📘 গল্পে আঁকা মহীয়সী খাদিজা রাঃ > 📄 শাদি মুবারক

📄 শাদি মুবারক


খাদিজা বিনতে খোআইলিদের গৃহ-আঙিনায় অনেক মানুষের আনাগোনা। খান্দানের সবাই ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে। একটা মুগ্ধকর অনুষ্ঠান আয়োজনের। মুহাম্মদের খানদান বনু হাশেম আর খাদিজার খান্দান বনু আসাদ-আজ সন্ধ্যায়ই মিলিত হতে যাচ্ছে। বনু হাশেমকে বনু আসাদ একটি দৃষ্টিকাড়া.. হৃদয়কাড়া নান্দনিক অনুষ্ঠান উপহার দিতে চায়! এ জন্যে এখন চলছে শেষমেশ চূড়ান্ত প্রস্তুতি।

সন্ধ্যায় এলো বনু হাশেম, সাথে আরও আত্মীয়রা। তাদের স্বাগত জানালো বনু আসাদ। সবাই বসেছেন মহলের প্রশস্ত আঙিনায়। সেখানে বিছানো হয়েছে দামি নকশি বিছানা। কারুকাজ করা বিছানা। মজলিসের মেজবান এবং মেহমান পরে-আছেন কারুকার্যমণ্ডিত আবা। মাথায় শোভা পাচ্ছে শানদার আমামা। বয়স্ক শায়খরা বসে আছেন রাজকীয় ভঙ্গিমায়। কথা বলছেন মেপে-জোখে, প্রাজ্ঞোচিত দক্ষতায়। তাদের সামনে ধোঁয়া উড়ছে সোনা-রুপার আম্বরদানি থেকে। মৌ মৌ করছে পরিবেশ। তাদের পাশেই বসে আছে ছেলেরা-ভাইয়েরা। কথা বলছে আনন্দোচ্ছলতায়। মুহাম্মদ বসে আছেন ঠিক মধ্যিখানে, আলো-ঝলমলে প্রদীপ্ত মুখাবয়বে। তাঁর কপাল থেকে যেনো আলো বের হচ্ছে ঠিকরে ঠিকরে। পাশেই বসেছেন আবু তালিব। তিনি জবাব দিচ্ছেন হাসিমুখে সবার অভিনন্দনের। খাদিজার চাচাজান-আমর ইবনে আসাদ বসেছেন আবু তালিবের কাছেই। ভীষণ হাসিখুশি দেখাচ্ছিলো তাঁকে। সবাইকে তিনি মিষ্টি হাসি বিতরণ করছিলেন।

গৃহাভ্যন্তর থেকে ভেসে আসছিলো খাদিজার বাঁদি ও বান্ধবীদের অনুচ্চ কণ্ঠের কোমল আনন্দ-গীত। আরও ভেসে আসছিলো অনুষ্ঠানকে ঘিরে খাদিজার কাছে আসা অভাবী মানুষের আনন্দ-কোলাহল। আজ তারা পাবে, অনেক পাবে। তার আগে ধুমধাম একটা খাওয়া-দাওয়া হবে। কতো কী খাবে আজ তারা!

একটু পর পরই মজলিসে পরিবেশিত হতে লাগলো শরবতের পেয়ালা। নানান রকম ফলের রেকাবি। যুবকেরা আরও নিয়ে এলো নানা স্বাদের মজাদার খাবার। যার যা ভালো লাগলো খেলো, তৃপ্তিভরে খেলো। কোনো কোনো শায়খ যুবকদের সঙ্গে রসিকতায় মেতে উঠলেন।

মজলিস যখন এভাবে ভরে উঠলো আবু তালিব সোজা হয়ে বসলেন। মজলিসের এদিক-ওদিক নজর বোলালেন। তারপর আনন্দভরে বললেন:
—সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, তিনিই তো আমাদের ইবরাহীমের বংশে জন্ম দিয়েছেন! ইসমাঈলের গর্বিত সন্তান বানিয়েছেন! আমাদের আরও দিয়েছেন তিনি কা'বাঘর রক্ষণাবেক্ষণের দুর্লভ গৌরব ও সম্মান! হারামের সেবা করার ভাগ্যও তাঁরই দান! তিনি আমাদের আরও দান করেছেন ন্যায়ভিত্তিক শাসন ও বিশ্বস্ততার সম্মান!
কুরাইশ সম্প্রদায়! এই যে আমার ভাতিজা মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ! ও খাদিজা বিনতে খোআইলিদ-এর প্রতি আগ্রহী। তাঁর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে চায়। অনুরূপ খাদিজা বিনতে খোআইলিদও তা-ই চান। আমার ভাতিজার ধন-সম্পদ কম, কিন্তু সে তো বিলীয়মান ছায়া-এই আছে এই নেই! বুদ্ধিতে আভিজাত্যে আমার ভাতিজার জুড়ি নেই। ...

আবু তালিব বলে যাচ্ছিলেন, সবাই নিবিড় নীরবতায় সাগ্রহে শুনে যাচ্ছিলো। তাঁর বক্তব্যের সাথে সম্মতিসূচক মাথা নাড়ছিলো। মুহাম্মদের দিকেও হাসিমুখে দেখছিলো। চোখের ভাষায় মুহাম্মদকে লক্ষ করে ‘ধন্য ধন্য’ বলছিলো।

আবু তালিব তাঁর সংক্ষিপ্ত বক্তব্য শেষ করলেন বিবাহের প্রস্তাব উত্থাপনের মধ্য দিয়ে। এ বক্তব্যের জবাবে দাঁড়ালেন ওয়ারাকা ইবনে নওফল। তিনিও আবু তালিবের মতো মুহাম্মদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেন। এরপর দাঁড়ালেন খাদিজার চাচাজান আমর ইবনে আসাদ। দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা করলেন খাদিজাকে মুহাম্মদের সাথে বিবাহ দেওয়ার কথা। সাথে সাথে ভেসে আসতে লাগলো চতুর্মুখী হর্ষধ্বনি। গৃহ-কোণের আনন্দ-কলরব। বাঁদিরাও হলো গীতে-গীতে উচ্চকণ্ঠ। আবার এলো খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন। আবার এলো শরবতের পেয়ালা। ফল-ফলাদির সাজানো রেকাবি। এলো রঙ-বেরঙের খাবার। তৃপ্তিভরে খেলো সবাই। মন ভরে দেখলো সবাই মুহাম্মদকে। আজকের অনুষ্ঠানের মধ্যমণিকে। মক্কার মহীয়সীর মহান বরকে।

খাদিজা বিলাতে লাগলেন বান্ধবী ও অন্যদের মাঝে আনন্দঘেরা উপহারসামগ্রী। দুহাতে আরও বিলালেন তিনি দান-অনুদান। দিলেন মন ভরে সবাইকে। কেউ বঞ্চিত হলো না। কাউকেই বঞ্চিত হতে হলো না। তিনি নাফিসাসহ সব বান্ধবীদের মাঝে বিলিয়ে দিচ্ছিলেন প্রাপ্তির মিষ্টি হাসি। স্বপ্নসূর্যকে ছুঁয়ে ফেলার আনন্দরেণু!

একসময় শেষ হলো অনুষ্ঠান-পর্ব। সবাই নব-দম্পতিকে শেষ শুভেচ্ছা জানিয়ে চলে গেলো যে যার মতো। আর মুহাম্মদও চলে গেলেন! নিজের বাড়ি থেকে খাদিজার বাড়িতে!! ছোট্ট গৃহ থেকে বড় মহলে!! শুরু হলো নতুন জীবন। খাদিজা ও মুহাম্মদ! মুহাম্মদ ও খাদিজা!!

মুহাম্মদ চাইলেন খাদিজার ব্যবসার হাল ধরবেন তিনিই, শক্ত হাতে। কিন্তু খাদিজা এ কাজে তাঁর ‘স্বপ্নসূর্য’কে বিলীন হয়ে যেতে দিলেন না! খাদিজা অনুভব করলেন, মুহাম্মদ শুধু ব্যবসার জন্যে নয়, শুধু খাদিজা ও তার বাণিজ্য দেখাশোনার জন্যে নয়, শুধু মক্কার জন্যেও নয়- মুহাম্মদকে প্রয়োজন সারা পৃথিবীর। সমগ্র মানবতার। এ জন্যে মুহাম্মদকে প্রস্তুত হতে হবে। এ জন্যে তাঁকে প্রস্তুত করা হচ্ছে। কুদরতিভাবেই তাঁকে এ জন্যে গড়ে তোলা হচ্ছে।

একদিন ভোরে মুহাম্মদ কর্মচারীদের কাজে সহযোগিতা করতে যাচ্ছিলেন। খাদিজা তাকালেন মুহাম্মদের দিকে, গভীর করে তাকালেন তাঁর চেহারায়। তারপর হাসিমুখে বললেন:
—মুহাম্মদ! কোথায় যাচ্ছেন আপনি? এখনো যে সারা মক্কা ঘুমিয়ে আছে! রাতে দেখলাম জেগে ছিলেন অনেকক্ষণ। দেখেছেন আকাশ, আকাশের তারা! এখন বিশ্রাম নিলে ভালো হয় না! মক্কার কেউই তো এখনো জেগে ওঠে নি!

