গেলেন হযরত হামযা-বদর যুদ্ধের প্রথম বীর। ওদিক থেকে যে এসেছিলো তাঁর মুকাবিলায়, সে ছিলো কোরাইশ বাহিনীর নিশানবরদার। কিন্তু অল্পক্ষণেই তার হাত থেকে নিশানটা পড়ে গেলো। মহাবীর হামযা তাকে এক আঘাতেই পাঠিয়ে দিলেন জাহান্নামে। এরপরই শুরু হলো সম্মিলিত আক্রমণ। আমি অবাক বিস্ময়ে দেখে যাচ্ছিলাম মুসলিম বাহিনীর বীরত্ব। আমার চোখে এ-যুদ্ধের তিনটি চিত্র আকাশের তারকার মতো জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। এ তিনটি চিত্রের কথাই আমি আগে বলি।
চিত্র-১ মুসলিম বাহিনী দুশমনের সাথে লড়ে যাচ্ছিলো বীর-বিক্রমে। যেদিক দিয়েই তাঁরা দুশমনের কাতার ভেদ করছিলেন সেদিকেই তাঁদের বীরত্ব আগুনের ফুলকির মতো জ্বলছিলো। সৃষ্টি হচ্ছিলো শত্রু-শিবিরে ত্রাস, মহাত্রাস। কোরাইশ সৈন্যরা সংখ্যায় ত্রিগুণ হওয়া সত্ত্বেও মুসলমানদের হামলা ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছিলো। মুসলমানরা লড়ছিলেন শাহাদতের ব্যাকুলতা বুকে নিয়ে, আর মুশরিকরা লড়ছিলো— জান বাঁচিয়ে অস্ত্র বাগিয়ে 'লেজ' গুটিয়ে। ইতিমধ্যে কোরাইশ বাহিনীর সাত পতাকাধারীর সবাই একে একে 'ভূতলশায়ী' হয়েছে। কোরাইশ বাহিনী বেসামাল হয়ে গেলো। পালিয়ে বাঁচা ছাড়া আর কোনো রাস্তাই তাদের নজরে এলো না। সুতরাং সবাই পালাতে লাগলো। মুসলমানরা তাদেরকে তাড়া করে বেশ খানিকটা পথ যাওয়ার পর আবার ফিরে এলেন। মুসলিম শিবিরে বিজয়ের আলো ফুটে উঠলো!
এই চিত্রটা আমার চোখে কেবলই রাঙা আলো ছড়াচ্ছিলো। কিন্তু এই রাঙা আলো-যে একটু পরই গাঢ় অন্ধকারে তলিয়ে যাবে তা আমি ভাবতেও পারি নি। এখন বলি সে অন্ধকার চিত্রের কথাই।
চিত্র-২ এই দ্বিতীয় চিত্রের কথা বলতে আমি দুরুদুরু কাঁপছি। আমার কণ্ঠ কেঁপে কেঁপে উঠছে। আমার মাঝখান দিয়ে যে গিরিপথটা ছিলো যেখানে সতর্ক প্রহরায় নিয়োজিত ছিলেন পঞ্চাশ জন তীরন্দাজ, সে কথা আমি আগেই বলেছি। তাঁরা বিজয়ের প্রথম প্রহরেই এতোটা উল্লসিত হয়ে উঠলেন যে আল্লাহ্র নবীর সতর্কবাণীর গুরুত্বের কথা তাঁরা আমলেই নিলেন না। দশজন ছাড়া সবাই স্বস্থান ত্যাগ করে মালে গণিমত কুড়াতে ছুটে গেলেন। আল্লাহ্র রাসূলের শিক্ষা তাঁরা ভুলে গেলেন। আর ওই দিকে ওঁত পেতে-থাকা কোরাইশ বাহিনীর ঘোড়সওয়াররা খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে ঐ গিরিপথ দিয়েই ধেয়ে এলো। অবশিষ্ট দশজন তাদেরকে কোনভাবেই ঠেকাতে পারলেন না, সবাই শহীদ হয়ে গেলেন। খালিদ বিন ওয়ালিদ সসৈন্যে একেবারে আল্লাহ্ নবীর কাছাকাছি চলে এলেন। মুহূর্তেই মুসলমানদের বিজয়ের উপর নেমে এলো কোরাইশ বাহিনীর ঝড়ো আক্রমণ। মালে গণিমত সংগ্রহে ব্যস্ত মুসলমানরা কোমর সোজা করে দাঁড়াতেও পারলেন না, এর মাঝেই শুরু হয়ে গেলো প্রতিপক্ষের সাঁড়াশি আক্রমণ। একটু আগে যে-কোরাইশ পালিয়ে জান বাঁচাতে ব্যস্ত ছিলো, তারাও এখন নতুন উদ্যমে ফিরে এলো এবং মুসলমানদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো।
