📘 গল্পে আঁকা সীরাত হে মুহাম্মদ > 📄 আমি মা হালিমার সেই বাহন

📄 আমি মা হালিমার সেই বাহন


হালিমা সা'দিয়ার নাম শুনেছো? আমি তার কাছেই থাকি। অনেক দিন থেকেই। তিনি একজন আদর্শ দাঈ-মা। মায়েরা নিজেদের আদুরে দুলালদের (দুধ-শিশুদের) তার কাছে পাঠিয়ে দেন, আর তিনি তাদেরকে দুধপান করিয়ে করিয়ে গড়ে তোলেন মাতৃ মমতায়। আমি যে সময়ের কথা বলছি তখন তো আর কৌটাজাত গুঁড়ো দুধ ছিলো না। তাই আরবের শহুরে মায়েরা পল্লীগ্রামের দাঈ-মা'দের কাছে দুধ-শিশুদের পাঠিয়ে দিতেন। অবশ্য পল্লীগ্রামের বিশুদ্ধ ভাষা ও স্বাস্থ্যকর আবহাওয়ায় শিশুদের বেড়ে ওঠার বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো।

হালিমা'র ধন ছিলো না, তবে ধনী একটা মন ছিলো। স্বামী হারিসকে নিয়ে থাকেন তিনি তায়েফ নগরী থেকে আশি কিলোমিটার দূরে শোহাতা পাহাড়ি উপত্যকায়, তাঁবু-সদৃশ ছোট্ট একটা 'কুটিরে' (গৃহে)। ঐ এলাকাটা ছিলো অনুর্বর, বৃষ্টি-বাদলা হয় না বললেই চলে। আর সবুজে আঁকা বন-বনানী এবং তার রূপ-রুপালী, মরুর দেশে সে তো কল্পনার ছবি! সুতরাং ওখানে চাষবাসে মোটেই সুবিধা করা যেতো না। এ দিকে আমিও দুবলা (শীর্ণ ও দুর্বল) পাতলা। নিজের দেহটাকে টেনে বেড়ানোই ছিলো এক কাজ। তবুও আমি তাদের সঙ্গেই ছিলাম, সঙ্গেই আছি। তাদের যে-কোনো উপকারে দেহ-মন উজাড় করে দিই। তারা খুব ভালো মানুষ। অমন ভালো মানুষের উপকারে পিছিয়ে থাকবো- তেমন অকৃতজ্ঞ আমি নই।

একদিন আমি তাঁবুর সামনে দাঁড়িয়ে আছি। হালিমা ধীর পায়ে এগিয়ে আসছেন আমার দিকে। দাঁড়ালেন এসে একেবারে আমার কাছটি ঘেঁষে। হালিমা আমার পাশে অমন করে দাঁড়ালে আমার খুব ভালো লাগে। আজ কি তিনি দূরে কোথাও যাবেন? নাকি আমাকে নিয়ে চারণভূমিতে যাবেন? চারণভূমিতে গেলেই ভালো। ভীষণ খিদে পেয়েছে আমার। আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম, দেখি কী হয়—কোথায় যান। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে হালিমা কী যেনো ভাবলেন। তারপর আমার লাগামটা হাতে নিলেন। তারপর আমার উপর চেপে বসলেন।

না, যা ভাবছিলাম তাই হলো। যা চাইছিলাম তা হলো না। মানে একটা দূরের সফরের জন্যে তিনি বের হচ্ছেন। তবু আমার মন খারাপ হলো না। হালিমার উপর কখনো আমার মন খারাপ হয় না। সাথে আছে তার ছিঁচকাঁদুনে শিশুটাও। ছিঁচকাঁদুনে বলার কারণ আছে। কান্না শুরু করলে ও আর থামতে চাইতো না। কী করবে বেচারা! দুধের শিশু দুধ না পেলে তো কাঁদবেই! আর বৃষ্টিহীন ফসলহীন সা'দপল্লীতে মা হালিমা'র বুকে দুধ আসবে কোত্থেকে? বাচ্চাটার কান্না আমাকে খুব কষ্ট দেয়। তখন আমি নিজের খিদের কথা ভুলে যাই। আমি তো অনেক বড়, খিদের জ্বালা সইতে পারি। কিন্তু ও তো ছোট দুধশিশু, কেমন করে সইবে ক্ষুধার কষ্ট? আমাদের সঙ্গে আছেন হালিমার স্বামী— হারিসও। আরো যোগ দিয়েছে বনু সা'দ এর বেশ ক'জন মহিলা। হারিস চেপে বসেছেন তার অতি বয়স্ক উটনীটিতে। আমরা রওয়ানা হয়ে গেলাম। মরুভূমির পথ কেটে কেটে ধীরে ধীরে সামনে বাড়তে লাগলাম।

সেদিন প্রচণ্ড গরম পড়েছিলো। ক্ষুধায়-গরমে আমার অবস্থা কাহিল। অনেক কষ্টে পা ফেলে ফেলে চলছিলাম। মনে হচ্ছিলো, আমার চেয়ে আমার পায়ের ওজনই বেশী। আসলেই আমি ছিলাম সীমাহীন ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত সফরের অনুপযোগী। এদিকে ওই শিশুটা অবিরাম কেঁদেই চলেছে। আমার ক্লান্তির ওইটাও একটা কারণ। কেননা আমি শিশুদের কষ্টের কান্না-ক্ষুধার কান্না সইতে পারি না। মা হালিমা ওকে দুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু কোথায় দুধ! বুক শুকিয়ে কাঠ! এক কাতরা দুধও বাচ্চাটার মিললো না। আমার বড়ো মায়া হলো। ইস্! নিষ্পাপ শিশুটা একটু দুধের জন্যে কী কষ্ট করছে! মা হালিমার চোখ ছলছল করে ওঠে চিরন্তন মাতৃমমতায়। আমার চোখও ভিজে ওঠে শিশু-মমতায়! হারিস একটু উষ্মা মেশানো কণ্ঠে বললেন: -নিজের শিশুকেই তুমি দুধ পান করাতে পারছো না, কেনো তবে আরেক শিশুকে আনতে যাওয়া?!

হালিমা শান্ত কণ্ঠে জবাব দিলেন: -আরেকটা শিশু এলে আমরা তার পরিবারের কাছ থেকে কিছু-না-কিছু পারিশ্রমিক পাবোই। তাই দিয়ে আমাদের দিন বেশ চলে যাবে। দুঃখের দিন কিছুটা হলেও ঘুচবে। আমার বুকেও দুধ আসবে। তখন এ-ও খাবে, ও-ও খাবে। আমরা চেষ্টা করবো কোনো ধনীর দুলালকে নিয়ে আসতে। তাহলে আমাদের পারিশ্রমিকটা একটু বেশী হবে। হারিস আর কথা বললেন না।

আমি নীরবে শুনলাম তাদের কথা, যেনো ছোট ছোট দুঃখকণা! আবার আমার চোখ ছলছলিয়ে উঠলো! অবশ্য অজানা একটা আনন্দও আমার মনে দোল দিয়ে গেলো! যদিও আমি বুঝতে পারছিলাম না আমরা কোথায় যাচ্ছি। আমি হারিসের উটনীটির কাছে জানতে চাইলাম: -এই! আমরা কোথায় যাচ্ছি? ওর আবার মরু-পথঘাট সব জানা। বয়স তো আর কম হয় নি, আমার চেয়ে ঢের বেশী। কতো জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হয়েছে ওকে, দিনের পর দিন, রাতের পর রাত। তাই চট করে জবাব দিলো: -আমরা মক্কায় যাচ্ছি!

মক্কার কথা শুনে আমার মনটা আনন্দে দুলে উঠলো। মক্কা-যে আমার ভীষণ প্রিয়! খুশিতে আমি হেলে-দোলে পথ চলতে লাগলাম। আমি দ্রুত পথ চলার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু পারছিলাম না। কীভাবে পারবো, শরীরটায়-যে কিছু নেই, একেবারেই দুবলা-পাতলা, পথ চলছিলাম সবার পেছনে পেছনে।

আমরা এক সময় মক্কায় পৌঁছে গেলাম। হালিমা বেরিয়ে গেলেন শিশুর খোঁজে। ছুটোছুটি করতে লাগলেন এখানে ওখানে। অনেকক্ষণ পর ফিরে এলেন হালিমা। কিন্তু মুখে তার হতাশার ছায়া। যেনো মুখজুড়ে লেপটে আছে পৌঁচ-পোঁচ দুঃখ ছাপ। স্বামীর পাশে বসতে বসতে তিনি বললেন:
-মনে হচ্ছে শূন্য হাতেই আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে, যেমন এসেছিলাম তেমন। সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে আরো ক্ষুধা, আরো কষ্ট, আরো ক্লান্তি! আমি ছাড়া আর সবাই বাচ্চা পেয়ে গেছে। এদিকে আর বাচ্চাও নেই- একটি এতিম ছাড়া!

তার কথা শুনে আমার মনটা বিষাদে ভরে গেলো। হায় বেচারি, কতো আশা নিয়ে এসেছিলেন! এখন কী হতাশাই না তাকে ঘিরে ধরেছে! কেউ তাকে বাচ্চা দিতে চাইছে না। হয়তো কেউ-ই তাকে পছন্দ করছে না। তার দারিদ্র দেখে, তার স্বাস্থ্যহীনতা দেখে। কিন্তু তার মনটা-যে আকাশের মতো উদার, তার কোলে যে কোনো দুধশিশুই-যে গভীর মমতায় জড়িয়ে থাকে— সে খবর কেউ জানলো না! যদি জানতো! কিন্তু ওই এতিম বাচ্চাটাকেই কেনো নিয়ে নিচ্ছেন না তিনি?! আমার মন কেনো যেনো নিজের অজান্তেই ওই না-দেখা এতিম বাচ্চাটার ভালোবাসায় দুলে উঠলো!

একটু বিশ্রাম নিয়ে হালিমা আবার বেরুলেন বাচ্চার সন্ধানে। অনেকক্ষণ পর তিনি ফিরে এলেন, তাঁর কোলে একটা বাচ্চা— ফুটফুটে একটা দুধশিশু। ভীষণ পুলকিত মনে হচ্ছিলো হালিমাকে। দূর থেকেই স্বামীকে লক্ষ্য করে হর্ষধ্বনি করে উঠলেন তিনি: -আল-হামদুলিল্লাহ!