খাদিজার দিকে তাকিয়ে মুহাম্মদ হাসলেন, দ্যোতিত মুখে। তারপর কোমলকণ্ঠে বললেন:
—খাদিজা! কাজ যে করতেই হবে! শ্রম-সাধনা না হলে কেমনে চলবে! মানুষ চেষ্টা করে আর আল্লাহ তাওফিক দান করেন।

খাদিজা সারা মুখে মায়াবী হাসি ছড়িয়ে বললেন:
—আপনাকে এতোকিছু ভাবতে হবে না! সম্পদ তো আল্লাহ অনেক দিয়েছেন! আল্লাহর রহমতে আমরা মক্কার ভেতরে সবচেয়ে সচ্ছল। সবচেয়ে ভালো। সবচেয়ে সুখী।

জবাবে মুহাম্মদ বললেন:
—খাদিজা! আমি সম্পদ-সচ্ছলতা নিয়ে ভাবছি না! কিন্তু আমি কাজ করতে চাই! সম্পদ ও প্রাচুর্যের আনুকূল্য থাকলেও মানুষকে কাজ করতে হবে! শ্রম-সাধনাও মানুষকে ব্যয় করতে হবে, হোক সে ধনী বা অমুখাপেক্ষী। আল্লাহ মানুষকে যে কর্ম-ক্ষমতা ও স্বাস্থ্য দান করেছেন অবশ্যই তা যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে! খাদিজা! সম্পদ অস্থায়ী-বিলীয়মান ছায়া, এই আছে এই নেই! তাই সম্পদ অর্জনের একটা ক্ষেত্র ও উৎস থাকতে হবে, যাতে ব্যয় হয়ে যাওয়া সম্পদ আবার হাতে চলে আসে। পাশাপাশি নতুন উপায় নিয়েও ভাবতে হবে, ব্যবস্থা নিতে হবে। অসহায় ও দরিদ্রদের ভাগও যথাযথভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে। অর্থনৈতিকভাবে যারা দুর্বল, তাদের ভুলে গেলে চলবে না! তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে।

খাদিজা জোর দিয়ে এবার বললেন:
—না মুহাম্মদ! সশ্রম কাজে আপনাকে আমি ঝাঁপিয়ে পড়তে দেবো না! আপনি শুধু নির্দেশ দেবেন, ওরাই সব করবে। আপনি তো দেখতেই পাচ্ছেন আমার কোনো শ্রমিক-সংকট নেই। সবাই আপনার ইশারায় সাড়া দিতে প্রস্তুত। আর দূরদেশে বাণিজ্য-কাফেলায়ও আপনাকে যেতে হবে না; যাবে অন্য লোক। এ মক্কাতেই পড়ে আছে আপনার অনেক কাজ!

মুহাম্মদ হাসিমুখে জানতে চাইলেন:
—মক্কায় আমার অনেক কাজ!

খাদিজা বলিষ্ঠ কণ্ঠে বললেন:
—সারা মক্কা আপনার ন্যায়ভিত্তিক মত ও পরামর্শের মুখাপেক্ষী! সবার এখানে আপনাকে প্রয়োজন! সবাই এখানে আপনার জন্যে সেই আসন তৈরি করে দিতে প্রস্তুত, আল্লাহ যে জন্যে আপনাকে সৃষ্টি করেছেন!

মুহাম্মদ হেসে বললেন, যেতে যেতে গুদামঘরের দিকে:
—আমি চিন্তা করবো খাদিজা! সময় এখনো হয় নি! আমরা এখনো পথের শুরুতে!

এই সংলাপের আরেকটি দ্যোতিত দিক হলো: খাদিজা মুহাম্মদ সম্পর্কে ওয়ারাকা'র মাধ্যমে এবং বাস্তব দৃষ্টিতে একে একে সব জেনে নিচ্ছেন। অথচ মুহাম্মদ আগামী দিনগুলোর কোনো খবরই জানেন না। একটু স্পষ্ট করি-
খাদিজা জানেন-মুহাম্মদই আগামী দিনের নবী। কিন্তু মুহাম্মদ জানেন না। এ জন্যেই খাদিজা নতুন করে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন– আনন্দে-উত্তেজনায় ভাসতে ভাসতে। অথচ আগে কী কঠিন সংকল্প ছিলো তাঁর– বিবাহ না করার! এরপর কী ঘটলো? ঘটতে লাগলো? পাশে এসে তখন দাঁড়ালেন বান্ধবী নাফিসা। সৃষ্টি হলো ইতিহাসের এক বিস্ময়কর নতুন অধ্যায়। আগামী দিনের শ্রেষ্ঠনবী এবং শ্রেষ্ঠ মানবী মিশে গেলেন এক সাথে। বিবাহ বন্ধনে। তারপর থেকেই সবসময় আমরা মহীয়সী খাদিজাকে দেখবো– কী যত্ন করে মুহাম্মদকে ভালোবেসেছেন তিনি। তাঁর আরাম-বিশ্রাম-স্বস্তির জন্যে সে কী ব্যাকুলতা তাঁর।

📘 গল্পে আঁকা মহীয়সী খাদিজা রাঃ > 📄 আবুল কাসেম

📄 আবুল কাসেম


সময় এগিয়ে যেতে লাগলো। দিনের পর দিন। মাসের পর মাস। বছরের পর বছর। খাদিজা ও মুহাম্মদ এবং মুহাম্মদ ও খাদিজার দাম্পত্য-জীবন সুখ-শান্তিতে ভরে গেলো। খাদিজা নিজের আরাম খোঁজেন মুহাম্মদের আরামের মাঝে। এ দম্পতি এখন মক্কার আদর্শ দম্পতি। আলোকময় দম্পতি। মক্কার মানুষ মুহাম্মদকে সমীহ করে। সবার মাঝে মুহাম্মদের একটা সম্মানজনক জায়গা তৈরি হয়েছে। মুহাম্মদ কোনো মজলিসে উপস্থিত হলে সবাই সরে গিয়ে তাঁকে জায়গা করে দেয়। তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করে। কঠিন কঠিন বিষয়ে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এলেই মুহাম্মদকে তারা ডাকে। এখানে ওখানে দেখা হলেই সবাই তাঁকে মিষ্টি করে শ্রদ্ধাভরে ডাকে- ‘আল-আমীন! আল-আমীন!!’ বলে। তাঁর কাছে গচ্ছিত রাখে নিজেদের মূল্যবান সম্পদ।

খাদিজা সবই লক্ষ করেন। মক্কার নেতৃস্থানীয়দের চোখে মুহাম্মদকে যতো সম্মানিত ও বরিত হতে দেখেন খাদিজা ততোই গর্ববোধ করেন। আকাশের দিকে চেয়ে চেয়ে কামনা করেন মুহাম্মদের আরও উন্নত মর্যাদা। আরও শীর্ষস্থান। আরও সূর্য-দীপ্তি। মুহাম্মদের প্রতিটি মুহূর্ত ভরে উঠুক শান্তি, স্থিতি, স্বস্তি, প্রশান্তিতে- এ নিয়ে খাদিজার ভাবনা ও চেষ্টার কোনো অন্ত নেই। যা করলে বা যা শুনলে মুহাম্মদের বিঘ্ন ঘটতে পারে- এমন কিছুই তিনি মুহাম্মদকে করতে দেন না, শুনতে দেন না।

খাদিজা মুহাম্মদকে নিয়ে সুখের ভেতরে বাস করেন আর স্বপ্ন দেখেন- এ সুখ-সম্পর্ক আরও গভীর ও নিবিড় হওয়ার জন্যে আল্লাহ যেনো তাঁদেরকে দান করেন সন্তান!

আল্লাহ এ স্বপ্ন পূরণ করলেন! বিবাহের দ্বিতীয় বছর শেষে তাঁর কোল আলোকিত করে জন্ম নিলো-‘কাসেম’! ছোট্ট কাসেমের কান্না আর চিৎকারে কলরবময় হয়ে উঠলো তাঁদের উদ্যান! কোলে শুয়ে শুয়ে কাসেম পা নাড়ে, বড় বড় চোখে মাকে দেখে, বাবাকে দেখে, একবার ডানে তাকায়, একবার বামে তাকায়, ঘরময় কী যেনো খুঁজে ফিরে! এ মায়াকাড়া দৃশ্য দেখে মুহাম্মদের মন ভরে, চোখ ভরে! খাদিজার মন ভরে, চোখ ভরে! এ-যে অ-নে-ক কাঙ্ক্ষিত পুত্র সন্তান! পুত্র-সন্তানের জন্যে তখন আরবদের মাঝে সেকি হাহাকার চলছিলো। বিবাহের পর বিবাহ। শুধু পুত্র-সন্তানের আশায়।

খাদিজার মন তাই আনন্দে ভাসতে থাকে! পুত্র-সন্তান লাভ করাতে এখন তাঁদের সম্পর্ক আরও কোমল মধুময়! আরও সমুদ্র-গভীর!! খাদিজা এখন আর ‘মুহাম্মদ!’ বলে ডাকেন না, ডাকেন ‘আবুল কাসেম!’ বলে!

