📄 লড়াই আরও তীব্র হলো
কুরাইশ আর নবীজীর মধ্যকার লড়াই আরও তীব্র হলো। দিনে দিনে এ তীব্রতা কেবল বাড়তেই লাগলো। একদিকে আলো আর দিকে অন্ধকার। একদিকে হক আর দিকে বাতিল। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাওয়াতের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন অবিরাম। এদিকে কাফির মুশরিকরাও বাধাদানে মরিয়া। রাগে-ক্ষোভে ওরা ফেটে যাওয়ার উপক্রম। এ দাওয়াতকে প্রতিহত করতে চলছে ওদের দিনরাতের ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত।
আবু লাহাব ও উম্মে জামিল রাসূলের বিরোধিতায় এখন প্রকাশ্যে মাঠে নেমে পড়েছে। উম্মে জামিলের রাত-দিনের একটাই চিন্তা— খাদিজাকে কী করে কষ্ট দেয়া যায়। আল্লাহর রাসূল জোরেসোরে কথা বলা শুরু করলেন কা’বার আশেপাশে স্থাপিত মূর্তির বিরুদ্ধে। মূর্তি নিথর নিষ্প্রাণ! মূর্তি—না-করতে পারে উপকার, না-করতে পারে ক্ষতি! এমন নিষ্প্রাণ অসাঢ় বস্তু কখনো উপাস্য হতে পারে না!
কুরাইশের ভিত কেঁপে উঠলো আল্লাহর রাসূলের এ সমালোচনায়। এরা সবাই আলোচনায় বসলো মুহাম্মদ এবং তাঁর নতুন দাওয়াত নিয়ে। আলোচনা ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠলো। ওদের একটাই বক্তব্য-মুহাম্মদকে আর সুযোগ দেয়া যায় না। অবশ্যই তাকে এ সমালোচনা বন্ধ করতে হবে। অবশ্যই তাকে রুখতে হবে। আমাদের উপাস্যদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য আমরা সহ্য করবো না। উপস্থিত কেউ কেউ বললো:
—এক্ষুনি যদি আমরা মুহাম্মদকে রুখে না-দাঁড়াই তাহলে কয়দিন পর আমাদের নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব বলতে আর কিছুই থাকবে না। মজলিস শেষ হলো কয়েকটা সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্য দিয়ে।
কবিরা বললো: —আমরা কবিতার ভাষায় মুহাম্মদকে আক্রমণ করবো! তার প্রচারিত দীনকে খেলো বানিয়ে পেশ করবো! তাকে নিয়ে বিদ্রূপে মেতে উঠবো! এ কবিতা যখন জনতার মাঝে ছড়িয়ে পড়বে তখন আশা করি কেউ মুহাম্মদের কাছে আর ভিড়বে না, তার দাওয়াত কবুল করবে না!
গল্পকার ও কাহিনীকাররা বললো: —আমরা মানুষকে নিয়ে গল্পের আসর জমিয়ে তুলবো। পূর্ববর্তীদের গল্প ও কাহিনী তাদের শোনাবো। তখন এরা আর মুহাম্মদের কুরআন শুনতে যাবে না। কুরআনের ‘শিল্প-সুষমায়’ মুগ্ধও হবে না!
ব্যবসায়ীরা বললো: —আমরা মুহাম্মদ ও তার অনুসারীদের অর্থনৈতিকভাবে বয়কট করবো। তাদের সাথে বন্ধ করে দেবো যাবতীয় লেনদেন। এভাবে যখন আমরা তাদের জীবনকে অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করে ফেলতে পারবো তখন তারা ইসলাম ত্যাগ করে পূর্বধর্মে ফিরে আসতে বাধ্য হবে। অপরদিকে নতুন করেও কেউ সেই ধর্মের দিকে ঝোঁকার সাহস পাবে না।
আবু জেহেল আর আবু লাহাব নবীজীকে কষ্ট দেয়ার সিংহভাগ দায়িত্বই নিজেদের কাঁধে তুলে নিলো। আবু লাহাব শপথ করে বললো:
—মুহাম্মদকে শান্তিতে থাকতে দেবো না! খাদিজাকেও জ্বালাতন করতে ছাড়বো না! খাদিজাই তো অর্থ-সম্পদ দিয়ে মুহাম্মদকে সহযোগিতা করে যাচ্ছে! অবিচ্ছিন্নভাবে দাওয়াতের কাজ চালিয়ে যেতে তাকে সাহস যোগাচ্ছে!
এরপর কুরাইশ সত্যি সত্যি কোমর বেঁধে ইসলাম-বিরোধিতায় মাঠে নেমে পড়লো। উম্মে জামিল দরজা দিয়ে খাদিজার ঘরের দিকে তাকিয়ে ঠাস্ করে দরজাটা বন্ধ করে রাগে ফুঁসতে লাগলো। আর বলতে লাগলো:
—তোমার আর নিস্তার নেই! হয় তুমি এখানে থাকবে নয় আমি! তোমার আরাম আমি হারাম করে ছাড়বো!
তারপর উম্মে জামিলের আর তর সইলো না বুঝি। ‘সব আয়োজন’ নিয়ে মাঠে নেমে গেলো। নবুওতের নূর-ছাওয়া গৃহকে লক্ষ বানাতে উম্মে জামিলের বুকটা একটু কাঁপলোও না! নমুনা দেখো তার কষ্ট দেয়ার—
একদিন সকাল বেলা আবু লাহাব ঘুম থেকে উঠে উম্মে জামিলকে দেখতে পেলো না। ছেলেদেরও আশপাশে পেলো না। আবু লাহাব অবাক হলো। এই ভোরে ওরা সব গেল কোথায়? একটু পর উম্মে জামিল গৃহে ঢুকলো-হাত থেকে কাঁটা সরাতে সরাতে। গলায় ঝোলানো রয়েছে খেজুরের ছাল-বাকলের একটা রশি। আবু লাহাব অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো স্ত্রীর দিকে। উম্মে জামিল দুষ্ট হাসিতে মুখটা ভরে বললো:
—তুমি কি চাও না মুহাম্মদের কষ্ট ও অপমান এবং তাকে রাগতে দেখলে তোমার কি ভালো লাগবে না? দরোজাটা খুলে একটু ওদিকে তাকাও!
আবু লাহাব দরজা খুলে দেখলো, খাদিজার ঘরের সামনটা—প্রবেশ পথটা কাঁটায় কাঁটায় ছাওয়া! আবু লাহাব হাততালি দিয়ে বললো:
—উম্মে জামিল! তুমি তো দেখছি ইবলিসকেও পেছনে ফেলে দিয়েছো!
উম্মে জামিল হিংসার আগুনে জ্বলতে জ্বলতে বললো:
—তুমি শুধু অর্থ ঢালো, তারপর দেখতে থাকো-মুহাম্মদ আর খাদিজাকে কেমন খেলা দেখাই! আমাকে একটা ভেড়া কিনে দাও, আমি ভেড়ার গোবর জমিয়ে জমিয়ে তা ফেলে আসবো খাদিজার ঘরের সামনে। সব নাশ করে দেবো! আমার নাম উম্মে জামিল! আমি খাদিজাকে দেখিয়ে দেবো-উম্মে জামিল কাকে বলে.. উম্মে জামিল কী করতে পারে! উম্মে জামিল দুশমনকে শেষ করে দিতে জানে! মুহাম্মদকেও আমি দেখাবো-কী রশি সে আমার গলায় ঝুলিয়েছে!
আল্লাহর রাসূল সকাল বেলা বের হতে গিয়ে দেখলেন—পথ কাঁটায় কাঁটায় ছাওয়া। দরোজায় অনেক ময়লা। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফিরে এলেন। খাদিজাকে বললেন:
—আবু লাহাবের স্ত্রী শুরু করে দিয়েছে! খাদিজা, এটা প্রথম বর্ষণ!
খাদিজা দরোজায় ছুটে গেলেন! দরোজা এবং বাড়ির সামনে পড়ে থাকা কাঁটা ও ময়লা-আবর্জনা দেখলেন। তারপর হাসিমুখে বললেন:
—হে আল্লাহর রাসূল! একটু অপেক্ষা করুন! আমি এক্ষুনি সব পরিষ্কার করে দিচ্ছি!
