📘 গল্পে আঁকা মহীয়সী খাদিজা রাঃ > 📄 বিদায়

📄 বিদায়


খাদিজা আল্লাহর রাসূলকে নিয়ে ক্রমেই শঙ্কিত হয়ে উঠছিলেন। তাঁকে কখন কীভাবে সহযোগিতা করা যায়—এই হয়ে উঠলো খাদিজার সার্বক্ষণিক চিন্তা। বয়স যদিও এখন তাঁর অনেক—পঁয়ষট্টি ছুঁইছুঁই হয়ে গেছে, তবু ঈমানের বলে হৃদয়টা তাঁর চিরসবুজ! সজীবতায় চিরআন্দোলিত!

আল্লাহর রাসূলের তামান্না—খাদিজা দীর্ঘজীবী হোন! সে দিন পর্যন্ত খাদিজা বেঁচে থাকুন যেদিন আল্লাহর সাহায্যে ইসলাম পূর্ণতা লাভ করবে! ইসলামের সূর্য আলোকিত করবে দুনিয়ার দিক-দিগন্ত। দূর করে দেবে সকল কালো। আহা, খাদিজা! ইসলামের জন্যে.. ইসলামের নবীর জন্যে নিজের জান-জীবন—সব উৎসর্গ করে দিয়েছেন! যখনই আল্লাহর রাসূল এবং সাহাবীদের ওপর জুলুম হয় তখন সবার আগে কে ব্যথা পায়? খাদিজা! আল্লাহর রাসূলের কষ্ট যেনো খাদিজার নিজেরই কষ্ট! সাহাবীদের কষ্ট যেনো খাদিজার নিজেরই কষ্ট! মহীয়সী খাদিজার বয়স যতোই বাড়ছে ততোই তিনি প্রিয় মুহাম্মদকে কাছে অনুভব করছেন! তাঁর ভালোবাসার উত্তাপ অনুভব করছেন!

একদিন আল্লাহর রাসূল ও খাদিজা রাতের গভীরে বসে বসে দু’আ করছিলেন.. কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন। খাদিজা হঠাৎ তাঁর সারা শরীরে একটা কাঁপুনি অনুভব করলেন! অনুভব করলেন আস্তে আস্তে দেহটা নিস্তেজ হয়ে আসছে! তিনি আল্লাহর রাসূলের দিকে হাসিমুখে তাকালেন! মায়াবিকণ্ঠে বললেন:

—আল্লাহর রাসূল! অবশ্যই আল্লাহ আপনাকে সাহায্য করবেন! ওরা কিছুতেই আল্লাহর নূর-ইসলামকে নেভাতে পারবে না! আল্লাহ এ নূরকে পূর্ণতা দান করবেনই! তাঁর রাসূলকে সাহায্য করবেনই!

আল্লাহর রাসূল দেখলেন খাদিজাকে ভীষণ ক্লান্ত দেখাচ্ছে! তিনি খাদিজার হাতের তালু দেখলেন! ভীষণ গরম! উদ্বেগভরে বললেন:

—খাদিজা, তুমি তো অসুস্থ!

খাদিজা বললেন:

—কিছু না, শরীরটা গরম! ঠিক হয়ে যাবে!

আল্লাহর রাসূল খাদিজাকে ধরে উঠতে সাহায্য করলেন! তারপর বিছানায় শুইয়ে দিলেন! পাশে বসে তাঁর গায়ে হাত বুলিয়ে দিলেন! তাঁর মাথায় ঠাণ্ডা পানি ঢেলে দিলেন! আল্লাহর কাছে তাঁর আরোগ্যের দু’আ করতে লাগলেন! আর খাদিজা কৃতজ্ঞতাভরা চোখে প্রিয় মুহাম্মদের দিকে তাকিয়ে রইলেন! তাঁর শোকর আদায় করতে লাগলেন! তাঁকেও একটু বিশ্রাম নিতে বললেন! আল্লাহর রাসূল তখন দয়া-ঝরানো কণ্ঠে বললেন:

—খাদিজা! কেমন করে আমি তোমার হক আদায় করবো?! আমি ছিলাম নির্ধন! আল্লাহ তোমাকে দিয়ে আমার অভাব দূর করে দিয়েছেন! আমি ছিলাম ঝুঁকির মুখে, বিপদের দুয়ারে! তোমার গৃহে পেয়েছি সাহায্য ও সুরক্ষা! তুমি আমার কী-না ছিলে?! কখনো তুমি ছিলে মায়ের ভূমিকায়। কখনো বোনের ভূমিকায়। স্ত্রীর ভূমিকায় তুমি ছিলে আদর্শ, সফল!