মুহাম্মদ এ উপনামে আলোড়িত হন, আনন্দে তাঁর বুকটা ভরে যায়! খাদিজার মতো অন্যরাও তাঁকে এখন এ উপনামে ডাকে! বলে- ‘আবুল কাসেম!’ খাদিজার কানে এ উপনাম মধুর মতো বাজে! মিষ্টি ঐকতান সৃষ্টি করে! যখনই তিনি অন্যদের এ নামে প্রিয় মুহাম্মদকে ডাকতে শোনেন, তখন হৃদয়ে তাঁর কী-যে আশ্চর্য-মধুর এক অনুভূতি অস্তিত্বময় হয়ে ওঠে, তা বোঝানো মুশকিল! মনটা যেনো তখন শতকণ্ঠে কলরব করে ওঠে! অসংখ্য কুসুমকলি যেনো ফুটে ফুটে সুবাস ছড়াতে থাকে!

দিনে দিনে বাড়তে লাগলো মুহাম্মদের সম্মান ও মর্যাদা। বাড়তে থাকে তাঁকে ঘিরে ভিড়। সমস্যা আসে সমাধানও চলে আসে তাঁর হাত ধরে! প্রতিদিনই তাঁর সামনে আসতো কোনো না-কোনো সমস্যা, তিনি পেশ করতেন তার সঠিক সমাধান, যে সমাধান সবাই মেনে নিতেন নির্দ্বিধায়-অকপটে। অন্যান্যদের সঙ্গে তাঁকেও বসতে হতো কুরাইশের পরামর্শকেন্দ্র-দারুন নাদওয়ায়। সেখানে তিনি শুনতেন বেশি বলতেন কম। তাঁর ভাবগম্ভীর সুচিন্তিত মত সব সময় থাকতো ন্যায়ের পক্ষে অন্যায়ের বিরুদ্ধে। মাজলুমের পক্ষে জালিমের বিরুদ্ধে। না, কারও মন রক্ষা করে তিনি কথা বলতেন না, যা বলা উচিত তা-ই বলতেন। কাছের ও দূরের কাউকেই তিনি এ ক্ষেত্রে রে'আত করে কথা বলতেন না। যে কোনো ভালো কাজে তিনি অংশ নিতেন। তা বাস্তবায়নে চেষ্টা করতেন। অন্যদেরও উদ্বুদ্ধ করতেন।

আনন্দের উপর আনন্দ! সুখের উপর সুখ! কাসেমের বয়স এক বছর যখন ছুঁইছুঁই তখনই তাঁদের ঘর আলোকিত করে জন্ম নিলো এক মেয়ে! নাম রাখা হলো যয়নাব! কী মনকাড়া হাসি, মায়া-মায়া মুখ! হাসি-হাসি চোখ। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে একবার খাদিজাকে, আরেকবার মুহাম্মদকে! খাদিজা আনন্দিত! তৃপ্ত প্রশান্ত। ছেলে হয়েছে, এখন আবার মেয়ে হয়েছে! হে আকাশের দাতা, তোমার কতো দয়া!

কিন্তু এ আনন্দ স্থায়ী হলো না। সুখের উপর হঠাৎ এলো শোকের আঘাত। কাসেম ভীষণ অসুস্থ হয়ে গেলো। বিছানা থেকে উঠতেই পারছিলো না। খাদিজা পাশে বসে রইলেন সারাক্ষণ। ওষুধ-পত্তরও আনালেন। মুহাম্মদও খাদিজার পাশে। মা-বাবা একসঙ্গে দেখেন কাসেমের ক্রমে ক্রমে নিস্তেজ হয়ে যাওয়া। না, কোনো ওষুধেই কিছু হলো না! কাসেমের অসুখ বাড়তে লাগলো, বাড়তেই লাগলো! খাদিজা অস্থির! আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন! সন্তানের আরোগ্য কামনা করেন! আহ! কী কষ্ট! চোখের সামনে মানিকটা ‘শুকিয়ে’ যাচ্ছে! কিছুই করতে পারছেন তাঁরা ওর এই কষ্টে!

খাদিজার অঢেল সম্পদ কি কোনো কাজে আসবে এ বিপদ থেকে কাসেমকে উদ্ধার করতে? না, কোনো কাজে আসছে না! কাসেম ধীরে ধীরে আরও নিস্তেজ হয়ে এলো! কতো কী খাওয়ালেন, পান করালেন! বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিলেন! ওষুধ খাওয়ালেন! কিন্তু অবস্থা ক্রমেই খারাপের দিকে যেতে লাগলো! কী কষ্ট! গাছের একটা তাজা ডাল যেনো ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাচ্ছে! রসহীন প্রাণহীন ডালটা যেনো এখন তাপে তাপে জ্বলে যাচ্ছে!

খাদিজা কাসেমের উপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তাকান প্রিয় মুহাম্মদের দিকে! তাঁর কষ্ট-ছলোছলো চোখের দিকে! দুঃখ যেনো ঝরে ঝরে পড়ছে! শিশুটা কি এভাবেই চোখের সামনে শুকিয়ে যাবে? খাদিজা মুহাম্মদের দিকে তাকান আর ভাবেন, আহা, এ কষ্ট যদি শুধু তাঁর একার হতো! হায়! কোনো ‘মু'জিযা’ এসে যদি কাসেমকে ভালো করে দিতো!

কিন্তু আল্লাহর ফায়সালা চিরকার্যকর, কাসেম চলে গেলো! খাদিজার মনে হলো— পৃথিবীটা দুলছে! তাঁর হৃদয়টা ভেঙে দু-টুকরো হয়ে গেছে! কিন্তু মুহাম্মদ আবার ভেঙে না পড়েন- সে জন্যে তিনি শক্ত হলেন, চোখের পানি নিয়ন্ত্রণ করলেন! কিন্তু একি! প্রিয় মুহাম্মদও-যে ঝরঝর করে কাঁদছেন! খাদিজা ভেজাকণ্ঠে মুহাম্মদকে সান্ত্বনা দিলেন:
—মুহাম্মদ! এটাই আল্লাহর ফায়সালা! আল্লাহর ফায়সালা কে রদ করতে পারে? আমরা কাসেমকে ধরে রাখতে কতো চেষ্টা করেছি! কিন্তু আল্লাহ তা চান নি, তাই কাসেম চলে গেছে!

এরপর দু'জনে মিলে কাসেমকে কাফনে মোড়ালেন! শেষবারের মতো বিদায় জানালেন, অশ্রুজলে বুক ভাসিয়ে! সমাহিত করলেন কবরে! তারপর ফিরে এলেন শোক-কাতরতায় আচ্ছন্ন হয়ে, কাসেমহীন নীরব গৃহে! খাদিজা আল্লাহর কাছে দু'আ করলেন, আল্লাহ যেনো বদলা দেন! আরেক কাসেম দান করে তাঁদের হৃদয়ের শোক-তরঙ্গায়িত নদীকে শান্ত করেন!

খাদিজার আরেক সন্তান যখন পেটে এলো এবং ধীরে ধীরে প্রসবকালও ঘনিয়ে এলো, তিনি মনে-প্রাণে চাইতে লাগলেন এ যেনো ছেলে হয়! কাসেমের ভাই হয়! কিন্তু কাসেমের ভাই এলো না, এলো যয়নাবের বোন-রোকাইয়া! খাদিজা আল্লাহর কাছে আবারও হাত পাতলেন! ছেলে চাইলেন! এবারও ছেলে এলো না, এলো মেয়ে-উম্মে কুলসুম! খাদিজা আরও বেশি করে আল্লাহর দিকে রুজু হলেন! ছেলে চাইতে লাগলেন! আবার যখন সময় হলো প্রসবের, জন্ম নিলেন আবারও মেয়ে! ফাতেমা! একের পর এক তিন মেয়ে! এখন খাদিজার ঘরে চার মেয়ে! মুহাম্মদ এখন চার কন্যার বাবা! যয়নাব-রোকাইয়া-উম্মে কুলসুম-ফাতেমা! এতো চাইলেন ছেলে তবুও পেলেন শুধুই মেয়ে! কী এর রহস্য?! খাদিজা দুঃখভরা চোখে তাকান প্রিয় মুহাম্মদের দিকে, কিন্তু দেখেন মুহাম্মদ মেয়ে নিয়ে খুব খুশি! তাদের নিয়ে মহাব্যস্ত! আদরে সোহাগে ভরিয়ে দেন ওদের মায়া-মায়া গাল! এখন একে কোলে নিচ্ছেন তখন ওকে কোলে নিচ্ছেন! খাদিজাও তাঁর অনুসরণ করেন! মেয়েদের আদর করেন! এভাবে কাসেম চলে যাওয়ার শোক ধীরে ধীরে হালকা হয়ে আসে।

এরপর আর সন্তান হলো না-না ছেলে, না মেয়ে। ছেলে-মেয়ে নিয়ে আর ভাবলেনও না তিনি। মুহাম্মদের চোখে তিনি যেমন ছিলেন তেমনি আছেন। বরং এখন তাঁর প্রতি মুহাম্মদ আরও বেশি মায়াদিল, স্নেহশীল! আরও বেশি সম্মানিত!