আমরাও তার পুলকে জেগে উঠলাম— বাচ্চা তাহলে পাওয়া গেছে! আমার মনে হলো; এ-ই সেই এতিম—আমার অজানা ভালোবাসা!! কাছে আসতেই আমি একটা ঘ্রাণ পেলাম, ভীষণ মিষ্টি ঘ্রাণ। অন্য রকম মিষ্টি ঘ্রাণ। যেনো মেশক আম্বরের ঘ্রাণ। আর এ-যে বয়ে নিয়ে-আসা এ-বাচ্চারই ঘ্রাণ, তাতে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ রইলো না। কী সুন্দর ফুটফুটে চেহারা! হালিমার কোলে যেনো পূর্ণিমার চাঁদ নেমে এসেছে! মিটিমিটি হাসছে! মায়াবি আলো ছড়াচ্ছে! হারিস কাছে গেলেন। আরো কাছে। গভীর দৃষ্টিতে তার চেহারার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাকিয়েই রইলেন। যেনো কতো কালের চেনা কোনো প্রিয় মুখ অনেক কাল পর তিনি দেখছেন! হারিসের চোখে মুখে আনন্দোডাস ঝলমল করতে লাগলো। তিনি আনন্দ-প্লাবিত কণ্ঠে বললেন: -কার মাণিক নিয়ে এসেছো তুমি হালিমা!

-এর নাম মুহাম্মদ! মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ বিন আবদুল মুত্তালিব। ওর দাদা কোরাইশ সরদার। ও এতিম—বাবা বেঁচে নেই, ওর জন্মের ছয় মাস আগেই চলে গেছেন। মা—আমেনা বিনতে ওয়াহব, কোরাইশ গোত্রের বিদূষী মহিয়সী নারী।

সব শুনে হারিসের আনন্দের কোনো সীমা রইলো না। তিনি খুশিতে গদগদ হয়ে তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে গেলেন এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই সা'দপল্লীতে ফিরে যাওয়ার তোড়জোড় শুরু করে দিলেন।

আশ্চর্য! হালিমার ছিঁচকাঁদুনে বাচ্চাটি এখন আর কাঁদছে না! বরং ও ছিলো বিস্ময়করভাবে হাসিখুশি! কারণ কি শুধু এই যে ও এইমাত্র অনেক দিন পর তৃপ্তিভরে মায়ের দুধ পান করেছে! যা একটু আগেও ছিলো অকল্পনীয়! কিন্তু যেই মুহাম্মদ এলো অমনি হালিমার দুধহীন শূন্য বুকেও মাতৃদুধের যেনো বান ডেকে গেলো! আল্লাহ্র কী মহিমা! সেই দুধ পান করে শিশুটি এখন তৃপ্ত, পরিতৃপ্ত! তাহলে এখন কেনো ও আর কাঁদবে?! আমার মনে প্রশ্ন জাগে— মুহাম্মদের মতো দুধভাই প্রাপ্তি, সেও কি কান্না বন্ধ হয়ে যাওয়ার আরেকটা কারণ?!

এবার ফিরে যাওয়ার পালা। আবার হালিমা আমার উপর বসলেন। এখন তার সাথে একজন নয়, দু'জন শিশু নিজের সন্তান আর শিশু মুহাম্মদ। হারিস চড়ে বসলেন নিজের বাহনে-বৃদ্ধ উটনীটিতে। শুরু হলো ফিরতি সফর। আমি আবিষ্কার করলাম, এবার আমার চলার গতি দ্রুত, বিস্ময়কর দ্রুত! আমাদের সঙ্গে যারা মক্কা থেকে বেরিয়েছিলো তাদেরকে পেছনে ফেলে এবং যারা আমাদেরকে পেছনে ফেলে আগে চলে গিয়েছিলো তাদেরকেও পেছনে ফেলে আমি আগে চলে গেলাম! আগে মক্কার কথা শুনে ‘কল্পনায়’ আগে আগে চলছিলাম, এখন বাস্তবেই আগে আগে চলছি! এমন তো হবেই! কেননা আমি প্রচুর শক্তি অনুভব করছিলাম। ভীষণ তৃপ্তি অনুভব করছিলাম। মনে হচ্ছিলো, যেনো আমি সারাদিন চারণভূমিতে ঘুরে ঘুরে ঘাস খেয়ে এই মাত্র ফিরেছি, হৃষ্টপুষ্ট হয়ে।

এদিকে হারিসের বৃদ্ধ উটনীটিকে চেনাই যাচ্ছিলো না। বাবা, সে কী গতি! আমাকে পেছনে ফেলে ছুটে চলেছে ঊর্দ্ধশ্বাসে, যেনো একটা তেজি ঘোড়া!

হ্যাঁ সবাইকে পেছনে ফেলে আমরা সময়ের বেশ আগেই পৌঁছে গেলাম সা'দপল্লীর তাঁবুতে— হালিমা ও হারিসের তাঁবুতে। তাঁবুতে পৌঁছে দেখি বরকতের অমিয়ধারায় সব 'সয়লাব'!
বিরান সা'দপল্লী এখন উর্বরা!
পাতাঝরা শূন্য গাছে এখন সবুজ সবুজ কিশলয়!
আর ঊষর প্রকৃতি যেনো গায়ে চড়িয়েছে সবুজের চাদর!
ঘাসহীন চারণভূমিতে লকলক করছে সবুজ ঘাসেরা!
বদলে গেছে আকাশ!
বদলে গেছে বাতাস!
বদলে গেছে মানুষ!
বদলে গেছে তাঁবু!
বদলে গেছে আশপাশের সবকিছু!
কী মজা! মুহাম্মদ আসার পর সব বদলে গেছে!
সব বদলে গেছে!
হে মুহাম্মদ!
তুমি এতিম নও শুধু, তুমি মানিক, পরশ পাথর!
তুমি সবকিছু বদলে-দেওয়া মানিক!
স্বাগতম তোমাকে হে মুহাম্মদ সা'দপল্লীতে!

কয়েকদিনেই আমরা—মেষ-দুম্বা-উটনী-গাধা— বেশ মোটাতাজা হয়ে গেলাম। আর হালিমা! তার আনন্দের কথা আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। এর আগে নিজের বাচ্চাটাকেই তিনি দুধ পান করাতে পারতেন না। আর এখন তার দুধ এতো বেড়ে গেছে যে, নিজের বাচ্চার জন্যে যথেষ্ট হয়ে শিশু মুহাম্মদের জন্যেও যথেষ্ট হয়ে আরো অনেক অনেক থেকে যায়। আল্লাহ্র কী মহিমা! হারিসও ছিলেন সীমাহীন আনন্দিত। তাঁর চোখে মুখে সব সময় লেগে থাকতো আনন্দ ও তৃপ্তির আভা, যা আগে আমি কখনো দেখিনি!

আমি ছিলাম মা হালিমার প্রিয় বাহন। তিনি কোথাও গেলে আমাকেই নিয়ে যেতেন। মুহাম্মদ আসার পর তাঁকেও সঙ্গে নিতে তিনি ভুলতেন না। শিশু মুহাম্মদকে নিয়ে তিনি মনের হরষে আমার পিঠে চড়ে বসতেন, এখানে ওখানে যেতেন। নিজের মেষপাল তদারক করতেন। মুহাম্মদকে নিয়ে যখন হালিমা আমার পিঠে বসতেন তখন আমার কী-যে ভালো লাগতো, সে কথা বলে বোঝাতে পারবো না। ভর দুপুরের তপ্ত মরুতেও তাদেরকে নিয়ে ঘুরে বেড়াতে আমার একদম খারাপ লাগতো না—কোনো কষ্ট হতো না। বরং অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করতাম, দূর আকাশের বুকে একটা মেঘখণ্ড যেনো সূর্যিমামার প্রচণ্ড দাহ থেকে আমাদেরকে বাঁচিয়ে রাখছে—ছায়া দিচ্ছে! জীবনে কতোজনকে নিয়ে মরুর বুকে আমি কতো ঘুরে বেড়িয়েছি, কিন্তু এমন মজা তো আর পাই নি! এই আশ্চর্য প্রশান্তি তো কখনো অনুভব করি নি! ভর দুপুরে অমন বাদল-ছায়ার আয়োজন তো আর চোখে পড়ে নি!

মনে আমার কতোবার প্রশ্ন জেগেছে— কে এই এতিম? কে তুমি হে মুহাম্মদ? কেনো তোমার এতো শান? কেনো তোমার এতো মান— প্রকৃতির কাছে.. মেঘের কাছে? ভবিষ্যতের কোন্ মহাপুরুষ লুকিয়ে আছে তোমার ভিতর?

এভাবেই সপ্তাহ গড়িয়ে মাস, মাস গড়িয়ে বছর তারপর বছর ঘুরে এসে গেলো আরেক বছর। তারপর আরেক বছর। মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এখন দু' বছর পেরিয়ে তৃতীয় বছরে পা রেখেছে। ইতিমধ্যেই ওর দুধ ছাড়ানো হয়েছে। এ-বয়সের শিশু আর কতোটুকুন বড়ই-বা হয়! কিন্তু মুহাম্মদ সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। দু'বছর না পেরুতেই বয়সের তুলনায় ও অনেক বেশী স্বাস্থ্যবান ও বাড়ন্ত হয়ে উঠেছে। এদিকে দু'বছর পর মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার একটা কথা ছিলো। কিন্তু মা হালিমা মনে-প্রাণে চাইছিলেন মুহাম্মদ তার কাছে আরো অনেক দিন থাক। অমন বরকত-শিশুকে কে হাতছাড়া করতে চায়? কে হারাতে চায় অমন চাঁদমুখ? তার স্নিগ্ধ ছায়া থেকে কে বঞ্চিত হতে চায়? সত্যি কথা বলতে কি, আমিও চাইছিলাম।

মুহাম্মদ আরো অনেক দিন থাকবে আমাদের মাঝে। তাকে দেখে দেখে চোখ জুড়াবো আর বয়ে বয়ে ঘুরে বেড়াবো- মন ভরবো। এখানে ওখানে, যেখানে মনে চায় সেখানে। 'সবুজ ঘাসের সজীব' দুনিয়ায়। তাঁর বরকতের বৃষ্টিতে পরিস্নাত সা'দ পল্লীর মুক্ত আঙ্গিনায়। ক্লান্তিহীন-শ্রান্তিহীন।

অমন সোনার ছেলেকে পিঠে নিতে কার-না সাধ হয়?
অমন বরকতি শিশুর স্পর্শে কে-না শিহরিত হয়?

কিন্তু আমরা চাইলেই তো হবে না! ওদিকে মা আমেনাকেও-যে চাইতে হবে! দু'চাওয়া এক হলেই কেবল আমরা পাবো মুহাম্মদকে, আরো অনেক দিন, অন্তত কিছুদিন। কিন্তু এখন তো তাঁকে এখানে সা'দপল্লীতে রাখার আর সুযোগ নেই! নিয়ে যেতে হবে, হবেই, মক্কায়। ফিরিয়ে দিতে হবে। তখন মা আমেনার মন গললে, দু'চাওয়া এক হলে আবার আসবে মুহাম্মদ সা'দপল্লীতে। নইলে এ-ই শেষ বিদায়! অশ্রু-ছলোছলো বিদায়!!

কিন্তু এটা মানতে আমার মন কোনভাবেই প্রস্তুত হচ্ছে না! (কী অবুঝ মন আমার!)