খাদিজা বাঁদিদের দ্রুত তা পরিষ্কারের নির্দেশ দিলেন। খাদিজা জানেন, এখন দূর থেকে উম্মে জামিল সব লক্ষ করছে! উম্মে জামিল চায়, এখন একটা ঝগড়া হোক। পরিস্থিতি খারাপ থেকে খারাপতর হোক। কিন্তু খাদিজা উম্মে জামিলের ইচ্ছেমতো রেগে গেলেন না! খাদিজা সবর করলেন! উম্মে জামিলের কুৎসিত গালাগালি কতো তাঁর কানে আসে! কিন্তু খাদিজা কিছুই বলেন না! খাদিজা একটু রাগও করেন না! খাদিজা একটু মনও খারাপ করেন না! খাদিজা শুধু মৃদু হেসে বলেন:
—না, আমি উম্মে জামিলকে কিচ্ছু বলবো না! আবু লাহাবকে কিছু বলবো না! ওদের কাউকে কিচ্ছু বলবো না! ওরা রেগে-জ্বলে শেষ হয়ে যাক নিজেদের আগুনে! আমার নীরবতাই ওদের সাজা!
খাদিজা দেখেন-পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফুঁসছে তাঁর প্রিয় বাঁদিরা! তিনি আগেই তাদের বলে দিয়েছেন, ওরা যেনো উম্মে জামিলকে.. কাউকে কিছু না বলে! এখন মৃদু হেসে তিনি ওদের বললেন:
—এক মুসলিম নারী আরেক কাফির নারীর মাঝে কী পার্থক্য? আমরা যদি তার মন্দ আচরণের বদলা দিই মন্দ আচরণেই-ক্ষমা না করি এবং অপমানের বদলে ক্ষমা না করি, তাহলে কেমন করে আমরা ইসলামের সেবা করবো? ইসলামের হক আদায় করবো? ইসলামের নবীর সুন্নতের ওপর চলবো?
খাদিজার ধৈর্যে কোনো ভাটা পড়লো না! উম্মে জামিলের সব মন্দ আচরণ তিনি একে একে সয়ে যেতে লাগলেন। এদিকে নবীজীও গৃহে ফিরে বলতেন প্রিয় খাদিজাকে—কী বলেছে আজ তাঁকে আবু জেহেল ও আবু লাহাব! সব শুনে খাদিজা হাসতেন মিষ্টি হাসি! বলতেন সান্ত্বনা-ঢালা কণ্ঠে:
—এসব কিছুই না! বাতাসে ভেসে বেড়ানো শব্দ, এই আছে এই নেই! হঠাৎ মিলিয়ে যাবে, আকাশের মহাশূন্যতায়!
কুরাইশ দেখলো, মুহাম্মদের দাওয়াতি কাজ আটকানো যাচ্ছে না, অপ্রতিরোধ্য গতিতে তা এগিয়েই যাচ্ছে। তার অনুসারীদের সংখ্যাও দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। কুরাইশ বেশ দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলো। তারা ভাবতে বসলো। সবাই পরামর্শে বসলো। আবু জেহেল, আবু লাহাব এবং উম্মে জামিল মিলে যা করছে তা যথেষ্ট না, আরও কঠিন পদক্ষেপ নিতে হবে। কী করা যায়?
একজন চিৎকার করে বললো: —মুহাম্মদের সাহায্যের উৎস বন্ধ করে দিতে হবে—তার শেকড় কেটে দিতে হবে!
সবাই জানতে চাইলো: —সাহায্যের উৎস-শেকড় মানে? তুমি কি আবু তালিবের কথা বলছো? হ্যাঁ, তার সাথে একটা বোঝাপড়া করতেই হবে!
ওই লোকটি তখন দৃঢ়কণ্ঠে বললো: —আমি বরং খাদিজার কথা বলছি! ওই মহিলার ক্ষমতা, অর্থ-বিত্ত ও সহযোগিতার ওপর ভর করেই মুহাম্মদ এগিয়ে যাচ্ছে! খাদিজাই তার অদ্ভুত ক্ষমতাবলে দাওয়াতকে ছড়িয়ে দিচ্ছে! খাদিজার ব্যবসারও লাগাম টেনে ধরতে হবে! ইতিমধ্যে খাদিজার গোত্রের অনেকেই ইসলাম কবুল করেছে। যে কোনো মূল্যে তারা মুহাম্মদকে সাহায্য করতে প্রস্তুত! এ সব কিসের আলামত? আমরা বলেছি, মুহাম্মদ যাদুকর! খাদিজা সম্পর্কে আমরা কী বলবো? কেন সে মুহাম্মদকে সর্বস্ব বিলিয়ে সহযোগিতা করে যাচ্ছে? তোমরা যদি খাদিজাকে না থামাও, তাহলে মুহাম্মদের কিছুই করতে পারবে না!
সবাই বললো: —আমরা তাহলে কী করতে পারি?
—আমরা যদি আগে আবু তালিবকে মুহাম্মদ থেকে আলাদা করে ফেলতে পারি তাহলে খাদিজাকে আলাদা করাও সহজ হয়ে যাবে! প্রয়োজনে খাদিজাকে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে মুহাম্মদ থেকে আলাদা করে ফেলা হবে! এই দুইজন সহযোগী হারালেই মুহাম্মদ থেমে যাবে, চুপসে যাবে, নীরব হয়ে যাবে!
সবাই তার মত পছন্দ করলো। কিন্তু আবু তালিব কুরাইশকে পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিলেন: —আমি কিছুতেই আমার ভাতিজাকে সহযোগিতা করা বন্ধ করবো না! আমি আছি তার পাশে! থাকবোই!!
কুরাইশ প্রথম ধাপে মারাত্মকভাবে ব্যর্থ হলো! খাদিজার ক্ষেত্রেও যে তারা ব্যর্থ হবে-তাতে কোনো দ্বিধা রইলো না! এখন তাহলে কী করা? এখন তারা তৃতীয় আরেকটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো! মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুসারীদের ‘শেষ’ করে দেয়া! তাহলে অন্যরা আর এদের পরিণতি দেখে নতুন ধর্মে প্রবেশ করার সাহস পাবে না! এবার এই তৃতীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তারা ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়লো!
শুরু হলো পরিকল্পনা মতো সাহাবীদের ওপর নির্মম জুলুম-নির্যাতন। মক্কা হয়ে উঠলো নিষ্ঠুর পাষাণ! কান পাতলেই শোনা যেতে লাগলো— ‘আহ আহ’ চিৎকার-ধ্বনি! অসহায় দুর্বল ও দাসদের ওপরই ওদের যতো ক্ষোভ! কাউকে ফেলে রাখা হলো ঊষর উত্তপ্ত মরুর বুকে-পাথরচাপা দিয়ে! কাউকে বন্দি করে রাখা হলো অন্ধকার কুঠরিতে-নেই খাবার, নেই পানীয়! ক্ষুৎ-পিপাসায় নাড়ীভুঁড়ি সংকুচিত। ব্যথায় মুষড়ে পড়া অবস্থা। কাউকে ধরে লোহা দিয়ে পেট চিরে ফেলা হলো! বিবস্ত্র করে ফেলা হলো সবার চোখের ওপর! পাশাপাশি চললো কলজে-ছেঁড়া ভাষায় গালিগালাজ ও অশ্রাব্য কটু কথা! উম্মে জামিলের মতো যে সব নারী এ কাজে দক্ষ তারা সবাই মাঠে নেমে এলো! ঈমান-আনা বাড়ির সামনে ঝরতে লাগলো গালিবর্ষণ, মুষলধারে-অঝোরধারায়! এখন মক্কায় ঈমান-আনা কোনো মানুষ মানে-তার কাছ থেকে পালিয়ে বেড়ানো! হোক সে নিকটাত্মীয় কিংবা সুহৃদ বন্ধু! নইলে কাফিরদের সতর্ক দৃষ্টি থেকে বাঁচার কোনো উপায় নেই! আর একবার এ-অপরাধে কেউ ধরা পড়লে তার আর রক্ষে নেই! নিষ্ঠুরতার তুফান বইয়ে দেয়া হবে!
