📄 ঈমান যখন জাগলো
খাদিজা এখন ব্যস্ত। না, নিজেকে নিয়ে নয়। নিজের সন্তানদের নিয়েও নয়। আগের ঘরের সন্তানদের নিয়েও নয়। তাঁর গৃহের বিশেষ অতিথি ছোট্ট আলী, যায়দ (ইবনে হারিসা) কিংবা উম্মে আয়মানকে নিয়েও তাঁর বিশেষ কোনো ব্যস্ততা নেই। তাঁর বিশেষ ব্যস্ততা মুহাম্মদকে নিয়ে! যদি বলা যেতো—‘শুধু তাঁকে নিয়ে’, তাহলে কতোই-বা বেশি বলা হতো?! খাদিজার সবকিছু তো এখন কেন্দ্রীভূত প্রিয় মুহাম্মদকে ঘিরেই!
মুহাম্মদের হেরা গুহার ‘সেই দিন’ যতো কাছে আসে, খাদিজার ব্যস্ততা ততো বাড়ে। খাদিজা যেনো দিন গুনে গুনে এগিয়ে যাচ্ছেন চূড়ান্ত লগ্নের দিকে।
সময়ে সময়ে খাদিজা ছুটে যান চাচাতো ভাই ওয়ারাকার কাছে, তাকে গিয়ে বলেন—মুহাম্মদের মাঝে কী দেখলেন এবং তাঁর কণ্ঠে কী শুনলেন। ফিরে আসেন গৃহে তার কাছ থেকে আরও আশ্বাস নিয়ে .. বিশ্বাস নিয়ে .. আনন্দ নিয়ে। পাশাপাশি আগামী দিনের ত্যাগ ও কুরবানির জন্যেও তিনি নিজেকে প্রস্তুত করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে থাকেন। কেননা, ওয়ারাকা এ-ও তাঁকে বলে দিয়েছেন—সত্যের পথে সইতে হবে অনেক কষ্ট! নবীরা এসব কষ্টের ভেতরেই পথ চলেন! অনুসারীদেরও এ-কষ্টের ‘স্বাদ’ চাখতে হয়!
খাদিজা এখন মুহাম্মদময়। মুহাম্মদ যখন গৃহে তখনো মুহাম্মদ তাঁর হৃদয়ে। মুহাম্মদ যখন গারে হেরায় তখনও মুহাম্মদ তাঁর হৃদয়ে। মুহাম্মদ যখন মক্কার নেতৃস্থানীয়দের মাঝে তখনও তিনি তাঁকে হৃদয়ে গেঁথে রাখেন! যখন মুহাম্মদ গারে হেরায় থাকেন তখন কী যেনো খাদিজাকে কেবল টানে সেদিকে! একলা ঘরে তিনি আর বসে থাকতে পারেন না! ছুটে যান হেরাগুহার দিকে-মুহাম্মদের কাছে। মুহাম্মদের টানে। সে কী কষ্টের পথ! সে কী দুর্লংঘ্য পাহাড়ি ‘ধাপ’! তবুও খাদিজা চলে যান হেরা গুহায় মুহাম্মদের কাছে! হৃদয়ের ডাকে সাড়া দিয়ে! নিজের চোখে মুহাম্মদকে দেখে স্বস্তি পেতে! এরপর ফিরে আসতেন খাদিজা আবার গৃহে! মুহাম্মদকে তাঁর সাধনাস্থলে একা রেখে! মুহাম্মদ দেখতেন প্রিয়তমার ফিরে যাওয়া! আরও দেখতেন খাদিজার হৃদয়ের নম্রতা কোমলতা দয়ার্দ্রতা, যা তাঁর সাধনা-প্রহরকে পাথেয় যুগিয়ে চলেছে নীরব নিরবচ্ছিন্নতায়!
হেরা থেকে ফিরে এসে মুহাম্মদ খাদিজাকে বলতেন অনেক কথা- কিছু কিছু ভয়ের কথা। বলতেন, শূন্য মরুতে এক ধরনের ‘ভীতি জাগানিয়া’ আওয়াজ শোনার কথা। আওয়াজটা কানে এলেই হৃদয়ে তোলপাড় শুরু হতো। এসব শুনে খাদিজারও একটু ভয়-ভয় করতো। মুহাম্মদ দূরে কোথাও গেলেই খাদিজার দুশ্চিন্তা হতো। এমনকি তাঁর ফিরতে একটু দেরি হলেই খাদিজা তাঁর খোঁজে লোক পাঠাতেন। ওরা ফিরে এসে তাঁকে আশ্বস্ত করলেই তিনি স্বস্তি অনুভব করতেন।
তখন রমজান প্রায় শেষ। মুহাম্মদ গারে হেরায়। গভীর রাত। অন্ধকারে ঢাকা পড়ে আছে পাহাড়-উপত্যকা-সব। আকাশে শুধু মিটিমিটি জ্বলছে তারকা। তারারা যেনো আকাশের চোখ, তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে দূরের পৃথিবী। তারার আলোয় পাহাড়চূড়াগুলোকে মনে হচ্ছে ছায়ামূর্তির মতো, তাকিয়ে আছে একটি আরেকটির দিকে। সুনসান নিরবতা। কোথাও নেই কোনো কোলাহল। শুধু থেকে-থেকে শোনা যায় এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে ছুটে চলা শ্বাপদি কণ্ঠ। খাদিজার মনে ভয় জমতে শুরু করেছে। হেরা গুহায় ছুটে যেতে খাদিজার মন অস্থির হয়ে উঠেছে। প্রিয় মুহাম্মদের জন্যে তাঁর মন কাঁদছে। শুধু কাঁদছে। না, তিনি সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন না, করতে পারলেন না। বেরিয়ে গেলেন হেরাগুহার উদ্দেশে-সঙ্গে কয়েকজন খাদেম। দ্রুত পাহাড় বেয়ে বেয়ে তিনি ওপরে উঠতে লাগলেন। পাহাড়ি পাথরখণ্ডের ধারালো ঘর্ষণে পা-যে তাঁর রক্তাক্ত হয়ে উঠছে-সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। ক্লান্তিতে তাঁর শ্বাস-নিঃশ্বাস-যে দ্রুত ওঠানামা করতে লাগলো- সেদিকেও তাঁর কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। চলছেন আর চলছেন। একসময় পৌঁছে গেলেন গারে হেরায়।
কিন্তু একি! মুহাম্মদ-যে এখানে নেই! খাদিজার মন কেঁপে উঠলো! হাহাকার করে উঠলো! আশপাশে তাকিয়ে তিনি চিৎকার করে উঠলেন- কোথায় গেলেন তিনি! জায়গাটা-যে একেবারেই শূন্য! কোথায় তিনি?!
খাদিজা নেমে এলেন উপত্যকায়। খাদেমরা নামছে আগে আগে। সবাই মিলে খুঁজতে লাগলেন মুহাম্মদকে। ডানে-বামে-সামনে-পেছনে-সবখানে। খাদিজা ছুটে এলেন গৃহে, যদি পাওয়া যায় তাঁকে এখানে। কিন্তু না, গৃহেও ফেরেন নি মুহাম্মদ! খাদিজার দুশ্চিন্তা বাড়তে লাগলো। নেই গুহায়! নেই গৃহে! গেলেন তাহলে কোথায়?! নাকি তিনি উপত্যকাতেই! কিন্তু একটু পরই খাদেমরা ‘খাঁ খাঁ শূন্যতা’ নিয়ে ফিরে এলো। ওদের চেহারায় উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তার ছাপ। ওরা জানালো, উপত্যকাটা তন্নতন্ন করে খোঁজা হয়েছে, কিন্তু কোথাও তাঁকে চোখে পড়ে নি! খাদিজা অমন খবর শুনতে মোটেই প্রস্তুত ছিলেন না, একটা আর্তচিৎকার তাঁর বুক ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইলো। কিন্তু খাদিজা সামলে উঠলেন। তিনি হতাশ হলেন না, ভেঙে পড়লেন না। বরং খাদেমদের আবার মুহাম্মদের খোঁজে বেরিয়ে যেতে বললেন, পাহাড়ে-উপত্যকায়। ওরা সঙ্গে সঙ্গে মালিকানের হুকুম তামিল করলো, দ্রুত বেরিয়ে গেলো।
দুশ্চিন্তায়-ভয়ে অস্থির বেলা কাটাতে লাগলেন খাদিজা। কিন্তু গৃহে তাঁর মন টিকলো না। আবার হেরা গুহায় ছুটে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেন। বেরুতে যাবেন অমনি শুনলেন পদধ্বনি। দেখলেন মুহাম্মদ কাঁপতে কাঁপতে এসে গৃহে ঢুকছেন! আর কাঁপা-কাঁপা কণ্ঠে বলছেন- আমাকে কম্বল দিয়ে ঢেকে দাও! আমাকে কম্বল দিয়ে ঢেকে দাও!!
খাদিজা দ্রুত তাঁকে গিয়ে ধরলেন, বিছানায় শুইয়ে দিলেন এবং কম্বল দিয়ে ঢেকে দিলেন। খাদিজার মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ। তিনি উদ্বেগভরে নীরবে দাঁড়িয়ে রইলেন তাঁর শিয়রে!
কী হয়েছে খাদিজার মুহাম্মদের? অমন করছেন কেনো তিনি? খাদিজা কান পেতে শোনার চেষ্টা করলেন—শ্বাস-নিঃশ্বাস জারি আছে কি না!