একদিন হালিমা মুহাম্মদকে নিয়ে আমার পিঠে চেপে বসলেন। রওয়ানা হলেন মক্কায়, মা আমেনার কাছে। সারাটা পথই তিনি ছিলেন বিমর্ষ। নীরব আচ্ছন্নতায় মলিন। এ-যে মুহাম্মদের আসন্ন বিরহ-কাতরতার দুঃখ-দুঃখ ছাপ-তা বুঝতে আমার একটুও কষ্ট হলো না। নিজের অজান্তেই আমার চোখের পাতা ভিজে গেলো। মা আমেনা কি রাখবেন আমাদের আবেদন? 'না' বলে দিলে শূন্য হাতে কেমনে ফিরবো আমরা? আমি কেমনে তাকাবো মা হালিমার ভেজা চোখের দিকে? কেমন করে সইবো মুহাম্মদের মহা বিরহ?

আমরা মক্কায় পৌঁছে গেলাম। ঐ তো দেখা যাচ্ছে মা আমেনার ছোট্ট ঘরটা। হালিমা মুহাম্মদকে নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলেন। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম বাইরে, মা আমেনার ঘরের পাশটি ঘেঁষে, উৎকর্ণ হয়ে।

একটু পরই শুনতে পেলাম হালিমার কণ্ঠ, ব্যাকুল কণ্ঠ! হৃদয় ছুঁয়ে-যাওয়া উদ্বেল কণ্ঠ! তিনি আমেনার কাছে আবদার করেছেন, মুহাম্মদ-স্নেহে কাঁপা-কাঁপা কণ্ঠে, মুহাম্মদকে আরো কয়েকটা দিনের জন্যে তার সাথে সা'দপল্লীতে পাঠাতে! এ-আবদারের সামনে মা আমেনা নরম হয়ে গেলেন! তার মনটা-যে নরম! তিনি 'না' বলতে পারলেন না! এমন-যে হবে তা আগেই আমার মন সাক্ষ্য দিচ্ছিলো! কিন্তু এতো সহজেই-যে হবে তা ভাবতে পারি নি! আবারও আমার চোখের পাতা ভিজে গেলো! একটু আগে আমি কেঁদেছিলাম মুহাম্মদের বিরহ-আশঙ্কায়, মা হালিমার বিমর্ষতায়। এখন কাঁদছি এক ধাত্রীর কাছে এক মহিয়সী নারীর নিজের ছেলেকে সঁপে দেওয়ার অপার মহানুভবতায়!!

মক্কা ছেড়ে আমরা তায়েফের পথ ধরলাম। হালিমার বিমর্ষতা এখন রূপ নিয়েছে হর্ষোচ্ছ্বাসে! আর আমি তো আনন্দের আতিশয্যে যেনো উড়ে উড়েই ছুটছিলাম! যে-ই আমাকে দেখছে বিশ্বাস করতে পারছে না আমি হালিমার সেই দুবলা-পাতলা গাধাটি! হারিসের সাথে দেখা হতেই তিনিও তাকালেন অবিশ্বাস্য চোখে! যেনো হারানো মানিক ফিরে এসেছে কোলে! আমার কাছে মনে হলো সমগ্র সা'দপল্লীই যেনো আবার মেতে উঠেছে আনন্দ-কলরবে— কী আনন্দ.. কী মজা! আবার এসেছে আমাদের প্রিয় মুহাম্মদ! হ্যাঁ, আবার নামলো আমাদের আকাশে বরকতের বৃষ্টি! এ বৃষ্টিতে স্নাত হচ্ছি আমরা, আমাদের প্রকৃতি! ঠিক আগের মতোই! বরং আরো বেশী করে! আরো মুষলধারে!

সবাই আমাদেরকে ঈর্ষা করতে লাগলো! আমাদের আকাশের নীচে স্নাত হতে চাইলো! সবাই অবাক বিস্ময়ে আমাদের উপর মুহাম্মদী বৃষ্টির বর্ষণ দেখতে লাগলো! আমাদের মেষপাল যেখানে, সেখানে এসে ভীড় জমায় অন্যদের মেষপাল- বরকত লাভের আশায়, স্নাত হওয়ার বাসনায়! কিন্তু কী আশ্চর্য! আল্লাহর কী লীলা!! আমরা ভিজি বৃষ্টিতে 'না চাইতেই' আর ওরা ভিজতে পারে না- শত চেয়েও! অথচ একই আকাশ, একই বাতাস! একই মাটি, একই প্রকৃতি! রহস্য কী? আল্লাহই ভালো জানেন! তবে আমার মনে হয়; আমাদের আছে মুহাম্মদ ওদের নেই মুহাম্মদ- এটাই রহস্য!!

একদিন হালিমার ছেলেটা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো, সারা মুখে লেগে আছে উৎকণ্ঠার ছাপ! এসেই চীৎকার করে বলতে লাগলো:
-মা! মা! জানো কী হয়েছে! হঠাৎ ধবধবে সাদা পোশাকের দু'টি লোক আমাদের কোরাইশী ভাইকে ধরে নিয়ে গেছে পাহাড়ের আড়ালে! হারিস উৎকণ্ঠাভরে বললেন:
-কী! কী বলছো তুমি? ধরে নিয়ে গেছে মানে! ও তো আমাদের কাছে আমানত! ওর নিরাপত্তার সকল দায়-দায়িত্ব তো আমাদের! হালিমার ছেলেটা বলে চললো:
-তারপর আমি দেখলাম, একজন ভাইয়াকে শুইয়ে দিয়ে বুক ফেঁড়ে ফেলেছে! আরেকজন বুকের ভিতরে কী যেনো খুঁজে বের করে ছুঁড়ে ফেলে দিলো!
-তারপর?!
-তারপর চলে গেলো! একটু পরই দূরে মিলিয়ে গেলো!

হালিমা ও হারিস ঊর্দ্ধশ্বাসে ছুটে গেলেন অকুস্থলে। আমি নিজে গিয়ে হাজির হলাম সেখানে। গিয়ে দেখি— কই, তেমন কিছু চোখে পড়ছে না তো! মুহাম্মদ সুশান্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে! এক টুকরো মিষ্টি হাসি লেগে আছে ওর নূরানি চেহারাজুড়ে। না, ওর কোনো সমস্যা হয় নি। সব ঠিক আছে। কিন্তু সব ঠিক থাকলেও মুহাম্মদের মুখে সব শোনার পর হারিস বেশ ঘাবড়ে গেলেন। হালিমাকে জানালেন তার ভয়ের কথা আশঙ্কার কথা এবং সিদ্ধান্ত নিলেন দ্রুতই মুহাম্মদকে মক্কায় মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে আসবেন।

মুহাম্মদ আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। কিন্তু যে-বরকত তিনি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন তা আমাদেরকে ছেড়ে গেলো না। আমাদের জন্যে রেখে গেছেন তিনি বৃষ্টি। রেখে গেছেন সবুজে ছাওয়া দৃষ্টিকাড়া প্রকৃতি। খুলে দিয়ে গেছেন জীবন-জীবিকার অবারিত দিগন্ত। আমাদেরকে তিনি আরো দিয়ে গেছেন সুখ-শান্তি-সৌভাগ্য, যা দিনে দিনে আরো অনেক বেড়ে গিয়েছিলো। পরবর্তীতে অবশ্য আমরা জানতে পারি যে, ঐ লোক দু'জন আসলে ছিলেন আসমানী ফেরেশতা। এসেছিলেন মুহাম্মদের হৃদয়টাকে ধুয়ে মুছে পরিচ্ছন্ন করে দিয়ে যেতে। আগামী দিনের মহা গুরুভার বহনে তাঁকে প্রস্তুত করে তুলতে। এ-সব জানার পর আমার সৌভাগ্যের অনুভূতি আমার ভিতরে কলরব করে উঠলো—
আহা! এমন মুহাম্মদকেই আমরা পেয়েছিলাম এতো কাছে, এতো আপন করে! তাঁকে পিঠে নিয়ে আমি ঘুরতে পেরেছি, সা'দপল্লীর বাঁকে বাঁকে, পাহাড়ের উপত্যকায় উপত্যকায়! ধন্য আমার বাহন-জীবন!!

📘 গল্পে আঁকা সীরাত হে মুহাম্মদ > 📄 আমি কালো পাথর বলছি

📄 আমি কালো পাথর বলছি


আমি পাথর। কিন্তু অন্যসব পাথরের মতো নই। যে-সব পাথর দিয়ে তোমরা ঘর বানাও, মাদ্রাসা নির্মাণ করো কিংবা কারখানা তৈরী করো, তেমন পাথর নই আমি। আমি অনেক দামী পাথর। পৃথিবীতে যতো দামী পাথর আছে বা থাকতে পারে, তার চেয়েও আমি দামী। হীরে-মোতি-পান্না'র চেয়েও অনে-ক দামী। পাথর হলেও আমি আমিই। জুড়িহীন। সঙ্গিহীন। তুলনাহীন, আমার কোনো তুলনা নেই। আমার তুলনা শুধুই আমি।

আমার ইতিহাস জানতে চাও? আমি যেমন পুরোনো তেমনি মহিমান্বিত। আমি যেখানে অবস্থান করছি, তাও চির মহিমান্বিত। অর্থাৎ পৃথিবীর প্রথম ঘর—কা'বা—এর একটা কোণে আমাকে স্থাপন করা হয়েছে, যা নির্মাণ করেছিলেন হযরত ইবরাহীম এবং তাঁর ছেলে হযরত ইসমাঈল। এবার চিনতে পেরেছো আমায়? হ্যাঁ, আমি হাজরে আসওয়াদ—কালো পাথর! আরেকটা বড় পরিচয় বলে দিচ্ছি তোমার কানে কানে, আমি জান্নাত থেকে এসেছি!

এবার আমার গল্প শোনো—

একবার আকস্মিক বন্যায় কা'বাঘর ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হলো। নতুন করে তা সংস্কারের প্রয়োজন দেখা দিলো। আর মক্কাবাসীরা সে সংস্কার-কর্ম সম্পাদনও করলো, সব গোত্র মিলে। কিন্তু শেষে তারা আমাকে আমার নির্দ্ধারিত জায়গায় স্থাপন করতে যেয়ে মতবিরোধে জড়িয়ে পড়লো। এ-মতবিরোধ গড়াতে গড়াতে একেবারে 'যুদ্ধ-উত্তেজনায়' রূপ নিলো। এক গোত্র বললো:
-এ কাজ আমরা করবো! আরেক গোত্রের দাবি:
-না, এ-কাজ আমাদের, আমরা করবো! আরেক গোত্রের হুঙ্কার:
-অসম্ভব! এ-কাজ শুধু আমাদের, আমরাই করবো! কেউ বাধা দিতে এলে আমরা হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকবো না!

