📄 উম্মুল মু‘মিনীন
এরপর আর ওহী বন্ধ হয় নি, একের পর এক নাযিল হতে লাগলো আসমানি ওহী-কুরআনের আয়াত। খাদিজা কী সৌভাগ্যবতী! ওহী নাযিল হওয়ার পর সবার আগে জানতে পারেন তিনি। তারপর সবার আগেই শুরু করে দিতে পারেন তার প্রচার। প্রিয়জনদের মাঝে। ওহীর বাণীর ওপর আমলের সৌভাগ্যও তাঁরই প্রথম হয়। এমন অনেক সৌভাগ্যের ‘সব প্রথমেই’ খাদিজা প্রথম। আরেকটু স্পষ্ট করে বলছি—
নবীজীর প্রথম স্ত্রী কে? .. খাদিজা!!
প্রথম মুসলমান কে? .. খাদিজা!!
প্রথম ওযু শিখেছেন কে? .. খাদিজা!
নবীজীর সাথে প্রথম নামায পড়েছেন কে? .. খাদিজা!
সর্বপ্রথম কে নবীজীর দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন? .. খাদিজা!
কে সবার আগে তাঁর পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছেন? .. খাদিজা!
কাফির-মুশরিকদের ঠাট্টা-বিদ্রূপের ঝড় কে মুকাবিলা করেছেন প্রথমে? .. খাদিজা!
কা’বায় নামায পড়তে যাবেন আল্লাহর রাসূল! তখনো খাদিজা আছেন তাঁর সাথে! তিনিও নামায পড়ছেন আল্লাহর রাসূলের সাথে! তাঁর পেছনে! তখন দু’জনকে কেন্দ্র করে কাফির-মুশরিকরা কতো ঠাট্টা করলো, কতো বিদ্রূপ করলো, কিন্তু সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপই করলেন না খাদিজা!
এভাবেই প্রিয়নবীর সহযোগিতায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন মহীয়সী খাদিজা!
আল্লাহর রাসূলের দাওয়াতের কাজ চলতে লাগলো, আলোকিত হতে লাগলেন সত্যান্বেষী মানুষেরা। মিল্লাতে ইবরাহিমীর অনুসারীরা। মক্কার কিছু নেতৃস্থানীয় মানুষ যেমন ঈমান আনলেন, অনেক অসহায় দুর্বল মানুষও ঈমান আনলেন। দুর্বলেরা দেখলো, এই নতুন দীনেই লুকিয়ে আছে মহামুক্তির মহাপয়গাম। দাস-জীবনের বোঝা আর কতোদিন তারা বইবে? যেখানে কেবলই অমানবিকতা, নিষ্ঠুরতা। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নতুন দীনে নেই কোনো ভেদাভেদ, সবাই সমান। তারা একে একে সবাই ‘লাব্বাইক’ বলতে লাগলো।
নবীগৃহের সদস্যরাই সবার আগে সাড়া দিলেন। খাদিজার সব মেয়ে ঈমান আনলেন। কিন্তু মেয়েরা ঈমান আনলেও তাঁদের স্বামীরা ঈমান আনলো না। এতে দাম্পত্য-সংকট সৃষ্টি হলো। সে কথা আমরা একটু পরের দিকে বলছি।
অপরদিকে মক্কার নেতৃস্থানীয়রাও ঠাট্টা-বিদ্রূপে মেতে উঠলো। দীনের ব্যাপারে সন্দেহ তৈরি করতে লাগলো। দাস-গোলামদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে তাদের পূর্বের ধর্মে-মূর্তিপূজার ধর্মে ফিরে যেতে চাপ প্রয়োগ করতে লাগলো। শাস্তি দিতে লাগলো। ঈমান গ্রহণকারী মহিলা হলে-কারও স্ত্রী হলে ‘স্বামী-স্ত্রী’র সম্পর্কে ফাটল ধরানোর চেষ্টা করতে লাগলো।
খাদিজা তখন কীভাবে কী করলেন? ওই যে দুর্বল-অসহায় দাস-গোলামেরা, ইসলাম কবুল করার কারণে তাদের ওপর জুলুম-নির্যাতনের ঝড় নেমে এলো, এদের সাহায্যার্থে তিনি কী করলেন? খাদিজা এদের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেন! ঈমান আনার ‘অপরাধে’ মনিবরা যখন ওদেরকে তাড়িয়ে দিলো, কাজ করে খাওয়ার অধিকার কেড়ে নিলো, তখন খাদিজা এদের সম্পদ দিয়ে সাহায্য করলেন। আর যাদের মনিবরা কঠিন অসহনীয় নির্যাতনে পিষ্ট করছিল, তাদেরকে তিনি অর্থ-বিনিময় দিয়ে ছাড়িয়ে আনছিলেন!
খাদিজা তো আগেও অসহায়-দুর্বলদের পাশে ছিলেন, এখন আরও বেশি পাশে এসে দাঁড়ালেন! কখনো মাজলুমকে অর্থ-সাহায্য দিচ্ছেন! কখনো ক্ষুধার্তকে খাবার দিচ্ছেন! কখনো আবার বিপদগ্রস্তের পাশে দাঁড়াচ্ছেন!
এভাবে তাঁর বাড়িটাই এখন হয়ে উঠলো অসহায় বিপদগ্রস্তের আপন ঠিকানা! মাজলুমের আশ্রয়স্থল! এই জিহাদে-এই সেবায় তিনি ছিলেন অক্লান্ত! উদার দানশীলা! এই জিহাদের তীব্রতা যতো বাড়ে তাঁর আনন্দও ততো বাড়ে! এই জিহাদে শরীক হতেই তো তিনি দিনের পর দিন.. বছরের পর বছর স্বপ্ন দেখে এসেছেন! কিন্তু মাঝে মাঝেই একটা চিন্তা বরং একটা স্বপ্ন তাঁর মনে উকি দেয়। তাঁর বুকটায় থেকে-থেকে তা ঘুরে বেড়ায়! তখন আল্লাহর দরবারে তিনি হাত তোলেন। হে আল্লাহ! আমার স্বপ্ন কি বাস্তবায়িত হবে?
খাদিজার বয়স তো আর কম হয় নি! এ বয়সে সন্তান সাধারণত হয় না! মেয়েদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে তিনি ভাবেন—আহা! ওদের যদি একটা ভাই হতো!! কখনো প্রিয় স্বামীর দিকে তাকিয়ে তামান্না করেন—একটি ছেলেসন্তান হলে কতো আশা-স্বপ্ন বাসা বাঁধতো এ-বুকে! আকাশের মালিক চাইলে কী-না হয়! খাদিজা আকাশের মালিকের কাছেই পেশ করতে লাগলেন মনের সকল আকুতি! বুকভরা আশা—এ-ইচ্ছে আল্লাহ পূরণ করবেনই! তাঁর কতো আশাই তো আল্লাহ একের পর এক পূর্ণ করেছেন!
নবী-স্ত্রী হতে চেয়েছিলেন, হয়েছেন! ইসলামের পথে-দাওয়াতের রাস্তায় সব উৎসর্গ করতে চেয়েছিলেন, করেছেন! আল্লাহ তাঁর সব আশা পূর্ণ করেছেন! এ-আশাও তিনি পূর্ণ করবেন! তিনিই তো একমাত্র আশা পূরণকারী!
খাদিজার আনন্দের কোনো সীমা নেই, তাঁর গর্ভে সন্তান! এ-সন্তান যদি হয় পুত্র সন্তান, কী দিয়ে মাপবেন তিনি মনের আনন্দ?
প্রসবকালে আল্লাহর নবী পাশেই ছিলেন! যখন তিনি জানতে পারলেন—এসেছে কাঙ্ক্ষিত পুত্রসন্তান, তাকালেন পূর্ণ দৃষ্টিতে, ভালোবাসায় মমতায় উচ্ছলিত হয়ে! বললেন আনন্দঘন কণ্ঠে:
—আবুল কাসেম! কী নাম রাখবো ছেলের?