আল-হামদুলিল্লাহ! সব ঠিক আছে!
খাদিজা মুহাম্মদের পাশেই দাঁড়িয়ে রইলেন যতোক্ষণ না নিশ্চিত বিশ্বাস হলো যে মুহাম্মদ শঙ্কামুক্ত-ভীতিমুক্ত—তাঁর কোনো সমস্যা নেই। খাদিজা আরও আশ্বস্ত হলেন যখন দেখলেন মুহাম্মদ চোখ মেলে তাকিয়েছেন! খাদিজা হাত ধরে মুহাম্মদকে বসতে সাহায্য করলেন। গায়ের কম্বলটাও সরিয়ে দিলেন। ঘামে ভিজে-যাওয়া পোশাকও বদলে দিলেন। খাদিজার নাকে এসে লাগলো ঘামের ঘ্রাণ। কী সুগন্ধিময়! মুহাম্মদের পাশে এসে বসলেন খাদিজা, তাকিয়ে রইলেন তাঁর চোখে। সে চোখে কী মায়া, কী ছায়া! সে চোখে আরও ছিলো অপার কৌতূহল, যা এই হাসিঝরা প্রশ্নে ফুটে উঠলো:
—আবুল কাসেম! কোথায় ছিলেন আপনি? আমাদের সবাইকে দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছিলেন!
মুহাম্মদ কামরার ছাদের দিকে তাকালেন! তারপর ভয়-জড়ানো কণ্ঠে বললেন:
—খাদিজা! আমার কী হবে?! আমার ভীষণ ভয় লাগছে! আমি এক আশ্চর্য দৃশ্য দেখেছি! যা দেখেছি তা নিয়ে কথা বলতে আমার সাহস হচ্ছে না–ভয়-ভয় লাগছে! ভীষণ ভয়!! এসব বললে আর মানুষ শুনলে বলবে- আমি পাগল হয়ে গেছি! খাদিজা আমি দেখেছি অবিশ্বাস্য এক দৃশ্য!
খাদিজা মৃদু হাসলেন। বললেন মমতা ঝরিয়ে:
—কী দেখেছেন আপনি-আবুল কাসেম! এতো ঘাবড়ে যাচ্ছেন-যে! এতো ভয় পাচ্ছেন কেনো? আল্লাহর কসম! আল্লাহ আপনাকে অসম্মানিত করবেন না! কিছুতেই না! আল্লাহ আপনাকে অপদস্থ করতে পারেন না! আপনি তো আত্মীয়দের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখেন। বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করেন। আপনি তো শ্রেষ্ঠ অতিথিবৎসলও! যেখানে সত্য সেখানেই আপনি। সুতরাং আপনার কোনো বিপদ হতে পারে না! আপনি যা দেখেছেন ভালোই দেখেছেন।
মুহাম্মদ এবার কথা বলতে শুরু করলেন।
—আমি হেরাগুহায় ছিলাম। দেখছিলাম রাতের সৃষ্টিলীলা। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃজনশোভা। আমার মন ফুরফুরে। আমার হৃদয় আনন্দোদ্বেল। আহা! স-ব দেখতে আমার কী-যে মজা লাগছিলো! হেরা গুহার পরিবেশটাও মধুময় হয়ে উঠলো! এ অবস্থা যখন চলছিলো তখনই ঘটলো ব্যাপারটা! তখনই দেখলাম দৃশ্যটা! আমি দেখলাম- এক কোমলদেহী মানুষকে, মোটেই তিনি অন্য মানুষের মতো নন! ভয়ে আমার অন্তরাত্মা কেঁপে কেঁপে উঠলো! আমার দেহাবয়বও কাঁপতে লাগলো! এ পাহাড়চূড়ায় তুমি ছাড়া আর কেউ তো কখনো যায় নি! আমি ভীষণ ভড়কে গেলাম! আঁতকে উঠলাম! ওই কোমল দেহের মানুষটির দিকে আমি ‘মোহাচ্ছন্নের মতো’ তাকিয়ে রইলাম! ভয়ে আমি চিৎকার করে উঠতে চাইলাম! তখনই শোনা গেলো তার কঠিন কণ্ঠ!
—মুহাম্মদ, পড়ো!
আমি ভীতকণ্ঠে জবাব দিলাম:
—আমি তো পড়তে পারি না!
আবার শোনা গেলো সেই শক্ত কঠিন আওয়াজ! পিলে চমকে-দেওয়া আওয়াজ! পাশাপাশি ওই মানুষটি এগিয়ে এসে আমাকে বুকে চেপে ধরলেন! কী কঠিন চাপ! বললেন:
—মুহাম্মদ, পড়ো!
আমি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বললাম:
—আমি পড়া জানি না!
আবার চাপ! আবার সেই কঠিন কণ্ঠ:
—মুহাম্মদ, পড়ো!
আমি ভীতকণ্ঠে বললাম:
—কী পড়বো?
আবার চাপ! আরও জোরে! পাশাপাশি ভেসে এলো সেই মানুষটির মুখে আশ্চর্য মধুকণ্ঠে:
‘পড়ো তোমার রব-এর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাটবাঁধা রক্ত থেকে। পড়ো। তোমার রব খুব দয়ালু, যিনি মানুষকে জ্ঞান দান করেছেন কলমের সাহায্যে। মানুষকে জানিয়েছেন সে কথা যা সে জানতো না।’ (সূরা আলাক)
আমি তার অনুসরণ করলাম, যা পড়তে বলেছেন তা পড়লাম! তারপর দেখলাম, আমার সামনে কেউ নেই! আমি তখন ভীষণ ভীত! ভীষণ দিশেহারা! সারাটা দেহ যেনো আমার অবশ হয়ে গেছে! আমি শক্তি সঞ্চয় করলাম! তারপর দ্রুত চূড়া থেকে নেমে আসতে লাগলাম! তারপর গৃহাভিমুখে ছুটতে লাগলাম!
বুদ্ধিমতী প্রজ্ঞাবতী খাদিজা প্রিয় মুহাম্মদের যবানি শুনে একটুও বিচলিত হলেন না, বরং মুখের ভাঁজে ভাঁজে অপার্থিব এক হাসির ঝিলিক ছড়িয়ে পড়লো তাঁর! মনে মনে বুঝি বললেন- আহ! অবশেষে আমার জীবনে উদিত হলো নবুওত-সূর্য!! আমার সেই স্বপ্নসূর্য!! এবার আমার সব স্বপ্ন পূরণ হলো! মুহাম্মদ আমার স্বামী! আমার স্বামী এখন আল্লাহর নবী!! খাদিজা হাসিমুখে মুগ্ধকণ্ঠে উচ্চারণ করলেন:
—আবুল কাসেম! কী সুন্দর মধুময় বাণী আপনাকে পড়তে বলা হয়েছে! আমার বিশ্বাস, এ কোনো মানুষের কথা নয়, হতে পারেই না!
খাদিজা জানতে চাইলেন:
—আবুল কাসেম! ওই মানুষটি কীভাবে আপনার সামনে থেকে চলে গেলেন! কোথায় চলে গেলেন?
মুহাম্মদ বললেন:
—খাদিজা! হঠাৎ আমার চোখের সামনে থেকে মিলিয়ে যাওয়ার পর আবার তাকে আমি দেখলাম! বিশাল আকৃতির! যেনো আসমান-জমিন জুড়ে তার অবস্থান! আমাকে তিনি বললেন:
—মুহাম্মদ! আমি জিবরীল আর তুমি এখন থেকে আল্লাহর রাসূল!
খাদিজার আনন্দ এবার ষোলোকলায় পূর্ণ হলো! তিনি হর্ষধ্বনি করে উঠলেন:
—আল্লাহ কতো বরকতময়! আল্লাহ কতো মহীয়ান!!
খাদিজা আনন্দাতিশয্যে প্রিয় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আবেগে জড়িয়ে ধরলেন! তাঁর মাথায় চুমু খেলেন! বললেন:
—আবুল কাসেম! সুসংবাদ! সুসংবাদ!! আপনি সেই প্রতীক্ষিত নবী ও রাসূল, যার সুসংবাদ এতোদিন মানুষের মুখে মুখে শুনে এসেছি! আপনার অপেক্ষাতেই মানুষ প্রহর গুনে চলেছে- দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর! বরং যুগের পর যুগ!
খাদিজা প্রিয় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একটু বিশ্রাম নিতে বললেন। একটু আরাম করতে বললেন। নবীজী শুয়ে পড়লেন। খাদিজা পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন। আল্লাহর রাসূলের ঘুম না-আসা পর্যন্ত তিনি দাঁড়িয়েই রইলেন। তারপর দ্রুত পোশাক বদলে বেরিয়ে গেলেন সেই ওয়ারাকার কাছে! গিয়ে সব, স-ব বললেন তাঁকে আনন্দ-গদগদ কণ্ঠে! ওয়ারাকার বয়স তো আর কম হয় নি! তবুও যুবকের মতো হর্ষধ্বনি করে উঠলেন:
—কুদ্দুস! কুদ্দুস!! খাদিজা! তোমার স্বামীই সেই নবী! তাঁর কাছে ওহী নিয়ে এসেছিলেন জিবরীল! এ-জিবরীলই এর আগে সব নবী-রাসূলের কাছে ওহী নিয়ে এসেছেন! তিনি আসমানি বার্তাবাহক! খাদিজা! এখন তোমার অনেক কাজ! সবচেয়ে বড় কাজ হলো পদে-পদে তোমার স্বামীকে দাওয়াতের কাজে সহযোগিতা করা!
