📄 একটি রাতের আত্মকাহিনী
সূর্য ডুবেছে অনেকক্ষণ। চারদিকে শুধু অন্ধকার। আকাশে বসেছে মিটিমিটি তারার মেলা। না, আকাশে তখন চাঁদ ছিলো না। কারণ আমি ছিলাম 'চাঁদ মাস-রমজানের' শেষ সপ্তাহের একটি রাত। আজও মক্কা ও আরব উপদ্বীপের মানুষ আমাকে স্বাগত জানিয়েছে গতানুগতিকভাবে-অন্যান্য রাতের মতোই। কেউ জেগে আছে, গল্প করে, হৈ হুল্লোড় করে সময় পার করছে। কেউ-বা আবার নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে। থাক সে কথা; এখন আমার পরিচয়টা আরেকটু পরিস্কার করে বলি-
আমি একটি রাত—মহিমান্বিত রাত। আমার জন্মলগ্ন থেকেই দুনিয়া আমার অপেক্ষায় বসে ছিলো। আমি তো আর যেই-সেই রাত নই! আমার ফযিলত ও মর্যাদা এবং শান ও মাহাত্ম্য সম্পূর্ণ আলাদা। আমার মধ্যে লুকিয়ে আছে শুধু নূর আর নূর-আলো আর আলো। এ নূর বা আলো মোটেই সূর্য থেকে পাওয়া নয়, চাঁদের আলোর মতোও নয়। না, কোনো 'কৃত্রিম' আলোর ফুলঝুরিও নয়। এ নূর ও আলো সম্পূর্ণ অন্য জিনিস। এ নূর হলো আল্লাহ্র নূর, যা পৃথিবী বলো আর আকাশ বলো সবকিছুকে আলোকময় করে তোলে। হ্যাঁ, এ নূরের বরকতেই আমি হয়ে গেছি হাজার মাসের চেয়েও উত্তম! তিন হাজার দিনের চেয়েও সেরা। ছয় সহস্র দিবা-রাত্রির চেয়েও শ্রেষ্ঠ। তিরাশি বছরের চেয়েও উত্তম!
এখন চিনতে পারছো? আমি লাইলাতুল কদর—মহিমান্বিত রজনী!!
আমার জন্ম রমজান মাসে। ৬১০ খৃষ্টাব্দে। অর্থাৎ হিজরী সন আরাম্ভ হওয়ার ১৩ বছর পূর্বে। যেদিন আল-আমীন নবী হয়েছেন— তাঁর উপর প্রথম ওহী নাযিল হয়েছে, সেদিনই আমার জন্ম। এখন মনে হয় আমাকে চিনতে পেরেছো!
আরো বিস্তারিত বলছি—
মক্কার অদূরে একটা গুহা আছে—গারে হেরা। মুহাম্মদ প্রায়ই ওখানে ছুটে যেতেন। তিনি একটা লম্বা সময় সেখানে অবস্থান করতেন। লা-শরীক আল্লাহ্র দরবারে মুনাজাত করতেন। ইবাদত-সাধনায় ডুবে থাকতেন। কিন্তু অপরদিকে সারা মক্কা তখন ডুবে ছিলো বুত-সাধনায়—মূর্তিপূজায়।
আমার যখন জন্ম তখন মুহাম্মদের বয়স চল্লিশ হয়ে গেছে। এই গারে হেরাতেই সেদিন তিনি ইবাদতে মগ্ন। তাহাজ্জুদে সমাহিত (গভীর মনোযোগী, নিমগ্ন)। অশ্রুময় মুনাজাতে সমর্পিত। তিনি দু'হাত তুলে ডাকছিলেন আল্লাহকে যে-ভাষায়, তার ভাব যেনো এই—
‘হে পৃথিবীর মালিক! হে আকাশের রব! তুমিই তো সৃষ্টি করেছো চাঁদ-সুরুজ! তারায় ভরা ঐ রাতের আকাশ! এই পাহাড়-পর্বতও তোমারই সৃষ্টি! সবকিছুই তোমার সৃষ্টি! আমিও তোমার সৃষ্টি! তুমি আমারও স্রষ্টা! হে আমার রব! আমি তোমাকে চাই, শুধুই তোমাকে!’
হ্যাঁ, যখন চলছিলো এই গভীর মুনাজাত ও সকাতর দু'আ তখনই নূরে নূরে ভরে গেলো কুল মাখলুকাত। আলোয় আলোয় ছেয়ে গেলো সৃষ্টিলোক। আকাশে আলো। জমিনে আলো। সবখানে আলো। এই হেরা গুহায় সবচে' বেশী আলো। তখন আসমানের এক ফেরেশতা নেমে এলেন। তিনি ফেরেশতাকুল সরদার-হযরত জিবরীল। সাথে নিয়ে এলেন সবচে' সুন্দর, সবচে' শ্রেষ্ঠ, সবচে' মহান কিছু কথা, যা এই প্রথম শুনলো দুনিয়া! তিনি মুহাম্মদকে বললেন: -পড়ুন!
উত্তরে মুহাম্মদ বললেন: -আমি পড়তে জানি না!
তখন হযরত জিবরীল মুহাম্মদের কাছে এলেন। তাঁকে বুকে চেপে ধরলেন। একবার। দুইবার। তিনবার। প্রতিবারই বলছিলেন: -পড়ুন!
মুহাম্মদও প্রতিবার উত্তরে বলছিলেন: -আমি তো পড়তে জানি না!
অবশেষে হযরত জিবরীল তিলাওয়াত করলেন-
اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ خَلَقَ الإِنسَانَ مِنْ عَلَقٍ اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ. عَلَّمَ الإِنسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ .
‘পড়ো তোমার রব-এর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাটবাধা রক্ত থেকে। পড়ো। তোমার রব বড়ো দয়ালু। যিনি মানুষকে জ্ঞান দান করেছেন কলমের সাহায্যে। মানুষকে জানিয়েছেন সে কথা যা সে জানতো না।’ -সূরা আলাক
এবার মুহাম্মদও হযরত জিবরীলের সাথে সেই বাণী আওড়াতে লাগলেন। এরপর জিবরীল চলে গেলেন। মুহাম্মদ ভীষণ ভয় পেয়ে গেলেন। তাড়াতাড়ি বাড়ি ছুটে গেলেন। খাদিজার কাছে ফিরে গেলেন। ভয়ে কাঁপছিলেন তিনি। কপাল থেকে টপটপ বেয়ে পড়ছিলো ফোঁটা ফোঁটা ঘাম। হযরত খাদিজা তাঁকে বিছানায় শুইয়ে দিলেন। চাদর দিয়ে ঢেকে দিলেন। উদ্বেগভরে শিয়রে বসে রইলেন। ধীরে ধীরে মুহাম্মদ যখন শান্ত হলেন তখন খাদিজাকে একে একে সব খুলে বললেন। তাঁকে বললেন, কেমন করে হেরা গুহা আলোকোদ্ভাসিত হয়ে উঠলো, অথচ গুহাটা ছিলো অন্ধকার। কেমন করে জিবরীল তাঁর কাছে এসে তাঁকে পড়তে বললেন। তারপর তিনি তাঁকে একে একে তিনবার আলিঙ্গন করার—বুকে চাপ দেয়ার কথা জানালেন। আরো জানালেন, প্রথমে তিনি কী বলেছেন এবং জিবরীল কী করেছেন। আর সব শেষে কেমন করে জিবরীলের সাথে সাথে সেই বাণী তিনি আওড়েছেন! এরপর মুহাম্মদ সেই বাণী হযরত খাদিজাকেও একবার পড়ে শোনালেন।
হযরত খাদিজা মুহাম্মদকে সান্ত্বনা দিলেন। বললেন: -ভয়ের কিছু দেখছি না! আল্লাহই আপনার সহায়। আপনি অনেক ভালো মানুষ। অনেক দয়ালু মানুষ। পরিবারকে কতো ভালোবাসেন আপনি। জীবনে কখনো মিথ্যা বলেন নি। সবাইকে সহযোগিতা করেন। সবার হক আদায় করেন। আপনি তো মহান চরিত্রের অধিকারী। সত্যবাদী। বিশ্বস্ত। কেউ আপনার ক্ষতি করতে পারে না। কোনো দুশ্চিন্তা করবেন না।
খাদিজা নিজে যা বলার তা তো বললেন। যেভাবে পারলেন সেভাবে বললেন। অনেক সান্ত্বনা দিলেন। এবার নিজে আরো আশ্বস্ত হওয়ার জন্যে এবং প্রিয় আল-আমীনকে আরো ভয়মুক্ত করার জন্যে তাঁকে নিয়ে তিনি ছুটে গেলেন চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবনে নওফলের কাছে। তিনি ছিলেন ভীষণ জ্ঞানী ও প্রাজ্ঞ মানুষ। আসমানী কিতাব—তাওরাত-ইঞ্জিল তার বেশ পড়া ছিলো। ধর্ম বিষয়ে একজন সুপণ্ডিত ছিলেন তিনি। এ জন্যে মূর্তিপূজা ছিলো তাঁর ভীষণ অপছন্দ। ওয়ারাকা ইবনে নওফল মুহাম্মদের কাছে হেরা গুহায় ঘটে-যাওয়া সবকিছু শুনলেন, উৎকর্ণ হয়ে, তন্ময়চিত্তে। আর ধীরে ধীরে তাঁর মুখে ফুটে উঠতে লাগলো কী যেনো এক প্রাপ্তির হাসি! অদ্ভুত এক তৃপ্তির হাসি! সুন্দর এক মধুর হাসি! অজানা এক দিগন্তের উদ্ভাস! অজানা বলছি কেনো? জানাই তো! তাই তো মুহাম্মদের পক্ষ থেকে শোনা যখন শেষ তাঁর পক্ষ থেকে সুসংবাদ তখন শুরু! এবং এভাবে—
‘ভাতিজা! সুসংবাদ! তোমার উপর আসমানী ওহী নাযিল হয়েছে! তুমি নবী হয়ে গেছো! এ-উম্মতের নবী! আরবের নবী! আজমের নবী! সারা পৃথিবীর নবী! তুমি এখন মূসা আলাইহিস সালাম ও ঈসা আলাইহিস সালামের মতো! তোমাকে আল্লাহ নবী বানিয়েছেন মানুষকে হিদায়াতের রাস্তা বলে দিতে! কল্যাণের ভালোবাসার ও রহমতের সবক শেখাতে! প্রথম দিকে মানুষ বিশ্বাস করতে চাইবে না তোমাকে! এমনকি তোমাকে তোমার দেশ-এ-মক্কা থেকেও ওরা বের করে দেবে! কিন্তু শেষ পর্যন্ত তুমিই বিজয়ী হবে। তোমার ধর্মই বিজয়ী হবে। তোমাকে ধর্মের পথে অনেক যুদ্ধও করতে হবে। হায়! আমি যদি বেঁচে থাকতাম, তোমাকে অনেক সাহায্য করতাম!’
মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবার আরো শান্ত হলেন। আরো আশ্বস্ত হলেন। ওয়ারাকা ইবনে নওফলের কথা তাঁর ভীষণ ভালো লাগলো। যে-ওহীর আগমনে তিনি প্রথমে ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন এখন সে-ওহী যেনো আবার আসে, বারবার আসে এবং আমার মতো রাত্রি যেনো আরো আসে, সে জন্যে তাঁর মন ব্যাকুল হয়ে উঠলো। প্রায়ই তিনি ছুটে যেতেন উঁচু পাহাড়ে এবং গুহায়- সেই ওহীর আশায়, সেই ওহীর ব্যাকুলতায়। কিন্তু দ্বিতীয়বার ওহী আসতে দেরী হচ্ছিলো। সে জন্যে তাঁর উদ্বেগের কোনো কূল রইলো না। দুশ্চিন্তার কোনো সীমা রইলো না।
না, বেশী দিন অপেক্ষা করতে হয় নি। আবার এলো তাঁর কাছে ওহী। আবার এলো আসমানী দূত হযরত জিবরীল। এবারও ঠিক আগের মতোই তাঁর সারা গায়ে কম্পন সৃষ্টি হলো। তিনি দরদর করে ঘামতে লাগলেন। তিনি খাদিজাকে বললেন: -খাদিজা! আমাকে কম্বল দিয়ে ঢেকে দাও! তাড়াতাড়ি ঢেকে দাও!
খাদিজা তাঁকে ঢেকে দিলেন। রাসূল শুয়ে আছেন। খাদিজা পাশে বসে আছেন। ঠিক তখনই ভেসে এলো আসমানী দূতের কণ্ঠে এই আয়াতগুলো, যা শুধু তিনিই শুনতে পাচ্ছিলেন-
يَا أَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ. قُمْ فَأَنذِرْ وَرَبَّكَ فَكَبِّرْ وَثِيَابَكَ فَطَهِّرْ. وَالرُّجْزَ فَاهْجُرْ. وَلَا تَمْنُنْ تَسْتَكْثِرُ. وَلِرَبِّكَ فَاصْبِرْ .
‘হে চাদর আবৃত! উঠে পড়ুন এবং (মানুষকে) সতর্ক করুন। আপন প্রতিপালকের মাহাত্ম্য ঘোষণা করুন। নিজের পরিধেয় বস্ত্র পবিত্র করুন। গোনাহ থেকে বেঁচে থাকুন। বেশি পাওয়ার জন্যে কাউকে কিছু দেবেন না। আপন প্রতিপালকের (সন্তুষ্টির) জন্যে সবর করুন।’ -সূরা মুদ্দাসসির
এরপর ওহী নাযিল হচ্ছিলো একের পর এক। আয়াতের পর আয়াত। সবশেষে নাযিল হলো এই আয়াত—
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا .
‘আজ আমি তোমাদের জন্যে পরিপূর্ণ করে দিলাম তোমাদের দীন। আর পরিপূর্ণ করে দিলাম তোমাদের জন্যে আমার নেয়ামতসমূহ এবং দীন হিসাবে আমি তোমাদের জন্যে মনোনীত করলাম একমাত্র ইসলামকেই।’ -সূরা মায়েদা
সারা জীবন আমি -কদরের রাত- গর্ব করে বেড়াবো। কেননা ওহী নাযিলের সূচনা-রাত্রি ছিলাম আমি। আমার একান্ত নিজস্ব প্রহরে আকাশ থেকে নেমেছিলো কুরআন। অনাগত দিনে কতো মানুষের কণ্ঠে উচ্চারিত হবে এ-প্রশ্ন- কুরআন কখন নাযিল হতে শুরু করেছে? উত্তর একটাই, লাইলাতুল কদর—কদরের রাতে। মহিমান্বিত রজনীতে। আল্লাহ আমাকে কতো সম্মান দিয়েছেন! তিনি কুরআনে আমার আলোচনা করে আমার শান ও মর্যাদাকে কতো বাড়িয়ে দিয়েছেন! আমাকে 'এক বরকতময় রজনী' বলে ঘোষণা দিয়েছেন। এ কারণেই মুসলিম উম্মাহ সারা বছর আমার জন্যে অধীর অপেক্ষায় বসে থাকে। রমজানের শেষ দশকে খুঁজে বেড়ায় আমাকে, বেলায় অবেলায়। খুঁজবেই তো! তারা-যে জানে যখন আমি আসি, নূরের পসার নিয়ে আসি! আমার প্রতিটি মুহূর্ত ও প্রহর নূরে নূরে ছাওয়া। বরকতে বরকতে ঘেরা। এ-সব প্রহরে করা হয় যতো দু'আ, স-ব কবুল করেন আমার মাওলা! এই দেখো, কী সুন্দর করে বলেছেন আমার কথা আমার আল্লাহ-
إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ مُبَارَكَة.
‘নিশ্চয়ই আমি তা (কুরআন) নাযিল করেছি এক বরকতময় রজনীতে।’ -সূরা দুখান
শুধু একটি আয়াতের কথা বলছি কেনো? আমার মালিক তো আমাকে নিয়ে পূর্ণ একটি সূরাই নাযিল করেছেন! সূরাতুল কদর। কী সৌভাগ্য আমার! পড়ো-না একটু সূরাটি!
إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ. وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ. تَنَزَّلُ الْمَلائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ مِنْ كُلِّ أَمْرٍ. سَلَامٌ هي حَتَّى مَطْلَعِ الْفَجْرِ.
‘আমি তো কুরআন নাযিল করেছি কদরের রাতে। জানো কি, কদরের রাত কী? কদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও সেরা! সে রাতে ফেরেশতারা এবং জিবরীল নেমে আসেন, তাদের রব-এর নির্দেশে— সমস্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে। কদরের রাত, সে তো শান্তি আর নিরাপত্তা— একেবারে ভোরের আলোক রেখা ফুটা পর্যন্ত।’ -সূরা কদর
📄 আমি এক থোকা আঙুর
আমি এক থোকা আঙুর। ঝুলে আছি বাগানের লতানো শাখায়, তায়েফ নগরীতে। এ-বাগানটা উতবা বিন রবী'আ এবং তার ভাই শায়বা বিন রবী'আর। ওরা মালিক হলেও বাগানের সার্বক্ষণিক দেখাশোনায় নিয়োজিত ছিলো 'আদ্দাস' নামের এক মালী। বড়ো ভালো মানুষ তিনি। তার নিরলস যত্নেই বাগানটা প্রাণময়, সজীব। আঙুরের লতাগুল্ম কী সুন্দর লকলকিয়ে বেড়ে উঠেছে। ছড়িয়ে পড়েছে মাচানময়। এই লতায়িত মাচানের নিচে ঝুলে ঝুলে আমি একটা স্বপ্ন দেখে চলেছি। বলবো তোমাকে মধুর সে স্বপ্নের কথা! অমন স্বপ্নের কথা বলতেও তো মধু-মধু লাগে! শোনোই তাহলে-
আমার স্বপ্নটা হলো, প্রিয় মুহাম্মদকে একটিবার দেখা। চোখভরে.. মনভরে। এ-মুহূর্তে আমি ভীষণ খুশি। ভীষণ উত্তেজিত। হর্ষোচ্ছ্বাসে প্লাবিত। মনের হরষে (আনন্দে) আমার লতাগুল্মরা কাঁপছে। কারণ জানতে চাও! কারণ হলো আমার স্বপ্নটা একেবারেই আমার 'হাতের' কাছে! অর্থাৎ?! অর্থাৎ আমি জানতে পেরেছি প্রিয় মুহাম্মদ এখন তায়েফে! আহা! আমি যদি তাঁর কাছে চলে যেতে পারতাম উড়ে উড়ে কিংবা ভেসে ভেসে! কিংবা অন্যভাবে! কিন্তু সে তো আর হবার নয়! তাহলে আমার স্বপ্ন? সে কি বাস্তবায়িত হবে না? আমার 'টসটসে' বিশ্বাস; বাস্তবায়িত হবে, হবেই! অমন মধু-স্বপ্ন দেখার তাওফিক যখন হয়েছে, বাস্তবায়নের মুখ দেখার ভাগ্যও হবে!
এবার এসো খোঁজ নিই, প্রিয় নবী কেনো এলেন তায়েফে— তিনি এসেছেন তায়েফের বনু সাক্বীফ গোত্রকে ইসলামের দাওয়াত দিতে। তাঁর তায়েফ সফরটা হয়েছে বেশ গোপনে—সবার অলক্ষ্যে। তাঁর মনের আশা, বনু সাক্বীফ তাঁকে হতাশ করবে না, কুরাইশ যা করেছে তারা তা করবে না। বরং তারা তাঁকে গ্রহণ করবে। তাঁর দাওয়াত কবুল করবে। তাঁর ডাকে সাড়া দেবে। কেননা এরা কোরাইশ গোত্রের চেয়ে কম জাত্যাভিমানী (বংশ ও কুল নিয়ে গর্ব করে যারা) এবং ওদের তুলনায় এদের বুদ্ধিশুদ্ধিও একটু বেশী।
আমার জন্মের পর যখন আমি ছোট্ট একটা লতে ফুটফুট কলির মতো—ছোট ছোট কাঁচা আঙুর, সেই থেকেই আমি শুনে আসছি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা, আমার ছায়ায়-বসা মানুষের মুখে মুখে। আমি জানতে পেরেছি, তাঁর প্রতি সর্বপ্রথম ঈমান এনেছেন- পুরুষদের ভিতরে হযরত আবু বকর, মহিলাদের ভিতরে হযরত খাদিজা, কৃতদাসদের মধ্যে হযরত যায়দ ইবনে হারিসা, বালকদের মধ্যে হযরত আলী।
আমি আরো জানতে পেরেছি, যারা তাঁর প্রতি ঈমান এনেছেন তাদের সংখ্যা বেশী না-খুব অল্প। অধিকাংশ কোরাইশই ঈমান আনে নি। এরা বরং প্রকাশ্য দাওয়াত শুরু হওয়ার পর প্রচণ্ডভাবে বাধা দিতে লাগলো। সেই সঙ্গে ঠাট্টা-বিদ্রূপ তো আছেই। কিন্তু ইসলামের দাওয়াত বন্ধ হলো না। শত বাধা ও বিদ্রূপের ঝড় উপেক্ষা করে আরো জোরেশোরে দাওয়াতের কাজ চলতে লাগলো। ফলে কোরাইশ কৌশল বদল করলো। মুহাম্মদকে লোভের জালে আটকানোর চেষ্টা করলো। ওরা তাঁকে সম্পদ ও রাজত্বের লোভ দেখালো। কিন্তু বড়ো ভুল করলো ওরা। ওরা কি জানে না, মুহাম্মদ কখনোই লোভ-কাতর ছিলেন না? আমার নিচে-বসা এক লোকের মুখে শুনেছি, তারা নাকি আবু তালিবের কাছে দূত পাঠিয়ে জানিয়েছে মুহাম্মদ যা চাইবে আমরা তাই দেবো। বিনিময়ে মুহাম্মদকে এ-নতুন ধর্ম ছাড়তে হবে! আমাদের উপাস্যদের সমালোচনা বন্ধ করতে হবে!
আবু তালিব মুহাম্মদ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ-কথা জানানোর পর তিনি পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিলেন-
-চাচাজান! ওরা যদি আমার ডান হাতে আকাশ থেকে সূর্যটাকে এনেও রেখে দেয় আর বাম হাতে নামিয়ে আনে চন্দ্রটাকে, আর বিনিময়ে আমাকে ইসলামের দাওয়াত ছেড়ে দিতে বলে, তবুও আমি তা ছাড়বো না, মুহূর্তের জন্যেও না। যতোদিন না আল্লাহ এই দাওয়াতকে বিজয়ী করবেন অথবা আমি নিজেই এই দাওয়াতের পথে শহীদ হয়ে যাবো!
