📄 তোমার স্মরণে হে খাদিজা!
খাদিজা চলে যাওয়ার পর আল্লাহর রাসূলের মনটা হাহাকার করছিল। খাঁ খাঁ শূন্যতায় নিঃশব্দে কাঁদছিল! যখনই তাঁর মনে পড়তো খাদিজার দান ও দয়ার কথা এবং ত্যাগ ও কুরবানির কথা তখন মনটাকে সামাল দিতে তাঁর কী যে কষ্ট হতো! ভেতর থেকে হু হু করে কান্না আসতো। সে কান্নার ছায়া পড়তো তাঁর চোখে-মুখে। তাঁর কথায়-আচরণে!
এদিকে তাঁর মৃত্যু কাফির মুশরিকদের মাঝে আনন্দের মাদকতা সৃষ্টি করলো। ওরা একে অপরকে বলতে লাগলো:
—শোনো হে, এখন না-আছে আবু তালিব না-আছে খাদিজা! তোমাদের পথ এখন খোলা!
খাদিজার ওফাতের পর আল্লাহর নবী বাইরে বেরুতেই শুরু হলো কুরাইশের তাণ্ডব। কুরাইশের লেলিয়ে-দেয়া একদল কমিনা তাঁকে কষ্ট দিলো! তাঁর মাথায় মাটি ছিটিয়ে দিলো! আল্লাহর রাসূল বেদনাহত মনে ফিরে এলেন গৃহে! মনে পড়ছে এখন খাদিজার কথা! খাদিজা থাকলে মিষ্টি হাসি নিয়ে এগিয়ে আসতেন! তাঁর দুঃখভরা মনে সান্ত্বনার শীতল প্রলেপ বুলিয়ে দিতেন! ছোট্ট মেয়ে ফাতেমার চোখ পড়লো আল্লাহর রাসূলের মাথায়! ফাতেমা ছুটে এলেন! মাটি সরিয়ে পিতার মাথা পরিষ্কার করে দিলেন! ফাতেমার চোখে পানি, মনে মায়ের স্মৃতি! মেয়ের চোখে পানি দেখে আল্লাহর রাসূলের দুঃখবোধ আরও তীব্র হয়ে উঠলো! তিনি কেঁদে ফেললেন! প্রিয় রাসূল কুরাইশের জুলুম-নিপীড়নের সামনে বারবার খাদিজাকে মনে করতে লাগলেন! বেশি বেশি দু’আ করতে লাগলেন! পুণ্যবতী স্নেহবতী মহীয়সী খাদিজা রাসূলের স্মরণে অমলিন! চিরভাস্বর! চিরঅবিস্থিত!
সাহাবায়ে কেরাম দেখলেন; আল্লাহর রাসূল ভীষণ শোকাহত! বারবার ফিরে আসছে খাদিজার শোক! আল্লাহর নবীর এ-শোক কি একটু লাঘব করা যায় না? তাঁকে কি বিবাহে উদ্বুদ্ধ করা যায় না? অন্য কোনো স্ত্রীই পারবে খাদিজার শোক লাঘব করতে!
বিবাহে রাজি করাতে তাঁরা একজনকে পাঠালেন আল্লাহর রাসূলের কাছে। তিনি আল্লাহর নবীকে গিয়ে বললেন:
—হে আল্লাহর রাসূল! খাদিজার শোকে আপনি তো কাতর হয়ে পড়েছেন! এ কাতরতা আপনার চোখে-মুখে ছাপ ফেলেছে! আপনার এ-বাজ কষ্ট কি কেউ দূর করতে পারে না?
আল্লাহর রাসূল অশ্রুভরা চোখে বললেন:
—কে পারবে খাদিজার দুঃখ দূর করতে? খাদিজা আল্লাহর রাসূলকে সহযোগিতা করেছেন! আল্লাহর পথে জীবন উৎসর্গ করেছেন! আল্লাহর পথেই মৃত্যুবরণ করেছেন! খাদিজা ছিলেন ঘরের মালিকা, সন্তান-সন্ততির মা!
ওই মহিলা সাহাবী তখন বললেন:
—হে আল্লাহর রাসূল! নারীদের ভেতরে এমন কেউ কি নেই, যিনি খাদিজার অভাব কিছুটা হলেও দূর করতে পারবেন? আমার জানামতে নারীদের মধ্যে এমন মহিলাও আছেন, যিনি আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলকে সন্তুষ্ট করতে পারবেন!