আনন্দে খুশিতে খাদিজা আর কথা বলতে পারলেন না, চোখে পানি চলে এলো! হাত দিয়ে পানি মুছলেন তিনি! আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মমতাভরে বললেন:
—এর নাম আবদুল্লাহ বিন মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ! ও তাহির (পবিত্র)! ও তায়্যিব (উত্তম)! ও তো ইসলামের কোলে জন্ম নিয়েছে!! ইসলামপূর্বকালে যারা জন্মেছে, ওদের সবাইকে এ ছাড়িয়ে গেছে!
খাদিজার চোখে আনন্দ-মুখে আনন্দ! আল্লাহর রাসূলের চোখে আনন্দ-মুখে আনন্দ! সারা মহলে আনন্দ! প্রিয়জনের উষ্ণ অভিনন্দনে গমগম করতে লাগলো সারা বাড়ি! খাদিজা দানের হাত খুলে দিলেন! কতোজনকে কতো কী দিলেন!
কিন্তু আল্লাহ চাইলেন অন্য কিছু! কে ঠেকায় তাঁর চাওয়া? কার আছে সাধ্য? কিছুদিন পরই আবদুল্লাহ চলে গেলেন! কোন সে হিকমতের (আল্লাহর প্রাজ্ঞোচিত সিদ্ধান্তের) কারণে আল্লাহ আবদুল্লাহকে নিয়ে গেলেন নিজের কাছে, তা আল্লাহই ভালো জানেন! হাসিভরা গৃহে নেমে এলো শোক-স্তব্ধতা! মেয়েদের চোখে-মুখে ছেয়ে আছে গভীর শোকছায়া! শোক-বিহ্বল খাদিজার চোখে ছলছল করছে শোকের অশ্রু! তাঁর কাছে এসে আল্লাহর রাসূল বসলেন! প্রিয় হারানোর বেদনায় কাঁপা-কাঁপা কণ্ঠে তাঁকে সান্ত্বনা দিলেন:
—আল্লাহ তোমার মঙ্গল ও কল্যাণ চান! আল্লাহ চান নি তুমি হবে কাসেম বা আবদুল্লাহর মা! তিনি চাইছেন তুমি হও সবার মা-উম্মুল মু'মিনীন!! খাদিজা! এ উপাধি কি তোমাকে অনেক অ-নেক বেশি আনন্দ দেবে না?!
আল্লাহর রাসূলের মধুময় সান্ত্বনার পরশে খাদিজার শোক-হৃদয় শান্ত হলেও চোখটা বুঝি শান্ত হলো না! ফোঁটা-ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগলো! আল্লাহর নবী মমতাভরে নিজ হাতে তা মুছে দিতে লাগলেন! আর বলতে লাগলেন:
—খাদিজা! পরকাল! পরকাল তো দুনিয়া থেকে অনেক উত্তম!!
এরপর আল্লাহর রাসূল তিলাওয়াত করলেন এই আয়াত—
‘নিশ্চয়ই পরকাল দুনিয়া থেকে উত্তম! তোমার পালনকর্তা সত্বরই তোমাকে দান করবেন, তখন হবে তুমি সন্তুষ্ট।’ (সূরা দুহা)
এ আয়াত খাদিজার শোকতপ্ত হৃদয়ে শীতল বারি হয়ে বর্ষিত হলো! তিনি মেনে নিলেন আল্লাহর ফায়সালা—রাসূলের সান্ত্বনা-বৃষ্টিতে ভিজে-ভিজে শীতল হয়ে.. আশ্বস্ত হয়ে.. প্রশান্ত হয়ে!
আল্লাহর রাসূল খাদিজাকে আরও বললেন:
—খাদিজা! আমরা তো ফেরতযোগ্য ধারবস্তু! যে-কোনো মুহূর্তে আমাদের ফেরত যেতে হবে আল্লাহর কাছে! সুতরাং ওঠো! জিহাদের জন্যে প্রস্তুত হও! আল্লাহকে তো তুমি এমন প্রতিশ্রুতিই দিয়েছো! পথ অনেক দীর্ঘ! অনেক দুর্গম!!
📄 হক বাতিলের লড়াই
এখন ইসলামের গোপন দাওয়াতকাল চলছে। গোপনে গোপনে দাওয়াত চললেও মক্কার নেতৃস্থানীয়রা শুরু থেকেই চোখ রাখছিলো। এর গতিবিধি লক্ষ রাখছিলো। এর অনুসারীদের প্রতি ঠাট্টা-বিদ্রূপের বাণও ছুঁড়ে দিচ্ছিলো। আল্লাহর রাসূল এই নেতৃস্থানীয়দের প্রকাশ্যে দাওয়াত দেন নি এ পর্যন্ত। লোক দেখে-দেখে তিনি গোপনেই দাওয়াত দিয়ে যাচ্ছিলেন। সত্যের তালাশে-থাকা মানুষ একে একে সাড়া দিতে লাগলেন আল্লাহর রাসূলের দাওয়াতে। এদের মধ্যে আছেন যেমন মক্কার বিশিষ্টজন তেমনি আছেন মক্কার অবহেলিত নির্যাতিত নিপীড়িত দাস-গোলামেরা। মুসলমানদের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়তে লাগলো। একবার যে ইসলামের আলোর ভুবনে প্রবেশ করেছে সে আর পূর্বধর্মের কিংবা কুফরির অন্ধকারে ফিরে যাচ্ছে না।
আলোর দেখা পাওয়ার পর কে চায় আবার অন্ধকারে ফিরে যেতে? কেউ চায় না! শত ঠাট্টা-বিদ্রূপ ও নির্যাতনের মুখেও না! ইসলাম গ্রহণকারীদের সংখ্যা যতো বাড়ে খাদিজার গৃহ-আঙিনায় মানুষের ভিড়ও ততো বাড়ে। কেউ আসে সাহায্যের আশায়-অনুগ্রহ প্রাপ্তির বাসনায়। কেউ আসে অভাব মোচন কিংবা প্রয়োজন পূরণের প্রত্যাশায়। খাদিজা সবাইকে স্বাগত জানান। হাত খুলে দিয়ে যান। যার যা প্রয়োজন-সব পূরণ করে যান। সবাই যেনো তাঁর সন্তান। খাদিজার মনে অপার তৃপ্তি, তাঁর উদার মন যেনো বলে-এ-দিনের জন্যেই তো ছিল স-ব সঞ্চয়! সব বিলিয়ে দিতে চাই আমি ইসলামের পথে-আমার আল-আমীনের চোখের ইশারায়!
গোপন দাওয়াত বিরতিহীনভাবে চলেছে একে একে তিন বছর! কাফির-মুশরিকদের ঠাট্টা-বিদ্রূপ ও নির্যাতন এড়াতে সবাই লুকিয়ে লুকিয়ে নামায পড়তেন পাহাড়ের পাদদেশে-দারুল আরকামে। শুনতেন প্রিয় নবীর মুখে কুরআনের তিলাওয়াত। তাঁর সান্নিধ্যে.. আল্লাহর স্মরণে কাটাতেন মধুময় নীরব প্রহর।
একদিন আল্লাহর রাসূল বেশ চিন্তিত মুখে গৃহে প্রবেশ করলেন। খাদিজা মনে উদ্বেগ আর মুখে হাসি নিয়ে এগিয়ে এলেন। নরমকণ্ঠে জানতে চাইলেন:
—আল্লাহর রাসূল! সব খবর ভালো তো!
আল্লাহর রাসূল উৎকণ্ঠামাখা আওয়াজে বললেন:
—আমার রব নির্দেশ দিয়েছেন প্রকাশ্যে দাওয়াত দিতে। মক্কার নেতৃস্থানীয়দের এবং নিকটাত্মীয়দের ইসলামের দিকে ডাকতে। আল্লাহ ওহী নাযিল করেছেন, বলেছেন:
‘হে নবী! আপনি নিকট-আত্মীয়দেরকে সতর্ক করুন!’
খাদিজা শান্তকণ্ঠে বললেন:
—হে আল্লাহর রাসূল! অবশ্যই এখন নিকটাত্মীয়দের পালা! এখন তাঁদের সতর্ক করতে হবে! তাঁদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে আল্লাহর পয়গাম! তাঁদের শোনাতে হবে আসমানের বার্তা, ভাবতে হবে তা নিয়ে! কেন এরা অন্যদের মতো আপনার ডাকে সাড়া দেবে না? দিয়ে ধন্য হবে না?! এদেরই-না সবার আগে ‘লাব্বাইক’ বলা উচিত ছিল?!