খাদিজা লক্ষ করলেন, মুহাম্মদ ক্রমেই নীরবতাপ্রিয় হয়ে উঠছেন। বেশি বেশি চিন্তামগ্ন থাকেন। প্রকৃতির কোলে ভেসে বেড়ান। সৃষ্টিলীলা নিয়ে ভাবেন। একলা বসে নীরবে আকাশের অনন্ত শূন্যতায় তাকিয়ে থাকেন, তাকিয়েই থাকেন। দিনের বেলার প্রকৃতি যেমন তাঁকে টানে রাতের বেলার প্রকৃতিও তাঁকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। তারাভরা আকাশে তাকিয়ে তাকিয়ে খুঁজে ফেরেন তিনি আল্লাহর অপার সৃষ্টিকুশলতা। পৃথিবীর চেয়ে আকাশটাই হয়ে ওঠে তাঁর কাছে অধিক প্রিয়।

এদিকে সৃষ্টির প্রতিও তাঁর টান দিনে দিনে বাড়তে লাগলো। অভাবী ও মুখাপেক্ষীদের দিয়ে যেতে লাগলেন তিনি সম্পদ-সহযোগিতা। তাঁর কাছে চেয়ে কেউ বঞ্চিত হয় নি। অসহায় দাস-গোলামদের প্রতিও তাঁর মমতা সীমাহীন। কল্যাণ, শান্তি ও ভালোবাসা- এসব নিয়েই ব্যস্ত সময় কাটে মুহাম্মদের।

খাদিজা-মুহাম্মদের দাম্পত্য-জীবনের চৌদ্দটি বছর অমন সুন্দরভাবেই কেটে গেলো। শান্তি স্থিতির ভেতরে। কোথাও ছিলো না কোনো ছন্দপতন। এ গৃহে চর্চা হতো শুধু ভালো কথা.. মিষ্টি কথা.. কল্যাণের কথা। অসার কথা ছিলো সব সময় পরিত্যাজ্য। কিছু শোনা গেলে শোনা যেতো- ‘সালাম’ ও ‘অভিবাদন’। ‘না’-এর বদলে-‘হ্যাঁ’। আরও শোনা যেতো-আহলান সাহলান-‘স্বাগতম!’ সবচেয়ে বেশি শোনা যেতো- আকাশের উদ্দেশে নিবেদিত দু'আ-বাণী! সকাতর প্রার্থনা! বিনয়-বিগলিত অশ্রু-কান্না! এসবই কেন্দ্রীভূত ছিলো এ পরিবারের মঙ্গল ও কল্যাণ কামনায়! সার্বক্ষণিক আসমানি অনুগ্রহ কামনায়!

খাদিজা লক্ষ করলেন, মুহাম্মদের বয়স যতোই চল্লিশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ততোই তাঁর মুখাবয়বে নবুওতের নূরানিয়াত ফুটে উঠছে। চল্লিশ যতো কাছে আসে এ নূরের ঝলক ততো বাড়ে! তাঁর কথায়ও সে নূর ঝরে ঝরে পড়ে। ভোরে ঘুম থেকে উঠেই তিনি খাদিজাকে বলে যান—একে একে বিস্ময়কর সব স্বপ্নের কথা। আরও বিস্ময়কর হলো দিন বা অর্ধদিন পার না-হতেই সে সব স্বপ্ন ঠিক ঠিক ফলে যাচ্ছে! মুহাম্মদ দেখেন যা স্বপ্নে- ঘটে যায় তা বাস্তবে, একেবারে অক্ষরে অক্ষরে! কী আশ্চর্য! এসব দেখে খাদিজা কি বিস্মিত হতেন, ভয় পেতেন? না, অসম্ভব! খাদিজা বরং আনন্দিত হতেন, ভীষণ আনন্দিত! কেননা, তিনি জানতেন, তাঁর স্বপ্নপুরুষ-তাঁর স্বপ্নসূর্য অচিরেই নবী হতে চলেছেন! এসব তিনি আগে থেকেই তো জানতেন!

মায়সারা তাঁকে বলেছে কতো কী! বলেছে- বাদল-ছায়ায় মুহাম্মদের সফরের কাহিনী। আরও বলেছে- সেই ‘বাহিরা রাহেবের’ বিস্ময়-কাহিনী। আরও বলেছে- বুসরার বাজারে অস্বাভাবিকভাবে বেচায়-কেনায় মুহাম্মদের বিস্ময়কর সাফল্যের কাহিনী। সুতরাং এসব শুনে মুহাম্মদের প্রতি খাদিজার গুরুত্ব বেড়ে যায়, অনেক বেড়ে যায়। খাদিজা লক্ষ করছেন যে, এখন মুহাম্মদ আগের চেয়ে আরও নির্জনতাপ্রিয় হয়ে উঠছেন। নিরিবিলি সাধনার দিকে ঝুঁকে পড়ছেন।

মক্কা থেকে ছয় মাইল দূরত্বে একটা পাহাড় আছে-নূর পর্বত বা জাবালুন নূর, সেখানে আছে হেরা গুহা। রমজান এলেই এক মাসের জন্যে হেরা গুহায় তিনি ছুটে যান নিরবচ্ছিন্ন গভীর সাধনার জন্যে। সাথে নিয়ে নিয়ে যান সামান্য পাথেয়। এই একটু যব.. একটু লবণ .. একটু তেল.. সামান্য খেজুর। দুর্লংঘ্য পথ নিচে ফেলে উঠতে হয় সেখানে। গুহায় বসে সমাহিত হয়ে যান তিনি সাধনায়। নীরব একাকিত্বের আচ্ছন্নময়তায় মিশে-একাকার হয়ে যায় তাঁর সকাল-বিকালের এবং দিবস-রজনীর প্রহরগুলো। নেই কোনো কোলাহল। মক্কার সমাজ এখানে অনুপস্থিত। মক্কার সমাজের অনাচার দুরাচারও এখানে অনুপস্থিত। এখানে নেই জুলুম। এখানে নেই প্রতারণা। নেই ছলনা। আছে কেবলই আল্লাহর কুদরতের অপার ছায়া। এই-যে সুউচ্চ পাহাড়। ওই-যে সুনীল আকাশ। সবই বলে দেয়- আল্লাহর বড়ত্বের কথা। সবই ঘোষণা করে- আল্লাহর সর্বব্যপ্ত মহিমার কথা।

সাধনার গভীরে ডুবতে ডুবতে মুহাম্মদ কুড়িয়ে নেন-কতো মণি-মুক্তা-হিরা-জহরত। রমজান শেষে ফিরে আসেন তিনি গৃহে-খাদিজার কাছে। সাধনাক্লান্ত হয়ে, শান্তির নীড়ে। খাদিজা তখন মুহাম্মদের জন্যে বিছিয়ে দেন মমতা ও ভালোবাসার ‘অনুগত ডানা’। সে ডানার উষ্ণতায় কেটে যায়- মুহাম্মদের সকল ক্লান্তি-শ্রান্তি-অবসাদ। খাদিজার মিষ্টি-মধুর নরম-কোমল কথায় ভেসে যায় হেরা গুহার একাকিত্বের সব শূন্যতা। খাদিজার মুখের বিনম্র মৃদু হাসি অনেক বাড়িয়ে দেয় মুহাম্মদের মানসিক শক্তি। আবার নতুন করে হেরা গুহায় সাধনামুখর হওয়ার পাথেয়ও যোগায় এ- মৃদু হাসি। এ-মৃদু হাসির মাঝেই তো লুকিয়ে থাকে দাম্পত্য-জীবনের সুখ-শান্তি ও হাসি-আনন্দ! স্বামীর জন্যে যারা অমন হাসি হাসতে জানে না তারা কেমন করে বলবে- আমরা ‘খাদিজার আদর্শের’ অনুসারী?! পৃথিবীতে এখন চলছে খাদিজা সংকট! কবে দূর হবে এ সংকট? সুখী দম্পতির খোঁজে এ সংকট দূর হওয়া জরুরি।