খাদিজার দেহে প্রচণ্ড ব্যথা ছড়িয়ে পড়লো! তাঁর চোখ ছলছল করছে। কিসের পানি? ব্যথার? মৃত্যুযন্ত্রণার? আল্লাহর রাসূল তাঁর দিকে তাকিয়ে দুঃখভারাক্রান্ত কণ্ঠে বললেন:

—খাদিজা! কী হয়েছে তোমার? খুব কষ্ট হচ্ছে?! আল্লাহই তোমাকে দেখবেন! আল্লাহর দয়া অনেক বেশি!

খাদিজা আল্লাহর রাসূলের ব্যথা ও বিচলন দেখে ক্ষীণকণ্ঠে বললেন:

—হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ অবশ্যই আপনাকে সাহায্য করবেন! ওরা পারবে না কখনো আল্লাহর নূরকে নেভাতে! আল্লাহ তাঁর নূরকে নিভে যেতে দিতে পারেন না! অবশ্যই তিনি এ-নূরকে পূর্ণতা দান করবেন, করবেনই! মুশরিকরা না-চাইলেও করবেন!

খাদিজা একটু থামলেন! তারপর মিষ্টি করে হাসলেন। হাসতে হাসতে বললেন:

—আমিও মনে-প্রাণেই চাইছিলাম-ইসলামের মহাসূর্যটাকে চোখভরে দেখে যাবো! পৃথিবীর সকল অন্ধকার ছিন্নভিন্নকারী সে সূর্য! মক্কার সকল জুলুম-শোষণ-ত্রাসন নিঃশেষকারী সে সূর্য! ...

আল্লাহর রাসূল হেসে বললেন:

—খাদিজা! তুমি দেখে যাবে! অবশ্যই দেখে যাবে! এ বিপদ কেটে যাবে! তুমি আবার সুস্থ হবে! তোমার স্বপ্ন পূরণের পথে তুমি এগিয়ে যাবে!

আল্লাহর রাসূল কী যেনো ভেবে নিয়ে বললেন:

—আল্লাহ তোমাকে সুস্থ করে তুলবেন! আমাকে একা তিনি ছাড়বেন না!

খাদিজা আবারও আল্লাহর রাসূলকে সান্ত্বনা দিলেন। বললেন:

—আপনি একা হবেন কেন হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ আছেন আপনার সাথে! ওরা আপনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। আল্লাহ ওদের সব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দেবেন! ওদের কবল থেকে আপনাকে উদ্ধার করবেন! আপনি আছেন আল্লাহর আশ্রয়ে, ওদের সাধ্য কি এখানে পৌঁছে?

একটু নীরব থাকার পর খাদিজা বললেন:

—আল্লাহর রাসূল! আমার রব আমার জন্যে কী প্রস্তুত করে রেখেছেন? তিনি কি আমাকে কবুল করবেন? আমার প্রতি কি তিনি সন্তুষ্ট?

আল্লাহর নবী সোহাগভরে প্রিয় খাদিজার চোখ দু’টি বন্ধ করে দিলেন! খাদিজার অশ্রু ছলোছলো চোখ দেখতে তাঁর বুঝি কষ্ট হচ্ছিল! তারপর কোমলকণ্ঠে বললেন:

—আল্লাহ তোমার প্রতি সন্তুষ্ট! আল্লাহ তোমায় বদলা দেবেন! তুমি আশ্রয় দিয়েছো! তুমি সাহায্য করেছো! তুমি নিজের সবকিছু ব্যয় করেছো! তুমি আল্লাহর সাহায্যকারী! তাঁর রাসূলের সাহায্যকারী! যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সাহায্য করে আল্লাহ তাঁর জন্যে হয়ে যান! খাদিজা! তোমার জন্যে জান্নাতে থাকবে এমন প্রাসাদ, যার তলদেশ দিয়ে বইতে থাকবে ঝরনাধারা! সে প্রাসাদ হবে মোতির তৈরি! গোলাপে গোলাপে ছাওয়া! সেটিকে বেষ্টন করে রাখবে ফলের ভারে ভারে নুয়ে পড়া বৃক্ষশাখা! প্রবহমান ঝরনাধারা!!