এই ঝড়ের মাঝেই খাদিজা অবিচলতা-দৃঢ়তা-বীরত্বপূর্ণ সহনশীলতায় বুক বেঁধে কাজ করে যাচ্ছিলেন! ইসলামের জন্যে মন-প্রাণ উজাড় করে কাজ করে যাচ্ছিলেন! নির্যাতিত নিপীড়িত সাহাবীদের পাশে দাঁড়িয়ে-দিয়ে যাচ্ছিলেন হৃদয়-শীতল সান্ত্বনা! খাদিজা যেনো ওদের যখমে মলম! সংকটে সমাধান! খাদিজার ধনাগার এদের জন্যে খোলা! তাঁর দানের হাত অবারিত! শুধু ঈমান আনার ‘অপরাধে’ নিপীড়িত দাস-গোলামদের কিনে কিনে তিনি মুক্ত করে দিচ্ছিলেন! এদের যখন যা প্রয়োজন হয়েছে-হচ্ছে, হাত খুলে তিনি তা-ই দিয়ে যাচ্ছিলেন! কুরাইশের আরোপ করা-‘বাণিজ্য ও অর্থ-অবরোধ’ তিনি এভাবে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিচ্ছিলেন! কোনো বাধাই তাঁর সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না! তিনি প্রায়ই দেখেন, তাঁর বাড়ির বাইরে কিছু লোক গালিগালাজ করছে! কখনো-বা পাথর ছুঁড়ে মারছে, তিনি তাতেও দমছেন না! প্রতিশোধও নিচ্ছেন না! শুধু ধৈর্যে বুক বেঁধে নিজের করণীয় করে যাচ্ছেন! কে কী করলো-সে দিকে তাঁর কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই! রাসূলের পেছনে পেছনে দুষ্কৃতিকারীদের দেখেও তিনি ফুঁসে উঠছেন না। রাসূল গৃহে এলে তাঁকে স্বাগত জানাচ্ছেন সুহাসিতে ভালোবাসা ছড়িয়ে! সে হাসিতে, সে মায়াভরা মুখাবয়বে চোখ পড়লেই দূর হয়ে যায় দাওয়াতের ময়দানে মুখোমুখি-হওয়া স-ব কষ্ট-যাতনা-দুর্ভোগ! মুছে যায় স-ব দুর্ব্যবহার-দুরাচারিতার গ্লানি!
খাদিজা যেনো দুঃখ-মোছার পরশপাথর! খাদিজা! খাদিজা! আপনি সত্যি পরশপাথর!
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখলেন এই জালিমদের কবল থেকে প্রিয় সাহাবীদের মুক্ত করতে হবে! রক্ষা করতে হবে! কিন্তু এখানে থেকে কী করে সম্ভব? নাহ, এখান থেকে ‘পালাতে’ হবে! হিজরত করতে হবে-কোনো নিরাপদ ঠিকানায়! হাবশার কথাই তাঁর মাথায় এলো! তিনি সাহাবীদের হাবশায় চলে যেতে বললেন! খাদিজা এ-সিদ্ধান্তে খুশি হলেন! তিনি হাবশাগামী কাফেলাকে সফরের জন্যে প্রয়োজনীয় সব সহযোগিতা করলেন! খাদিজার আনন্দ আরও বেড়ে গেলো, যখন জামাতা উসমান ইবনে আফফানও রোকাইয়াকে নিয়ে হিজরত করবেন বলে জানালেন! খাদিজা তাঁকে বললেন:
—উসমান! আল্লাহ বরকত দান করুন, তোমার মাঝে! রোকাইয়ার মাঝে! হ্যাঁ.. তোমরা যাও! আমরা এখানেই আছি, আল্লাহর ফায়সালা না-আসা পর্যন্ত!
রাতের অন্ধকারকে আশ্রয় করে হাবশাগামী কাফেলা এগিয়ে চললো মক্কা ছেড়ে, দীন নিয়ে, দীনের ভালোবাসা বুকে নিয়ে! রাসূলের ভালোবাসাকে পুঁজি বানিয়ে! খাদিজার প্রতি হাজারো কৃতজ্ঞতার বাণী উচ্চারণ করতে করতে। খাদিজা বিদায়কালে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে আদর করলেন, অনেক দু’আ করলেন! কপালে এঁকে দিলেন স্নেহময়ী মায়ের চুমুচিহ্ন! খাদিজা সবার দিকে তাকিয়ে রইলেন, তাকিয়েই রইলেন, যতোক্ষণ দেখা যায় ততোক্ষণ! একসময় কাফেলা দৃষ্টির আড়ালে চলে গেলো। অন্ধকারে মিশে গেলো। খাদিজা ফিরে এলেন গৃহে! মনটা ভার ভার। চোখটাও ভেজা ভেজা! শুধু রোকাইয়া উসমানের জন্যে না-সবার জন্যে! সবাই তো তাঁর সন্তান! তিনি যে উম্মুল মু'মিনীন!
📄 এবার অবরোধ
হাবশাগামী মুহাজির-কাফেলা সমুদ্র তীরে এসে পৌঁছেছে। সমুদ্রের বুকে খুঁজে ফিরছেন তাঁরা কোনো নৌযান। চোখে-মুখে ভীতির ছায়া। তাঁদের খুঁজে খুঁজে যেকোনো মুহূর্তে কুরাইশ এখানে চলে আসতে পারে। সামনে বিশাল সমুদ্র। নৌযান নজরে পড়ছে না! পেছনে কুরাইশের ধেয়ে আসার তীব্র আশঙ্কা! নবীজীর নির্দেশে যাচ্ছেন তাঁরা হাবশায়! সবাই আল্লাহর দিকে রুজু হলেন! আল্লাহর কী মেহেরবানি! হঠাৎ করেই যেনো সমুদ্রের নীল জলরাশির ভেতর থেকে দুটি নৌযান বেরিয়ে এলো! মুসলমানদের কাতর আবেদনে নৌযান তীরে ভিড়লো। মাথাপিছু অর্ধেক দিনারে ওরা নিতে রাজি হলে সবাই আরোহণ করলেন! একটু পরই সমুদ্রের গভীর জলরাশি কেটে কেটে ছুটে চললো হাবশাগামী জাহাজ।
কুরাইশরা একটু দেরি হলেও খবর জেনে ফেললো। এভাবে রাতের আঁধারে মুসলমানদের চলে যাওয়াটাকে তারা বিপজ্জনক মনে করলো। দ্রুত তারা সমুদ্রের দিকে লোক পাঠালো, সবাইকে ধরে আনতে! কিন্তু সমুদ্রের তীরে মুহাজির-কাফেলার কোনো চিহ্নও তারা খুঁজে পেলো না, চোখের সামনে শুধু পানি আর পানি! অগত্যা তারা ফিরে এলো, বুকের ভেতর আগুন নিয়ে! সে আগুনে ভেতরটা বুঝি পুড়েই যায়! সবাই এবার একসঙ্গে বসে সে আগুন ঝাড়তে লাগলো:
—কিসের আর অপেক্ষা? কিছু করার সময় কি এখনো হয় নি?
কেউ বললো: —চলো, মুহাম্মদকে ‘শেষ’ করে দিই!
অন্যরা বললো: —খাদিজা আর আবু তালিবকে শেষ করতে হবে আগে!
অন্য আরেকজন বললো: —শুধু এদের কয়েকজনকে না, পুরো বনু হাশেম ও বনু মুত্তালিবকেই শেষ করে দিতে হবে!
শেষে সবাই একমত হলো মুসলমানদের তারা অবরুদ্ধ করে রাখবে, কোনো খাবার তাদের কাছে পৌঁছতে দেবে না! মুহাম্মদকে সহযোগিতা বন্ধ না-করা পর্যন্ত এ-অবরোধ চলবে! হয় তারা ক্ষুধায় মরবে নয় মুহাম্মদের সঙ্গ ছাড়বে! এ ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই!
একটা চামড়ার টুকরোয় কিছু অনৈতিক ও অন্যায় কথা লিখে কা’বার দেয়ালে টানিয়ে দিলো ওরা। সবাইকে তা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলার কঠোর নির্দেশ দিলো। ওদের লেখা কথাগুলো ছিল অমানবিকতায় ভরা। নির্দয়তায় ঠাসা। সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার কালো চিন্তায় কুৎসিত। কয়েকটি শর্তের নমুনা—
• এখন থেকে মুসলমানদের সাথে যাবতীয় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।
• তাদের সাথে ক্রয়-বিক্রয় বন্ধ।
• তাদের সাথে বিবাহ-শাদী নিষিদ্ধ।
• কোনো রকম লেনদেনও চলবে না।
এই অমানবিক নির্দয় কুরাইশী সিদ্ধান্তকে সামনে নিয়ে বনু হাশেম ও বনু মুত্তালিব একত্রিত হলেন নিজেদের করণীয় ঠিক করতে। পরামর্শ হলো। সিদ্ধান্তও হলো। কুরাইশের এই অন্যায় অবরোধ ও অযৌক্তিক চুক্তি কিছুতেই মানা যায় না। সবাই থাকবেন প্রিয় মুহাম্মদের পাশেই। সে জন্যে জীবন দিতে হলে সবাই জীবনই বিলিয়ে দেবেন!