এভাবে আওয়াজ বাড়তে লাগলো। উত্তেজনা উত্তাপ ছড়াতে লাগলো। সবাই উচ্চকণ্ঠ হতে লাগলো। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলো। সব গোত্র তীর-তৃণীর আর ঢাল-তলোয়ার নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলো! যুদ্ধটা বুঝি বেধেই যায়! কোনো শান্তিপূর্ণ সমাধান মনে হচ্ছে অনে-ক দূরে, কিংবা অসম্ভব।

আমি ভীষণ অসহায় বোধ করতে লাগলাম। কারণ, কারণটা-যে আমিই! যুদ্ধ যদি বেধেই যায়, রক্ত যদি বয়েই যায়, তাহলে আমি-যে লজ্জায়-আফসোসে একেবারে এতোটুকু হয়ে যাবো! পরিস্থিতি যতোই যুদ্ধের দিকে মোড় নিচ্ছে আমার অস্থিরতা ততোই বাড়ছে। কী করবো এখন আমি? পাথর হয়ে কী-করে মানুষকে শান্তির পথে আনবো? হঠাৎ মনে হলো, দু’আ তো করতে পারি! আমার রবের কাছে মিনতি তো জানাতে পারি! তিনি আমার তাসবীহ শোনেন, তাহলে তো দু’আও শুনবেন! অবশ্যই শুনবেন!

শুরু করলাম দু’আ— ‘আমার আল্লাহ! ওদেরকে সুমতি দাও! ফেরাও ওদেরকে এ অকারণ যুদ্ধ থেকে! ওদেরকে এক করে দাও! ওদেরকে নেক করে দাও! ওদের মাঝে ঐক্য এনে দাও! আমার মালিক! ওরা-যে সবাই এখন কা’বার আঙ্গিনায়! মসজিদুল হারামে! নিরাপত্তা ও শান্তির জায়গায়! এখানে যে আসে সেই-না নিরাপদ! তবে কেনো এই যুদ্ধ-যুদ্ধ ডঙ্কা? কেনো এই বেসামাল উত্তেজনা? আল্লাহ, আমার আল্লাহ! রহম করো! দয়া করো!…’

হঠাৎ কানে এলো, একটি বুদ্ধিদীপ্ত গম্ভীর কণ্ঠ— 'হে সম্প্রদায়! হে উন্মত্ত জনতা! এ কী উন্মাদনা? জানো কি, কী এর পরিণতি? জানো, কোথায় গিয়ে ঠেকবে, এ-উত্তেজনার জের? এই 'হারামে' দাঁড়িয়ে তোমরা লড়াই করতে চাও? তোমরা কি বিবেকের মাথা খেয়েছো! সাবধান! ক্ষান্ত হও! সংযত হও! বিবেককে জাগ্রত করো! যুক্তির কাছে ফিরে এসো! শয়তানকে বিতাড়িত করো! মিমাংসায় আসো! আসতেই হবে!!'

তার কথায় বেশ কাজ হলো। উত্তেজনা হ্রাস পেলো। একজন বললো: -বলুন তবে, আমাদের কী করতে হবে! তিনি একটু ভেবে নিয়ে বললেন:
-আমার প্রস্তাব হলো, যে ব্যক্তি আমাদের নিকট এই 'সাফা প্রবেশদ্বার' দিয়ে প্রথম প্রবেশ করবে, তাকেই আমরা মিমাংসাকারী হিসাবে মেনে নেবো। তার কথাই হবে আমাদের কথা। তার মতই হবে আমাদের মত। আমরা মনে করবো, আল্লাহ-ই তাকে পাঠিয়েছেন!'

সবাই তার প্রস্তাব পছন্দ করলো। মুহূর্তেই উত্তেজনা দূর হয়ে গেলো। সবাই শান্ত হলো। আমার অস্থিরতাও দূর হলো। এই ভেবে মনটা প্রশান্তিতে ভরে গেলো যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার দু'আ কবুল করেছেন!

এবার অপেক্ষার পালা। সবাই অপলক চোখে ‘সাফা প্রবেশদ্বার’-এর দিকে তাকিয়ে রইলো। এই বুঝি আসছে কেউ! চলতে লাগলো অপেক্ষা। গড়াতে লাগলো প্রতীক্ষার অধীর প্রহর। সবাই মনে প্রাণে চাইছিলো, আগমনকারী যেনো হয় সুবিচারক ও সুবিবেচক এবং বিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ। যাতে সবাই মেনে নিতে পারে তার বিজ্ঞোচিত প্রাজ্ঞোচিত ফায়সালা। আমিও সবার সাথে উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম।

সময় সামান্যই গড়িয়েছে। কিন্তু মনে হচ্ছিলো, কতো কাল বুঝি পেরিয়ে গেছে! অপেক্ষার সময় এমন দীর্ঘই মনে হয়। হঠাৎ একজন হর্ষধ্বনি করে উঠলো: -ঐ যে, কে যেনো আসছে!

সবাই তাকালো উদয়ের পথে। আমিও তাকালাম। এক যুবক এগিয়ে আসছে। কাছে, আরো কাছে। এবার সবাই তাকে চিনলো। আমিও। সবাই আনন্দ-উত্তেজনায় চিৎকার করে উঠলো: -আরে, এ-যে আমাদের প্রিয় আল-আমীন! মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ!’

সবার অলক্ষ্যে আমি আনন্দ-বিগলিত কণ্ঠে বলে উঠলাম- আল-হামদুলিল্লাহ! শোকর তোমার হে আল্লাহ!

এবার কথা বললেন সেই বুদ্ধিমান প্রবীণ ব্যক্তিটি: -এখন বলো, তোমরা কি আল-আমীনের ফায়সালা মেনে নেবে? সবাই এক বাক্যে উত্তর দিলো: -অবশ্যই, আমরা সবাই রাজি! আল-আমীন যা বলবে তাই হবে!

মুহাম্মদ আসতেই তিনি বললেন: -মুহাম্মদ! আমরা সবাই মিলে কা’বার পুনঃনির্মাণ কাজ শেষ করেছি। সব গোত্রই পাহাড় থেকে পাথর এনেছে। এ কাজে অংশ নিয়েছে। এখন বাকী আছে শুধু হাজরে আসওয়াদ প্রতিস্থাপন করা (জায়গা মতো রেখে দেওয়া)। এখানেই গোল বেধেছে। এখানে এসেই আমরা মারাত্মক বিরোধে জড়িয়ে পড়েছি। সব গোত্রই একসঙ্গে হাজরে আসওয়াদ প্রতিস্থাপনের সম্মান লাভ করতে যাচ্ছে, যা কিছুতেই সম্ভব না। এখন বলো, আমরা কী করবো? আমরা সবাই মিলে তোমাকেই ফায়সালার দায়িত্ব দিলাম!

মুহাম্মদ আমার দিকে তাকালেন। তারপর বিবদমান গোত্রগুলোর দিকে তাকালেন। নীরবে কিছুক্ষণ ভাবলেন। তারপর একটি চাদর আনালেন। তারপর নিজ হাতে আমাকে চাদরে রাখলেন। তারপর গোত্রপতিদেরকে বললেন: -আসুন! কাপড়ের প্রান্ত ধরে আমার সাথে চলুন!

তাই হলো! এভাবেই আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো। সবাই আমাকে বয়ে নিয়ে যাওয়ার সম্মান লাভ করলো, কোনো গোত্রই বাদ পড়লো না। কাপড়টি নির্দিষ্ট জায়গায় রাখার পর এবার আল-আমীন নিজেই আমাকে আমার জায়গায় স্থাপন করলেন—বসিয়ে দিলেন!

আল-আমীনের বুদ্ধিদীপ্ত অথচ সাদাসিধে ফায়সালায় সবাই সীমাহীন মুগ্ধ হলো! আমি নিজেও ভীষণ অবাক হলাম! এমন বুদ্ধি অন্য কারো মাথায় কেনো খেললো না? অথচ এখানে হাজির বাঘা বাঘা সব গোত্রপতি! তবে কি আল-আমীন সবার সেরা— বুদ্ধিতে যুক্তিতে প্রজ্ঞায় বিচক্ষণতায়?!

হ্যাঁ, এভাবেই আল-আমীনের বুদ্ধিদীপ্ত ফায়সালায় একটি নিশ্চিত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ থেকে সবাই রক্ষা পেলো। দূর হয়ে গেলো নিজেদের মধ্যকার বিবাদ-বিসংবাদ ও হিংসা-হানাহানি। বরং তার বদলে জায়গা করে নিলো— 'সবাই মিলে করি কাজ'-এর অনাবিলতা ও স্বচ্ছতা। কী সুন্দর ফায়সালা! কেউ বঞ্চিতও হলো না আবার কেউ এককভাবে শ্রেষ্ঠত্বও কেড়ে নিতে পারলো না। আমাকে যথাস্থানে বয়ে নিয়ে যাওয়ার এ-সম্মানে সবাই হয়ে গেলো সমান ভাগীদার।

বন্ধু! এখনো আমি আছি কা'বায়—আমার নির্দিষ্ট জায়গাটায়। আমাকে দেখতে পাবে তুমি কা'বার আঙ্গিনায় এলেই, মক্কার মানুষের মতো। অসংখ্য হজ্ব ও উমরাপালনকারীর মতো। না, কোনো বাধা নেই। চলে আসতে পারো একেবারে আমার কাছে। এঁকে দিতে পারো আমার গায়ে ভালোবাসার উষ্ণ চুমু-চিহ্ন! আর শোনো! ওখানে দাঁড়িয়ে অবশ্যই মনে করবে প্রিয় আল-আমীনের সেই মহা ফায়সালার ঘটনাটি। তাঁর প্রতিভাদীপ্ত বিচক্ষণতালব্ধ বিজ্ঞোচিত ফায়সালার ঘটনাটি। তারপর আল-আমীনের ভালোবাসায় আরেকটি চুমু এঁকে দিয়ো আমার কালো গায়ে! কী সৌভাগ্য হবে তোমার, যদি তোমার চুমুটিও ঠিক সেখানেই এঁকে দিতে পারো, যেখানে এঁকে দিয়েছিলো আল-আমীনের পবিত্র ঠোঁট! তাই যেনো হয়! বারবার যেনো হয়!!

📘 গল্পে আঁকা সীরাত হে মুহাম্মদ > 📄 একটি রাতের আত্মকাহিনী

📄 একটি রাতের আত্মকাহিনী


সূর্য ডুবেছে অনেকক্ষণ। চারদিকে শুধু অন্ধকার। আকাশে বসেছে মিটিমিটি তারার মেলা। না, আকাশে তখন চাঁদ ছিলো না। কারণ আমি ছিলাম 'চাঁদ মাস-রমজানের' শেষ সপ্তাহের একটি রাত। আজও মক্কা ও আরব উপদ্বীপের মানুষ আমাকে স্বাগত জানিয়েছে গতানুগতিকভাবে-অন্যান্য রাতের মতোই। কেউ জেগে আছে, গল্প করে, হৈ হুল্লোড় করে সময় পার করছে। কেউ-বা আবার নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে। থাক সে কথা; এখন আমার পরিচয়টা আরেকটু পরিস্কার করে বলি-

আমি একটি রাত—মহিমান্বিত রাত। আমার জন্মলগ্ন থেকেই দুনিয়া আমার অপেক্ষায় বসে ছিলো। আমি তো আর যেই-সেই রাত নই! আমার ফযিলত ও মর্যাদা এবং শান ও মাহাত্ম্য সম্পূর্ণ আলাদা। আমার মধ্যে লুকিয়ে আছে শুধু নূর আর নূর-আলো আর আলো। এ নূর বা আলো মোটেই সূর্য থেকে পাওয়া নয়, চাঁদের আলোর মতোও নয়। না, কোনো 'কৃত্রিম' আলোর ফুলঝুরিও নয়। এ নূর ও আলো সম্পূর্ণ অন্য জিনিস। এ নূর হলো আল্লাহ্র নূর, যা পৃথিবী বলো আর আকাশ বলো সবকিছুকে আলোকময় করে তোলে। হ্যাঁ, এ নূরের বরকতেই আমি হয়ে গেছি হাজার মাসের চেয়েও উত্তম! তিন হাজার দিনের চেয়েও সেরা। ছয় সহস্র দিবা-রাত্রির চেয়েও শ্রেষ্ঠ। তিরাশি বছরের চেয়েও উত্তম!

