📄 আমি সাপ
আমি জানি, তোমরা সবাই এক যোগে বলবে, "নাউযুবিল্লাহ্—বাঁচাও! বাঁচাও!! আল্লাহ পানাহ্'! না বন্ধু, ভয় পাওয়ার কিছু নেই, আমি অনেক দূরে! তা ছাড়া সব সাপ সব মানুষকে দংশন করে না, সে কথা আমার কাহিনী শুনলেই বুঝতে পারবে।
আমার জন্ম অনেক অনে-ক কাল আগে। আমি থাকতাম মক্কা নগরীর একটা পুরোনো ভবনের ফাটলে। ভবনটার নাম 'দারুন নাদওয়া'-পরামর্শকেন্দ্র। সেখানে সবাই এসে জড়ো হতো এবং নানা বিষয়ে সলা-পরামর্শ করতো। একদিন আমি আমার 'ঘর' থেকে বের হয়ে দেখি, জমকালো পোশাক-পরা একটা 'মানুষ'। একটু গভীর করে তাকালাম। হুঁ, চিনতে এবার মোটেই অসুবিধা হয় নি। ও মানুষ না, শয়তান—জলজ্যান্ত শয়তান। আমি বললাম:
-তোকে আমি ঠিকই চিনতে পেরেছি। তুই ইবলিস—শয়তান!
-সাবধান, আস্তে কথা বল্! আমার নাম ধরে চিল্লাচিল্লি করবি না, কেউ শোনে ফেলতে পারে!
-কিন্তু তুই এখানে কেন? এখানে তো তোর থাকার কথা না! কোন্ মতলবে এসেছিস্?
-আমি মুহাম্মদকে চাই! তার কবল থেকে মুক্তি চাই! এই লোক সারাটা দুনিয়া উলট-পালট করে দিচ্ছে! তার হৃদয় থেকে এমন একটা আলো বিচ্ছুরিত হয়, যা শয়তানদের চোখের আলো কেড়ে নেয়! এই সাপ! তুই তো জীবনে আমার অনেক উপকার করেছিস, আজ শেষ উপকারটা করবি?
আমি শয়তানের দিকে তাকিয়ে রইলাম। তার কথার কোনো উত্তর করলাম না। আমি জীবনে এই ইবলিসকে বিভিন্ন অপরাধ সংঘটনে অনেক সহযোগিতা করেছি। এ জন্যে সব সময় মানুষের কাছে আমি ঘৃণার পাত্র, মূর্তিমান আতঙ্ক। আমাকে দেখলেই মানুষ ছুটে পালায়। হায়! আমার দংশনে কতো নিরপরাধ মানুষ অকালে ঝরে পড়েছে!
এখন আমার মনে একটা উত্তম চিন্তার উদয় ঘটেছে। অর্থাৎ আমি চাইছি, জীবনটাকে অপরাধের অন্ধকার থেকে এবার টেনে তোলবো। আর না, কোনো মানুষকে আর বিষায়িত করবো না—ছোবল দেবো না। ইবলিসকে আর সহযোগিতা দেবো না। ইবলিসের কথায় উত্তর না করে আমি এ-সবই ভাবছিলাম। আমি আরো ভাবছিলাম, কী করে ইবলিসকে মুহাম্মদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়া যায়। এর মাঝেই দেখলাম একদল মানুষ হুড়হুড় করে 'দারুন নাদওয়ায়' এসে ঢুকলো। আমি তড়িৎ গতিতে সুরঙ্গে লুকিয়ে গেলাম। তবে কান পেতে রইলাম ওদের কথাবার্তা শোনার জন্যে। বিশেষ করে ইবলিস কী বলে তা শুনতে উৎকর্ণ হয়ে রইলাম।
সবাই বসলো। আলোচনা শুরু হলো। কী করে মুহাম্মদ-এর কবল থেকে মুক্তি লাভ করা যায় এবং কী করে তার নতুন দাওয়াতকে স্তব্ধ করে দেয়া যায়—এ-সব নিয়েই গরম গরম আলোচনা শুরু হলো।
একজন বললো: -তাকে বন্দি করে রাখলে কেমন হয়?
ইবলিস নড়েচড়ে বসলো, বললো: -না, এটা কোনো জুতসই কাজ হবে না, যে কোনো সময় সে পালিয়ে যাবে।
আরেকজন বললো: -তাহলে চলো তাকে শহর থেকে বের করে দিই!
ইবলিস এবারও বাধ সাধলো, বললো: -লাভ নেই, আবার ফিরে আসবে!
এভাবে বিভিন্ন জন বিভিন্ন মতামত প্রকাশ করলো। কিন্তু একটা প্রস্তাবও মানুষরূপী ইবলিসের মনমতো হলো না। অবশেষে ইবলিস নিজেই একটা নতুন প্রস্তাব পেশ করলো। যেমন ইবলিস তেমন প্রস্তাব। বললো: -আমি মনে করি; মুহাম্মদকে একেবারে দুনিয়া থেকেই সরিয়ে দিতে হবে। এ ছাড়া তার কবল থেকে পুরোপুরি মুক্তি লাভ করা যাবে না। এখন প্রশ্ন হলো, কী উপায়ে আমরা তাকে হত্যা করবো। এ জন্যে আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে। তা হলো, প্রত্যেক গোত্র থেকে একজন শক্তিশালী যুবককে আমরা বাছাই করবো। তারা সবাই রাতের আঁধারে এক যোগে ঝাঁপিয়ে পড়বে, মুহূর্তেই মুহাম্মদকে শেষ করে দেবে। তাহলে তার গোত্র আর এ-হত্যার বদলা নিতে পারবে না! উপস্থিত সকলেই হর্ষধ্বনি করে উঠলো: -খাসা প্রস্তাব! খাসা বুদ্ধি!! এমন সুন্দর একটা প্রস্তাব দেয়ার জন্যে সবাই তাকে ধন্যবাদ জানালো।
এরপর শুরু হলো প্রস্তাব বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া। আমি আমার ‘কুটির’ থেকে বেরিয়ে এলাম। রাতের আঁধারকে আশ্রয় করে আমি মুহাম্মদের ঘরের দিকে ছুটে গেলাম। গিয়ে দেখলাম; পরিস্থিতি মোটেই ভালো না। সবাই নাঙা তলোয়ার হাতে তাঁর ঘরটিকে ইতিমধ্যে ঘিরে ফেলেছে। জিঘাংসা-কাতর দৃষ্টিতে অপেক্ষা করছে তাঁর বাইরে আসার। এলেই সবাই এক যোগে তাঁর উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে, তাঁকে শেষ করে দেবে!
ওরা মাঝে মাঝে দরোজার ছিদ্র দিয়ে দেখে নিচ্ছিলো বিছানায় মুহাম্মদ আছে কি না। এদিকে হঠাৎ কী-যে ঘটলো কিছুই বুঝতে পারলাম না। দেখলাম ঘরটিকে ঘিরে- রাখা সবগুলো মানুষ ঘুমে ঢুলুঢুলু করছে। কোত্থেকে যেনো ওদের চোখে রাজ্যের ঘুম নেমে এসেছে। এমনকি আমিও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম না। সবার মতো আমিও কী এক আশ্চর্য গাঢ় নিদ্রায় নিজের অনিচ্ছায় ঢলে পড়লাম!