তারপর আল্লাহর রাসূল খাদিজার মাথায় আবার ঠাণ্ডা পানি ঢাললেন! তারপর বললেন স্নেহভরে.. দরদভরে:

—জ্বর চলে যাবে! তুমি সুস্থ হবে! আবার তুমি তৎপর হয়ে উঠবে ইসলামের সেবায়! অবশ্যই আল্লাহ তোমাকে উঠিয়ে নিয়ে দুশমনকে খুশি করবেন না! কিছুতেই ওরা পারবে না দীনের আলো নেভাতে!

খাদিজা চোখ মেললেন! বড় বড় সেই চোখ! তারপর শঙ্কা মেশানো কণ্ঠে জানতে চাইলেন:

—কুরাইশের খবর কী!

খাটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা খাদিজার এক মেয়ে অশ্রুভেজা কণ্ঠে জবাব দিলেন:

—মা! ওরা (তোমার মৃত্যুর) অপেক্ষা করছে!

ওর অশ্রু এবার বাঁধভাঙা কান্নায় রূপ নিলো! আল্লাহর রাসূল স্নেহভরে মেয়ের চোখ মুছে দিলেন! সান্ত্বনা দিলেন! খাদিজাকে ডাকলেন কথা বলতে! কিন্তু খাদিজার অসুখের তীব্রতা আরও বেড়ে গিয়েছিল! আল্লাহর রাসূলের মুখে উদ্বেগের কালো ছায়া! মেয়েদের মুখে উদ্বেগের কালো ছায়া। সাহাবীদের মুখেও উদ্বেগের কালো ছায়া! তাঁদের সবার মুখে ব্যাকুল জিজ্ঞাসা-কেমন এখন তিনি? সেরে উঠবেন তো!

অসহায় দরিদ্রদের মুখেও গভীর শোকচ্ছায়া! খাদিজা না-থাকলে কেমন করে চলবে তাঁদের জীবনের চাকা?

আবু লাহাব ও উম্মে জামিল ওদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। খাদিজার গৃহ থেকে যে-ই বেরিয়ে আসছে তার কাছেই জানতে চাচ্ছে খাদিজার অবস্থা! কিন্তু জওয়াব মিলছিল বড়ো রূঢ় ভাষায়! কেননা, তাঁদের প্রশ্নে ছিল চাপা উচ্ছ্বাস! খাদিজার জীবন প্রদীপ নিভে যাওয়ার উৎকট বাসনা! মক্কার সবাই জানতে চাচ্ছে খাদিজার অবস্থা। প্রিয়জনও, অপ্রিয়জনও। বৈঠকেও একই অবস্থা। কেউ খাদিজার সমালোচনায় মত্ত। কেউ তাঁর প্রশংসায় উচ্ছ্বসিত। ওরা উৎকর্ণ হয়ে আছে, খাদিজার সর্বশেষ খবর জানতে।

আল্লাহর রাসূল এবং মেয়েরা বসে আছেন খাদিজাকে ঘিরে! খাদিজা জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো পার করছিলেন! জীবনসায়াহ্নেও তাঁর একমাত্র চিন্তা ছিল-প্রিয় রাসূল! কুরাইশের নিষ্ঠুরতা!

রাতটা ছিল অনেক দীর্ঘ! এক ফোঁটা ঘুমও হয় নি কারও! চোখ ছিল বেদনাকাতর-ছলোছলো! মন ছিল উদ্বেগাচ্ছন্ন! খাদিজা বিছানায়! আল্লাহর রাসূল পাশে! আল্লাহর রাসূল সব আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিলেন!

