📘 গল্পে আঁকা সীরাত হে মুহাম্মদ > 📄 আমার পরিচয়

📄 আমার পরিচয়


আমি একটি বই। বই হতে পেরে আমি খুশি, ভীষণ খুশি। আমার বিশ্বাস; এ পৃথিবীতে আমি দামী, অনে-ক দামী। আমার পাতাগুলো মূল্যবান, অনে-ক মূল্যবান। টাকা-পয়সা, সোনাদানা, রাজ-রাজড়াদের আলিশান বালাখানা এমনকি সারা পৃথিবীর রত্নভাণ্ডার থেকেও আমি অনে-ক দামী। বলতে পারো, কেনো আমি এতো দামী? কেনো আমার এতো মূল্য? সে কথা বলতেই তোমাদের সামনে হাজির হয়েছি! শোনো, আমি মূল্যবান তিন কারণে—

এক. আল্লাহ মানুষের হিদায়াতের জন্যে কী পাঠিয়েছেন? কিতাব—আসমানী কিতাব। যেমন তাওরাত একটি আসমানী কিতাব, ইঞ্জিল একটি আসমানী কিতাব, যাবুর একটি আসমানী কিতাব এবং আমাদের কুরআন একটি আসমানী কিতাব। সেই সব মহান আসমানী কিতাবকে যেমন ‘কিতাব’ বলা হয়, আমাকেও মানুষ ‘কিতাব’ বলে! আসমানী হওয়ার মহিমা আমার ভাগ্যে জোটে নি, কিন্তু নাম-অবয়বের এ-সাদৃশ্যটুকু তো জুটেছে! এ-ই বা কম কিসে?

দুই. দ্বিতীয় কারণ হলো, কুরআন নাযিল হয়েছে যাঁর প্রতি আমি রচিত সেই মহামানবকে নিয়ে, সেই আল-আমীনকে নিয়ে, মরু-মক্কার সেই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিয়ে, আল্লাহ যাঁকে এ-পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন সবার হিদায়াতের জন্যে। সবাইকে সত্য ও কল্যাণের পথে এবং ভালোবাসা ও শান্তির পথে ডাকার জন্যে। দুনিয়ার কাঁটাবন থেকে উদ্ধার করে আখেরাতের 'ফুলবন'-এর সন্ধান দেয়ার জন্যে। আমার গুরুত্বের অন্য সব কারণ বাদ দিলেও শুধু এ কারনেই তো আমি গর্ব করতে পারি নিজেকে নিয়ে—ঈর্ষণীয় গর্ব!

তিন. আমার গুরুত্বের তৃতীয় কারণ হলো, আমি কচিকাঁচা ও সোনামণিদের জন্যে রচিত! ওরা আমার ভীষণ প্রিয়! প্রিয় তো হবেই! ওরা যে পবিত্র, চিরসুন্দর! যেনো শিশির-ধোয়া ফুল, কিংবা তার মিষ্টি মধুর স্নিগ্ধ হাসি! ওরা আল্লাহ্‌র কাছেও প্রিয়, আল্লাহ্‌র কাছে যিনি প্রিয়, সেই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছেও প্রিয়। তাই আমার কাছেও প্রিয়! ভীষণ প্রিয়!!

আমার পাতায় পাতায় বর্ণিত হয়েছে যে সব ঘটনা ও কাহিনী, তা আগাগোড়া সত্য। যদিও তা উচ্চারিত হয়েছে বিভিন্ন প্রাণী ও বস্তুর যবানিতে (ভাষায়)। আর আমার কচিকাঁচা বন্ধুরা তো ওদের মুখে গল্প শুনতেই বেশী পছন্দ করে, নয় কি? আবার বলছি; আমাকে সাজানো হয়েছে কুরআন-হাদীসসহ বিভিন্ন সীরাত গ্রন্থ মন্থন করে— নতুন ভাষায়.. নতুন ধারায়.. নতুন ভঙিতে .. নতুন উপস্থাপনায়।

আমার বিশ্বাস; কচিকাঁচা ও শিশু-কিশোর বন্ধুরা ভীষণ মজা করে ও গুরুত্ব দিয়ে আমাকে পড়বে এবং পড়তে পড়তে আনন্দ-বিহ্বল হয়ে পড়বে। আমার ভয়, ওরা আবার নাওয়া-খাওয়া ভুলে না যায়!

আমি বিশ্বাস করি; আমার বন্ধুরা এ-বই একবার পড়লে আবার পড়তে চাইবে। বারবার পড়তে চাইবে, পড়তে বাধ্য হবে। কেননা এ বইয়ে ছড়িয়ে আছে আকর্ষণ, বিপুল আকর্ষণ! আমি আরো বিশ্বাস করি; এ-বই পড়লে প্রিয় নবীজীকে ওরা ভালোবাসবে— হৃদয়-মন উজাড় করে! বাসবেই!! আর এ ভালোবাসার 'সোনার তরীতে' চড়েই ওরা পার হয়ে যাবে এই দুনিয়ার জীবনের স-ব সাগর মহাসাগর— একেবারে নির্বিঘ্নে, নির্ঝঞ্জাট, হোক তা যতোই তরঙ্গ-বিক্ষুব্ধ ও ফেনিলোত্তাল। আর ওপারে, মানে আখেরাতে এ-ভালোবাসার 'বোরাকে' চড়েই দাঁড়াবে গিয়ে ওরা একেবারে হাউযে কাউসারের পাড়ে প্রিয় নবীজীর কাছটি ঘেঁষে, তাঁকে ভালোবাসার অধিকার নিয়ে!! আহা! সে হবে কী মধুলগ্ন! হোক তা আমাদের সবার মধুস্বপ্ন!!

হ্যাঁ.. বিদায়ের আগে আরেকটা কথা না বললেই নয়! আমাকে আরবী রূপ দিয়েছেন আরব জাহানের ইসলামী শিশু-সাহিত্যের তারকা-লেখক আবদুত তাওয়াব ইউসুফ। আর বাংলা রূপ দিয়েছেন ইয়াহইয়া ইউসুফ নদভী। তাদেরকে অনেক ধন্যবাদ। ইয়াহইয়া ইউসুফ নদভীকে আলাদা করে আবারও ধন্যবাদ। কেননা বাংলাভাষীদের হাতে তিনিই আমাকে এই প্রথম তুলে দিয়েছেন। এ সুবাদে এখন কতো বন্ধু হবে আমার! আমার জন্য এ এক বিরাট সৌভাগ্য।

আরব বিশ্বে আমার বন্ধু সংখ্যা কতো, জানো? অনেক! সত্তর লাখ! অর্থাৎ সত্তর লাখ পাঠকবন্ধুর হাতে আমি পৌঁছে গেছি এখন পর্যন্ত!

আশা করি, বাংলা ভাষার প্রিয় পাঠকরাও আমার বন্ধু হবে এখন একে একে, অনেক! হে আল্লাহ! লেখক ও অনুবাদকের পরিশ্রম ও সাধনা তুমি কবুল করো, তাদেরকে উত্তম বিনিময় দান করো। আমীন!

এখন শুরু হয়ে যাক তাহলে— উল্টাতে থাকো আমার পৃষ্ঠাগুলো, একের পর এক! কুড়াতে থাকো ফুল— নবুওত উদ্যান থেকে, একের পর এক! গাঁথতে থাকো মালা.. সাজাতে থাকো জীবন— আমার তোমার সবার, একের পর এক!

📘 গল্পে আঁকা সীরাত হে মুহাম্মদ > 📄 আমি আবরাহার হাতি

📄 আমি আবরাহার হাতি


হাতি মানেই তো সাদা বাঁকানো দু'টি দাঁতের মাঝখান দিয়ে নিচের দিকে নেমে যাওয়া ইয়া লম্বা একটা শুঁড়। সুতরাং বুঝতেই পারছো আমারও অমন একটা শুঁড় আছে। আমি ঠিক বুনো হাতি নই। চিড়িয়াখানার অসহায় বন্দিত্বও কখনো আমাকে 'বরণ' করতে হয় নি। বয়সটা আমার নেহাত কম নয়, অনেক দিন ধরেই বেঁচে আছি। সবাই আমাকে একডাকে চেনে, আমি-যে আবরাহার হাতি! জগত-জোড়া আমার খ্যাতি। সবচে' বেশী নামডাক আমার যুদ্ধের ময়দানে। সেখানে আমি মহাত্রাস। প্রলয়ঙ্করী ঝড়। মুহূর্তেই সবকিছু তছনছ করে দিই। আমার শুঁড়টা যেনো ধ্বংস-তাণ্ডবের দ্বিতীয় নাম।

হ্যাঁ আমি আবরাহার হাতি। কিন্তু কী করে আমি আবরাহার হাতি হয়ে গেলাম? কেমন করে আফ্রিকার বন থেকে ধৃত হয়ে তার হাতে এসে পড়লাম? তারপর আমার জীবনে এবং আবরাহার জীবনে কী ঘটলো? সে এক শ্বাসরুদ্ধকর মজার কাহিনী! শোনাতে চাই তোমাদেরকে সেই কাহিনী— চাঁদনি রাতের দাদির গল্পের আসরের মতো গল্পময় করে। শুরু করবো?... শোনো তাহলে—

হাবশা'র নাম শুনেছো? সেখানেই আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। সেখানকার বন-বাদাড় আর ঘন নিবিড় গাছ-গাছালির ছায়া ও 'মায়া'য় আমার সময় বেশ কেটে যাচ্ছিলো। 'প্রয়োজন' পড়লে মাঝে মাঝে লোকালয়েও হানা দিতাম। একদিন আমি মনের সুখে বনের মাঝে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখি, একদল সশস্ত্র সৈন্য আমার পিছু নিয়েছে। অনেক চেষ্টা করেও আমি বাঁচতে পারলাম না, শেষমেষ ওরা আমাকে ধরে ফেললো। আমার উপর কেনো ওদের বদ-নজর পড়লো প্রথমে বুঝতে পারি নি। কিন্তু যখন বন্দির মতো ওরা আমাকে টানতে টানতে আবরাহার সামনে নিয়ে হাজির করলো, তখন আর বুঝতে বাকি রইলো না, ওরা আমার কাছে কী চায়। আমি বুঝে ফেললাম ওরা আমাকে 'বন্য-হাতি' থেকে 'সৈন্য-হাতি' বানাতে চায়।

নিজের অজান্তেই আমার চোখ দু'টি ছলছল করে উঠলো! স্বাধীনতা হারানোর বেদনায় বুক ফেটে আমার কান্না আসতে চাইলো! হায়, এ কী হয়ে গেলো! আর কি ফিরে পাবো না অবাধ অরণ্য-স্বাধীনতা? বন-বনানী'র মুক্ত ঘোরাফেরা?