সূর্যিটা যখন ওদের গায়ে সকাল বেলার 'মিষ্টি পরশ' বুলিয়ে দিলো তখন ওরা জাগলো। পরিস্থিতির আকস্মিকতায় ওরা বিস্মিত! ওরা বুঝতে পারছিলো না- এ কী ঘুম পেয়েছিলো ওদেরকে! সেই 'মায়াবী' ঘুমের রেশ মুখে নিয়ে ওরা ছুটে গেলো দরোজায়! ছিদ্র দিয়ে দেখলো, মুহাম্মদের বিছানায় যে শুয়েছিলো সে মুহাম্মদ নয়- আলী! ওদের মাথায় যেনো তলোয়ারের আঘাত পড়লো!
বন্ধু! আলী কেনো শুয়েছিলেন আল্লাহ্র রাসূলের বিছানায়? উত্তর হলো, নবীজীরই নির্দেশে। নবীজীর ইয়েমেনী সবুজ চাদরটা মুড়ি দিয়ে শুয়েছিলেন তিনি। নবীজী তাঁকে রেখেই এক সময় বেরিয়ে গেছেন, রাতের অন্ধকারে! আর তাঁকে দিয়ে গেছেন অভয়! প্রিয় নবী'র অভয়বাণী শুনে কেনো তবে ভয় পাবেন বীর আলী? যুবক আলী? ভবিষ্যতের খায়বারের দুর্গদ্বার বিজয়ী আলী? বয়স তাঁর কতোই বা হবে, কিন্তু বীরত্ব ছিলো তাঁর স্বভাব গুণ! তাই এক ঝাঁক নাঙা তলোয়ারের নিচে শুয়ে থাকতে তাঁর একটুও ভয় লাগে নি! বীরপুরুষ এমনই হয়! নবী-প্রেমিকরা এমনই হয়!
মূল ঘটনায় ফিরে আসি। আলী বের হয়ে আসতেই সবাই তাকে ঘিরে ধরলো। জাপটে ধরলো। প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে যেতে লাগলো।
-তুমি?! তুমি কেনো এখানে?
-জলদি বলো, মুহাম্মদ কোথায়?
-বলো, রাতে কোথায় ছিলো মুহাম্মদ?
স-ব প্রশ্নের জবাবে বীর যুবক আলী'র এক জবাব: -আমি জানি না! আমি জানি না!!
সবাই তখন আলীকে কা'বা চত্বরের দিকে ধরে নিয়ে গেলো। কেউ কেউ তার গায়ে হাতও তুললো। কিন্তু বিশেষ কিছু উদ্ঘাটিত না হওয়ায় ওরা কিছুক্ষণ পর এই আত্মোৎসর্গী বীরকে ছেড়ে দিলো। মুক্ত বীর এখন আনন্দ-বিহ্বল। এতো বড় দায়িত্ব পালন করতে পারলে কে-না আনন্দ-প্লাবিত হয়! তার সমানে এখন আরেকটা দায়িত্ব আছে। নবীর কাছে গচ্ছিত রাখা আমানতের মাল মালিকের নিকট পৌঁছে দেয়া!
মুহাম্মদ ও আবু বকর ইতিমধ্যে বেরিয়ে পড়েছেন মক্কা থেকে। সেই মক্কা, যেখানে পেয়েছেন তাঁরা কেবলই কঠোরতা, শুধুই পৈশাচিকতা! একদল মানুষের বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতা! এদিকে ইবলিস ঘটনা জানতে পেরে চীৎকার জুড়ে দিলো: -কী করে সে অতগুলো সশস্ত্র মানুষের চোখে 'ধুলো দিয়ে' চলে যেতে পারলো! এরপর ইবলিসটা আমার দিকে চোখ লাল করে তাকিয়ে বললো: -এই সাপ! তুই কোথায় ছিলি! কেনো মুহাম্মদের পথ আগলে দাঁড়াস নি! আমি বললাম: -সে আর পারলাম কই! তিনি আমার আগেই তো চলে গেলেন! নজদের শায়খরূপী ইবলিস এবার জ্বলে উঠলো: -মিথ্যে বলছিস তুই! ইচ্ছে করলেই বাধা দিতে পারতিস! অন্য সাপদেরকে জানিয়ে দিলি না কেন? তাহলেই তো কেউ-না-কেউ ছোবল বসিয়ে দিতে পারতো! তুই একটা অপদার্থ! মনে রাখিস্! আমি তোরে উচিত শিক্ষা দেবো! এ-কথা বলে ইবলিস হনহন করে চলে গেলো। উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে সুরাকা বিন মালিককে বললো: 'তাড়াতাড়ি মুহাম্মদের খোঁজ লাগাও! পুরস্কার পাবে, মোটা পুরস্কার!
মুহাম্মদ এবং প্রিয় সাহাবী আবু বকর গিয়ে আশ্রয় নিলেন গারে সাওরে। আত্মগোপন করে থাকলেন। সে গুহায় ছিলো অনেক ছিদ্র। ছিদ্রে ছিদ্রে ছিলো সাপের বসবাস। এরা সবাই আমার এবং ইবলিসের নির্দেশের অপেক্ষায় বসে ছিলো। আবু বকর ব্যাপারটা চিন্তা করে অনেক সতর্ক ছিলেন। সাপেরা আমাকে পরে জানিয়েছে যে আবু বকর প্রথমে মুহাম্মদকে ঢুকতে দেন নি। বরং নিজে ঢুকে সাপের ছিদ্রগুলো একে একে বন্ধ করে দিয়েছিলেন— নিজের পোশাক ছিঁড়ে ছিঁড়ে। সবগুলো ছিদ্রের মুখ তিনি বন্ধ করতে পারলেও কাপড়ের টুকরো শেষ হয়ে যাওয়াতে একটা ছিদ্র বন্ধ করতে পারলেন না। অগত্যা সেখানে নিজের প্রিয় পা'টাই দিয়ে রাখলেন! প্রিয়কে বিপদমুক্ত রাখতে প্রিয় উৎসর্গ করার কী আশ্চর্য সুন্দর দৃষ্টান্ত!
তখন যা ঘটা স্বাভাবিক ছিলো তাই ঘটলো! একটি সাপ মুহাম্মদের প্রিয় বন্ধুটির প্রিয় পা'টায় ছোবল মারলো! নবীজী তখন আবু বকরের উরুতে মাথা রেখে আরাম করছিলেন। তাই তীব্র ব্যথা সত্ত্বেও আবু বকর নড়লেন না, সাপের নীল বিষ নিয়েই নীরবে বসে রইলেন। তাঁর চোখ বেয়ে বেয়ে পড়ছিলো বেদনা-সঞ্জাত টপটপ 'নীল' অশ্রু! আল্লাহ্র রাসূলের গালে এসে পড়লো যখন সেই গরম অশ্রুর একটা ফোঁটা তখন তাঁর নিদ্রা ভেঙে গেলো। দেখলেন আবু বকর কাঁদছেন নীরবে। কারণটা জানলেন। তারপর নিজের মুখের একটু লালা লাগিয়ে দিলেন আক্রান্ত স্থানে। নিমেষেই ব্যথা দূর হয়ে গেলো! আবু বকর পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াতেও পারলেন! যেনো কিছুই হয় নি!!
তিনদিন পর তিনি মুহাম্মদকে নিয়ে বের হয়ে গেলেন গারে সাওর থেকে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ছুটে চললেন মদীনার দিকে। তাঁদেরকে কেউ আটকাতে পারলো না। না ইবলিস। না আমি এবং আমার সঙ্গীরা। না শত উট-লোভী সুরাকা। আল্লাহ মুহাম্মদকে হিফাযত করেছেন। তিনিই সর্বোত্তম হিফাযতকারী। তিনি যা চান তাই হয়, যা চান না তা হয় না! তাঁর ইচ্ছাই সব সময় কার্যকর হয়। ইন্নাহু ফা'আলুল্ লিমা ইয়ূরিদ!
