📄 আমি ‘জামাল’ বলছি
হ্যাঁ, আমি জামাল, মানে উট। কিন্তু বাস্তব উট নই, বাস্তব উটের ছায়া। ছায়া-উট। দৃশ্যে এসেছিলাম, আবার অদৃশ্যে মিলিয়ে গেছি। আমার এই আসা-যাওয়ার মাঝে চমৎকার একটা কাহিনী আছে। এ-কাহিনীই এখন তোমাদের শোনাবো। শুনলে বুঝতে পারবে, আমাদের নবীজীর শান (মর্যাদা) কতো! তাঁর জামাল (সৌন্দর্য) কতো! তাঁর মানবতা কতো! তাঁর দয়ামায়া কতো! ন্যায়ের পক্ষে অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর আপোষহীনতা কতো!
আমি তো ছায়া-উট। কায়া-উট মানে সত্যিকারের উটও তাঁকে — মুহাম্মদকে — নিয়ে অনেক কাহিনী বলেছে। ছোট্ট বেলায় রাসূল যেমন মেষ চরিয়েছেন তেমনি উটও চরিয়েছেন। কায়া-উটেরা আমাকে বলেছে যে, আল্লাহ্র রাসূল ওদের সাথে ভীষণ কোমল আচরণ করতেন। মায়ার আচরণ করতেন। দয়ার আচরণ করতেন। উট ও মেষ ফেলে রেখে কখনো তিনি অন্য রাখালদের মতো খেলতে চলে যেতেন না, বরং সারাক্ষণ ওদের কাছে কাছে থাকতেন। ওদের দেখভাল করতেন। মরুকষ্ট থেকে ওদেরকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করতেন। উটের কষ্ট যেনো তাঁরই কষ্ট! মেষের কষ্ট যেনো তাঁরই কষ্ট! যে-কোনো প্রাণী'র কষ্ট যেনো তাঁরই প্রাণের কষ্ট! এমন তো হবেই! তিনি-যে সারা পৃথিবীর রহমত! মানুষের জন্যে রহমত! প্রাণী'র জন্যে রহমত! সবার জন্যে রহমত! সবকিছুর জন্যে রহমত!!
আল-আমীন উটের উপর সওয়ারও হয়েছেন অনেক। সওয়ারী হিসাবে তিনি ছিলেন ভীষণ দয়ালু ও কোমল। উটের প্রতি ভীষণ লক্ষ্য রাখতেন তিনি। কোনো কষ্ট তো হচ্ছে না! বোঝাটা ভার হয়ে যায় নি তো! উটের পিঠে করে তিনি সফর করেছেন সিরিয়া ও ইয়েমেন। কখনো চাচা আবু তালিবের সঙ্গে, কখনো খাদিজার ব্যবসা নিয়ে। সে সব সফরে উটেরা তাঁকে গভীর করে চিনেছে। কাছ থেকে জেনেছে। মক্কায় কিংবা মদীনায়, সান'আয় কিংবা দামেস্কে উটেরা দেখেছে তাঁর ক্রয়-বিক্রয়। আর দেখেছে তাঁর নজিরবিহীন আমানতদারী ও সততা। আরো দেখেছে অল্প সময়েই তাঁর প্রতি মানুষের ঝুঁকে পড়ার বিরল মধুর দৃশ্য। জাহেলী যুগে কোরাইশ ব্যবসায়ীরা যেখানে কথায় কথায় মূর্তির নামে শপথ করছে, আল-আমীন সেখানে একটি বারের জন্যেও মূর্তির নামে শপথ করেন নি। অথচ লোকজনের ভীড় তাঁর কাছেই বেশী। তাঁর বেচা-কেনাই সবচে' বেশী। লাভবানও সবচে' তিনিই বেশী। তাঁর কাছ থেকে মানুষ পণ্য কিনে নিয়ে যায় উট বোঝাই করে আর বিস্ময় ও মুগ্ধতা নিয়ে যায় মন বোঝাই করে।
এবার একটি কাহিনী শোনো-আমার নিজের কাহিনী, যা অন্য উটের কাহিনীর সাথে একদম মিলবে না। একেবারেই আলাদা। ভীষণ মজাদার। নাওয়া-খাওয়া ভুলে এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলার মতো। শুরু হোক তাহলে—
একদিন ভিনদেশী এক বণিক এলেন মক্কায়। সঙ্গে কিছু উট। উদ্দেশ্য হলো, তিনি এ- গুলো মক্কার বাজারে বিক্রি করবেন। তারপর অল্প-বিস্তর যা লাভ হয়, তা-ই নিয়ে দেশে ফিরে যাবেন। ঘটনাক্রমে এ-গুলো কিনলো আবুল হাকাম, আবু জেহেল নামেই যার বেশী 'খ্যাতি'। কিনলো তো বলেছি, কিন্তু আসলে সে কিনে নি। জাহেলী যুগে অনেক খারাপ খারাপ অভ্যাস ছিলো মানুষের। এর মধ্যে একটা হলো, পণ্য কিনে মূল্য মারা-পরিশোধ না করা। আবু জেহেলও তাই করলো। উট নিয়ে চলে গেলো আর মূল্যটা মেরে দেওয়ার ফন্দি আঁটলো। এদিকে উট বিক্রেতা আবু জেহেলকে খুঁজে খুঁজে হয়রান। এতোগুলো উট, মূল্যটা তো নেহাত কম নয়। কিন্তু আবু জেহেলকে ধরেও ধরা যাচ্ছে না। যে-ই আবু জেহেল বুঝতে পারে ব্যবসায়ী তাকে অনুসরণ করছেন সঙ্গে সঙ্গে সে কেটে পড়ে-উধাও হয়ে যায়। বোঝাই যাচ্ছে; যে কোনো মূল্যে আবু জেহেল মূল্যটা না দেওয়ার ফন্দি আঁটছে। আঁটবেও তো! আবু জেহেল যে একটা ফন্দিবাজ। আস্ত একটা ধড়িবাজ। নইলে ভিনদেশী সওদাগরের পণ্য কিনে মূল্য নিয়ে কেনো এই ফন্দি'বাজি'.. ধড়িবাজি?!
এ দিকে বেচারা উট বিক্রেতার মাথায় হাত। এতোগুলো উটের মূল্য না পেলে তার ব্যবসাসি-যে লাটে ওঠবে! অনেক চেষ্টা করেও যখন আবু জেহেলের 'নৈকট্য' লাভ হলো না তখন অনন্যোপায় হয়ে এমন কারো হাত ধরার চিন্তা করলেন যিনি আবু জেহেলের কবল থেকে মূল্যটা 'উদ্ধার' করে দেবেন। ব্যবসায়ীটি হতাশ মনে 'সেই মানুষটি'কেই খুঁজে বেড়াতে লাগলেন।
দু'জন লোক দাঁড়িয়ে ছিলো, অদূরেই। ব্যবসায়ী ভাবলেন— আচ্ছা, এদের কাছে কি সাহায্য চাওয়া যায়?.. চেহারা সুরত দেখে মনে হচ্ছে এরা বেশ প্রভাবশালী। তাই হলো। ব্যবসায়ী তাদের কাছে গিয়ে পুরো ঘটনাটা বলে প্রতিকার চাইলেন। সহযোগিতা চাইলেন।
কিন্তু লোক চিনতে ভুল হয়ে গেলো। ওরা ছিলো আসলে আবু জেহেলের চেলা। কট্টর কাফের। ভিতরটা অন্ধকারে ঠাসা। তাই ভালো কিছু আশা করা বৃথা। তার নমুনা দেখো—
ব্যবসায়ীটি যখন ওদের কাছে সাহায্য চাইছিলেন ঠিক তখনই ঐ পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তখন ইসলামের গোপন দাওয়াতকাল চলছিলো। অর্থাৎ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবী হয়েছেন তিন বছরও হয় নি এবং তিনিসহ সাহাবীদের উপর চলছিলো সীমাহীন জুলুম নির্যাতন। তখন ঐ লোক দু'জনের একজনের মাথায় দুষ্টবুদ্ধি খেলে গেলো। সে আল্লাহ্র রাসূলকে অপদস্থ করতে চাইলো। তাঁকে নিয়ে একটা 'খেলা' খেলতে চাইলো। সে ভাবলো, লোকটা আমার কাছে আবু জেহেলের বিরুদ্ধে সহযোগিতা চাইতে এসেছে। এখন আমি যদি একে মুহাম্মদের কথা বলে দিই এবং তাঁর কাছেই সহযোগিতা চাইতে বলি, তাহলে ভালো একটা মজা হবে। মুহাম্মদ লোকটাকে সহযোগিতা করতে নিশ্চিত আবু জেহেলের বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে যাবে। গেলেই তো আর আবু জেহেল তার কথায় উটের মূল্য পরিশোধ করে দেবেন না, বরং মুহাম্মদকে একটা আচ্ছামতো অপমান করে ছাড়বেন। সেটা কঠিন গালিগালাজও হতে পারে আবার প্রহার-টহারও হতে পারে। এই দুষ্টচিন্তা থেকেই সে বললো:
-তুমি একটা কাজ করো। ঐ-যে লোকটি যাচ্ছে, তার কাছে যাও। গিয়ে তোমার সমস্যাটা খুলে বলো। আমার বিশ্বাস, সে তোমার কাজটা করে দিতে পারবে।
এ দিকে কাফের-সঙ্গীটিও এ দুষ্টচিন্তায় শরীক হয়ে বললো:
-হ্যাঁ, তুমি জলদি গিয়ে তাকে ধরো। তোমার কাজ হবেই হবে। আবু জেহেল তাকে খুব মানেন কি না—তার কথায় ওঠেন আর বসেন! সে সুপারিশ করলে আবু জেহেল ফেলতে পারবেন না! সুতরাং তাড়াতাড়ি যাও। তাকে গিয়ে বলো। দেখবে কেমন যাদুর মতো তোমার কাজ করে দেবে মুহূর্তের ভিতর!