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকালেন খাদিজার দিকে! তারপর বাড়ির খোলা আঙিনায় দৃষ্টি মেলে বললেনঃ
—খাদিজা! তাহলে এরা তো দাওয়াতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবে! এমনিতেই ওরা বেশ চটে আছে। ভেতরে ভেতরে ফুঁসছে! পারলে আমাদের জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে শেষ করে দেয়। ইসলামের দাওয়াতকে এরা সহ্যই করতে পারছে না! এর মধ্যে অনেকের নিকটাত্মীয়, ছেলে, দাস-গোলাম এ-দাওয়াতে লাব্বাইক বলেছেও! এরা মনে করে-ইসলামই এদের ‘বিভ্রান্ত’ করছে! দলছুট করছে! অধিকার-সচেতন করে তুলছে! সুতরাং এখন আমি যদি সরাসরি এদেরই দাওয়াত দিতে যাই, কী অবস্থা দাঁড়াবে বলো! এরা রাগে-ক্ষোভে ফেটে পড়বে! সরাসরি ইসলাম-বিরোধিতায় নেমে পড়বে! অত্যাচার-নির্যাতনের মাত্রা আরও বেড়ে যাবে! খাদিজা! তখন আমরা কি সামাল দিতে পারবো?
খাদিজা দৃঢ় কণ্ঠে বললেন:
—আপনি তো হক পথে ডাকছেন! সরল সোজা পথের দাওয়াত দিচ্ছেন! আল্লাহ আপনার সাথে আছেন! তিনি আপনাকে সাহায্য করবেনই! সুতরাং আপনার রব যা করতে বলেছেন তা নিয়ে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ুন! এদের দাওয়াত দেন! এদের সাথে কথা বলুন! কুরআন পড়ে পড়ে শোনান! নিশ্চয়ই এদের মন নরম হবে! সত্যের দিকে ঝুঁকবে! শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে! ইসলাম গ্রহণেও আশা করি ধন্য হতে পারবে! আর যদি এমনটি না-হয়, তাহলে এতো ভাবনা কিসের? আপনার রব জালিমদের ছেড়ে দেবেন না! আপনাকে সাহায্য করবেনই!
খাদিজার কথায় প্রিয় নবী বল পেলেন। শক্তি অনুভব করলেন। তখনই আলাপে আলাপে স্থির হলো যে খাদিজা সবার জন্যে রান্নার আয়োজন করবেন! আল্লাহর রাসূল সবাইকে খাওয়ার দাওয়াত দেবেন। তারপর ভোজন শেষে সবাইকে প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দেবেন!
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকালেই বেরিয়ে গেলেন দুপুরের খাবারের দাওয়াত দিতে। এদিকে খাদিজা খাবার প্রস্তুত করতে লেগে গেলেন। তাঁর মনে অনেক আশা, নিশ্চয়ই এরা আজ ইসলামের নবীকে মেনে নেবে-তাঁর ডাকে সাড়া দেবে। আর ইসলামের বিরোধিতা হবে না। ফিরে আসবে মক্কায় শান্তি স্থিতি।
দুপুরের পর পরই কুরাইশ নেতৃবৃন্দ খাদিজার গৃহে এসে জড়ো হলো। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তারা আলাপ-আলোচনা শুরু করলো। ধন-সম্পদ নিয়ে, ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে। যুদ্ধ ও শান্তি নিয়ে। আল্লাহর রাসূল কেন তাঁদের ডেকেছেন সে প্রসঙ্গ তাদের আলোচনায় এলো না। এক সুযোগে যখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের সামনে উঠে দাঁড়ালেন এবং ইসলাম ও দাওয়াত নিয়ে কথা বলতে আরম্ভ করলেন, আসল বিষয় বুঝতে পেরে তারা ভীষণ রেগে গেল! শুধু তা-ই নয়, হনহনিয়ে সবাই বেরিয়ে গেল!
আল্লাহর রাসূল ব্যথিত মনে খাদিজার কাছে গেলেন! চোখে-মুখে হতাশার ছাপ! হতাশকণ্ঠে দীর্ঘশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে বললেন খাদিজাকে:
—খাদিজা! দেখলে তো! এরা কুফরির ওপর অটল! এরা ইসলাম কবুল করবে না! কিছুতেই না! এরা মনে করে এদের ওপরে কেউ নেই, সবার ওপরে এরা!
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এদেরকে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি এদের ধন-সম্পদ থেকে অসহায়-অক্ষম-দরিদ্রের হক আদায় করবেন! তারপরও এ সম্পদলোভীরা কেমন করে তাঁর ডাকে সাড়া দিতে পারে?
খাদিজা আল্লাহর রাসূলকে সান্ত্বনা দিলেন। শান্তকণ্ঠে বললেন:
—আপনি হতাশ হবেন না! আপনি তো ভালো পথে-কল্যাণের পথে এদের ডাকছেন! এরা সুপথে এলে এদেরই লাভ! আর যদি বিপথগামীই থাকে-আপনার ডাকে সাড়া না-ই দেয়, সেজন্যে এদের অবশ্যই ভোগতে হবে কর্মফল! এখন হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আবার তাঁদের ডাকুন! আবার তাঁদের সামনে ইসলামের দাওয়াত পেশ করুন! এবার হয়তো ওদের মন গলতে পারে। কোনো বাধা তো নেই!
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দৃঢ়কণ্ঠে বললেন:
—হ্যাঁ.. আমি আবার ডাকবো, সবাইকে ডাকবো। সবার কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছে দেবো!
একদিন সকালে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরোহণ করলেন ‘সাফা’য়। তারপর উচ্চকণ্ঠে ডেকে উঠলেন সবাইকে:
—হে কুরাইশ সম্প্রদায়! হে কুরাইশ সম্প্রদায়!
‘সাফা’ পর্বতের টিলায় দাঁড়িয়ে ওই যে কে ডাকছে! সবাই ছুটে এলো! আল আমীন ডাকছে! তারা আল আমীনের কাছে জানতে চাইলো, কেন এই আহ্বান? কী বলতে চায় আল-আমীন? তখন আল আমীন জানালেন—
আল্লাহর নির্দেশ-মূর্তিপূজা ছাড়তে হবে! এক আল্লাহর ইবাদত করতে হবে! তাঁর সাথে কোনো কিছু শরীক করা যাবে না! আল্লাহ এক-লা-শরীফ!
কুরাইশ তখন জ্বলে উঠলো! সবচেয়ে বেশি জ্বলে উঠলো চাচা আবু লাহাব! আগুন-কণ্ঠে বললো:
—ধ্বংস হোক তোমার! এ জন্যে তুমি আমাদের জমা করেছো.. আমাদের আরাম নষ্ট করেছো?!