বনের সবুজ কোলে তার শীতল ছায়ায় কী দারুণ ছিলো আমার জীবন। কিন্তু নিমেষেই কী ঘটে গেলো। আমি ভাবতেও পারি নি, আমার জীবন হয়ে যাবে অমন আবদ্ধ। শুধু কি আবদ্ধ, একেবারে কাটায়-কাটায় মাপা সৈনিক জীবন। একঘেয়ে। নিষ্ঠুর। পাষাণেঘেরা। আমাকে সৈন্য বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করার কারণ আছে। গায়ে-গতরে যেমন বিশাল আমি শক্তি-সামর্থ্যেও অতুলনীয় আমি। তাই বন্য হয়েও আমি হয়ে গেলাম সৈন্য। মানুষ সৈন্যের মতো হাতি সৈন্য। শুধু তাই নয়; আমিই হয়ে গেলাম একদল হাতি সৈন্যের সেনাপতি। আমার কথায়, আমার ইশারায় অন্যসব হাতি— এই খাড়া, এই বসা।

বনের ছায়ায় আমার মনটা বেশ কোমল ছিলো। কিন্তু আবরাহার 'ছায়ায়' আমি ক্রমেই 'দানব' হয়ে উঠছিলাম। সবাই আমাকে জমের মতো ভয় করতো। আমি আসছি শুনলেই থরথর করে কাঁপতে থাকতো। কারণ আছে। যে দিকে যেতাম ধ্বংস ছড়িয়ে যেতাম। অর্থাৎ আশপাশ ও পায়ের নিচের সবকিছু বরবাদ করে চলে যেতাম, মানুষের সাজানো জীবন ও পরিবেশ তছনছ করে ফেলতাম।

যাই হোক; আবরাহা আমাকে পেয়ে ভীষণ খুশি। কিন্তু আমি একটুও খুশি হতে পারি নি। তবু মনিব হিসাবে বাইরে বাইরে তাকে শ্রদ্ধা না করে উপায় ছিলো না। এদিকে হাবশায় কিছুদিন কাটতে-না-কাটতেই আবরাহা ইয়েমেন আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিলো। এ-অভিযানে বিজয়লাভ করতেই হবে। তাই আবরাহা আমাকে ব্যবহার করলো। আর আমিও আমার 'তাণ্ডব' দেখালাম। আমার নিজস্ব সৈন্যবল নিয়ে ওদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। ফলাফল যা হবার তাই হলো। ইয়েমেন-সম্রাট নিহত হলো। ইয়েমেনের জনতার ভাগ্য-বিপর্যয় ঘটলো। তারপর আবরাহা নিজেই বনে গেলো ইয়েমেনের স্বঘোষিত বাদশা।

イয়েমেন দখলের পর আমার আর স্বদেশভূমি— হাবশায় ফেরা হয় নি। মাঝে মাঝেই হাবশার জন্যে মনটা আঁকু-পাঁকু করতো। স্বদেশকে কার-না মনে পড়ে? স্বদেশকে কে-না ভালোবাসে? কিন্তু জালিম আবরাহার কাছে স্বদেশ প্রেমের কী মূল্য আছে? তার কাছে মূল্য শুধু ক্ষমতার.. শুধু দম্ভের! শুধু কেড়ে নেয়ার! আমি আবরাহার বিশেষ হাতি-রাজকীয় হাতি। আমাকে সাধারণ কোনো কাজে ব্যবহার করা হতো না। মক্কার কা'বার প্রতি রুষ্ট হয়ে যে-উপাসনালয়টা সে নির্মাণ করছিলো, সে জন্যে পাথর কাঠ ইত্যাদি বোঝা বয়ে আনতে হতো দূরের পাহাড় থেকে। এ-কাজে ব্যবহৃত হতো একপাল হাতিই। কিন্তু একদিনের জন্যেও আমাকে ওদিকে 'ডাকা' হয় নি। ও-সব ছিলো ঐ সাধারণ হাতিদেরই কাজ। হঠাৎ করে উপাসনালয়-প্রসঙ্গটা টেনে আনলাম শুধু শুধু না, কারণ আছে। এ-উপাসনালয় নির্মাণের সাথে জড়িয়ে আছে আমার মূল কাহিনীর শিকড়। আরো খুলে বলি-

এ-উপাসনালয়টা তৈরী হচ্ছিলো বিশাল আকারে কা'বা'র চেয়ে অনেক বড় করে। কিন্তু বদ নিয়তে। অর্থাৎ আবরাহার উদ্দেশ্য ছিলো বড়ো খারাপ। মক্কার কা'বার প্রতি মানুষের হৃদয়টান দেখে তার মাথা নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। সুযোগ পেলেই মানুষ মক্কার কা'বা যিয়ারত করতে ছুটে যেতো। এখন কী করে মক্কাগামী মানুষকে সেই কা'বার মতো আরেকটা 'কা'বা' বানিয়ে এখানেই আটকে ফেলা যায়- এই হয়ে দাঁড়ালো আবরাহার সকাল-সন্ধ্যার চিন্তা। এক সময় যখন শেষ হলো এর নির্মাণ কাজ, দেখা গেলো ফল যা আশা করা হয়েছিলো, হয়েছে তার উল্টো। কেউ এলো না আবরাহার নকল কা'বায়। এই নকল কা'বার শোভা ও রূপময়তা দর্শনার্থী ও পথিকের দৃষ্টি কাড়লেও কারো হৃদয় কাড়তে পারলো না। সবাই আরো বেশী সংখ্যায় ছুটে যেতে লাগলো মক্কার কা'বায়। আসল কা'বায়। ইবরাহিমী কা'বায়। মানুষ তো আর এতোটা বোকা নয় যে আসল-নকলের পার্থক্যই বুঝবে না! কিন্তু আবরাহা মানুষের এই প্রত্যাখ্যানকে হজম করতে পারলো না। জালিমদের যা হয় আর কি! সময় থাকতে ওরা বোঝে না। আবরাহা ভীষণ চটে গেলো। রাগে ক্ষোভে ফুঁসতে লাগলো। শেষটায় এ সিদ্ধান্তই নিয়ে বসলো— মক্কার কা'বা আমি ধ্বংস করে দেবো, নইলে এই বোকাগুলোকে ফেরানো যাবে না! আমার সাথে বেয়াদবি! দেখাবো এবার মজা আমি!

বাস্, দেখতে দেখতেই শুরু হয়ে গেলো মক্কা অভিযানের জোর প্রস্তুতি। তৈরী হয়ে গেলো এক বিশাল হস্তিবাহিনী। বুঝতেই পারছো, আমি ছিলাম এই বাহিনীর সেরা আকর্ষণ। একদিকে আমি হস্তিবাহিনীর সেনাপতি। আরেকদিকে আবরাহার রাজ-বাহন।

হ্যাঁ। প্রস্তুতি শেষ। এইমাত্র যাত্রা হলো মক্কার দিকে—কা'বা অভিমুখে। আমার পিঠেই চড়ে বসেছে সেনাপতি আবরাহা। আবরাহা মাঝে মধ্যে ঘাড় বাঁকা করে পেছনের দিকে তাকাচ্ছে আর প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিচ্ছে। আবরাহা আমার কাছে দু'টি জিনিস আশা করছিলো। এক. তার এই কা'বা-বিধ্বংসী অভিযানে আমি যেনো হই তার 'মনের বাহন'— যা নির্দেশ দেবে তাই পালন করবো। দুই. আমি যেনো কা'বা-ধ্বংসে ব্যবহার করি আমার দানবীয় শক্তি—শুঁড়ীয় শক্তি। এ রকম আশা সে আমার কাছে করতেই পারে। কেননা অতীতে আবরাহার অসংখ্য 'অশুভ' ইচ্ছে আমি বাস্তবায়ন করেছি। তার ইচ্ছায় মুহূর্তেই আমি নষ্ট করে দিয়েছি অসংখ্য বস্তি।

কিন্তু মক্কার কা'বা ভাঙার এই অভিযানে বের হতে আমার মন একেবারেই সায় দিচ্ছিলো না। ভিতর থেকে আমি প্রচণ্ড একটা বাধা অনুভব করছিলাম। তবুও আবরাহার ইচ্ছায় আর আমার অনিচ্ছায় যেতে হচ্ছে মক্কায়। আমি পথ চলছিলাম নীরবে। কিন্তু উৎকর্ণ হয়ে ছিলাম- কে কী বলে, শুনতে। তখন কানে ভেসে আসতে লাগলো বিভিন্ন জনের বিভিন্ন কথা। কেউ কথা বলছিলো মক্কা নিয়ে, কেউ-বা কা'বা নিয়ে, কা'বা নির্মাণের ইতিকাহিনী নিয়ে। এ-সব কথা আমার মন-খারাপ অবস্থাকে আরো বাড়িয়ে দিলো। তবু কান পেতে আমি সব শুনছিলাম। ফলে অনেক অজানা ইতিহাসের কপাট আমার সামনে একে একে খুলে যেতে লাগলো।