আমার মনিব (আঙুর বাগানের মালিক) উতবার মুখে আমি শুনেছি, একবার কোরাইশ গোত্র তাকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে প্রতিনিধি হিসাবে পাঠিয়েছিলো কিছু আকর্ষণীয় প্রস্তাব দিয়ে। মনিব তখন সে-সব প্রস্তাব নিয়ে তাঁর কাছে গেলেন। গিয়ে তাঁকে বললেন:
-মুহাম্মদ! তুমি আসলে কী চাও, একটু বলবে? সম্পদ চাইলে কোরাইশ গোত্র তোমার পায়ের কাছে দিরহাম-দীনার ঢেলে দেবে, তুমিই হয়ে যাবে মক্কার সেরা ধনী! আর যদি বলো তোমার সম্মান চাই, তারা তোমাকে সম্মানিত নেতা হিসাবে বরণ করে নিতে এক পায়ে খাড়া! আর যদি রাজত্ব তোমার উদ্দেশ্য হয়, তাহলে তারা তোমাকে রাজাও বানাবে! এ ছাড়া যদি মনে করো তোমার মাঝে কোনো 'মানসিক বিকার' দেখা দিয়েছে, তাহলে তাও আমাদেরকে বলো, আমরা দুনিয়ার বড় বড় চিকিৎসকদেরকে এনে জড়ো করবো, তোমাকে সুস্থ করে তোলবো!..
আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উতবার কথা শুনলেন। জবাবে মুখে কিছুই বললেন না, শুধু এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন-
قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُوحَى إِلَيَّ أَنَّمَا إِلَهُكُمْ إِلَهُ وَاحِدٌ.
‘বলো, আমি তো তোমাদের মতোই একজন মানুষ, আমার কাছে ওহী আসে এমর্মে যে তোমাদের ইলাহ শুধুই এক ইলাহ।’ -সূরা কাহ্ফ্ফ
উতবা এ-জবাব শুনে ফিরে এসেছিলেন মাথা নুইয়ে। এসে অপেক্ষমান কোরাইশ নেতাদেরকে বলেছিলেন:
-আমি এমন কথা মুহাম্মদের কাছে শুনে এসেছি যা কবিতাও নয়, যাদুও নয়, গণকের ভবিষ্যদ্বাণীও নয়!
এরপর উতবা কোরাইশকে অনুরোধ করে বললো:
-তোমরা মুহাম্মদকে নিজের অবস্থায় ছেড়ে দিলে ভালো হয়! মুহাম্মদকে তো তোমরা সেই ছোট্ট বেলা থেকেই জানো! তোমরাই-না বলতে তোমাদের মধ্যে উন্নত চরিত্রে, সত্যবাদিতায় ও আমানতদারীতে তার কোনো জুড়ি নেই! আজ যখন সে বড় হলো এবং তোমাদের কাছে একটা বিশেষ দাওয়াত নিয়ে এলো, তখন 'সেই' তোমাদের চোখেই কেনো এখন সে হয়ে গেলো মিথ্যাবাদী ও যাদুকর?!
না, কোরাইশের কোনো প্রলোভনই কাজে এলো না। তাঁর দাওয়াত চলতে লাগলো আপন গতিতে। কোরাইশও বসে থাকলো না, তাঁর দাওয়াতের কাজে বাধা দিতে লাগলো। তাঁকে এবং তাঁর অনুসারীদের প্রতি সীমাহীন জুলুম-নির্যাতন শুরু করলো। এমনকি তাঁকে এবং অন্যদেরকে বয়কট করার, অবরুদ্ধ করে রাখার ঘোষণা দিলো। নিজেরা নিজেরা একটা চামড়ার টুকরোয় কিছু অনৈতিক ও অন্যায় কথা লিখে কা'বার দেয়ালে টানিয়ে দিলো। সবাইকে তা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলার কঠোর নির্দেশ দিলো। ওদের লিখা কথাগুলো ছিলো অমানবিকতায় ভরা। নির্দয়তায় ঠাসা। সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার কালো চিন্তায় কুৎসিত। লক্ষ্য করো কয়েকটি কথা-
* মুসলমানদের সাথে কোনো সালাম-কালাম চলবে না।
* তাদের সাথে ক্রয়-বিক্রয় বন্ধ।
* তাদের সাথে বিবাহ শাদী নিষিদ্ধ।
* কোনো রকম লেনদেনও চলবে না।
হ্যাঁ এভাবেই ওরা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবীদেরকে দিনের পর দিন.. মাসের পর মাস.. বরং বছরের পর বছর একাধারে তিন বছর অবরুদ্ধ করে রাখলো। এর মাঝে যতো রকম নিষ্ঠুরতা আছে সবই প্রদর্শন করলো। শিশু-নারী-বৃদ্ধরা সামান্য খাবারের জন্যে প্রচণ্ড কষ্ট করলো। বড়রা খাবার না পেয়ে খেলো— গাছের পাতা এবং আরো কতো 'অখাদ্য'।
তবুও ঈমান কারো টললো না। মনোবল কারো ভাঙলো না। তাওয়াক্কুল কারো কমলো না। চেতনা কারো নিভলো না। বিবেক কারো নুইলো না। সুতরাং এ-বয়কট ও অবরোধ কোনো কাজে এলো না। শুধু কষ্ট পেলো একদল নিরপরাধ মানুষ-অসহায় শিশু-নারী-বৃদ্ধ। ওদের অমানবিক কষ্টে লজ্জা পেলো মানবতা। কিন্তু লজ্জা পেলো না পাষাণদিল কোরাইশ। তবে তিন বছর গড়িয়ে যাওয়ার পর কোরাইশের ভিতরের পাঁচজন শীর্ষস্থানীয় মানুষের ঘুমন্ত মানবতা জেগে উঠলো। তারা বললো— ‘আমরা আর মানি না এই অবরোধ, এই চুক্তি! কেনো কষ্ট পাবে এতোগুলো নিরপরাধ মানুষ!’ এই বলে তারা কা'বায় টানানো চামড়ার টুকরোটি ছিঁড়ে কুটিকুটি করে ফেললো!
অবরোধ শেষ হলো। কিন্তু জুলুম-নির্যাতন বন্ধ হলো না। বরং আরো বাড়লো। আরো নৃশংস হলো। আরো অমানবিক হলো। আরো পাষাণেঘেরা হলো। আরো পাথরেচাপা হলো। আরো কাঁটাময় হলো। আরো পিলে-চমকানো হলো। এর মাত্রাটা ভয়াবহ আকৃতি নিয়ে সামনে এলো চাচা আবু তালিব এবং স্ত্রী খাদিজার ইন্তেকালের পর। অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে ফিরে আসার পরপরই তাঁরা দু'জন চলে গেলেন। প্রথমে আবু তালিব। পরে খাদিজা। তাঁরা দু'জন ছিলেন তাঁর দুর্ভেদ্য দুর্গ। বিপদের সহায়। সান্ত্বনার স্নিগ্ধ পরশ। এ জন্যেই প্রিয়-হারানোর এ-বছরটির নাম রেখেছেন নবীজী— عام الحزن বা দুঃখ-বছর। এ-বছরে না-জানি কতো দুঃখ পেয়েছেন আমাদের নবীজী!
তাঁদের ওফাতের পরে নির্যাতনের কিছু নমুনা লক্ষ্য করো—
এক. একবার আল্লাহ্র রাসূল নামাজ পড়ছিলেন। যেই তিনি সেজদায় গেলেন অমনি একদল কমজাত এসে তার মাথায় বকরীর নাড়ীভুঁড়ি চাপিয়ে দিলো, তারপর অদূরে দাঁড়িয়ে মজা লুটতে লাগলো।
দুই. আরেকবার এক কাফের তাঁর গলায় কাপড় জড়িয়ে টানতে টানতে তাঁর শ্বাস প্রায় রোধ করে ফেলেছিলো। হায়! রাহমাতুল-লিল-আলামীনের সঙ্গে কী নিষ্ঠুরতা!! অমন নিষ্ঠুরতার কথা শুনলে কার-না চোখে পানি আসে?!
আমি এ-সব খবর শুনতাম মক্কা থেকে-আসা লোকজনের মুখে মুখে, যারা এখানে এসে আমার লতানো শাখের শীতল ছায়ায় বসতো এবং পরস্পরে আলাপ করতো। হ্যাঁ, এ-সব খবর শুনে আমি খুব কষ্ট পেতাম। আমার খুব খারাপ লাগতো। সেই থেকে আমি স্বপ্ন দেখে চলেছি মুহাম্মদকে একটিবার দেখে আমার জীবনকে ধন্য করতে। কিন্তু পারবো কি? আমার জীবন-যে অনেক ছোট! তাঁর সাথে আমার দেখা হওয়ার পূর্বেই হয়তো কাফেররা আমাকে এ-বাগান থেকে নিয়ে যাবে তারপর আমাকে নিঙড়ে নিঙড়ে মদ বানাবে আর ওদের মাতাল আসরকে আরো মাতাল করে তোলবে, বুদ্ধি হারিয়ে আরো তীব্রতার সাথে মুহাম্মদ এবং তাঁর সাহাবীদের প্রতি জুলুম-নির্যাতন শুরু করবে। তবুও আমি আশা ছাড়লাম না। নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার আশা পূর্ণ করবেন। মুহাম্মদের সাথে আমার দেখা হবেই। এতো কাছ থেকে তিনি ফিরে যাবেন না, আমাকে মাহরুম করবেন না! হে আল্লাহ! কাছে এনে দাও আমার প্রিয় মুহাম্মদকে! আমার আর তর সইছে না!
আল্লাহ্ কী শান! আমার আশা পূর্ণ হলো এবং অবিলম্বেই! আমার স্বপ্ন বাস্তব হলো এবং 'মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি'র মতোই!
এই-যে প্রিয় মুহাম্মদ নিজেই চলে এসেছেন আমার কাছে! একেবারে কাছে! এইমাত্র বসলেন তিনি আমার ছায়াতলে-আমার লতানো শাখের শীতল ছায়ায়! হ্যাঁ, আমি তাঁকে দেখলাম, ধন্য হলাম! আহা, কী শান্তি! কী প্রশান্তি!!
কিন্তু এ কী! তাঁর দেহ-যে রক্তাক্ত! আনন্দের ভিতরেও আমি হু হু করে কেঁদে উঠলাম! এ কী অবস্থা করেছে ওরা আমার প্রিয় নবীর! আমার স্বপ্ন পুরুষের! আমার প্রতীক্ষিত শ্রেষ্ঠ অতিথির! তাঁর শরীর-যে রক্তাক্ত! শরীর বেয়ে বেয়ে রক্ত এসে জমেছে জুতোয়! ইস্, জুতো খুলতে কী কষ্ট হচ্ছে! কী নিষ্ঠুর এরা! অমন মানুষের রক্ত ঝরাতে পারে যে হাত, অবশ্যই তা নাপাক হাত! অথচ তাঁর কোনো অপরাধ নেই! তিনি রহমতে গড়া! তিনি মায়ায় মোড়া! তিনি মানবতায় ছাওয়া! তিনি উম্মতের শ্রেষ্ঠ পাওয়া! এসেছেন ইসলামের দাওয়াত নিয়ে! হকের পয়গাম নিয়ে!