ব্যবসায়ী ওদের কথায় প্রভাবিত হলেন। ব্যবসায়ী ওদের কথায় আশা পেলেন। তাই জলদি গিয়ে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললেন:
-জনাব! আমি এক ভিনদেশী বণিক। কিছু উট বিক্রি করেছিলাম আবুল হাকাম ইবনে হিশাম (আবু জেহেল) এর কাছে। কিন্তু তিনি মূল্য পরিশোধ করেন নি এবং করবেন বলেও মনে হচ্ছে না। আপনি কি দয়া করে আমাকে একটু সহযোগিতা করবেন? আমার মূল্যটা কি একটু উসুল করে দেবেন?! নইলে আমি বড়ো বিপদে পড়ে যাবো!
আল্লাহ্র রাসূল লোকটির বিপদ বুঝলেন। তার অসহায়ত্ব উপলব্ধি করলেন। তিনি ঠিক বন্ধুর মতো লোকটির হাত আপন মুঠোয় নিলেন। তারপর তাকে নিয়ে আবু জেহেলের বাড়ির দিকে রওয়ানা হলেন। এদিকে নিজেদের অসৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে দেখে ঐ দুষ্ট লোক দু’টির মুখে ছড়িয়ে পড়লো কূটিল হাসি। ওরাও দূরত্ব বজায় রেখে তাদেরকে অনুসরণ করলো এবং আবু জেহেলের বাড়ির একটু দূরে এসে থামলো, যেখান থেকে সব স্পষ্ট দেখা যায়। ওরা অপেক্ষা করতে লাগলো, একটি উত্তেজনাকর পরিস্থিতি দেখার জন্যে। ওরা কল্পনা করতে লাগলো, মুহাম্মদের বিরুদ্ধে আবুল হাকামের ফুঁসে ওঠার দৃশ্যটা না জানি আজ কী ভয়ঙ্কর হয়! ভয়ঙ্কর তো হবেই! মুহাম্মদ যেচে এসেছে লোকটাকে সহযোগিতা করতে, উটের দাম উসুল করে দিতে, বাহাদুরী ফলাতে! এখন দেখা যাবে— কতো উটে কতো মূল্য! আবুল হাকাম মূল্য দেবেন না, দেবেনই না। আর মুহাম্মদ মূল্য আদায় করে দেবে, চেষ্টা করবেই। জব্বর মজা হবে! হা.. হা..!! আমাদের পাতা জালে আজ মুহাম্মদ ভালো মতনই আটকা পড়েছে! কোরাইশ গোেত্র দেখবে আজ আরেকটা নতুন যুদ্ধ! আবুল হাকাম আর মুহাম্মদ! মুহাম্মদ আর আবুল হাকাম! কোরাইশ গোত্র আজ একটা আনন্দের খোরাক পাবে। হা.. হা.. হা!!
ঐ দুষ্ট লোক দু'টি এ-সব বলাবলি করতে করতে হাসছিলো আর একে অপরের গায়ে গিয়ে পড়ছিলো। ওরা নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে দেখে খুশিতে একে অপরকে অভিনন্দনও জানাচ্ছিলো। আল্লাহ্র রাসূল লোকটিকে নিয়ে যখন আবু জেহেলের দরোজার কড়া নাড়লেন তখন ওরা বড় বড় চোখে সে দিকে তাকিয়ে রইলো। রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করতে লাগলো তাদের পরিকল্পিত সেই কাঙ্ক্ষিত লড়াইয়ের।
মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দরোজায় খটখট আওয়াজ দিয়ে আবু জেহেলকে ডেকে উঠলেন। ভিতর থেকে তখন ভেসে এলো আবু জেহেলের অহঙ্কারী কণ্ঠ: -দরোজায় কে?!
আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাবে বললেন: -আমি মুহাম্মদ, একটু বাইরে আসতে হবে!
আবু জেহেল দরোজা খুললো। বেরিয়ে এলো। মুহাম্মদকে একটা 'আচ্ছা মজা' দেখানোর চিন্তা নিয়েই সে বের হয়ে এলো। কিন্তু স্থির হয়ে দাঁড়ানোর আগেই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শান্ত ও নির্ভিক কণ্ঠে বললেন: -এই ব্যবসায়ীর মূল্যটা দিয়ে দাও!
তারপর কী হলো? তারপর কী ঘটলো? আবু জেহেল কি ঝলসে উঠলো? আবু জেহেল কি নবীজীর উপর হামলে পড়লো? না! আবু জেহেল ঝলসে ওঠে নি! হামলেও পড়ে নি! আবু জেহেল কি ফুঁসে উঠেছিলো? না, তাও পারে নি! আবু জেহেল তাহলে কী করলো? আবু জেহেল যা করলো তা অকল্পনীয়, অভাবনীয়!
আল্লাহ্র রাসূলের দিকে তাকাতেই আবু জেহেলের চেহারাটা কাচুমাচু হয়ে গেলো! বরং তার উদ্ধত দৃষ্টি জম-দেখা মানুষের মতো জ্যোতিহীন ও নিষ্প্রভ হয়ে গেলো। শুধু তাই না; রাজ্যের ভয়-কাতরতা সেখানে কিলবিল করতে লাগলো। তারপর? ওই তো, সাক্ষাত জম-দেখা মানুষের মতো থরথর করে আবু জেহেল কাঁপতে লাগলো! তারপর? তারপর মাথাটা দুলিয়ে মূল্য পরিশোধের 'সম্মতি জানিয়ে' পলাতক গোলামের মতো ভিতরে চলে গেলো!!
ভিনদেশী বণিকটির বিস্ময়ের কোনো সীমা রইলো না! আরো বেশী বিস্মিত হলো অদূরে দাঁড়িয়ে-থাকা ঐ দুষ্ট লোক দু'টি, যারা একটা মজা দেখার অধীর অপেক্ষায় প্রহর গোনছিলো, মুহাম্মদের উপর আবু জেহেলের হামলে পড়ার মজা। কিন্তু তারা হতাশ হলো না। ভাবতে লাগলো, আবুল হাকাম আসলে এখন ভিতরে গিয়েছেন কোনো 'ডাণ্ডা' আনতে। এলেই শুরু হবে ডাণ্ডাবৃষ্টি! এই বুঝি বেরিয়ে আসছেন! কিংবা নিয়ে আসতে গেছেন আগুনে স্যাঁকা কোনো লোহার শিক। এনেই মুহাম্মদের কপালটায় এঁকে দেবেন একটা উষ্ণ স্যাঁকা-চিহ্ন! তাই যেনো হয়! এটাই মুহাম্মদের পাওনা! সাহস কতো! আবুল হাকামের ইচ্ছের বিরুদ্ধে লড়তে আসা! সুতরাং হতাশার কিছু নেই। একটু সবর করো। এই বুঝি 'উদয় হলেন' আবুল হাকাম রুদ্রমূর্তিতে, রণ-দাপটে!
একটু পর আবু জেহেল এলো! দ্রুতই এলো! সাথে একটা জিনিসও নিয়ে এলো! কিন্তু সেটা ডাণ্ডা কিংবা লোহার শিক নয়- উটের মূল্য! একেবারে পুরোটা! 'পাইয়ে-পাইয়ে.. আনায় আনায়'!!
অদূরে দাঁড়িয়ে-থাকা লোক দু'টি যেনো 'আকাশ হইতে ভূতলে লুটাইয়া পড়িল'!
একটু আগের 'বেচারা ব্যবসায়ী'র বিস্ময়ের ঘোর কাটতে-না-কাটতেই তাতে এসে যোগ হলো আনন্দ, মহা আনন্দ। তিনি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না! যে লোকটা তাকে এতো কষ্ট দিলো, এমন কি মূল্যটা না দেওয়ার জন্যে দিনের পর দিন অদ্ভুত টালবাহানা করলো, সে আজ কেমন করে অমন বাধ্য ভৃত্যের মতো সমস্ত পাওনা তার হাতে এনে রেখে দিলো- এতো সহজে এবং এতো বিস্ময়কর দ্রুততায়?!
মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিস্ময়-বিমুগ্ধ ব্যবসায়ীকে বললেন:
-আপনার উটের মূল্য সব বুঝে পেলেন!
আনন্দ গদগদ কণ্ঠে ব্যবসায়ী বললেন:
-জ্বী অবশ্যই!!
এরপর আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের কাজে চলে গেলেন, বিস্মিত ব্যবসায়ীটি তাঁকে মুখের ভাষায় একটু ধন্যবাদ জানানোরও সুযোগ পেলেন না। শুধু চোখের ভাষায় বললেন যেনো—
কে তুমি হে মহান?
অমন ভালো মানুষের দেখা তো আমি জীবনে আর পাই নি!
আমি কি তোমাকে আবার পাবো?
তোমার সাথে মন খুলে একটু কথা বলতে পারবো?
তোমার উন্নত চরিত্রের দ্যুতিতে একটু দ্যুতিত হতে পারবো?
কে তুমি হে সুন্দর?! তোমাকে তো ভালো করে একটু কৃতজ্ঞতাও জানানো হয় নি!