শেষরাতের দিকে খাদিজা চোখ মেললেন, কিছুক্ষণের জন্যে! তারপর মেয়েদের দিকে তাকালেন! প্রিয় রাসূলের দিকে তাকালেন! তারপর হাসি-হাসি মুখে আবার চোখ বন্ধ করে ফেললেন! আর খুললেন না! খুলতে পারলেন না! কোনোদিন খুলতে পারবেন না! নীরব হয়ে গেলেন মহীয়সী খাদিজা! নিথর হয়ে গেল তাঁর দেহ! এ-দেহে কী প্রাণ ছিল! সদা সজীব! ইসলামের সেবায় আকুল! নবীজীর সেবায় ব্যাকুল! দীনের তরে সদা জাগ্রত! এ-মহীয়সীর সামনে বসে.. এ দেহের সামনে বসে— নবীজী কাঁদলেন! মেয়েরা কাঁদলেন! আশপাশে সবাই কাঁদলেন! সবকিছুই যেন কাঁদতে লাগলো!

সকালবেলা খাদিজা বের হলেন, অশ্রুসিক্ত সাহাবীদের কাঁধে করে! মক্কার উত্তর-পূর্বে কুরাইশ সম্প্রদায়ের কবরস্থান—‘হাজুন’ নিয়ে যাওয়া হলো!

তারপর আল্লাহর রাসূল নিজে নামলেন কবরে! তারপর নিজের হাতে তাঁর কবরকে সমান করলেন! তারপর লাশ গ্রহণ করে নিজের হাতেই তাঁকে শুইয়ে দিলেন! তারপর বিদায়ের শেষলগ্নে তাঁর চেহারার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন! তারপর বেরিয়ে এলেন কবর থেকে অশ্রুপূর্ণ চোখে! মাথা নুইয়ে!

ফিরে এলেন খাদিজাবিহীন খাদিজার বাড়িতে! সাহাবীদের সান্ত্বনার ভিড়ে বসে তিনি অপেক্ষা করতে লাগলেন কুরাইশের পক্ষ থেকে ধেয়ে আসা সম্ভাব্য আঘাতের! এ আঘাত এখন একাই তাঁকে মুকাবিলা করতে হবে! চাচাজান নেই! নেই খাদিজাও! আল্লাহ! তুমিই সহায়! তুমি তো আছো হে মালিক! তুমি চিরসাহায্যকারী! মুমিনের চিরবন্ধু!

📘 গল্পে আঁকা মহীয়সী খাদিজা রাঃ > 📄 তোমার স্মরণে হে খাদিজা!

📄 তোমার স্মরণে হে খাদিজা!


খাদিজা চলে যাওয়ার পর আল্লাহর রাসূলের মনটা হাহাকার করছিল। খাঁ খাঁ শূন্যতায় নিঃশব্দে কাঁদছিল! যখনই তাঁর মনে পড়তো খাদিজার দান ও দয়ার কথা এবং ত্যাগ ও কুরবানির কথা তখন মনটাকে সামাল দিতে তাঁর কী যে কষ্ট হতো! ভেতর থেকে হু হু করে কান্না আসতো। সে কান্নার ছায়া পড়তো তাঁর চোখে-মুখে। তাঁর কথায়-আচরণে!

এদিকে তাঁর মৃত্যু কাফির মুশরিকদের মাঝে আনন্দের মাদকতা সৃষ্টি করলো। ওরা একে অপরকে বলতে লাগলো:

—শোনো হে, এখন না-আছে আবু তালিব না-আছে খাদিজা! তোমাদের পথ এখন খোলা!