তা ওদের কাছে ভালো না লাগলে গ্রহণ না করুক! তা না করে উল্টো কল্যাণকামী বন্ধুর সঙ্গে কেনো এই নিষ্ঠুরতা? কেনো তাঁর রক্ত নিয়ে এই দানবীয় উল্লাস? আহ! আমি আর সইতে পারছি না! ভালো আচরণের কী মন্দ বদলা!
ওদের কাছ থেকে হতাশ হয়ে তিনি যখন মক্কার পথ ধরলেন, তাঁর পেছনে একদল অবুঝ শিশুকে ওরা লেলিয়ে দিলো! সাথে ছিলো আরো কিছু নির্বোধ! ওরা রাসূলকে ঘিরে ধরলো। তাঁর গায়ে হাত দিলো। তাঁর দিকে পাথর ছুঁড়ে মারলো। ওদের নিক্ষিপ্ত পাথরে তাঁর দেহ থেকে দরদর করে রক্ত ঝরলো। তাঁকে নিয়ে ওরা 'পাগল-বিদ্রূপে' মেতে উঠলো। ওদের হিংস্র বেষ্টনী থেকে যতোই বের হতে চাচ্ছিলেন তিনি ওরা ততোই তাঁকে ঘিরে ঘিরে ধরছিলো। ইস, কী নিষ্ঠুরতা!
এক সময় তিনি ওদের কবল থেকে বেরিয়ে এসে আশ্রয় নিতে সক্ষম হলেন আমার কাছে .. আমার মাচানের ছায়ায়। ক্লান্ত অবসন্ন জর্জরিত হত-বিহ্বল দেহটা নিয়ে বসলেন আমার লতানো শাখের নিচে। মজলুম নবী তখন দু'আ করছিলেন এই বলে বলে—
اللَّهُمَّ إِلَيْكَ أَشْكُوْ ضَعْفَ قُوَّتِي وَقِلَّةَ حِيْلَتِيْ وَهَوَانِي عَلَى النَّاسِ أَنْتَ رَبُّ الْمُسْتَضْعَفِينَ وَأَنْتَ رَبِّي ، اللَّهُمَّ إِلَى مَنْ تَكلُنِي ؟ إِلَى بَعِيْدِ يَتَجَهَّمُنِي ؟ أَمْ إِلَى عَدُوٌّ مَلَكْتَه أَمْرِي ؟ إِنْ لَمْ يَكُنْ بِكَ غَضَبٌ عَلَيَّ فَلَا أُبَالِي غَيْرَ أَنَّ عَافِيَتَكَ هِي أَوْسَعُ لِيْ أَعُوْذُ بِنُوْরِ وَجْهِكَ الَّذِي أَشْرَقَتْ لَهُ الظُّلُمَاتُ وَصَلُحَ عَلَيْهِ أَمْرُ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ أَنْ يَنْزِلَ بِي سَخَطُكَ أَوْ يَحِلُّ عَلَيَّ غَضَبُكَ لَكَ الْعُتْبَى حَتَّى تَرْضَى .
‘আমার আল্লাহ! আমি দুর্বল, আমি অসহায়! তাই বলে আমি তো মানুষের কাছে অপমানিত হতে পারি না! তুমি-না দয়ালু! তুমি-না অসহায় দুর্বলের প্রতিপালক! তুমি তো আমারও প্রতিপালক! তবে কাদের হাতে তুমি আমাকে তুলে দিচ্ছো? আমার সাথে দুর্ব্যবহার করবে— এমন লোকের হাতে? নাকি আমার দুশমনের হাতেই তুলে দিয়েছো আমাকে? আমার কোনো অভিযোগ নেই। তুমি যদি থাকো আমার প্রতি সন্তুষ্ট, তাহলে কোনো ভয়ও নেই! কোনো পরোয়া নেই আমার! তোমার ক্ষমাই তো আমার সবচে' বড় পাওয়া! আমি চাই তোমার আশ্রয়ের আলো, যে আলো দূর করে দেবে সকল কালো। দুনিয়া-আখেরাতের সবকিছু তোমার হাতেই তো ন্যস্ত! তোমার অভিশাপ নয়— আমি চাই তোমার সন্তুষ্টি। তোমার ক্রোধ নয়— আমি চাই তোমার কৃপা!’
উতবা-শায়বা কাছেই দাঁড়িয়েছিলো। রক্তময় নবীর মর্মস্পর্শী দু'আ তাদের মর্মেও বুঝি 'আঘাত' করলো। উতবা ক্রীতদাস— আদ্দাসকে জোরে ডাক দিলো:
-আদ্দাস! ঐ লোকটাকে এক থোকা আঙুর দিয়ে এসো!
আমি আমার কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না! কারণ আদ্দাস আমার দিকে এগিয়ে আসছে! আমি আমার চোখকে বিশ্বাস করতে পারলাম না! কেননা আদ্দাস আমাকে ছিঁড়তে এগিয়ে আসছে! সত্যি আদ্দাস আমার দিকে আসছে—আমাকে ছিঁড়তে?!
আদ্দাস এখন আমাকে একেবারে মুহাম্মদের সামনে নিয়ে দেবে—আমাকে খেতে?! আহ! আমার কী সৌভাগ্য! যাঁর প্রতীক্ষায় অস্থির বেলা কাটাতে কাটাতে আমি ছিলাম মরিয়া দূর থেকে তাঁকে এক ঝলক দেখবো বলে, সেই মুহাম্মদ এখন আমার এতো কাছে?! তাঁর সাথে আমার শুধু এখন দেখাই হবে না, বরং আমি সারা জীবনের জন্যে মিশে যাবো তাঁর পবিত্র রক্তে-মাংসে-অস্থি-মজ্জায়! তাঁর চেতনায়-চিন্তায়! আহা! কী শোকর আদায় করবো তোমার হে আল্লাহ! আল হামদুলিল্লাহ!!
আদ্দাস আমাকে ছিঁড়লো! একটা তশতরিতে রাখলো! তারপর এক পা দু' পা করে এগিয়ে যেতে লাগলো আদ্দাস! আদ্দাস এখন মুহাম্মদের কাছে, খুব কাছে! আমিও মুহাম্মদের নিকটে, খুব নিকটে! আদ্দাস যতো কাছে যায় আমি ততো নিকটে যাই! আমি যতো নিকটে যাচ্ছি আমার আনন্দ ও সৌভাগ্য ততো বেশী প্রাণময়.. বাঙ্ময় হচ্ছে! কেমন করে আমি প্রকাশ করবো আমার এ আনন্দ ও সৌভাগ্য! হে আমার স্বপ্ন! এখন তুমি কতো রূপময়! তোমার রূপলীলা আমার ছোট্ট জীবনকে কী মহিমাই-না দিয়েছে!
এক্ষুণি তাঁর করস্পর্শে আমি ধন্য হবো! এই তো; এইমাত্র আদ্দাস আমাকে এনে রাখলো মুহাম্মদের সামনে! আদ্দাস মুহাম্মদের নূরানি চেহারার দিকে তাকিয়ে রইলো। কী ঝলমলে নূর-ছাওয়া চেহারা! অমন চেহারার মানুষ কি আদ্দাস আর দেখেছে? এবার মুহাম্মদকে আদ্দাস খেতে অনুরোধ করলো। মুহাম্মদ অনুরোধ রক্ষা করলেন। বরং আমাকে ধন্য করলেন! 'বিসমিল্লাহ' বলে আমার দিকে হাত বাড়ালেন! খেতে শুরু করলেন। স্পর্শ করলো আমাকে সবচে' বড় সৌভাগ্য! আদ্দাস মুহাম্মদের মুখে 'বিসমিল্লাহ' শুনে দ্বিতীয়বার অবাক হলো। কারণ এমন কথা কোনোদিন কারো মুখে এখানে বসে ও শুনে নি! তাই তার মনে কৌতূহল সৃষ্টি হলো। ও মুহাম্মদের কাছে জানতে চাইলো: -এমন কথা তো আমি এখানে কাউকে বলতে শুনি নি!
নবীজী তাকে বললেন: -তুমি কোথাকার বাসিন্দা? আদ্দাস বললো: -আমি নিনাওয়া'র মানুষ! রাসূল জবাবে বললেন: -তুমি দেখছি পুণ্যপুরুষ ইউনুস ইবনে মাত্তা'র দেশের মানুষ! -ইউনুস ইবনে মাত্তাকে আপনি চেনেন!!
আদ্দাসের চোখে রাজ্যের বিস্ময়! আল্লাহ্র রাসূল জবাব দিলেন: হ্যাঁ, চিনি! তিনি যে আমার ভাই। তিনি নবী ছিলেন, আমিও নবী! এরপর আদ্দাস আর স্থির থাকতে পারলো না! একটু আগের আদ্দাস বদলে গেলো! শুধু আঙুর সঁপে দিতে-আসা আদ্দাস এখন নিজেকেই সঁপে দিলো! ভালোবাসা-শূন্য আদ্দাস এখন ভালোবাসায় আপ্লুত, পরিপ্লুত হয়ে গেলো! ও সামনে ঝুঁকে নবীজীর মাথায়-হাতে-পায়ে চুমু খেতে লাগলো! আর বলতে লাগলো— ‘অবশ্যই, অবশ্যই আপনি নবী! নবীরা ছাড়া আর কেউ তো সত্যের পথে জুলুম নির্যাতন সইতে পারে না!’
ধন্য আমি, চিরধন্য! হ্যাঁ.. নবীজী আমাকে আরাম করে খাচ্ছেন! সুখ সুখ চেহারা নিয়ে খাচ্ছেন! আমি যেনো তাঁর অনে-ক প্রতীক্ষিত খাবার! এ বাগিচায় যেনো তিনি শুধু আমার জন্যেই এসেছেন! আহা! আমাকে তিনি যখন হাত দিয়ে স্পর্শ করে মুখে তুলছিলেন তখন আমার মনে হচ্ছিলো আমি যেনো রাজফল! পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ফল! ইতিহাসের সেরা আঙুরের থোকা! অবশ্যই সেরা! আমি হতে পেরেছি নবীজীর খাদ্য!! এমন সময়ে, যখন তিনি ক্লান্ত অবসন্ন জুলুম জর্জরিত রক্ত-রঞ্জিত!!
এ ছাড়া আমার আরেকটা সৌভাগ্য হলো, আমি দু'চোখভরে দেখেছি— কেমন করে পাথরবৃষ্টির পর আসে চুমুবৃষ্টি! আরো দেখেছি সত্যের সন্ধান পেয়ে কেমন করে আদ্দাস সে সত্যকে আকড়ে ধরেছিলো! উতবা শায়বার চোখের সামনে! তাদের লাল চোখের রাঙানিকে নিঃশঙ্কে উপেক্ষা করে! সত্যের খোঁজে-থাকা মানুষ সত্যকে এভাবেই আলিঙ্গন করে! ধন্য (আমার মতো) তুমিও হে আদ্দাস!
📄 আমি ‘জামাল’ বলছি
হ্যাঁ, আমি জামাল, মানে উট। কিন্তু বাস্তব উট নই, বাস্তব উটের ছায়া। ছায়া-উট। দৃশ্যে এসেছিলাম, আবার অদৃশ্যে মিলিয়ে গেছি। আমার এই আসা-যাওয়ার মাঝে চমৎকার একটা কাহিনী আছে। এ-কাহিনীই এখন তোমাদের শোনাবো। শুনলে বুঝতে পারবে, আমাদের নবীজীর শান (মর্যাদা) কতো! তাঁর জামাল (সৌন্দর্য) কতো! তাঁর মানবতা কতো! তাঁর দয়ামায়া কতো! ন্যায়ের পক্ষে অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর আপোষহীনতা কতো!