ওয়ারাকা একটু থামলেন। তারপর আবার বলতে লাগলেন:
—খাদিজা! সাহাসে বুক বাঁধো! এ-পথে আছে অনেক কষ্ট! সত্যের পথ সব সময় কণ্টকাকীর্ণ! এ পথ বড়ো দীর্ঘ ও দুর্গম!
খাদিজা আনন্দে ভাসতে ভাসতে ফিরে এলেন! খাদিজা ছুটে ছুটে ফিরে এলেন! মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে-যে দিতে হবে সুসংবাদ! তাঁকে জানাতে হবে ওয়ারাকার কথা-সুসংবাদ! এসে দেখলেন প্রিয় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখনো ঘুমোচ্ছেন! তাঁর চেহারায় ভাসছে নবুওতের নূর! আসমানি ওহীর ঝলক!
কিন্তু কাঁপছেন কেনো তিনি? ঘামে-ঘামে তাঁর কপালটি-যে একেবারে ভিজে গেছে! খাদিজা একটু বিস্মিত হলেন! খাদিজা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জাগিয়ে দিতে ইচ্ছে করলেন! কিন্তু আবার ইচ্ছেটা ত্যাগ করলেন! না, ঘুমোক আল-আমীন! তাঁর ঘুম বড্ড প্রয়োজন! খাদিজা নবীজীর ঘামসিক্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে রইলেন! অপেক্ষায় বসে রইলেন এ আশায় যে এ অবস্থা এক্ষুনি কেটে যাবে! হ্যাঁ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চোখ খুলেছেন! খাদিজা নিশ্চুপ বসে রইলেন! কান পেতে রইলেন! মনে হচ্ছে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সামনের দিকে কিছু দেখছেন! একটু পর তিনি স্বাভাবিক হলেন! চোখ নিচে নামালেন! খাদিজা কোমলকণ্ঠে বললেন:
—আবুল কাসেম! একটু বিশ্রাম কি নেবেন না!
আল্লাহর রাসূল মমতা-ঝরা কণ্ঠে বললেন:
—খাদিজা! বিশ্রামের সময় নেই! এইমাত্র আমার রব জিবরীলকে পাঠিয়েছিলেন। তিনি আমাকে কাজের ময়দানে-দাওয়াতের ময়দানে ‘ঝাঁপিয়ে পড়ার’ নির্দেশ দিয়ে গেছেন! এখন মানুষকে ফেরাতে হবে মূর্তিপূজা থেকে। তাদেরকে ডাকতে হবে তাওহিদের দিকে, দিতে হবে সত্যপথের সন্ধান।
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটু থেমে বললেন:
—খাদিজা তুমি শুনবে এইমাত্র নাযিল-হওয়া আল্লাহর কালাম?
খাদিজা আনন্দে কান পাতলেন! আল্লাহর নবী তিলাওয়াত শুরু করলেন:
‘হে চাদর আবৃত! উঠে পড়ুন এবং (মানুষকে) সতর্ক করুন। আপন প্রতিপালকের মাহাত্ম্য ঘোষণা করুন। নিজের পরিধেয় বস্ত্র পবিত্র রাখুন। গোনাহ থেকে বেঁচে থাকুন। বেশি পাওয়ার আশায় কাউকে কিছু দেবেন না। আপন প্রতিপালকের সন্তুষ্টির জন্যে সবর করুন।’ (সূরা মুদ্দাসসির)
আনন্দে সৌভাগ্যে খাদিজার মন দুলে উঠলো! আল্লাহর কালাম তাঁর কানে মধু বর্ষণ করলো! প্রিয় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কণ্ঠ তাঁর মনে অনেক অ-নেক শক্তি যোগালো—আগামী দিনের ‘জিহাদে’ নিজেকে উজাড় করে দিয়ে লড়াই করার জন্যে! খাদিজা আল্লাহর রাসূলকে সুসংবাদ শোনালেন- ভয় নেই প্রিয়! সামনে আসছে শুধুই অফুরন্ত কল্যাণ! আপনাকে অভিনন্দন হে স্বামী! আল্লাহর অনুগ্রহ আপনার নিত্য সঙ্গী!
আল্লাহর রাসূল খাদিজাকে জবাবে বললেন:
—খাদিজা! আমি নবুওতের দায়িত্ব পালনের জন্যে পূর্ণ প্রস্তুত! মানুষকে ডাকবো আল্লাহর পথে.. সত্যের পথে.. সরল সঠিক দীনের পথে!
একটু চুপ থেকে আল্লাহর রাসূল বললেন:
—আমার সম্প্রদায় কি গোমরাহি থেকে ফিরে আসবে? জুলুম নিপীড়ন কি ওরা ছাড়তে পারবে? খাদিজা! আমার তো মনে হচ্ছে; ওরা আমাদের মানবে না! আমাদের কথা শুনবে না! উল্টো রুখে দাঁড়াবে! জানি না, কোথায় গিয়ে ঠেকবে আমাদের জিহাদ-সংগ্রাম!
একটু আগে আল্লাহর কালামের মধুরিমায় বিমুগ্ধ খাদিজা বললেন:
—ওয়ালি রাব্বিকা ফাসবির! আপনার রব আপনাকে যা আদেশ করেছেন তা নির্ভয়ে পালন করে যান! সেই বুক থেকে বাতিলকে বের করা তো একটু শক্ত হবেই, যে বুকে বাতিল ছড়িয়ে দিয়েছে শাখা-প্রশাখা! বিছিয়েছে শক্ত শেকড়! আপনার রব-এর কসম! যিনি আপনাকে নবী করে পাঠিয়েছেন, তিনি আপনার সাথে থাকবেন, থাকবেনই। সব সময় আপনাকে সাহায্য করবেন!
তারপর খাদিজা আনন্দপ্লাবিত উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করলেন:
—হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনাকে মানলাম, আপনাকে রাসূল হিসাবে মনে-প্রাণে বিশ্বাস করলাম! আশহাদু আন্নাকা রাসূলুল্লাহ!! আমি আপনাকে সব দিয়ে দিলাম! আল্লাহর জন্যে আমার সম্পদ ও প্রাচুর্য দিয়ে দিলাম! সব আপনার হাতে তুলে দিলাম! সত্যের পথে এসব যেভাবে চান সেভাবে খরচ করুন, বিলিয়ে দিন! অকাতরে বিলিয়ে দিন! আমার এখন কিছুই নেই! শুধু আপনিই আমার! আমার সবকিছু আপনার!!
📄 মক্কা এখন জেগে উঠবে
এখন ভোর। খাদিজার ঘুম ভেঙে গেছে। আল-আমীন-মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এরও ঘুম ভেঙেছে। রাতে কী আর ঘুম হয়েছে খাদিজার! একটু আগেই তো তিনি শুয়েছিলেন! তবুও মনটা ফুরফুরে! মনে হচ্ছে তিনি যেনো রাত জাগেন নি, অনেক ঘুমিয়েছেন! মনে হচ্ছে রাতভর আল-আমীনের নবী হওয়া দেখেন নি, কেবল ঘুমিয়েছেন! অথচ তিনি ঘুমান নি, কই আর ঘুমোলেন! তবুও অমন ঘুম-শেষের শান্তি ও প্রশান্তিতে মনটা ভরে আছে কেনো? আহা! কী আরামের সকাল! কী শান্তির পরিবেশ! সব কি আল-আমীনের নবী হওয়ার বরকত? অবশ্যই! অবশ্যই!!
আল-আমীন এখন গৃহে নেই, বেরিয়ে গেছেন নতুন মন নিয়ে .. নতুন চেতনা নিয়ে .. নতুন দাওয়াতের পয়গাম নিয়ে-কা'বা-চত্বরে!
আজ মনভরে আল-আমীন তাওয়াফ করলেন! কা'বা-চত্বরে তাঁর দেখা হয়ে গেলো ওয়ারাকা ইবনে নওফলের সাথে, তিনিও সকাল সকাল তাওয়াফে এসেছিলেন! আল-আমীনকে দেখে তিনি আনন্দিত হলেন! আনন্দভরা উচ্চকণ্ঠে তাঁকে অভিনন্দন জানালেন! দাওয়াতের পথে অটল-অবিচল থাকার অনেক উপদেশও দিলেন! কা'বা-চত্বরের এক জায়গায় বসে আল-আমীনকে আরও বললেন অনেক কিছু। বললেন, অনেক বাধা-বিপত্তি। আসবে অনেক ঝড়। আসবে প্রত্যাখ্যান। আসবে জুলুম-নিপীড়ন। শেষে ওয়ারাকা নবীজীর মাথায় চুমু খেলেন! বৃদ্ধ ওয়ারাকার শ্রদ্ধা-চুমুতে আল-আমীন ধন্য হলেন। ওয়ারাকাও ধন্য হলেন!