এরপর সবাই গিয়ে প্রবেশ করলেন একটা পাহাড়-বেষ্টিত উপত্যকায়। এটাই ভালো জায়গা। এখানে তাঁরা সবাই এক সাথে থাকবেন। সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেবেন। দূরে পড়ে থাক মক্কার সব ষড়যন্ত্র। খাদিজা এ-অভিযানে পিছিয়ে থাকলেন না। সবার সাথে শরীক হলেন। তিনিও এলেন হৃদয়ের সব কোমলতা নিয়ে এ দুর্গম গিরিময় উপত্যকায়! সাথে নিতে ভুললেন না-কিছু মাল কিছু ‘যাদ’-উপায়-উপকরণ! কুরাইশের নিষ্ঠুর অবরোধে এসব কাজে লাগবে!
এদিকে কুরাইশ অবরোধকে কঠিন থেকে কঠিনতর করে তোলার জন্যে যা যা করা দরকার সবই করতে লাগলো। যেমন তারা বাজারে গিয়ে গিয়ে ভিনদেশি বণিকদের কাছে ঘুরঘুর করতো। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোনো অনুসারী কিছু কিনতে এসে যখন মূল্য বলতেন-দরদাম করতেন, তখন ওদের কেউ এগিয়ে এসে দ্বিগুণ মূল্য হাঁকিয়ে বসতো। সাহাবী তখন মূল্য বাড়িয়ে কিনতে চাইলে আবার ওই লোকটা বেশি মূল্য বলে বাধা সৃষ্টি করতো। এভাবে চলতে থাকতো। শেষ পর্যন্ত সাহাবী হতাশ হয়ে চলে যেতেন। আর এরা তাঁকে লক্ষ করে বিদ্রূপের বাণ ছুঁড়তো।
আবু লাহাব ও উম্মে জামিল বনু হাশেম ও বনু মুত্তালিবের সাথে এখানে আসে নি। হিংসা ও বিদ্বেষ রাসূলের সাথে নিকটাত্মীয়তার কথা তাদের ভুলিয়ে দিয়েছে। বরং রাসূলের ক্ষতি করাই এখন তাদের লক্ষ। আবু লাহাব বাজারে বাজারে ঘুরতো আর চিৎকার করে করে বলতো- কেউ যেনো মুহাম্মদের কাছে—তার অনুসারীদের কাছে কিছু বিক্রি না করে! এতে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সে-ই তার ক্ষতিপূরণ দেবে।
কুরাইশ যখন এভাবে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়লো আল্লাহর রাসূল এবং অন্য সবাইকে ক্ষুধায় মারতে, তখন স্বাভাবিকভাবেই ঘাঁটিতে খাদ্যঘাটতি তারপর খাদ্যসংকট দেখা দিলো। এবং এ সংকট বাড়তে বাড়তে ভয়াবহ রূপ ধারণ করলো। একসময় যার কাছে যা ছিল স-বই শেষ হয়ে গেল! এদিকে বাইরে থেকে কিনে আনার পথও প্রায় বন্ধ! বয়স্ক নারী-পুরুষেরা কষ্টে কষ্টে দিন কাটাতে পারলেও শিশুদের অবস্থা খুবই শোচনীয় হয়ে উঠলো! এ শিশুকান্না বন্ধ করারও কোনো উপায় নেই! ক্ষুধার রাজ্যে ওরা অবুঝ! মানে না কোনো সান্ত্বনা! শোনে না কোনো বকুনি! কানেই তোলে না কান্না-থামানো কোনো ভয়বাণী! আহা! ওদের কান্নায় পাথরও বুঝি গলে যায়! গলে না শুধু কুরাইশ জালিমদের মন! অথচ ঘাঁটি ভেদ করে এ কান্না তাঁদের কানেও ‘আছড়ে পড়ছিল’!
এ অমানবিক অবরোধে কেমন ছিলেন মহীয়সী খাদিজা? ধৈর্যে অবিচল! সবরে ‘মেওয়া ফল’! পাশাপাশি বিলিয়ে যাচ্ছিলেন নিজের ধন-দৌলত ও সম্পদ-সহযোগিতা! এখানেও খাদিজার মৃদু হাসিটি হারিয়ে যায় নি! সব সময় তা তাঁর মুখে দ্যোতিত! দ্যুতি ছড়ায় তা সবার মনে! বিশেষত প্রিয় নবীর মনে! এখানেও সংকট যতো বাড়ে খাদিজার হাসিটিও ততো পুষ্পময় হয়—অনাবিলতায় জ্যোতির্ময় হয়! কেন? কেন এমন হয়? কেননা, খাদিজা বিশ্বাস করেন—এই-যে দীনের জন্যে এতো কষ্ট, এ-সবের বদলা মিলবে আল্লাহর কাছে, মহাবদলা! দুঃখে-কষ্টে হা-হুতাশে কেন নষ্ট হবে সেই মহাবদলা?! তাই গিরিসংকটে বসে অবরোধের মুখেও তাঁর মুখে অমন করে ফোটে—পুষ্পের হাসি!!
খাদিজা ছিলেন কুরাইশ থেকে বেশ দূরে—সেই পাহাড়ের ঘাটিতে। তবুও কুরাইশ খাদিজাকে ভয় পাচ্ছিল। খাদিজা কোন সময় কী পরিকল্পনা করে বসেন—বলা যায় না! খাদিজার পরিকল্পনা যেমন বুদ্ধিদীপ্ত তেমনি সুদূরপ্রসারী! তাই খাদিজাকে কুরাইশ ভীষণ ভয় পায়! খাদিজার পরিকল্পনাকেও তারা মারাত্মক ভয় পায়! এ জন্যে তারা অবরোধকে নিশ্ছিদ্র করার পাঁয়তারা চালাচ্ছিল। বাইরের কেউ যেনো খাদিজার সাথে কোনো রকম যোগাযোগ করতে না-পারে সে ব্যাপারেও তারা ছিল সীমাহীন সতর্ক। একসময় তাদের মনে হলো, তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিছু কিছু খাবার কেউ কেউ পৌঁছে দিচ্ছে! ঘাঁটিতে বসে খাদিজাই যে এ-আয়োজন করছেন গোপনে গোপনে, এতে তাদের বিন্দুমাত্র সন্দেহ রইলো না। সুতরাং পাহারা আরও মজবুত করা হলো। সতর্কতা আরও বাড়ানো হলো। অবরোধের সবকিছুই দেখাশোনা ও পর্যবেক্ষণ করছিল আবু জেহেল। সে এ ব্যাপারে আরও অনেক সতর্ক হয়ে উঠলো।
এক রাতে আবু জেহেল দেখতে পেলো এক গোলাম গমের বস্তা নিয়ে যাচ্ছে ঘাঁটির দিকে। পেছনে পেছনে যাচ্ছে খাদিজার ভাইপো হাকিম ইবনে হিযাম! আবু জেহেল সামনে বেড়ে ওই গোলামকে ধরে ফেললো! তারপর ক্ষুব্ধকণ্ঠে বললো:
—আমরা কি বনু হাশেমকে বয়কট করে চলার ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হই নি? যে পর্যন্ত না ওরা ইসলাম ত্যাগ করবে কিংবা ক্ষুধায় মারা যাবে?! কেন তুমি খাবার নিয়ে যাচ্ছো? কেন তুমি চুক্তি ভাঙছো?
গোলাম তখন তাচ্ছিল্যভরে বললো:
—আমি খাবার নিয়ে যাচ্ছি না! আমি ঋণ আদায় করতে যাচ্ছি! খাদিজা আমার কাছে এটা পায়! মানুষ মানুষের ঋণ পরিশোধ করবে-সেটা তোমরা করতে দেবে না?!
আবু জেহেল তখন রাগে-ক্ষোভে চিৎকার করে উঠলো এই বলে:
—খাদিজা! সবখানে খাদিজা! খাদিজাকে আর ছাড় দেয়া যায় না, তাকে এবং তার খান্দানকে শেষ করে দিতে হবে!