যাঁকে পাঠানো হয়েছে সারা পৃথিবীর রহমত বানিয়ে, তাঁর ধ্বংস কামনা? আপন চাচা হয়ে?! অমন কথায় আল্লাহর আরশ কেঁপে উঠলো বুঝি! আল্লাহ ওহী পাঠালেন! নবীজীর পক্ষ থেকে চাচার বিরুদ্ধে জওয়াব পাঠালেন! আল্লাহর নবী সবার সামনে উচ্চকণ্ঠে তিলাওয়াত করলেন:
‘আবু লাহাবের দু-হাত ধ্বংস হোক, ধ্বংস হোক সে নিজে। কোনো কাজে আসে নি তার ধন-সম্পদ যা সে উপার্জন করেছে। সত্বরই সে প্রবেশ করবে লেলিহান আগুনে এবং তার স্ত্রীও, সে ইন্ধনবহনকারিণী, তার গলদেশে খেজুরের ছাল-বাকলের রশি।’ (সূরা লাহাব)
আবু লাহাবকে নিয়ে নাযিল-হওয়া সূরা আবু লাহাবের জন্যে জ্বলন্ত আগুন হয়ে দেখা দিলো। সবাই যেনো এখন আবু লাহাবকে লক্ষ করে বলছে, হে জমিনের ধ্বংসকামনাকারী, শোনো এবার আকাশের ধ্বংস কামনা! সত্যের পতাকা যাঁদের হাতে তাঁদের সবার কাছেই আবদুল উয্যা এখন আবু লাহাব (প্রজ্বলিত আগুনের ধারক)। মুখে মুখে শোনা যেতে লাগলো—আবু লাহাব! আবু লাহাব!! আগুনের বাপ! আগুনের বাপ!! অপরদিকে আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামিলের ‘গুণ’-এর কথাও এ-সূরায় বর্ণিত হয়েছে ‘হাম্মালাতাল হাতাব’-ইন্ধনবহনকারিণী! এ-ও এক মুখরোচক আলোচনায় রূপ নিলো! এ-আসমানি প্রতিউত্তরে ভেসে গেলো পুরো মক্কা! জ্বলে উঠলো ‘আবু লাহাব’ আর ‘ইন্ধনবহনকারিণী’! ওরা জ্বলতে লাগলো মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিরুদ্ধে! খাদিজার বিরুদ্ধে! ঈমান কবুল-করা সাহাবীদের বিরুদ্ধে! আবু লাহাব জ্বলে আর ইন্ধনবহনকারিণী ইন্ধন যোগায়! ওরা এ-দুজনের কাছ থেকে প্রতিশোধ নিতে সুযোগ খুঁজতে লাগলো! প্রতিশোধ নেয়ার শপথ নিলো! উম্মে জামিল ও আবু লাহাবের বাড়ি ছিল খাদিজার বাড়ির পাশেই।
একদিন রাগে কাঁপতে কাঁপতে স্বামীর কাছে নালিশ করলো ‘হাম্মালাতাল হাতাব’-উম্মে জামিল! মহিলারা নাকি তাকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপে মেতে উঠেছে! কেউ দেখলেই বলছে—‘হাম্মালাতাল হাতাব’! কেউ বলছে—‘ফি জিদিহা হাবলুম মিম মাসাদ’! উম্মে জামিল ‘রাগো রাগো’ কণ্ঠে.. কাঁদো কাঁদো স্বরে বলতে লাগলো:
—শেষ, সব শেষ আমার! আজকের পর আমার আর কিছুই বাকি রইলো না! তোমাকে আমি পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিতে চাই-আমার বাড়িতে মুহাম্মদ-এর মেয়েরা বউ হয়ে থাকতে পারবে না, কিছুতেই পারবে না! খাদিজার দুই মেয়ের হয় তালাক হবে নয় আমি এই ঘর ছাড়লাম!
স্বামী আবু লাহাবও যে স্ত্রীর চেয়ে কম চটে আছে- তা নয়! তাই স্ত্রীর কথা সে ফেলে দিতে পারলো না। বরং এও যেনো তারও মনের কথা- এমন ভাব নিয়েই সে ছুটে গেলো দুই ছেলে-উতবা-উতায়বার কাছে! রোকাইয়া ও উম্মে কুলসুমের সাথে ইতিমধ্যেই এ দু-ভাইয়ের বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল। আবু লাহাব সরােষে বলে উঠলেন:
—শুনেছো, আমাকে এবং তোমাদের মাকে নিয়ে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কী সব বলেছে?! এখন শোনো, অবিলম্বে খাদিজার দুই মেয়েকে তালাক দিতে হবে!
বাবার কথা শেষ না-হতেই পেছন থেকে মা আবার চিৎকার করে উঠলো:
—খাদিজার মেয়েরা আমার ঘরে আসতে পারবে না! থাকতে পারবে না! ওদের তালাক দিতে হবে, দিতেই হবে! নইলে তোরা আমার সন্তান না-আমি তোদের মা না!
ছেলেরা মা-বাবার রুদ্রমূর্তি দেখে ভয় পেয়ে গেল! ফলে তারা যা চাইলো তা-ই হলো! তারা খাদিজার মেয়েদের তালাক দিলো!
এ-খবর যখন খাদিজার কানে গেলো আকাশের দিকে হাত তোলে তিনি শোকর আদায় করলেন! কেননা আবু লাহাব আর উম্মে জামিলের মতো জাহান্নামীদের ভেতরে কেমন করে থাকবে নবী নন্দিনীরা? নবীজীও এ সংবাদে খুশি হলেন। আল্লাহর শোকর আদায় করলেন। আবু লাহাব আর উম্মে জামিলের অনিষ্ট থেকে ওরা বেঁচে গেলো। কিন্তু আল্লাহর নবী বুঝতে পারলেন, আবু লাহাব আর উম্মে জামিলের লড়াই সবে শুরু, শেষ হতে আরও অনেক দেরি! এ লড়াই আরও ভয়াবহ রূপ নেবে! আরও হিংস্র হয়ে উঠবে! আরও অমানবিক হয়ে উঠবে! খাদিজা আশঙ্কা করলেন, উম্মে জামিল তাঁকে দিয়েই লড়াইটা শুরু করবে! তাঁর বিরুদ্ধেই চক্রান্ত শুরু করবে! নারীরা যেমন নারীদের পেছনে লাগে হিংসার উন্মত্ততা নিয়ে, ঠিক সেভাবেই!
📄 লড়াই আরও তীব্র হলো
কুরাইশ আর নবীজীর মধ্যকার লড়াই আরও তীব্র হলো। দিনে দিনে এ তীব্রতা কেবল বাড়তেই লাগলো। একদিকে আলো আর দিকে অন্ধকার। একদিকে হক আর দিকে বাতিল। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাওয়াতের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন অবিরাম। এদিকে কাফির মুশরিকরাও বাধাদানে মরিয়া। রাগে-ক্ষোভে ওরা ফেটে যাওয়ার উপক্রম। এ দাওয়াতকে প্রতিহত করতে চলছে ওদের দিনরাতের ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত।
আবু লাহাব ও উম্মে জামিল রাসূলের বিরোধিতায় এখন প্রকাশ্যে মাঠে নেমে পড়েছে। উম্মে জামিলের রাত-দিনের একটাই চিন্তা— খাদিজাকে কী করে কষ্ট দেয়া যায়। আল্লাহর রাসূল জোরেসোরে কথা বলা শুরু করলেন কা’বার আশেপাশে স্থাপিত মূর্তির বিরুদ্ধে। মূর্তি নিথর নিষ্প্রাণ! মূর্তি—না-করতে পারে উপকার, না-করতে পারে ক্ষতি! এমন নিষ্প্রাণ অসাঢ় বস্তু কখনো উপাস্য হতে পারে না!
কুরাইশের ভিত কেঁপে উঠলো আল্লাহর রাসূলের এ সমালোচনায়। এরা সবাই আলোচনায় বসলো মুহাম্মদ এবং তাঁর নতুন দাওয়াত নিয়ে। আলোচনা ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠলো। ওদের একটাই বক্তব্য-মুহাম্মদকে আর সুযোগ দেয়া যায় না। অবশ্যই তাকে এ সমালোচনা বন্ধ করতে হবে। অবশ্যই তাকে রুখতে হবে। আমাদের উপাস্যদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য আমরা সহ্য করবো না। উপস্থিত কেউ কেউ বললো:
—এক্ষুনি যদি আমরা মুহাম্মদকে রুখে না-দাঁড়াই তাহলে কয়দিন পর আমাদের নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব বলতে আর কিছুই থাকবে না। মজলিস শেষ হলো কয়েকটা সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্য দিয়ে।
কবিরা বললো: —আমরা কবিতার ভাষায় মুহাম্মদকে আক্রমণ করবো! তার প্রচারিত দীনকে খেলো বানিয়ে পেশ করবো! তাকে নিয়ে বিদ্রূপে মেতে উঠবো! এ কবিতা যখন জনতার মাঝে ছড়িয়ে পড়বে তখন আশা করি কেউ মুহাম্মদের কাছে আর ভিড়বে না, তার দাওয়াত কবুল করবে না!
গল্পকার ও কাহিনীকাররা বললো: —আমরা মানুষকে নিয়ে গল্পের আসর জমিয়ে তুলবো। পূর্ববর্তীদের গল্প ও কাহিনী তাদের শোনাবো। তখন এরা আর মুহাম্মদের কুরআন শুনতে যাবে না। কুরআনের ‘শিল্প-সুষমায়’ মুগ্ধও হবে না!