وَإِذْ يَمْكُرُ بِكَ الَّذِينَ كَفَرُوا لِيُثْبِتُوكَ أَوْ يَقْتُلُوكَ أَوْ يُخْرِجُوكَ وَيَمْكُرُونَ وَيَمْكُرُ اللَّهُ وَاللَّهُ খَيْرُ الْمَاكِرِينَ .
'আর যখন কাফেররা তোমাকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করছিলো তোমাকে বন্দি করতে অথবা তোমাকে হত্যা করতে কিংবা (মক্কা থেকে) বের করে দিতে, তারা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিলো, আল্লাহ্ (তোমাকে উদ্ধারের জন্যে) কৌশল করছিলেন, আর আল্লাহই সর্বশ্রেষ্ঠ কুশলী।' -সূরা আনফাল
📄 আমি কবুতর বলছি
আমি সাদা রঙের। মানুষ আমাকে শান্তির প্রতীক মনে করে, বলে— ‘শান্তির পায়রা’। এ জন্যেই বুঝি আমাকে নিয়ে কবিরা লিখেছেন কবিতা, গেয়েছেন শান্তির জয়গান। শিল্পের রঙধনুতে রাঙিয়ে দিয়েছেন কবিতার আকাশ। লেখকেরা আমার বর্ণনায় লিখেছেন পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা। গেয়েছেন কতো স্তুতিগান। তাদের সব সৃষ্টিগাথার সার কথা একটাই— আমি শান্তি ও সমৃদ্ধির আধার। কিন্তু এ-সবে আমার তেমন গা নেই। গর্ব করার মতোও কিছু খুঁজে পাই না। আমার গর্ব ও মর্যাদার উৎস অন্যখানে। হ্যাঁ, সে কথা বলতেই আমি তোমাদের মাথার উপর উড়ছি। একটু বসতে দেবে?...
তাহলে শোনো সে গর্বের কাহিনী—
মসজিদুল হারামের আকাশটাই আমার ঠিকানা— বিচরণক্ষেত্র। মনে চাইলে ডানা মেলে মনের সুখে এখান থেকে ওখানে যাই। ওখান থেকে এখানে আসি। উড়ে উড়ে দেখি মসজিদুল হারামের শোভা। আরো দেখি কা’বা-কেন্দ্রিক তাওয়াফকারীদের ‘অবিরাম’ ছুটে চলা। কখনো এসে নামি কা’বা চত্বরে। এটা সেটা কুড়িয়ে খাই, নির্ভয়ে। কেউ আমার কোনো ক্ষতি করে না। বরং আমার কাছে এসে দাঁড়িয়ে থাকে, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আমাকে দেখে। ‘কেউ কেউ তো আমার মাথায় আদর করে হাত রাখে—দিয়ে যায় স্নেহভরা কর-স্পর্শ’! তখন আমার খুব ভালো লাগে। সবাইকে বন্ধু-বন্ধু লাগে। কখনো আমি নীরবে তাকিয়ে থাকি কা’বার স্বর্গীয় সৌন্দর্যের দিকে। উপভোগ করি তার শোভা। ভাবি, কী সুন্দর কা’বার শোভা! এ-শোভায় কী মায়া! কী মায়া!!
সেদিন সকালে আমি মক্কার অদূরে একটা গুহার উপরে উড়ছিলাম। ডিম পাড়ার একটা উপযুক্ত জায়গা খুঁজছিলাম। ডিমে তা দিয়ে দু'টি বাচ্ছা ফোটানোর জন্যে জায়গাটা নিরিবিলি হওয়া জরুরী। এই গুহাটা আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। কিন্তু অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করলাম অনেক সাপ গুহাটায়। মনে হলো, ওরা যেনো কারো অপেক্ষা করছে। আমি গুহায় নামতে পারলাম না। নামলেই-যে ওরা আমাকে ছোবল দেবে, এতে আমার কোনো সন্দেহ নেই। এর মধ্যে একটা মাকড়সার সাথে আমার দেখা হয়ে গেলো। আমি ওর কাছে জানতে চাইলাম: -এই, এখানে এতো সাপ কেনো? কেনো ওরা ভীড় করেছে?
মাকড়সাটি বললো: -আমি ঠিক জানি না। তবে শুনেছি, মক্কার বড় সাপটা নাকি সবাইকে এখানে আসার নির্দেশ দিয়েছে। উদ্দেশ্য হলো, দু'জন মানুষের পথে বাধা সৃষ্টি করা।
আমি জানতে চাইলাম: -কোন্ দু'জন? কে তারা? তাদেরকে বাধা দিতে হবে কেনো?
মাকড়সা বললো: -আমি ঠিক জানি না। তবে তুমি তো আকাশে উড়তে পারো। দেখোই-না একটু, কোথাও কিছু নজরে পড়ে কি না!
আমি উড়াল দিলাম। অনেক উপরে উঠে এলাম। বেশ খানিকটা দূরত্ব অতিক্রম করার পর দেখতে পেলাম আবু বকরকে সাথে নিয়ে আল্লাহ্র রাসূল এ-দিকে আসছেন। তাঁদের মাঝে কথা হচ্ছিলো একটা নিরাপদ আশ্রয় নিয়ে, যেখানে কয়েকটা দিন আত্মগোপন করে থাকা যাবে। আমি বুঝতে পারলাম, আগে থেকেই তাঁরা এ-গুহাটা নির্বাচন করে রেখেছিলেন। তাঁদের পরবর্তী গন্তব্য ইয়াসরিব-মদীনা। আমি তাঁদের আগে আগে উড়তে লাগলাম। তাঁদেরকে 'পথ দেখাতে' লাগলাম। নবীজী এবং আবু বকরের জন্যে আমার মনটা হঠাৎ কেঁপে উঠলো। এই-যে তাঁরা গুহায় যাচ্ছেন, সেখানে তো অনেক সাপ! কেমন করে তাঁরা সেখানে থাকবেন? রাত কাটাবেন? একাধারে কয়েকদিন?
সাপ-কোপের বিষয়টা আমাকে উদ্বিগ্ন করে তুললো। এদিকে মক্কার কাফির মুশরিকরাও নিঃসন্দেহে তাঁদের পিছু নেবে। একটা অজানা আশঙ্কায় আমার মনটা আবার কেঁপে উঠলো। হায়, কী অবস্থা! সামনে সাপ! পেছনে শত্রু! সব মিলিয়ে আমার খুব ভয় করছিলো। তাঁদের বিপদের আশঙ্কায় আমার বুকটা দুরুদুরু করতে লাগলো। কিন্তু আল-হামদুলিল্লাহ! আমি স্বস্তি ফিরে পেলাম যখন দেখলাম, আবু বকর আগে গিয়ে সবগুলো গর্ত কাপড় দিয়ে বন্ধ করে দিলেন। একটা গর্ত কাপড়ের অভাবে বন্ধ করা গেলো না। আহা, আমি যদি সেটি আমার শরীর বিছিয়ে বন্ধ করতে পারতাম! হায়! আমি যদি আরো আগে এসে গুহাটা সাফ করে দিতে পারতাম!