তিনি অনেকক্ষণ ধরে কথা বললেন আল্লাহর রাসূলের সাথে। তারপর আল্লাহর রাসূল সাওদা বিনতে যামআ’র নাম শুনে প্রস্তাবে রাজি হলেন! কিন্তু তিনি এসেও আল্লাহর রাসূলের মন থেকে খাদিজার স্মৃতি ভুলিয়ে দিতে পারলেন না! খাদিজা আগে যেমন ছিলেন আল্লাহর রাসূলের হৃদয় জুড়ে এখনো তেমনি আছেন তাঁর সত্তা জুড়ে।
আল্লাহর রাসূল প্রিয় মেয়ে রোকাইয়াকে খুব ভালোবাসতেন! কেননা রোকাইয়ার মুখাবয়ব ছিল দেখতে অনেকটাই মা খাদিজার মতো। নবীজী রোকাইয়ার দিকে তাকিয়ে থাকতেন আর স্মরণ করতেন প্রিয় খাদিজাকে! তাঁর ত্যাগ ও কুরবানিকে! তাঁর মায়া ও মমতাকে! তাঁর সান্ত্বনা ও মিষ্টি হাসিকে! তাঁর স্নেহভরা উক্তি ও কথামালাকে! তাঁর দরদভরা অপার দান ও আকাশ-উদার সাহায্যকে! রোকাইয়ার কথাও শুনতেন তিনি অনেকক্ষণ ধরে! রোকাইয়ার মৃত্যুতে আল্লাহর রাসূল অনেক ব্যথা পেয়েছিলেন!
আল্লাহর রাসূল ঘর থেকে বের হওয়ার সময় খাদিজাকে স্মরণ করতেন, খাদিজার প্রশংসা করতেন! তাঁর জন্যে দু’আ করতেন! এ জন্যে পরবর্তীতে তাঁর এক স্ত্রী অভিমানভরে বলেছিলেন:
—তিনি তো এক বুড়িই ছিলেন! আল্লাহ তো এখন আপনাকে তাঁর বদলে আরও উত্তম স্ত্রী দান করেছেন!
আল্লাহর রাসূল এ-কথায় প্রচণ্ড অসন্তুষ্ট হলেন! উচ্চকণ্ঠে বললেন:
—না, আল্লাহর কসম, না! তাঁরচে’ ভালো কোনো স্ত্রী আল্লাহ আমাকে দান করেন নি! যখন মানুষ আমাকে অস্বীকার করছিল তখন তিনি ঈমান এনেছিলেন! যখন মানুষ আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করছিল তখন তিনি আমাকে সত্যায়ন করেছিলেন! যখন মানুষের কাছে আমি বঞ্চিত হচ্ছিলাম তখন তিনি আমাকে সম্পদ-সহযোগিতা জুগিয়েছিলেন! তাঁর গর্ভেই আমার সন্তান জন্ম লাভ করেছে, অন্য কারও গর্ভে নয়!
বিজয় এলেই আল্লাহর রাসূল খাদিজাকে স্মরণ করতেন! ইসলামের বিজয় দেখার জন্যে প্রিয় খাদিজা কী লালায়িত ছিলেন! বিপদকালেও আল্লাহর রাসূল খাদিজাকে মনে করতেন! তাঁর অমায়িক সান্ত্বনাকে স্মরণ করতেন! যখন তাঁর হাতে মালে গনিমত জমা হতো, তখনো খাদিজাকে তাঁর মনে পড়তো! আহা, খাদিজা ইসলামের সেবায় তাঁর সবকিছুই তো বিলিয়ে দিয়েছিলেন! আজ তিনি বেঁচে থাকলে তার কিছুটা বিনিময় ফিরিয়ে দেয়া যেত!
আল্লাহর রাসূল উপলক্ষ এলেই খাদিজাকে স্মরণ করতেন! তাঁর আত্মার সাথে যেনো বাস করতে চাইতেন! ফলে তিনি খাদিজার প্রিয় যারা সবাইকে মনে করতেন.. স্মরণ করতেন.. দান করতেন! বকরি জবাইকালে বলতেন:
—খাদিজার বান্ধবীদের কাছে গোশত পাঠাও! আমি তাঁর বান্ধবীদের পছন্দ করি!
আল্লাহর রাসূল খাদিজার ঋণ পরিশোধ করেছেন, যেমন খাদিজা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ঋণ পরিশোধ করেছেন! সারাজীবনই খাদিজাকে মনে রেখেছেন! কখনো তাঁকে ভুলে যান নি! একেবারে সর্বোচ্চ বন্ধু-আল্লাহর ডাকে সাড়া দেয়া পর্যন্ত!
কী সুন্দর এ বিনিময়! খাদিজা বিনিময় দিয়েছেন রাসূলকে! রাসূলও বিনিময় দিয়েছেন খাদিজাকে! খাদিজাকে আল্লাহ বানিয়েছেন সকল মুসলিম নর-নারীর জন্যে অনুপম আদর্শ! এ-আদর্শ মায়া-মমতায় অগ্রবর্তী হওয়ার! এ-আদর্শ ন্যায়-নিষ্ঠায় দৃষ্টান্ত হওয়ার! এ-আদর্শ আল্লাহকে ভালোবাসার.. তাঁর রাসূলকে ভালোবাসার! এ ভালোবাসার ওপরে আছে কি আর কোনো ভালোবাসা? মহীয়সী খাদিজার জীবন বলে- এ ভালোবাসাই শ্রেষ্ঠ ভালোবাসা!