আবু জেহেল হনহন করে ছুটে গেল কুরাইশ নেতৃবৃন্দকে ঘটনা জানাতে এবং এবং খাদিজার ব্যাপারে একটা চূড়ান্ত ফায়সালায় আসতে। সব শুনে কুরাইশ ভাবতেও শুরু করলো। কিন্তু কে কী করবে খাদিজার? আল্লাহর ইচ্ছার বিরুদ্ধে? আল্লাহর ইচ্ছা হলো-এ অবরোধ ভাঙবে! আল্লাহর ইচ্ছা হলো-এ অবরোধ ব্যর্থ হবে! আল্লাহর ইচ্ছা হলো-ইসলাম থাকবে! ‘আবু জেহেল’ থাকবে না! ‘আবু লাহাব’ থাকবে না! আল্লাহর ইচ্ছেয় বাধা দেবে-কে?!
অবরোধের সময়টা একেবারে কম ছিল না-তিন বছর! এ তিন বছরে খাদিজা যেমন জানের কুরবানি করেছেন তেমনি মালেরও কুরবানি করেছেন! অর্থ-সম্পদ যা ছিল তাঁর—সব বিলিয়ে দিলেন তিনি নবীজীর মায়ায়.. আল্লাহর ভালোবাসায়! দানের মহিমায় এমন করে ‘হারিয়ে যেতে’ কোন ইতিহাস কোন নারীকে কোথায় দেখেছে-আমাদের মহীয়সী এই খাদিজা ছাড়া?! অবরোধের কঠিন দিনগুলোতে তিনি নিজে তো ছিলেনই অটল-অবিচল, পাশাপাশি নারীকে জুগিয়েছেন অবিচলতার সাহস আর পুরুষকে দিয়েছেন লড়াই করার শক্তি!
আল্লাহর ইচ্ছায় অবরোধ শেষ হলো। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের নিয়ে.. স্বগোত্রকে নিয়ে.. খাদিজাকে নিয়ে ফিরে এলেন। খাদিজা এ অবরোধে শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লেও অনেক বেড়ে গিয়েছিল তাঁর মানসিক বল। গৃহে এসে খাদিজা ভাবতে লাগলেন-কুরাইশ এখন কী করতে পারে, নতুন করে? ওদের ‘তৃণীরে’ আছে কি অন্য কোনো তীর? হ্যাঁ.. একটা তীর এখনো আছে! সর্বশেষ তীর!! খাদিজা চিৎকার করে উঠলেন:
—অসম্ভব! ওরা কিছুতেই তাঁকে হত্যা করতে পারবে না! না, কিছুতেই না!! আল্লাহ তাঁকে রক্ষা করবেন! অবশ্যই রক্ষা করবেন!
📄 শেষ তীর
দীর্ঘ অনুপস্থিতির পর খাদিজা গৃহে ফিরে এলেন। তাঁর আগমনে গৃহ-আঙিনা আবার প্রাণ ফিরে পেলো। এতোদিন বাড়িটি যেনো আঁধারে আচ্ছন্ন ছিল, এখন আবার কী সুন্দর ঝলমলিয়ে উঠেছে। খাদিজার বান্ধবী ও সখীরা ছুটে এলেন খাদিজাকে অভিনন্দন জানাতে, নিরাপদ প্রত্যাবর্তনে। ছুটে এলো আরও কতো নারী, খাদিজার অনুগ্রহের বৃষ্টিতে ছিল যাদের নিত্য অবগাহন। সবার চোখে অশ্রু, আনন্দের ‘বন্যা’! সবার বুকে ক্ষোভ, কাফির মুশরিকদের নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে ক্ষোভ!
খাদিজার গৃহে সাহাবায়ে কেরামও আসছেন দলে দলে। তাঁর বাড়ির এখানে ওখানে গুঞ্জরিত হচ্ছে কুরআনের তিলাওয়াত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিলাওয়াত করছেন। সাহাবীরাও তিলাওয়াত করছেন, কোথাও একা একা, কোথাও দলবদ্ধ হয়ে। না, এখন আর মুসলমানেরা গোপনে দাওয়াত দিচ্ছেন না কিংবা ইবাদত-বন্দেগি করছেন না। এখন সবই হচ্ছে প্রকাশ্যে, কাফির মুশরিকদের চোখের ওপর। এখন বীর উমর যেমন ইসলাম কবুল করেছেন তেমনি মহাবীর হামযাও ইসলাম কবুল করে ধন্য হয়েছেন। এ বীরদের ইসলাম গ্রহণে ইসলাম এখন বীরপুষ্ট। শক্তিশালী।
কাফির মুশরিকদের আরোপিত অবরোধ ব্যর্থ। ওরা এ জন্যে ভেতরে ভেতরে কেবল গড়গড় করছিল-ফুঁসছিল। ওরা চেয়েছিলো অবরোধে সবাইকে শেষ করে দেবে। মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সাহাবীদের ক্ষুধা-মৃত্যুর নিচে চাপা দেবে। কিন্তু কিছুই হলো না, আল্লাহর ইচ্ছায় অবরোধ ভেঙে গেছে। ব্যর্থ হয়ে গেছে। অবরোধের নিষ্ঠুর কালো দিনগুলোকে পেছনে ফেলে আত্মত্যাগের বিরল মহিমায় ভাস্বর হয়ে ফিরে এসেছেন সবাই। এখন সারা আরবে তাঁদের কথা আলোচনা হচ্ছে। অনেকেই আশ্চর্য হয়েছে। মুগ্ধ হয়েছে। বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েছে, অবশ্যই আল্লাহ আছেন মুহাম্মদের সাথে। ফলে অনেকেই ঝুঁকে পড়তে লাগলো ইসলামের দিকে। আল্লাহর রাসূলের হাতে হাত রেখে ঘোষণা করতে লাগলো-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ! বাড়তে লাগলো এভাবে দিনে দিনে মুসলমানদের সংখ্যা।
খাদিজা আবারো নজর দিলেন তাঁর ব্যবসা-বাণিজ্যের দিকে। তাঁর কাছে এসে ভিড় করতে লাগলো কাজের লোকেরা। জমে উঠলো আগের মতোই আবারও বেচাকেনা। এদিকে ইসলামের জয়যাত্রায়-উত্তরোত্তর সংখ্যা বৃদ্ধিতে তিনি ভীষণ খুশি। কাফির মুশরিকদের শত বাধার সামনেও ইসলামের এ-আলোর যাত্রা ব্যাহত হচ্ছে না। আল হামদুলিল্লাহ!
খাদিজার বাড়ির দিকে চোখ পড়লেই মক্কার সরদারদের চোখে হিংসা জ্বলে-জ্বলে উঠতো। ওরা চাইতো–খাদিজার বাড়িটা শেষ করে দেয়া যেত যদি! আবু লাহাব আর উম্মে জামিল দেখতো খাদিজার বাড়িতে মুসলমানেরা এই আসছে এই যাচ্ছে, বিরতিহীন। সারাক্ষণ কী গমগম করে বাড়িটা। উম্মে জামিল এসব দেখে আর জ্বলে। ওরা সবাই এ দৃশ্য দেখে আর জ্বলে। জ্বলতেই থাকে। ওদের জ্বলার যেনো শেষ নেই। ওদের ক্ষোভের যেনো সীমা নেই। ওদের পোড়ারও যেনো কোনো শেষ নেই। ওদের হৃদয় জ্বলে। ওদের চোখ জ্বলে। আগুন-জ্বলা হৃদয় ও চোখ নিয়ে কেমনে তারা ঘুমোবে? যখন বিছানায় শুতে যেতো শুতে পারতো না, হিংসা ও ক্ষোভের এ আগুন ওদের রাতের ঘুম চোখের ঘুম-সব কেড়ে নিতো। বিশেষত যখন খাদিজার গৃহ থেকে কুরআনের সুর ভেসে আসতো, সাহাবীদের কথা শোনা যেতো তখন ওদের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যেতো, হিংসার আগুন যেনো চোখ বয়ে বয়ে পড়তো। নাকি বিষাক্ত তীর এসে এদের বুকে বিঁধতো? তখন বিছানা ছেড়ে তারা উঠে আসতো বাড়ির ছাদে, তাকিয়ে থাকতো খাদিজার বাড়ির দিকে হিংসাভরা দৃষ্টিতে, ক্ষোভের ওপর ক্ষোভ নিয়ে। তাদের কটমট দৃষ্টি যেনো বলতো—খাদিজারে খাদিজা! সইতে আর পারি না! কবে যে তুই মরবি জানি না!