সাধনাক্লান্ত মুহাম্মদকে পাশে নিয়ে খাদিজা ভাবতে থাকেন, আহা তিনিও যেতে পারতেন যদি ওই হেরার চূড়ায়! ওখানে বসে দেখতে পারতেন যদি প্রিয় আল-আমীনের সাধনামুখর সকাল-সন্ধ্যা! গভীর রজনীর নীরব তপস্যা! দিনের আলোতে তাকিয়ে দেখতেন মক্কার ছোট ছোট চলাচল-পথ! আশপাশে ছড়িয়ে থাকা উঁচু উঁচু পাহাড়! আরও দেখতেন সুদূরের ওই তারকা-ছাওয়া আকাশ! হেরা গুহার নির্জনতায় তিনিও যদি হতে পারতেন- প্রিয়ের মতো একটুখানি আত্মসমাহিত! মক্কার চেঁচামেচি আর অহেতুক কোলাহল একদম ভালো লাগে না। একটা মাস ওখানে কাটাতে পারলে নিশ্চয়ই আলোকিত অন্তর্লোক নিয়ে ফেরা যেতো।

বছর গড়িয়ে গড়িয়ে চলে গেলো। আরেক রমজান এই এলো বলে। খাদিজা এবারও হেরা-সফরের আয়োজনে লেগে গেলেন। খাদিজার আয়োজন-তৎপরতা দেখলে মনে হবে- এ সফর যেনো মুহাম্মদের ইচ্ছেয় নয়-হচ্ছে খাদিজার ইচ্ছেয়। স্ত্রীর তোড়জোর মুহাম্মদের মনে সাহস যোগায়, উৎসাহ যোগায়। বল এনে দেয়। মুহাম্মদ আগের মতো আবার গেলেন রমজান-সাধনায় গারে হেরায়। খাদিজা এবারও প্রয়োজনীয় পাথেয় দিয়ে দিয়েছেন। সবচেয়ে বেশি দিয়েছেন নরম নরম কথা। মিষ্টি-মিষ্টি উপদেশ। অনেক অনেক স্নেহ-ব্যাকুল দু'আ।

📘 গল্পে আঁকা মহীয়সী খাদিজা রাঃ > 📄 ঈমান যখন জাগলো

📄 ঈমান যখন জাগলো


খাদিজা এখন ব্যস্ত। না, নিজেকে নিয়ে নয়। নিজের সন্তানদের নিয়েও নয়। আগের ঘরের সন্তানদের নিয়েও নয়। তাঁর গৃহের বিশেষ অতিথি ছোট্ট আলী, যায়দ (ইবনে হারিসা) কিংবা উম্মে আয়মানকে নিয়েও তাঁর বিশেষ কোনো ব্যস্ততা নেই। তাঁর বিশেষ ব্যস্ততা মুহাম্মদকে নিয়ে! যদি বলা যেতো—‘শুধু তাঁকে নিয়ে’, তাহলে কতোই-বা বেশি বলা হতো?! খাদিজার সবকিছু তো এখন কেন্দ্রীভূত প্রিয় মুহাম্মদকে ঘিরেই!

মুহাম্মদের হেরা গুহার ‘সেই দিন’ যতো কাছে আসে, খাদিজার ব্যস্ততা ততো বাড়ে। খাদিজা যেনো দিন গুনে গুনে এগিয়ে যাচ্ছেন চূড়ান্ত লগ্নের দিকে।

সময়ে সময়ে খাদিজা ছুটে যান চাচাতো ভাই ওয়ারাকার কাছে, তাকে গিয়ে বলেন—মুহাম্মদের মাঝে কী দেখলেন এবং তাঁর কণ্ঠে কী শুনলেন। ফিরে আসেন গৃহে তার কাছ থেকে আরও আশ্বাস নিয়ে .. বিশ্বাস নিয়ে .. আনন্দ নিয়ে। পাশাপাশি আগামী দিনের ত্যাগ ও কুরবানির জন্যেও তিনি নিজেকে প্রস্তুত করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে থাকেন। কেননা, ওয়ারাকা এ-ও তাঁকে বলে দিয়েছেন—সত্যের পথে সইতে হবে অনেক কষ্ট! নবীরা এসব কষ্টের ভেতরেই পথ চলেন! অনুসারীদেরও এ-কষ্টের ‘স্বাদ’ চাখতে হয়!

খাদিজা এখন মুহাম্মদময়। মুহাম্মদ যখন গৃহে তখনো মুহাম্মদ তাঁর হৃদয়ে। মুহাম্মদ যখন গারে হেরায় তখনও মুহাম্মদ তাঁর হৃদয়ে। মুহাম্মদ যখন মক্কার নেতৃস্থানীয়দের মাঝে তখনও তিনি তাঁকে হৃদয়ে গেঁথে রাখেন! যখন মুহাম্মদ গারে হেরায় থাকেন তখন কী যেনো খাদিজাকে কেবল টানে সেদিকে! একলা ঘরে তিনি আর বসে থাকতে পারেন না! ছুটে যান হেরাগুহার দিকে-মুহাম্মদের কাছে। মুহাম্মদের টানে। সে কী কষ্টের পথ! সে কী দুর্লংঘ্য পাহাড়ি ‘ধাপ’! তবুও খাদিজা চলে যান হেরা গুহায় মুহাম্মদের কাছে! হৃদয়ের ডাকে সাড়া দিয়ে! নিজের চোখে মুহাম্মদকে দেখে স্বস্তি পেতে! এরপর ফিরে আসতেন খাদিজা আবার গৃহে! মুহাম্মদকে তাঁর সাধনাস্থলে একা রেখে! মুহাম্মদ দেখতেন প্রিয়তমার ফিরে যাওয়া! আরও দেখতেন খাদিজার হৃদয়ের নম্রতা কোমলতা দয়ার্দ্রতা, যা তাঁর সাধনা-প্রহরকে পাথেয় যুগিয়ে চলেছে নীরব নিরবচ্ছিন্নতায়!

হেরা থেকে ফিরে এসে মুহাম্মদ খাদিজাকে বলতেন অনেক কথা- কিছু কিছু ভয়ের কথা। বলতেন, শূন্য মরুতে এক ধরনের ‘ভীতি জাগানিয়া’ আওয়াজ শোনার কথা। আওয়াজটা কানে এলেই হৃদয়ে তোলপাড় শুরু হতো। এসব শুনে খাদিজারও একটু ভয়-ভয় করতো। মুহাম্মদ দূরে কোথাও গেলেই খাদিজার দুশ্চিন্তা হতো। এমনকি তাঁর ফিরতে একটু দেরি হলেই খাদিজা তাঁর খোঁজে লোক পাঠাতেন। ওরা ফিরে এসে তাঁকে আশ্বস্ত করলেই তিনি স্বস্তি অনুভব করতেন।

তখন রমজান প্রায় শেষ। মুহাম্মদ গারে হেরায়। গভীর রাত। অন্ধকারে ঢাকা পড়ে আছে পাহাড়-উপত্যকা-সব। আকাশে শুধু মিটিমিটি জ্বলছে তারকা। তারারা যেনো আকাশের চোখ, তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে দূরের পৃথিবী। তারার আলোয় পাহাড়চূড়াগুলোকে মনে হচ্ছে ছায়ামূর্তির মতো, তাকিয়ে আছে একটি আরেকটির দিকে। সুনসান নিরবতা। কোথাও নেই কোনো কোলাহল। শুধু থেকে-থেকে শোনা যায় এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে ছুটে চলা শ্বাপদি কণ্ঠ। খাদিজার মনে ভয় জমতে শুরু করেছে। হেরা গুহায় ছুটে যেতে খাদিজার মন অস্থির হয়ে উঠেছে। প্রিয় মুহাম্মদের জন্যে তাঁর মন কাঁদছে। শুধু কাঁদছে। না, তিনি সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন না, করতে পারলেন না। বেরিয়ে গেলেন হেরাগুহার উদ্দেশে-সঙ্গে কয়েকজন খাদেম। দ্রুত পাহাড় বেয়ে বেয়ে তিনি ওপরে উঠতে লাগলেন। পাহাড়ি পাথরখণ্ডের ধারালো ঘর্ষণে পা-যে তাঁর রক্তাক্ত হয়ে উঠছে-সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। ক্লান্তিতে তাঁর শ্বাস-নিঃশ্বাস-যে দ্রুত ওঠানামা করতে লাগলো- সেদিকেও তাঁর কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। চলছেন আর চলছেন। একসময় পৌঁছে গেলেন গারে হেরায়।

কিন্তু একি! মুহাম্মদ-যে এখানে নেই! খাদিজার মন কেঁপে উঠলো! হাহাকার করে উঠলো! আশপাশে তাকিয়ে তিনি চিৎকার করে উঠলেন- কোথায় গেলেন তিনি! জায়গাটা-যে একেবারেই শূন্য! কোথায় তিনি?!