আল্লাহ্র রাসূল চলে যেতেই ব্যবসায়ীর কাছে দৌড়ে-প্রায় ছুটে এলো লোক দু'টি! তারাও বিস্মিত! চোখের সামনে যা ঘটে গেলো তাকে কোনোভাবেই বিশ্বাস করা যায় না! সত্যিই কি তা ঘটেছে যা তারা দেখেছে! কিন্তু ঐ চাক্ষুষ দেখাকে বিশ্বাস না করে উপায় কী? ব্যবসায়ী নিজে গোনে গোনে তাদেরকে দেখালেন যে, আবুল হাকাম 'কড়ায় গণ্ডায়' তার পাওনা বুঝিয়ে দিয়েছে! তারপর ব্যবসায়ী তাদেরকে লক্ষ্য করে বললেন:
-ঐ মহান লোকটিকে অনেক ধন্যবাদ! আমি কল্পনাও করি নি, এতো সহজে এবং এমন বিস্ময়কর দ্রুততায় তিনি আমার পাওনাটা উসুল করে দেবেন! আর তোমাদেরকেও ধন্যবাদ! তোমরাই তো আমাকে তাঁর কাছে যেতে বলেছো!!
ওরা ব্যবসায়ীর দিকে ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।
একটু পর ভেবাচ্যাকা-খাওয়া লোকগুলি ছুটে গেলো কোরাইশের কাছে! ওদেরকে গিয়ে জানালো চোখে-দেখা 'আবুল-হাকাম-কাহিনী'! একেবারে দাঁড়ি-কমাসহ। সবার চোখে বিস্ময়! তাহলে কি আবুল হাকাম কাপুরুষ হয়ে গেলেন! মুহাম্মদের কাছে এতোটা নতজানু হওয়ার অর্থ কী! সবাই উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে গেলো! বললো, চলো, আবুল হাকামের বাড়ি চলো!
আসল ব্যাপার জানতে সবাই রোষ-কষায়িত হয়ে ছুটে গেলো 'আবুলহাকামখানায়'। গিয়েই দরোজায় জোরে জোরে আঘাত করতে লাগলো। আর বলাবলি করতে লাগলো, এর মানে কী! মুহাম্মদ ব্যবসায়ীর মূল্য দিয়ে দিতে বললো আর অমনি তিনি দিয়ে দিলেন! এ তো দেখছি মুহাম্মদের প্রতি রীতিমত আনুগত্য প্রকাশ! তবে কি ভাতিজার কাছে কাবু হয়ে গেলেন চাচাজান?!
কিন্তু কী আশ্চর্য! এতো ধাক্কাধাক্কি তবু দরোজা খোলা হচ্ছে না কেনো? ভিতরে কেউ নেই নাকি? আশ্চর্য! এমন তো আগে কখনো হয় নি!
উপস্থিত কোরাইশ নেতৃবর্গ হৈচৈ শুরু করে দিলো। অবশেষে অ-নে-ক কষ্টে দরোজাটা খোলানো গেলো তখনই, যখন আবুল হাকামের বিশ্বাস হলো, মুহাম্মদ নয়— দরোজায় দাঁড়িয়ে কোরাইশেরই লোকজন! এরপর আবুল হাকাম তাদের ক্রুদ্ধ প্রশ্নের উত্তরে কাঁপাকাঁপা আওয়াজে বলতে লাগলো:
-তোমরা আমাকে ভুল বোঝো না। আসলে আমি দরোজাটা খুলেছিলাম মুহাম্মদকে ধোলাই দিতেই। ওর সাহস কতো! ঐ লোকটার পক্ষ নিয়ে আমার সাথে লড়তে এসেছে! কিন্তু কী আর বলবো তোমাদেরকে, মুহাম্মদের দিকে 'আগুনঝরা' দৃষ্টি নিয়ে তাকাতেই দেখলাম, ঠিক মুহাম্মদের মাথার উপর দিয়ে ইয়া বড় একটা উট আমার দিকে হা করে আছে দাঁত খিঁচিয়ে! যেনো এক্ষুণি আমায় গিলে খাবে, যদি না- দিই ব্যবসায়ীর পাওনা! এই ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখে কলিজা আমার শুকিয়ে গেলো! থরোথরো পায়ে ভিতরে গেলাম! মনে হচ্ছিলো সেই হা-করা উটটাও আমার পেছনে পেছনে আসছে! আমি ভয়ে পেছনে তাকাতে পর্যন্ত সাহস পাচ্ছিলাম না! সত্যি সত্যি এসে থাকলে! আমার আরো মনে হচ্ছিলো, যদি আমি ব্যবসায়ীর পাওনা নিয়ে অবিলম্বে দরোজায় হাজির না হই, ঐ ভয়ঙ্কর উটটা আমাকে চিরতরে শেষ করে দেবে! তাই আমি আর দেরী করলাম না। তড়িঘড়ি করে থলে নিয়ে হাজির হলাম দরোজায়, পাওনাটা নিয়ে তুলে দিলাম ব্যবসায়ীর হাতে, মুহাম্মদের সামনে! তারপর দ্রুত দরোজাটা লাগিয়ে দিয়ে ভিতরে এসে হাঁপাতে লাগলাম! হাঁপাতেই থাকলাম!
আবু জেহেলের এই কাহিনী শুনে একজন বলে উঠলো: -হুঁ, বুঝেছি এখন, দরোজা না খোলার রহস্যখানা! আশ্চর্য! এ সব কী শুনছি! আরেকজন টিপ্পনি কেটে বললো: -আবুল হাকাম নিশ্চয়ই এও ভেবেছিলেন যে, মুহাম্মদের মাথার উপর দিয়ে ঐ উটটাও দাঁত খিঁচিয়ে তাকিয়ে আছে, আশ্চর্য! কী হচ্ছে এ-সব?! এ-কথা শুনে কয়েকজন হেসে উঠলো-বিদ্রূপের হাসি!
আল্লাহ্ কী লীলা! মুহাম্মদকে নিয়ে যে-হাসিটা দেখার জন্যে অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছিলো ঐ দুষ্টরা সে-হাসিটাই এখন ওরা দেখলো আবু জেহেলকে নিয়ে! এবার ওরাও বিদ্রূপে সবার সাথে যোগ দিয়ে বললো: -অসম্ভব! আমরা এ-কথা বিশ্বাস করি না! আমরাও তো অদূরে দাঁড়িয়ে ছিলাম! কই, কোনো উট তো আমাদের চোখে পড়ে নি! এদের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বাকীরা বললো: -বুঝেছি, সব বুঝেছি! আসলে মুহাম্মদের ব্যক্তিত্ব ও বীরত্বই আবুল হাকামের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে! সম্ভবত যতোবার মুহাম্মদ আসবে ততোবারই আবুল হাকামের এই অবস্থা হবে! এই বলে কোরাইশ এক যোগে গলা ফাটিয়ে হাসতে লাগলো-হা হা হা.......!
📄 আমি বোরাক বলছি
আমি যে সময়ের কথা বলছি তখন না ছিলো আধুনিক রকেট কিংবা এইসব কৃত্রিম উপগ্রহ। এ-সব আবিস্কার হওয়ার হাজার হাজার বছর আগে থেকেই আমি ছিলাম। আমি বোরাক। মানুষ কতো নামে আমাকে ডাকে। কেউ বলে আসমানী বাহন। কেউ বলে বিদ্যুৎ বাহন। আমি দেখতে কেমন? এ ব্যাপারেও নানা জনের নানান মত। আমি বলি কি; আমি হলাম এক বিশেষ বাহন, আল্লাহ্র সৃষ্টি, যিনি আসমান জমিন সৃষ্টি করেছেন, সবকিছু সৃষ্টি করেছেন, তিনিই আমার স্রষ্টা। বাস্.. এ-ই আমার সবচে' বড় পরিচয়। নবীরা সওয়ার হয়েছেন আমার পিঠে- এও আমার এক গর্বের ইতিহাস। কিন্তু সব নবীর সেরা নবী যিনি তিনি শুধু আমার পিঠে সওয়ার হয়েছেন- তাই নয় বরং তাঁর সাথে জড়িয়ে আছে আমার অনেক স্মৃতি, অনেক ঘটনা। বরং বলা উচিত- এক বিস্ময়কর মু'জিযা। এখন বলতে চাই তোমাদেরকে সেই ঘটনা, যা হার মানায় গল্পকেও! এমন কি কল্পনাকেও!
বার বছর ধরে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুওতের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। এ দীর্ঘ সময়ে তাঁকে এবং তাঁর সাহাবীদেরকে অনেক জুলুম-অত্যাচার সইতে হয়েছে। নবীজীর জীবনে এসেছে অনেক কষ্ট। অনেক দুঃখ। অনেক শোক। এর মাঝেই তিনি হারিয়েছেন প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজাকে। হারিয়েছেন প্রিয় চাচা আবু তালিবকে। কাফির মুশরিকদের জুলুম-অত্যাচারের মাত্রাটাও এর ফলে অনেক বেড়ে গেছে। ঈমান ও জীবন বাঁচাতে অনেক সাহাবীকেই হাবশায় হিজরত করতে হয়েছে।
মক্কায় দাওয়াতের কাজ কঠিন হয়ে গেলো, অনেক কঠিন। হতাশ হয়ে গিয়েছিলেন তিনি তায়েফে। আশা নিয়ে, অনেক আশা। বুকভরা আশা। কিন্তু ওরা-তায়েফের লোকেরা তাঁকে দিলো শুধুই হতাশা। বুকভরা ব্যথা। রক্তঝরা দুঃখ। অশ্রুঝরা প্রত্যাবর্তন।
তায়েফ থেকে ফেরার পরই প্রিয় রাসূলকে ডেকে পাঠালেন আল্লাহ একেবারে নিজের সকাশে! সঙ্গে থাকবেন কে? যাওয়ার বাহনটাই-বা কী হবে? সঙ্গে থাকবেন আসমানী দূত-জিবরীল। আর বাহন হলাম আমি-বোরাক!