মাকড়সাটিও দেখলাম ঐ গর্তটা খোলা থাকায় আমার মতোই ভীষণ উদ্বিগ্ন। কিন্তু সেরা নবীর সেরা উম্মত হযরত আবু বকর আমাদের দুশ্চিন্তা স্থায়ী হতে দিলেন না। তিনি নিজেই তা পা দিয়ে বন্ধ করে দিলেন! আল্লাহু আকবার! নবীজীর জন্যে কী তাঁর মায়া ও দরদ! সাপের কামড়ে দংশিত হওয়ার আশঙ্কাকে কী অবলীলায় তিনি উপেক্ষা করলেন, শুধু প্রিয়নবীর নিরাপত্তার কথা ভেবে!
আমি কোথাও স্থির হয়ে বসতে পারছিলাম না। কেবল এদিক ওদিক ওড়াউড়ি করছিলাম। ভয়ে উদ্বেগে। মাকড়সা আমার এ অবস্থা দেখে বললো:
-কী ব্যাপার! তুমি এতো অস্থির যে! ডিম পাড়ার একটা ভালো জায়গা খুঁজে নিলেই পারো! অমন অস্থির হয়ে ওড়াউড়ি করছো কেনো?
আমি বললাম: -বন্ধু! আমি ডিমপাড়া নিয়ে ভাবছি না। আমি আশঙ্কা করছি নবীজী এবং আবু বকরের কোনো বিপদ না হয়! কাফির মুশরিকরা কখন এখানে ছুটে আসে— বলা তো যায় না!
এই বলে আমি মক্কার দিকে উড়ে গেলাম। অনেক দূর যাওয়ার পর আবার ফিরে এলাম। ফিরে এলাম রাজ্যের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে! এসেই মাকড়সাকে বললাম: -বন্ধু! একটু ভেবে দেখেছো কি, কাফির মুশরিকরা এখানে চলে এলে তাঁদের কী অবস্থা হবে? বাঁচার তো আমি বাহ্যিক কোনো উপায় দেখছি না! আমরা কি কিছু একটা করতে পারি না!
মাকড়সা একটু চুপ থেকে বললো: -আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে! আমি এই মুহূর্তে গুহাটার মুখে জাল বুনে মুখটাকে ছেয়ে ফেলবো!
আমি তো অমন অদ্ভুত প্রস্তাবের কথা শুনে প্রথমটায় হেসেই উড়িয়ে দিতে যাচ্ছিলাম। বুঝতেই পারছিলাম না মাকড়সার পাতলা জালে কী করে গুহার মুখ আটকে দেওয়া সম্ভব! কিন্তু পরক্ষণেই মনে এলো— না, এটা চমৎকার একটা কৌশল! এ ছাড়া আমিও তো তার সাথে যোগ দিতে পারি!
তাই করলাম। মাকড়সা দ্রুত জাল বুনে যেতে লাগলো আর আমি গুহার মুখের কাছেই একটা ‘বাসা’ তৈরী করে ডিম পাড়লাম এবং তা দিতে লাগলাম!
আমার আশঙ্কাই সত্য হলো। কাফেররা সত্যি সত্যি চলে এলো। একেবারে গুহার মুখে। আমি কান পেতে রইলাম। হঠাৎ শুনতে পেলাম ওরা বলছে:
-মুহাম্মদ ও আবু বকর এখানে এই গুহাটায় লুকিয়ে নেই তো!
-হয়তো বা!
-অবশ্যই তারা এখানে আছে!
আরেকজন বললো:
-অসম্ভব! এখানে থাকবে কী করে! এটা তো সাপ-কোপে ভরা!
এভাবে ওদের মধ্যে কথা কাটাকাটি চলতে লাগলো।
একজন বলে: -প্রবেশ করবো..
আকেজন বলে: -না, প্রবেশ করবো না!
আরেকজন বলে: -কেনো ঢুকবো না? দেখতে অসুবিধা কী?
অপরজন উত্তর দেয়: -কেনো ঢুকবো? শুধু শুধু সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয়?
এভাবে আওয়াজ উচ্চ হতে লাগলো। মতবিরোধ বাড়তে লাগলো। একজন বেশ বুদ্ধিমানের মতোই বললো:
-চলো তো! এখানে কালক্ষেপণ করে লাভ নেই! এখানে দীর্ঘদিন কেউ ঢুকে নি!
আরেকজন বললো: -কী করে বুঝলে?
-কী করে বুঝলাম মানে? তুমি দেখছি একটা হাদারাম, চেয়ে দেখো; মাকড়সা গুহার মুখে কেমন জাল বুনে বসে আছে! কেউ ঢুকলে কি আর এই জাল অক্ষত থাকে, না মাকড়সা থাকতে পারে?! তা ছাড়া ওই যে দেখো; একটা কবুতর ডিমে তা দিচ্ছে! কেউ এখানে ঢুকলে কবুতরটা কি এখানে কি অমন করে বসে থাকতো? বরং ডিমগুলো ভেঙে পড়ে থাকতো! নিশ্চিত এখানে অনেক দিন কেউ আসে নি!
সবাই তার কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বললো: -তুমি ঠিকই বলেছো! আমরা এ-সব চিন্তা করে দেখি নি! এখানে কেউ থাকতে পারে না। চলো.. চলো!
এরা দূরে চলে গেলো! আরো দূরে! আ-রো দূরে! আমরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম! যেই ওরা দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেলো, অমনি আমি বাসা ছেড়ে আকাশে উড়াল দিলাম! ডানা ঝাপটে আনন্দ প্রকাশ করতে লাগলাম! আর বন্ধু মাকড়সাটি সরচিত জালে মনের হরষে নাচতে লাগলো! আহা, যদি আমাদের মনের এ বান-ডাকা আনন্দ-স্রোত তাঁদের সামনে বইয়ে দিতে পারতাম-প্রকাশ করতে পারতাম! যদি তাঁদের বোধগম্য ভাষায় বলতে পারতাম- আমরাও তোমাকে ভালোবাসি হে নবী! আমরাও তোমাদের হিজরতের এ-অভিযানে সঙ্গে আছি হে প্রিয়!
তিনদিন পর নবীজী এবং আবু বকর আত্মগোপন থেকে বেরিয়ে নতুন করে পথচলা শুরু করলেন। গারে সাওর ছিলো তিনদিনের আশ্রয়স্থল। এখন গন্তব্য ইয়াসরিব- মদীনা। আমি তাঁদের মাথার উপর দিয়ে উড়ে উড়ে ডানা ঝাপটে তাদের উদ্দেশে বলতে লাগলাম-মা'আস্ সালামাহ! নিরাপদে পৌঁছো তোমরা মদীনায়!