এক রাতে খাদিজার ঘরে ফজর তক কেউ ঘুমোলো না। ওদিকে আবু লাহাবের বাড়িরও একই অবস্থা, সে রাতে কেউ ঘুমায় নি। সকাল হতেই আবু লাহাব ছুটে গেল কুরাইশের মজলিসে। তারপর চিৎকার করে বলতে লাগলো:
—হে কুরাইশ সম্প্রদায়! আর কতো সইতে হবে? সহ্যের একটা সীমা আছে! সে সীমা অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে!
আবু লাহাবের অগ্নি-উত্তেজনাকে কেউ একজন থামাতে চাইলো। আবু লাহাব তখন আরও জ্বলে উঠলো:
—তুমি যদি খাদিজার প্রতিবেশী হতে তাহলে বুঝতে কী জ্বালায় জ্বলছি আমি! ও বাড়িটার দিকে তাকালেই তুমি দেখতে পাবে মুহাম্মদের ধর্মটা কেমন তরতরিয়ে এগিয়ে চলেছে! এরপরও কি তুমি বলবে আরও ধৈর্য ধরতে? ধৈর্যে ধৈর্যে বেলা অনেক হয়ে গেছে! আর ধৈর্য-ধৈর্য করলে এবার বেলাই ডুবে যাবে! তখন কেমন মজা হবে? বিষয়টা এখন এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে যে এখন গালিতে কাজ হবে না! নতুন কোনো অবরোধেও কাজ হবে না! বন্দি করলেও কোনো ফায়দা হবে না! এখন প্রয়োজন একটি, শুধু একটি! আর তা হলো—শেষ তীরের ব্যবহার!!
আরেকজন শান্তগলায় বললো: —কিন্তু আবদুল উয্যা! মুহাম্মদ তো তোমার আপন ভাতিজা!
আবু লাহাব আবার জ্বলে উঠলো। নির্দয়তা-মাখা কণ্ঠে বললো:
—সে সম্পর্ক নেই! সব চুকেবুকে গেছে! না ‘রক্তের বন্ধন’ না আত্মীয়তার বন্ধন—কিছুই নেই!
আবু লাহাবের দৃষ্টি পড়লো আবু তালিবের ওপর। তিনি সেখানেই বসা ছিলেন। তাঁর দিকে তাকিয়ে কটমট করে বললেন:
—আবু তালিবের সাথেও এখন থেকে আমার কোনো সম্পর্ক নেই! আবু তালিব মুহাম্মদের দলের! সুতরাং এখন ওদের বিরুদ্ধে যা করার করো, আমি ওদের পাশে নেই! থাকবোও না! নিভিয়ে দাও এ আগুন, যা বেড়েই চলেছে, দিনে দিনে! তোমরা কি লক্ষ করো নি, এ আগুন এখন মক্কার বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে! মুহাম্মদ তো এখন রীতিমতো ভিনদেশি কবিলা ও গোত্রের সাথে আলাপ-আলোচনা করছে, তাঁদেরকে তার ধর্মের দিকে ডাকছে! আবু তালিব মুহাম্মদের এসব কর্মকাণ্ডকে বাধা তো দিচ্ছেই না, উল্টো সমর্থন করে যাচ্ছে! মুহাম্মদ যা চায় আবু তালিবও তা-ই চায়! মুহাম্মদ যা বলে আবু তালিবও তা-ই বলে! আবু তালিব কি ওই ঘাঁটি পর্যন্তও মুহাম্মদের সঙ্গে যায় নি? বেছে নেয় নি কি মুহাম্মদের স্বার্থে নিজের জন্যে অবরোধ? সুতরাং আবু তালিবের কাছ থেকে কিছুই আশা করা যায় না! অবশ্য সবচেয়ে বড় সমস্যাটা এখন আবু তালিবও না! এইমুহূর্তে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, খাদিজা ও খাদিজার মাল-দৌলত!
একটু চুপ থাকার পর আবু লাহাব রাগে গড়গড় করতে করতে বললো:
—খাদিজার পুরা খানদানই মুহাম্মদের পাশে! এমনকি যারা ইসলাম কবুল করে নি তাঁরাও মুহাম্মদের পাশে! খাদিজার বোন হালা ও তার ছেলের খবর কি তোমরা রাখো? মুসলমান না হয়েও তারা মুহাম্মদকে সহযোগিতা করে যাচ্ছে! খাদিজার গৃহই তাঁদের গৃহ! এর আগেও এ খানদানের কেউ কেউ রাতের আঁধারে পাহাড়ের ঘাঁটিতে খাবার নিয়ে গেছে! আমাদের পরিকল্পনা নষ্ট করে দেয়ার চেষ্টা করেছে! খাদিজার ভাইদের ছেলে-মেয়েরাও একে একে ইসলাম কবুল করে চলেছে!
আরেকবার থামলো আবু লাহাব। তারপর আরও অগ্নিময় হয়ে বললো:
—খাদিজার পরিবারের কেউ কেউ বাহ্যত ইসলামবিরোধিতা করলেও কে বলবে এরা খাদিজার চর নয়? চর না হলেও কে বলবে এরা ইসলাম গ্রহণের চিন্তা করছে না? না, এদের কাউকেই বিশ্বাস করা যায় না!
এরপর আবু লাহাব জমিনে জোরে একটা থাপ্পর মেরে বললো:
—খাদিজাকে দিয়েই শুরু করতে হবে! খাদিজাকেই আগে ধরতে হবে! খাদিজার পর আমাদের জন্যে সবকিছুই সহজ হয়ে যাবে!
একজন বললো: —আবু তালিবকে দিয়ে শুরু করলে?
আবু লাহাব এ-কথা শুনে প্রচণ্ড ক্ষেপে গেল। বললো:
—আমি আমার মত জানিয়ে দিলাম! এখন তোমরা যাকে চাও তাকে দিয়েই শুরু করো! কিন্তু ঘুমিয়ে থেকো না! বিষয়টা খুবই মারাত্মক! একদিনের কাজ পেছানো মানে এক বছর পিছিয়ে যাওয়া! আমরা পিছিয়ে গেলে মুহাম্মদের বিজয় আর ঠেকানো যাবে না! পরাজয়ই হবে আমাদের ‘ললাট-লিখন’!
শেষে সিদ্ধান্ত হলো, আবু তালিবকে দিয়েই শুরু হবে! একজন বললো:
—আবু তালিবকে নিজের অবস্থায় ছেড়ে দাও! বেচারা এখন জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো পার করছে, প্রচণ্ড অসুস্থ!
পরে তারা ঠিক করলো, আবু তালিবকে মুহাম্মদের ব্যাপারে তাঁদের বক্তব্য পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে আসবে। হয় আবু তালিব মুহাম্মদকে নতুন দাওয়াত বন্ধ করতে রাজি করাবে নয় মুহাম্মদের পথ থেকে সরে দাঁড়াবে। যদি একটাতেও আবু তালিব রাজি না হয়, তাহলে আবু তালিব ও মুহাম্মদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত লড়াই শুরু হবে!
এরপর কুরাইশ গেল আবু তালিবের কাছে। গিয়ে তাঁকে জানিয়ে দিলো তাঁদের বক্তব্য- সাফ সাফ। কিন্তু ফল যা আশা করা হয়েছিল তার কিছুই হলো না! আবু তালিব তাঁদের প্রস্তাব ঘৃণাভরে ফিরিয়ে দিলেন! আল্লাহর রাসূল সে সময় প্রিয় চাচা আবু তালিবের কাছেই অবস্থান করছিলেন। তাই কাফির মুশরিকদের বক্তব্য যেমন শুনেছেন তেমনি দেখেছেন তাঁদের চোখে নিষ্ঠুরতা ও জিঘাংসার ছায়া! ওরা চলে গেলে আল্লাহর রাসূলও বেরিয়ে পড়লেন এবং গৃহে এসে খাদিজার পাশে গম্ভীর হয়ে বসে রইলেন। খাদিজা আগের মতোই-সব সময়ের মতোই মৃদু হেসে বললেন:
—আল্লাহর রাসূল! কী ব্যাপার, আপনাকে যে বিচলিত দেখাচ্ছে?!