আরো বিস্তারিত বলি- সময়টা ছিলো রজবের ২৭ তারিখ রাত। রাতে জিবরীল গেলেন নবীজীকে জাগাতে। তিনি সেদিন ঘুমিয়ে ছিলেন আবু তালিব তনয়া-উম্মে হানীর গৃহে, কা'বার একেবারে পাশে। এরপর তিনি তাঁকে নিয়ে এলেন কা'বা চত্বরে, যেখানে আমি অপেক্ষা করছিলাম। সেখানে তিনি তাঁর ক্বলবটাকে ধুইয়ে দিলেন জমজম দিয়ে। সাথে সাথে তা ভরে গেলো ঈমানের নূরে। হিকমতের (শরীয়তের গভীর জ্ঞানের) নূরে। এরপর আল্লাহ্র রাসূল আমার উপরে সওয়ার হলেন। গভীর রজনীর নিঝুম প্রহরে শুরু হলো ইসরা-বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে পথচলা। সঙ্গে আছেন হযরত জিবরীল। আমরা এগিয়ে যাচ্ছি ক্ষীপ্র গতিতে।
মক্কার সীমানা ছাড়িয়ে কিছুদূর যেতেই পথে পড়লো এক বণিক দল। এরা ছিলো কোরাইশ গোত্রের। এদের একটা উট হারিয়ে গিয়েছিলো। আল্লাহ্র রাসূল বলে দিলেন, কোথায় গেলে পাবে উটের সন্ধান। একটু পর আরেকটি বণিক কাফেলা আমাদের পথে পড়লো। ওদের বেশকিছু উট দলছুট হয়ে কোথায় যেনো চলে গিয়েছিলো। একটার পা ভেঙে গিয়েছিলো। কিছুক্ষণ পর আরেকটা কাফেলার দেখা পেলাম। ঐ কাফেলার আগে আগে চলছিলো একটা উট যার উপরে চাপানো ছিলো দু'টি কালো বোঝা।
জেতে যেতে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো দেখেছেন অনেক কিছু। তখন তাঁর মনে জেগেছে কতো কৌতূহল ও জিজ্ঞাসা। সঙ্গে সঙ্গে সে কৌতূহল প্রকাশও করেছেন তিনি। হযরত জিবরীলও মিটিয়েছেন তাঁর কৌতূহল।
নবীজী দেখলেন এক যুবতীকে। যেমন তার যৌবনময় রূপ তেমনি তার রূপময় পোশাক। ঐ যুবতীটি গলা ফাটিয়ে ডাকছিলো নবীজীকে। বলছিলো, মুহাম্মদ, এই মুহাম্মদ! কিন্তু আল্লাহ্র রাসূল তার ডাকে সাড়া দিলেন না। তার দিকে ফিরেও তাকালেন না।
হযরত জিবরীল তাঁকে জানালেন: -আপনাকে একটু আগে যে যুবতীটি ডাকছিলো, জানেন, ও কে? ও হলো দুনিয়া, রূপ ধরে এসেছিলো আপনাকে আকর্ষণ করতে।
আল্লাহ্র রাসূল বললেন: -আমার কোনো প্রয়োজন নেই এই দুনিয়ার!
আমরা 'ইয়াসরিব' (মদীনায়) পৌঁছার পর জিবরীল বললেন: -এই-যে ইয়াসরিব। এখানে আপনাকে হিজরত করতে হবে। তখন জায়গাটার নাম রাখবেন- মদীনা মুনাওয়ারা। এখানেই আপনার ইন্তেকাল হবে।
এরপর আমরা অতিক্রম করলাম এমন এক সম্প্রদায়ের পাশ দিয়ে যারা ফসল রোপন করছিলো আর কাটছিলো। সে এক বিস্ময়কর দৃশ্য! ফসল কাটতে-না- কাটতেই আবার আগের মতো ফলে যাচ্ছে, যেনো আগে কাটাই হয় নি! শীষগুলো শস্যদানায় দুলছে! আবার যেই-না কাটা অমনি আবার আগের মতো— যেই সেই!!
নবীজী জিবরীলকে বললেন: -ভাই, এ কী!
জিবরীল বললেন: -এরা হলেন আল্লাহ্র পথের মুজাহিদ! এদের সৎ কাজের বিনিময় আল্লাহ সাতশ' গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেবেন।
আমরা আরো দেখেছি, সালাত তরককারীদের সাজা। যাকাত অনাদায়ের শাস্তি।
জেতে যেতে হঠাৎ মনে হলো, মিষ্টি একটা বাতাস বইছে। ঘ্রাণে ঘ্রাণে চারদিক মৌ মৌ করছে। ঠিক তখনই কানে ভেসে এলো মধুময় একটা কণ্ঠ।
আল্লাহ্র রাসূল জানতে চাইলেন: -এটা কী কণ্ঠ? কোত্থেকে আসছে এই ঘ্রাণ?
জিবরীল বললেন: -এটা জান্নাতের কণ্ঠ! জান্নাত বলছে, আমাকে যা যা দেয়ার কথা ছিলো স-ব দিয়ে দাও! আমার আয়োজন কতো! এই-যে আমার কক্ষ! এই-যে আমার রেশমী বস্ত্র! সোনা-দানার কোনো অভাব নেই! আর পান পাত্র? সোরাহি? মধুর নহর? দুধের নহর? স্বচ্ছ পানির প্রস্রবণ? অনে-ক.. অফুরান! বে-হিসাব!!
আরেকটা উপত্যকা অতিক্রমকালে ভেসে এলো একটা অসহনীয় দুর্গন্ধ। আর শোনা গেলো একটা জঘন্য কণ্ঠ।
আল্লাহ্ নবী জানতে চাইলেন: -এ আবার কী!
জিবরীল জানালেন: -এ হলো জাহান্নাম। ডেকে ডেকে বলছে, আমাকে যা যা দেয়ার কথা ছিলো সব দাও! আমার আয়োজন কতো! এই-যে আমার শিকল ও বেড়ি। আর আমার ভিতরের অগ্নিতাপ? ভীষণ! মারাত্মক! কখন পাবো আমি আমার প্রতিশ্রুত জিনিস? আর তো তর সইছে না!
চোখের পলকেই আমরা বাইতুল মাকদিসে পৌঁছে গেলাম। মুহাম্মদ আমাকে উঁচু একটা পাথর খণ্ডের সাথে বাঁধলেন। সেই পাথরখণ্ডটা আজো আছে। মুসলিম উম্মাহ পাথরখণ্ডটির উপর একটি সুসজ্জিত ও কারুকার্যময় গম্বুজ নির্মাণ করেছে, যা 'কুব্বাতুস সাখরা' নামে খ্যাত-পরিচিত। মুহাম্মদ আমাকে রেখে মসজিদুল আকসায় প্রবেশ করলেন। সেখানে তাঁকে স্বাগত জানাতে অপেক্ষা করছিলেন স-ব নবী রাসূল। সবার সঙ্গে তাঁর দেখা হলো। সবাইকে নিয়ে তিনি নামাজ পড়লেন। ইমাম হলেন তিনি আর সবাই হলেন মুক্তাদি। নামাজ শেষে শুরু হলো মি'রাজ- মূল অভিযান। জিবরীল একটা সিঁড়ি নিয়ে এলেন। এই সিঁড়িটা উঠে গেছে সোজা মহাকাশের দিকে। এই সিঁড়ি দিয়ে এখন নবীজীর যাত্রা হবে আকাশের দিকে। আরশের দিকে। সিঁড়ির নামেই এ-অভিযানের নামকরণ হয়েছে মি'রাজ। যার মানে- সোপান যোগে ঊর্দ্ধ গমন অর্থাৎ আল্লাহর সকাশে উপস্থিতি।
চলতে চলতে আল্লাহ্র রাসূল পৌঁছে গেলেন প্রথম আকাশে। সেখানে তাঁকে স্বাগত জানালেন হযরত আদম আলাইহিস সালাম। এরপর এলো দ্বিতীয় আকাশ। সেখানে তাঁর দেখা হলো ঈসা আলাইহিস সালাম, ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম ও যাকারিয়্যা আলাইহিস সালাম-এর সঙ্গে। এরপর এলো তৃতীয় আকাশ। সেখানে ছিলেন ইউসুফ আলাইহিস সালাম। এরপর চতুর্থ আকাশ। সেখানে ছিলেন হযরত ইদরিস আলাইহিস সালাম। এরপর এলো পঞ্চম আকাশ। সেখানে দেখা হলো হযরত হারূন আলাইহিস সালাম-এর সাথে। ষষ্ঠ আকাশে তাঁকে স্বাগত জানালেন হযরত মূসা আলাইহিস সালাম। এরপর এসে গেলো সপ্তম আকাশ। সেখানে সাক্ষাত হলো হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর সঙ্গে। সবাই নবীজীকে স্বাগত জানালেন এই বলে- (مرحباً بالنبي الصالح والأخ الصالح) সুস্বাগতম পুণ্যবান নবীকে, পুণ্যবান ভাইকে!)।
এরপর আল্লাহ মুহাম্মদকে সিদরাতুল মুনতাহায় উন্নীত করলেন! তারপর হাজির হলেন তিনি আল্লাহর মহা সান্নিধ্যে! সেখানে তিনি ভক্তিভরে তাঁকে সেজদা করলেন! তাঁর মহিমা প্রকাশ করলেন! তাঁর স্তুতি গাইলেন! তাঁর নিবেদনে ঢেলে দিলেন অযুত নিযুত কৃতজ্ঞতা! কৃতজ্ঞতা তো ঢেলেই দিতে হবে! কারণ এখানে-যে এর আগে আর কেউ আসে নি শুধু তিনি ছাড়া! ডাকাই-যে হয় নি! শুধু তাঁকেই ডেকে এনেছেন আল্লাহ! আহা! শ্রেষ্ঠ নবীর কী শ্রেষ্ঠ সৌভাগ্য! এরপর আল্লাহ তাঁকে একে একে দিলেন অনেক উপহার! সবচে' বড় উপহারটা কী? নামাযের উপহার! পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের সেরা উপহার! যে নামায আদায় করতে হবে কা'বামুখী হয়ে। এরপর আল্লাহ তাঁর প্রিয় মুহাম্মদকে বিদায় দিলেন। আবার তিনি ফিরে এলেন দুনিয়ায়। প্রথমে এসে নামলেন সেই মসজিদুল আকসার বাইরে। তারপর আবার প্রবেশ করলেন ভিতরে। সেখানে সমবেত স-ব নবী রাসূলকে বিদায় জানিয়ে আবার এসে আমার উপর চড়ে বসলেন। শুরু হলো কা'বার দিকে ফিরে যাওয়া। ... না, বেশিক্ষণ লাগে নি, মুহূর্তেই আমরা পৌঁছে গেলাম মক্কায়-কা'বা চত্বরে! এভাবেই সমাপ্ত হলো মুহাম্মদের মহাকাশ ভ্রমণ। আল্লাহ্র সকাশে (দরবারে, সান্নিধ্যে) হাজির হওয়ার অপূর্ব গৌরব। আমি মুহাম্মদকে বিদায় জানালাম। তিনি চলে গেলেন গৃহে। পরদিন আল্লাহ্র রাসূল কা'বায় হাজির হয়ে সবাইকে জানালেন তাঁর এই মহাভ্রমণের কথা। ইসরা ও মি'রাজের কথা। কোরাইশের কাফির মুশরিকরা তা বিশ্বাস করলো না। আবু জেহেল তো একে 'ডাহা মিথ্যা' বলেই উড়িয়ে দিলো। ওদের একজন ঠাট্টা করে বললো, আমরা একমাসেও জেরুজালেম পৌঁছতে পারি না আর মুহাম্মদ কি না এক রাতেই সেখানে গিয়ে আবার ফিরেও এসেছে! কী আজগুবি কথা!