ব্যবসায়ীরা বললো: —আমরা মুহাম্মদ ও তার অনুসারীদের অর্থনৈতিকভাবে বয়কট করবো। তাদের সাথে বন্ধ করে দেবো যাবতীয় লেনদেন। এভাবে যখন আমরা তাদের জীবনকে অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করে ফেলতে পারবো তখন তারা ইসলাম ত্যাগ করে পূর্বধর্মে ফিরে আসতে বাধ্য হবে। অপরদিকে নতুন করেও কেউ সেই ধর্মের দিকে ঝোঁকার সাহস পাবে না।
আবু জেহেল আর আবু লাহাব নবীজীকে কষ্ট দেয়ার সিংহভাগ দায়িত্বই নিজেদের কাঁধে তুলে নিলো। আবু লাহাব শপথ করে বললো:
—মুহাম্মদকে শান্তিতে থাকতে দেবো না! খাদিজাকেও জ্বালাতন করতে ছাড়বো না! খাদিজাই তো অর্থ-সম্পদ দিয়ে মুহাম্মদকে সহযোগিতা করে যাচ্ছে! অবিচ্ছিন্নভাবে দাওয়াতের কাজ চালিয়ে যেতে তাকে সাহস যোগাচ্ছে!
এরপর কুরাইশ সত্যি সত্যি কোমর বেঁধে ইসলাম-বিরোধিতায় মাঠে নেমে পড়লো। উম্মে জামিল দরজা দিয়ে খাদিজার ঘরের দিকে তাকিয়ে ঠাস্ করে দরজাটা বন্ধ করে রাগে ফুঁসতে লাগলো। আর বলতে লাগলো:
—তোমার আর নিস্তার নেই! হয় তুমি এখানে থাকবে নয় আমি! তোমার আরাম আমি হারাম করে ছাড়বো!
তারপর উম্মে জামিলের আর তর সইলো না বুঝি। ‘সব আয়োজন’ নিয়ে মাঠে নেমে গেলো। নবুওতের নূর-ছাওয়া গৃহকে লক্ষ বানাতে উম্মে জামিলের বুকটা একটু কাঁপলোও না! নমুনা দেখো তার কষ্ট দেয়ার—
একদিন সকাল বেলা আবু লাহাব ঘুম থেকে উঠে উম্মে জামিলকে দেখতে পেলো না। ছেলেদেরও আশপাশে পেলো না। আবু লাহাব অবাক হলো। এই ভোরে ওরা সব গেল কোথায়? একটু পর উম্মে জামিল গৃহে ঢুকলো-হাত থেকে কাঁটা সরাতে সরাতে। গলায় ঝোলানো রয়েছে খেজুরের ছাল-বাকলের একটা রশি। আবু লাহাব অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো স্ত্রীর দিকে। উম্মে জামিল দুষ্ট হাসিতে মুখটা ভরে বললো:
—তুমি কি চাও না মুহাম্মদের কষ্ট ও অপমান এবং তাকে রাগতে দেখলে তোমার কি ভালো লাগবে না? দরোজাটা খুলে একটু ওদিকে তাকাও!
আবু লাহাব দরজা খুলে দেখলো, খাদিজার ঘরের সামনটা—প্রবেশ পথটা কাঁটায় কাঁটায় ছাওয়া! আবু লাহাব হাততালি দিয়ে বললো:
—উম্মে জামিল! তুমি তো দেখছি ইবলিসকেও পেছনে ফেলে দিয়েছো!
উম্মে জামিল হিংসার আগুনে জ্বলতে জ্বলতে বললো:
—তুমি শুধু অর্থ ঢালো, তারপর দেখতে থাকো-মুহাম্মদ আর খাদিজাকে কেমন খেলা দেখাই! আমাকে একটা ভেড়া কিনে দাও, আমি ভেড়ার গোবর জমিয়ে জমিয়ে তা ফেলে আসবো খাদিজার ঘরের সামনে। সব নাশ করে দেবো! আমার নাম উম্মে জামিল! আমি খাদিজাকে দেখিয়ে দেবো-উম্মে জামিল কাকে বলে.. উম্মে জামিল কী করতে পারে! উম্মে জামিল দুশমনকে শেষ করে দিতে জানে! মুহাম্মদকেও আমি দেখাবো-কী রশি সে আমার গলায় ঝুলিয়েছে!
আল্লাহর রাসূল সকাল বেলা বের হতে গিয়ে দেখলেন—পথ কাঁটায় কাঁটায় ছাওয়া। দরোজায় অনেক ময়লা। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফিরে এলেন। খাদিজাকে বললেন:
—আবু লাহাবের স্ত্রী শুরু করে দিয়েছে! খাদিজা, এটা প্রথম বর্ষণ!
খাদিজা দরোজায় ছুটে গেলেন! দরোজা এবং বাড়ির সামনে পড়ে থাকা কাঁটা ও ময়লা-আবর্জনা দেখলেন। তারপর হাসিমুখে বললেন:
—হে আল্লাহর রাসূল! একটু অপেক্ষা করুন! আমি এক্ষুনি সব পরিষ্কার করে দিচ্ছি!
খাদিজা বাঁদিদের দ্রুত তা পরিষ্কারের নির্দেশ দিলেন। খাদিজা জানেন, এখন দূর থেকে উম্মে জামিল সব লক্ষ করছে! উম্মে জামিল চায়, এখন একটা ঝগড়া হোক। পরিস্থিতি খারাপ থেকে খারাপতর হোক। কিন্তু খাদিজা উম্মে জামিলের ইচ্ছেমতো রেগে গেলেন না! খাদিজা সবর করলেন! উম্মে জামিলের কুৎসিত গালাগালি কতো তাঁর কানে আসে! কিন্তু খাদিজা কিছুই বলেন না! খাদিজা একটু রাগও করেন না! খাদিজা একটু মনও খারাপ করেন না! খাদিজা শুধু মৃদু হেসে বলেন:
—না, আমি উম্মে জামিলকে কিচ্ছু বলবো না! আবু লাহাবকে কিছু বলবো না! ওদের কাউকে কিচ্ছু বলবো না! ওরা রেগে-জ্বলে শেষ হয়ে যাক নিজেদের আগুনে! আমার নীরবতাই ওদের সাজা!
খাদিজা দেখেন-পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফুঁসছে তাঁর প্রিয় বাঁদিরা! তিনি আগেই তাদের বলে দিয়েছেন, ওরা যেনো উম্মে জামিলকে.. কাউকে কিছু না বলে! এখন মৃদু হেসে তিনি ওদের বললেন:
—এক মুসলিম নারী আরেক কাফির নারীর মাঝে কী পার্থক্য? আমরা যদি তার মন্দ আচরণের বদলা দিই মন্দ আচরণেই-ক্ষমা না করি এবং অপমানের বদলে ক্ষমা না করি, তাহলে কেমন করে আমরা ইসলামের সেবা করবো? ইসলামের হক আদায় করবো? ইসলামের নবীর সুন্নতের ওপর চলবো?
খাদিজার ধৈর্যে কোনো ভাটা পড়লো না! উম্মে জামিলের সব মন্দ আচরণ তিনি একে একে সয়ে যেতে লাগলেন। এদিকে নবীজীও গৃহে ফিরে বলতেন প্রিয় খাদিজাকে—কী বলেছে আজ তাঁকে আবু জেহেল ও আবু লাহাব! সব শুনে খাদিজা হাসতেন মিষ্টি হাসি! বলতেন সান্ত্বনা-ঢালা কণ্ঠে:
—এসব কিছুই না! বাতাসে ভেসে বেড়ানো শব্দ, এই আছে এই নেই! হঠাৎ মিলিয়ে যাবে, আকাশের মহাশূন্যতায়!
কুরাইশ দেখলো, মুহাম্মদের দাওয়াতি কাজ আটকানো যাচ্ছে না, অপ্রতিরোধ্য গতিতে তা এগিয়েই যাচ্ছে। তার অনুসারীদের সংখ্যাও দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। কুরাইশ বেশ দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলো। তারা ভাবতে বসলো। সবাই পরামর্শে বসলো। আবু জেহেল, আবু লাহাব এবং উম্মে জামিল মিলে যা করছে তা যথেষ্ট না, আরও কঠিন পদক্ষেপ নিতে হবে। কী করা যায়?
একজন চিৎকার করে বললো: —মুহাম্মদের সাহায্যের উৎস বন্ধ করে দিতে হবে—তার শেকড় কেটে দিতে হবে!