মক্কায় এই কা'বা নির্মাণ করেছেন একজন নবী। তাঁর নাম ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)। আর এ-কাজে সহযোগী ছিলেন তাঁর ছেলে ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম)। ছেলে বাবাকে পাহাড় থেকে পাথর এনে দিয়েছেন। এটা-ওটা এগিয়ে দিয়েছেন। ওরা আরো বলছিলো যে, নবী ইবরাহীমের অনেক মু'জিযা ছিলো। একবার তাঁর সম্প্রদায় ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁকে আগুনে ফেলে দিয়েছিলো। কিন্তু আল্লাহ্ কী কুদরত! আগুন তাঁর কোনো ক্ষতি করতে পারে নি। আগুনের কাজ তো পুড়িয়ে দেয়া—জ্বালিয়ে দেয়া। কিন্তু সেদিন নাকি আগুন ইবরাহীমকে উল্টো দিয়েছিলো আরামদায়ক শীতলতা, স্বর্গীয় প্রশান্তি! এ-সব শুনে আমার নিশ্চিত বিশ্বাস জন্মালো যে, ইবরাহীমের এই কা'বা আর আবরাহার ঐ গীর্জা এক নয়। কা'বা অনেক মহান। আল্লাহ্ নবীর হাতে গড়া এক শ্রেষ্ঠ গৃহ। প্রথম গৃহ। কা'বার আঙ্গিনায় প্রবেশ করলেই মানুষ নিরাপদ, কেউ তার ক্ষতি করতে পারে না। কেশাগ্রও স্পর্শ করতে পারে না। এমন কি একটা কবুতরও যদি এখানে ওড়তে ওড়তে এসে বসে তাহলে কোনো শিকারী তাকে নিশানা বানাতে সাহস করে না। কেউ তার কাছেও যায় না। এ-স্থান চিরনিরাপদ ও শান্ত-সমাহিত এক স্থান। আসমানী নূর এখানে ঝরে ঝরে পড়ে। তা স্বর্গীয় জ্যোতিতে জ্যোতির্ময়। আসমানী নূরে নূরময়। সবাই এ-স্থানকে ভালোবাসে। এখানে এসে জড়ো হয়। আবেগভরে পড়ে থাকে এখানে। কখনো চলতে থাকে তাওয়াফ—ঘন্টার পর ঘন্টা। কখনো ইবাদতে ইবাদতে কেটে যায় বেলার পর বেলা। কখনো চলে আত্মসমাহিত মানুষের অশ্রু-কাতর মুনাজাত। কখনো গুঞ্জরিত হয় আশপাশের গোটা পরিবেশ 'লাব্বাইক' ধ্বনির মধুর গুঞ্জরনে। ঐশী গুঞ্জরনে। তাহলে আবরাহা কেনো এই মহান কা'বা ভেঙে ফেলার জন্যে অমন দুর্বিনীত? এতোটা মরিয়া, বেসামাল বেপরোয়া? আদৌ কি সে পারবে তার এ 'অপবিত্র' ইচ্ছে বাস্তবায়ন করতে? এ-সব ভাবতেই আমার ভিতরটা ভয়ে কেঁপে কেঁপে উঠলো। আমার চলার গতি শ্লথ হয়ে আসতে লাগলো।

সৈন্যদের আলোচনা থেকে আমি এ-ও জানতে পারি যে মক্কার মানুষ আমাকে ভালোই চেনে। ভীষণ ভয়ও পায়। তারা যখন জানতে পারলো যে আমাকে নিয়ে আবরাহা কা'বা গুঁড়িয়ে দিতে মক্কার দিকে ধেয়ে আসছে, তখন থেকেই নাকি তারা ভয়ে শঙ্কায় অস্থির হয়ে আছে। অজানা পরিণতির আশঙ্কায় গভীর উদ্বেগে সময় পার করছে। সবার মনের উদ্বেগাকুল জিজ্ঞাসা- কী হবে? আমাদের কা'বা কি সত্যি ধ্বংস হয়ে যাবে? আমার চলার পথে যা কিছু পড়ে স-ব আমি নষ্ট ও বরবাদ করে দিই- এ খবরও মক্কাবাসীর জানা ছিলো। তাদের আরো জানা ছিলো আমার দানবীয় শক্তির বেপরোয়া ব্যবহারের কথা। এক জালিম শাসকের আস্কারা-পাওয়া হাতির ধ্বংস-ছড়ানো জুলুমের কথা।

আমরা মক্কার কাছাকাছি চলে এসেছি প্রায়। আর সামান্য পথ বাকি। এরপরই আবরাহার নির্দেশে কা'বা 'ধ্বংস হবে'। পৃথিবীতে কা'বা আর 'থাকবে না'। থাকবে শুধু আবরাহার ঐ নতুন 'কা'বা'টা (গির্জাটা)। হয়তো মক্কাও ধ্বংসলীলার শিকার হবে। ধুলোয় মিশে যাবে। আমি শুনেছি, প্রতিরোধ গড়ে তোলার মতো মক্কায় তেমন কোনো লোকবল ও সৈন্য বাহিনী নেই। এর মানে আবরাহার অশুভ ইচ্ছে বাস্তবায়নের পথে তেমন কোনো বাধা নেই। রাস্তা প্রায় ফাঁকা। পথ প্রায় কণ্টকমুক্ত। আবরাহার হাতি হয়েও আমি এ জন্যে গভীর বেদনা অনুভব করছি। বেদনা-ঘেরা হৃদয়ে ভাবছিলাম- আবরাহার রোষ থেকে আজ না বাঁচতে পারবে মক্কা না তার কা'বা।

আবরাহার সৈন্য বাহিনীর ভিতরে লক্ষ্য করলাম একটা 'হামবড়া' (আমরাই সেরা) ভাব। কেউ কেউ আমার দিকে তাকিয়ে বলছিলো: হে বীর! এগিয়ে যাও! হে আবরাহার হাতি! হে হাতির রাজা-সেরা হাতি! সামনে বাড়ো! ওদের এ-সব মন-ফুলানো কথা আমার একদম ভালো লাগছিলো না। আমার মন কেবলই বলছিলো- আবরাহার বাহিনীর কপালে আজ দুঃখ আছে। আমার কপালেও দুঃখ আছে। জালিমের হাতকে যারা শক্তিশালী করতে এসেছে, সবার কপালেই দুঃখ আছে। হায়! আমি যদি এখন পালিয়ে যেতে পারতাম!!

মক্কা'র একদম কাছে এসে আবরাহা থামলো। শিবির স্থাপনের নির্দেশ দিলো। এরপর সবাই আবরাহার পক্ষ থেকে চূড়ান্ত আক্রমণের নির্দেশের অপেক্ষা করতে লাগলো। এর মধ্যেই আমি জানতে পারলাম যে, কিছুক্ষণ আগে মক্কার সরদার আবদুল মুত্তালিব আবরাহার খিমা ঘুরে গেছেন। তিনি তার 'উট' চাইতে এসেছিলেন। যাওয়ার সময় পরিস্কার ও অবিচলিত ভাষায় তিনি বলে গেছেন- لِلْبَيْتِ رَبِّ يَحْمِيه 'কা'বার একজন মালিক আছেন, তিনিই রক্ষা করবেন কা'বা!'

কিন্তু আবরাহা মক্কার সরদারের কথাকে আমলেই নিলো না। উল্টো মক্কা আক্রমণের নির্দেশ দিলো! কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি, আবদুল মুত্তালিবের এই 'মহা ঘোষণা'য় আমার জান দ্বিতীয়বার কেঁপে উঠলো! অথচ আমি এক ভয়ঙ্কর হাতি। যা-ই সামনে পাই দুমড়ে-মুচড়ে যাই। শহর-নগর-পাড়া-মহল্লা- কিছুই আমার ধ্বংস-রোষ থেকে রক্ষা পায় না। মুহূর্তেই আমি যবরকে যের বানিয়ে দিই (সব উলট পালট করে দিই)। আমি না চাইলে কোথাও কোনো গাছপালা বা ঘরবাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। আমার 'সর্বসংহারক' (সবকিছু যা বিনাশ করে দেয়) শুঁড় থেকে কিছুই রক্ষা পায় না।

কিন্তু এ-মুহূর্তে আবরাহার নির্দেশে আমি সর্বসংহারকরূপে আবির্ভূত হতে— না পাচ্ছি মানসিক বল, না পাচ্ছি শারীরিক বল। উল্টো আমি ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ছিলাম। প্রচণ্ড ক্লান্তিতে দেহটা নিস্তেজ হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে, আর বুঝি চলতেই পারবো না। এ অবস্থা শুধু আমার একার না, সব হাতির। সব ঘোড়ার। সব উটের। সব সৈন্যের। কেউ ঠিকমতো চলতে পারছিলো না। হঠাৎ দেখলাম আমি থেমেই পড়েছি, আর সামনে বাড়তে পারছি না। না, এক কদমও না। আমার দেহের সব যেনো অবশ হয়ে আসছে। পা'টাও নাড়াতে পারছি না। একটুও না। একেবারে ঠাঁয়-দাঁড়ানো অবস্থা। শুধু তাই নয়, মনে হচ্ছিলো, আমার পা যেনো কেউ পেরেক দিয়ে জমিনে পুঁতে রেখেছে। একই অবস্থা আমার সহসঙ্গীদেরও।

আবরাহা ভীষণ বিরক্ত হলো। বিরক্ত হলো সহসৈন্যরাও। রাজ্যের দুশ্চিন্তা অস্বস্তি ও অজানা আতঙ্ক ওদেরকে চেপে ধরলো। ওদের সব রাগ এসে পড়লো আমার উপর, আমি যেনো ইচ্ছে করেই অমন করছি! কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হলো; আমি ডানেও চলতে পারছিলাম এবং বামেও। কিন্তু কা'বা অভিমুখে? যেই সেই! এক কদমও চলতে পারছিলাম না। তবুও আবরাহার বিবেক জাগলো না। তবুও তার হুঁশ হলো না। কারো হুঁশ হলো না। আমাকে এবং আমার সহযোদ্ধাদেরকে চাবুকের আঘাতে আঘাতে জর্জরিত করা হলো। কিন্তু শত বেত্রাঘাতেও কাজ হলো না। আমি চলতে পারলাম না। কেউ চলতে পারলো না। অবশেষে আবরাহা লোহা গরম করে আমার গায়ে স্যাঁকা দিলো! তার প্রিয় হাতিটাই তার কাছে হয়ে উঠলো এখন ভীষণ অপ্রিয়। কিন্তু আগুনের এ 'দংশনে'ও কাজ হলো না। আমি চলতে পারলাম না, পারলামই না। তবুও অবুঝ আবরাহা বুঝলো না। তবুও জালিমের সুমতি হলো না! জালিমদের সুমতি হয়ও না। আমি এতোদিন তার সেবা করেছি, তার ইচ্ছায় উজাড় করে দিয়েছি কতো গাছপালা ও জনপদ, কিন্তু সে-সব 'উপকার'-এর কথা আজ ভুলে গেলো আমার অকৃতজ্ঞ মনিব। আমাকে চাবকালো। ঝলসানো স্যাঁকা দিলো। কিন্তু তাতেও-যে কিছু হলো না! আমি যেখানে ছিলাম সেখানেই নিশ্চল থেমে রইলাম।

রইলাম। তখন মনে হচ্ছিলো আমিই পৃথিবীর সবচে' অসহায় প্রাণী। আমি আমার ভাষায় আবরাহাকে জানিয়ে দিলাম—মনিব! যতো চাও পেটাও, স্যাঁকা দাও, আমি যাবো না, কিছুতেই যাবো না, যেতে-যে পারবো না! আমি কা'বা ধ্বংস করবো না, করতে পারবো না। এ-কা'বা তোমার নকল 'কা'বা' নয়, এ-কা'বা ইবরাহীমের কা'বা! এ-কা'বা ইসমাঈলের কা'বা! এ-কা'বার রব তোমার চেয়ে অনে-ক শক্তিশালী! তোমার মতো অসংখ্য আবরাহাকে তিনি মুহূর্তেই ধ্বংস করে দিতে পারেন! হে জালিম! তোমার কপালে হয়তো সে পরিণতিই লেখা হয়ে গেছে!