খাদিজার ওফাতের পর আল্লাহর নবী বাইরে বেরুতেই শুরু হলো কুরাইশের তাণ্ডব। কুরাইশের লেলিয়ে-দেয়া একদল কমিনা তাঁকে কষ্ট দিলো! তাঁর মাথায় মাটি ছিটিয়ে দিলো! আল্লাহর রাসূল বেদনাহত মনে ফিরে এলেন গৃহে! মনে পড়ছে এখন খাদিজার কথা! খাদিজা থাকলে মিষ্টি হাসি নিয়ে এগিয়ে আসতেন! তাঁর দুঃখভরা মনে সান্ত্বনার শীতল প্রলেপ বুলিয়ে দিতেন! ছোট্ট মেয়ে ফাতেমার চোখ পড়লো আল্লাহর রাসূলের মাথায়! ফাতেমা ছুটে এলেন! মাটি সরিয়ে পিতার মাথা পরিষ্কার করে দিলেন! ফাতেমার চোখে পানি, মনে মায়ের স্মৃতি! মেয়ের চোখে পানি দেখে আল্লাহর রাসূলের দুঃখবোধ আরও তীব্র হয়ে উঠলো! তিনি কেঁদে ফেললেন! প্রিয় রাসূল কুরাইশের জুলুম-নিপীড়নের সামনে বারবার খাদিজাকে মনে করতে লাগলেন! বেশি বেশি দু’আ করতে লাগলেন! পুণ্যবতী স্নেহবতী মহীয়সী খাদিজা রাসূলের স্মরণে অমলিন! চিরভাস্বর! চিরঅবিস্থিত!

সাহাবায়ে কেরাম দেখলেন; আল্লাহর রাসূল ভীষণ শোকাহত! বারবার ফিরে আসছে খাদিজার শোক! আল্লাহর নবীর এ-শোক কি একটু লাঘব করা যায় না? তাঁকে কি বিবাহে উদ্বুদ্ধ করা যায় না? অন্য কোনো স্ত্রীই পারবে খাদিজার শোক লাঘব করতে!

বিবাহে রাজি করাতে তাঁরা একজনকে পাঠালেন আল্লাহর রাসূলের কাছে। তিনি আল্লাহর নবীকে গিয়ে বললেন:

—হে আল্লাহর রাসূল! খাদিজার শোকে আপনি তো কাতর হয়ে পড়েছেন! এ কাতরতা আপনার চোখে-মুখে ছাপ ফেলেছে! আপনার এ-বাজ কষ্ট কি কেউ দূর করতে পারে না?

আল্লাহর রাসূল অশ্রুভরা চোখে বললেন:

—কে পারবে খাদিজার দুঃখ দূর করতে? খাদিজা আল্লাহর রাসূলকে সহযোগিতা করেছেন! আল্লাহর পথে জীবন উৎসর্গ করেছেন! আল্লাহর পথেই মৃত্যুবরণ করেছেন! খাদিজা ছিলেন ঘরের মালিকা, সন্তান-সন্ততির মা!

ওই মহিলা সাহাবী তখন বললেন:

—হে আল্লাহর রাসূল! নারীদের ভেতরে এমন কেউ কি নেই, যিনি খাদিজার অভাব কিছুটা হলেও দূর করতে পারবেন? আমার জানামতে নারীদের মধ্যে এমন মহিলাও আছেন, যিনি আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলকে সন্তুষ্ট করতে পারবেন!

তিনি অনেকক্ষণ ধরে কথা বললেন আল্লাহর রাসূলের সাথে। তারপর আল্লাহর রাসূল সাওদা বিনতে যামআ’র নাম শুনে প্রস্তাবে রাজি হলেন! কিন্তু তিনি এসেও আল্লাহর রাসূলের মন থেকে খাদিজার স্মৃতি ভুলিয়ে দিতে পারলেন না! খাদিজা আগে যেমন ছিলেন আল্লাহর রাসূলের হৃদয় জুড়ে এখনো তেমনি আছেন তাঁর সত্তা জুড়ে।

আল্লাহর রাসূল প্রিয় মেয়ে রোকাইয়াকে খুব ভালোবাসতেন! কেননা রোকাইয়ার মুখাবয়ব ছিল দেখতে অনেকটাই মা খাদিজার মতো। নবীজী রোকাইয়ার দিকে তাকিয়ে থাকতেন আর স্মরণ করতেন প্রিয় খাদিজাকে! তাঁর ত্যাগ ও কুরবানিকে! তাঁর মায়া ও মমতাকে! তাঁর সান্ত্বনা ও মিষ্টি হাসিকে! তাঁর স্নেহভরা উক্তি ও কথামালাকে! তাঁর দরদভরা অপার দান ও আকাশ-উদার সাহায্যকে! রোকাইয়ার কথাও শুনতেন তিনি অনেকক্ষণ ধরে! রোকাইয়ার মৃত্যুতে আল্লাহর রাসূল অনেক ব্যথা পেয়েছিলেন!