আল্লাহর রাসূল উদ্বেগভরা কণ্ঠে বললেন:
—খাদিজা! চাচাজান আবু তালিবের অবস্থা ভালো না! কাফিররা তাঁর মওতের ইন্তিজার (অপেক্ষা) করছে! তারপর সর্বশক্তি নিয়ে আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে!
খাদিজা প্রিয় মুহাম্মদের দিকে আলো-ঝলমলে চেহারা নিয়ে তাকালেন! তারপর মিষ্টি করে হাসলেন! তারপর কোমল করে বললেন:
—আল্লাহর রাসূল! বিচলিত হবেন না! হকের ওপর বাতিল বিজয়ী হতে পারে না! ওরা যা করতে চাচ্ছে তা কিছুতেই করতে পারবে না। আপনার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না! আবু তালিব যদি চলে যান, কোনো চিন্তা নেই! আবু তালিবের ‘রব’ তো আছেন!! তিনি আবু তালিবের চেয়ে এবং ওদের চেয়ে অনেক শক্তিশালী! অনেক!
খাদিজার আস্থাভরা কণ্ঠের দৃঢ় সান্ত্বনায় আল্লাহর রাসূল আশ্বস্ত হলেন। দূর হয়ে গেল তাঁর বিচলন। কিন্তু বসা থেকে না-উঠতেই এলো চাচাজানের মৃত্যুসংবাদ! আল্লাহর রাসূলের মুখ থেকে একটু আগের হাসিটি মিলিয়ে গেল! মুখাবয়বের ভাঁজে ভাঁজে পিতৃব্য-বিয়োগ-বেদনার ছাপ ফুটে ফুটে উঠতে লাগলো! তাঁর সান্ত্বনা-দুর্গের একটি বড় স্তম্ভ কি আজ ভেঙে পড়লো? তাই তো মনে হয়!
আল্লাহর রাসূল দ্রুত বেরিয়ে গেলেন! যেতে যেতে খাদিজাকে বেদনাভরা কণ্ঠে বললেন:
—খাদিজা! তুমি ছাড়া আর কেউ যে রইলো না!
আল্লাহর রাসূল খাদিজার দীর্ঘ জীবন কামনা করে দু'আ করতে লাগলেন।
📄 বিদায়
খাদিজা আল্লাহর রাসূলকে নিয়ে ক্রমেই শঙ্কিত হয়ে উঠছিলেন। তাঁকে কখন কীভাবে সহযোগিতা করা যায়—এই হয়ে উঠলো খাদিজার সার্বক্ষণিক চিন্তা। বয়স যদিও এখন তাঁর অনেক—পঁয়ষট্টি ছুঁইছুঁই হয়ে গেছে, তবু ঈমানের বলে হৃদয়টা তাঁর চিরসবুজ! সজীবতায় চিরআন্দোলিত!
আল্লাহর রাসূলের তামান্না—খাদিজা দীর্ঘজীবী হোন! সে দিন পর্যন্ত খাদিজা বেঁচে থাকুন যেদিন আল্লাহর সাহায্যে ইসলাম পূর্ণতা লাভ করবে! ইসলামের সূর্য আলোকিত করবে দুনিয়ার দিক-দিগন্ত। দূর করে দেবে সকল কালো। আহা, খাদিজা! ইসলামের জন্যে.. ইসলামের নবীর জন্যে নিজের জান-জীবন—সব উৎসর্গ করে দিয়েছেন! যখনই আল্লাহর রাসূল এবং সাহাবীদের ওপর জুলুম হয় তখন সবার আগে কে ব্যথা পায়? খাদিজা! আল্লাহর রাসূলের কষ্ট যেনো খাদিজার নিজেরই কষ্ট! সাহাবীদের কষ্ট যেনো খাদিজার নিজেরই কষ্ট! মহীয়সী খাদিজার বয়স যতোই বাড়ছে ততোই তিনি প্রিয় মুহাম্মদকে কাছে অনুভব করছেন! তাঁর ভালোবাসার উত্তাপ অনুভব করছেন!
একদিন আল্লাহর রাসূল ও খাদিজা রাতের গভীরে বসে বসে দু’আ করছিলেন.. কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন। খাদিজা হঠাৎ তাঁর সারা শরীরে একটা কাঁপুনি অনুভব করলেন! অনুভব করলেন আস্তে আস্তে দেহটা নিস্তেজ হয়ে আসছে! তিনি আল্লাহর রাসূলের দিকে হাসিমুখে তাকালেন! মায়াবিকণ্ঠে বললেন:
—আল্লাহর রাসূল! অবশ্যই আল্লাহ আপনাকে সাহায্য করবেন! ওরা কিছুতেই আল্লাহর নূর-ইসলামকে নেভাতে পারবে না! আল্লাহ এ নূরকে পূর্ণতা দান করবেনই! তাঁর রাসূলকে সাহায্য করবেনই!
আল্লাহর রাসূল দেখলেন খাদিজাকে ভীষণ ক্লান্ত দেখাচ্ছে! তিনি খাদিজার হাতের তালু দেখলেন! ভীষণ গরম! উদ্বেগভরে বললেন:
—খাদিজা, তুমি তো অসুস্থ!
খাদিজা বললেন:
—কিছু না, শরীরটা গরম! ঠিক হয়ে যাবে!
আল্লাহর রাসূল খাদিজাকে ধরে উঠতে সাহায্য করলেন! তারপর বিছানায় শুইয়ে দিলেন! পাশে বসে তাঁর গায়ে হাত বুলিয়ে দিলেন! তাঁর মাথায় ঠাণ্ডা পানি ঢেলে দিলেন! আল্লাহর কাছে তাঁর আরোগ্যের দু’আ করতে লাগলেন! আর খাদিজা কৃতজ্ঞতাভরা চোখে প্রিয় মুহাম্মদের দিকে তাকিয়ে রইলেন! তাঁর শোকর আদায় করতে লাগলেন! তাঁকেও একটু বিশ্রাম নিতে বললেন! আল্লাহর রাসূল তখন দয়া-ঝরানো কণ্ঠে বললেন:
—খাদিজা! কেমন করে আমি তোমার হক আদায় করবো?! আমি ছিলাম নির্ধন! আল্লাহ তোমাকে দিয়ে আমার অভাব দূর করে দিয়েছেন! আমি ছিলাম ঝুঁকির মুখে, বিপদের দুয়ারে! তোমার গৃহে পেয়েছি সাহায্য ও সুরক্ষা! তুমি আমার কী-না ছিলে?! কখনো তুমি ছিলে মায়ের ভূমিকায়। কখনো বোনের ভূমিকায়। স্ত্রীর ভূমিকায় তুমি ছিলে আদর্শ, সফল!
খাদিজার দেহে প্রচণ্ড ব্যথা ছড়িয়ে পড়লো! তাঁর চোখ ছলছল করছে। কিসের পানি? ব্যথার? মৃত্যুযন্ত্রণার? আল্লাহর রাসূল তাঁর দিকে তাকিয়ে দুঃখভারাক্রান্ত কণ্ঠে বললেন:
—খাদিজা! কী হয়েছে তোমার? খুব কষ্ট হচ্ছে?! আল্লাহই তোমাকে দেখবেন! আল্লাহর দয়া অনেক বেশি!
খাদিজা আল্লাহর রাসূলের ব্যথা ও বিচলন দেখে ক্ষীণকণ্ঠে বললেন:
—হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ অবশ্যই আপনাকে সাহায্য করবেন! ওরা পারবে না কখনো আল্লাহর নূরকে নেভাতে! আল্লাহ তাঁর নূরকে নিভে যেতে দিতে পারেন না! অবশ্যই তিনি এ-নূরকে পূর্ণতা দান করবেন, করবেনই! মুশরিকরা না-চাইলেও করবেন!
খাদিজা একটু থামলেন! তারপর মিষ্টি করে হাসলেন। হাসতে হাসতে বললেন:
—আমিও মনে-প্রাণেই চাইছিলাম-ইসলামের মহাসূর্যটাকে চোখভরে দেখে যাবো! পৃথিবীর সকল অন্ধকার ছিন্নভিন্নকারী সে সূর্য! মক্কার সকল জুলুম-শোষণ-ত্রাসন নিঃশেষকারী সে সূর্য! ...