কিন্তু আবরাহা আমার ভাষা বুঝলো না। মক্কা, কা'বা আর মক্কাবাসীর ধ্বংস ছাড়া যেনো তার পিপাসা মিটবে না। জালিমদের রক্ত-পিপাসা কখনো মিটে না। হায়! আমি যদি আবরাহার হাতি না হতাম! আমি যদি ওর 'জালে' আটকা না পড়তাম! হে আমার প্রিয় বনভূমি! কোথায় হারিয়ে গেছো তুমি? হে অরণ্য-স্বাধীনতা! হে সবুজ পৃথিবী! আর কি ফিরে আসবে না?

Hঠাৎ হঠাৎ ঘটলো ব্যাপারটা! নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলাম না! দেখলাম আকাশ কালো করে এগিয়ে আসছে ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষুদে পাখি! মুহূর্তে বিনামেঘেই আকাশটা আঁধারে আচ্ছন্ন হয়ে গেলো। চারদিক যেনো সাঁঝ-সন্ধ্যায় ছেয়ে গেলো। ঠাহর করতে পারলাম না—আমি কি স্বপ্ন দেখছি না জেগেই আছি! এরপর যা ঘটলো এবং যতো দ্রুত ঘটতে লাগলো তা স্বপ্নকেও হার মানায়। কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যায়! সৈন্যরা চীৎকার করতে লাগলো—পাখি! পাখি!! পাথর! পাথর!!

দেখলাম একটা ছোট্ট পাথরকণা এসে পড়লো আমার কাছটায়! আকারে একেবারেই ছোট। এই একটা শস্যদানার মতো। কিন্তু কী আশ্চর্য! এই ছোট্ট পাথরকণাটাই আমার এক সহযোদ্ধার গায়ে এসে পড়লো তো সাথে সাথে ও চিৎপটাং। আরেকটা এসে ঐ ঘোড়াটার উপরে পড়লো তো ওটাও কুপোকাত। আরেকটা এসে উটের গায়ে পড়লো তো সেটাও একেবারে ভূতলশায়ী। এ-সব দেখে দেখে আমি কাঁপতে লাগলাম! জীবনে আমি কতো ধ্বংসলীলাই তো দেখেছি। নিজেও কতো ধ্বংস তাণ্ডব চালিয়েছি। কিন্তু ধ্বংসের অমন ভয়াবহতা আগে কখনো দেখি নি! দশাসই একটা সৈনিকের গায়ে ঐ পাখির ঠোঁট থেকে ছেড়ে-দেয়া ছোট্ট পাথরকণাটা যখন এসে পড়লো, সাথে সাথে ছটফট করতে করতে সে মারা গেলো! এভাবে আমার চোখের সামনে একে একে সব লুটিয়ে পড়তে লাগলো, যেনো কোনো বিষাক্ত তীর ওদের গায়ে এসে বিঁধছে। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে আমি এত্তোটুকুন হয়ে গেলাম।

Hঠাৎ চোখে পড়লো ঊর্দ্ধ গগন থেকে নেমে-আসা একটা আলোক রেখার উপর। তা দ্যুতি ছড়াচ্ছে কা'বার আশপাশে। আর আবদুল মুত্তালিবকে দেখলাম ভীষণ হাসিখুশি। বিজয়স্নাত মানুষের মাঝে অভিনন্দিত বীর যেমন হাসিখুশি থাকেন, ঠিক তেমনি! সবাই তাকে অভিনন্দন জানাচ্ছে। আবদুল মুত্তালিব আনন্দ গদগদ কণ্ঠে সবাইকে তখন একটা স্বপ্নের কথা বলছিলেন, যা তিনি দেখেছিলেন এই কয়েক রাত আগে। তিনি জানালেন যে, একটা রুপার শেকল যেনো তার পিঠ থেকে বেরিয়ে একটা মাথা তার উঠে গেছে আকাশের দিকে এবং আরেকটা মাথা ছড়িয়ে পড়েছে মাটির পৃথিবীতে। এরপর হঠাৎ মনে হলো এই শেকলটা একটা গাছে রূপ নিয়েছে। তার একটা পাতায় একটা আলোকচ্ছটা (আলোক-রশ্মি, আলোর টুকরো)। সবাই ঘিরে আছে সেই আলোকচ্ছটাকে।

এ-স্বপ্ন শুনে সবাই ভীষণ খুশি হলো। স্বপ্নের ব্যাখ্যায় কেউ কেউ বললো: -আপনার বংশে জন্ম নেবেন এক মহা পুরুষ। দুনিয়া-জোড়া হবে তাঁর খ্যাতি। পূর্ব-পশ্চিমের অগণিত মানুষ তাঁকে মানবে। তাঁর আদর্শ অনুসরণ করবে।

সবাই আবদুল মুত্তালিবকে নতুন করে অভিনন্দন জানালো। মুবারকবাদ দিলো। শেষে জানতে চাইলো: -মান্যবর সরদার! কী নাম রাখবেন তাঁর?
তিনি বললেন: -আমি তার নাম রাখবো মুহাম্মদ! যাতে সবাই তার প্রশংসা করে, স্তুতি গায়! এই জমিনে যারা আছে তারাও এবং ঐ আকাশে যারা আছে তারাও!

প্রিয় বন্ধু! মুহাম্মদ-এর আগমনের এ-সুসংবাদের সাথে সাথেই আমি -আবরাহার হাতি- বিদায় নিচ্ছি। ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে ত্রাস ছড়ানো এক বিশাল হাতির জীবন। তবে শেষ বেলায় তোমাদেরকে জানিয়ে যেতে চাই- আবরাহাদের দিন শেষ। এখন বেঁচে থাকবে শুধু কা'বা! ততোদিন, যতোদিন বেঁচে থাকবে এই আকাশ, এই পৃথিবী! কা'বার দিকে মুখ করে দাঁড়াবে প্রতিদিন পাঁচবার নামাজের সময় তাঁর উম্মত! হ্যাঁ, এ সবই ইতিহাসের বুকে লুকিয়ে থাকা কথা! জানিয়ে দিলাম তোমাদেরকে! তাতে যদি একটু ঘোচে আমার আবরাহার হাতি হওয়ার কালো দাগ!

﴿ أَلَمْ تَرَ كَيْفَ فَعَلَ رَبُّكَ بِأَصْحَابِ الْفِيلِ. أَلَمْ يَجْعَلْ كَيْدَهُمْ فِي تضليل. وَأَرْسَلَ عَلَيْهِمْ طَيْراً أَبَابِيلَ . تَرْمِيهِمْ بِحِجَارَةٍ مِنْ سَجِّيلٍ. فَجَعَلَهُمْ كَعَصْفِ مَأْكُولٍ . ﴾

'তুমি কি দেখো নি তোমার প্রতিপালক হস্তিবাহিনীকে কেমন করে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন? তিনি কি তাদের (কা'বা ধ্বংসের) চক্রান্ত ভণ্ডুল (ব্যর্থ বা অকৃতকার্য) করে দেন নি? আর তাদের বিরুদ্ধে পাঠান নি কি ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষুদে পাখি? যারা তাদের উপরে ছোট ছোট পাথরকণা ছুঁড়ে মারছিলো! অতঃপর তাদেরকে পশু-চাবানো ঘাষের মতো ভর্তা বানিয়ে দিয়েছিলো!' -সূরা ফিল

📘 গল্পে আঁকা সীরাত হে মুহাম্মদ > 📄 আমি মা হালিমার সেই বাহন

📄 আমি মা হালিমার সেই বাহন


হালিমা সা'দিয়ার নাম শুনেছো? আমি তার কাছেই থাকি। অনেক দিন থেকেই। তিনি একজন আদর্শ দাঈ-মা। মায়েরা নিজেদের আদুরে দুলালদের (দুধ-শিশুদের) তার কাছে পাঠিয়ে দেন, আর তিনি তাদেরকে দুধপান করিয়ে করিয়ে গড়ে তোলেন মাতৃ মমতায়। আমি যে সময়ের কথা বলছি তখন তো আর কৌটাজাত গুঁড়ো দুধ ছিলো না। তাই আরবের শহুরে মায়েরা পল্লীগ্রামের দাঈ-মা'দের কাছে দুধ-শিশুদের পাঠিয়ে দিতেন। অবশ্য পল্লীগ্রামের বিশুদ্ধ ভাষা ও স্বাস্থ্যকর আবহাওয়ায় শিশুদের বেড়ে ওঠার বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো।

হালিমা'র ধন ছিলো না, তবে ধনী একটা মন ছিলো। স্বামী হারিসকে নিয়ে থাকেন তিনি তায়েফ নগরী থেকে আশি কিলোমিটার দূরে শোহাতা পাহাড়ি উপত্যকায়, তাঁবু-সদৃশ ছোট্ট একটা 'কুটিরে' (গৃহে)। ঐ এলাকাটা ছিলো অনুর্বর, বৃষ্টি-বাদলা হয় না বললেই চলে। আর সবুজে আঁকা বন-বনানী এবং তার রূপ-রুপালী, মরুর দেশে সে তো কল্পনার ছবি! সুতরাং ওখানে চাষবাসে মোটেই সুবিধা করা যেতো না। এ দিকে আমিও দুবলা (শীর্ণ ও দুর্বল) পাতলা। নিজের দেহটাকে টেনে বেড়ানোই ছিলো এক কাজ। তবুও আমি তাদের সঙ্গেই ছিলাম, সঙ্গেই আছি। তাদের যে-কোনো উপকারে দেহ-মন উজাড় করে দিই। তারা খুব ভালো মানুষ। অমন ভালো মানুষের উপকারে পিছিয়ে থাকবো- তেমন অকৃতজ্ঞ আমি নই।