ঠিক তখনি সেখানে এসে হাজির হলেন আবু বকর রা.। এসে বসলেন আল্লাহ্র রাসূলের কাছ ঘেঁষে। তখন কাফেরদের মুখ থেকেই তিনি শুনলেন রাসূল কী বলেছেন এবং তারা কতোটা বিস্ময় প্রকাশ করে রাসূলের কথাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। কাফের ও রাসূলের মাঝে এ নিয়ে কথা চলতে লাগলো। এ ব্যাপারে রাসূল যাই বলছেন কাফেররা তাই অস্বীকার করছে। শেষ পর্যন্ত কাফেররা বললো, ঠিক আছে; মুহাম্মদ তাহলে বলুক, মসজিদুল আকসা দেখতে কেমন? কী আছে তার ভিতর? কয়টি তার দরোজা জানালা? আসলে এ-সব বলে তারা রাসূলকে আটকে দিতে চেয়েছিলো। লা-জওয়াব করে দিতে চেয়েছিলো। তারা ধরেই নিয়েছিলো যে, মুহাম্মদ এক রাতে ওখানে যেতেই পারে না। সুতরাং তার পক্ষে এর বর্ণনা দেওয়াও সম্ভব না। কিন্তু আল্লাহ তাঁর নবীকে লজ্জিত করলেন না। জওয়াবে আল্লাহ্ নবী মসজিদুল আকসার আকার-আকৃতি একে একে ওদের সামনে বর্ণনা করে যেতে লাগলেন। এমনভাবে যেনো আল-আকসা তাঁর চোখের সামনে ভাসছে! আর তিনি দেখে দেখে সব বলে যাচ্ছেন। এতে সবাই বিস্ময়ে যেনো পাথর হয়ে গেলো! আবু বকর আবেগভরে বলে উঠলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনি সত্য বলেছেন!
এদিকে আল্লাহ্র রাসূল কাফেরদের বিস্ময় আরো বাড়িয়ে দিলেন ঐ সব কাফেলার কথা উল্লেখ করে যাদের সাথে তাঁর দেখা হয়েছিলো মক্কা থেকে একটু দূরে। তারপর যখন ঐ সব কাফেলা ফিরে এলো এবং প্রথম কাফেলার হারিয়ে যাওয়া উটটিও ফিরে এলো, দ্বিতীয় কাফেলার পা ভেঙে-যাওয়া উটটিও ফিরে এলো এবং আরো ফিরে এলো তৃতীয় কাফেলার কালো বোঝা বহন-করা সেই উট দু'টিও, তখন এ-ঘটনা অস্বীকার করতে ওদের একটু মুখ-লজ্জাই হলো।
কিন্তু কী আশ্চর্য! তবু মন ওদের ঘুরলো না! বিবেক ওদের দুললো না! চেতনা ওদের জাগলো না! ঈমানও ওদের নসীব হলো না!
তখন বিস্মিত কাফেরদের ভিতরে আবার শোনা গেলো হযরত আবু বকরের নির্দ্বিধ কণ্ঠ:
-হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনি অবশ্যই সত্য বলেছেন! আপনার সব কথাই আমি বিশ্বাস করলাম!
নবীজী আনন্দভরা কণ্ঠে বললেন: -আবু বকর! তুমি ‘সিদ্দীক’!
তখন থেকেই আবু বকর রা.-এর সাথে এই ‘সিদ্দীক’ উপাধী একাকার হয়ে যায়!
বন্ধু! আমি বোরাক! যে কাহিনী আমি বলা শুরু করেছিলাম তা এখানেই সমাপ্ত করবো। শেষে বলতে চাই, ইসরা ও মি'রাজের মু'জিযা যতোদিন আলোচিত হবে ততোদিন সায়্যিদুল মুরসালিনের সাথে আমিও আলোচিত হবো। এ আমার চরম সৌভাগ্য। প্রায় ১৫ শত বছর আগেই আল্লাহ আমাকে দিয়ে প্রমাণ করে দিয়েছেন, আল্লাহ যা চান তা-ই হয়! কোনো কিছুই তাঁর কুদরত ও চাওয়ার সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। হ্যাঁ, তিনি যা চান তা-ই হয়! যখন চান তখনই হয়! হবেই তো! তিনি-যে ‘কুন ফায়াকুন’-এর মালিক! রকেটের গতি কিংবা উপগ্রহের দ্যুতি— তাঁর ইচ্ছের সামনে সবই চিরম্লান। এ-ঘটনাকে অস্বীকার করার দুর্মতি মানেই দুর্গতি। পবিত্র কুরআনে আছে এ-ঘটনার কথা। বিদায়ের আগে অনুরোধ করে যাই— আয়াতটা একটু পড়ো। প্রবেশ করো গভীরে— অর্থ ও ভাবের। দেখবে কী মজা!
سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلاً مِنْ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ.
মহিমান্বিত সেই সত্ত্বা, যিনি তাঁর বান্দা (মুহাম্মদ) কে মসজিদুল হারাম (কা’বা) থেকে মসজিদুল আকসা (বাইতুল মাকদিস) পর্যন্ত নৈশভ্রমণ করিয়েছেন, যার আশপাশ আমি বরকতময় করে দিয়েছি। যাতে আমি আমার নিদর্শন প্রত্যক্ষ করাতে পারি। নিশ্চয়ই তিনি সবশ্রোতা.. সর্বদ্রষ্টা। -সূরা ইসরা।
📄 আমি সাপ
আমি জানি, তোমরা সবাই এক যোগে বলবে, "নাউযুবিল্লাহ্—বাঁচাও! বাঁচাও!! আল্লাহ পানাহ্'! না বন্ধু, ভয় পাওয়ার কিছু নেই, আমি অনেক দূরে! তা ছাড়া সব সাপ সব মানুষকে দংশন করে না, সে কথা আমার কাহিনী শুনলেই বুঝতে পারবে।
আমার জন্ম অনেক অনে-ক কাল আগে। আমি থাকতাম মক্কা নগরীর একটা পুরোনো ভবনের ফাটলে। ভবনটার নাম 'দারুন নাদওয়া'-পরামর্শকেন্দ্র। সেখানে সবাই এসে জড়ো হতো এবং নানা বিষয়ে সলা-পরামর্শ করতো। একদিন আমি আমার 'ঘর' থেকে বের হয়ে দেখি, জমকালো পোশাক-পরা একটা 'মানুষ'। একটু গভীর করে তাকালাম। হুঁ, চিনতে এবার মোটেই অসুবিধা হয় নি। ও মানুষ না, শয়তান—জলজ্যান্ত শয়তান। আমি বললাম:
-তোকে আমি ঠিকই চিনতে পেরেছি। তুই ইবলিস—শয়তান!
-সাবধান, আস্তে কথা বল্! আমার নাম ধরে চিল্লাচিল্লি করবি না, কেউ শোনে ফেলতে পারে!
-কিন্তু তুই এখানে কেন? এখানে তো তোর থাকার কথা না! কোন্ মতলবে এসেছিস্?