আল্লাহর রাসূল হেসে বললেন:
—খাদিজা! তুমি দেখে যাবে! অবশ্যই দেখে যাবে! এ বিপদ কেটে যাবে! তুমি আবার সুস্থ হবে! তোমার স্বপ্ন পূরণের পথে তুমি এগিয়ে যাবে!
আল্লাহর রাসূল কী যেনো ভেবে নিয়ে বললেন:
—আল্লাহ তোমাকে সুস্থ করে তুলবেন! আমাকে একা তিনি ছাড়বেন না!
খাদিজা আবারও আল্লাহর রাসূলকে সান্ত্বনা দিলেন। বললেন:
—আপনি একা হবেন কেন হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ আছেন আপনার সাথে! ওরা আপনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। আল্লাহ ওদের সব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দেবেন! ওদের কবল থেকে আপনাকে উদ্ধার করবেন! আপনি আছেন আল্লাহর আশ্রয়ে, ওদের সাধ্য কি এখানে পৌঁছে?
একটু নীরব থাকার পর খাদিজা বললেন:
—আল্লাহর রাসূল! আমার রব আমার জন্যে কী প্রস্তুত করে রেখেছেন? তিনি কি আমাকে কবুল করবেন? আমার প্রতি কি তিনি সন্তুষ্ট?
আল্লাহর নবী সোহাগভরে প্রিয় খাদিজার চোখ দু’টি বন্ধ করে দিলেন! খাদিজার অশ্রু ছলোছলো চোখ দেখতে তাঁর বুঝি কষ্ট হচ্ছিল! তারপর কোমলকণ্ঠে বললেন:
—আল্লাহ তোমার প্রতি সন্তুষ্ট! আল্লাহ তোমায় বদলা দেবেন! তুমি আশ্রয় দিয়েছো! তুমি সাহায্য করেছো! তুমি নিজের সবকিছু ব্যয় করেছো! তুমি আল্লাহর সাহায্যকারী! তাঁর রাসূলের সাহায্যকারী! যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সাহায্য করে আল্লাহ তাঁর জন্যে হয়ে যান! খাদিজা! তোমার জন্যে জান্নাতে থাকবে এমন প্রাসাদ, যার তলদেশ দিয়ে বইতে থাকবে ঝরনাধারা! সে প্রাসাদ হবে মোতির তৈরি! গোলাপে গোলাপে ছাওয়া! সেটিকে বেষ্টন করে রাখবে ফলের ভারে ভারে নুয়ে পড়া বৃক্ষশাখা! প্রবহমান ঝরনাধারা!!
তারপর আল্লাহর রাসূল খাদিজার মাথায় আবার ঠাণ্ডা পানি ঢাললেন! তারপর বললেন স্নেহভরে.. দরদভরে:
—জ্বর চলে যাবে! তুমি সুস্থ হবে! আবার তুমি তৎপর হয়ে উঠবে ইসলামের সেবায়! অবশ্যই আল্লাহ তোমাকে উঠিয়ে নিয়ে দুশমনকে খুশি করবেন না! কিছুতেই ওরা পারবে না দীনের আলো নেভাতে!
খাদিজা চোখ মেললেন! বড় বড় সেই চোখ! তারপর শঙ্কা মেশানো কণ্ঠে জানতে চাইলেন:
—কুরাইশের খবর কী!
খাটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা খাদিজার এক মেয়ে অশ্রুভেজা কণ্ঠে জবাব দিলেন:
—মা! ওরা (তোমার মৃত্যুর) অপেক্ষা করছে!
ওর অশ্রু এবার বাঁধভাঙা কান্নায় রূপ নিলো! আল্লাহর রাসূল স্নেহভরে মেয়ের চোখ মুছে দিলেন! সান্ত্বনা দিলেন! খাদিজাকে ডাকলেন কথা বলতে! কিন্তু খাদিজার অসুখের তীব্রতা আরও বেড়ে গিয়েছিল! আল্লাহর রাসূলের মুখে উদ্বেগের কালো ছায়া! মেয়েদের মুখে উদ্বেগের কালো ছায়া। সাহাবীদের মুখেও উদ্বেগের কালো ছায়া! তাঁদের সবার মুখে ব্যাকুল জিজ্ঞাসা-কেমন এখন তিনি? সেরে উঠবেন তো!
অসহায় দরিদ্রদের মুখেও গভীর শোকচ্ছায়া! খাদিজা না-থাকলে কেমন করে চলবে তাঁদের জীবনের চাকা?
আবু লাহাব ও উম্মে জামিল ওদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। খাদিজার গৃহ থেকে যে-ই বেরিয়ে আসছে তার কাছেই জানতে চাচ্ছে খাদিজার অবস্থা! কিন্তু জওয়াব মিলছিল বড়ো রূঢ় ভাষায়! কেননা, তাঁদের প্রশ্নে ছিল চাপা উচ্ছ্বাস! খাদিজার জীবন প্রদীপ নিভে যাওয়ার উৎকট বাসনা! মক্কার সবাই জানতে চাচ্ছে খাদিজার অবস্থা। প্রিয়জনও, অপ্রিয়জনও। বৈঠকেও একই অবস্থা। কেউ খাদিজার সমালোচনায় মত্ত। কেউ তাঁর প্রশংসায় উচ্ছ্বসিত। ওরা উৎকর্ণ হয়ে আছে, খাদিজার সর্বশেষ খবর জানতে।
আল্লাহর রাসূল এবং মেয়েরা বসে আছেন খাদিজাকে ঘিরে! খাদিজা জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো পার করছিলেন! জীবনসায়াহ্নেও তাঁর একমাত্র চিন্তা ছিল-প্রিয় রাসূল! কুরাইশের নিষ্ঠুরতা!
রাতটা ছিল অনেক দীর্ঘ! এক ফোঁটা ঘুমও হয় নি কারও! চোখ ছিল বেদনাকাতর-ছলোছলো! মন ছিল উদ্বেগাচ্ছন্ন! খাদিজা বিছানায়! আল্লাহর রাসূল পাশে! আল্লাহর রাসূল সব আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিলেন!
শেষরাতের দিকে খাদিজা চোখ মেললেন, কিছুক্ষণের জন্যে! তারপর মেয়েদের দিকে তাকালেন! প্রিয় রাসূলের দিকে তাকালেন! তারপর হাসি-হাসি মুখে আবার চোখ বন্ধ করে ফেললেন! আর খুললেন না! খুলতে পারলেন না! কোনোদিন খুলতে পারবেন না! নীরব হয়ে গেলেন মহীয়সী খাদিজা! নিথর হয়ে গেল তাঁর দেহ! এ-দেহে কী প্রাণ ছিল! সদা সজীব! ইসলামের সেবায় আকুল! নবীজীর সেবায় ব্যাকুল! দীনের তরে সদা জাগ্রত! এ-মহীয়সীর সামনে বসে.. এ দেহের সামনে বসে— নবীজী কাঁদলেন! মেয়েরা কাঁদলেন! আশপাশে সবাই কাঁদলেন! সবকিছুই যেন কাঁদতে লাগলো!
সকালবেলা খাদিজা বের হলেন, অশ্রুসিক্ত সাহাবীদের কাঁধে করে! মক্কার উত্তর-পূর্বে কুরাইশ সম্প্রদায়ের কবরস্থান—‘হাজুন’ নিয়ে যাওয়া হলো!
তারপর আল্লাহর রাসূল নিজে নামলেন কবরে! তারপর নিজের হাতে তাঁর কবরকে সমান করলেন! তারপর লাশ গ্রহণ করে নিজের হাতেই তাঁকে শুইয়ে দিলেন! তারপর বিদায়ের শেষলগ্নে তাঁর চেহারার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন! তারপর বেরিয়ে এলেন কবর থেকে অশ্রুপূর্ণ চোখে! মাথা নুইয়ে!
ফিরে এলেন খাদিজাবিহীন খাদিজার বাড়িতে! সাহাবীদের সান্ত্বনার ভিড়ে বসে তিনি অপেক্ষা করতে লাগলেন কুরাইশের পক্ষ থেকে ধেয়ে আসা সম্ভাব্য আঘাতের! এ আঘাত এখন একাই তাঁকে মুকাবিলা করতে হবে! চাচাজান নেই! নেই খাদিজাও! আল্লাহ! তুমিই সহায়! তুমি তো আছো হে মালিক! তুমি চিরসাহায্যকারী! মুমিনের চিরবন্ধু!