একদিন আমি তাঁবুর সামনে দাঁড়িয়ে আছি। হালিমা ধীর পায়ে এগিয়ে আসছেন আমার দিকে। দাঁড়ালেন এসে একেবারে আমার কাছটি ঘেঁষে। হালিমা আমার পাশে অমন করে দাঁড়ালে আমার খুব ভালো লাগে। আজ কি তিনি দূরে কোথাও যাবেন? নাকি আমাকে নিয়ে চারণভূমিতে যাবেন? চারণভূমিতে গেলেই ভালো। ভীষণ খিদে পেয়েছে আমার। আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম, দেখি কী হয়—কোথায় যান। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে হালিমা কী যেনো ভাবলেন। তারপর আমার লাগামটা হাতে নিলেন। তারপর আমার উপর চেপে বসলেন।

না, যা ভাবছিলাম তাই হলো। যা চাইছিলাম তা হলো না। মানে একটা দূরের সফরের জন্যে তিনি বের হচ্ছেন। তবু আমার মন খারাপ হলো না। হালিমার উপর কখনো আমার মন খারাপ হয় না। সাথে আছে তার ছিঁচকাঁদুনে শিশুটাও। ছিঁচকাঁদুনে বলার কারণ আছে। কান্না শুরু করলে ও আর থামতে চাইতো না। কী করবে বেচারা! দুধের শিশু দুধ না পেলে তো কাঁদবেই! আর বৃষ্টিহীন ফসলহীন সা'দপল্লীতে মা হালিমা'র বুকে দুধ আসবে কোত্থেকে? বাচ্চাটার কান্না আমাকে খুব কষ্ট দেয়। তখন আমি নিজের খিদের কথা ভুলে যাই। আমি তো অনেক বড়, খিদের জ্বালা সইতে পারি। কিন্তু ও তো ছোট দুধশিশু, কেমন করে সইবে ক্ষুধার কষ্ট? আমাদের সঙ্গে আছেন হালিমার স্বামী— হারিসও। আরো যোগ দিয়েছে বনু সা'দ এর বেশ ক'জন মহিলা। হারিস চেপে বসেছেন তার অতি বয়স্ক উটনীটিতে। আমরা রওয়ানা হয়ে গেলাম। মরুভূমির পথ কেটে কেটে ধীরে ধীরে সামনে বাড়তে লাগলাম।

সেদিন প্রচণ্ড গরম পড়েছিলো। ক্ষুধায়-গরমে আমার অবস্থা কাহিল। অনেক কষ্টে পা ফেলে ফেলে চলছিলাম। মনে হচ্ছিলো, আমার চেয়ে আমার পায়ের ওজনই বেশী। আসলেই আমি ছিলাম সীমাহীন ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত সফরের অনুপযোগী। এদিকে ওই শিশুটা অবিরাম কেঁদেই চলেছে। আমার ক্লান্তির ওইটাও একটা কারণ। কেননা আমি শিশুদের কষ্টের কান্না-ক্ষুধার কান্না সইতে পারি না। মা হালিমা ওকে দুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু কোথায় দুধ! বুক শুকিয়ে কাঠ! এক কাতরা দুধও বাচ্চাটার মিললো না। আমার বড়ো মায়া হলো। ইস্! নিষ্পাপ শিশুটা একটু দুধের জন্যে কী কষ্ট করছে! মা হালিমার চোখ ছলছল করে ওঠে চিরন্তন মাতৃমমতায়। আমার চোখও ভিজে ওঠে শিশু-মমতায়! হারিস একটু উষ্মা মেশানো কণ্ঠে বললেন: -নিজের শিশুকেই তুমি দুধ পান করাতে পারছো না, কেনো তবে আরেক শিশুকে আনতে যাওয়া?!

হালিমা শান্ত কণ্ঠে জবাব দিলেন: -আরেকটা শিশু এলে আমরা তার পরিবারের কাছ থেকে কিছু-না-কিছু পারিশ্রমিক পাবোই। তাই দিয়ে আমাদের দিন বেশ চলে যাবে। দুঃখের দিন কিছুটা হলেও ঘুচবে। আমার বুকেও দুধ আসবে। তখন এ-ও খাবে, ও-ও খাবে। আমরা চেষ্টা করবো কোনো ধনীর দুলালকে নিয়ে আসতে। তাহলে আমাদের পারিশ্রমিকটা একটু বেশী হবে। হারিস আর কথা বললেন না।

আমি নীরবে শুনলাম তাদের কথা, যেনো ছোট ছোট দুঃখকণা! আবার আমার চোখ ছলছলিয়ে উঠলো! অবশ্য অজানা একটা আনন্দও আমার মনে দোল দিয়ে গেলো! যদিও আমি বুঝতে পারছিলাম না আমরা কোথায় যাচ্ছি। আমি হারিসের উটনীটির কাছে জানতে চাইলাম: -এই! আমরা কোথায় যাচ্ছি? ওর আবার মরু-পথঘাট সব জানা। বয়স তো আর কম হয় নি, আমার চেয়ে ঢের বেশী। কতো জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হয়েছে ওকে, দিনের পর দিন, রাতের পর রাত। তাই চট করে জবাব দিলো: -আমরা মক্কায় যাচ্ছি!

মক্কার কথা শুনে আমার মনটা আনন্দে দুলে উঠলো। মক্কা-যে আমার ভীষণ প্রিয়! খুশিতে আমি হেলে-দোলে পথ চলতে লাগলাম। আমি দ্রুত পথ চলার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু পারছিলাম না। কীভাবে পারবো, শরীরটায়-যে কিছু নেই, একেবারেই দুবলা-পাতলা, পথ চলছিলাম সবার পেছনে পেছনে।

আমরা এক সময় মক্কায় পৌঁছে গেলাম। হালিমা বেরিয়ে গেলেন শিশুর খোঁজে। ছুটোছুটি করতে লাগলেন এখানে ওখানে। অনেকক্ষণ পর ফিরে এলেন হালিমা। কিন্তু মুখে তার হতাশার ছায়া। যেনো মুখজুড়ে লেপটে আছে পৌঁচ-পোঁচ দুঃখ ছাপ। স্বামীর পাশে বসতে বসতে তিনি বললেন:
-মনে হচ্ছে শূন্য হাতেই আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে, যেমন এসেছিলাম তেমন। সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে আরো ক্ষুধা, আরো কষ্ট, আরো ক্লান্তি! আমি ছাড়া আর সবাই বাচ্চা পেয়ে গেছে। এদিকে আর বাচ্চাও নেই- একটি এতিম ছাড়া!

তার কথা শুনে আমার মনটা বিষাদে ভরে গেলো। হায় বেচারি, কতো আশা নিয়ে এসেছিলেন! এখন কী হতাশাই না তাকে ঘিরে ধরেছে! কেউ তাকে বাচ্চা দিতে চাইছে না। হয়তো কেউ-ই তাকে পছন্দ করছে না। তার দারিদ্র দেখে, তার স্বাস্থ্যহীনতা দেখে। কিন্তু তার মনটা-যে আকাশের মতো উদার, তার কোলে যে কোনো দুধশিশুই-যে গভীর মমতায় জড়িয়ে থাকে— সে খবর কেউ জানলো না! যদি জানতো! কিন্তু ওই এতিম বাচ্চাটাকেই কেনো নিয়ে নিচ্ছেন না তিনি?! আমার মন কেনো যেনো নিজের অজান্তেই ওই না-দেখা এতিম বাচ্চাটার ভালোবাসায় দুলে উঠলো!

একটু বিশ্রাম নিয়ে হালিমা আবার বেরুলেন বাচ্চার সন্ধানে। অনেকক্ষণ পর তিনি ফিরে এলেন, তাঁর কোলে একটা বাচ্চা— ফুটফুটে একটা দুধশিশু। ভীষণ পুলকিত মনে হচ্ছিলো হালিমাকে। দূর থেকেই স্বামীকে লক্ষ্য করে হর্ষধ্বনি করে উঠলেন তিনি: -আল-হামদুলিল্লাহ!

আমরাও তার পুলকে জেগে উঠলাম— বাচ্চা তাহলে পাওয়া গেছে! আমার মনে হলো; এ-ই সেই এতিম—আমার অজানা ভালোবাসা!! কাছে আসতেই আমি একটা ঘ্রাণ পেলাম, ভীষণ মিষ্টি ঘ্রাণ। অন্য রকম মিষ্টি ঘ্রাণ। যেনো মেশক আম্বরের ঘ্রাণ। আর এ-যে বয়ে নিয়ে-আসা এ-বাচ্চারই ঘ্রাণ, তাতে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ রইলো না। কী সুন্দর ফুটফুটে চেহারা! হালিমার কোলে যেনো পূর্ণিমার চাঁদ নেমে এসেছে! মিটিমিটি হাসছে! মায়াবি আলো ছড়াচ্ছে! হারিস কাছে গেলেন। আরো কাছে। গভীর দৃষ্টিতে তার চেহারার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাকিয়েই রইলেন। যেনো কতো কালের চেনা কোনো প্রিয় মুখ অনেক কাল পর তিনি দেখছেন! হারিসের চোখে মুখে আনন্দোডাস ঝলমল করতে লাগলো। তিনি আনন্দ-প্লাবিত কণ্ঠে বললেন: -কার মাণিক নিয়ে এসেছো তুমি হালিমা!