﴿ إِلَّا تَنْصُرُوْهُ فَقَدْ نَصَرَهُ اللَّهُ إِذْ أَخْرَجَهُ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا ثَانِيَ اثْنَيْنِ إِذْ هُمَا فِي الْغَارِ إِذْ يَقُوْلُ لِصَاحِبِهِ لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا فَأَنْزَلَ اللَّهُ سَكَيْنَتَهُ عَلَيْهِ وَأَيَّدَهُ بِجُنُوْدٍ لَمْ تَرَوْهَا وَجَعَلَ كَلِمَةَ الَّذِيْنَ كَفَرُوا السُّفْلَى وَكَلِمَةُ اللَّهِ هِيَ الْعُلْيَا وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ ﴾
'যদি তোমরা তাঁকে (রাসূলকে) সাহায্য না করো, তবে মনে রেখো, অবশ্যই আল্লাহ তাঁকে সাহায্য করেছিলেন, যখন কাফেররা তাঁকে (মক্কা থেকে) বের করে দিয়েছিলেন, তিনি (নবী) ছিলেন দু'জনের একজন, যখন তাঁরা গুহার মধ্যে ছিলেন। তখন তিনি নিজের সঙ্গীকে বললেন, দুশ্চিন্তার কী আছে, আল্লাহ আমাদের সাথেই আছেন। অতঃপর আল্লাহ তাঁর প্রতি স্বীয় প্রশান্তি নাযিল করলেন এবং তাঁর সাহায্যে এমন বাহিনী পাঠালেন যা তোমরা দেখোনি। বস্তুত: আল্লাহ কাফেরদের মাথা নিচু করে দিলেন। আর আল্লাহর কথাই সদা চিরসমুন্নত। আল্লাহ পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়। -সূরা তাওবা
📄 আমি ঘোড়া
আমি যেতে চাই না তবু আমাকে যেতে হবে। কারণ আমার মনিব চান শত উটের পুরস্কার আর আমি চাই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবু বকর নিরাপদে পৌঁছে যান মদীনায়। শেষ পর্যন্ত আমার মনিবের ইচ্ছেরই জয় হলো। আমাকে বের হতেই হলো। লাগামটা-যে তার হাতে, যেদিকে টানেন সেদিকেই আমাকে যেতে হয়। আমার ইচ্ছে-অনিচ্ছে'র কোনো মূল্য নেই। মনিব বুঝলেন না আমার বোবা কান্না। মনিব অনুভব করলেন না আমার মুহাম্মদপ্রীতি। আশ্চর্য! জন্তু হয়ে আমি তাঁকে চিনলাম আর মানুষ হয়ে তিনি তাঁকে চিনলেন না। আমার মুহাম্মদপ্রীতির উপর চেপে বসলো তার সম্পদপ্রীতি। সম্পদের লালসা মানুষকে এতো অন্ধ করে দেয় কেনো?..
সময়টা ছিলো সকাল। মনিব সুরাকা বিন মালিক ছুটে চলেছেন সমুদ্র উপকুলের দিকে। উদ্দেশ্য মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ও আবু বকরকে ঠেকানো এবং কোরাইশের নিকট ধরিয়ে দেওয়া। সুরাকার মতো আরো অনেকেই এ-অভিযানে বেরিয়েছিলো। কারণ ঐ একটাই। কোরাইশ ঘোষণা দিয়েছে- যে বা যারা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জীবিত অথবা মৃত ধরে আনতে পারবে, তাদের জন্যে অপেক্ষা করছে শত উটের পুরস্কার!
বের হওয়ার মুহূর্তে ইবলিস-শয়তান আমাকে দাঁত খিঁচিয়ে বলে দিয়েছে, আমি যেনো সর্বশক্তি ব্যয় করে মনিবকে সহযোগিতা করি মুহাম্মদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবো। এতে নাকি সে আমাকে একটা নতুন জিন (ঘোড়ার গদি) আর আমার মালিককে একশত উট উপহার দেবে। আমি অবশ্য ইবলিসের পুরস্কারে একটুও লালায়িত (আগ্রহী) নই। কিন্তু আগেই যেমনটা বলেছি, আজ আমি আমার ইচ্ছে'র বিরুদ্ধে বের হয়েছি। আমার মনিব আমাকে মারধোর করে রাস্তায় টেনে এনেছেন। শক্ত হাতে লাগাম ধরে তিনি এগিয়ে চলেছেন। সাথে নিয়েছেন বর্শা ও তীর-ধনুক। আরো নিয়েছেন ভাগ্য পরীক্ষার কী সব 'হাবিজাবি'। এ-সব অস্ত্রের বিনিময়ে তিনি নাকি লড়বেন মুহাম্মদ ও আবু বকরের সাথে। তাদেরকে বন্দি করে নিয়ে আসবেন কোরাইশের কাছে কিংবা ওখানেই 'শেষ করে' দেবেন। কিন্তু আমার 'প্রাণিমন' কেনো জানি বারবার বলছিলো—
আজ জয় হবে সত্যের।
আজ জয় হবে ন্যায়ের।
আজ জয় হবে মুহাম্মদের।
অন্ধকার কি আলোর উদ্ভাস ঠেকাতে পারে?
সুরাকা বিন মালিক একজন শ্রেষ্ঠ ঘোড়সওয়ার। আরব অশ্বারোহী বাহিনীতে তাঁর একটা সুনাম আছে। আর আমি তাঁর চোখে এক শ্রেষ্ঠ ঘোড়া। তাই আমাদের এই অভিযানকে ঘিরে মক্কাবাসীদের মনে অনেক আশা-ভরসা। তাদের বিশ্বাস; আমরা সফল হবো এবং পুরস্কারটা আমরাই অর্জন করবো।
যাই হোক; অভিযান-সাফল্যের ব্যাপারে সুরাকাও বেশ আশাবাদী ছিলেন। সফলতার কাছাকাছি আমরা প্রায় পৌঁছেও গিয়েছিলাম। মুহাম্মদ ও তাঁর সঙ্গীকে আমরা প্রায় ধরেও ফেলেছিলাম। আমরা তাঁদের একেবারে কাছে চলে গিয়েছিলাম। আবু বকর তখন ভীষণ ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। তখন আল্লাহ্র রাসূল তাঁকে মনে করিয়ে দিলেন গুহায় বসে-বলা সেই উক্তিটি— আবু বকর! উদ্বেগের কিছুই নেই, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন!
কিন্তু অভিযানের চূড়ান্ত পর্বে এসে আমরাই রহস্যের জালে আটকা পড়ে গেলাম! তাঁদেরকে ধরে ফেলাটা যেখানে ছিলো সময়ের ব্যাপার, সেটিই এখন মনে হচ্ছে সুদূর পরাহত-অসম্ভব! আরেকটু খুলে বলি-
খুব সাবধানেই আমি পথ চলছিলাম। কিন্তু আচমকা আমি হোঁচট খেলাম, কোনো কারণ ছাড়াই। আমি অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করলাম, আমার মনিব তাল সামলাতে না পেরে জিন থেকে ছিটকে পড়ে গেছেন! অথচ এর আগে কখনো এমন হয় নি। ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে যাওয়া যে-কোনো ঘোড়সওয়ারের জন্যে অপমানজনক। আর সুরাকার মতো শ্রেষ্ঠ ঘোড়সওয়ার হলে তো আরো বেশী লজ্জা .. আরো বেশী অপমান!
আমার মনিব আবার উঠে দাঁড়ালেন। আবার আমার পিঠে চেপে বসলেন। এই আকস্মিক দুর্ঘটনায় যেমন ছিলেন তিনি বিস্মিত ও হতবাক তেমনি ছিলেন ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত। তার যেনো তর সইছিলো না। আবার সামনে বাড়তে লাগলেন। যেতে যেতে রাসূল এবং আবু বকরের একেবারে কাছে চলে গেলেন। আরো কাছে। আরো কাছে। রাসূলের কুরআন তিলাওয়াতের শব্দ তার কানে আসছিলো। তিনি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে তাঁদেরকে থামতে বললেন। তাঁরা থামলেন না। তখন তিনি তাঁদেরকে হত্যা করার হুমকি দিলেন। আরো কাছে চলে এলেন। এবার থামলেন তাঁরা। আল্লাহ্র রাসূল আকাশের দিকে তাকিয়ে আরশ-দোলানো কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন- 'ইয়া রব!' জানি না, কী ছিলো সেই কণ্ঠে! আবারও আমরা দুর্ঘটনার কবলে পড়লাম! এবার আমার সামনের পা দু'টি বালি-ঢাকা একটা পরিত্যক্ত কূপে কোমর পর্যন্ত ডুবে গেলো। সাথে সাথে মনিবের পা' দু'টিও ডুবে গেলো। একটু আগে মদীনাগামী মুহাম্মদ ও আবু বকরকে 'এই তো ধরে ফেলেছি!'-এর যে আনন্দে মনিব সাঁতার কাটছিলেন, তা যেনো এখন 'অতল' চোরাবালিতে তলিয়ে গেলো! আমি নিজের এবং মনিবের পা টেনে তোলার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলাম! আমাদের চোখে মুখে হতাশা ও অজানা আশঙ্কার কালো মেঘ ছায়া ফেলেছে! আমি ভীত কণ্ঠে হ্রেষাধ্বনি করতে লাগলাম! আর মনিব ভীতি-জড়ানো ব্যাকুল কণ্ঠে চীৎকার করে উঠলেন:
-ক্ষমা করো মুহাম্মদ! বাঁচাও আমাদেরকে! আমরা আর তোমার পিছু নেবো না! এই মুহূর্তে আমরা মক্কায় ফিরে যাচ্ছি!