ওখানে কুরাইশের লোকজনও ছিলো। ওরাও তাওয়াফ করছিলো। কেউ কেউ ওয়ারাকার কথা শুনতে পেলো। ওয়ারাকা চলে গেলে ওরা এসে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে জানতে চাইলো, কী বিষয়ে ওয়ারাকার তাঁর সাথে কথা হচ্ছিলো। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওদের দিকে তাকালেন, তারপর দৃঢ়কণ্ঠে বললেন:
—গত রাতে আমি ওহী লাভ করেছি! তা-ই নিয়ে কথা হচ্ছিল।
কুরাইশ এ কথা শুনে মুখ-চাওয়াচাওয়ি করলো। একজন বিস্ময়ভরে বললো:
—মুহাম্মদ! শুনি, কে তোমার কাছে ওহী পাঠিয়েছে?!
আল্লাহর রাসূল দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জবাব দিলেন:
—আল্লাহ! যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন.. তোমাদের সৃষ্টি করেছেন.. আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন.. পাথর সৃষ্টি করেছেন.. বালিরাশি সৃষ্টি করেছেন.. পানি সৃষ্টি করেছেন.. বৃক্ষ-তরুলতা সৃষ্টি করেছেন! সবকিছু সৃষ্টি করেছেন! সেই আল্লাহ-ই ওহী পাঠিয়েছেন!
এসব শুনে আরেকজন হাসিতে ভেঙে পড়লো! বললোঃ
—শুনি তো, কী ওহী পাঠিয়েছেন তোমার রব তোমার কাছে?
আল্লাহর রাসূল বললেন:
—তিনি ওহী পাঠিয়ে আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন হিদায়াতের পথে মানুষকে ডাকতে.. সঠিক সরল পথের ঠিকানা বলে দিতে .. যারা অসার মূর্তিপূজা ও অপরাধে লিপ্ত রয়েছে তাদেরকে হিদায়াত ও সুপথে আনতে। তুমি দেখতে পাচ্ছো না সামাজিক অবক্ষয়? অনুভব করতে পারো না? অবশ্যই এর পরিবর্তন দরকার!
আল্লাহর রাসূলের এ কথা শুনে কুরাইশের এক লোক জোরে হেসে উঠলো! বললো:
—বুঝেছি! তুমি কী বলতে চাও, এতোক্ষণে বুঝেছি!! তুমি হতে চাচ্ছো সেই নবী যার আলোচনা কেউ কেউ করে বলে শুনেছি! কিন্তু আফসোস তোমার জন্যে হে মুহাম্মদ! তুমি তো অনেক দেরি করে ফেলেছো! তোমার আগেই অনেকে নবী হয়ে গেছে! কিন্তু বিনিময়ে ওদের জুটেছে কেবলই রাশি রাশি ঠাট্টা! ঝাঁপি ঝাঁপি বিদ্রূপ! এখন তুমি দেখছি সে পথে পা ওঠাতে চাচ্ছো, কান পেতে শুনে রাখ-তোমার কপালেও তবে আছে সেই ঠাট্টা আর বিদ্রূপ!! বলি কি; সবচেয়ে ভালো হয় এ বিপজ্জনক পথ থেকে তোমার সরে আসা! শুধু শুধু আমাদের পরিবেশটা নষ্ট করো না! তাহলে ওদের যে-পরিণতি হয়েছে তোমারও হবে সে পরিণতি। হাঁটতে হবে তোমাকে কণ্টকাকীর্ণ পথে!
এদিকে খাদিজা আর বসে থাকতে পারলেন না, শুরু করে দিলেন দাওয়াতের কাজ। প্রথমেই একত্রিত করলেন প্রিয় সখী-বান্ধবী ও সহচরীদের। বিশ্বস্ত দাসীদের। ওদের শোনালেন প্রিয় স্বামীর নবী হওয়ার সুসংবাদ! সবাই বিমুগ্ধচিত্তে উৎকর্ণ হয়ে শুনলো এ সুসংবাদ! তারপর গৃহে ফিরে বললো গিয়ে স্বামীদের .. আত্মীয়দের .. পরিচিতদের! এভাবে দ্রুতই সারা মক্কায় খবরটি ছড়িয়ে পড়লো! মুখে মুখে আলোচিত হতে লাগলো। অনেকেই বিশ্বাস করলো না, বরং ঠাট্টা-বিদ্রূপের হাসি হাসলো! অপরদিকে কেউ কেউ বিবেকের কাছে জানতে চাইলো:
—মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর মুখে অমন খবর উচ্চারিত হলে তো তাকে মোটেই হালকাভাবে নেয়া যায় না! তিনি তো আল-আমীন-চিরবিশ্বাসী! জীবনে কখনো না-তিনি মিথ্যা বলেছেন আর না আমানতের খেয়ানত করেছেন! তা ছাড়া তাঁর জীবনসঙ্গিনী খাদিজা তো ‘তাহিরা’-চিরপবিত্র! তাঁর মুখেই-বা অসত্য উচ্চারিত হবে কেমন করে? না-বোঝেই-বা তিনি স্বামীকে সত্যায়ন করবেন-এমনটাও তো মনে হয় না! খাদিজা-মুহাম্মদ-দু'জনই সত্য-বিচ্যুত বা পাগল হয়ে গেছেন-এ-কথা বিশ্বাস করাও তো সম্ভব না! এক রাতে একসঙ্গে অমন দু'জন মানুষের পাগল হওয়া অসম্ভব!
খাদিজার গৃহ-আঙিনায় ভিড় বাড়তে লাগলো। মহিলারা এসেছে মুখে-মুখে শোনা কথাটা যাচাই করতে। খাদিজা সহাস্যে সবাইকে বলতে লাগলেন ঘটনা। দৃঢ়তার সাথে সবাইকে এ-ও বলে দিলেন, তারা যা শুনেছে সব সত্য। এমনকি তিনি সমবেত মহিলাদের নাযিলকৃত কুরআনও তিলাওয়াত করে শুনিয়ে দিলেন! সবাই উৎকর্ণ নীরবতায় আচ্ছন্ন হয়ে শুনলো খাদিজার ঐশীবাণীর ব্যতিক্রমী তিলাওয়াত! সবাই নিরীক্ষণ করলো খাদিজাকে, লক্ষ করলো খাদিজার মুখের ভাঁজ ও বলার ভঙ্গি! আছে কি সেখানে কোনো অস্বাভাবিকতার ছাপ-পাগলামির চিহ্ন?! কই! চোখে পড়ছে না তো! আগে যে-খাদিজাকে তারা চিনতেন এখনো তো সে-ই খাদিজাই কথা বলছেন! আচরণে-আন্তরিকতায় .. বুদ্ধিতে-দীপ্তিতে কোনো তফাত নেই! কোনো পরিবর্তন নেই! যেই খাদিজা সে-ই খাদিজা!! বরং এখন খাদিজা আরও দীপ্তিময়ী! তাঁর কথায় আচরণে কী অপূর্ব উচ্ছলতা!
সবাই ফিরে গেলো গৃহে—রাজ্যের বিস্ময় চোখে নিয়ে! হাজারো প্রশ্ন বুকে নিয়ে—কী শুনলাম আমরা? কী দেখলাম আমরা? গৃহে ফিরে সবাই জানালো দেখে-আসা.. শুনে-আসা কথা-একে একে সব! সবাইকে! তারা শুনেছে যে-বিস্ময় নিয়ে, বলেছে আরও বেশি বিস্ময় নিয়ে! তারা দেখেছে যে মুগ্ধতা নিয়ে, বলেছে আরও অনেক বেশি মুগ্ধতা ছড়িয়ে!
না, সেদিনের পর থেকে খাদিজার গৃহ-আঙিনার ভিড় আর কমে নি, দিনে দিনে বেড়েছে, কেবল বেড়েছে! সবাই জানতে চেয়েছে, নাযিল হয়েছে কি কোনো নতুন ওহী-আসমানি বার্তা?! কিন্তু হঠাৎ তারা লক্ষ করলো, খাদিজা আগের মতো উচ্ছল না! মুখে ছাপ ফেলেছে একটা ছায়া! সে ছায়া কিছুটা দুশ্চিন্তার.. কিছুটা উদ্বেগের! কারণ ওহী বন্ধ বেশ কয়দিন হয়ে গেলো! এখন কী বলবেন খাদিজা ওদের? ওদের প্রশ্নের মুখে বেশ অস্বস্তিতেই তাঁকে পড়তে হচ্ছে। এদিকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়েছেন!
খাদিজার দুশ্চিন্তা রীতিমত উদ্বেগে রূপ নিলো! তাঁর মনে হানা দেয় এ-ভাবনাও- আল্লাহ কি তাঁর নবীকে ‘ভুলে’ গেছেন? আর কি ওহী নাযিল হবে না?! ‘নবী-পত্নী’ হওয়ার ধারাবাহিকতা কি তাহলে থেমে যাবে?! যে জন্যে তিনি সব বিলিয়ে দিয়েছেন? জান-মাল-সব?