এখন চিনতে পারছো? আমি লাইলাতুল কদর—মহিমান্বিত রজনী!!

আমার জন্ম রমজান মাসে। ৬১০ খৃষ্টাব্দে। অর্থাৎ হিজরী সন আরাম্ভ হওয়ার ১৩ বছর পূর্বে। যেদিন আল-আমীন নবী হয়েছেন— তাঁর উপর প্রথম ওহী নাযিল হয়েছে, সেদিনই আমার জন্ম। এখন মনে হয় আমাকে চিনতে পেরেছো!

আরো বিস্তারিত বলছি—

মক্কার অদূরে একটা গুহা আছে—গারে হেরা। মুহাম্মদ প্রায়ই ওখানে ছুটে যেতেন। তিনি একটা লম্বা সময় সেখানে অবস্থান করতেন। লা-শরীক আল্লাহ্র দরবারে মুনাজাত করতেন। ইবাদত-সাধনায় ডুবে থাকতেন। কিন্তু অপরদিকে সারা মক্কা তখন ডুবে ছিলো বুত-সাধনায়—মূর্তিপূজায়।

আমার যখন জন্ম তখন মুহাম্মদের বয়স চল্লিশ হয়ে গেছে। এই গারে হেরাতেই সেদিন তিনি ইবাদতে মগ্ন। তাহাজ্জুদে সমাহিত (গভীর মনোযোগী, নিমগ্ন)। অশ্রুময় মুনাজাতে সমর্পিত। তিনি দু'হাত তুলে ডাকছিলেন আল্লাহকে যে-ভাষায়, তার ভাব যেনো এই—
‘হে পৃথিবীর মালিক! হে আকাশের রব! তুমিই তো সৃষ্টি করেছো চাঁদ-সুরুজ! তারায় ভরা ঐ রাতের আকাশ! এই পাহাড়-পর্বতও তোমারই সৃষ্টি! সবকিছুই তোমার সৃষ্টি! আমিও তোমার সৃষ্টি! তুমি আমারও স্রষ্টা! হে আমার রব! আমি তোমাকে চাই, শুধুই তোমাকে!’

হ্যাঁ, যখন চলছিলো এই গভীর মুনাজাত ও সকাতর দু'আ তখনই নূরে নূরে ভরে গেলো কুল মাখলুকাত। আলোয় আলোয় ছেয়ে গেলো সৃষ্টিলোক। আকাশে আলো। জমিনে আলো। সবখানে আলো। এই হেরা গুহায় সবচে' বেশী আলো। তখন আসমানের এক ফেরেশতা নেমে এলেন। তিনি ফেরেশতাকুল সরদার-হযরত জিবরীল। সাথে নিয়ে এলেন সবচে' সুন্দর, সবচে' শ্রেষ্ঠ, সবচে' মহান কিছু কথা, যা এই প্রথম শুনলো দুনিয়া! তিনি মুহাম্মদকে বললেন: -পড়ুন!

উত্তরে মুহাম্মদ বললেন: -আমি পড়তে জানি না!
তখন হযরত জিবরীল মুহাম্মদের কাছে এলেন। তাঁকে বুকে চেপে ধরলেন। একবার। দুইবার। তিনবার। প্রতিবারই বলছিলেন: -পড়ুন!
মুহাম্মদও প্রতিবার উত্তরে বলছিলেন: -আমি তো পড়তে জানি না!

অবশেষে হযরত জিবরীল তিলাওয়াত করলেন-
اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ خَلَقَ الإِنسَانَ مِنْ عَلَقٍ اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ. عَلَّمَ الإِنسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ .
‘পড়ো তোমার রব-এর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাটবাধা রক্ত থেকে। পড়ো। তোমার রব বড়ো দয়ালু। যিনি মানুষকে জ্ঞান দান করেছেন কলমের সাহায্যে। মানুষকে জানিয়েছেন সে কথা যা সে জানতো না।’ -সূরা আলাক

এবার মুহাম্মদও হযরত জিবরীলের সাথে সেই বাণী আওড়াতে লাগলেন। এরপর জিবরীল চলে গেলেন। মুহাম্মদ ভীষণ ভয় পেয়ে গেলেন। তাড়াতাড়ি বাড়ি ছুটে গেলেন। খাদিজার কাছে ফিরে গেলেন। ভয়ে কাঁপছিলেন তিনি। কপাল থেকে টপটপ বেয়ে পড়ছিলো ফোঁটা ফোঁটা ঘাম। হযরত খাদিজা তাঁকে বিছানায় শুইয়ে দিলেন। চাদর দিয়ে ঢেকে দিলেন। উদ্বেগভরে শিয়রে বসে রইলেন। ধীরে ধীরে মুহাম্মদ যখন শান্ত হলেন তখন খাদিজাকে একে একে সব খুলে বললেন। তাঁকে বললেন, কেমন করে হেরা গুহা আলোকোদ্ভাসিত হয়ে উঠলো, অথচ গুহাটা ছিলো অন্ধকার। কেমন করে জিবরীল তাঁর কাছে এসে তাঁকে পড়তে বললেন। তারপর তিনি তাঁকে একে একে তিনবার আলিঙ্গন করার—বুকে চাপ দেয়ার কথা জানালেন। আরো জানালেন, প্রথমে তিনি কী বলেছেন এবং জিবরীল কী করেছেন। আর সব শেষে কেমন করে জিবরীলের সাথে সাথে সেই বাণী তিনি আওড়েছেন! এরপর মুহাম্মদ সেই বাণী হযরত খাদিজাকেও একবার পড়ে শোনালেন।

হযরত খাদিজা মুহাম্মদকে সান্ত্বনা দিলেন। বললেন: -ভয়ের কিছু দেখছি না! আল্লাহই আপনার সহায়। আপনি অনেক ভালো মানুষ। অনেক দয়ালু মানুষ। পরিবারকে কতো ভালোবাসেন আপনি। জীবনে কখনো মিথ্যা বলেন নি। সবাইকে সহযোগিতা করেন। সবার হক আদায় করেন। আপনি তো মহান চরিত্রের অধিকারী। সত্যবাদী। বিশ্বস্ত। কেউ আপনার ক্ষতি করতে পারে না। কোনো দুশ্চিন্তা করবেন না।

খাদিজা নিজে যা বলার তা তো বললেন। যেভাবে পারলেন সেভাবে বললেন। অনেক সান্ত্বনা দিলেন। এবার নিজে আরো আশ্বস্ত হওয়ার জন্যে এবং প্রিয় আল-আমীনকে আরো ভয়মুক্ত করার জন্যে তাঁকে নিয়ে তিনি ছুটে গেলেন চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবনে নওফলের কাছে। তিনি ছিলেন ভীষণ জ্ঞানী ও প্রাজ্ঞ মানুষ। আসমানী কিতাব—তাওরাত-ইঞ্জিল তার বেশ পড়া ছিলো। ধর্ম বিষয়ে একজন সুপণ্ডিত ছিলেন তিনি। এ জন্যে মূর্তিপূজা ছিলো তাঁর ভীষণ অপছন্দ। ওয়ারাকা ইবনে নওফল মুহাম্মদের কাছে হেরা গুহায় ঘটে-যাওয়া সবকিছু শুনলেন, উৎকর্ণ হয়ে, তন্ময়চিত্তে। আর ধীরে ধীরে তাঁর মুখে ফুটে উঠতে লাগলো কী যেনো এক প্রাপ্তির হাসি! অদ্ভুত এক তৃপ্তির হাসি! সুন্দর এক মধুর হাসি! অজানা এক দিগন্তের উদ্ভাস! অজানা বলছি কেনো? জানাই তো! তাই তো মুহাম্মদের পক্ষ থেকে শোনা যখন শেষ তাঁর পক্ষ থেকে সুসংবাদ তখন শুরু! এবং এভাবে—
‘ভাতিজা! সুসংবাদ! তোমার উপর আসমানী ওহী নাযিল হয়েছে! তুমি নবী হয়ে গেছো! এ-উম্মতের নবী! আরবের নবী! আজমের নবী! সারা পৃথিবীর নবী! তুমি এখন মূসা আলাইহিস সালাম ও ঈসা আলাইহিস সালামের মতো! তোমাকে আল্লাহ নবী বানিয়েছেন মানুষকে হিদায়াতের রাস্তা বলে দিতে! কল্যাণের ভালোবাসার ও রহমতের সবক শেখাতে! প্রথম দিকে মানুষ বিশ্বাস করতে চাইবে না তোমাকে! এমনকি তোমাকে তোমার দেশ-এ-মক্কা থেকেও ওরা বের করে দেবে! কিন্তু শেষ পর্যন্ত তুমিই বিজয়ী হবে। তোমার ধর্মই বিজয়ী হবে। তোমাকে ধর্মের পথে অনেক যুদ্ধও করতে হবে। হায়! আমি যদি বেঁচে থাকতাম, তোমাকে অনেক সাহায্য করতাম!’

মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবার আরো শান্ত হলেন। আরো আশ্বস্ত হলেন। ওয়ারাকা ইবনে নওফলের কথা তাঁর ভীষণ ভালো লাগলো। যে-ওহীর আগমনে তিনি প্রথমে ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন এখন সে-ওহী যেনো আবার আসে, বারবার আসে এবং আমার মতো রাত্রি যেনো আরো আসে, সে জন্যে তাঁর মন ব্যাকুল হয়ে উঠলো। প্রায়ই তিনি ছুটে যেতেন উঁচু পাহাড়ে এবং গুহায়- সেই ওহীর আশায়, সেই ওহীর ব্যাকুলতায়। কিন্তু দ্বিতীয়বার ওহী আসতে দেরী হচ্ছিলো। সে জন্যে তাঁর উদ্বেগের কোনো কূল রইলো না। দুশ্চিন্তার কোনো সীমা রইলো না।

না, বেশী দিন অপেক্ষা করতে হয় নি। আবার এলো তাঁর কাছে ওহী। আবার এলো আসমানী দূত হযরত জিবরীল। এবারও ঠিক আগের মতোই তাঁর সারা গায়ে কম্পন সৃষ্টি হলো। তিনি দরদর করে ঘামতে লাগলেন। তিনি খাদিজাকে বললেন: -খাদিজা! আমাকে কম্বল দিয়ে ঢেকে দাও! তাড়াতাড়ি ঢেকে দাও!
খাদিজা তাঁকে ঢেকে দিলেন। রাসূল শুয়ে আছেন। খাদিজা পাশে বসে আছেন। ঠিক তখনই ভেসে এলো আসমানী দূতের কণ্ঠে এই আয়াতগুলো, যা শুধু তিনিই শুনতে পাচ্ছিলেন-
يَا أَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ. قُمْ فَأَنذِرْ وَرَبَّكَ فَكَبِّرْ وَثِيَابَكَ فَطَهِّرْ. وَالرُّجْزَ فَاهْجُرْ. وَلَا تَمْنُنْ تَسْتَكْثِرُ. وَلِرَبِّكَ فَاصْبِرْ .
‘হে চাদর আবৃত! উঠে পড়ুন এবং (মানুষকে) সতর্ক করুন। আপন প্রতিপালকের মাহাত্ম্য ঘোষণা করুন। নিজের পরিধেয় বস্ত্র পবিত্র করুন। গোনাহ থেকে বেঁচে থাকুন। বেশি পাওয়ার জন্যে কাউকে কিছু দেবেন না। আপন প্রতিপালকের (সন্তুষ্টির) জন্যে সবর করুন।’ -সূরা মুদ্দাসসির

এরপর ওহী নাযিল হচ্ছিলো একের পর এক। আয়াতের পর আয়াত। সবশেষে নাযিল হলো এই আয়াত—
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا .
‘আজ আমি তোমাদের জন্যে পরিপূর্ণ করে দিলাম তোমাদের দীন। আর পরিপূর্ণ করে দিলাম তোমাদের জন্যে আমার নেয়ামতসমূহ এবং দীন হিসাবে আমি তোমাদের জন্যে মনোনীত করলাম একমাত্র ইসলামকেই।’ -সূরা মায়েদা

সারা জীবন আমি -কদরের রাত- গর্ব করে বেড়াবো। কেননা ওহী নাযিলের সূচনা-রাত্রি ছিলাম আমি। আমার একান্ত নিজস্ব প্রহরে আকাশ থেকে নেমেছিলো কুরআন। অনাগত দিনে কতো মানুষের কণ্ঠে উচ্চারিত হবে এ-প্রশ্ন- কুরআন কখন নাযিল হতে শুরু করেছে? উত্তর একটাই, লাইলাতুল কদর—কদরের রাতে। মহিমান্বিত রজনীতে। আল্লাহ আমাকে কতো সম্মান দিয়েছেন! তিনি কুরআনে আমার আলোচনা করে আমার শান ও মর্যাদাকে কতো বাড়িয়ে দিয়েছেন! আমাকে 'এক বরকতময় রজনী' বলে ঘোষণা দিয়েছেন। এ কারণেই মুসলিম উম্মাহ সারা বছর আমার জন্যে অধীর অপেক্ষায় বসে থাকে। রমজানের শেষ দশকে খুঁজে বেড়ায় আমাকে, বেলায় অবেলায়। খুঁজবেই তো! তারা-যে জানে যখন আমি আসি, নূরের পসার নিয়ে আসি! আমার প্রতিটি মুহূর্ত ও প্রহর নূরে নূরে ছাওয়া। বরকতে বরকতে ঘেরা। এ-সব প্রহরে করা হয় যতো দু'আ, স-ব কবুল করেন আমার মাওলা! এই দেখো, কী সুন্দর করে বলেছেন আমার কথা আমার আল্লাহ-
إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ مُبَارَكَة.
‘নিশ্চয়ই আমি তা (কুরআন) নাযিল করেছি এক বরকতময় রজনীতে।’ -সূরা দুখান

শুধু একটি আয়াতের কথা বলছি কেনো? আমার মালিক তো আমাকে নিয়ে পূর্ণ একটি সূরাই নাযিল করেছেন! সূরাতুল কদর। কী সৌভাগ্য আমার! পড়ো-না একটু সূরাটি!
إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ. وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ. تَنَزَّلُ الْمَلائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ مِنْ كُلِّ أَمْرٍ. سَلَامٌ هي حَتَّى مَطْلَعِ الْفَجْرِ.
‘আমি তো কুরআন নাযিল করেছি কদরের রাতে। জানো কি, কদরের রাত কী? কদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও সেরা! সে রাতে ফেরেশতারা এবং জিবরীল নেমে আসেন, তাদের রব-এর নির্দেশে— সমস্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে। কদরের রাত, সে তো শান্তি আর নিরাপত্তা— একেবারে ভোরের আলোক রেখা ফুটা পর্যন্ত।’ -সূরা কদর

📘 গল্পে আঁকা সীরাত হে মুহাম্মদ > 📄 আমি এক থোকা আঙুর

📄 আমি এক থোকা আঙুর


আমি এক থোকা আঙুর। ঝুলে আছি বাগানের লতানো শাখায়, তায়েফ নগরীতে। এ-বাগানটা উতবা বিন রবী'আ এবং তার ভাই শায়বা বিন রবী'আর। ওরা মালিক হলেও বাগানের সার্বক্ষণিক দেখাশোনায় নিয়োজিত ছিলো 'আদ্দাস' নামের এক মালী। বড়ো ভালো মানুষ তিনি। তার নিরলস যত্নেই বাগানটা প্রাণময়, সজীব। আঙুরের লতাগুল্ম কী সুন্দর লকলকিয়ে বেড়ে উঠেছে। ছড়িয়ে পড়েছে মাচানময়। এই লতায়িত মাচানের নিচে ঝুলে ঝুলে আমি একটা স্বপ্ন দেখে চলেছি। বলবো তোমাকে মধুর সে স্বপ্নের কথা! অমন স্বপ্নের কথা বলতেও তো মধু-মধু লাগে! শোনোই তাহলে-

আমার স্বপ্নটা হলো, প্রিয় মুহাম্মদকে একটিবার দেখা। চোখভরে.. মনভরে। এ-মুহূর্তে আমি ভীষণ খুশি। ভীষণ উত্তেজিত। হর্ষোচ্ছ্বাসে প্লাবিত। মনের হরষে (আনন্দে) আমার লতাগুল্মরা কাঁপছে। কারণ জানতে চাও! কারণ হলো আমার স্বপ্নটা একেবারেই আমার 'হাতের' কাছে! অর্থাৎ?! অর্থাৎ আমি জানতে পেরেছি প্রিয় মুহাম্মদ এখন তায়েফে! আহা! আমি যদি তাঁর কাছে চলে যেতে পারতাম উড়ে উড়ে কিংবা ভেসে ভেসে! কিংবা অন্যভাবে! কিন্তু সে তো আর হবার নয়! তাহলে আমার স্বপ্ন? সে কি বাস্তবায়িত হবে না? আমার 'টসটসে' বিশ্বাস; বাস্তবায়িত হবে, হবেই! অমন মধু-স্বপ্ন দেখার তাওফিক যখন হয়েছে, বাস্তবায়নের মুখ দেখার ভাগ্যও হবে!

এবার এসো খোঁজ নিই, প্রিয় নবী কেনো এলেন তায়েফে— তিনি এসেছেন তায়েফের বনু সাক্বীফ গোত্রকে ইসলামের দাওয়াত দিতে। তাঁর তায়েফ সফরটা হয়েছে বেশ গোপনে—সবার অলক্ষ্যে। তাঁর মনের আশা, বনু সাক্বীফ তাঁকে হতাশ করবে না, কুরাইশ যা করেছে তারা তা করবে না। বরং তারা তাঁকে গ্রহণ করবে। তাঁর দাওয়াত কবুল করবে। তাঁর ডাকে সাড়া দেবে। কেননা এরা কোরাইশ গোত্রের চেয়ে কম জাত্যাভিমানী (বংশ ও কুল নিয়ে গর্ব করে যারা) এবং ওদের তুলনায় এদের বুদ্ধিশুদ্ধিও একটু বেশী।

আমার জন্মের পর যখন আমি ছোট্ট একটা লতে ফুটফুট কলির মতো—ছোট ছোট কাঁচা আঙুর, সেই থেকেই আমি শুনে আসছি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা, আমার ছায়ায়-বসা মানুষের মুখে মুখে। আমি জানতে পেরেছি, তাঁর প্রতি সর্বপ্রথম ঈমান এনেছেন- পুরুষদের ভিতরে হযরত আবু বকর, মহিলাদের ভিতরে হযরত খাদিজা, কৃতদাসদের মধ্যে হযরত যায়দ ইবনে হারিসা, বালকদের মধ্যে হযরত আলী।

আমি আরো জানতে পেরেছি, যারা তাঁর প্রতি ঈমান এনেছেন তাদের সংখ্যা বেশী না-খুব অল্প। অধিকাংশ কোরাইশই ঈমান আনে নি। এরা বরং প্রকাশ্য দাওয়াত শুরু হওয়ার পর প্রচণ্ডভাবে বাধা দিতে লাগলো। সেই সঙ্গে ঠাট্টা-বিদ্রূপ তো আছেই। কিন্তু ইসলামের দাওয়াত বন্ধ হলো না। শত বাধা ও বিদ্রূপের ঝড় উপেক্ষা করে আরো জোরেশোরে দাওয়াতের কাজ চলতে লাগলো। ফলে কোরাইশ কৌশল বদল করলো। মুহাম্মদকে লোভের জালে আটকানোর চেষ্টা করলো। ওরা তাঁকে সম্পদ ও রাজত্বের লোভ দেখালো। কিন্তু বড়ো ভুল করলো ওরা। ওরা কি জানে না, মুহাম্মদ কখনোই লোভ-কাতর ছিলেন না? আমার নিচে-বসা এক লোকের মুখে শুনেছি, তারা নাকি আবু তালিবের কাছে দূত পাঠিয়ে জানিয়েছে মুহাম্মদ যা চাইবে আমরা তাই দেবো। বিনিময়ে মুহাম্মদকে এ-নতুন ধর্ম ছাড়তে হবে! আমাদের উপাস্যদের সমালোচনা বন্ধ করতে হবে!

আবু তালিব মুহাম্মদ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ-কথা জানানোর পর তিনি পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিলেন-
-চাচাজান! ওরা যদি আমার ডান হাতে আকাশ থেকে সূর্যটাকে এনেও রেখে দেয় আর বাম হাতে নামিয়ে আনে চন্দ্রটাকে, আর বিনিময়ে আমাকে ইসলামের দাওয়াত ছেড়ে দিতে বলে, তবুও আমি তা ছাড়বো না, মুহূর্তের জন্যেও না। যতোদিন না আল্লাহ এই দাওয়াতকে বিজয়ী করবেন অথবা আমি নিজেই এই দাওয়াতের পথে শহীদ হয়ে যাবো!