খাদিজা নেমে এলেন উপত্যকায়। খাদেমরা নামছে আগে আগে। সবাই মিলে খুঁজতে লাগলেন মুহাম্মদকে। ডানে-বামে-সামনে-পেছনে-সবখানে। খাদিজা ছুটে এলেন গৃহে, যদি পাওয়া যায় তাঁকে এখানে। কিন্তু না, গৃহেও ফেরেন নি মুহাম্মদ! খাদিজার দুশ্চিন্তা বাড়তে লাগলো। নেই গুহায়! নেই গৃহে! গেলেন তাহলে কোথায়?! নাকি তিনি উপত্যকাতেই! কিন্তু একটু পরই খাদেমরা ‘খাঁ খাঁ শূন্যতা’ নিয়ে ফিরে এলো। ওদের চেহারায় উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তার ছাপ। ওরা জানালো, উপত্যকাটা তন্নতন্ন করে খোঁজা হয়েছে, কিন্তু কোথাও তাঁকে চোখে পড়ে নি! খাদিজা অমন খবর শুনতে মোটেই প্রস্তুত ছিলেন না, একটা আর্তচিৎকার তাঁর বুক ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইলো। কিন্তু খাদিজা সামলে উঠলেন। তিনি হতাশ হলেন না, ভেঙে পড়লেন না। বরং খাদেমদের আবার মুহাম্মদের খোঁজে বেরিয়ে যেতে বললেন, পাহাড়ে-উপত্যকায়। ওরা সঙ্গে সঙ্গে মালিকানের হুকুম তামিল করলো, দ্রুত বেরিয়ে গেলো।

দুশ্চিন্তায়-ভয়ে অস্থির বেলা কাটাতে লাগলেন খাদিজা। কিন্তু গৃহে তাঁর মন টিকলো না। আবার হেরা গুহায় ছুটে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেন। বেরুতে যাবেন অমনি শুনলেন পদধ্বনি। দেখলেন মুহাম্মদ কাঁপতে কাঁপতে এসে গৃহে ঢুকছেন! আর কাঁপা-কাঁপা কণ্ঠে বলছেন- আমাকে কম্বল দিয়ে ঢেকে দাও! আমাকে কম্বল দিয়ে ঢেকে দাও!!

খাদিজা দ্রুত তাঁকে গিয়ে ধরলেন, বিছানায় শুইয়ে দিলেন এবং কম্বল দিয়ে ঢেকে দিলেন। খাদিজার মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ। তিনি উদ্বেগভরে নীরবে দাঁড়িয়ে রইলেন তাঁর শিয়রে!

কী হয়েছে খাদিজার মুহাম্মদের? অমন করছেন কেনো তিনি? খাদিজা কান পেতে শোনার চেষ্টা করলেন—শ্বাস-নিঃশ্বাস জারি আছে কি না!
আল-হামদুলিল্লাহ! সব ঠিক আছে!

খাদিজা মুহাম্মদের পাশেই দাঁড়িয়ে রইলেন যতোক্ষণ না নিশ্চিত বিশ্বাস হলো যে মুহাম্মদ শঙ্কামুক্ত-ভীতিমুক্ত—তাঁর কোনো সমস্যা নেই। খাদিজা আরও আশ্বস্ত হলেন যখন দেখলেন মুহাম্মদ চোখ মেলে তাকিয়েছেন! খাদিজা হাত ধরে মুহাম্মদকে বসতে সাহায্য করলেন। গায়ের কম্বলটাও সরিয়ে দিলেন। ঘামে ভিজে-যাওয়া পোশাকও বদলে দিলেন। খাদিজার নাকে এসে লাগলো ঘামের ঘ্রাণ। কী সুগন্ধিময়! মুহাম্মদের পাশে এসে বসলেন খাদিজা, তাকিয়ে রইলেন তাঁর চোখে। সে চোখে কী মায়া, কী ছায়া! সে চোখে আরও ছিলো অপার কৌতূহল, যা এই হাসিঝরা প্রশ্নে ফুটে উঠলো:
—আবুল কাসেম! কোথায় ছিলেন আপনি? আমাদের সবাইকে দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছিলেন!

মুহাম্মদ কামরার ছাদের দিকে তাকালেন! তারপর ভয়-জড়ানো কণ্ঠে বললেন:
—খাদিজা! আমার কী হবে?! আমার ভীষণ ভয় লাগছে! আমি এক আশ্চর্য দৃশ্য দেখেছি! যা দেখেছি তা নিয়ে কথা বলতে আমার সাহস হচ্ছে না–ভয়-ভয় লাগছে! ভীষণ ভয়!! এসব বললে আর মানুষ শুনলে বলবে- আমি পাগল হয়ে গেছি! খাদিজা আমি দেখেছি অবিশ্বাস্য এক দৃশ্য!

খাদিজা মৃদু হাসলেন। বললেন মমতা ঝরিয়ে:
—কী দেখেছেন আপনি-আবুল কাসেম! এতো ঘাবড়ে যাচ্ছেন-যে! এতো ভয় পাচ্ছেন কেনো? আল্লাহর কসম! আল্লাহ আপনাকে অসম্মানিত করবেন না! কিছুতেই না! আল্লাহ আপনাকে অপদস্থ করতে পারেন না! আপনি তো আত্মীয়দের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখেন। বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করেন। আপনি তো শ্রেষ্ঠ অতিথিবৎসলও! যেখানে সত্য সেখানেই আপনি। সুতরাং আপনার কোনো বিপদ হতে পারে না! আপনি যা দেখেছেন ভালোই দেখেছেন।

মুহাম্মদ এবার কথা বলতে শুরু করলেন।
—আমি হেরাগুহায় ছিলাম। দেখছিলাম রাতের সৃষ্টিলীলা। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃজনশোভা। আমার মন ফুরফুরে। আমার হৃদয় আনন্দোদ্বেল। আহা! স-ব দেখতে আমার কী-যে মজা লাগছিলো! হেরা গুহার পরিবেশটাও মধুময় হয়ে উঠলো! এ অবস্থা যখন চলছিলো তখনই ঘটলো ব্যাপারটা! তখনই দেখলাম দৃশ্যটা! আমি দেখলাম- এক কোমলদেহী মানুষকে, মোটেই তিনি অন্য মানুষের মতো নন! ভয়ে আমার অন্তরাত্মা কেঁপে কেঁপে উঠলো! আমার দেহাবয়বও কাঁপতে লাগলো! এ পাহাড়চূড়ায় তুমি ছাড়া আর কেউ তো কখনো যায় নি! আমি ভীষণ ভড়কে গেলাম! আঁতকে উঠলাম! ওই কোমল দেহের মানুষটির দিকে আমি ‘মোহাচ্ছন্নের মতো’ তাকিয়ে রইলাম! ভয়ে আমি চিৎকার করে উঠতে চাইলাম! তখনই শোনা গেলো তার কঠিন কণ্ঠ!
—মুহাম্মদ, পড়ো!
আমি ভীতকণ্ঠে জবাব দিলাম:
—আমি তো পড়তে পারি না!
আবার শোনা গেলো সেই শক্ত কঠিন আওয়াজ! পিলে চমকে-দেওয়া আওয়াজ! পাশাপাশি ওই মানুষটি এগিয়ে এসে আমাকে বুকে চেপে ধরলেন! কী কঠিন চাপ! বললেন:
—মুহাম্মদ, পড়ো!
আমি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বললাম:
—আমি পড়া জানি না!
আবার চাপ! আবার সেই কঠিন কণ্ঠ:
—মুহাম্মদ, পড়ো!
আমি ভীতকণ্ঠে বললাম:
—কী পড়বো?

আবার চাপ! আরও জোরে! পাশাপাশি ভেসে এলো সেই মানুষটির মুখে আশ্চর্য মধুকণ্ঠে:
‘পড়ো তোমার রব-এর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাটবাঁধা রক্ত থেকে। পড়ো। তোমার রব খুব দয়ালু, যিনি মানুষকে জ্ঞান দান করেছেন কলমের সাহায্যে। মানুষকে জানিয়েছেন সে কথা যা সে জানতো না।’ (সূরা আলাক)

আমি তার অনুসরণ করলাম, যা পড়তে বলেছেন তা পড়লাম! তারপর দেখলাম, আমার সামনে কেউ নেই! আমি তখন ভীষণ ভীত! ভীষণ দিশেহারা! সারাটা দেহ যেনো আমার অবশ হয়ে গেছে! আমি শক্তি সঞ্চয় করলাম! তারপর দ্রুত চূড়া থেকে নেমে আসতে লাগলাম! তারপর গৃহাভিমুখে ছুটতে লাগলাম!

বুদ্ধিমতী প্রজ্ঞাবতী খাদিজা প্রিয় মুহাম্মদের যবানি শুনে একটুও বিচলিত হলেন না, বরং মুখের ভাঁজে ভাঁজে অপার্থিব এক হাসির ঝিলিক ছড়িয়ে পড়লো তাঁর! মনে মনে বুঝি বললেন- আহ! অবশেষে আমার জীবনে উদিত হলো নবুওত-সূর্য!! আমার সেই স্বপ্নসূর্য!! এবার আমার সব স্বপ্ন পূরণ হলো! মুহাম্মদ আমার স্বামী! আমার স্বামী এখন আল্লাহর নবী!! খাদিজা হাসিমুখে মুগ্ধকণ্ঠে উচ্চারণ করলেন:
—আবুল কাসেম! কী সুন্দর মধুময় বাণী আপনাকে পড়তে বলা হয়েছে! আমার বিশ্বাস, এ কোনো মানুষের কথা নয়, হতে পারেই না!