আমি -ওহুদ পাহাড়- এ দৃশ্য দেখছিলাম আর দুঃখে বেদনায় ফেটে পড়ার উপক্রম হচ্ছিলাম। হায়! ছোট্ট দলের একটা ছোট্ট ভুল কী ভয়ঙ্করভাবে নিশ্চিত বিজয়কে বিপর্যয়ে বদলে দিলো! আল্লাহ্র রাসূলের উপরও এলো আঘাত! আহ! তাঁর রক্ত দেখে আমি কী-যে কষ্ট অনুভব করছিলাম! আল্লাহ্র রাসূল আমার একটা ফাটলে গিয়ে আশ্রয় নিলেন আহত হয়ে! এদিকে তখন শয়তান এ-কথা মশহুর করে দিলো যে মুহাম্মদ 'মারা গেছে'! উত্তেজনায় উন্মাদনায় কাফেররা উল্লাস করতে লাগলো। তারা যেনো ধরেই নিয়েছিলো যে ইসলামের দিন শেষ। মুসলমানদের আর কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। ওহুদেই রচিত হবে তাদের শেষ সমাধি।
চিত্র-৩ আল্লাহ্র রাসূলের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আবেগভরে এক সাহাবী বলে উঠলেন: -মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি সত্যি সত্যি মারা গিয়ে থাকেন তাহলে আমরা জীবন দিয়ে কী আর করবো?! যে পথে তিনি চলে গেছেন সে পথে তোমরাও জীবন বিলিয়ে দাও!
এ-ঘোষণার পর আবার সবাই একত্রিত হতে লাগলেন। সবার মাঝে মনোবল ফিরে এলো। আবার তাঁরা সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ালেন। এর মাঝেই ভেসে এলো একজনের কণ্ঠে সুসংবাদ- মিথ্যে, সব মিথ্যে! আল্লাহ্র রাসূল মারা যান নি! তিনি জীবিত আছেন, সুস্থ আছেন!
সাথে সাথে সবার মন আনন্দে দুলে উঠলো! আবার তারা জীবনপণ লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। আমার উপরে উঠে এসে তাঁরা বিপদমুক্ত অবস্থান নিলেন। খালিদ বিন ওয়ালিদের সৈন্যরা উপরে উঠে আসতে চাইলো। কিন্তু মুসলিম বাহিনীর তীরবৃষ্টি ও পাথরবৃষ্টি তাদেরকে বাধাগ্রস্ত করলো। দূরে হটিয়ে দিলো। এরপর কোরাইশ বাহিনী আর সুবিধে করতে পারলো না, তারা বারবার আক্রমণ শাণিত করতে চাইলো, কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হলো।
তীরন্দাজদের একটা ভুলের কারণে যুদ্ধে সাময়িকভাবে ফিরে এলেও এখন তারা ভালোই বুঝতে পারছে- না, মুসলমানদেরকে শেষ করা যাবে না! বরং সময় যতো গড়াবে মুসলমানরা ততোই ফুঁসে উঠতে থাকবে। তার আগেই ময়দান ছাড়তে হবে। সোজা মক্কার পথ ধরতে হবে। কোথাও আর থামা যাবে না। অবশ্য মদীনায় এখন আক্রমণ করা যায়। কেননা মদীনা এখন ফাঁকা প্রায় বীরশূন্য। কিন্তু মদীনায় আমাদের ভাগ্যে কী লুকিয়ে আছে তা এই মুহূর্তে অজানার আঁধারে ঢাকা। বরং এখন বিজয়ের যে গৌরবটা নিয়ে মক্কায় ফিরা যাবে, মদীনা আক্রমণ করলে তাও উল্টো বদলে যেতে পারে। বদর যুদ্ধের প্রতিশোধ নিতে পারার আনন্দটা একেবারেই ভেস্তে যেতে পারে—ধুলোয় মিশে যেতে পারে। সুতরাং জয় হোবল, জয় হোবল! মক্কা চলো, দ্রুত মক্কা চলো!