সবাই জানতে চাইলো: —সাহায্যের উৎস-শেকড় মানে? তুমি কি আবু তালিবের কথা বলছো? হ্যাঁ, তার সাথে একটা বোঝাপড়া করতেই হবে!
ওই লোকটি তখন দৃঢ়কণ্ঠে বললো: —আমি বরং খাদিজার কথা বলছি! ওই মহিলার ক্ষমতা, অর্থ-বিত্ত ও সহযোগিতার ওপর ভর করেই মুহাম্মদ এগিয়ে যাচ্ছে! খাদিজাই তার অদ্ভুত ক্ষমতাবলে দাওয়াতকে ছড়িয়ে দিচ্ছে! খাদিজার ব্যবসারও লাগাম টেনে ধরতে হবে! ইতিমধ্যে খাদিজার গোত্রের অনেকেই ইসলাম কবুল করেছে। যে কোনো মূল্যে তারা মুহাম্মদকে সাহায্য করতে প্রস্তুত! এ সব কিসের আলামত? আমরা বলেছি, মুহাম্মদ যাদুকর! খাদিজা সম্পর্কে আমরা কী বলবো? কেন সে মুহাম্মদকে সর্বস্ব বিলিয়ে সহযোগিতা করে যাচ্ছে? তোমরা যদি খাদিজাকে না থামাও, তাহলে মুহাম্মদের কিছুই করতে পারবে না!
সবাই বললো: —আমরা তাহলে কী করতে পারি?
—আমরা যদি আগে আবু তালিবকে মুহাম্মদ থেকে আলাদা করে ফেলতে পারি তাহলে খাদিজাকে আলাদা করাও সহজ হয়ে যাবে! প্রয়োজনে খাদিজাকে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে মুহাম্মদ থেকে আলাদা করে ফেলা হবে! এই দুইজন সহযোগী হারালেই মুহাম্মদ থেমে যাবে, চুপসে যাবে, নীরব হয়ে যাবে!
সবাই তার মত পছন্দ করলো। কিন্তু আবু তালিব কুরাইশকে পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিলেন: —আমি কিছুতেই আমার ভাতিজাকে সহযোগিতা করা বন্ধ করবো না! আমি আছি তার পাশে! থাকবোই!!
কুরাইশ প্রথম ধাপে মারাত্মকভাবে ব্যর্থ হলো! খাদিজার ক্ষেত্রেও যে তারা ব্যর্থ হবে-তাতে কোনো দ্বিধা রইলো না! এখন তাহলে কী করা? এখন তারা তৃতীয় আরেকটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো! মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুসারীদের ‘শেষ’ করে দেয়া! তাহলে অন্যরা আর এদের পরিণতি দেখে নতুন ধর্মে প্রবেশ করার সাহস পাবে না! এবার এই তৃতীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তারা ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়লো!
শুরু হলো পরিকল্পনা মতো সাহাবীদের ওপর নির্মম জুলুম-নির্যাতন। মক্কা হয়ে উঠলো নিষ্ঠুর পাষাণ! কান পাতলেই শোনা যেতে লাগলো— ‘আহ আহ’ চিৎকার-ধ্বনি! অসহায় দুর্বল ও দাসদের ওপরই ওদের যতো ক্ষোভ! কাউকে ফেলে রাখা হলো ঊষর উত্তপ্ত মরুর বুকে-পাথরচাপা দিয়ে! কাউকে বন্দি করে রাখা হলো অন্ধকার কুঠরিতে-নেই খাবার, নেই পানীয়! ক্ষুৎ-পিপাসায় নাড়ীভুঁড়ি সংকুচিত। ব্যথায় মুষড়ে পড়া অবস্থা। কাউকে ধরে লোহা দিয়ে পেট চিরে ফেলা হলো! বিবস্ত্র করে ফেলা হলো সবার চোখের ওপর! পাশাপাশি চললো কলজে-ছেঁড়া ভাষায় গালিগালাজ ও অশ্রাব্য কটু কথা! উম্মে জামিলের মতো যে সব নারী এ কাজে দক্ষ তারা সবাই মাঠে নেমে এলো! ঈমান-আনা বাড়ির সামনে ঝরতে লাগলো গালিবর্ষণ, মুষলধারে-অঝোরধারায়! এখন মক্কায় ঈমান-আনা কোনো মানুষ মানে-তার কাছ থেকে পালিয়ে বেড়ানো! হোক সে নিকটাত্মীয় কিংবা সুহৃদ বন্ধু! নইলে কাফিরদের সতর্ক দৃষ্টি থেকে বাঁচার কোনো উপায় নেই! আর একবার এ-অপরাধে কেউ ধরা পড়লে তার আর রক্ষে নেই! নিষ্ঠুরতার তুফান বইয়ে দেয়া হবে!
এই ঝড়ের মাঝেই খাদিজা অবিচলতা-দৃঢ়তা-বীরত্বপূর্ণ সহনশীলতায় বুক বেঁধে কাজ করে যাচ্ছিলেন! ইসলামের জন্যে মন-প্রাণ উজাড় করে কাজ করে যাচ্ছিলেন! নির্যাতিত নিপীড়িত সাহাবীদের পাশে দাঁড়িয়ে-দিয়ে যাচ্ছিলেন হৃদয়-শীতল সান্ত্বনা! খাদিজা যেনো ওদের যখমে মলম! সংকটে সমাধান! খাদিজার ধনাগার এদের জন্যে খোলা! তাঁর দানের হাত অবারিত! শুধু ঈমান আনার ‘অপরাধে’ নিপীড়িত দাস-গোলামদের কিনে কিনে তিনি মুক্ত করে দিচ্ছিলেন! এদের যখন যা প্রয়োজন হয়েছে-হচ্ছে, হাত খুলে তিনি তা-ই দিয়ে যাচ্ছিলেন! কুরাইশের আরোপ করা-‘বাণিজ্য ও অর্থ-অবরোধ’ তিনি এভাবে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিচ্ছিলেন! কোনো বাধাই তাঁর সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না! তিনি প্রায়ই দেখেন, তাঁর বাড়ির বাইরে কিছু লোক গালিগালাজ করছে! কখনো-বা পাথর ছুঁড়ে মারছে, তিনি তাতেও দমছেন না! প্রতিশোধও নিচ্ছেন না! শুধু ধৈর্যে বুক বেঁধে নিজের করণীয় করে যাচ্ছেন! কে কী করলো-সে দিকে তাঁর কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই! রাসূলের পেছনে পেছনে দুষ্কৃতিকারীদের দেখেও তিনি ফুঁসে উঠছেন না। রাসূল গৃহে এলে তাঁকে স্বাগত জানাচ্ছেন সুহাসিতে ভালোবাসা ছড়িয়ে! সে হাসিতে, সে মায়াভরা মুখাবয়বে চোখ পড়লেই দূর হয়ে যায় দাওয়াতের ময়দানে মুখোমুখি-হওয়া স-ব কষ্ট-যাতনা-দুর্ভোগ! মুছে যায় স-ব দুর্ব্যবহার-দুরাচারিতার গ্লানি!
খাদিজা যেনো দুঃখ-মোছার পরশপাথর! খাদিজা! খাদিজা! আপনি সত্যি পরশপাথর!
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখলেন এই জালিমদের কবল থেকে প্রিয় সাহাবীদের মুক্ত করতে হবে! রক্ষা করতে হবে! কিন্তু এখানে থেকে কী করে সম্ভব? নাহ, এখান থেকে ‘পালাতে’ হবে! হিজরত করতে হবে-কোনো নিরাপদ ঠিকানায়! হাবশার কথাই তাঁর মাথায় এলো! তিনি সাহাবীদের হাবশায় চলে যেতে বললেন! খাদিজা এ-সিদ্ধান্তে খুশি হলেন! তিনি হাবশাগামী কাফেলাকে সফরের জন্যে প্রয়োজনীয় সব সহযোগিতা করলেন! খাদিজার আনন্দ আরও বেড়ে গেলো, যখন জামাতা উসমান ইবনে আফফানও রোকাইয়াকে নিয়ে হিজরত করবেন বলে জানালেন! খাদিজা তাঁকে বললেন:
—উসমান! আল্লাহ বরকত দান করুন, তোমার মাঝে! রোকাইয়ার মাঝে! হ্যাঁ.. তোমরা যাও! আমরা এখানেই আছি, আল্লাহর ফায়সালা না-আসা পর্যন্ত!