এরপর আমরা অসহায় দৃষ্টিতে তাঁদের দিকে তাকিয়ে রইলাম। মনে হচ্ছিলো, সবাই আমাদেরকে এ-কঠিন দশায় ফেলে চলে যাবেন। কিন্তু না; আবদুল্লাহ বিন উরাইকিত আমাদের কাছে এলেন। ভাবছিলাম কী যেনো ঘটে! আমাদের দু'জনের পা'ই তখন জমিনে ডুবে আছে, তিনি আমাদেরকে মেরে ফেলবেন না তো! অসহায় মৃত্যুর কল্পনায় আমরা কাঁপছিলাম! কিন্তু আমরা যা ভাবলাম তা হলো না, যা ভাবি নি তাই হলো! তিনি এসে আমাদের পাশে দাঁড়ালেন। একটু নিচু হলেন। তারপর সুরাকা'র ডান পা'টি ধরে জোরে টান দিলেন এবং বের করে আনলেন! তারপর আমার কাছে এসে আমার ডান পা'টি ধরে টান দিলেন এবং বের করে আনতে সক্ষম হলেন! এরপর তিনি এলেন আমাদের বাম পাশে। সুরাকার বাম পা বের করার পর আমার বাম পা'টাও বের করে আনলেন। এরপর তিনি চলে গেলেন সঙ্গীদ্বয়ের কাছে। আমি নয়া জীবন ফিরে পেলাম। সম্ভবত আমার মনিবও। মনে মনে প্রতীজ্ঞা করলাম- আর না, এক্ষুণি আমি ফিরে যাবো মক্কায়।
কী অবিশ্বাস্য! জানি দুশমনের অমন উপকার ক'জন করে! আহা, কী মহা মানব এই মুহাম্মদ! নিজের লোক পাঠিয়ে বিপদমুক্ত করলেন নিজের জানের দুশমনকে! কিন্তু সুরাকা'র মনে কি মুহাম্মদের অদ্ভুত সুন্দর এই মানবীয় গুণের পরশ লেগেছিলো? না, লাগে নি! দুনিয়া-লোভীদের যা অবস্থা হয় আর কি! সুরাকা শিক্ষা নিলেন না। সুরাকা থামলেন না। তার কী-যে দুর্মতি হলো আমি বুঝতে পারলাম না! আবার তাকে লোভে পেয়ে বসলো! শত উটের লোভ! হায়রে লোভ! উপকারীর উপকার ভুলতে এই লোভ-কাতর মানুষটার একটু সময়ও লাগলো না! তিনি উঠে দাঁড়ালেন! সামনে বাড়তে লাগলেন! অনেক কাছেও চলে গেলেন! কিন্তু পারলেন না! হঠাৎ অনুভব করলেন প্রচণ্ড ব্যথা! তার কাছে মনে হচ্ছিলো তিনি যেনো আহত, মারাত্মক আহত! যেনো ক্ষতস্থান থেকে টপকে টপকে রক্ত ঝরছে! তিনি থেমে গেলেন। থমকে গেলেন। নিশ্চল স্তব্ধতায় দাঁড়িয়ে রইলেন! তারপর সকাতর চীৎকারে রাসূলকে আবার ডাকলেন, আরো কাতর কণ্ঠে! এবারের মতো ক্ষমা করে দেয়ার অনুরোধ করলেন! কসম করে বললেন— 'ক্ষমা করো হযরত!' মক্কায় ফিরে যাবোই! আর তোমার পিছু নেবো না, নেবোই না!
দয়াল নবীর মনে দয়ার ঢেউ উঠলো! তাই প্রাণশত্রুর কাতরতা তাঁকে কাতর করে তুললো! রাসূল তাকে ক্ষমা করে দিলেন! আমরা মুক্তি পেলাম! মুক্তির আনন্দে ভাসতে ভাসতে সুরাকা নবীজীর কাছে আবদার করে বললেন:
-মুহাম্মদ! আল্লাহ তোমার বিপদ-সহায়! আমি কেনো, কেউ তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না! এখন আমি কি তোমার কাছে একটা জিনিস চাইতে পারি!
হযরত আবু বকর জানতে চাইলেন: -কী!
সুরাকা বললেন: -আমি মুহাম্মদের কাছে একটা নিরাপত্তা-পত্র চাই—একটা অভয়-পত্র চাই, ভবিষ্যতে যাতে এই নিরাপত্তা-পত্রের আশ্রয়ে আমি তাঁর কাছে উপস্থিত হতে পারি! নবীজী আবদুল্লাহ বিন উরাইকিতকে নিরাপত্তা-পত্র লিখে দেয়ার নির্দেশ দিলে তিনি একটি চামড়ায় তা লিখে দিলেন। সুরাকা পত্রটি সসম্মানে সংরক্ষণ করলেন। তারপর তিনি নবীজীকে সহযোগিতা করতে চাইলেন। কিন্তু নবীজী জানিয়ে দিলেন—সহযোগিতার কোনো প্রয়োজন নেই আমাদের! তুমি শুধু আমাদের বিষয়টা গোপন রাখবে!
সুরাকা আবার আমার উপর সওয়ার হলেন, মক্কার পথ ধরলেন। ফিরে আসতে কী-যে ভালো লাগছিলো আমার, তা বোঝাই কোন্ ভাষায়? আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না যে আমি বেঁচে গেছি! অমন কঠিন অবস্থা থেকে বেঁচে আসা কি কল্পনা করা যায়? নবীজীর দয়া না হলে তা মোটেই সম্ভব ছিলো না! আমার মনিবেরও আনন্দের কোনো সীমা ছিলো না! যার সাথেই দেখা হচ্ছিলো তাকেই তিনি বলছিলেন—না, আমি মুহাম্মদ এবং তাঁর সাথীর কোনো হদিস পাই নি! তোমরা সব ফিরে যাও! তাঁকে খোঁজে কোনো লাভ নেই! তিনি ধরা-ছোঁয়ার বাইরে!
এদিকে আমার সাথে দেখা-হওয়া ঘোড়া গাধা ও উটদেরও আমি জানিয়ে দিলাম আমার ভাষায় ঐ একই কথা, যাতে তারা আর ব্যর্থ-চেষ্টা না করে। আমি এবং সুরাকা মিলে যা পারি নি, তারা কী করে পারবে? অসম্ভব!! আমরা যে-ঐশী ঝলক দেখে এসেছি তার সামনে সবাই ঝলসে যাবে! কী দরকার ঝলসে যাওয়ার? সুতরাং সবাই নিরাপদে ফিরে যাক, পরাজয় ঘটুক লোভের! বিজয় ঘটুক শুধু সত্যের! মুহাম্মদ ও তাঁর বন্ধু পৌঁছে যাক মদীনায় নিরাপদে, নির্বিঘ্নে, সমহিমায়, সগৌরবে!
يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَبِّكَ وَإِنْ لَمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ وَاللَّهُ يَعْصِمُكَ مِنَ النَّاسِ
‘হে রাসূল, পৌঁছে দিন আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে। আর যদি আপনি এরূপ না করেন, তবে আপনি তাঁর পয়গাম কিছুই পৌঁছালেন না। আল্লাহ আপনাকে মানুষের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করবেন।’ -সূরা মায়েদা
📄 আমি সেই বকরী
আমার মতো বকরী তোমরা অনেক দেখেছো, কিন্তু ঠিক আমাকে দেখো নি। কারণ আমার জন্ম সে-ই কবে, যখন আল্লাহ্র রাসূল হিজরত করেন মক্কা থেকে মদীনায়। আমি মক্কায়ও নয়, মদীনায়ও নয়, থাকতাম এ দু' শহরের মধ্যিখানে—উম্মে মা'বাদের তাঁবুতে। এক মহিয়সী নারী তিনি। তাঁবুবাসিনী হলেও তিনি ছিলেন ভীষণ উদার ও মায়াবিনী। উদারতা ও দয়ামায়ায় তিনি রাজপুরবাসিনীদেরকেও হার মানান। অনেক আদর-যত্নে আমাদেরকে পালতেন তিনি, যেনো আমরা তার হৃদয়ের টুকরো। কতোকালের আদুরে সন্তান।
একদিন উম্মে মা'বাদ তাঁবুতে বসে ছিলেন। সেদিন আমিও ছিলাম তাঁবুতে। তার স্বামী বেরিয়ে গিয়েছিলেন একটু আগে অন্যান্য বকরীর পাল নিয়ে, খাদ্যের খোঁজে। ঠিক সেই মুহূর্তে তাঁবুর সামনে এসে থামলেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবু বকর। তাঁরা উম্মে মা'বাদের কাছে এসে বিনয়-ধোওয়া ভঙ্গিতে জানতে চাইলেন:
খাওয়ার মতো কিছু হবে কি? খেজুর কিংবা গোশত বা অন্য কিছু? উপযুক্ত মূল্য দিয়ে তাঁরা তা কিনতে চান! কেননা ভীষণ ক্ষুধার্ত তাঁরা! এদিকে যেতে হবে আরো বহু দূরে, সেই ইয়াসরিবে!
তখন মহিয়সী উম্মে মা'বাদ দরদমাখা কণ্ঠে বললেন:
-আফসোস! আমার কাছে কিছুই-যে নেই! থাকলে তোমাদের মেহমানদারী করতাম! আমাদের অভাবের সংসার, এই আছে এই নেই! এখন আছি আমি 'নেই'-এর মাঝে কিছুই 'নেই'-এর মাঝে!
আমি তাঁবুতে বসে সব শুনলাম। মনটা কেমন যেনো ব্যাকুল হয়ে উঠলো। ক্ষুধায় কষ্ট পাবে তাঁরা, সে কেমন করে হয়? আমি চীৎকার জুড়ে দিলাম— ম্যাঁ.. ম্যাঁ.. ম্যাঁ ম্যাঁ!
এতোক্ষণ তো আমি নীরবই ছিলাম! তাহলে এখন কেনো এই চীৎকার? এর সঠিক ব্যাখ্যা আমার জানা নেই! তবে মনের ভিতর থেকে আমি একটা প্রেরণা ও তাগিদ অনুভব করছিলাম। মনে হচ্ছিলো, কে যেনো আমাকে ফিসফিসিয়ে বলছে:
-এই! চুপ করে আছো কেনো? কথা বলো! তোমার উপস্থিতি তাঁদের জানাও, জলদি জানাও!
তাই আমি 'ম্যাঁ-ম্যাঁ' করে উঠলাম! মুহাম্মদ আমার আওয়াজ শুনে উম্মে মা'বাদের কাছে আমার সম্পর্কে জানতে চাইলেন। উম্মে মা'বাদ জানালেন:
-এটি আমার অসুস্থ বকরীটি, ঠিকমত দাঁড়াতেই পারে না। অন্যান্য বকরীর সাথে চারণভূমিতেও যেতে পারছে না।
তাঁরা জিজ্ঞাসা করলেন:
-আসাছে, তোমার এই বকরীর ওলানে কি একটু দুধ হবে না!
উম্মে মা'বাদ বিস্ময়ঝরা কণ্ঠে বললেন: -দুধ! কোত্থেকে আসবে দুধ!! ও তো নিজেই ভীষণ দুর্বল! প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত!!
তবু আমি শুনলাম আল্লাহ্র রাসূল বললেন: -আমাকে একটু অনুমতি দেবে দোহন করার?
উম্মে মা'বাদ বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বললেন: -যদি তোমার মনে হয় ওর দুধ আছে তবে দোহন করো!'
আমি যখন শুনলাম উম্মে মা'বাদ অনুমতি দিয়েছেন, আমার আনন্দের কোনো সীমা রইলো না! আমি আবার 'ম্যাঁ-ম্যাঁ' বলে চীৎকার (না হর্ষধ্বনি?) করে উঠলাম! দুধ আমার ওলানে আছে কি নেই- সে বড় কথা নয়। আমি-যে আল্লাহ্র রাসূলের হাতের ছোঁয়া ও পরশ পেতে যাচ্ছি, সে-ই ভাগ্য! এদিকে উম্মে মা'বাদ নবীজীর আগ্রহের কারণে অনুমতি দিলেও তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে এক কাতরা দুধও আমার ওলান থেকে বের হবে না! তবু তিনি অনুমতি দিলেন! না দিয়ে পারলেন না! প্রার্থীর মুখের উপর 'না' বলে দেওয়া তার ধাঁচেই ছিলো না। তার তাঁবুতে এসে কেউ কিছু চাইবে আর তিনি 'না' করে দেবেন, সে কেমন করে হয়?
তাঁর বরকতপূর্ণ শ্রেষ্ঠ হাত এইমাত্র আমার ওলানকে স্পর্শ করলো! আর মুখে তখন উচ্চারিত হলো-
اللهُمَّ بَارِكْ لَهَا فِي عَنْزَتِها
হে আল্লাহ! তার বকরীতে বরকত দান করো!
আমি বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেলাম! বিশ্বাস করতে আমার কষ্ট হলো, এতো দুধও লুকিয়েছিলো আমার ওলানে! একটা পাত্র একেবারে টইটম্বুর! দুধপূর্ণ পাত্রটা তিনি এগিয়ে দিলেন বিস্মিত উম্মে মা'বাদের দিকে, পান করতে! উম্মে মা'বাদ কী আর পান করবেন! বিস্ময়ের ঘোরই-যে তার কাটছে না!! অবাক বিস্ময়ে পাত্রটির দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি বড় বড় চোখে, তাকিয়েই রইলেন! চোখের ভাষায় তিনি যেনো বলছিলেন: অবিশ্বাস্য, কী করে ওর ওলানে দুধ এলো! এবং এতো দুধ? একেবারে চর্বি-বাওয়া?! ফেনিল-শুভ্র?!