আমার মনিব (আঙুর বাগানের মালিক) উতবার মুখে আমি শুনেছি, একবার কোরাইশ গোত্র তাকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে প্রতিনিধি হিসাবে পাঠিয়েছিলো কিছু আকর্ষণীয় প্রস্তাব দিয়ে। মনিব তখন সে-সব প্রস্তাব নিয়ে তাঁর কাছে গেলেন। গিয়ে তাঁকে বললেন:
-মুহাম্মদ! তুমি আসলে কী চাও, একটু বলবে? সম্পদ চাইলে কোরাইশ গোত্র তোমার পায়ের কাছে দিরহাম-দীনার ঢেলে দেবে, তুমিই হয়ে যাবে মক্কার সেরা ধনী! আর যদি বলো তোমার সম্মান চাই, তারা তোমাকে সম্মানিত নেতা হিসাবে বরণ করে নিতে এক পায়ে খাড়া! আর যদি রাজত্ব তোমার উদ্দেশ্য হয়, তাহলে তারা তোমাকে রাজাও বানাবে! এ ছাড়া যদি মনে করো তোমার মাঝে কোনো 'মানসিক বিকার' দেখা দিয়েছে, তাহলে তাও আমাদেরকে বলো, আমরা দুনিয়ার বড় বড় চিকিৎসকদেরকে এনে জড়ো করবো, তোমাকে সুস্থ করে তোলবো!..

আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উতবার কথা শুনলেন। জবাবে মুখে কিছুই বললেন না, শুধু এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন-
قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُوحَى إِلَيَّ أَنَّمَا إِلَهُكُمْ إِلَهُ وَاحِدٌ.
‘বলো, আমি তো তোমাদের মতোই একজন মানুষ, আমার কাছে ওহী আসে এমর্মে যে তোমাদের ইলাহ শুধুই এক ইলাহ।’ -সূরা কাহ্ফ্ফ

উতবা এ-জবাব শুনে ফিরে এসেছিলেন মাথা নুইয়ে। এসে অপেক্ষমান কোরাইশ নেতাদেরকে বলেছিলেন:
-আমি এমন কথা মুহাম্মদের কাছে শুনে এসেছি যা কবিতাও নয়, যাদুও নয়, গণকের ভবিষ্যদ্বাণীও নয়!

এরপর উতবা কোরাইশকে অনুরোধ করে বললো:
-তোমরা মুহাম্মদকে নিজের অবস্থায় ছেড়ে দিলে ভালো হয়! মুহাম্মদকে তো তোমরা সেই ছোট্ট বেলা থেকেই জানো! তোমরাই-না বলতে তোমাদের মধ্যে উন্নত চরিত্রে, সত্যবাদিতায় ও আমানতদারীতে তার কোনো জুড়ি নেই! আজ যখন সে বড় হলো এবং তোমাদের কাছে একটা বিশেষ দাওয়াত নিয়ে এলো, তখন 'সেই' তোমাদের চোখেই কেনো এখন সে হয়ে গেলো মিথ্যাবাদী ও যাদুকর?!

না, কোরাইশের কোনো প্রলোভনই কাজে এলো না। তাঁর দাওয়াত চলতে লাগলো আপন গতিতে। কোরাইশও বসে থাকলো না, তাঁর দাওয়াতের কাজে বাধা দিতে লাগলো। তাঁকে এবং তাঁর অনুসারীদের প্রতি সীমাহীন জুলুম-নির্যাতন শুরু করলো। এমনকি তাঁকে এবং অন্যদেরকে বয়কট করার, অবরুদ্ধ করে রাখার ঘোষণা দিলো। নিজেরা নিজেরা একটা চামড়ার টুকরোয় কিছু অনৈতিক ও অন্যায় কথা লিখে কা'বার দেয়ালে টানিয়ে দিলো। সবাইকে তা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলার কঠোর নির্দেশ দিলো। ওদের লিখা কথাগুলো ছিলো অমানবিকতায় ভরা। নির্দয়তায় ঠাসা। সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার কালো চিন্তায় কুৎসিত। লক্ষ্য করো কয়েকটি কথা-
* মুসলমানদের সাথে কোনো সালাম-কালাম চলবে না।
* তাদের সাথে ক্রয়-বিক্রয় বন্ধ।
* তাদের সাথে বিবাহ শাদী নিষিদ্ধ।
* কোনো রকম লেনদেনও চলবে না।

হ্যাঁ এভাবেই ওরা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবীদেরকে দিনের পর দিন.. মাসের পর মাস.. বরং বছরের পর বছর একাধারে তিন বছর অবরুদ্ধ করে রাখলো। এর মাঝে যতো রকম নিষ্ঠুরতা আছে সবই প্রদর্শন করলো। শিশু-নারী-বৃদ্ধরা সামান্য খাবারের জন্যে প্রচণ্ড কষ্ট করলো। বড়রা খাবার না পেয়ে খেলো— গাছের পাতা এবং আরো কতো 'অখাদ্য'।

তবুও ঈমান কারো টললো না। মনোবল কারো ভাঙলো না। তাওয়াক্কুল কারো কমলো না। চেতনা কারো নিভলো না। বিবেক কারো নুইলো না। সুতরাং এ-বয়কট ও অবরোধ কোনো কাজে এলো না। শুধু কষ্ট পেলো একদল নিরপরাধ মানুষ-অসহায় শিশু-নারী-বৃদ্ধ। ওদের অমানবিক কষ্টে লজ্জা পেলো মানবতা। কিন্তু লজ্জা পেলো না পাষাণদিল কোরাইশ। তবে তিন বছর গড়িয়ে যাওয়ার পর কোরাইশের ভিতরের পাঁচজন শীর্ষস্থানীয় মানুষের ঘুমন্ত মানবতা জেগে উঠলো। তারা বললো— ‘আমরা আর মানি না এই অবরোধ, এই চুক্তি! কেনো কষ্ট পাবে এতোগুলো নিরপরাধ মানুষ!’ এই বলে তারা কা'বায় টানানো চামড়ার টুকরোটি ছিঁড়ে কুটিকুটি করে ফেললো!

অবরোধ শেষ হলো। কিন্তু জুলুম-নির্যাতন বন্ধ হলো না। বরং আরো বাড়লো। আরো নৃশংস হলো। আরো অমানবিক হলো। আরো পাষাণেঘেরা হলো। আরো পাথরেচাপা হলো। আরো কাঁটাময় হলো। আরো পিলে-চমকানো হলো। এর মাত্রাটা ভয়াবহ আকৃতি নিয়ে সামনে এলো চাচা আবু তালিব এবং স্ত্রী খাদিজার ইন্তেকালের পর। অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে ফিরে আসার পরপরই তাঁরা দু'জন চলে গেলেন। প্রথমে আবু তালিব। পরে খাদিজা। তাঁরা দু'জন ছিলেন তাঁর দুর্ভেদ্য দুর্গ। বিপদের সহায়। সান্ত্বনার স্নিগ্ধ পরশ। এ জন্যেই প্রিয়-হারানোর এ-বছরটির নাম রেখেছেন নবীজী— عام الحزن বা দুঃখ-বছর। এ-বছরে না-জানি কতো দুঃখ পেয়েছেন আমাদের নবীজী!

তাঁদের ওফাতের পরে নির্যাতনের কিছু নমুনা লক্ষ্য করো—
এক. একবার আল্লাহ্র রাসূল নামাজ পড়ছিলেন। যেই তিনি সেজদায় গেলেন অমনি একদল কমজাত এসে তার মাথায় বকরীর নাড়ীভুঁড়ি চাপিয়ে দিলো, তারপর অদূরে দাঁড়িয়ে মজা লুটতে লাগলো।

দুই. আরেকবার এক কাফের তাঁর গলায় কাপড় জড়িয়ে টানতে টানতে তাঁর শ্বাস প্রায় রোধ করে ফেলেছিলো। হায়! রাহমাতুল-লিল-আলামীনের সঙ্গে কী নিষ্ঠুরতা!! অমন নিষ্ঠুরতার কথা শুনলে কার-না চোখে পানি আসে?!

আমি এ-সব খবর শুনতাম মক্কা থেকে-আসা লোকজনের মুখে মুখে, যারা এখানে এসে আমার লতানো শাখের শীতল ছায়ায় বসতো এবং পরস্পরে আলাপ করতো। হ্যাঁ, এ-সব খবর শুনে আমি খুব কষ্ট পেতাম। আমার খুব খারাপ লাগতো। সেই থেকে আমি স্বপ্ন দেখে চলেছি মুহাম্মদকে একটিবার দেখে আমার জীবনকে ধন্য করতে। কিন্তু পারবো কি? আমার জীবন-যে অনেক ছোট! তাঁর সাথে আমার দেখা হওয়ার পূর্বেই হয়তো কাফেররা আমাকে এ-বাগান থেকে নিয়ে যাবে তারপর আমাকে নিঙড়ে নিঙড়ে মদ বানাবে আর ওদের মাতাল আসরকে আরো মাতাল করে তোলবে, বুদ্ধি হারিয়ে আরো তীব্রতার সাথে মুহাম্মদ এবং তাঁর সাহাবীদের প্রতি জুলুম-নির্যাতন শুরু করবে। তবুও আমি আশা ছাড়লাম না। নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার আশা পূর্ণ করবেন। মুহাম্মদের সাথে আমার দেখা হবেই। এতো কাছ থেকে তিনি ফিরে যাবেন না, আমাকে মাহরুম করবেন না! হে আল্লাহ! কাছে এনে দাও আমার প্রিয় মুহাম্মদকে! আমার আর তর সইছে না!

আল্লাহ্ কী শান! আমার আশা পূর্ণ হলো এবং অবিলম্বেই! আমার স্বপ্ন বাস্তব হলো এবং 'মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি'র মতোই!

এই-যে প্রিয় মুহাম্মদ নিজেই চলে এসেছেন আমার কাছে! একেবারে কাছে! এইমাত্র বসলেন তিনি আমার ছায়াতলে-আমার লতানো শাখের শীতল ছায়ায়! হ্যাঁ, আমি তাঁকে দেখলাম, ধন্য হলাম! আহা, কী শান্তি! কী প্রশান্তি!!

কিন্তু এ কী! তাঁর দেহ-যে রক্তাক্ত! আনন্দের ভিতরেও আমি হু হু করে কেঁদে উঠলাম! এ কী অবস্থা করেছে ওরা আমার প্রিয় নবীর! আমার স্বপ্ন পুরুষের! আমার প্রতীক্ষিত শ্রেষ্ঠ অতিথির! তাঁর শরীর-যে রক্তাক্ত! শরীর বেয়ে বেয়ে রক্ত এসে জমেছে জুতোয়! ইস্, জুতো খুলতে কী কষ্ট হচ্ছে! কী নিষ্ঠুর এরা! অমন মানুষের রক্ত ঝরাতে পারে যে হাত, অবশ্যই তা নাপাক হাত! অথচ তাঁর কোনো অপরাধ নেই! তিনি রহমতে গড়া! তিনি মায়ায় মোড়া! তিনি মানবতায় ছাওয়া! তিনি উম্মতের শ্রেষ্ঠ পাওয়া! এসেছেন ইসলামের দাওয়াত নিয়ে! হকের পয়গাম নিয়ে!