আবু সুফিয়ান চলে যেতে যেতে মুসলমানদের উদ্দেশ্যে বললেন: -আজ আমরা বদরের প্রতিশোধ নিলাম। বদর ছিলো তোমাদের। ওহুদ হলো আমাদের। যুদ্ধ হলো জয়-পরাজয়ের খেলা। একদিন তোমাদের, একদিন আমাদের। আবার দেখা হবে তোমাদের সাথে।
যুদ্ধ এখানেই শেষ। আমি অশ্রু ছলোছলো চোখে আমার আশেপাশে তাকালাম। আহ! আর সইতে পারছি না! ঐ-যে ওখানে পড়ে আছে বীর হামযার ক্ষত-বিক্ষত দেহ! হিন্দা কী পিশাচিনীর মতো বুক চিরে তাঁর কলিজাটা বের করে চিবিয়েছে! আরো পড়ে আছে অন্যান্য শহীদানের দেহ। আশেপাশে পড়ে ছিলেন আহতরাও।
কোরাইশ বাহিনী ময়দান ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আবার আমার মাথায় সেই দুশ্চিন্তাটা ফিরে এলো— এরা সব এখন মদীনায় গিয়ে চড়াও হবে না তো! মদীনার রাস্তা একদম ফাঁকা। রুখে দাঁড়াবার বিশেষ কেউ নেই ওখানে। মুসলমানরা সবাই এখানে আমার কাছে। এদের মদীনায় ফিরে যেতে একটু সময়ও লাগবে। শহীদদের দাফন-কাফন বাকি। আহতদের প্রাথমিক পরিচর্যা বাকি। তারপর ধীরে ধীরে মদীনায় যেতে হবে। এর মাঝে তো কাফেররা মদীনায় গিয়ে তুলকালাম কাণ্ড ঘটিয়ে দিতে পারে! আমি আবার কেঁপে উঠলাম! উদ্বেগভরে কোরাইশ বাহিনীর গতিবিধিটা বোঝার চেষ্টা করলাম। একটুপর আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। না, ওরা মদীনা নয়— মক্কার পথ ধরছে!
বিজয়ের আনন্দ কি ছিলো ওদের মনে? না, ছিলো না। থাকার কথাও না। প্রকৃত বিজয়টা তো আসলে ওরা অর্জন করতে পারে নি। প্রকৃত বিজয় ছিলো মুসলমানদেরই। তবে এ বিজয়টায় অনেক রক্ত ঝরেছে, ছোট্ট ঐ ভুলটার কারণে। এ জন্যে ওরা মক্কায় যেতে যেতে বলাবলি করছিলো— আমরা কি বিজয়ী! তাহলে আমাদের মালে গণিমত কোথায়? কই, একজন বন্দিও তো আমাদের সঙ্গে নেই! কোথায় আমাদের বিজয়?! কেনো আমরা এখন মদীনায় না গিয়ে মক্কায় ফিরে যাচ্ছি? আমরা তো এসেছিলাম ইসলাম ও মুসলমানদেরকে একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দিতে! তাহলে তা না করে আমরা মক্কার পথ ধরলাম যে!
আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শহীদানের দাফন সম্পন্ন করলেন। চাচাজান হামযার বিকৃত লাশ দেখে তিনি অঝরে কাঁদলেন। সাহাবীরা অমন করে কাঁদতে দেখেন নি প্রিয় নবীকে কখনো!! তারপর ভেজা চোখে আল্লাহ্র রাসূল মদীনায় ফিরে গেলেন। আমার চোখও ছিলো তখন ভেজা। রাসূলের ভালোবাসায়, শহীদানের ভালোবাসায়, শহীদানের স্বজনদের কান্নায়! কিন্তু মদীনায় ফিরার পরে রাতটা পার হতে-না-হতেই আবার এলো নতুন যুদ্ধের নতুন ঘোষণা। জানা গেছে আবু সুফিয়ান নাকি সহ-যোদ্ধাদের গরম গরম কথায় আবার মদীনা আক্রমণের জন্যে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। সুতরাং ১৬ই শাওয়াল ফজর শেষে আবার আল্লাহ্র রাসূলের নেতৃত্বে এগিয়ে চললেন বীর সাহাবীরা, আবু সুফিয়ানের উদ্দেশে। 'হামরাউল আসাদ' পৌঁছে তাঁরা থামলেন। এমনকি সেখানে তিনদিন আবু সুফিয়ানের অপেক্ষাও করলেন। কিন্তু আবু সুফিয়ানের আর কোনো পাত্তা পাওয়া গেলো না। আসলে তিনি দ্বিতীয়বার আল্লাহ্ নবীর বের হওয়ার সংবাদ পেয়ে ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। সে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে আবার মক্কার দিকে ছুটে যেতে লাগলেন। 'হামরাউল আসাদ' এসে মুসলিম বাহিনীর মুখোমুখি হওয়া তো দূরের কথা; বরং পরাজিত সৈন্যদের সেনাপতির মতো তিনি ক্রমেই 'পলায়নের' গতি বাড়িয়ে দিচ্ছিলেন। বলা তো যায় না, মুসলিম বাহিনী 'হামরাউল আসাদ' থেকে এদিকেই আবার ছুটে না আসে!
'হামরাউল আসাদ'-এ তিনদিন অবস্থান করে ১৯ তারিখ আবার ফিরে এলেন আল্লাহ্র রাসূল মদীনায়। আমার কোল ঘেঁষেই মদীনায় প্রবেশ করছিলেন আল্লাহ্র রাসূল ও সাহাবীরা। তাঁরা আমার দিকে তাকাচ্ছিলেন কৃতজ্ঞতাভরা দৃষ্টিতে, ভালোবাসাপূর্ণ দৃষ্টিতে! তাঁরা আমাকে ভালোবাসেন, আমিও তাঁদেরকে ভালোবাসি! এ-ভালোবাসার কথা আমার মুখের দাবি নয়- এর ঘোষণা দিয়েছেন আল্লাহ্ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে এই বলে-
جبل أحد يحبنا ونحبه وهو من جبال الجنة
ওহুদ পাহাড় ভালোবাসে আমাদেরকে আমরাও ভালোবাসি তাকে। ওহুদ জান্নাতের একটি পাহাড়।
যুদ্ধ যখন ওদের হাতের মুঠোয় চলে গিয়েছিল তখন আমি তাঁদের পেছন দিকে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম-যে! কিন্তু মুসলিম উম্মাহর জন্যে আমি একটি শিক্ষাও বটে। এ-শিক্ষা হলো- সেনাপতির নির্দেশ অলঙ্ঘনীয়। পাশাপাশি এ-শিক্ষাও লুকিয়ে আছে আমার চোখের সামনে ঘটে-যাওয়া এ যুদ্ধে- যদি থাকে ইসলামের আদর্শের জন্যে আত্মনিবেদনের দৃঢ় প্রত্যয় ও দীপ্ত অঙ্গীকার, তাহলে হাজার বিপর্যয়েও সাফল্য অনিবার্য! যুদ্ধের হিসাবে মুসলিম বাহিনী সীমাহীন ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আত্মনিবেদনের এ-প্রত্যয়ই শেষ পর্যন্ত তাঁদেরকে সব বিপর্যয় কাটিয়ে বিজয় পাইয়ে দিয়েছিল।
হ্যাঁ, আমি এখনো আছি। ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে, সেই ত্যাগময় বীরত্বময় যুদ্ধের সাক্ষী হয়ে। দাঁড়িয়ে আছি একেবারে মদীনার কোল ঘেঁষেই। আমাকে যারা দেখতে আসে, আমার পাশে শুয়ে থাকা শহীদানের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে যারা অশ্রু ঝরায়, বাতিলের মুকাবিলায় জীবনপণ লড়াইয়ের শপথ নেয়, তাদের কানে কানে আমার বলতে ইচ্ছে করে- তোমরাও বুঝি আমাকে ভালোবাসো, নবীকে ভালোবাসো, নবীর সাহাবীদেরকে ভালোবাসো!
তাহলে শোনো- আমিও তোমাদেরকে ভালোবাসি!
টিকাঃ
১. إن رأيتمونا تخطفنا الطير فلا تبرحوا مكانكم هذا حتى أرسল إليكم وإن رأيتمونا هزمنا القوم وأوطأناهم فلا تبرحوا حتى أرسل إليكم . (صحيح البخاري)