খাদিজা জানতে চাইলেন:
—আবুল কাসেম! ওই মানুষটি কীভাবে আপনার সামনে থেকে চলে গেলেন! কোথায় চলে গেলেন?
মুহাম্মদ বললেন:
—খাদিজা! হঠাৎ আমার চোখের সামনে থেকে মিলিয়ে যাওয়ার পর আবার তাকে আমি দেখলাম! বিশাল আকৃতির! যেনো আসমান-জমিন জুড়ে তার অবস্থান! আমাকে তিনি বললেন:
—মুহাম্মদ! আমি জিবরীল আর তুমি এখন থেকে আল্লাহর রাসূল!

খাদিজার আনন্দ এবার ষোলোকলায় পূর্ণ হলো! তিনি হর্ষধ্বনি করে উঠলেন:
—আল্লাহ কতো বরকতময়! আল্লাহ কতো মহীয়ান!!

খাদিজা আনন্দাতিশয্যে প্রিয় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আবেগে জড়িয়ে ধরলেন! তাঁর মাথায় চুমু খেলেন! বললেন:
—আবুল কাসেম! সুসংবাদ! সুসংবাদ!! আপনি সেই প্রতীক্ষিত নবী ও রাসূল, যার সুসংবাদ এতোদিন মানুষের মুখে মুখে শুনে এসেছি! আপনার অপেক্ষাতেই মানুষ প্রহর গুনে চলেছে- দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর! বরং যুগের পর যুগ!

খাদিজা প্রিয় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একটু বিশ্রাম নিতে বললেন। একটু আরাম করতে বললেন। নবীজী শুয়ে পড়লেন। খাদিজা পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন। আল্লাহর রাসূলের ঘুম না-আসা পর্যন্ত তিনি দাঁড়িয়েই রইলেন। তারপর দ্রুত পোশাক বদলে বেরিয়ে গেলেন সেই ওয়ারাকার কাছে! গিয়ে সব, স-ব বললেন তাঁকে আনন্দ-গদগদ কণ্ঠে! ওয়ারাকার বয়স তো আর কম হয় নি! তবুও যুবকের মতো হর্ষধ্বনি করে উঠলেন:
—কুদ্দুস! কুদ্দুস!! খাদিজা! তোমার স্বামীই সেই নবী! তাঁর কাছে ওহী নিয়ে এসেছিলেন জিবরীল! এ-জিবরীলই এর আগে সব নবী-রাসূলের কাছে ওহী নিয়ে এসেছেন! তিনি আসমানি বার্তাবাহক! খাদিজা! এখন তোমার অনেক কাজ! সবচেয়ে বড় কাজ হলো পদে-পদে তোমার স্বামীকে দাওয়াতের কাজে সহযোগিতা করা!

ওয়ারাকা একটু থামলেন। তারপর আবার বলতে লাগলেন:
—খাদিজা! সাহাসে বুক বাঁধো! এ-পথে আছে অনেক কষ্ট! সত্যের পথ সব সময় কণ্টকাকীর্ণ! এ পথ বড়ো দীর্ঘ ও দুর্গম!

খাদিজা আনন্দে ভাসতে ভাসতে ফিরে এলেন! খাদিজা ছুটে ছুটে ফিরে এলেন! মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে-যে দিতে হবে সুসংবাদ! তাঁকে জানাতে হবে ওয়ারাকার কথা-সুসংবাদ! এসে দেখলেন প্রিয় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখনো ঘুমোচ্ছেন! তাঁর চেহারায় ভাসছে নবুওতের নূর! আসমানি ওহীর ঝলক!

কিন্তু কাঁপছেন কেনো তিনি? ঘামে-ঘামে তাঁর কপালটি-যে একেবারে ভিজে গেছে! খাদিজা একটু বিস্মিত হলেন! খাদিজা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জাগিয়ে দিতে ইচ্ছে করলেন! কিন্তু আবার ইচ্ছেটা ত্যাগ করলেন! না, ঘুমোক আল-আমীন! তাঁর ঘুম বড্ড প্রয়োজন! খাদিজা নবীজীর ঘামসিক্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে রইলেন! অপেক্ষায় বসে রইলেন এ আশায় যে এ অবস্থা এক্ষুনি কেটে যাবে! হ্যাঁ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চোখ খুলেছেন! খাদিজা নিশ্চুপ বসে রইলেন! কান পেতে রইলেন! মনে হচ্ছে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সামনের দিকে কিছু দেখছেন! একটু পর তিনি স্বাভাবিক হলেন! চোখ নিচে নামালেন! খাদিজা কোমলকণ্ঠে বললেন:
—আবুল কাসেম! একটু বিশ্রাম কি নেবেন না!

আল্লাহর রাসূল মমতা-ঝরা কণ্ঠে বললেন:
—খাদিজা! বিশ্রামের সময় নেই! এইমাত্র আমার রব জিবরীলকে পাঠিয়েছিলেন। তিনি আমাকে কাজের ময়দানে-দাওয়াতের ময়দানে ‘ঝাঁপিয়ে পড়ার’ নির্দেশ দিয়ে গেছেন! এখন মানুষকে ফেরাতে হবে মূর্তিপূজা থেকে। তাদেরকে ডাকতে হবে তাওহিদের দিকে, দিতে হবে সত্যপথের সন্ধান।

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটু থেমে বললেন:
—খাদিজা তুমি শুনবে এইমাত্র নাযিল-হওয়া আল্লাহর কালাম?
খাদিজা আনন্দে কান পাতলেন! আল্লাহর নবী তিলাওয়াত শুরু করলেন:
‘হে চাদর আবৃত! উঠে পড়ুন এবং (মানুষকে) সতর্ক করুন। আপন প্রতিপালকের মাহাত্ম্য ঘোষণা করুন। নিজের পরিধেয় বস্ত্র পবিত্র রাখুন। গোনাহ থেকে বেঁচে থাকুন। বেশি পাওয়ার আশায় কাউকে কিছু দেবেন না। আপন প্রতিপালকের সন্তুষ্টির জন্যে সবর করুন।’ (সূরা মুদ্দাসসির)

আনন্দে সৌভাগ্যে খাদিজার মন দুলে উঠলো! আল্লাহর কালাম তাঁর কানে মধু বর্ষণ করলো! প্রিয় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কণ্ঠ তাঁর মনে অনেক অ-নেক শক্তি যোগালো—আগামী দিনের ‘জিহাদে’ নিজেকে উজাড় করে দিয়ে লড়াই করার জন্যে! খাদিজা আল্লাহর রাসূলকে সুসংবাদ শোনালেন- ভয় নেই প্রিয়! সামনে আসছে শুধুই অফুরন্ত কল্যাণ! আপনাকে অভিনন্দন হে স্বামী! আল্লাহর অনুগ্রহ আপনার নিত্য সঙ্গী!

আল্লাহর রাসূল খাদিজাকে জবাবে বললেন:
—খাদিজা! আমি নবুওতের দায়িত্ব পালনের জন্যে পূর্ণ প্রস্তুত! মানুষকে ডাকবো আল্লাহর পথে.. সত্যের পথে.. সরল সঠিক দীনের পথে!

একটু চুপ থেকে আল্লাহর রাসূল বললেন:
—আমার সম্প্রদায় কি গোমরাহি থেকে ফিরে আসবে? জুলুম নিপীড়ন কি ওরা ছাড়তে পারবে? খাদিজা! আমার তো মনে হচ্ছে; ওরা আমাদের মানবে না! আমাদের কথা শুনবে না! উল্টো রুখে দাঁড়াবে! জানি না, কোথায় গিয়ে ঠেকবে আমাদের জিহাদ-সংগ্রাম!

একটু আগে আল্লাহর কালামের মধুরিমায় বিমুগ্ধ খাদিজা বললেন:
—ওয়ালি রাব্বিকা ফাসবির! আপনার রব আপনাকে যা আদেশ করেছেন তা নির্ভয়ে পালন করে যান! সেই বুক থেকে বাতিলকে বের করা তো একটু শক্ত হবেই, যে বুকে বাতিল ছড়িয়ে দিয়েছে শাখা-প্রশাখা! বিছিয়েছে শক্ত শেকড়! আপনার রব-এর কসম! যিনি আপনাকে নবী করে পাঠিয়েছেন, তিনি আপনার সাথে থাকবেন, থাকবেনই। সব সময় আপনাকে সাহায্য করবেন!

তারপর খাদিজা আনন্দপ্লাবিত উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করলেন:
—হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনাকে মানলাম, আপনাকে রাসূল হিসাবে মনে-প্রাণে বিশ্বাস করলাম! আশহাদু আন্নাকা রাসূলুল্লাহ!! আমি আপনাকে সব দিয়ে দিলাম! আল্লাহর জন্যে আমার সম্পদ ও প্রাচুর্য দিয়ে দিলাম! সব আপনার হাতে তুলে দিলাম! সত্যের পথে এসব যেভাবে চান সেভাবে খরচ করুন, বিলিয়ে দিন! অকাতরে বিলিয়ে দিন! আমার এখন কিছুই নেই! শুধু আপনিই আমার! আমার সবকিছু আপনার!!