আমি তো ছায়া-উট। কায়া-উট মানে সত্যিকারের উটও তাঁকে — মুহাম্মদকে — নিয়ে অনেক কাহিনী বলেছে। ছোট্ট বেলায় রাসূল যেমন মেষ চরিয়েছেন তেমনি উটও চরিয়েছেন। কায়া-উটেরা আমাকে বলেছে যে, আল্লাহ্র রাসূল ওদের সাথে ভীষণ কোমল আচরণ করতেন। মায়ার আচরণ করতেন। দয়ার আচরণ করতেন। উট ও মেষ ফেলে রেখে কখনো তিনি অন্য রাখালদের মতো খেলতে চলে যেতেন না, বরং সারাক্ষণ ওদের কাছে কাছে থাকতেন। ওদের দেখভাল করতেন। মরুকষ্ট থেকে ওদেরকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করতেন। উটের কষ্ট যেনো তাঁরই কষ্ট! মেষের কষ্ট যেনো তাঁরই কষ্ট! যে-কোনো প্রাণী'র কষ্ট যেনো তাঁরই প্রাণের কষ্ট! এমন তো হবেই! তিনি-যে সারা পৃথিবীর রহমত! মানুষের জন্যে রহমত! প্রাণী'র জন্যে রহমত! সবার জন্যে রহমত! সবকিছুর জন্যে রহমত!!
আল-আমীন উটের উপর সওয়ারও হয়েছেন অনেক। সওয়ারী হিসাবে তিনি ছিলেন ভীষণ দয়ালু ও কোমল। উটের প্রতি ভীষণ লক্ষ্য রাখতেন তিনি। কোনো কষ্ট তো হচ্ছে না! বোঝাটা ভার হয়ে যায় নি তো! উটের পিঠে করে তিনি সফর করেছেন সিরিয়া ও ইয়েমেন। কখনো চাচা আবু তালিবের সঙ্গে, কখনো খাদিজার ব্যবসা নিয়ে। সে সব সফরে উটেরা তাঁকে গভীর করে চিনেছে। কাছ থেকে জেনেছে। মক্কায় কিংবা মদীনায়, সান'আয় কিংবা দামেস্কে উটেরা দেখেছে তাঁর ক্রয়-বিক্রয়। আর দেখেছে তাঁর নজিরবিহীন আমানতদারী ও সততা। আরো দেখেছে অল্প সময়েই তাঁর প্রতি মানুষের ঝুঁকে পড়ার বিরল মধুর দৃশ্য। জাহেলী যুগে কোরাইশ ব্যবসায়ীরা যেখানে কথায় কথায় মূর্তির নামে শপথ করছে, আল-আমীন সেখানে একটি বারের জন্যেও মূর্তির নামে শপথ করেন নি। অথচ লোকজনের ভীড় তাঁর কাছেই বেশী। তাঁর বেচা-কেনাই সবচে' বেশী। লাভবানও সবচে' তিনিই বেশী। তাঁর কাছ থেকে মানুষ পণ্য কিনে নিয়ে যায় উট বোঝাই করে আর বিস্ময় ও মুগ্ধতা নিয়ে যায় মন বোঝাই করে।
এবার একটি কাহিনী শোনো-আমার নিজের কাহিনী, যা অন্য উটের কাহিনীর সাথে একদম মিলবে না। একেবারেই আলাদা। ভীষণ মজাদার। নাওয়া-খাওয়া ভুলে এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলার মতো। শুরু হোক তাহলে—
একদিন ভিনদেশী এক বণিক এলেন মক্কায়। সঙ্গে কিছু উট। উদ্দেশ্য হলো, তিনি এ- গুলো মক্কার বাজারে বিক্রি করবেন। তারপর অল্প-বিস্তর যা লাভ হয়, তা-ই নিয়ে দেশে ফিরে যাবেন। ঘটনাক্রমে এ-গুলো কিনলো আবুল হাকাম, আবু জেহেল নামেই যার বেশী 'খ্যাতি'। কিনলো তো বলেছি, কিন্তু আসলে সে কিনে নি। জাহেলী যুগে অনেক খারাপ খারাপ অভ্যাস ছিলো মানুষের। এর মধ্যে একটা হলো, পণ্য কিনে মূল্য মারা-পরিশোধ না করা। আবু জেহেলও তাই করলো। উট নিয়ে চলে গেলো আর মূল্যটা মেরে দেওয়ার ফন্দি আঁটলো। এদিকে উট বিক্রেতা আবু জেহেলকে খুঁজে খুঁজে হয়রান। এতোগুলো উট, মূল্যটা তো নেহাত কম নয়। কিন্তু আবু জেহেলকে ধরেও ধরা যাচ্ছে না। যে-ই আবু জেহেল বুঝতে পারে ব্যবসায়ী তাকে অনুসরণ করছেন সঙ্গে সঙ্গে সে কেটে পড়ে-উধাও হয়ে যায়। বোঝাই যাচ্ছে; যে কোনো মূল্যে আবু জেহেল মূল্যটা না দেওয়ার ফন্দি আঁটছে। আঁটবেও তো! আবু জেহেল যে একটা ফন্দিবাজ। আস্ত একটা ধড়িবাজ। নইলে ভিনদেশী সওদাগরের পণ্য কিনে মূল্য নিয়ে কেনো এই ফন্দি'বাজি'.. ধড়িবাজি?!
এ দিকে বেচারা উট বিক্রেতার মাথায় হাত। এতোগুলো উটের মূল্য না পেলে তার ব্যবসাসি-যে লাটে ওঠবে! অনেক চেষ্টা করেও যখন আবু জেহেলের 'নৈকট্য' লাভ হলো না তখন অনন্যোপায় হয়ে এমন কারো হাত ধরার চিন্তা করলেন যিনি আবু জেহেলের কবল থেকে মূল্যটা 'উদ্ধার' করে দেবেন। ব্যবসায়ীটি হতাশ মনে 'সেই মানুষটি'কেই খুঁজে বেড়াতে লাগলেন।
দু'জন লোক দাঁড়িয়ে ছিলো, অদূরেই। ব্যবসায়ী ভাবলেন— আচ্ছা, এদের কাছে কি সাহায্য চাওয়া যায়?.. চেহারা সুরত দেখে মনে হচ্ছে এরা বেশ প্রভাবশালী। তাই হলো। ব্যবসায়ী তাদের কাছে গিয়ে পুরো ঘটনাটা বলে প্রতিকার চাইলেন। সহযোগিতা চাইলেন।
কিন্তু লোক চিনতে ভুল হয়ে গেলো। ওরা ছিলো আসলে আবু জেহেলের চেলা। কট্টর কাফের। ভিতরটা অন্ধকারে ঠাসা। তাই ভালো কিছু আশা করা বৃথা। তার নমুনা দেখো—
ব্যবসায়ীটি যখন ওদের কাছে সাহায্য চাইছিলেন ঠিক তখনই ঐ পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তখন ইসলামের গোপন দাওয়াতকাল চলছিলো। অর্থাৎ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবী হয়েছেন তিন বছরও হয় নি এবং তিনিসহ সাহাবীদের উপর চলছিলো সীমাহীন জুলুম নির্যাতন। তখন ঐ লোক দু'জনের একজনের মাথায় দুষ্টবুদ্ধি খেলে গেলো। সে আল্লাহ্র রাসূলকে অপদস্থ করতে চাইলো। তাঁকে নিয়ে একটা 'খেলা' খেলতে চাইলো। সে ভাবলো, লোকটা আমার কাছে আবু জেহেলের বিরুদ্ধে সহযোগিতা চাইতে এসেছে। এখন আমি যদি একে মুহাম্মদের কথা বলে দিই এবং তাঁর কাছেই সহযোগিতা চাইতে বলি, তাহলে ভালো একটা মজা হবে। মুহাম্মদ লোকটাকে সহযোগিতা করতে নিশ্চিত আবু জেহেলের বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে যাবে। গেলেই তো আর আবু জেহেল তার কথায় উটের মূল্য পরিশোধ করে দেবেন না, বরং মুহাম্মদকে একটা আচ্ছামতো অপমান করে ছাড়বেন। সেটা কঠিন গালিগালাজও হতে পারে আবার প্রহার-টহারও হতে পারে। এই দুষ্টচিন্তা থেকেই সে বললো:
-তুমি একটা কাজ করো। ঐ-যে লোকটি যাচ্ছে, তার কাছে যাও। গিয়ে তোমার সমস্যাটা খুলে বলো। আমার বিশ্বাস, সে তোমার কাজটা করে দিতে পারবে।
এ দিকে কাফের-সঙ্গীটিও এ দুষ্টচিন্তায় শরীক হয়ে বললো:
-হ্যাঁ, তুমি জলদি গিয়ে তাকে ধরো। তোমার কাজ হবেই হবে। আবু জেহেল তাকে খুব মানেন কি না—তার কথায় ওঠেন আর বসেন! সে সুপারিশ করলে আবু জেহেল ফেলতে পারবেন না! সুতরাং তাড়াতাড়ি যাও। তাকে গিয়ে বলো। দেখবে কেমন যাদুর মতো তোমার কাজ করে দেবে মুহূর্তের ভিতর!
ব্যবসায়ী ওদের কথায় প্রভাবিত হলেন। ব্যবসায়ী ওদের কথায় আশা পেলেন। তাই জলদি গিয়ে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললেন:
-জনাব! আমি এক ভিনদেশী বণিক। কিছু উট বিক্রি করেছিলাম আবুল হাকাম ইবনে হিশাম (আবু জেহেল) এর কাছে। কিন্তু তিনি মূল্য পরিশোধ করেন নি এবং করবেন বলেও মনে হচ্ছে না। আপনি কি দয়া করে আমাকে একটু সহযোগিতা করবেন? আমার মূল্যটা কি একটু উসুল করে দেবেন?! নইলে আমি বড়ো বিপদে পড়ে যাবো!
আল্লাহ্র রাসূল লোকটির বিপদ বুঝলেন। তার অসহায়ত্ব উপলব্ধি করলেন। তিনি ঠিক বন্ধুর মতো লোকটির হাত আপন মুঠোয় নিলেন। তারপর তাকে নিয়ে আবু জেহেলের বাড়ির দিকে রওয়ানা হলেন। এদিকে নিজেদের অসৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে দেখে ঐ দুষ্ট লোক দু’টির মুখে ছড়িয়ে পড়লো কূটিল হাসি। ওরাও দূরত্ব বজায় রেখে তাদেরকে অনুসরণ করলো এবং আবু জেহেলের বাড়ির একটু দূরে এসে থামলো, যেখান থেকে সব স্পষ্ট দেখা যায়। ওরা অপেক্ষা করতে লাগলো, একটি উত্তেজনাকর পরিস্থিতি দেখার জন্যে। ওরা কল্পনা করতে লাগলো, মুহাম্মদের বিরুদ্ধে আবুল হাকামের ফুঁসে ওঠার দৃশ্যটা না জানি আজ কী ভয়ঙ্কর হয়! ভয়ঙ্কর তো হবেই! মুহাম্মদ যেচে এসেছে লোকটাকে সহযোগিতা করতে, উটের দাম উসুল করে দিতে, বাহাদুরী ফলাতে! এখন দেখা যাবে— কতো উটে কতো মূল্য! আবুল হাকাম মূল্য দেবেন না, দেবেনই না। আর মুহাম্মদ মূল্য আদায় করে দেবে, চেষ্টা করবেই। জব্বর মজা হবে! হা.. হা..!! আমাদের পাতা জালে আজ মুহাম্মদ ভালো মতনই আটকা পড়েছে! কোরাইশ গোেত্র দেখবে আজ আরেকটা নতুন যুদ্ধ! আবুল হাকাম আর মুহাম্মদ! মুহাম্মদ আর আবুল হাকাম! কোরাইশ গোত্র আজ একটা আনন্দের খোরাক পাবে। হা.. হা.. হা!!