খাদিজার এ-দুশ্চিন্তার সাথে যোগ হয় আরও বড় দুশ্চিন্তা। যখন রাসূলকে দেখেন তিনি দুশ্চিন্তায় তখন তাঁর নিজের দুশ্চিন্তা আরও অনেক বেড়ে যায়। অস্থির হয়ে পড়েন তিনি! ভুলে যান নিজের দুশ্চিন্তা। পাশে বসে রাসূলকে দিয়ে যান সান্ত্বনা। মনে করিয়ে দিতে থাকেন আল্লাহর অফুরান অনুগ্রহের কথা। আরও শুনিয়ে যান অভয়বাণী-প্রিয়! দুশ্চিন্তার কিছু নেই! আল্লাহর অনুগ্রহ অফুরান! আঁধার কেটে যাবেই! ঊষা হাসবেই! ওহী আসবেই! প্রয়োজন শুধু একটু অপেক্ষার। একটু সবরের।
কিন্তু ওহী এলো না! রাসূলের দুশ্চিন্তাও কাটলো না! কিন্তু খাদিজা ছিলেন গভীর আস্থাশীল! রাসূলের পাশে দাঁড়ালেন তিনি-কখনো দিচ্ছেন সান্ত্বনা! কখনো শোনাচ্ছেন অভয়বাণী! আর রাসূলের দুশ্চিন্তার মাত্রাটা যখন একটু বেড়ে যেতো তখন বলতেন;
—হে আল্লাহর রাসূল! দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগের কী আছে! সংকটের পাশেই তো সমাধান! কঠিনের আড়ালেই তো সহজ! নিশ্চয় এ বিরতির মাঝে (ওহী না-আসার ভেতরে) লুকিয়ে আছে কোনো হিকমত ও রহস্য!
সান্ত্বনার পাশাপাশি খাদিজা আল্লাহর কাছে দু'আও করতে লাগলেন আল্লাহ যেনো তাঁর নবীকে ভুলে না যান। ওহী যেনো বন্ধ না হয়ে যায়। নবীর দুশ্চিন্তা যেনো তড়িৎ কেটে যায়।
একদিন খাদিজা আল্লাহর রাসূলের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাঁকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। ভেঙে না পড়ার জন্যে উৎসাহ দিচ্ছেন। এর মাঝেই খাদিজা দেখলেন, প্রিয় নবীর শরীরটা কেঁপে কেঁপে উঠছে! কপাল বেয়ে বেয়ে ঘামও পড়ছে! খাদিজার মনটাও কেঁপে উঠলো! নবীজীর দিকে গভীর মমতায় উৎকণ্ঠাভরে তাকিয়ে রইলেন। না, ভয়ের কিছু নেই! নবীজী শান্ত হয়েছেন! খাদিজা কোমলকণ্ঠে উচ্চারণ করলেন :
—আবুল কাসেম! আপনার রব আপনাকে ভুলে যেতে পারেন না, কখনো না!
খাদিজার কথায় নবীজী মৃদু হাসলেন! সে হাসিতে ঝরে ঝরে পড়ছে খাদিজার প্রতি সন্তুষ্টি ও কৃতজ্ঞতা! এবার আল্লাহর নবী এইমাত্র নাযিল-হওয়া ওহী তাঁকে শোনাতে লাগলেন :
‘শপথ পূর্বাহ্নের। শপথ রাত্রির, যখন তা নিঝুম হয়। তোমার রব তোমাকে ত্যাগ করেন নি। তোমার প্রতি বিরূপও হন নি। নিশ্চয়ই পরকাল তোমার জন্যে ইহকাল থেকে উত্তম। তোমার পালনকর্তা সত্বরই তোমাকে দান করবেন, তখন হবে তুমি সন্তুষ্ট। তিনি কি পান নি তোমাকে এতিমরূপে? তখন দিয়েছেন আশ্রয়। তিনি পেয়েছেন তোমাকে পথহারা (বেখবর)। তখন দেখিয়েছেন পথ। তোমাকে পেয়েছেন নিঃস্ব অসহায়। তখন দূর করেছেন তোমার অভাব। সুতরাং তুমি এতিমের প্রতি কঠোর হয়ো না। আর যে সওয়াল করে (ভিক্ষা চায়) তাকে ধমক দিয়ো না। প্রকাশ করে যাও তোমার পালনকর্তার নেয়ামতের কথা।’ (সূরা দুহা)
খাদিজার মনে আনন্দ আর ধরে না! নবীজীর মুখের হাসি তাঁর মুখের হাসিকে আলোকিত করলো! নবীজীর মনের আনন্দ তাঁর মনের আনন্দকে বাড়িয়ে দিলো! অপেক্ষার কঠিন প্রহর শেষে সুসংবাদ এলে মনের অবস্থা কী হতে পারে-তা বোঝানো আসলেই মুশকিল!
খাদিজা এবার ভাবতে বসলেন সদ্য নাযিল হওয়া সূরার বাণী নিয়ে- আয়াত নিয়ে। আল্লাহ এ সূরায় রাসূলের সামনে তুলে ধরেছেন অনেক শিক্ষা। তাঁকে নির্দেশ দিয়েছেন কী করণীয় আর কী বর্জনীয়। আখেরাতের জন্যে তাঁকে আমল করতে বলেছেন। কেননা আখেরাত দুনিয়ার চেয়ে অনেক শ্রেষ্ঠ। অতুলনীয় উত্তম। আল্লাহ তাঁর রাসূলকে আরও মনে করিয়ে দিয়েছেন তাঁর প্রতি বর্ষিত নেয়ামতের কথা। কর্মের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ার কথা। এতিম-মিসকিনের সাথে সদয় আচরণের কথা।
এরপর খাদিজা মিষ্টি করে হাসলেন, এ সূরায় তো আছে তাঁর প্রতি ইশারাও! তিনি প্রিয় আল-আমীনের পাশে দাঁড়িয়েছেন—তা আল্লাহ পছন্দ করেছেন! এটিকে নেয়ামত হিসাবে আখ্যা দিয়েছেন, আল-আমীনের জন্যে! খাদিজার জন্যে! আল্লাহর নবী খাদিজার দিকে তাকিয়ে বললেন আনন্দ-উদ্বেল কণ্ঠে :
—খাদিজা! তোমার অনুগ্রহ অনেক! আল্লাহ তা নষ্ট করবেন না! যদিও অনুগ্রহ ও দয়ার একমাত্র উৎস আল্লাহ, তবুও তিনিই তো তোমাকে মিলিয়ে দিয়েছেন আমাকে! আমাকে তীব্র প্রয়োজনের মুহূর্তে তিনি অভাবমুক্ত করেছেন তোমার সম্পদ দিয়ে.. তোমার মন-প্রাণ দিয়ে! হ্যাঁ.. আল্লাহ এখন সেই অনুগ্রহের কথাই আমাকে মনে করিয়ে দিলেন! খাদিজা! তুমি কি শোনো নি আয়াত?
খাদিজা ছলোছলো চোখে বললেন :
—আমার জান আমার মাল-স-ব আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের জন্যে! হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আপনার দায়িত্ব পালনে ঝাঁপিয়ে পড়ুন! আল্লাহ আছেন আপনার সাথে! আমি আছি আপনার পাশে!
আল্লাহর রাসূল খাদিজাকে জবাবে বললেন:
—খাদিজা! আমি নবুওতের দায়িত্ব পালনের জন্যে পূর্ণ প্রস্তুত! মানুষকে ডাকবো আল্লাহর পথে.. সত্যের পথে.. সরল সঠিক দীনের পথে!
একটু চুপ থেকে আল্লাহর রাসূল বললেন:
—আমার সম্প্রদায় কি গোমরাহি থেকে ফিরে আসবে? জুলুম নিপীড়ন কি ওরা ছাড়তে পারবে? খাদিজা! আমার তো মনে হচ্ছে; ওরা আমাদের মানবে না! আমাদের কথা শুনবে না! উল্টো রুখে দাঁড়াবে! জানি না, কোথায় গিয়ে ঠেকবে আমাদের জিহাদ-সংগ্রাম!
একটু আগে আল্লাহর কালামের মধুরিমায় বিমুগ্ধ খাদিজা বললেন:
—ওয়ালি রাব্বিকা ফাসবির! আপনার রব আপনাকে যা আদেশ করেছেন তা নির্ভয়ে পালন করে যান! সেই বুক থেকে বাতিলকে বের করা তো একটু শক্ত হবেই, যে বুকে বাতিল ছড়িয়ে দিয়েছে শাখা-প্রশাখা! বিছিয়েছে শক্ত শেকড়! আপনার রব-এর কসম! যিনি আপনাকে নবী করে পাঠিয়েছেন, তিনি আপনার সাথে থাকবেন, থাকবেনই। সব সময় আপনাকে সাহায্য করবেন!
📄 উম্মুল মু‘মিনীন
এরপর আর ওহী বন্ধ হয় নি, একের পর এক নাযিল হতে লাগলো আসমানি ওহী-কুরআনের আয়াত। খাদিজা কী সৌভাগ্যবতী! ওহী নাযিল হওয়ার পর সবার আগে জানতে পারেন তিনি। তারপর সবার আগেই শুরু করে দিতে পারেন তার প্রচার। প্রিয়জনদের মাঝে। ওহীর বাণীর ওপর আমলের সৌভাগ্যও তাঁরই প্রথম হয়। এমন অনেক সৌভাগ্যের ‘সব প্রথমেই’ খাদিজা প্রথম। আরেকটু স্পষ্ট করে বলছি—
নবীজীর প্রথম স্ত্রী কে? .. খাদিজা!!
প্রথম মুসলমান কে? .. খাদিজা!!
প্রথম ওযু শিখেছেন কে? .. খাদিজা!
নবীজীর সাথে প্রথম নামায পড়েছেন কে? .. খাদিজা!
সর্বপ্রথম কে নবীজীর দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন? .. খাদিজা!
কে সবার আগে তাঁর পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছেন? .. খাদিজা!
কাফির-মুশরিকদের ঠাট্টা-বিদ্রূপের ঝড় কে মুকাবিলা করেছেন প্রথমে? .. খাদিজা!