-আমি মুহাম্মদকে চাই! তার কবল থেকে মুক্তি চাই! এই লোক সারাটা দুনিয়া উলট-পালট করে দিচ্ছে! তার হৃদয় থেকে এমন একটা আলো বিচ্ছুরিত হয়, যা শয়তানদের চোখের আলো কেড়ে নেয়! এই সাপ! তুই তো জীবনে আমার অনেক উপকার করেছিস, আজ শেষ উপকারটা করবি?
আমি শয়তানের দিকে তাকিয়ে রইলাম। তার কথার কোনো উত্তর করলাম না। আমি জীবনে এই ইবলিসকে বিভিন্ন অপরাধ সংঘটনে অনেক সহযোগিতা করেছি। এ জন্যে সব সময় মানুষের কাছে আমি ঘৃণার পাত্র, মূর্তিমান আতঙ্ক। আমাকে দেখলেই মানুষ ছুটে পালায়। হায়! আমার দংশনে কতো নিরপরাধ মানুষ অকালে ঝরে পড়েছে!
এখন আমার মনে একটা উত্তম চিন্তার উদয় ঘটেছে। অর্থাৎ আমি চাইছি, জীবনটাকে অপরাধের অন্ধকার থেকে এবার টেনে তোলবো। আর না, কোনো মানুষকে আর বিষায়িত করবো না—ছোবল দেবো না। ইবলিসকে আর সহযোগিতা দেবো না। ইবলিসের কথায় উত্তর না করে আমি এ-সবই ভাবছিলাম। আমি আরো ভাবছিলাম, কী করে ইবলিসকে মুহাম্মদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়া যায়। এর মাঝেই দেখলাম একদল মানুষ হুড়হুড় করে 'দারুন নাদওয়ায়' এসে ঢুকলো। আমি তড়িৎ গতিতে সুরঙ্গে লুকিয়ে গেলাম। তবে কান পেতে রইলাম ওদের কথাবার্তা শোনার জন্যে। বিশেষ করে ইবলিস কী বলে তা শুনতে উৎকর্ণ হয়ে রইলাম।
সবাই বসলো। আলোচনা শুরু হলো। কী করে মুহাম্মদ-এর কবল থেকে মুক্তি লাভ করা যায় এবং কী করে তার নতুন দাওয়াতকে স্তব্ধ করে দেয়া যায়—এ-সব নিয়েই গরম গরম আলোচনা শুরু হলো।
একজন বললো: -তাকে বন্দি করে রাখলে কেমন হয়?
ইবলিস নড়েচড়ে বসলো, বললো: -না, এটা কোনো জুতসই কাজ হবে না, যে কোনো সময় সে পালিয়ে যাবে।
আরেকজন বললো: -তাহলে চলো তাকে শহর থেকে বের করে দিই!
ইবলিস এবারও বাধ সাধলো, বললো: -লাভ নেই, আবার ফিরে আসবে!
এভাবে বিভিন্ন জন বিভিন্ন মতামত প্রকাশ করলো। কিন্তু একটা প্রস্তাবও মানুষরূপী ইবলিসের মনমতো হলো না। অবশেষে ইবলিস নিজেই একটা নতুন প্রস্তাব পেশ করলো। যেমন ইবলিস তেমন প্রস্তাব। বললো: -আমি মনে করি; মুহাম্মদকে একেবারে দুনিয়া থেকেই সরিয়ে দিতে হবে। এ ছাড়া তার কবল থেকে পুরোপুরি মুক্তি লাভ করা যাবে না। এখন প্রশ্ন হলো, কী উপায়ে আমরা তাকে হত্যা করবো। এ জন্যে আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে। তা হলো, প্রত্যেক গোত্র থেকে একজন শক্তিশালী যুবককে আমরা বাছাই করবো। তারা সবাই রাতের আঁধারে এক যোগে ঝাঁপিয়ে পড়বে, মুহূর্তেই মুহাম্মদকে শেষ করে দেবে। তাহলে তার গোত্র আর এ-হত্যার বদলা নিতে পারবে না! উপস্থিত সকলেই হর্ষধ্বনি করে উঠলো: -খাসা প্রস্তাব! খাসা বুদ্ধি!! এমন সুন্দর একটা প্রস্তাব দেয়ার জন্যে সবাই তাকে ধন্যবাদ জানালো।
এরপর শুরু হলো প্রস্তাব বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া। আমি আমার ‘কুটির’ থেকে বেরিয়ে এলাম। রাতের আঁধারকে আশ্রয় করে আমি মুহাম্মদের ঘরের দিকে ছুটে গেলাম। গিয়ে দেখলাম; পরিস্থিতি মোটেই ভালো না। সবাই নাঙা তলোয়ার হাতে তাঁর ঘরটিকে ইতিমধ্যে ঘিরে ফেলেছে। জিঘাংসা-কাতর দৃষ্টিতে অপেক্ষা করছে তাঁর বাইরে আসার। এলেই সবাই এক যোগে তাঁর উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে, তাঁকে শেষ করে দেবে!
ওরা মাঝে মাঝে দরোজার ছিদ্র দিয়ে দেখে নিচ্ছিলো বিছানায় মুহাম্মদ আছে কি না। এদিকে হঠাৎ কী-যে ঘটলো কিছুই বুঝতে পারলাম না। দেখলাম ঘরটিকে ঘিরে- রাখা সবগুলো মানুষ ঘুমে ঢুলুঢুলু করছে। কোত্থেকে যেনো ওদের চোখে রাজ্যের ঘুম নেমে এসেছে। এমনকি আমিও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম না। সবার মতো আমিও কী এক আশ্চর্য গাঢ় নিদ্রায় নিজের অনিচ্ছায় ঢলে পড়লাম!
সূর্যিটা যখন ওদের গায়ে সকাল বেলার 'মিষ্টি পরশ' বুলিয়ে দিলো তখন ওরা জাগলো। পরিস্থিতির আকস্মিকতায় ওরা বিস্মিত! ওরা বুঝতে পারছিলো না- এ কী ঘুম পেয়েছিলো ওদেরকে! সেই 'মায়াবী' ঘুমের রেশ মুখে নিয়ে ওরা ছুটে গেলো দরোজায়! ছিদ্র দিয়ে দেখলো, মুহাম্মদের বিছানায় যে শুয়েছিলো সে মুহাম্মদ নয়- আলী! ওদের মাথায় যেনো তলোয়ারের আঘাত পড়লো!
বন্ধু! আলী কেনো শুয়েছিলেন আল্লাহ্র রাসূলের বিছানায়? উত্তর হলো, নবীজীরই নির্দেশে। নবীজীর ইয়েমেনী সবুজ চাদরটা মুড়ি দিয়ে শুয়েছিলেন তিনি। নবীজী তাঁকে রেখেই এক সময় বেরিয়ে গেছেন, রাতের অন্ধকারে! আর তাঁকে দিয়ে গেছেন অভয়! প্রিয় নবী'র অভয়বাণী শুনে কেনো তবে ভয় পাবেন বীর আলী? যুবক আলী? ভবিষ্যতের খায়বারের দুর্গদ্বার বিজয়ী আলী? বয়স তাঁর কতোই বা হবে, কিন্তু বীরত্ব ছিলো তাঁর স্বভাব গুণ! তাই এক ঝাঁক নাঙা তলোয়ারের নিচে শুয়ে থাকতে তাঁর একটুও ভয় লাগে নি! বীরপুরুষ এমনই হয়! নবী-প্রেমিকরা এমনই হয়!
মূল ঘটনায় ফিরে আসি। আলী বের হয়ে আসতেই সবাই তাকে ঘিরে ধরলো। জাপটে ধরলো। প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে যেতে লাগলো।
-তুমি?! তুমি কেনো এখানে?
-জলদি বলো, মুহাম্মদ কোথায়?
-বলো, রাতে কোথায় ছিলো মুহাম্মদ?
স-ব প্রশ্নের জবাবে বীর যুবক আলী'র এক জবাব: -আমি জানি না! আমি জানি না!!
সবাই তখন আলীকে কা'বা চত্বরের দিকে ধরে নিয়ে গেলো। কেউ কেউ তার গায়ে হাতও তুললো। কিন্তু বিশেষ কিছু উদ্ঘাটিত না হওয়ায় ওরা কিছুক্ষণ পর এই আত্মোৎসর্গী বীরকে ছেড়ে দিলো। মুক্ত বীর এখন আনন্দ-বিহ্বল। এতো বড় দায়িত্ব পালন করতে পারলে কে-না আনন্দ-প্লাবিত হয়! তার সমানে এখন আরেকটা দায়িত্ব আছে। নবীর কাছে গচ্ছিত রাখা আমানতের মাল মালিকের নিকট পৌঁছে দেয়া!
মুহাম্মদ ও আবু বকর ইতিমধ্যে বেরিয়ে পড়েছেন মক্কা থেকে। সেই মক্কা, যেখানে পেয়েছেন তাঁরা কেবলই কঠোরতা, শুধুই পৈশাচিকতা! একদল মানুষের বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতা! এদিকে ইবলিস ঘটনা জানতে পেরে চীৎকার জুড়ে দিলো: -কী করে সে অতগুলো সশস্ত্র মানুষের চোখে 'ধুলো দিয়ে' চলে যেতে পারলো! এরপর ইবলিসটা আমার দিকে চোখ লাল করে তাকিয়ে বললো: -এই সাপ! তুই কোথায় ছিলি! কেনো মুহাম্মদের পথ আগলে দাঁড়াস নি! আমি বললাম: -সে আর পারলাম কই! তিনি আমার আগেই তো চলে গেলেন! নজদের শায়খরূপী ইবলিস এবার জ্বলে উঠলো: -মিথ্যে বলছিস তুই! ইচ্ছে করলেই বাধা দিতে পারতিস! অন্য সাপদেরকে জানিয়ে দিলি না কেন? তাহলেই তো কেউ-না-কেউ ছোবল বসিয়ে দিতে পারতো! তুই একটা অপদার্থ! মনে রাখিস্! আমি তোরে উচিত শিক্ষা দেবো! এ-কথা বলে ইবলিস হনহন করে চলে গেলো। উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে সুরাকা বিন মালিককে বললো: 'তাড়াতাড়ি মুহাম্মদের খোঁজ লাগাও! পুরস্কার পাবে, মোটা পুরস্কার!