তা ওদের কাছে ভালো না লাগলে গ্রহণ না করুক! তা না করে উল্টো কল্যাণকামী বন্ধুর সঙ্গে কেনো এই নিষ্ঠুরতা? কেনো তাঁর রক্ত নিয়ে এই দানবীয় উল্লাস? আহ! আমি আর সইতে পারছি না! ভালো আচরণের কী মন্দ বদলা!

ওদের কাছ থেকে হতাশ হয়ে তিনি যখন মক্কার পথ ধরলেন, তাঁর পেছনে একদল অবুঝ শিশুকে ওরা লেলিয়ে দিলো! সাথে ছিলো আরো কিছু নির্বোধ! ওরা রাসূলকে ঘিরে ধরলো। তাঁর গায়ে হাত দিলো। তাঁর দিকে পাথর ছুঁড়ে মারলো। ওদের নিক্ষিপ্ত পাথরে তাঁর দেহ থেকে দরদর করে রক্ত ঝরলো। তাঁকে নিয়ে ওরা 'পাগল-বিদ্রূপে' মেতে উঠলো। ওদের হিংস্র বেষ্টনী থেকে যতোই বের হতে চাচ্ছিলেন তিনি ওরা ততোই তাঁকে ঘিরে ঘিরে ধরছিলো। ইস, কী নিষ্ঠুরতা!

এক সময় তিনি ওদের কবল থেকে বেরিয়ে এসে আশ্রয় নিতে সক্ষম হলেন আমার কাছে .. আমার মাচানের ছায়ায়। ক্লান্ত অবসন্ন জর্জরিত হত-বিহ্বল দেহটা নিয়ে বসলেন আমার লতানো শাখের নিচে। মজলুম নবী তখন দু'আ করছিলেন এই বলে বলে—
اللَّهُمَّ إِلَيْكَ أَشْكُوْ ضَعْفَ قُوَّتِي وَقِلَّةَ حِيْلَتِيْ وَهَوَانِي عَلَى النَّاسِ أَنْتَ رَبُّ الْمُسْتَضْعَفِينَ وَأَنْتَ رَبِّي ، اللَّهُمَّ إِلَى مَنْ تَكلُنِي ؟ إِلَى بَعِيْدِ يَتَجَهَّمُنِي ؟ أَمْ إِلَى عَدُوٌّ مَلَكْتَه أَمْرِي ؟ إِنْ لَمْ يَكُنْ بِكَ غَضَبٌ عَلَيَّ فَلَا أُبَالِي غَيْرَ أَنَّ عَافِيَتَكَ هِي أَوْسَعُ لِيْ أَعُوْذُ بِنُوْরِ وَجْهِكَ الَّذِي أَشْرَقَتْ لَهُ الظُّلُمَاتُ وَصَلُحَ عَلَيْهِ أَمْرُ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ أَنْ يَنْزِلَ بِي سَخَطُكَ أَوْ يَحِلُّ عَلَيَّ غَضَبُكَ لَكَ الْعُتْبَى حَتَّى تَرْضَى .
‘আমার আল্লাহ! আমি দুর্বল, আমি অসহায়! তাই বলে আমি তো মানুষের কাছে অপমানিত হতে পারি না! তুমি-না দয়ালু! তুমি-না অসহায় দুর্বলের প্রতিপালক! তুমি তো আমারও প্রতিপালক! তবে কাদের হাতে তুমি আমাকে তুলে দিচ্ছো? আমার সাথে দুর্ব্যবহার করবে— এমন লোকের হাতে? নাকি আমার দুশমনের হাতেই তুলে দিয়েছো আমাকে? আমার কোনো অভিযোগ নেই। তুমি যদি থাকো আমার প্রতি সন্তুষ্ট, তাহলে কোনো ভয়ও নেই! কোনো পরোয়া নেই আমার! তোমার ক্ষমাই তো আমার সবচে' বড় পাওয়া! আমি চাই তোমার আশ্রয়ের আলো, যে আলো দূর করে দেবে সকল কালো। দুনিয়া-আখেরাতের সবকিছু তোমার হাতেই তো ন্যস্ত! তোমার অভিশাপ নয়— আমি চাই তোমার সন্তুষ্টি। তোমার ক্রোধ নয়— আমি চাই তোমার কৃপা!’

উতবা-শায়বা কাছেই দাঁড়িয়েছিলো। রক্তময় নবীর মর্মস্পর্শী দু'আ তাদের মর্মেও বুঝি 'আঘাত' করলো। উতবা ক্রীতদাস— আদ্দাসকে জোরে ডাক দিলো:
-আদ্দাস! ঐ লোকটাকে এক থোকা আঙুর দিয়ে এসো!

আমি আমার কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না! কারণ আদ্দাস আমার দিকে এগিয়ে আসছে! আমি আমার চোখকে বিশ্বাস করতে পারলাম না! কেননা আদ্দাস আমাকে ছিঁড়তে এগিয়ে আসছে! সত্যি আদ্দাস আমার দিকে আসছে—আমাকে ছিঁড়তে?!

আদ্দাস এখন আমাকে একেবারে মুহাম্মদের সামনে নিয়ে দেবে—আমাকে খেতে?! আহ! আমার কী সৌভাগ্য! যাঁর প্রতীক্ষায় অস্থির বেলা কাটাতে কাটাতে আমি ছিলাম মরিয়া দূর থেকে তাঁকে এক ঝলক দেখবো বলে, সেই মুহাম্মদ এখন আমার এতো কাছে?! তাঁর সাথে আমার শুধু এখন দেখাই হবে না, বরং আমি সারা জীবনের জন্যে মিশে যাবো তাঁর পবিত্র রক্তে-মাংসে-অস্থি-মজ্জায়! তাঁর চেতনায়-চিন্তায়! আহা! কী শোকর আদায় করবো তোমার হে আল্লাহ! আল হামদুলিল্লাহ!!

আদ্দাস আমাকে ছিঁড়লো! একটা তশতরিতে রাখলো! তারপর এক পা দু' পা করে এগিয়ে যেতে লাগলো আদ্দাস! আদ্দাস এখন মুহাম্মদের কাছে, খুব কাছে! আমিও মুহাম্মদের নিকটে, খুব নিকটে! আদ্দাস যতো কাছে যায় আমি ততো নিকটে যাই! আমি যতো নিকটে যাচ্ছি আমার আনন্দ ও সৌভাগ্য ততো বেশী প্রাণময়.. বাঙ্ময় হচ্ছে! কেমন করে আমি প্রকাশ করবো আমার এ আনন্দ ও সৌভাগ্য! হে আমার স্বপ্ন! এখন তুমি কতো রূপময়! তোমার রূপলীলা আমার ছোট্ট জীবনকে কী মহিমাই-না দিয়েছে!

এক্ষুণি তাঁর করস্পর্শে আমি ধন্য হবো! এই তো; এইমাত্র আদ্দাস আমাকে এনে রাখলো মুহাম্মদের সামনে! আদ্দাস মুহাম্মদের নূরানি চেহারার দিকে তাকিয়ে রইলো। কী ঝলমলে নূর-ছাওয়া চেহারা! অমন চেহারার মানুষ কি আদ্দাস আর দেখেছে? এবার মুহাম্মদকে আদ্দাস খেতে অনুরোধ করলো। মুহাম্মদ অনুরোধ রক্ষা করলেন। বরং আমাকে ধন্য করলেন! 'বিসমিল্লাহ' বলে আমার দিকে হাত বাড়ালেন! খেতে শুরু করলেন। স্পর্শ করলো আমাকে সবচে' বড় সৌভাগ্য! আদ্দাস মুহাম্মদের মুখে 'বিসমিল্লাহ' শুনে দ্বিতীয়বার অবাক হলো। কারণ এমন কথা কোনোদিন কারো মুখে এখানে বসে ও শুনে নি! তাই তার মনে কৌতূহল সৃষ্টি হলো। ও মুহাম্মদের কাছে জানতে চাইলো: -এমন কথা তো আমি এখানে কাউকে বলতে শুনি নি!

নবীজী তাকে বললেন: -তুমি কোথাকার বাসিন্দা? আদ্দাস বললো: -আমি নিনাওয়া'র মানুষ! রাসূল জবাবে বললেন: -তুমি দেখছি পুণ্যপুরুষ ইউনুস ইবনে মাত্তা'র দেশের মানুষ! -ইউনুস ইবনে মাত্তাকে আপনি চেনেন!!

আদ্দাসের চোখে রাজ্যের বিস্ময়! আল্লাহ্র রাসূল জবাব দিলেন: হ্যাঁ, চিনি! তিনি যে আমার ভাই। তিনি নবী ছিলেন, আমিও নবী! এরপর আদ্দাস আর স্থির থাকতে পারলো না! একটু আগের আদ্দাস বদলে গেলো! শুধু আঙুর সঁপে দিতে-আসা আদ্দাস এখন নিজেকেই সঁপে দিলো! ভালোবাসা-শূন্য আদ্দাস এখন ভালোবাসায় আপ্লুত, পরিপ্লুত হয়ে গেলো! ও সামনে ঝুঁকে নবীজীর মাথায়-হাতে-পায়ে চুমু খেতে লাগলো! আর বলতে লাগলো— ‘অবশ্যই, অবশ্যই আপনি নবী! নবীরা ছাড়া আর কেউ তো সত্যের পথে জুলুম নির্যাতন সইতে পারে না!’

ধন্য আমি, চিরধন্য! হ্যাঁ.. নবীজী আমাকে আরাম করে খাচ্ছেন! সুখ সুখ চেহারা নিয়ে খাচ্ছেন! আমি যেনো তাঁর অনে-ক প্রতীক্ষিত খাবার! এ বাগিচায় যেনো তিনি শুধু আমার জন্যেই এসেছেন! আহা! আমাকে তিনি যখন হাত দিয়ে স্পর্শ করে মুখে তুলছিলেন তখন আমার মনে হচ্ছিলো আমি যেনো রাজফল! পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ফল! ইতিহাসের সেরা আঙুরের থোকা! অবশ্যই সেরা! আমি হতে পেরেছি নবীজীর খাদ্য!! এমন সময়ে, যখন তিনি ক্লান্ত অবসন্ন জুলুম জর্জরিত রক্ত-রঞ্জিত!!

এ ছাড়া আমার আরেকটা সৌভাগ্য হলো, আমি দু'চোখভরে দেখেছি— কেমন করে পাথরবৃষ্টির পর আসে চুমুবৃষ্টি! আরো দেখেছি সত্যের সন্ধান পেয়ে কেমন করে আদ্দাস সে সত্যকে আকড়ে ধরেছিলো! উতবা শায়বার চোখের সামনে! তাদের লাল চোখের রাঙানিকে নিঃশঙ্কে উপেক্ষা করে! সত্যের খোঁজে-থাকা মানুষ সত্যকে এভাবেই আলিঙ্গন করে! ধন্য (আমার মতো) তুমিও হে আদ্দাস!

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00