রাতের অন্ধকারকে আশ্রয় করে হাবশাগামী কাফেলা এগিয়ে চললো মক্কা ছেড়ে, দীন নিয়ে, দীনের ভালোবাসা বুকে নিয়ে! রাসূলের ভালোবাসাকে পুঁজি বানিয়ে! খাদিজার প্রতি হাজারো কৃতজ্ঞতার বাণী উচ্চারণ করতে করতে। খাদিজা বিদায়কালে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে আদর করলেন, অনেক দু’আ করলেন! কপালে এঁকে দিলেন স্নেহময়ী মায়ের চুমুচিহ্ন! খাদিজা সবার দিকে তাকিয়ে রইলেন, তাকিয়েই রইলেন, যতোক্ষণ দেখা যায় ততোক্ষণ! একসময় কাফেলা দৃষ্টির আড়ালে চলে গেলো। অন্ধকারে মিশে গেলো। খাদিজা ফিরে এলেন গৃহে! মনটা ভার ভার। চোখটাও ভেজা ভেজা! শুধু রোকাইয়া উসমানের জন্যে না-সবার জন্যে! সবাই তো তাঁর সন্তান! তিনি যে উম্মুল মু'মিনীন!
📄 এবার অবরোধ
হাবশাগামী মুহাজির-কাফেলা সমুদ্র তীরে এসে পৌঁছেছে। সমুদ্রের বুকে খুঁজে ফিরছেন তাঁরা কোনো নৌযান। চোখে-মুখে ভীতির ছায়া। তাঁদের খুঁজে খুঁজে যেকোনো মুহূর্তে কুরাইশ এখানে চলে আসতে পারে। সামনে বিশাল সমুদ্র। নৌযান নজরে পড়ছে না! পেছনে কুরাইশের ধেয়ে আসার তীব্র আশঙ্কা! নবীজীর নির্দেশে যাচ্ছেন তাঁরা হাবশায়! সবাই আল্লাহর দিকে রুজু হলেন! আল্লাহর কী মেহেরবানি! হঠাৎ করেই যেনো সমুদ্রের নীল জলরাশির ভেতর থেকে দুটি নৌযান বেরিয়ে এলো! মুসলমানদের কাতর আবেদনে নৌযান তীরে ভিড়লো। মাথাপিছু অর্ধেক দিনারে ওরা নিতে রাজি হলে সবাই আরোহণ করলেন! একটু পরই সমুদ্রের গভীর জলরাশি কেটে কেটে ছুটে চললো হাবশাগামী জাহাজ।
কুরাইশরা একটু দেরি হলেও খবর জেনে ফেললো। এভাবে রাতের আঁধারে মুসলমানদের চলে যাওয়াটাকে তারা বিপজ্জনক মনে করলো। দ্রুত তারা সমুদ্রের দিকে লোক পাঠালো, সবাইকে ধরে আনতে! কিন্তু সমুদ্রের তীরে মুহাজির-কাফেলার কোনো চিহ্নও তারা খুঁজে পেলো না, চোখের সামনে শুধু পানি আর পানি! অগত্যা তারা ফিরে এলো, বুকের ভেতর আগুন নিয়ে! সে আগুনে ভেতরটা বুঝি পুড়েই যায়! সবাই এবার একসঙ্গে বসে সে আগুন ঝাড়তে লাগলো:
—কিসের আর অপেক্ষা? কিছু করার সময় কি এখনো হয় নি?
কেউ বললো: —চলো, মুহাম্মদকে ‘শেষ’ করে দিই!
অন্যরা বললো: —খাদিজা আর আবু তালিবকে শেষ করতে হবে আগে!
অন্য আরেকজন বললো: —শুধু এদের কয়েকজনকে না, পুরো বনু হাশেম ও বনু মুত্তালিবকেই শেষ করে দিতে হবে!
শেষে সবাই একমত হলো মুসলমানদের তারা অবরুদ্ধ করে রাখবে, কোনো খাবার তাদের কাছে পৌঁছতে দেবে না! মুহাম্মদকে সহযোগিতা বন্ধ না-করা পর্যন্ত এ-অবরোধ চলবে! হয় তারা ক্ষুধায় মরবে নয় মুহাম্মদের সঙ্গ ছাড়বে! এ ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই!
একটা চামড়ার টুকরোয় কিছু অনৈতিক ও অন্যায় কথা লিখে কা’বার দেয়ালে টানিয়ে দিলো ওরা। সবাইকে তা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলার কঠোর নির্দেশ দিলো। ওদের লেখা কথাগুলো ছিল অমানবিকতায় ভরা। নির্দয়তায় ঠাসা। সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার কালো চিন্তায় কুৎসিত। কয়েকটি শর্তের নমুনা—
• এখন থেকে মুসলমানদের সাথে যাবতীয় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।
• তাদের সাথে ক্রয়-বিক্রয় বন্ধ।
• তাদের সাথে বিবাহ-শাদী নিষিদ্ধ।
• কোনো রকম লেনদেনও চলবে না।
এই অমানবিক নির্দয় কুরাইশী সিদ্ধান্তকে সামনে নিয়ে বনু হাশেম ও বনু মুত্তালিব একত্রিত হলেন নিজেদের করণীয় ঠিক করতে। পরামর্শ হলো। সিদ্ধান্তও হলো। কুরাইশের এই অন্যায় অবরোধ ও অযৌক্তিক চুক্তি কিছুতেই মানা যায় না। সবাই থাকবেন প্রিয় মুহাম্মদের পাশেই। সে জন্যে জীবন দিতে হলে সবাই জীবনই বিলিয়ে দেবেন!
এরপর সবাই গিয়ে প্রবেশ করলেন একটা পাহাড়-বেষ্টিত উপত্যকায়। এটাই ভালো জায়গা। এখানে তাঁরা সবাই এক সাথে থাকবেন। সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেবেন। দূরে পড়ে থাক মক্কার সব ষড়যন্ত্র। খাদিজা এ-অভিযানে পিছিয়ে থাকলেন না। সবার সাথে শরীক হলেন। তিনিও এলেন হৃদয়ের সব কোমলতা নিয়ে এ দুর্গম গিরিময় উপত্যকায়! সাথে নিতে ভুললেন না-কিছু মাল কিছু ‘যাদ’-উপায়-উপকরণ! কুরাইশের নিষ্ঠুর অবরোধে এসব কাজে লাগবে!
এদিকে কুরাইশ অবরোধকে কঠিন থেকে কঠিনতর করে তোলার জন্যে যা যা করা দরকার সবই করতে লাগলো। যেমন তারা বাজারে গিয়ে গিয়ে ভিনদেশি বণিকদের কাছে ঘুরঘুর করতো। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোনো অনুসারী কিছু কিনতে এসে যখন মূল্য বলতেন-দরদাম করতেন, তখন ওদের কেউ এগিয়ে এসে দ্বিগুণ মূল্য হাঁকিয়ে বসতো। সাহাবী তখন মূল্য বাড়িয়ে কিনতে চাইলে আবার ওই লোকটা বেশি মূল্য বলে বাধা সৃষ্টি করতো। এভাবে চলতে থাকতো। শেষ পর্যন্ত সাহাবী হতাশ হয়ে চলে যেতেন। আর এরা তাঁকে লক্ষ করে বিদ্রূপের বাণ ছুঁড়তো।
আবু লাহাব ও উম্মে জামিল বনু হাশেম ও বনু মুত্তালিবের সাথে এখানে আসে নি। হিংসা ও বিদ্বেষ রাসূলের সাথে নিকটাত্মীয়তার কথা তাদের ভুলিয়ে দিয়েছে। বরং রাসূলের ক্ষতি করাই এখন তাদের লক্ষ। আবু লাহাব বাজারে বাজারে ঘুরতো আর চিৎকার করে করে বলতো- কেউ যেনো মুহাম্মদের কাছে—তার অনুসারীদের কাছে কিছু বিক্রি না করে! এতে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সে-ই তার ক্ষতিপূরণ দেবে।
কুরাইশ যখন এভাবে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়লো আল্লাহর রাসূল এবং অন্য সবাইকে ক্ষুধায় মারতে, তখন স্বাভাবিকভাবেই ঘাঁটিতে খাদ্যঘাটতি তারপর খাদ্যসংকট দেখা দিলো। এবং এ সংকট বাড়তে বাড়তে ভয়াবহ রূপ ধারণ করলো। একসময় যার কাছে যা ছিল স-বই শেষ হয়ে গেল! এদিকে বাইরে থেকে কিনে আনার পথও প্রায় বন্ধ! বয়স্ক নারী-পুরুষেরা কষ্টে কষ্টে দিন কাটাতে পারলেও শিশুদের অবস্থা খুবই শোচনীয় হয়ে উঠলো! এ শিশুকান্না বন্ধ করারও কোনো উপায় নেই! ক্ষুধার রাজ্যে ওরা অবুঝ! মানে না কোনো সান্ত্বনা! শোনে না কোনো বকুনি! কানেই তোলে না কান্না-থামানো কোনো ভয়বাণী! আহা! ওদের কান্নায় পাথরও বুঝি গলে যায়! গলে না শুধু কুরাইশ জালিমদের মন! অথচ ঘাঁটি ভেদ করে এ কান্না তাঁদের কানেও ‘আছড়ে পড়ছিল’!