-এর নাম মুহাম্মদ! মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ বিন আবদুল মুত্তালিব। ওর দাদা কোরাইশ সরদার। ও এতিম—বাবা বেঁচে নেই, ওর জন্মের ছয় মাস আগেই চলে গেছেন। মা—আমেনা বিনতে ওয়াহব, কোরাইশ গোত্রের বিদূষী মহিয়সী নারী।

সব শুনে হারিসের আনন্দের কোনো সীমা রইলো না। তিনি খুশিতে গদগদ হয়ে তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে গেলেন এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই সা'দপল্লীতে ফিরে যাওয়ার তোড়জোড় শুরু করে দিলেন।

আশ্চর্য! হালিমার ছিঁচকাঁদুনে বাচ্চাটি এখন আর কাঁদছে না! বরং ও ছিলো বিস্ময়করভাবে হাসিখুশি! কারণ কি শুধু এই যে ও এইমাত্র অনেক দিন পর তৃপ্তিভরে মায়ের দুধ পান করেছে! যা একটু আগেও ছিলো অকল্পনীয়! কিন্তু যেই মুহাম্মদ এলো অমনি হালিমার দুধহীন শূন্য বুকেও মাতৃদুধের যেনো বান ডেকে গেলো! আল্লাহ্র কী মহিমা! সেই দুধ পান করে শিশুটি এখন তৃপ্ত, পরিতৃপ্ত! তাহলে এখন কেনো ও আর কাঁদবে?! আমার মনে প্রশ্ন জাগে— মুহাম্মদের মতো দুধভাই প্রাপ্তি, সেও কি কান্না বন্ধ হয়ে যাওয়ার আরেকটা কারণ?!

এবার ফিরে যাওয়ার পালা। আবার হালিমা আমার উপর বসলেন। এখন তার সাথে একজন নয়, দু'জন শিশু নিজের সন্তান আর শিশু মুহাম্মদ। হারিস চড়ে বসলেন নিজের বাহনে-বৃদ্ধ উটনীটিতে। শুরু হলো ফিরতি সফর। আমি আবিষ্কার করলাম, এবার আমার চলার গতি দ্রুত, বিস্ময়কর দ্রুত! আমাদের সঙ্গে যারা মক্কা থেকে বেরিয়েছিলো তাদেরকে পেছনে ফেলে এবং যারা আমাদেরকে পেছনে ফেলে আগে চলে গিয়েছিলো তাদেরকেও পেছনে ফেলে আমি আগে চলে গেলাম! আগে মক্কার কথা শুনে ‘কল্পনায়’ আগে আগে চলছিলাম, এখন বাস্তবেই আগে আগে চলছি! এমন তো হবেই! কেননা আমি প্রচুর শক্তি অনুভব করছিলাম। ভীষণ তৃপ্তি অনুভব করছিলাম। মনে হচ্ছিলো, যেনো আমি সারাদিন চারণভূমিতে ঘুরে ঘুরে ঘাস খেয়ে এই মাত্র ফিরেছি, হৃষ্টপুষ্ট হয়ে।

এদিকে হারিসের বৃদ্ধ উটনীটিকে চেনাই যাচ্ছিলো না। বাবা, সে কী গতি! আমাকে পেছনে ফেলে ছুটে চলেছে ঊর্দ্ধশ্বাসে, যেনো একটা তেজি ঘোড়া!

হ্যাঁ সবাইকে পেছনে ফেলে আমরা সময়ের বেশ আগেই পৌঁছে গেলাম সা'দপল্লীর তাঁবুতে— হালিমা ও হারিসের তাঁবুতে। তাঁবুতে পৌঁছে দেখি বরকতের অমিয়ধারায় সব 'সয়লাব'!
বিরান সা'দপল্লী এখন উর্বরা!
পাতাঝরা শূন্য গাছে এখন সবুজ সবুজ কিশলয়!
আর ঊষর প্রকৃতি যেনো গায়ে চড়িয়েছে সবুজের চাদর!
ঘাসহীন চারণভূমিতে লকলক করছে সবুজ ঘাসেরা!
বদলে গেছে আকাশ!
বদলে গেছে বাতাস!
বদলে গেছে মানুষ!
বদলে গেছে তাঁবু!
বদলে গেছে আশপাশের সবকিছু!
কী মজা! মুহাম্মদ আসার পর সব বদলে গেছে!
সব বদলে গেছে!
হে মুহাম্মদ!
তুমি এতিম নও শুধু, তুমি মানিক, পরশ পাথর!
তুমি সবকিছু বদলে-দেওয়া মানিক!
স্বাগতম তোমাকে হে মুহাম্মদ সা'দপল্লীতে!

কয়েকদিনেই আমরা—মেষ-দুম্বা-উটনী-গাধা— বেশ মোটাতাজা হয়ে গেলাম। আর হালিমা! তার আনন্দের কথা আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। এর আগে নিজের বাচ্চাটাকেই তিনি দুধ পান করাতে পারতেন না। আর এখন তার দুধ এতো বেড়ে গেছে যে, নিজের বাচ্চার জন্যে যথেষ্ট হয়ে শিশু মুহাম্মদের জন্যেও যথেষ্ট হয়ে আরো অনেক অনেক থেকে যায়। আল্লাহ্র কী মহিমা! হারিসও ছিলেন সীমাহীন আনন্দিত। তাঁর চোখে মুখে সব সময় লেগে থাকতো আনন্দ ও তৃপ্তির আভা, যা আগে আমি কখনো দেখিনি!

আমি ছিলাম মা হালিমার প্রিয় বাহন। তিনি কোথাও গেলে আমাকেই নিয়ে যেতেন। মুহাম্মদ আসার পর তাঁকেও সঙ্গে নিতে তিনি ভুলতেন না। শিশু মুহাম্মদকে নিয়ে তিনি মনের হরষে আমার পিঠে চড়ে বসতেন, এখানে ওখানে যেতেন। নিজের মেষপাল তদারক করতেন। মুহাম্মদকে নিয়ে যখন হালিমা আমার পিঠে বসতেন তখন আমার কী-যে ভালো লাগতো, সে কথা বলে বোঝাতে পারবো না। ভর দুপুরের তপ্ত মরুতেও তাদেরকে নিয়ে ঘুরে বেড়াতে আমার একদম খারাপ লাগতো না—কোনো কষ্ট হতো না। বরং অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করতাম, দূর আকাশের বুকে একটা মেঘখণ্ড যেনো সূর্যিমামার প্রচণ্ড দাহ থেকে আমাদেরকে বাঁচিয়ে রাখছে—ছায়া দিচ্ছে! জীবনে কতোজনকে নিয়ে মরুর বুকে আমি কতো ঘুরে বেড়িয়েছি, কিন্তু এমন মজা তো আর পাই নি! এই আশ্চর্য প্রশান্তি তো কখনো অনুভব করি নি! ভর দুপুরে অমন বাদল-ছায়ার আয়োজন তো আর চোখে পড়ে নি!

মনে আমার কতোবার প্রশ্ন জেগেছে— কে এই এতিম? কে তুমি হে মুহাম্মদ? কেনো তোমার এতো শান? কেনো তোমার এতো মান— প্রকৃতির কাছে.. মেঘের কাছে? ভবিষ্যতের কোন্ মহাপুরুষ লুকিয়ে আছে তোমার ভিতর?

এভাবেই সপ্তাহ গড়িয়ে মাস, মাস গড়িয়ে বছর তারপর বছর ঘুরে এসে গেলো আরেক বছর। তারপর আরেক বছর। মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এখন দু' বছর পেরিয়ে তৃতীয় বছরে পা রেখেছে। ইতিমধ্যেই ওর দুধ ছাড়ানো হয়েছে। এ-বয়সের শিশু আর কতোটুকুন বড়ই-বা হয়! কিন্তু মুহাম্মদ সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। দু'বছর না পেরুতেই বয়সের তুলনায় ও অনেক বেশী স্বাস্থ্যবান ও বাড়ন্ত হয়ে উঠেছে। এদিকে দু'বছর পর মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার একটা কথা ছিলো। কিন্তু মা হালিমা মনে-প্রাণে চাইছিলেন মুহাম্মদ তার কাছে আরো অনেক দিন থাক। অমন বরকত-শিশুকে কে হাতছাড়া করতে চায়? কে হারাতে চায় অমন চাঁদমুখ? তার স্নিগ্ধ ছায়া থেকে কে বঞ্চিত হতে চায়? সত্যি কথা বলতে কি, আমিও চাইছিলাম।

মুহাম্মদ আরো অনেক দিন থাকবে আমাদের মাঝে। তাকে দেখে দেখে চোখ জুড়াবো আর বয়ে বয়ে ঘুরে বেড়াবো- মন ভরবো। এখানে ওখানে, যেখানে মনে চায় সেখানে। 'সবুজ ঘাসের সজীব' দুনিয়ায়। তাঁর বরকতের বৃষ্টিতে পরিস্নাত সা'দ পল্লীর মুক্ত আঙ্গিনায়। ক্লান্তিহীন-শ্রান্তিহীন।

অমন সোনার ছেলেকে পিঠে নিতে কার-না সাধ হয়?
অমন বরকতি শিশুর স্পর্শে কে-না শিহরিত হয়?

কিন্তু আমরা চাইলেই তো হবে না! ওদিকে মা আমেনাকেও-যে চাইতে হবে! দু'চাওয়া এক হলেই কেবল আমরা পাবো মুহাম্মদকে, আরো অনেক দিন, অন্তত কিছুদিন। কিন্তু এখন তো তাঁকে এখানে সা'দপল্লীতে রাখার আর সুযোগ নেই! নিয়ে যেতে হবে, হবেই, মক্কায়। ফিরিয়ে দিতে হবে। তখন মা আমেনার মন গললে, দু'চাওয়া এক হলে আবার আসবে মুহাম্মদ সা'দপল্লীতে। নইলে এ-ই শেষ বিদায়! অশ্রু-ছলোছলো বিদায়!!

কিন্তু এটা মানতে আমার মন কোনভাবেই প্রস্তুত হচ্ছে না! (কী অবুঝ মন আমার!)

একদিন হালিমা মুহাম্মদকে নিয়ে আমার পিঠে চেপে বসলেন। রওয়ানা হলেন মক্কায়, মা আমেনার কাছে। সারাটা পথই তিনি ছিলেন বিমর্ষ। নীরব আচ্ছন্নতায় মলিন। এ-যে মুহাম্মদের আসন্ন বিরহ-কাতরতার দুঃখ-দুঃখ ছাপ-তা বুঝতে আমার একটুও কষ্ট হলো না। নিজের অজান্তেই আমার চোখের পাতা ভিজে গেলো। মা আমেনা কি রাখবেন আমাদের আবেদন? 'না' বলে দিলে শূন্য হাতে কেমনে ফিরবো আমরা? আমি কেমনে তাকাবো মা হালিমার ভেজা চোখের দিকে? কেমন করে সইবো মুহাম্মদের মহা বিরহ?