কা’বায় নামায পড়তে যাবেন আল্লাহর রাসূল! তখনো খাদিজা আছেন তাঁর সাথে! তিনিও নামায পড়ছেন আল্লাহর রাসূলের সাথে! তাঁর পেছনে! তখন দু’জনকে কেন্দ্র করে কাফির-মুশরিকরা কতো ঠাট্টা করলো, কতো বিদ্রূপ করলো, কিন্তু সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপই করলেন না খাদিজা!
এভাবেই প্রিয়নবীর সহযোগিতায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন মহীয়সী খাদিজা!
আল্লাহর রাসূলের দাওয়াতের কাজ চলতে লাগলো, আলোকিত হতে লাগলেন সত্যান্বেষী মানুষেরা। মিল্লাতে ইবরাহিমীর অনুসারীরা। মক্কার কিছু নেতৃস্থানীয় মানুষ যেমন ঈমান আনলেন, অনেক অসহায় দুর্বল মানুষও ঈমান আনলেন। দুর্বলেরা দেখলো, এই নতুন দীনেই লুকিয়ে আছে মহামুক্তির মহাপয়গাম। দাস-জীবনের বোঝা আর কতোদিন তারা বইবে? যেখানে কেবলই অমানবিকতা, নিষ্ঠুরতা। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নতুন দীনে নেই কোনো ভেদাভেদ, সবাই সমান। তারা একে একে সবাই ‘লাব্বাইক’ বলতে লাগলো।
নবীগৃহের সদস্যরাই সবার আগে সাড়া দিলেন। খাদিজার সব মেয়ে ঈমান আনলেন। কিন্তু মেয়েরা ঈমান আনলেও তাঁদের স্বামীরা ঈমান আনলো না। এতে দাম্পত্য-সংকট সৃষ্টি হলো। সে কথা আমরা একটু পরের দিকে বলছি।
অপরদিকে মক্কার নেতৃস্থানীয়রাও ঠাট্টা-বিদ্রূপে মেতে উঠলো। দীনের ব্যাপারে সন্দেহ তৈরি করতে লাগলো। দাস-গোলামদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে তাদের পূর্বের ধর্মে-মূর্তিপূজার ধর্মে ফিরে যেতে চাপ প্রয়োগ করতে লাগলো। শাস্তি দিতে লাগলো। ঈমান গ্রহণকারী মহিলা হলে-কারও স্ত্রী হলে ‘স্বামী-স্ত্রী’র সম্পর্কে ফাটল ধরানোর চেষ্টা করতে লাগলো।
খাদিজা তখন কীভাবে কী করলেন? ওই যে দুর্বল-অসহায় দাস-গোলামেরা, ইসলাম কবুল করার কারণে তাদের ওপর জুলুম-নির্যাতনের ঝড় নেমে এলো, এদের সাহায্যার্থে তিনি কী করলেন? খাদিজা এদের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেন! ঈমান আনার ‘অপরাধে’ মনিবরা যখন ওদেরকে তাড়িয়ে দিলো, কাজ করে খাওয়ার অধিকার কেড়ে নিলো, তখন খাদিজা এদের সম্পদ দিয়ে সাহায্য করলেন। আর যাদের মনিবরা কঠিন অসহনীয় নির্যাতনে পিষ্ট করছিল, তাদেরকে তিনি অর্থ-বিনিময় দিয়ে ছাড়িয়ে আনছিলেন!
খাদিজা তো আগেও অসহায়-দুর্বলদের পাশে ছিলেন, এখন আরও বেশি পাশে এসে দাঁড়ালেন! কখনো মাজলুমকে অর্থ-সাহায্য দিচ্ছেন! কখনো ক্ষুধার্তকে খাবার দিচ্ছেন! কখনো আবার বিপদগ্রস্তের পাশে দাঁড়াচ্ছেন!
এভাবে তাঁর বাড়িটাই এখন হয়ে উঠলো অসহায় বিপদগ্রস্তের আপন ঠিকানা! মাজলুমের আশ্রয়স্থল! এই জিহাদে-এই সেবায় তিনি ছিলেন অক্লান্ত! উদার দানশীলা! এই জিহাদের তীব্রতা যতো বাড়ে তাঁর আনন্দও ততো বাড়ে! এই জিহাদে শরীক হতেই তো তিনি দিনের পর দিন.. বছরের পর বছর স্বপ্ন দেখে এসেছেন! কিন্তু মাঝে মাঝেই একটা চিন্তা বরং একটা স্বপ্ন তাঁর মনে উকি দেয়। তাঁর বুকটায় থেকে-থেকে তা ঘুরে বেড়ায়! তখন আল্লাহর দরবারে তিনি হাত তোলেন। হে আল্লাহ! আমার স্বপ্ন কি বাস্তবায়িত হবে?
খাদিজার বয়স তো আর কম হয় নি! এ বয়সে সন্তান সাধারণত হয় না! মেয়েদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে তিনি ভাবেন—আহা! ওদের যদি একটা ভাই হতো!! কখনো প্রিয় স্বামীর দিকে তাকিয়ে তামান্না করেন—একটি ছেলেসন্তান হলে কতো আশা-স্বপ্ন বাসা বাঁধতো এ-বুকে! আকাশের মালিক চাইলে কী-না হয়! খাদিজা আকাশের মালিকের কাছেই পেশ করতে লাগলেন মনের সকল আকুতি! বুকভরা আশা—এ-ইচ্ছে আল্লাহ পূরণ করবেনই! তাঁর কতো আশাই তো আল্লাহ একের পর এক পূর্ণ করেছেন!
নবী-স্ত্রী হতে চেয়েছিলেন, হয়েছেন! ইসলামের পথে-দাওয়াতের রাস্তায় সব উৎসর্গ করতে চেয়েছিলেন, করেছেন! আল্লাহ তাঁর সব আশা পূর্ণ করেছেন! এ-আশাও তিনি পূর্ণ করবেন! তিনিই তো একমাত্র আশা পূরণকারী!
খাদিজার আনন্দের কোনো সীমা নেই, তাঁর গর্ভে সন্তান! এ-সন্তান যদি হয় পুত্র সন্তান, কী দিয়ে মাপবেন তিনি মনের আনন্দ?
প্রসবকালে আল্লাহর নবী পাশেই ছিলেন! যখন তিনি জানতে পারলেন—এসেছে কাঙ্ক্ষিত পুত্রসন্তান, তাকালেন পূর্ণ দৃষ্টিতে, ভালোবাসায় মমতায় উচ্ছলিত হয়ে! বললেন আনন্দঘন কণ্ঠে:
—আবুল কাসেম! কী নাম রাখবো ছেলের?
আনন্দে খুশিতে খাদিজা আর কথা বলতে পারলেন না, চোখে পানি চলে এলো! হাত দিয়ে পানি মুছলেন তিনি! আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মমতাভরে বললেন:
—এর নাম আবদুল্লাহ বিন মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ! ও তাহির (পবিত্র)! ও তায়্যিব (উত্তম)! ও তো ইসলামের কোলে জন্ম নিয়েছে!! ইসলামপূর্বকালে যারা জন্মেছে, ওদের সবাইকে এ ছাড়িয়ে গেছে!
খাদিজার চোখে আনন্দ-মুখে আনন্দ! আল্লাহর রাসূলের চোখে আনন্দ-মুখে আনন্দ! সারা মহলে আনন্দ! প্রিয়জনের উষ্ণ অভিনন্দনে গমগম করতে লাগলো সারা বাড়ি! খাদিজা দানের হাত খুলে দিলেন! কতোজনকে কতো কী দিলেন!
কিন্তু আল্লাহ চাইলেন অন্য কিছু! কে ঠেকায় তাঁর চাওয়া? কার আছে সাধ্য? কিছুদিন পরই আবদুল্লাহ চলে গেলেন! কোন সে হিকমতের (আল্লাহর প্রাজ্ঞোচিত সিদ্ধান্তের) কারণে আল্লাহ আবদুল্লাহকে নিয়ে গেলেন নিজের কাছে, তা আল্লাহই ভালো জানেন! হাসিভরা গৃহে নেমে এলো শোক-স্তব্ধতা! মেয়েদের চোখে-মুখে ছেয়ে আছে গভীর শোকছায়া! শোক-বিহ্বল খাদিজার চোখে ছলছল করছে শোকের অশ্রু! তাঁর কাছে এসে আল্লাহর রাসূল বসলেন! প্রিয় হারানোর বেদনায় কাঁপা-কাঁপা কণ্ঠে তাঁকে সান্ত্বনা দিলেন:
—আল্লাহ তোমার মঙ্গল ও কল্যাণ চান! আল্লাহ চান নি তুমি হবে কাসেম বা আবদুল্লাহর মা! তিনি চাইছেন তুমি হও সবার মা-উম্মুল মু'মিনীন!! খাদিজা! এ উপাধি কি তোমাকে অনেক অ-নেক বেশি আনন্দ দেবে না?!
আল্লাহর রাসূলের মধুময় সান্ত্বনার পরশে খাদিজার শোক-হৃদয় শান্ত হলেও চোখটা বুঝি শান্ত হলো না! ফোঁটা-ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগলো! আল্লাহর নবী মমতাভরে নিজ হাতে তা মুছে দিতে লাগলেন! আর বলতে লাগলেন:
—খাদিজা! পরকাল! পরকাল তো দুনিয়া থেকে অনেক উত্তম!!