এ অমানবিক অবরোধে কেমন ছিলেন মহীয়সী খাদিজা? ধৈর্যে অবিচল! সবরে ‘মেওয়া ফল’! পাশাপাশি বিলিয়ে যাচ্ছিলেন নিজের ধন-দৌলত ও সম্পদ-সহযোগিতা! এখানেও খাদিজার মৃদু হাসিটি হারিয়ে যায় নি! সব সময় তা তাঁর মুখে দ্যোতিত! দ্যুতি ছড়ায় তা সবার মনে! বিশেষত প্রিয় নবীর মনে! এখানেও সংকট যতো বাড়ে খাদিজার হাসিটিও ততো পুষ্পময় হয়—অনাবিলতায় জ্যোতির্ময় হয়! কেন? কেন এমন হয়? কেননা, খাদিজা বিশ্বাস করেন—এই-যে দীনের জন্যে এতো কষ্ট, এ-সবের বদলা মিলবে আল্লাহর কাছে, মহাবদলা! দুঃখে-কষ্টে হা-হুতাশে কেন নষ্ট হবে সেই মহাবদলা?! তাই গিরিসংকটে বসে অবরোধের মুখেও তাঁর মুখে অমন করে ফোটে—পুষ্পের হাসি!!
খাদিজা ছিলেন কুরাইশ থেকে বেশ দূরে—সেই পাহাড়ের ঘাটিতে। তবুও কুরাইশ খাদিজাকে ভয় পাচ্ছিল। খাদিজা কোন সময় কী পরিকল্পনা করে বসেন—বলা যায় না! খাদিজার পরিকল্পনা যেমন বুদ্ধিদীপ্ত তেমনি সুদূরপ্রসারী! তাই খাদিজাকে কুরাইশ ভীষণ ভয় পায়! খাদিজার পরিকল্পনাকেও তারা মারাত্মক ভয় পায়! এ জন্যে তারা অবরোধকে নিশ্ছিদ্র করার পাঁয়তারা চালাচ্ছিল। বাইরের কেউ যেনো খাদিজার সাথে কোনো রকম যোগাযোগ করতে না-পারে সে ব্যাপারেও তারা ছিল সীমাহীন সতর্ক। একসময় তাদের মনে হলো, তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিছু কিছু খাবার কেউ কেউ পৌঁছে দিচ্ছে! ঘাঁটিতে বসে খাদিজাই যে এ-আয়োজন করছেন গোপনে গোপনে, এতে তাদের বিন্দুমাত্র সন্দেহ রইলো না। সুতরাং পাহারা আরও মজবুত করা হলো। সতর্কতা আরও বাড়ানো হলো। অবরোধের সবকিছুই দেখাশোনা ও পর্যবেক্ষণ করছিল আবু জেহেল। সে এ ব্যাপারে আরও অনেক সতর্ক হয়ে উঠলো।
এক রাতে আবু জেহেল দেখতে পেলো এক গোলাম গমের বস্তা নিয়ে যাচ্ছে ঘাঁটির দিকে। পেছনে পেছনে যাচ্ছে খাদিজার ভাইপো হাকিম ইবনে হিযাম! আবু জেহেল সামনে বেড়ে ওই গোলামকে ধরে ফেললো! তারপর ক্ষুব্ধকণ্ঠে বললো:
—আমরা কি বনু হাশেমকে বয়কট করে চলার ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হই নি? যে পর্যন্ত না ওরা ইসলাম ত্যাগ করবে কিংবা ক্ষুধায় মারা যাবে?! কেন তুমি খাবার নিয়ে যাচ্ছো? কেন তুমি চুক্তি ভাঙছো?
গোলাম তখন তাচ্ছিল্যভরে বললো:
—আমি খাবার নিয়ে যাচ্ছি না! আমি ঋণ আদায় করতে যাচ্ছি! খাদিজা আমার কাছে এটা পায়! মানুষ মানুষের ঋণ পরিশোধ করবে-সেটা তোমরা করতে দেবে না?!
আবু জেহেল তখন রাগে-ক্ষোভে চিৎকার করে উঠলো এই বলে:
—খাদিজা! সবখানে খাদিজা! খাদিজাকে আর ছাড় দেয়া যায় না, তাকে এবং তার খান্দানকে শেষ করে দিতে হবে!
আবু জেহেল হনহন করে ছুটে গেল কুরাইশ নেতৃবৃন্দকে ঘটনা জানাতে এবং এবং খাদিজার ব্যাপারে একটা চূড়ান্ত ফায়সালায় আসতে। সব শুনে কুরাইশ ভাবতেও শুরু করলো। কিন্তু কে কী করবে খাদিজার? আল্লাহর ইচ্ছার বিরুদ্ধে? আল্লাহর ইচ্ছা হলো-এ অবরোধ ভাঙবে! আল্লাহর ইচ্ছা হলো-এ অবরোধ ব্যর্থ হবে! আল্লাহর ইচ্ছা হলো-ইসলাম থাকবে! ‘আবু জেহেল’ থাকবে না! ‘আবু লাহাব’ থাকবে না! আল্লাহর ইচ্ছেয় বাধা দেবে-কে?!
অবরোধের সময়টা একেবারে কম ছিল না-তিন বছর! এ তিন বছরে খাদিজা যেমন জানের কুরবানি করেছেন তেমনি মালেরও কুরবানি করেছেন! অর্থ-সম্পদ যা ছিল তাঁর—সব বিলিয়ে দিলেন তিনি নবীজীর মায়ায়.. আল্লাহর ভালোবাসায়! দানের মহিমায় এমন করে ‘হারিয়ে যেতে’ কোন ইতিহাস কোন নারীকে কোথায় দেখেছে-আমাদের মহীয়সী এই খাদিজা ছাড়া?! অবরোধের কঠিন দিনগুলোতে তিনি নিজে তো ছিলেনই অটল-অবিচল, পাশাপাশি নারীকে জুগিয়েছেন অবিচলতার সাহস আর পুরুষকে দিয়েছেন লড়াই করার শক্তি!
আল্লাহর ইচ্ছায় অবরোধ শেষ হলো। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের নিয়ে.. স্বগোত্রকে নিয়ে.. খাদিজাকে নিয়ে ফিরে এলেন। খাদিজা এ অবরোধে শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লেও অনেক বেড়ে গিয়েছিল তাঁর মানসিক বল। গৃহে এসে খাদিজা ভাবতে লাগলেন-কুরাইশ এখন কী করতে পারে, নতুন করে? ওদের ‘তৃণীরে’ আছে কি অন্য কোনো তীর? হ্যাঁ.. একটা তীর এখনো আছে! সর্বশেষ তীর!! খাদিজা চিৎকার করে উঠলেন:
—অসম্ভব! ওরা কিছুতেই তাঁকে হত্যা করতে পারবে না! না, কিছুতেই না!! আল্লাহ তাঁকে রক্ষা করবেন! অবশ্যই রক্ষা করবেন!