আল্লাহর রাসূল ঘর থেকে বের হওয়ার সময় খাদিজাকে স্মরণ করতেন, খাদিজার প্রশংসা করতেন! তাঁর জন্যে দু’আ করতেন! এ জন্যে পরবর্তীতে তাঁর এক স্ত্রী অভিমানভরে বলেছিলেন:

—তিনি তো এক বুড়িই ছিলেন! আল্লাহ তো এখন আপনাকে তাঁর বদলে আরও উত্তম স্ত্রী দান করেছেন!

আল্লাহর রাসূল এ-কথায় প্রচণ্ড অসন্তুষ্ট হলেন! উচ্চকণ্ঠে বললেন:

—না, আল্লাহর কসম, না! তাঁরচে’ ভালো কোনো স্ত্রী আল্লাহ আমাকে দান করেন নি! যখন মানুষ আমাকে অস্বীকার করছিল তখন তিনি ঈমান এনেছিলেন! যখন মানুষ আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করছিল তখন তিনি আমাকে সত্যায়ন করেছিলেন! যখন মানুষের কাছে আমি বঞ্চিত হচ্ছিলাম তখন তিনি আমাকে সম্পদ-সহযোগিতা জুগিয়েছিলেন! তাঁর গর্ভেই আমার সন্তান জন্ম লাভ করেছে, অন্য কারও গর্ভে নয়!

বিজয় এলেই আল্লাহর রাসূল খাদিজাকে স্মরণ করতেন! ইসলামের বিজয় দেখার জন্যে প্রিয় খাদিজা কী লালায়িত ছিলেন! বিপদকালেও আল্লাহর রাসূল খাদিজাকে মনে করতেন! তাঁর অমায়িক সান্ত্বনাকে স্মরণ করতেন! যখন তাঁর হাতে মালে গনিমত জমা হতো, তখনো খাদিজাকে তাঁর মনে পড়তো! আহা, খাদিজা ইসলামের সেবায় তাঁর সবকিছুই তো বিলিয়ে দিয়েছিলেন! আজ তিনি বেঁচে থাকলে তার কিছুটা বিনিময় ফিরিয়ে দেয়া যেত!

আল্লাহর রাসূল উপলক্ষ এলেই খাদিজাকে স্মরণ করতেন! তাঁর আত্মার সাথে যেনো বাস করতে চাইতেন! ফলে তিনি খাদিজার প্রিয় যারা সবাইকে মনে করতেন.. স্মরণ করতেন.. দান করতেন! বকরি জবাইকালে বলতেন:

—খাদিজার বান্ধবীদের কাছে গোশত পাঠাও! আমি তাঁর বান্ধবীদের পছন্দ করি!

আল্লাহর রাসূল খাদিজার ঋণ পরিশোধ করেছেন, যেমন খাদিজা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ঋণ পরিশোধ করেছেন! সারাজীবনই খাদিজাকে মনে রেখেছেন! কখনো তাঁকে ভুলে যান নি! একেবারে সর্বোচ্চ বন্ধু-আল্লাহর ডাকে সাড়া দেয়া পর্যন্ত!

কী সুন্দর এ বিনিময়! খাদিজা বিনিময় দিয়েছেন রাসূলকে! রাসূলও বিনিময় দিয়েছেন খাদিজাকে! খাদিজাকে আল্লাহ বানিয়েছেন সকল মুসলিম নর-নারীর জন্যে অনুপম আদর্শ! এ-আদর্শ মায়া-মমতায় অগ্রবর্তী হওয়ার! এ-আদর্শ ন্যায়-নিষ্ঠায় দৃষ্টান্ত হওয়ার! এ-আদর্শ আল্লাহকে ভালোবাসার.. তাঁর রাসূলকে ভালোবাসার! এ ভালোবাসার ওপরে আছে কি আর কোনো ভালোবাসা? মহীয়সী খাদিজার জীবন বলে- এ ভালোবাসাই শ্রেষ্ঠ ভালোবাসা!

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00