এরপর আল্লাহর রাসূল তিলাওয়াত করলেন এই আয়াত—
‘নিশ্চয়ই পরকাল দুনিয়া থেকে উত্তম! তোমার পালনকর্তা সত্বরই তোমাকে দান করবেন, তখন হবে তুমি সন্তুষ্ট।’ (সূরা দুহা)
এ আয়াত খাদিজার শোকতপ্ত হৃদয়ে শীতল বারি হয়ে বর্ষিত হলো! তিনি মেনে নিলেন আল্লাহর ফায়সালা—রাসূলের সান্ত্বনা-বৃষ্টিতে ভিজে-ভিজে শীতল হয়ে.. আশ্বস্ত হয়ে.. প্রশান্ত হয়ে!
আল্লাহর রাসূল খাদিজাকে আরও বললেন:
—খাদিজা! আমরা তো ফেরতযোগ্য ধারবস্তু! যে-কোনো মুহূর্তে আমাদের ফেরত যেতে হবে আল্লাহর কাছে! সুতরাং ওঠো! জিহাদের জন্যে প্রস্তুত হও! আল্লাহকে তো তুমি এমন প্রতিশ্রুতিই দিয়েছো! পথ অনেক দীর্ঘ! অনেক দুর্গম!!
📄 হক বাতিলের লড়াই
এখন ইসলামের গোপন দাওয়াতকাল চলছে। গোপনে গোপনে দাওয়াত চললেও মক্কার নেতৃস্থানীয়রা শুরু থেকেই চোখ রাখছিলো। এর গতিবিধি লক্ষ রাখছিলো। এর অনুসারীদের প্রতি ঠাট্টা-বিদ্রূপের বাণও ছুঁড়ে দিচ্ছিলো। আল্লাহর রাসূল এই নেতৃস্থানীয়দের প্রকাশ্যে দাওয়াত দেন নি এ পর্যন্ত। লোক দেখে-দেখে তিনি গোপনেই দাওয়াত দিয়ে যাচ্ছিলেন। সত্যের তালাশে-থাকা মানুষ একে একে সাড়া দিতে লাগলেন আল্লাহর রাসূলের দাওয়াতে। এদের মধ্যে আছেন যেমন মক্কার বিশিষ্টজন তেমনি আছেন মক্কার অবহেলিত নির্যাতিত নিপীড়িত দাস-গোলামেরা। মুসলমানদের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়তে লাগলো। একবার যে ইসলামের আলোর ভুবনে প্রবেশ করেছে সে আর পূর্বধর্মের কিংবা কুফরির অন্ধকারে ফিরে যাচ্ছে না।
আলোর দেখা পাওয়ার পর কে চায় আবার অন্ধকারে ফিরে যেতে? কেউ চায় না! শত ঠাট্টা-বিদ্রূপ ও নির্যাতনের মুখেও না! ইসলাম গ্রহণকারীদের সংখ্যা যতো বাড়ে খাদিজার গৃহ-আঙিনায় মানুষের ভিড়ও ততো বাড়ে। কেউ আসে সাহায্যের আশায়-অনুগ্রহ প্রাপ্তির বাসনায়। কেউ আসে অভাব মোচন কিংবা প্রয়োজন পূরণের প্রত্যাশায়। খাদিজা সবাইকে স্বাগত জানান। হাত খুলে দিয়ে যান। যার যা প্রয়োজন-সব পূরণ করে যান। সবাই যেনো তাঁর সন্তান। খাদিজার মনে অপার তৃপ্তি, তাঁর উদার মন যেনো বলে-এ-দিনের জন্যেই তো ছিল স-ব সঞ্চয়! সব বিলিয়ে দিতে চাই আমি ইসলামের পথে-আমার আল-আমীনের চোখের ইশারায়!
গোপন দাওয়াত বিরতিহীনভাবে চলেছে একে একে তিন বছর! কাফির-মুশরিকদের ঠাট্টা-বিদ্রূপ ও নির্যাতন এড়াতে সবাই লুকিয়ে লুকিয়ে নামায পড়তেন পাহাড়ের পাদদেশে-দারুল আরকামে। শুনতেন প্রিয় নবীর মুখে কুরআনের তিলাওয়াত। তাঁর সান্নিধ্যে.. আল্লাহর স্মরণে কাটাতেন মধুময় নীরব প্রহর।
একদিন আল্লাহর রাসূল বেশ চিন্তিত মুখে গৃহে প্রবেশ করলেন। খাদিজা মনে উদ্বেগ আর মুখে হাসি নিয়ে এগিয়ে এলেন। নরমকণ্ঠে জানতে চাইলেন:
—আল্লাহর রাসূল! সব খবর ভালো তো!
আল্লাহর রাসূল উৎকণ্ঠামাখা আওয়াজে বললেন:
—আমার রব নির্দেশ দিয়েছেন প্রকাশ্যে দাওয়াত দিতে। মক্কার নেতৃস্থানীয়দের এবং নিকটাত্মীয়দের ইসলামের দিকে ডাকতে। আল্লাহ ওহী নাযিল করেছেন, বলেছেন:
‘হে নবী! আপনি নিকট-আত্মীয়দেরকে সতর্ক করুন!’
খাদিজা শান্তকণ্ঠে বললেন:
—হে আল্লাহর রাসূল! অবশ্যই এখন নিকটাত্মীয়দের পালা! এখন তাঁদের সতর্ক করতে হবে! তাঁদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে আল্লাহর পয়গাম! তাঁদের শোনাতে হবে আসমানের বার্তা, ভাবতে হবে তা নিয়ে! কেন এরা অন্যদের মতো আপনার ডাকে সাড়া দেবে না? দিয়ে ধন্য হবে না?! এদেরই-না সবার আগে ‘লাব্বাইক’ বলা উচিত ছিল?!
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকালেন খাদিজার দিকে! তারপর বাড়ির খোলা আঙিনায় দৃষ্টি মেলে বললেনঃ
—খাদিজা! তাহলে এরা তো দাওয়াতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবে! এমনিতেই ওরা বেশ চটে আছে। ভেতরে ভেতরে ফুঁসছে! পারলে আমাদের জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে শেষ করে দেয়। ইসলামের দাওয়াতকে এরা সহ্যই করতে পারছে না! এর মধ্যে অনেকের নিকটাত্মীয়, ছেলে, দাস-গোলাম এ-দাওয়াতে লাব্বাইক বলেছেও! এরা মনে করে-ইসলামই এদের ‘বিভ্রান্ত’ করছে! দলছুট করছে! অধিকার-সচেতন করে তুলছে! সুতরাং এখন আমি যদি সরাসরি এদেরই দাওয়াত দিতে যাই, কী অবস্থা দাঁড়াবে বলো! এরা রাগে-ক্ষোভে ফেটে পড়বে! সরাসরি ইসলাম-বিরোধিতায় নেমে পড়বে! অত্যাচার-নির্যাতনের মাত্রা আরও বেড়ে যাবে! খাদিজা! তখন আমরা কি সামাল দিতে পারবো?
খাদিজা দৃঢ় কণ্ঠে বললেন:
—আপনি তো হক পথে ডাকছেন! সরল সোজা পথের দাওয়াত দিচ্ছেন! আল্লাহ আপনার সাথে আছেন! তিনি আপনাকে সাহায্য করবেনই! সুতরাং আপনার রব যা করতে বলেছেন তা নিয়ে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ুন! এদের দাওয়াত দেন! এদের সাথে কথা বলুন! কুরআন পড়ে পড়ে শোনান! নিশ্চয়ই এদের মন নরম হবে! সত্যের দিকে ঝুঁকবে! শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে! ইসলাম গ্রহণেও আশা করি ধন্য হতে পারবে! আর যদি এমনটি না-হয়, তাহলে এতো ভাবনা কিসের? আপনার রব জালিমদের ছেড়ে দেবেন না! আপনাকে সাহায্য করবেনই!
খাদিজার কথায় প্রিয় নবী বল পেলেন। শক্তি অনুভব করলেন। তখনই আলাপে আলাপে স্থির হলো যে খাদিজা সবার জন্যে রান্নার আয়োজন করবেন! আল্লাহর রাসূল সবাইকে খাওয়ার দাওয়াত দেবেন। তারপর ভোজন শেষে সবাইকে প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দেবেন!
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকালেই বেরিয়ে গেলেন দুপুরের খাবারের দাওয়াত দিতে। এদিকে খাদিজা খাবার প্রস্তুত করতে লেগে গেলেন। তাঁর মনে অনেক আশা, নিশ্চয়ই এরা আজ ইসলামের নবীকে মেনে নেবে-তাঁর ডাকে সাড়া দেবে। আর ইসলামের বিরোধিতা হবে না। ফিরে আসবে মক্কায় শান্তি স্থিতি।
দুপুরের পর পরই কুরাইশ নেতৃবৃন্দ খাদিজার গৃহে এসে জড়ো হলো। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তারা আলাপ-আলোচনা শুরু করলো। ধন-সম্পদ নিয়ে, ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে। যুদ্ধ ও শান্তি নিয়ে। আল্লাহর রাসূল কেন তাঁদের ডেকেছেন সে প্রসঙ্গ তাদের আলোচনায় এলো না। এক সুযোগে যখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের সামনে উঠে দাঁড়ালেন এবং ইসলাম ও দাওয়াত নিয়ে কথা বলতে আরম্ভ করলেন, আসল বিষয় বুঝতে পেরে তারা ভীষণ রেগে গেল! শুধু তা-ই নয়, হনহনিয়ে সবাই বেরিয়ে গেল!