উম্মে মা'বাদ সামান্য একটু পান করেই মুখ উঠিয়ে নিলেন, যদি শেষ হয়ে যায়! কিন্তু আল্লাহ্র রাসূল তাকে আশ্বস্ত করলেন। আরো পান করতে বললেন। দুধে পূর্ণ আরেকটা পাত্র তাকে দেখালেন! এবার উম্মে মা'বাদ তার পাত্রের সবটুকু দুধ পান করলেন তৃপ্তিভরে। অপর পাত্রটি থেকে আবু বকর পান করলেন। সবার শেষে পান করলেন আল্লাহ্র রাসূল। এরপর আবার তিনি আমার কাছে এলেন। আবার আমার ওলানে হাত রাখলেন। আবার অনেক দুধ দোহন করলেন। এ-দুধটুকু তিনি উম্মে মা'বাদের হাতে তুলে দিলেন। তারপর তার সহৃদয় মেহমানদারির শোকর আদায় করে বিদায় নিয়ে আবার পথচলা শুরু করলেন মদীনার দিকে!
আবু মা'বাদ (উম্মে মা'বাদের স্বামী) সন্ধ্যে বেলায় ফিরে এলেন। ফিরলো দুবলা- পাতলা বকরীগুলোও। এদিকে ফিরেই স্ত্রীর হাতে পাত্রভরা দুধ দেখে তিনি তো অবাক! বললেন:
-দুধ! দুধ পেলে কোথায়? একটা দুধেল বকরীও তো তোমার কাছে রেখে যাই নি!
উম্মে মা'বাদ মুগ্ধতা ছড়ানো কণ্ঠে জবাব দিলেন: -আমাদের তাঁবুতে এসেছিলেন এক বরকতময় ব্যক্তি! এ-সব তাঁরই বরকতের 'বৃষ্টি'!
উম্মে মা'বাদ এরপর সবকিছুই স্বামীকে বললেন। তার স্বামী বলে উঠলেন:
-আহা! মনে হচ্ছে এ-ব্যক্তিই সেই মুহাম্মদ! তাঁকেই কোরাইশ হন্যে হয়ে খুঁজে ফিরছে। তাঁকে ওরা ধরতে চায়। তুমি আমাকে তাঁর একটা বর্ণনা দিতে পারো? দেখতে কেমন? আচরণ কেমন?
তাঁবুবাসিনী উম্মে মা'বাদ-এর 'কবিমনটা' যেনো এমনি একটা প্রশ্নের অপেক্ষায় ছিলো! তাই মুহাম্মদের কথা নিখুঁত ও সুন্দরভাবে বর্ণনা করতে তাকে একটুও বেগ পেতে হলো না—ভাবতে হলো না। এমনভাবে তিনি স্বামীকে শুনিয়ে গেলেন মুহাম্মদের কথা, যেনো তিনি চোখের সামনে মেলে-ধরা কোনো অলংকারসমৃদ্ধ হস্তলিপি পড়ছেন! তিনি বললেন: -তাঁর চেহারা নূর-ছাওয়া—আলোকোদ্ভাসিত! মুখে লেগে ছিলো মৃদু হাসির মিষ্টি টুকরো! কণ্ঠস্বর ভীষণ মনকাড়া, কথায় যেনো মধু ঝরে! দেখতে না লম্বা না খাটো! তাঁর দিকে তাকালে চোখ ফেরাতে মন চায় না— কেবল তাকিয়ে থাকতেই ইচ্ছে করে! তখন মনে খেলে যায় অদ্ভুত মজার একটা শিহরণ! সঙ্গীরা তাঁকে ভীষণ সম্মান করে! তিনি ভদ্র মার্জিত অভিজাত!!! মহান চরিত্রের অধিকারী! দুধ দোহনের পর সবার পান করা যখন শেষ, তাঁর পান করা তখন শুরু !!..
আবু মা'বাদ পান করতে লাগলেন সেই বরকতময় হাতের দোহন-করা দুধ, মুহাম্মদী বরকতের প্রতি আসক্ত ও লালায়িত হয়ে। শুধু দুধে নয়, তাঁবু ও তার আশপাশ—সর্বত্রই যেনো মুহাম্মদ রেখে গেছেন তাঁর বরকতের ছাপ! আবু মা'বাদ আবেগ-প্লাবিত কণ্ঠে বললেন: -ইনিই আল্লাহ্র রাসূল। তাঁর কথাই আমরা শুনেছি। আহা! তাঁর সাথে যদি আমার দেখাটা হয়ে যেতো! তাঁর মুখের একটু কথা যদি আমি শুনতে পারতাম! তাঁর সাথে যদি একটু কথা বলতে পারতাম! যদি তাঁর সাথে আমিও চলে যেতে পারতাম সেই সেখানে, যেখানে তিনি যাচ্ছেন! হায়! আমি যদি তাঁর হাতে ঈমান কবুল করতে পারতাম!
উম্মে মা'বাদ বললেন: -তিনি তো হারিয়ে যাচ্ছেন না, যে কোনো সময় আপনি তাঁকে খুঁজে বের করতে পারবেন! তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারবেন!
আমি এতোক্ষণ নীরবেই তাঁদের কথা শুনছিলাম। নীরবতা ভেঙে আবু মা'বাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলি চাইলাম। আবার বলে উঠলাম আমার ভাষায়— ম্যাঁ.. ম্যাঁ.. ম্যাঁ ম্যাঁ!
ফলটা ভালই হলো। আবু মা'বাদ উঠে আমার কাছে এলেন এবং আদর করে আমার গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। আর আবেগমথিত গলায় বলতে লাগলেন:
-আমাদের প্রিয় বকরী! তোমাকে অনে-ক ধন্যবাদ! তোমার কারণেই তো আমরা এক মহা মানবের পরশ পেলাম! তোমার মর্যাদা এখন অনেক উঁচু। মানুষ তোমাকে ভুলবে না। ইতিহাস তোমাকে ভুলবে না। আজ যা ঘটে গেলো এই তাঁবুকে ঘিরে .. আমাদেরকে ঘিরে.. বরং তোমাকে ঘিরে, তা কি কখনো ভোলা যায়?!
আবু মা'বাদের কথার উত্তরে আমি বলতে চাচ্ছিলাম: মনিব! আমার কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই! আমি কেবল বিস্ময় ও মুগ্ধতা নিয়ে স-ব দেখে গেছি!
শ্রেষ্ঠত্ব যা, স-ব তাঁরই! সেই বরকতময় হাতের, যা আমাকে স্পর্শ করেছে। সেই হাতের মালিকের, যিনি দু'আ করেছেন আর সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ তা কবুল করেছেন! আমার ওলান পূর্ণ হয়ে গেলো দুধে!
আমি ভীষণ গর্ব অনুভব করি। কেননা আমার দুধ পান করেছেন আল্লাহ্র রাসূল। তাও আবার এক গুরুত্বপূর্ণ সফরে। মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে। যে হিজরত বদলে দিয়েছিলো সবকিছু। মুসলমানদের সংখ্যা এতো বাড়িয়ে দিয়েছিলো যে, যখন আমি তাঁদেরকে দীর্ঘ দিন পর মক্কায় ফিরে যেতে দেখলাম বিজয়ীর বেশে, ইসলামের মহান পতাকা হাতে, তখন আমি তাঁদের সংখ্যা গোনে গোনে শেষ করতে পারি নি! কেবল তাকিয়েছিলাম অবাক বিস্ময়ে এবং আনন্দ-বিগলিত চিত্তে। আর বারবার ফিরে যাচ্ছিলাম আমার সেই মধুময় স্মৃতির কাছে! আহা! এই স্মৃতিটিই তো এখন আমার সবচে' বড় ধন!