ঐ দুষ্ট লোক দু'টি এ-সব বলাবলি করতে করতে হাসছিলো আর একে অপরের গায়ে গিয়ে পড়ছিলো। ওরা নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে দেখে খুশিতে একে অপরকে অভিনন্দনও জানাচ্ছিলো। আল্লাহ্র রাসূল লোকটিকে নিয়ে যখন আবু জেহেলের দরোজার কড়া নাড়লেন তখন ওরা বড় বড় চোখে সে দিকে তাকিয়ে রইলো। রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করতে লাগলো তাদের পরিকল্পিত সেই কাঙ্ক্ষিত লড়াইয়ের।
মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দরোজায় খটখট আওয়াজ দিয়ে আবু জেহেলকে ডেকে উঠলেন। ভিতর থেকে তখন ভেসে এলো আবু জেহেলের অহঙ্কারী কণ্ঠ: -দরোজায় কে?!
আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাবে বললেন: -আমি মুহাম্মদ, একটু বাইরে আসতে হবে!
আবু জেহেল দরোজা খুললো। বেরিয়ে এলো। মুহাম্মদকে একটা 'আচ্ছা মজা' দেখানোর চিন্তা নিয়েই সে বের হয়ে এলো। কিন্তু স্থির হয়ে দাঁড়ানোর আগেই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শান্ত ও নির্ভিক কণ্ঠে বললেন: -এই ব্যবসায়ীর মূল্যটা দিয়ে দাও!
তারপর কী হলো? তারপর কী ঘটলো? আবু জেহেল কি ঝলসে উঠলো? আবু জেহেল কি নবীজীর উপর হামলে পড়লো? না! আবু জেহেল ঝলসে ওঠে নি! হামলেও পড়ে নি! আবু জেহেল কি ফুঁসে উঠেছিলো? না, তাও পারে নি! আবু জেহেল তাহলে কী করলো? আবু জেহেল যা করলো তা অকল্পনীয়, অভাবনীয়!
আল্লাহ্র রাসূলের দিকে তাকাতেই আবু জেহেলের চেহারাটা কাচুমাচু হয়ে গেলো! বরং তার উদ্ধত দৃষ্টি জম-দেখা মানুষের মতো জ্যোতিহীন ও নিষ্প্রভ হয়ে গেলো। শুধু তাই না; রাজ্যের ভয়-কাতরতা সেখানে কিলবিল করতে লাগলো। তারপর? ওই তো, সাক্ষাত জম-দেখা মানুষের মতো থরথর করে আবু জেহেল কাঁপতে লাগলো! তারপর? তারপর মাথাটা দুলিয়ে মূল্য পরিশোধের 'সম্মতি জানিয়ে' পলাতক গোলামের মতো ভিতরে চলে গেলো!!
ভিনদেশী বণিকটির বিস্ময়ের কোনো সীমা রইলো না! আরো বেশী বিস্মিত হলো অদূরে দাঁড়িয়ে-থাকা ঐ দুষ্ট লোক দু'টি, যারা একটা মজা দেখার অধীর অপেক্ষায় প্রহর গোনছিলো, মুহাম্মদের উপর আবু জেহেলের হামলে পড়ার মজা। কিন্তু তারা হতাশ হলো না। ভাবতে লাগলো, আবুল হাকাম আসলে এখন ভিতরে গিয়েছেন কোনো 'ডাণ্ডা' আনতে। এলেই শুরু হবে ডাণ্ডাবৃষ্টি! এই বুঝি বেরিয়ে আসছেন! কিংবা নিয়ে আসতে গেছেন আগুনে স্যাঁকা কোনো লোহার শিক। এনেই মুহাম্মদের কপালটায় এঁকে দেবেন একটা উষ্ণ স্যাঁকা-চিহ্ন! তাই যেনো হয়! এটাই মুহাম্মদের পাওনা! সাহস কতো! আবুল হাকামের ইচ্ছের বিরুদ্ধে লড়তে আসা! সুতরাং হতাশার কিছু নেই। একটু সবর করো। এই বুঝি 'উদয় হলেন' আবুল হাকাম রুদ্রমূর্তিতে, রণ-দাপটে!
একটু পর আবু জেহেল এলো! দ্রুতই এলো! সাথে একটা জিনিসও নিয়ে এলো! কিন্তু সেটা ডাণ্ডা কিংবা লোহার শিক নয়- উটের মূল্য! একেবারে পুরোটা! 'পাইয়ে-পাইয়ে.. আনায় আনায়'!!
অদূরে দাঁড়িয়ে-থাকা লোক দু'টি যেনো 'আকাশ হইতে ভূতলে লুটাইয়া পড়িল'!
একটু আগের 'বেচারা ব্যবসায়ী'র বিস্ময়ের ঘোর কাটতে-না-কাটতেই তাতে এসে যোগ হলো আনন্দ, মহা আনন্দ। তিনি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না! যে লোকটা তাকে এতো কষ্ট দিলো, এমন কি মূল্যটা না দেওয়ার জন্যে দিনের পর দিন অদ্ভুত টালবাহানা করলো, সে আজ কেমন করে অমন বাধ্য ভৃত্যের মতো সমস্ত পাওনা তার হাতে এনে রেখে দিলো- এতো সহজে এবং এতো বিস্ময়কর দ্রুততায়?!
মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিস্ময়-বিমুগ্ধ ব্যবসায়ীকে বললেন:
-আপনার উটের মূল্য সব বুঝে পেলেন!
আনন্দ গদগদ কণ্ঠে ব্যবসায়ী বললেন:
-জ্বী অবশ্যই!!
এরপর আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের কাজে চলে গেলেন, বিস্মিত ব্যবসায়ীটি তাঁকে মুখের ভাষায় একটু ধন্যবাদ জানানোরও সুযোগ পেলেন না। শুধু চোখের ভাষায় বললেন যেনো—
কে তুমি হে মহান?
অমন ভালো মানুষের দেখা তো আমি জীবনে আর পাই নি!
আমি কি তোমাকে আবার পাবো?
তোমার সাথে মন খুলে একটু কথা বলতে পারবো?
তোমার উন্নত চরিত্রের দ্যুতিতে একটু দ্যুতিত হতে পারবো?
কে তুমি হে সুন্দর?! তোমাকে তো ভালো করে একটু কৃতজ্ঞতাও জানানো হয় নি!
আল্লাহ্র রাসূল চলে যেতেই ব্যবসায়ীর কাছে দৌড়ে-প্রায় ছুটে এলো লোক দু'টি! তারাও বিস্মিত! চোখের সামনে যা ঘটে গেলো তাকে কোনোভাবেই বিশ্বাস করা যায় না! সত্যিই কি তা ঘটেছে যা তারা দেখেছে! কিন্তু ঐ চাক্ষুষ দেখাকে বিশ্বাস না করে উপায় কী? ব্যবসায়ী নিজে গোনে গোনে তাদেরকে দেখালেন যে, আবুল হাকাম 'কড়ায় গণ্ডায়' তার পাওনা বুঝিয়ে দিয়েছে! তারপর ব্যবসায়ী তাদেরকে লক্ষ্য করে বললেন:
-ঐ মহান লোকটিকে অনেক ধন্যবাদ! আমি কল্পনাও করি নি, এতো সহজে এবং এমন বিস্ময়কর দ্রুততায় তিনি আমার পাওনাটা উসুল করে দেবেন! আর তোমাদেরকেও ধন্যবাদ! তোমরাই তো আমাকে তাঁর কাছে যেতে বলেছো!!
ওরা ব্যবসায়ীর দিকে ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।
একটু পর ভেবাচ্যাকা-খাওয়া লোকগুলি ছুটে গেলো কোরাইশের কাছে! ওদেরকে গিয়ে জানালো চোখে-দেখা 'আবুল-হাকাম-কাহিনী'! একেবারে দাঁড়ি-কমাসহ। সবার চোখে বিস্ময়! তাহলে কি আবুল হাকাম কাপুরুষ হয়ে গেলেন! মুহাম্মদের কাছে এতোটা নতজানু হওয়ার অর্থ কী! সবাই উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে গেলো! বললো, চলো, আবুল হাকামের বাড়ি চলো!
আসল ব্যাপার জানতে সবাই রোষ-কষায়িত হয়ে ছুটে গেলো 'আবুলহাকামখানায়'। গিয়েই দরোজায় জোরে জোরে আঘাত করতে লাগলো। আর বলাবলি করতে লাগলো, এর মানে কী! মুহাম্মদ ব্যবসায়ীর মূল্য দিয়ে দিতে বললো আর অমনি তিনি দিয়ে দিলেন! এ তো দেখছি মুহাম্মদের প্রতি রীতিমত আনুগত্য প্রকাশ! তবে কি ভাতিজার কাছে কাবু হয়ে গেলেন চাচাজান?!
কিন্তু কী আশ্চর্য! এতো ধাক্কাধাক্কি তবু দরোজা খোলা হচ্ছে না কেনো? ভিতরে কেউ নেই নাকি? আশ্চর্য! এমন তো আগে কখনো হয় নি!
উপস্থিত কোরাইশ নেতৃবর্গ হৈচৈ শুরু করে দিলো। অবশেষে অ-নে-ক কষ্টে দরোজাটা খোলানো গেলো তখনই, যখন আবুল হাকামের বিশ্বাস হলো, মুহাম্মদ নয়— দরোজায় দাঁড়িয়ে কোরাইশেরই লোকজন! এরপর আবুল হাকাম তাদের ক্রুদ্ধ প্রশ্নের উত্তরে কাঁপাকাঁপা আওয়াজে বলতে লাগলো:
-তোমরা আমাকে ভুল বোঝো না। আসলে আমি দরোজাটা খুলেছিলাম মুহাম্মদকে ধোলাই দিতেই। ওর সাহস কতো! ঐ লোকটার পক্ষ নিয়ে আমার সাথে লড়তে এসেছে! কিন্তু কী আর বলবো তোমাদেরকে, মুহাম্মদের দিকে 'আগুনঝরা' দৃষ্টি নিয়ে তাকাতেই দেখলাম, ঠিক মুহাম্মদের মাথার উপর দিয়ে ইয়া বড় একটা উট আমার দিকে হা করে আছে দাঁত খিঁচিয়ে! যেনো এক্ষুণি আমায় গিলে খাবে, যদি না- দিই ব্যবসায়ীর পাওনা! এই ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখে কলিজা আমার শুকিয়ে গেলো! থরোথরো পায়ে ভিতরে গেলাম! মনে হচ্ছিলো সেই হা-করা উটটাও আমার পেছনে পেছনে আসছে! আমি ভয়ে পেছনে তাকাতে পর্যন্ত সাহস পাচ্ছিলাম না! সত্যি সত্যি এসে থাকলে! আমার আরো মনে হচ্ছিলো, যদি আমি ব্যবসায়ীর পাওনা নিয়ে অবিলম্বে দরোজায় হাজির না হই, ঐ ভয়ঙ্কর উটটা আমাকে চিরতরে শেষ করে দেবে! তাই আমি আর দেরী করলাম না। তড়িঘড়ি করে থলে নিয়ে হাজির হলাম দরোজায়, পাওনাটা নিয়ে তুলে দিলাম ব্যবসায়ীর হাতে, মুহাম্মদের সামনে! তারপর দ্রুত দরোজাটা লাগিয়ে দিয়ে ভিতরে এসে হাঁপাতে লাগলাম! হাঁপাতেই থাকলাম!