আল্লাহর রাসূল ব্যথিত মনে খাদিজার কাছে গেলেন! চোখে-মুখে হতাশার ছাপ! হতাশকণ্ঠে দীর্ঘশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে বললেন খাদিজাকে:
—খাদিজা! দেখলে তো! এরা কুফরির ওপর অটল! এরা ইসলাম কবুল করবে না! কিছুতেই না! এরা মনে করে এদের ওপরে কেউ নেই, সবার ওপরে এরা!
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এদেরকে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি এদের ধন-সম্পদ থেকে অসহায়-অক্ষম-দরিদ্রের হক আদায় করবেন! তারপরও এ সম্পদলোভীরা কেমন করে তাঁর ডাকে সাড়া দিতে পারে?
খাদিজা আল্লাহর রাসূলকে সান্ত্বনা দিলেন। শান্তকণ্ঠে বললেন:
—আপনি হতাশ হবেন না! আপনি তো ভালো পথে-কল্যাণের পথে এদের ডাকছেন! এরা সুপথে এলে এদেরই লাভ! আর যদি বিপথগামীই থাকে-আপনার ডাকে সাড়া না-ই দেয়, সেজন্যে এদের অবশ্যই ভোগতে হবে কর্মফল! এখন হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আবার তাঁদের ডাকুন! আবার তাঁদের সামনে ইসলামের দাওয়াত পেশ করুন! এবার হয়তো ওদের মন গলতে পারে। কোনো বাধা তো নেই!
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দৃঢ়কণ্ঠে বললেন:
—হ্যাঁ.. আমি আবার ডাকবো, সবাইকে ডাকবো। সবার কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছে দেবো!
একদিন সকালে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরোহণ করলেন ‘সাফা’য়। তারপর উচ্চকণ্ঠে ডেকে উঠলেন সবাইকে:
—হে কুরাইশ সম্প্রদায়! হে কুরাইশ সম্প্রদায়!
‘সাফা’ পর্বতের টিলায় দাঁড়িয়ে ওই যে কে ডাকছে! সবাই ছুটে এলো! আল আমীন ডাকছে! তারা আল আমীনের কাছে জানতে চাইলো, কেন এই আহ্বান? কী বলতে চায় আল-আমীন? তখন আল আমীন জানালেন—
আল্লাহর নির্দেশ-মূর্তিপূজা ছাড়তে হবে! এক আল্লাহর ইবাদত করতে হবে! তাঁর সাথে কোনো কিছু শরীক করা যাবে না! আল্লাহ এক-লা-শরীফ!
কুরাইশ তখন জ্বলে উঠলো! সবচেয়ে বেশি জ্বলে উঠলো চাচা আবু লাহাব! আগুন-কণ্ঠে বললো:
—ধ্বংস হোক তোমার! এ জন্যে তুমি আমাদের জমা করেছো.. আমাদের আরাম নষ্ট করেছো?!
যাঁকে পাঠানো হয়েছে সারা পৃথিবীর রহমত বানিয়ে, তাঁর ধ্বংস কামনা? আপন চাচা হয়ে?! অমন কথায় আল্লাহর আরশ কেঁপে উঠলো বুঝি! আল্লাহ ওহী পাঠালেন! নবীজীর পক্ষ থেকে চাচার বিরুদ্ধে জওয়াব পাঠালেন! আল্লাহর নবী সবার সামনে উচ্চকণ্ঠে তিলাওয়াত করলেন:
‘আবু লাহাবের দু-হাত ধ্বংস হোক, ধ্বংস হোক সে নিজে। কোনো কাজে আসে নি তার ধন-সম্পদ যা সে উপার্জন করেছে। সত্বরই সে প্রবেশ করবে লেলিহান আগুনে এবং তার স্ত্রীও, সে ইন্ধনবহনকারিণী, তার গলদেশে খেজুরের ছাল-বাকলের রশি।’ (সূরা লাহাব)
আবু লাহাবকে নিয়ে নাযিল-হওয়া সূরা আবু লাহাবের জন্যে জ্বলন্ত আগুন হয়ে দেখা দিলো। সবাই যেনো এখন আবু লাহাবকে লক্ষ করে বলছে, হে জমিনের ধ্বংসকামনাকারী, শোনো এবার আকাশের ধ্বংস কামনা! সত্যের পতাকা যাঁদের হাতে তাঁদের সবার কাছেই আবদুল উয্যা এখন আবু লাহাব (প্রজ্বলিত আগুনের ধারক)। মুখে মুখে শোনা যেতে লাগলো—আবু লাহাব! আবু লাহাব!! আগুনের বাপ! আগুনের বাপ!! অপরদিকে আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামিলের ‘গুণ’-এর কথাও এ-সূরায় বর্ণিত হয়েছে ‘হাম্মালাতাল হাতাব’-ইন্ধনবহনকারিণী! এ-ও এক মুখরোচক আলোচনায় রূপ নিলো! এ-আসমানি প্রতিউত্তরে ভেসে গেলো পুরো মক্কা! জ্বলে উঠলো ‘আবু লাহাব’ আর ‘ইন্ধনবহনকারিণী’! ওরা জ্বলতে লাগলো মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিরুদ্ধে! খাদিজার বিরুদ্ধে! ঈমান কবুল-করা সাহাবীদের বিরুদ্ধে! আবু লাহাব জ্বলে আর ইন্ধনবহনকারিণী ইন্ধন যোগায়! ওরা এ-দুজনের কাছ থেকে প্রতিশোধ নিতে সুযোগ খুঁজতে লাগলো! প্রতিশোধ নেয়ার শপথ নিলো! উম্মে জামিল ও আবু লাহাবের বাড়ি ছিল খাদিজার বাড়ির পাশেই।
একদিন রাগে কাঁপতে কাঁপতে স্বামীর কাছে নালিশ করলো ‘হাম্মালাতাল হাতাব’-উম্মে জামিল! মহিলারা নাকি তাকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপে মেতে উঠেছে! কেউ দেখলেই বলছে—‘হাম্মালাতাল হাতাব’! কেউ বলছে—‘ফি জিদিহা হাবলুম মিম মাসাদ’! উম্মে জামিল ‘রাগো রাগো’ কণ্ঠে.. কাঁদো কাঁদো স্বরে বলতে লাগলো:
—শেষ, সব শেষ আমার! আজকের পর আমার আর কিছুই বাকি রইলো না! তোমাকে আমি পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিতে চাই-আমার বাড়িতে মুহাম্মদ-এর মেয়েরা বউ হয়ে থাকতে পারবে না, কিছুতেই পারবে না! খাদিজার দুই মেয়ের হয় তালাক হবে নয় আমি এই ঘর ছাড়লাম!
স্বামী আবু লাহাবও যে স্ত্রীর চেয়ে কম চটে আছে- তা নয়! তাই স্ত্রীর কথা সে ফেলে দিতে পারলো না। বরং এও যেনো তারও মনের কথা- এমন ভাব নিয়েই সে ছুটে গেলো দুই ছেলে-উতবা-উতায়বার কাছে! রোকাইয়া ও উম্মে কুলসুমের সাথে ইতিমধ্যেই এ দু-ভাইয়ের বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল। আবু লাহাব সরােষে বলে উঠলেন:
—শুনেছো, আমাকে এবং তোমাদের মাকে নিয়ে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কী সব বলেছে?! এখন শোনো, অবিলম্বে খাদিজার দুই মেয়েকে তালাক দিতে হবে!
বাবার কথা শেষ না-হতেই পেছন থেকে মা আবার চিৎকার করে উঠলো:
—খাদিজার মেয়েরা আমার ঘরে আসতে পারবে না! থাকতে পারবে না! ওদের তালাক দিতে হবে, দিতেই হবে! নইলে তোরা আমার সন্তান না-আমি তোদের মা না!
ছেলেরা মা-বাবার রুদ্রমূর্তি দেখে ভয় পেয়ে গেল! ফলে তারা যা চাইলো তা-ই হলো! তারা খাদিজার মেয়েদের তালাক দিলো!
এ-খবর যখন খাদিজার কানে গেলো আকাশের দিকে হাত তোলে তিনি শোকর আদায় করলেন! কেননা আবু লাহাব আর উম্মে জামিলের মতো জাহান্নামীদের ভেতরে কেমন করে থাকবে নবী নন্দিনীরা? নবীজীও এ সংবাদে খুশি হলেন। আল্লাহর শোকর আদায় করলেন। আবু লাহাব আর উম্মে জামিলের অনিষ্ট থেকে ওরা বেঁচে গেলো। কিন্তু আল্লাহর নবী বুঝতে পারলেন, আবু লাহাব আর উম্মে জামিলের লড়াই সবে শুরু, শেষ হতে আরও অনেক দেরি! এ লড়াই আরও ভয়াবহ রূপ নেবে! আরও হিংস্র হয়ে উঠবে! আরও অমানবিক হয়ে উঠবে! খাদিজা আশঙ্কা করলেন, উম্মে জামিল তাঁকে দিয়েই লড়াইটা শুরু করবে! তাঁর বিরুদ্ধেই চক্রান্ত শুরু করবে! নারীরা যেমন নারীদের পেছনে লাগে হিংসার উন্মত্ততা নিয়ে, ঠিক সেভাবেই!