মুহাম্মদ এবং প্রিয় সাহাবী আবু বকর গিয়ে আশ্রয় নিলেন গারে সাওরে। আত্মগোপন করে থাকলেন। সে গুহায় ছিলো অনেক ছিদ্র। ছিদ্রে ছিদ্রে ছিলো সাপের বসবাস। এরা সবাই আমার এবং ইবলিসের নির্দেশের অপেক্ষায় বসে ছিলো। আবু বকর ব্যাপারটা চিন্তা করে অনেক সতর্ক ছিলেন। সাপেরা আমাকে পরে জানিয়েছে যে আবু বকর প্রথমে মুহাম্মদকে ঢুকতে দেন নি। বরং নিজে ঢুকে সাপের ছিদ্রগুলো একে একে বন্ধ করে দিয়েছিলেন— নিজের পোশাক ছিঁড়ে ছিঁড়ে। সবগুলো ছিদ্রের মুখ তিনি বন্ধ করতে পারলেও কাপড়ের টুকরো শেষ হয়ে যাওয়াতে একটা ছিদ্র বন্ধ করতে পারলেন না। অগত্যা সেখানে নিজের প্রিয় পা'টাই দিয়ে রাখলেন! প্রিয়কে বিপদমুক্ত রাখতে প্রিয় উৎসর্গ করার কী আশ্চর্য সুন্দর দৃষ্টান্ত!
তখন যা ঘটা স্বাভাবিক ছিলো তাই ঘটলো! একটি সাপ মুহাম্মদের প্রিয় বন্ধুটির প্রিয় পা'টায় ছোবল মারলো! নবীজী তখন আবু বকরের উরুতে মাথা রেখে আরাম করছিলেন। তাই তীব্র ব্যথা সত্ত্বেও আবু বকর নড়লেন না, সাপের নীল বিষ নিয়েই নীরবে বসে রইলেন। তাঁর চোখ বেয়ে বেয়ে পড়ছিলো বেদনা-সঞ্জাত টপটপ 'নীল' অশ্রু! আল্লাহ্র রাসূলের গালে এসে পড়লো যখন সেই গরম অশ্রুর একটা ফোঁটা তখন তাঁর নিদ্রা ভেঙে গেলো। দেখলেন আবু বকর কাঁদছেন নীরবে। কারণটা জানলেন। তারপর নিজের মুখের একটু লালা লাগিয়ে দিলেন আক্রান্ত স্থানে। নিমেষেই ব্যথা দূর হয়ে গেলো! আবু বকর পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াতেও পারলেন! যেনো কিছুই হয় নি!!
তিনদিন পর তিনি মুহাম্মদকে নিয়ে বের হয়ে গেলেন গারে সাওর থেকে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ছুটে চললেন মদীনার দিকে। তাঁদেরকে কেউ আটকাতে পারলো না। না ইবলিস। না আমি এবং আমার সঙ্গীরা। না শত উট-লোভী সুরাকা। আল্লাহ মুহাম্মদকে হিফাযত করেছেন। তিনিই সর্বোত্তম হিফাযতকারী। তিনি যা চান তাই হয়, যা চান না তা হয় না! তাঁর ইচ্ছাই সব সময় কার্যকর হয়। ইন্নাহু ফা'আলুল্ লিমা ইয়ূরিদ!
وَإِذْ يَمْكُرُ بِكَ الَّذِينَ كَفَرُوا لِيُثْبِتُوكَ أَوْ يَقْتُلُوكَ أَوْ يُخْرِجُوكَ وَيَمْكُرُونَ وَيَمْكُرُ اللَّهُ وَاللَّهُ খَيْرُ الْمَاكِرِينَ .
'আর যখন কাফেররা তোমাকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করছিলো তোমাকে বন্দি করতে অথবা তোমাকে হত্যা করতে কিংবা (মক্কা থেকে) বের করে দিতে, তারা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিলো, আল্লাহ্ (তোমাকে উদ্ধারের জন্যে) কৌশল করছিলেন, আর আল্লাহই সর্বশ্রেষ্ঠ কুশলী।' -সূরা আনফাল
📄 আমি কবুতর বলছি
আমি সাদা রঙের। মানুষ আমাকে শান্তির প্রতীক মনে করে, বলে— ‘শান্তির পায়রা’। এ জন্যেই বুঝি আমাকে নিয়ে কবিরা লিখেছেন কবিতা, গেয়েছেন শান্তির জয়গান। শিল্পের রঙধনুতে রাঙিয়ে দিয়েছেন কবিতার আকাশ। লেখকেরা আমার বর্ণনায় লিখেছেন পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা। গেয়েছেন কতো স্তুতিগান। তাদের সব সৃষ্টিগাথার সার কথা একটাই— আমি শান্তি ও সমৃদ্ধির আধার। কিন্তু এ-সবে আমার তেমন গা নেই। গর্ব করার মতোও কিছু খুঁজে পাই না। আমার গর্ব ও মর্যাদার উৎস অন্যখানে। হ্যাঁ, সে কথা বলতেই আমি তোমাদের মাথার উপর উড়ছি। একটু বসতে দেবে?...
তাহলে শোনো সে গর্বের কাহিনী—
মসজিদুল হারামের আকাশটাই আমার ঠিকানা— বিচরণক্ষেত্র। মনে চাইলে ডানা মেলে মনের সুখে এখান থেকে ওখানে যাই। ওখান থেকে এখানে আসি। উড়ে উড়ে দেখি মসজিদুল হারামের শোভা। আরো দেখি কা’বা-কেন্দ্রিক তাওয়াফকারীদের ‘অবিরাম’ ছুটে চলা। কখনো এসে নামি কা’বা চত্বরে। এটা সেটা কুড়িয়ে খাই, নির্ভয়ে। কেউ আমার কোনো ক্ষতি করে না। বরং আমার কাছে এসে দাঁড়িয়ে থাকে, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আমাকে দেখে। ‘কেউ কেউ তো আমার মাথায় আদর করে হাত রাখে—দিয়ে যায় স্নেহভরা কর-স্পর্শ’! তখন আমার খুব ভালো লাগে। সবাইকে বন্ধু-বন্ধু লাগে। কখনো আমি নীরবে তাকিয়ে থাকি কা’বার স্বর্গীয় সৌন্দর্যের দিকে। উপভোগ করি তার শোভা। ভাবি, কী সুন্দর কা’বার শোভা! এ-শোভায় কী মায়া! কী মায়া!!
সেদিন সকালে আমি মক্কার অদূরে একটা গুহার উপরে উড়ছিলাম। ডিম পাড়ার একটা উপযুক্ত জায়গা খুঁজছিলাম। ডিমে তা দিয়ে দু'টি বাচ্ছা ফোটানোর জন্যে জায়গাটা নিরিবিলি হওয়া জরুরী। এই গুহাটা আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। কিন্তু অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করলাম অনেক সাপ গুহাটায়। মনে হলো, ওরা যেনো কারো অপেক্ষা করছে। আমি গুহায় নামতে পারলাম না। নামলেই-যে ওরা আমাকে ছোবল দেবে, এতে আমার কোনো সন্দেহ নেই। এর মধ্যে একটা মাকড়সার সাথে আমার দেখা হয়ে গেলো। আমি ওর কাছে জানতে চাইলাম: -এই, এখানে এতো সাপ কেনো? কেনো ওরা ভীড় করেছে?
মাকড়সাটি বললো: -আমি ঠিক জানি না। তবে শুনেছি, মক্কার বড় সাপটা নাকি সবাইকে এখানে আসার নির্দেশ দিয়েছে। উদ্দেশ্য হলো, দু'জন মানুষের পথে বাধা সৃষ্টি করা।
আমি জানতে চাইলাম: -কোন্ দু'জন? কে তারা? তাদেরকে বাধা দিতে হবে কেনো?
মাকড়সা বললো: -আমি ঠিক জানি না। তবে তুমি তো আকাশে উড়তে পারো। দেখোই-না একটু, কোথাও কিছু নজরে পড়ে কি না!
আমি উড়াল দিলাম। অনেক উপরে উঠে এলাম। বেশ খানিকটা দূরত্ব অতিক্রম করার পর দেখতে পেলাম আবু বকরকে সাথে নিয়ে আল্লাহ্র রাসূল এ-দিকে আসছেন। তাঁদের মাঝে কথা হচ্ছিলো একটা নিরাপদ আশ্রয় নিয়ে, যেখানে কয়েকটা দিন আত্মগোপন করে থাকা যাবে। আমি বুঝতে পারলাম, আগে থেকেই তাঁরা এ-গুহাটা নির্বাচন করে রেখেছিলেন। তাঁদের পরবর্তী গন্তব্য ইয়াসরিব-মদীনা। আমি তাঁদের আগে আগে উড়তে লাগলাম। তাঁদেরকে 'পথ দেখাতে' লাগলাম। নবীজী এবং আবু বকরের জন্যে আমার মনটা হঠাৎ কেঁপে উঠলো। এই-যে তাঁরা গুহায় যাচ্ছেন, সেখানে তো অনেক সাপ! কেমন করে তাঁরা সেখানে থাকবেন? রাত কাটাবেন? একাধারে কয়েকদিন?