আবু জেহেলের এই কাহিনী শুনে একজন বলে উঠলো: -হুঁ, বুঝেছি এখন, দরোজা না খোলার রহস্যখানা! আশ্চর্য! এ সব কী শুনছি! আরেকজন টিপ্পনি কেটে বললো: -আবুল হাকাম নিশ্চয়ই এও ভেবেছিলেন যে, মুহাম্মদের মাথার উপর দিয়ে ঐ উটটাও দাঁত খিঁচিয়ে তাকিয়ে আছে, আশ্চর্য! কী হচ্ছে এ-সব?! এ-কথা শুনে কয়েকজন হেসে উঠলো-বিদ্রূপের হাসি!
আল্লাহ্ কী লীলা! মুহাম্মদকে নিয়ে যে-হাসিটা দেখার জন্যে অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছিলো ঐ দুষ্টরা সে-হাসিটাই এখন ওরা দেখলো আবু জেহেলকে নিয়ে! এবার ওরাও বিদ্রূপে সবার সাথে যোগ দিয়ে বললো: -অসম্ভব! আমরা এ-কথা বিশ্বাস করি না! আমরাও তো অদূরে দাঁড়িয়ে ছিলাম! কই, কোনো উট তো আমাদের চোখে পড়ে নি! এদের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বাকীরা বললো: -বুঝেছি, সব বুঝেছি! আসলে মুহাম্মদের ব্যক্তিত্ব ও বীরত্বই আবুল হাকামের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে! সম্ভবত যতোবার মুহাম্মদ আসবে ততোবারই আবুল হাকামের এই অবস্থা হবে! এই বলে কোরাইশ এক যোগে গলা ফাটিয়ে হাসতে লাগলো-হা হা হা.......!
📄 আমি বোরাক বলছি
আমি যে সময়ের কথা বলছি তখন না ছিলো আধুনিক রকেট কিংবা এইসব কৃত্রিম উপগ্রহ। এ-সব আবিস্কার হওয়ার হাজার হাজার বছর আগে থেকেই আমি ছিলাম। আমি বোরাক। মানুষ কতো নামে আমাকে ডাকে। কেউ বলে আসমানী বাহন। কেউ বলে বিদ্যুৎ বাহন। আমি দেখতে কেমন? এ ব্যাপারেও নানা জনের নানান মত। আমি বলি কি; আমি হলাম এক বিশেষ বাহন, আল্লাহ্র সৃষ্টি, যিনি আসমান জমিন সৃষ্টি করেছেন, সবকিছু সৃষ্টি করেছেন, তিনিই আমার স্রষ্টা। বাস্.. এ-ই আমার সবচে' বড় পরিচয়। নবীরা সওয়ার হয়েছেন আমার পিঠে- এও আমার এক গর্বের ইতিহাস। কিন্তু সব নবীর সেরা নবী যিনি তিনি শুধু আমার পিঠে সওয়ার হয়েছেন- তাই নয় বরং তাঁর সাথে জড়িয়ে আছে আমার অনেক স্মৃতি, অনেক ঘটনা। বরং বলা উচিত- এক বিস্ময়কর মু'জিযা। এখন বলতে চাই তোমাদেরকে সেই ঘটনা, যা হার মানায় গল্পকেও! এমন কি কল্পনাকেও!
বার বছর ধরে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুওতের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। এ দীর্ঘ সময়ে তাঁকে এবং তাঁর সাহাবীদেরকে অনেক জুলুম-অত্যাচার সইতে হয়েছে। নবীজীর জীবনে এসেছে অনেক কষ্ট। অনেক দুঃখ। অনেক শোক। এর মাঝেই তিনি হারিয়েছেন প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজাকে। হারিয়েছেন প্রিয় চাচা আবু তালিবকে। কাফির মুশরিকদের জুলুম-অত্যাচারের মাত্রাটাও এর ফলে অনেক বেড়ে গেছে। ঈমান ও জীবন বাঁচাতে অনেক সাহাবীকেই হাবশায় হিজরত করতে হয়েছে।
মক্কায় দাওয়াতের কাজ কঠিন হয়ে গেলো, অনেক কঠিন। হতাশ হয়ে গিয়েছিলেন তিনি তায়েফে। আশা নিয়ে, অনেক আশা। বুকভরা আশা। কিন্তু ওরা-তায়েফের লোকেরা তাঁকে দিলো শুধুই হতাশা। বুকভরা ব্যথা। রক্তঝরা দুঃখ। অশ্রুঝরা প্রত্যাবর্তন।
তায়েফ থেকে ফেরার পরই প্রিয় রাসূলকে ডেকে পাঠালেন আল্লাহ একেবারে নিজের সকাশে! সঙ্গে থাকবেন কে? যাওয়ার বাহনটাই-বা কী হবে? সঙ্গে থাকবেন আসমানী দূত-জিবরীল। আর বাহন হলাম আমি-বোরাক!
আরো বিস্তারিত বলি- সময়টা ছিলো রজবের ২৭ তারিখ রাত। রাতে জিবরীল গেলেন নবীজীকে জাগাতে। তিনি সেদিন ঘুমিয়ে ছিলেন আবু তালিব তনয়া-উম্মে হানীর গৃহে, কা'বার একেবারে পাশে। এরপর তিনি তাঁকে নিয়ে এলেন কা'বা চত্বরে, যেখানে আমি অপেক্ষা করছিলাম। সেখানে তিনি তাঁর ক্বলবটাকে ধুইয়ে দিলেন জমজম দিয়ে। সাথে সাথে তা ভরে গেলো ঈমানের নূরে। হিকমতের (শরীয়তের গভীর জ্ঞানের) নূরে। এরপর আল্লাহ্র রাসূল আমার উপরে সওয়ার হলেন। গভীর রজনীর নিঝুম প্রহরে শুরু হলো ইসরা-বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে পথচলা। সঙ্গে আছেন হযরত জিবরীল। আমরা এগিয়ে যাচ্ছি ক্ষীপ্র গতিতে।
মক্কার সীমানা ছাড়িয়ে কিছুদূর যেতেই পথে পড়লো এক বণিক দল। এরা ছিলো কোরাইশ গোত্রের। এদের একটা উট হারিয়ে গিয়েছিলো। আল্লাহ্র রাসূল বলে দিলেন, কোথায় গেলে পাবে উটের সন্ধান। একটু পর আরেকটি বণিক কাফেলা আমাদের পথে পড়লো। ওদের বেশকিছু উট দলছুট হয়ে কোথায় যেনো চলে গিয়েছিলো। একটার পা ভেঙে গিয়েছিলো। কিছুক্ষণ পর আরেকটা কাফেলার দেখা পেলাম। ঐ কাফেলার আগে আগে চলছিলো একটা উট যার উপরে চাপানো ছিলো দু'টি কালো বোঝা।
জেতে যেতে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো দেখেছেন অনেক কিছু। তখন তাঁর মনে জেগেছে কতো কৌতূহল ও জিজ্ঞাসা। সঙ্গে সঙ্গে সে কৌতূহল প্রকাশও করেছেন তিনি। হযরত জিবরীলও মিটিয়েছেন তাঁর কৌতূহল।
নবীজী দেখলেন এক যুবতীকে। যেমন তার যৌবনময় রূপ তেমনি তার রূপময় পোশাক। ঐ যুবতীটি গলা ফাটিয়ে ডাকছিলো নবীজীকে। বলছিলো, মুহাম্মদ, এই মুহাম্মদ! কিন্তু আল্লাহ্র রাসূল তার ডাকে সাড়া দিলেন না। তার দিকে ফিরেও তাকালেন না।
হযরত জিবরীল তাঁকে জানালেন: -আপনাকে একটু আগে যে যুবতীটি ডাকছিলো, জানেন, ও কে? ও হলো দুনিয়া, রূপ ধরে এসেছিলো আপনাকে আকর্ষণ করতে।
আল্লাহ্র রাসূল বললেন: -আমার কোনো প্রয়োজন নেই এই দুনিয়ার!
আমরা 'ইয়াসরিব' (মদীনায়) পৌঁছার পর জিবরীল বললেন: -এই-যে ইয়াসরিব। এখানে আপনাকে হিজরত করতে হবে। তখন জায়গাটার নাম রাখবেন- মদীনা মুনাওয়ারা। এখানেই আপনার ইন্তেকাল হবে।
এরপর আমরা অতিক্রম করলাম এমন এক সম্প্রদায়ের পাশ দিয়ে যারা ফসল রোপন করছিলো আর কাটছিলো। সে এক বিস্ময়কর দৃশ্য! ফসল কাটতে-না- কাটতেই আবার আগের মতো ফলে যাচ্ছে, যেনো আগে কাটাই হয় নি! শীষগুলো শস্যদানায় দুলছে! আবার যেই-না কাটা অমনি আবার আগের মতো— যেই সেই!!
নবীজী জিবরীলকে বললেন: -ভাই, এ কী!
জিবরীল বললেন: -এরা হলেন আল্লাহ্র পথের মুজাহিদ! এদের সৎ কাজের বিনিময় আল্লাহ সাতশ' গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেবেন।
আমরা আরো দেখেছি, সালাত তরককারীদের সাজা। যাকাত অনাদায়ের শাস্তি।
জেতে যেতে হঠাৎ মনে হলো, মিষ্টি একটা বাতাস বইছে। ঘ্রাণে ঘ্রাণে চারদিক মৌ মৌ করছে। ঠিক তখনই কানে ভেসে এলো মধুময় একটা কণ্ঠ।
আল্লাহ্র রাসূল জানতে চাইলেন: -এটা কী কণ্ঠ? কোত্থেকে আসছে এই ঘ্রাণ?
জিবরীল বললেন: -এটা জান্নাতের কণ্ঠ! জান্নাত বলছে, আমাকে যা যা দেয়ার কথা ছিলো স-ব দিয়ে দাও! আমার আয়োজন কতো! এই-যে আমার কক্ষ! এই-যে আমার রেশমী বস্ত্র! সোনা-দানার কোনো অভাব নেই! আর পান পাত্র? সোরাহি? মধুর নহর? দুধের নহর? স্বচ্ছ পানির প্রস্রবণ? অনে-ক.. অফুরান! বে-হিসাব!!
আরেকটা উপত্যকা অতিক্রমকালে ভেসে এলো একটা অসহনীয় দুর্গন্ধ। আর শোনা গেলো একটা জঘন্য কণ্ঠ।
আল্লাহ্ নবী জানতে চাইলেন: -এ আবার কী!