আমরা মক্কায় পৌঁছে গেলাম। ঐ তো দেখা যাচ্ছে মা আমেনার ছোট্ট ঘরটা। হালিমা মুহাম্মদকে নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলেন। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম বাইরে, মা আমেনার ঘরের পাশটি ঘেঁষে, উৎকর্ণ হয়ে।

একটু পরই শুনতে পেলাম হালিমার কণ্ঠ, ব্যাকুল কণ্ঠ! হৃদয় ছুঁয়ে-যাওয়া উদ্বেল কণ্ঠ! তিনি আমেনার কাছে আবদার করেছেন, মুহাম্মদ-স্নেহে কাঁপা-কাঁপা কণ্ঠে, মুহাম্মদকে আরো কয়েকটা দিনের জন্যে তার সাথে সা'দপল্লীতে পাঠাতে! এ-আবদারের সামনে মা আমেনা নরম হয়ে গেলেন! তার মনটা-যে নরম! তিনি 'না' বলতে পারলেন না! এমন-যে হবে তা আগেই আমার মন সাক্ষ্য দিচ্ছিলো! কিন্তু এতো সহজেই-যে হবে তা ভাবতে পারি নি! আবারও আমার চোখের পাতা ভিজে গেলো! একটু আগে আমি কেঁদেছিলাম মুহাম্মদের বিরহ-আশঙ্কায়, মা হালিমার বিমর্ষতায়। এখন কাঁদছি এক ধাত্রীর কাছে এক মহিয়সী নারীর নিজের ছেলেকে সঁপে দেওয়ার অপার মহানুভবতায়!!

মক্কা ছেড়ে আমরা তায়েফের পথ ধরলাম। হালিমার বিমর্ষতা এখন রূপ নিয়েছে হর্ষোচ্ছ্বাসে! আর আমি তো আনন্দের আতিশয্যে যেনো উড়ে উড়েই ছুটছিলাম! যে-ই আমাকে দেখছে বিশ্বাস করতে পারছে না আমি হালিমার সেই দুবলা-পাতলা গাধাটি! হারিসের সাথে দেখা হতেই তিনিও তাকালেন অবিশ্বাস্য চোখে! যেনো হারানো মানিক ফিরে এসেছে কোলে! আমার কাছে মনে হলো সমগ্র সা'দপল্লীই যেনো আবার মেতে উঠেছে আনন্দ-কলরবে— কী আনন্দ.. কী মজা! আবার এসেছে আমাদের প্রিয় মুহাম্মদ! হ্যাঁ, আবার নামলো আমাদের আকাশে বরকতের বৃষ্টি! এ বৃষ্টিতে স্নাত হচ্ছি আমরা, আমাদের প্রকৃতি! ঠিক আগের মতোই! বরং আরো বেশী করে! আরো মুষলধারে!

সবাই আমাদেরকে ঈর্ষা করতে লাগলো! আমাদের আকাশের নীচে স্নাত হতে চাইলো! সবাই অবাক বিস্ময়ে আমাদের উপর মুহাম্মদী বৃষ্টির বর্ষণ দেখতে লাগলো! আমাদের মেষপাল যেখানে, সেখানে এসে ভীড় জমায় অন্যদের মেষপাল- বরকত লাভের আশায়, স্নাত হওয়ার বাসনায়! কিন্তু কী আশ্চর্য! আল্লাহর কী লীলা!! আমরা ভিজি বৃষ্টিতে 'না চাইতেই' আর ওরা ভিজতে পারে না- শত চেয়েও! অথচ একই আকাশ, একই বাতাস! একই মাটি, একই প্রকৃতি! রহস্য কী? আল্লাহই ভালো জানেন! তবে আমার মনে হয়; আমাদের আছে মুহাম্মদ ওদের নেই মুহাম্মদ- এটাই রহস্য!!

একদিন হালিমার ছেলেটা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো, সারা মুখে লেগে আছে উৎকণ্ঠার ছাপ! এসেই চীৎকার করে বলতে লাগলো:
-মা! মা! জানো কী হয়েছে! হঠাৎ ধবধবে সাদা পোশাকের দু'টি লোক আমাদের কোরাইশী ভাইকে ধরে নিয়ে গেছে পাহাড়ের আড়ালে! হারিস উৎকণ্ঠাভরে বললেন:
-কী! কী বলছো তুমি? ধরে নিয়ে গেছে মানে! ও তো আমাদের কাছে আমানত! ওর নিরাপত্তার সকল দায়-দায়িত্ব তো আমাদের! হালিমার ছেলেটা বলে চললো:
-তারপর আমি দেখলাম, একজন ভাইয়াকে শুইয়ে দিয়ে বুক ফেঁড়ে ফেলেছে! আরেকজন বুকের ভিতরে কী যেনো খুঁজে বের করে ছুঁড়ে ফেলে দিলো!
-তারপর?!
-তারপর চলে গেলো! একটু পরই দূরে মিলিয়ে গেলো!

হালিমা ও হারিস ঊর্দ্ধশ্বাসে ছুটে গেলেন অকুস্থলে। আমি নিজে গিয়ে হাজির হলাম সেখানে। গিয়ে দেখি— কই, তেমন কিছু চোখে পড়ছে না তো! মুহাম্মদ সুশান্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে! এক টুকরো মিষ্টি হাসি লেগে আছে ওর নূরানি চেহারাজুড়ে। না, ওর কোনো সমস্যা হয় নি। সব ঠিক আছে। কিন্তু সব ঠিক থাকলেও মুহাম্মদের মুখে সব শোনার পর হারিস বেশ ঘাবড়ে গেলেন। হালিমাকে জানালেন তার ভয়ের কথা আশঙ্কার কথা এবং সিদ্ধান্ত নিলেন দ্রুতই মুহাম্মদকে মক্কায় মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে আসবেন।

মুহাম্মদ আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। কিন্তু যে-বরকত তিনি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন তা আমাদেরকে ছেড়ে গেলো না। আমাদের জন্যে রেখে গেছেন তিনি বৃষ্টি। রেখে গেছেন সবুজে ছাওয়া দৃষ্টিকাড়া প্রকৃতি। খুলে দিয়ে গেছেন জীবন-জীবিকার অবারিত দিগন্ত। আমাদেরকে তিনি আরো দিয়ে গেছেন সুখ-শান্তি-সৌভাগ্য, যা দিনে দিনে আরো অনেক বেড়ে গিয়েছিলো। পরবর্তীতে অবশ্য আমরা জানতে পারি যে, ঐ লোক দু'জন আসলে ছিলেন আসমানী ফেরেশতা। এসেছিলেন মুহাম্মদের হৃদয়টাকে ধুয়ে মুছে পরিচ্ছন্ন করে দিয়ে যেতে। আগামী দিনের মহা গুরুভার বহনে তাঁকে প্রস্তুত করে তুলতে। এ-সব জানার পর আমার সৌভাগ্যের অনুভূতি আমার ভিতরে কলরব করে উঠলো—
আহা! এমন মুহাম্মদকেই আমরা পেয়েছিলাম এতো কাছে, এতো আপন করে! তাঁকে পিঠে নিয়ে আমি ঘুরতে পেরেছি, সা'দপল্লীর বাঁকে বাঁকে, পাহাড়ের উপত্যকায় উপত্যকায়! ধন্য আমার বাহন-জীবন!!

📘 গল্পে আঁকা সীরাত হে মুহাম্মদ > 📄 আমি কালো পাথর বলছি

📄 আমি কালো পাথর বলছি


আমি পাথর। কিন্তু অন্যসব পাথরের মতো নই। যে-সব পাথর দিয়ে তোমরা ঘর বানাও, মাদ্রাসা নির্মাণ করো কিংবা কারখানা তৈরী করো, তেমন পাথর নই আমি। আমি অনেক দামী পাথর। পৃথিবীতে যতো দামী পাথর আছে বা থাকতে পারে, তার চেয়েও আমি দামী। হীরে-মোতি-পান্না'র চেয়েও অনে-ক দামী। পাথর হলেও আমি আমিই। জুড়িহীন। সঙ্গিহীন। তুলনাহীন, আমার কোনো তুলনা নেই। আমার তুলনা শুধুই আমি।

আমার ইতিহাস জানতে চাও? আমি যেমন পুরোনো তেমনি মহিমান্বিত। আমি যেখানে অবস্থান করছি, তাও চির মহিমান্বিত। অর্থাৎ পৃথিবীর প্রথম ঘর—কা'বা—এর একটা কোণে আমাকে স্থাপন করা হয়েছে, যা নির্মাণ করেছিলেন হযরত ইবরাহীম এবং তাঁর ছেলে হযরত ইসমাঈল। এবার চিনতে পেরেছো আমায়? হ্যাঁ, আমি হাজরে আসওয়াদ—কালো পাথর! আরেকটা বড় পরিচয় বলে দিচ্ছি তোমার কানে কানে, আমি জান্নাত থেকে এসেছি!

এবার আমার গল্প শোনো—

একবার আকস্মিক বন্যায় কা'বাঘর ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হলো। নতুন করে তা সংস্কারের প্রয়োজন দেখা দিলো। আর মক্কাবাসীরা সে সংস্কার-কর্ম সম্পাদনও করলো, সব গোত্র মিলে। কিন্তু শেষে তারা আমাকে আমার নির্দ্ধারিত জায়গায় স্থাপন করতে যেয়ে মতবিরোধে জড়িয়ে পড়লো। এ-মতবিরোধ গড়াতে গড়াতে একেবারে 'যুদ্ধ-উত্তেজনায়' রূপ নিলো। এক গোত্র বললো:
-এ কাজ আমরা করবো! আরেক গোত্রের দাবি:
-না, এ-কাজ আমাদের, আমরা করবো! আরেক গোত্রের হুঙ্কার:
-অসম্ভব! এ-কাজ শুধু আমাদের, আমরাই করবো! কেউ বাধা দিতে এলে আমরা হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকবো না!