সাপ-কোপের বিষয়টা আমাকে উদ্বিগ্ন করে তুললো। এদিকে মক্কার কাফির মুশরিকরাও নিঃসন্দেহে তাঁদের পিছু নেবে। একটা অজানা আশঙ্কায় আমার মনটা আবার কেঁপে উঠলো। হায়, কী অবস্থা! সামনে সাপ! পেছনে শত্রু! সব মিলিয়ে আমার খুব ভয় করছিলো। তাঁদের বিপদের আশঙ্কায় আমার বুকটা দুরুদুরু করতে লাগলো। কিন্তু আল-হামদুলিল্লাহ! আমি স্বস্তি ফিরে পেলাম যখন দেখলাম, আবু বকর আগে গিয়ে সবগুলো গর্ত কাপড় দিয়ে বন্ধ করে দিলেন। একটা গর্ত কাপড়ের অভাবে বন্ধ করা গেলো না। আহা, আমি যদি সেটি আমার শরীর বিছিয়ে বন্ধ করতে পারতাম! হায়! আমি যদি আরো আগে এসে গুহাটা সাফ করে দিতে পারতাম!
মাকড়সাটিও দেখলাম ঐ গর্তটা খোলা থাকায় আমার মতোই ভীষণ উদ্বিগ্ন। কিন্তু সেরা নবীর সেরা উম্মত হযরত আবু বকর আমাদের দুশ্চিন্তা স্থায়ী হতে দিলেন না। তিনি নিজেই তা পা দিয়ে বন্ধ করে দিলেন! আল্লাহু আকবার! নবীজীর জন্যে কী তাঁর মায়া ও দরদ! সাপের কামড়ে দংশিত হওয়ার আশঙ্কাকে কী অবলীলায় তিনি উপেক্ষা করলেন, শুধু প্রিয়নবীর নিরাপত্তার কথা ভেবে!
আমি কোথাও স্থির হয়ে বসতে পারছিলাম না। কেবল এদিক ওদিক ওড়াউড়ি করছিলাম। ভয়ে উদ্বেগে। মাকড়সা আমার এ অবস্থা দেখে বললো:
-কী ব্যাপার! তুমি এতো অস্থির যে! ডিম পাড়ার একটা ভালো জায়গা খুঁজে নিলেই পারো! অমন অস্থির হয়ে ওড়াউড়ি করছো কেনো?
আমি বললাম: -বন্ধু! আমি ডিমপাড়া নিয়ে ভাবছি না। আমি আশঙ্কা করছি নবীজী এবং আবু বকরের কোনো বিপদ না হয়! কাফির মুশরিকরা কখন এখানে ছুটে আসে— বলা তো যায় না!
এই বলে আমি মক্কার দিকে উড়ে গেলাম। অনেক দূর যাওয়ার পর আবার ফিরে এলাম। ফিরে এলাম রাজ্যের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে! এসেই মাকড়সাকে বললাম: -বন্ধু! একটু ভেবে দেখেছো কি, কাফির মুশরিকরা এখানে চলে এলে তাঁদের কী অবস্থা হবে? বাঁচার তো আমি বাহ্যিক কোনো উপায় দেখছি না! আমরা কি কিছু একটা করতে পারি না!
মাকড়সা একটু চুপ থেকে বললো: -আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে! আমি এই মুহূর্তে গুহাটার মুখে জাল বুনে মুখটাকে ছেয়ে ফেলবো!
আমি তো অমন অদ্ভুত প্রস্তাবের কথা শুনে প্রথমটায় হেসেই উড়িয়ে দিতে যাচ্ছিলাম। বুঝতেই পারছিলাম না মাকড়সার পাতলা জালে কী করে গুহার মুখ আটকে দেওয়া সম্ভব! কিন্তু পরক্ষণেই মনে এলো— না, এটা চমৎকার একটা কৌশল! এ ছাড়া আমিও তো তার সাথে যোগ দিতে পারি!
তাই করলাম। মাকড়সা দ্রুত জাল বুনে যেতে লাগলো আর আমি গুহার মুখের কাছেই একটা ‘বাসা’ তৈরী করে ডিম পাড়লাম এবং তা দিতে লাগলাম!
আমার আশঙ্কাই সত্য হলো। কাফেররা সত্যি সত্যি চলে এলো। একেবারে গুহার মুখে। আমি কান পেতে রইলাম। হঠাৎ শুনতে পেলাম ওরা বলছে:
-মুহাম্মদ ও আবু বকর এখানে এই গুহাটায় লুকিয়ে নেই তো!
-হয়তো বা!
-অবশ্যই তারা এখানে আছে!
আরেকজন বললো:
-অসম্ভব! এখানে থাকবে কী করে! এটা তো সাপ-কোপে ভরা!
এভাবে ওদের মধ্যে কথা কাটাকাটি চলতে লাগলো।
একজন বলে: -প্রবেশ করবো..
আকেজন বলে: -না, প্রবেশ করবো না!
আরেকজন বলে: -কেনো ঢুকবো না? দেখতে অসুবিধা কী?
অপরজন উত্তর দেয়: -কেনো ঢুকবো? শুধু শুধু সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয়?
এভাবে আওয়াজ উচ্চ হতে লাগলো। মতবিরোধ বাড়তে লাগলো। একজন বেশ বুদ্ধিমানের মতোই বললো:
-চলো তো! এখানে কালক্ষেপণ করে লাভ নেই! এখানে দীর্ঘদিন কেউ ঢুকে নি!
আরেকজন বললো: -কী করে বুঝলে?
-কী করে বুঝলাম মানে? তুমি দেখছি একটা হাদারাম, চেয়ে দেখো; মাকড়সা গুহার মুখে কেমন জাল বুনে বসে আছে! কেউ ঢুকলে কি আর এই জাল অক্ষত থাকে, না মাকড়সা থাকতে পারে?! তা ছাড়া ওই যে দেখো; একটা কবুতর ডিমে তা দিচ্ছে! কেউ এখানে ঢুকলে কবুতরটা কি এখানে কি অমন করে বসে থাকতো? বরং ডিমগুলো ভেঙে পড়ে থাকতো! নিশ্চিত এখানে অনেক দিন কেউ আসে নি!
সবাই তার কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বললো: -তুমি ঠিকই বলেছো! আমরা এ-সব চিন্তা করে দেখি নি! এখানে কেউ থাকতে পারে না। চলো.. চলো!
এরা দূরে চলে গেলো! আরো দূরে! আ-রো দূরে! আমরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম! যেই ওরা দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেলো, অমনি আমি বাসা ছেড়ে আকাশে উড়াল দিলাম! ডানা ঝাপটে আনন্দ প্রকাশ করতে লাগলাম! আর বন্ধু মাকড়সাটি সরচিত জালে মনের হরষে নাচতে লাগলো! আহা, যদি আমাদের মনের এ বান-ডাকা আনন্দ-স্রোত তাঁদের সামনে বইয়ে দিতে পারতাম-প্রকাশ করতে পারতাম! যদি তাঁদের বোধগম্য ভাষায় বলতে পারতাম- আমরাও তোমাকে ভালোবাসি হে নবী! আমরাও তোমাদের হিজরতের এ-অভিযানে সঙ্গে আছি হে প্রিয়!
তিনদিন পর নবীজী এবং আবু বকর আত্মগোপন থেকে বেরিয়ে নতুন করে পথচলা শুরু করলেন। গারে সাওর ছিলো তিনদিনের আশ্রয়স্থল। এখন গন্তব্য ইয়াসরিব- মদীনা। আমি তাঁদের মাথার উপর দিয়ে উড়ে উড়ে ডানা ঝাপটে তাদের উদ্দেশে বলতে লাগলাম-মা'আস্ সালামাহ! নিরাপদে পৌঁছো তোমরা মদীনায়!
﴿ إِلَّا تَنْصُرُوْهُ فَقَدْ نَصَرَهُ اللَّهُ إِذْ أَخْرَجَهُ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا ثَانِيَ اثْنَيْنِ إِذْ هُمَا فِي الْغَارِ إِذْ يَقُوْلُ لِصَاحِبِهِ لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا فَأَنْزَلَ اللَّهُ سَكَيْنَتَهُ عَلَيْهِ وَأَيَّدَهُ بِجُنُوْدٍ لَمْ تَرَوْهَا وَجَعَلَ كَلِمَةَ الَّذِيْنَ كَفَرُوا السُّفْلَى وَكَلِمَةُ اللَّهِ هِيَ الْعُلْيَا وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ ﴾
'যদি তোমরা তাঁকে (রাসূলকে) সাহায্য না করো, তবে মনে রেখো, অবশ্যই আল্লাহ তাঁকে সাহায্য করেছিলেন, যখন কাফেররা তাঁকে (মক্কা থেকে) বের করে দিয়েছিলেন, তিনি (নবী) ছিলেন দু'জনের একজন, যখন তাঁরা গুহার মধ্যে ছিলেন। তখন তিনি নিজের সঙ্গীকে বললেন, দুশ্চিন্তার কী আছে, আল্লাহ আমাদের সাথেই আছেন। অতঃপর আল্লাহ তাঁর প্রতি স্বীয় প্রশান্তি নাযিল করলেন এবং তাঁর সাহায্যে এমন বাহিনী পাঠালেন যা তোমরা দেখোনি। বস্তুত: আল্লাহ কাফেরদের মাথা নিচু করে দিলেন। আর আল্লাহর কথাই সদা চিরসমুন্নত। আল্লাহ পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়। -সূরা তাওবা