জিবরীল জানালেন: -এ হলো জাহান্নাম। ডেকে ডেকে বলছে, আমাকে যা যা দেয়ার কথা ছিলো সব দাও! আমার আয়োজন কতো! এই-যে আমার শিকল ও বেড়ি। আর আমার ভিতরের অগ্নিতাপ? ভীষণ! মারাত্মক! কখন পাবো আমি আমার প্রতিশ্রুত জিনিস? আর তো তর সইছে না!
চোখের পলকেই আমরা বাইতুল মাকদিসে পৌঁছে গেলাম। মুহাম্মদ আমাকে উঁচু একটা পাথর খণ্ডের সাথে বাঁধলেন। সেই পাথরখণ্ডটা আজো আছে। মুসলিম উম্মাহ পাথরখণ্ডটির উপর একটি সুসজ্জিত ও কারুকার্যময় গম্বুজ নির্মাণ করেছে, যা 'কুব্বাতুস সাখরা' নামে খ্যাত-পরিচিত। মুহাম্মদ আমাকে রেখে মসজিদুল আকসায় প্রবেশ করলেন। সেখানে তাঁকে স্বাগত জানাতে অপেক্ষা করছিলেন স-ব নবী রাসূল। সবার সঙ্গে তাঁর দেখা হলো। সবাইকে নিয়ে তিনি নামাজ পড়লেন। ইমাম হলেন তিনি আর সবাই হলেন মুক্তাদি। নামাজ শেষে শুরু হলো মি'রাজ- মূল অভিযান। জিবরীল একটা সিঁড়ি নিয়ে এলেন। এই সিঁড়িটা উঠে গেছে সোজা মহাকাশের দিকে। এই সিঁড়ি দিয়ে এখন নবীজীর যাত্রা হবে আকাশের দিকে। আরশের দিকে। সিঁড়ির নামেই এ-অভিযানের নামকরণ হয়েছে মি'রাজ। যার মানে- সোপান যোগে ঊর্দ্ধ গমন অর্থাৎ আল্লাহর সকাশে উপস্থিতি।
চলতে চলতে আল্লাহ্র রাসূল পৌঁছে গেলেন প্রথম আকাশে। সেখানে তাঁকে স্বাগত জানালেন হযরত আদম আলাইহিস সালাম। এরপর এলো দ্বিতীয় আকাশ। সেখানে তাঁর দেখা হলো ঈসা আলাইহিস সালাম, ইয়াহইয়া আলাইহিস সালাম ও যাকারিয়্যা আলাইহিস সালাম-এর সঙ্গে। এরপর এলো তৃতীয় আকাশ। সেখানে ছিলেন ইউসুফ আলাইহিস সালাম। এরপর চতুর্থ আকাশ। সেখানে ছিলেন হযরত ইদরিস আলাইহিস সালাম। এরপর এলো পঞ্চম আকাশ। সেখানে দেখা হলো হযরত হারূন আলাইহিস সালাম-এর সাথে। ষষ্ঠ আকাশে তাঁকে স্বাগত জানালেন হযরত মূসা আলাইহিস সালাম। এরপর এসে গেলো সপ্তম আকাশ। সেখানে সাক্ষাত হলো হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর সঙ্গে। সবাই নবীজীকে স্বাগত জানালেন এই বলে- (مرحباً بالنبي الصالح والأخ الصالح) সুস্বাগতম পুণ্যবান নবীকে, পুণ্যবান ভাইকে!)।
এরপর আল্লাহ মুহাম্মদকে সিদরাতুল মুনতাহায় উন্নীত করলেন! তারপর হাজির হলেন তিনি আল্লাহর মহা সান্নিধ্যে! সেখানে তিনি ভক্তিভরে তাঁকে সেজদা করলেন! তাঁর মহিমা প্রকাশ করলেন! তাঁর স্তুতি গাইলেন! তাঁর নিবেদনে ঢেলে দিলেন অযুত নিযুত কৃতজ্ঞতা! কৃতজ্ঞতা তো ঢেলেই দিতে হবে! কারণ এখানে-যে এর আগে আর কেউ আসে নি শুধু তিনি ছাড়া! ডাকাই-যে হয় নি! শুধু তাঁকেই ডেকে এনেছেন আল্লাহ! আহা! শ্রেষ্ঠ নবীর কী শ্রেষ্ঠ সৌভাগ্য! এরপর আল্লাহ তাঁকে একে একে দিলেন অনেক উপহার! সবচে' বড় উপহারটা কী? নামাযের উপহার! পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের সেরা উপহার! যে নামায আদায় করতে হবে কা'বামুখী হয়ে। এরপর আল্লাহ তাঁর প্রিয় মুহাম্মদকে বিদায় দিলেন। আবার তিনি ফিরে এলেন দুনিয়ায়। প্রথমে এসে নামলেন সেই মসজিদুল আকসার বাইরে। তারপর আবার প্রবেশ করলেন ভিতরে। সেখানে সমবেত স-ব নবী রাসূলকে বিদায় জানিয়ে আবার এসে আমার উপর চড়ে বসলেন। শুরু হলো কা'বার দিকে ফিরে যাওয়া। ... না, বেশিক্ষণ লাগে নি, মুহূর্তেই আমরা পৌঁছে গেলাম মক্কায়-কা'বা চত্বরে! এভাবেই সমাপ্ত হলো মুহাম্মদের মহাকাশ ভ্রমণ। আল্লাহ্র সকাশে (দরবারে, সান্নিধ্যে) হাজির হওয়ার অপূর্ব গৌরব। আমি মুহাম্মদকে বিদায় জানালাম। তিনি চলে গেলেন গৃহে। পরদিন আল্লাহ্র রাসূল কা'বায় হাজির হয়ে সবাইকে জানালেন তাঁর এই মহাভ্রমণের কথা। ইসরা ও মি'রাজের কথা। কোরাইশের কাফির মুশরিকরা তা বিশ্বাস করলো না। আবু জেহেল তো একে 'ডাহা মিথ্যা' বলেই উড়িয়ে দিলো। ওদের একজন ঠাট্টা করে বললো, আমরা একমাসেও জেরুজালেম পৌঁছতে পারি না আর মুহাম্মদ কি না এক রাতেই সেখানে গিয়ে আবার ফিরেও এসেছে! কী আজগুবি কথা!
ঠিক তখনি সেখানে এসে হাজির হলেন আবু বকর রা.। এসে বসলেন আল্লাহ্র রাসূলের কাছ ঘেঁষে। তখন কাফেরদের মুখ থেকেই তিনি শুনলেন রাসূল কী বলেছেন এবং তারা কতোটা বিস্ময় প্রকাশ করে রাসূলের কথাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। কাফের ও রাসূলের মাঝে এ নিয়ে কথা চলতে লাগলো। এ ব্যাপারে রাসূল যাই বলছেন কাফেররা তাই অস্বীকার করছে। শেষ পর্যন্ত কাফেররা বললো, ঠিক আছে; মুহাম্মদ তাহলে বলুক, মসজিদুল আকসা দেখতে কেমন? কী আছে তার ভিতর? কয়টি তার দরোজা জানালা? আসলে এ-সব বলে তারা রাসূলকে আটকে দিতে চেয়েছিলো। লা-জওয়াব করে দিতে চেয়েছিলো। তারা ধরেই নিয়েছিলো যে, মুহাম্মদ এক রাতে ওখানে যেতেই পারে না। সুতরাং তার পক্ষে এর বর্ণনা দেওয়াও সম্ভব না। কিন্তু আল্লাহ তাঁর নবীকে লজ্জিত করলেন না। জওয়াবে আল্লাহ্ নবী মসজিদুল আকসার আকার-আকৃতি একে একে ওদের সামনে বর্ণনা করে যেতে লাগলেন। এমনভাবে যেনো আল-আকসা তাঁর চোখের সামনে ভাসছে! আর তিনি দেখে দেখে সব বলে যাচ্ছেন। এতে সবাই বিস্ময়ে যেনো পাথর হয়ে গেলো! আবু বকর আবেগভরে বলে উঠলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনি সত্য বলেছেন!
এদিকে আল্লাহ্র রাসূল কাফেরদের বিস্ময় আরো বাড়িয়ে দিলেন ঐ সব কাফেলার কথা উল্লেখ করে যাদের সাথে তাঁর দেখা হয়েছিলো মক্কা থেকে একটু দূরে। তারপর যখন ঐ সব কাফেলা ফিরে এলো এবং প্রথম কাফেলার হারিয়ে যাওয়া উটটিও ফিরে এলো, দ্বিতীয় কাফেলার পা ভেঙে-যাওয়া উটটিও ফিরে এলো এবং আরো ফিরে এলো তৃতীয় কাফেলার কালো বোঝা বহন-করা সেই উট দু'টিও, তখন এ-ঘটনা অস্বীকার করতে ওদের একটু মুখ-লজ্জাই হলো।
কিন্তু কী আশ্চর্য! তবু মন ওদের ঘুরলো না! বিবেক ওদের দুললো না! চেতনা ওদের জাগলো না! ঈমানও ওদের নসীব হলো না!
তখন বিস্মিত কাফেরদের ভিতরে আবার শোনা গেলো হযরত আবু বকরের নির্দ্বিধ কণ্ঠ:
-হে আল্লাহ্র রাসূল! আপনি অবশ্যই সত্য বলেছেন! আপনার সব কথাই আমি বিশ্বাস করলাম!
নবীজী আনন্দভরা কণ্ঠে বললেন: -আবু বকর! তুমি ‘সিদ্দীক’!
তখন থেকেই আবু বকর রা.-এর সাথে এই ‘সিদ্দীক’ উপাধী একাকার হয়ে যায়!
বন্ধু! আমি বোরাক! যে কাহিনী আমি বলা শুরু করেছিলাম তা এখানেই সমাপ্ত করবো। শেষে বলতে চাই, ইসরা ও মি'রাজের মু'জিযা যতোদিন আলোচিত হবে ততোদিন সায়্যিদুল মুরসালিনের সাথে আমিও আলোচিত হবো। এ আমার চরম সৌভাগ্য। প্রায় ১৫ শত বছর আগেই আল্লাহ আমাকে দিয়ে প্রমাণ করে দিয়েছেন, আল্লাহ যা চান তা-ই হয়! কোনো কিছুই তাঁর কুদরত ও চাওয়ার সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। হ্যাঁ, তিনি যা চান তা-ই হয়! যখন চান তখনই হয়! হবেই তো! তিনি-যে ‘কুন ফায়াকুন’-এর মালিক! রকেটের গতি কিংবা উপগ্রহের দ্যুতি— তাঁর ইচ্ছের সামনে সবই চিরম্লান। এ-ঘটনাকে অস্বীকার করার দুর্মতি মানেই দুর্গতি। পবিত্র কুরআনে আছে এ-ঘটনার কথা। বিদায়ের আগে অনুরোধ করে যাই— আয়াতটা একটু পড়ো। প্রবেশ করো গভীরে— অর্থ ও ভাবের। দেখবে কী মজা!
سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلاً مِنْ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ.
মহিমান্বিত সেই সত্ত্বা, যিনি তাঁর বান্দা (মুহাম্মদ) কে মসজিদুল হারাম (কা’বা) থেকে মসজিদুল আকসা (বাইতুল মাকদিস) পর্যন্ত নৈশভ্রমণ করিয়েছেন, যার আশপাশ আমি বরকতময় করে দিয়েছি। যাতে আমি আমার নিদর্শন প্রত্যক্ষ করাতে পারি। নিশ্চয়ই তিনি সবশ্রোতা.. সর্বদ্রষ্টা। -সূরা ইসরা।