এভাবে আওয়াজ বাড়তে লাগলো। উত্তেজনা উত্তাপ ছড়াতে লাগলো। সবাই উচ্চকণ্ঠ হতে লাগলো। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলো। সব গোত্র তীর-তৃণীর আর ঢাল-তলোয়ার নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলো! যুদ্ধটা বুঝি বেধেই যায়! কোনো শান্তিপূর্ণ সমাধান মনে হচ্ছে অনে-ক দূরে, কিংবা অসম্ভব।

আমি ভীষণ অসহায় বোধ করতে লাগলাম। কারণ, কারণটা-যে আমিই! যুদ্ধ যদি বেধেই যায়, রক্ত যদি বয়েই যায়, তাহলে আমি-যে লজ্জায়-আফসোসে একেবারে এতোটুকু হয়ে যাবো! পরিস্থিতি যতোই যুদ্ধের দিকে মোড় নিচ্ছে আমার অস্থিরতা ততোই বাড়ছে। কী করবো এখন আমি? পাথর হয়ে কী-করে মানুষকে শান্তির পথে আনবো? হঠাৎ মনে হলো, দু’আ তো করতে পারি! আমার রবের কাছে মিনতি তো জানাতে পারি! তিনি আমার তাসবীহ শোনেন, তাহলে তো দু’আও শুনবেন! অবশ্যই শুনবেন!

শুরু করলাম দু’আ— ‘আমার আল্লাহ! ওদেরকে সুমতি দাও! ফেরাও ওদেরকে এ অকারণ যুদ্ধ থেকে! ওদেরকে এক করে দাও! ওদেরকে নেক করে দাও! ওদের মাঝে ঐক্য এনে দাও! আমার মালিক! ওরা-যে সবাই এখন কা’বার আঙ্গিনায়! মসজিদুল হারামে! নিরাপত্তা ও শান্তির জায়গায়! এখানে যে আসে সেই-না নিরাপদ! তবে কেনো এই যুদ্ধ-যুদ্ধ ডঙ্কা? কেনো এই বেসামাল উত্তেজনা? আল্লাহ, আমার আল্লাহ! রহম করো! দয়া করো!…’

হঠাৎ কানে এলো, একটি বুদ্ধিদীপ্ত গম্ভীর কণ্ঠ— 'হে সম্প্রদায়! হে উন্মত্ত জনতা! এ কী উন্মাদনা? জানো কি, কী এর পরিণতি? জানো, কোথায় গিয়ে ঠেকবে, এ-উত্তেজনার জের? এই 'হারামে' দাঁড়িয়ে তোমরা লড়াই করতে চাও? তোমরা কি বিবেকের মাথা খেয়েছো! সাবধান! ক্ষান্ত হও! সংযত হও! বিবেককে জাগ্রত করো! যুক্তির কাছে ফিরে এসো! শয়তানকে বিতাড়িত করো! মিমাংসায় আসো! আসতেই হবে!!'

তার কথায় বেশ কাজ হলো। উত্তেজনা হ্রাস পেলো। একজন বললো: -বলুন তবে, আমাদের কী করতে হবে! তিনি একটু ভেবে নিয়ে বললেন:
-আমার প্রস্তাব হলো, যে ব্যক্তি আমাদের নিকট এই 'সাফা প্রবেশদ্বার' দিয়ে প্রথম প্রবেশ করবে, তাকেই আমরা মিমাংসাকারী হিসাবে মেনে নেবো। তার কথাই হবে আমাদের কথা। তার মতই হবে আমাদের মত। আমরা মনে করবো, আল্লাহ-ই তাকে পাঠিয়েছেন!'

সবাই তার প্রস্তাব পছন্দ করলো। মুহূর্তেই উত্তেজনা দূর হয়ে গেলো। সবাই শান্ত হলো। আমার অস্থিরতাও দূর হলো। এই ভেবে মনটা প্রশান্তিতে ভরে গেলো যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার দু'আ কবুল করেছেন!

এবার অপেক্ষার পালা। সবাই অপলক চোখে ‘সাফা প্রবেশদ্বার’-এর দিকে তাকিয়ে রইলো। এই বুঝি আসছে কেউ! চলতে লাগলো অপেক্ষা। গড়াতে লাগলো প্রতীক্ষার অধীর প্রহর। সবাই মনে প্রাণে চাইছিলো, আগমনকারী যেনো হয় সুবিচারক ও সুবিবেচক এবং বিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ। যাতে সবাই মেনে নিতে পারে তার বিজ্ঞোচিত প্রাজ্ঞোচিত ফায়সালা। আমিও সবার সাথে উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম।

সময় সামান্যই গড়িয়েছে। কিন্তু মনে হচ্ছিলো, কতো কাল বুঝি পেরিয়ে গেছে! অপেক্ষার সময় এমন দীর্ঘই মনে হয়। হঠাৎ একজন হর্ষধ্বনি করে উঠলো: -ঐ যে, কে যেনো আসছে!

সবাই তাকালো উদয়ের পথে। আমিও তাকালাম। এক যুবক এগিয়ে আসছে। কাছে, আরো কাছে। এবার সবাই তাকে চিনলো। আমিও। সবাই আনন্দ-উত্তেজনায় চিৎকার করে উঠলো: -আরে, এ-যে আমাদের প্রিয় আল-আমীন! মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ!’

সবার অলক্ষ্যে আমি আনন্দ-বিগলিত কণ্ঠে বলে উঠলাম- আল-হামদুলিল্লাহ! শোকর তোমার হে আল্লাহ!

এবার কথা বললেন সেই বুদ্ধিমান প্রবীণ ব্যক্তিটি: -এখন বলো, তোমরা কি আল-আমীনের ফায়সালা মেনে নেবে? সবাই এক বাক্যে উত্তর দিলো: -অবশ্যই, আমরা সবাই রাজি! আল-আমীন যা বলবে তাই হবে!

মুহাম্মদ আসতেই তিনি বললেন: -মুহাম্মদ! আমরা সবাই মিলে কা’বার পুনঃনির্মাণ কাজ শেষ করেছি। সব গোত্রই পাহাড় থেকে পাথর এনেছে। এ কাজে অংশ নিয়েছে। এখন বাকী আছে শুধু হাজরে আসওয়াদ প্রতিস্থাপন করা (জায়গা মতো রেখে দেওয়া)। এখানেই গোল বেধেছে। এখানে এসেই আমরা মারাত্মক বিরোধে জড়িয়ে পড়েছি। সব গোত্রই একসঙ্গে হাজরে আসওয়াদ প্রতিস্থাপনের সম্মান লাভ করতে যাচ্ছে, যা কিছুতেই সম্ভব না। এখন বলো, আমরা কী করবো? আমরা সবাই মিলে তোমাকেই ফায়সালার দায়িত্ব দিলাম!

মুহাম্মদ আমার দিকে তাকালেন। তারপর বিবদমান গোত্রগুলোর দিকে তাকালেন। নীরবে কিছুক্ষণ ভাবলেন। তারপর একটি চাদর আনালেন। তারপর নিজ হাতে আমাকে চাদরে রাখলেন। তারপর গোত্রপতিদেরকে বললেন: -আসুন! কাপড়ের প্রান্ত ধরে আমার সাথে চলুন!

তাই হলো! এভাবেই আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো। সবাই আমাকে বয়ে নিয়ে যাওয়ার সম্মান লাভ করলো, কোনো গোত্রই বাদ পড়লো না। কাপড়টি নির্দিষ্ট জায়গায় রাখার পর এবার আল-আমীন নিজেই আমাকে আমার জায়গায় স্থাপন করলেন—বসিয়ে দিলেন!

আল-আমীনের বুদ্ধিদীপ্ত অথচ সাদাসিধে ফায়সালায় সবাই সীমাহীন মুগ্ধ হলো! আমি নিজেও ভীষণ অবাক হলাম! এমন বুদ্ধি অন্য কারো মাথায় কেনো খেললো না? অথচ এখানে হাজির বাঘা বাঘা সব গোত্রপতি! তবে কি আল-আমীন সবার সেরা— বুদ্ধিতে যুক্তিতে প্রজ্ঞায় বিচক্ষণতায়?!

হ্যাঁ, এভাবেই আল-আমীনের বুদ্ধিদীপ্ত ফায়সালায় একটি নিশ্চিত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ থেকে সবাই রক্ষা পেলো। দূর হয়ে গেলো নিজেদের মধ্যকার বিবাদ-বিসংবাদ ও হিংসা-হানাহানি। বরং তার বদলে জায়গা করে নিলো— 'সবাই মিলে করি কাজ'-এর অনাবিলতা ও স্বচ্ছতা। কী সুন্দর ফায়সালা! কেউ বঞ্চিতও হলো না আবার কেউ এককভাবে শ্রেষ্ঠত্বও কেড়ে নিতে পারলো না। আমাকে যথাস্থানে বয়ে নিয়ে যাওয়ার এ-সম্মানে সবাই হয়ে গেলো সমান ভাগীদার।

বন্ধু! এখনো আমি আছি কা'বায়—আমার নির্দিষ্ট জায়গাটায়। আমাকে দেখতে পাবে তুমি কা'বার আঙ্গিনায় এলেই, মক্কার মানুষের মতো। অসংখ্য হজ্ব ও উমরাপালনকারীর মতো। না, কোনো বাধা নেই। চলে আসতে পারো একেবারে আমার কাছে। এঁকে দিতে পারো আমার গায়ে ভালোবাসার উষ্ণ চুমু-চিহ্ন! আর শোনো! ওখানে দাঁড়িয়ে অবশ্যই মনে করবে প্রিয় আল-আমীনের সেই মহা ফায়সালার ঘটনাটি। তাঁর প্রতিভাদীপ্ত বিচক্ষণতালব্ধ বিজ্ঞোচিত ফায়সালার ঘটনাটি। তারপর আল-আমীনের ভালোবাসায় আরেকটি চুমু এঁকে দিয়ো আমার কালো গায়ে! কী সৌভাগ্য হবে তোমার, যদি তোমার চুমুটিও ঠিক সেখানেই এঁকে দিতে পারো, যেখানে এঁকে দিয়েছিলো আল-আমীনের পবিত্র ঠোঁট! তাই যেনো হয়! বারবার যেনো হয়!!

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00