📘 গল্পে আঁকা মহীয়সী খাদিজা রাঃ > 📄 মক্কা এখন জেগে উঠবে

📄 মক্কা এখন জেগে উঠবে


এখন ভোর। খাদিজার ঘুম ভেঙে গেছে। আল-আমীন-মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এরও ঘুম ভেঙেছে। রাতে কী আর ঘুম হয়েছে খাদিজার! একটু আগেই তো তিনি শুয়েছিলেন! তবুও মনটা ফুরফুরে! মনে হচ্ছে তিনি যেনো রাত জাগেন নি, অনেক ঘুমিয়েছেন! মনে হচ্ছে রাতভর আল-আমীনের নবী হওয়া দেখেন নি, কেবল ঘুমিয়েছেন! অথচ তিনি ঘুমান নি, কই আর ঘুমোলেন! তবুও অমন ঘুম-শেষের শান্তি ও প্রশান্তিতে মনটা ভরে আছে কেনো? আহা! কী আরামের সকাল! কী শান্তির পরিবেশ! সব কি আল-আমীনের নবী হওয়ার বরকত? অবশ্যই! অবশ্যই!!

আল-আমীন এখন গৃহে নেই, বেরিয়ে গেছেন নতুন মন নিয়ে .. নতুন চেতনা নিয়ে .. নতুন দাওয়াতের পয়গাম নিয়ে-কা'বা-চত্বরে!

আজ মনভরে আল-আমীন তাওয়াফ করলেন! কা'বা-চত্বরে তাঁর দেখা হয়ে গেলো ওয়ারাকা ইবনে নওফলের সাথে, তিনিও সকাল সকাল তাওয়াফে এসেছিলেন! আল-আমীনকে দেখে তিনি আনন্দিত হলেন! আনন্দভরা উচ্চকণ্ঠে তাঁকে অভিনন্দন জানালেন! দাওয়াতের পথে অটল-অবিচল থাকার অনেক উপদেশও দিলেন! কা'বা-চত্বরের এক জায়গায় বসে আল-আমীনকে আরও বললেন অনেক কিছু। বললেন, অনেক বাধা-বিপত্তি। আসবে অনেক ঝড়। আসবে প্রত্যাখ্যান। আসবে জুলুম-নিপীড়ন। শেষে ওয়ারাকা নবীজীর মাথায় চুমু খেলেন! বৃদ্ধ ওয়ারাকার শ্রদ্ধা-চুমুতে আল-আমীন ধন্য হলেন। ওয়ারাকাও ধন্য হলেন!

ওখানে কুরাইশের লোকজনও ছিলো। ওরাও তাওয়াফ করছিলো। কেউ কেউ ওয়ারাকার কথা শুনতে পেলো। ওয়ারাকা চলে গেলে ওরা এসে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে জানতে চাইলো, কী বিষয়ে ওয়ারাকার তাঁর সাথে কথা হচ্ছিলো। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওদের দিকে তাকালেন, তারপর দৃঢ়কণ্ঠে বললেন:
—গত রাতে আমি ওহী লাভ করেছি! তা-ই নিয়ে কথা হচ্ছিল।

কুরাইশ এ কথা শুনে মুখ-চাওয়াচাওয়ি করলো। একজন বিস্ময়ভরে বললো:
—মুহাম্মদ! শুনি, কে তোমার কাছে ওহী পাঠিয়েছে?!

আল্লাহর রাসূল দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জবাব দিলেন:
—আল্লাহ! যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন.. তোমাদের সৃষ্টি করেছেন.. আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন.. পাথর সৃষ্টি করেছেন.. বালিরাশি সৃষ্টি করেছেন.. পানি সৃষ্টি করেছেন.. বৃক্ষ-তরুলতা সৃষ্টি করেছেন! সবকিছু সৃষ্টি করেছেন! সেই আল্লাহ-ই ওহী পাঠিয়েছেন!

এসব শুনে আরেকজন হাসিতে ভেঙে পড়লো! বললোঃ
—শুনি তো, কী ওহী পাঠিয়েছেন তোমার রব তোমার কাছে?

আল্লাহর রাসূল বললেন:
—তিনি ওহী পাঠিয়ে আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন হিদায়াতের পথে মানুষকে ডাকতে.. সঠিক সরল পথের ঠিকানা বলে দিতে .. যারা অসার মূর্তিপূজা ও অপরাধে লিপ্ত রয়েছে তাদেরকে হিদায়াত ও সুপথে আনতে। তুমি দেখতে পাচ্ছো না সামাজিক অবক্ষয়? অনুভব করতে পারো না? অবশ্যই এর পরিবর্তন দরকার!

আল্লাহর রাসূলের এ কথা শুনে কুরাইশের এক লোক জোরে হেসে উঠলো! বললো:
—বুঝেছি! তুমি কী বলতে চাও, এতোক্ষণে বুঝেছি!! তুমি হতে চাচ্ছো সেই নবী যার আলোচনা কেউ কেউ করে বলে শুনেছি! কিন্তু আফসোস তোমার জন্যে হে মুহাম্মদ! তুমি তো অনেক দেরি করে ফেলেছো! তোমার আগেই অনেকে নবী হয়ে গেছে! কিন্তু বিনিময়ে ওদের জুটেছে কেবলই রাশি রাশি ঠাট্টা! ঝাঁপি ঝাঁপি বিদ্রূপ! এখন তুমি দেখছি সে পথে পা ওঠাতে চাচ্ছো, কান পেতে শুনে রাখ-তোমার কপালেও তবে আছে সেই ঠাট্টা আর বিদ্রূপ!! বলি কি; সবচেয়ে ভালো হয় এ বিপজ্জনক পথ থেকে তোমার সরে আসা! শুধু শুধু আমাদের পরিবেশটা নষ্ট করো না! তাহলে ওদের যে-পরিণতি হয়েছে তোমারও হবে সে পরিণতি। হাঁটতে হবে তোমাকে কণ্টকাকীর্ণ পথে!

এদিকে খাদিজা আর বসে থাকতে পারলেন না, শুরু করে দিলেন দাওয়াতের কাজ। প্রথমেই একত্রিত করলেন প্রিয় সখী-বান্ধবী ও সহচরীদের। বিশ্বস্ত দাসীদের। ওদের শোনালেন প্রিয় স্বামীর নবী হওয়ার সুসংবাদ! সবাই বিমুগ্ধচিত্তে উৎকর্ণ হয়ে শুনলো এ সুসংবাদ! তারপর গৃহে ফিরে বললো গিয়ে স্বামীদের .. আত্মীয়দের .. পরিচিতদের! এভাবে দ্রুতই সারা মক্কায় খবরটি ছড়িয়ে পড়লো! মুখে মুখে আলোচিত হতে লাগলো। অনেকেই বিশ্বাস করলো না, বরং ঠাট্টা-বিদ্রূপের হাসি হাসলো! অপরদিকে কেউ কেউ বিবেকের কাছে জানতে চাইলো:
—মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর মুখে অমন খবর উচ্চারিত হলে তো তাকে মোটেই হালকাভাবে নেয়া যায় না! তিনি তো আল-আমীন-চিরবিশ্বাসী! জীবনে কখনো না-তিনি মিথ্যা বলেছেন আর না আমানতের খেয়ানত করেছেন! তা ছাড়া তাঁর জীবনসঙ্গিনী খাদিজা তো ‘তাহিরা’-চিরপবিত্র! তাঁর মুখেই-বা অসত্য উচ্চারিত হবে কেমন করে? না-বোঝেই-বা তিনি স্বামীকে সত্যায়ন করবেন-এমনটাও তো মনে হয় না! খাদিজা-মুহাম্মদ-দু'জনই সত্য-বিচ্যুত বা পাগল হয়ে গেছেন-এ-কথা বিশ্বাস করাও তো সম্ভব না! এক রাতে একসঙ্গে অমন দু'জন মানুষের পাগল হওয়া অসম্ভব!

খাদিজার গৃহ-আঙিনায় ভিড় বাড়তে লাগলো। মহিলারা এসেছে মুখে-মুখে শোনা কথাটা যাচাই করতে। খাদিজা সহাস্যে সবাইকে বলতে লাগলেন ঘটনা। দৃঢ়তার সাথে সবাইকে এ-ও বলে দিলেন, তারা যা শুনেছে সব সত্য। এমনকি তিনি সমবেত মহিলাদের নাযিলকৃত কুরআনও তিলাওয়াত করে শুনিয়ে দিলেন! সবাই উৎকর্ণ নীরবতায় আচ্ছন্ন হয়ে শুনলো খাদিজার ঐশীবাণীর ব্যতিক্রমী তিলাওয়াত! সবাই নিরীক্ষণ করলো খাদিজাকে, লক্ষ করলো খাদিজার মুখের ভাঁজ ও বলার ভঙ্গি! আছে কি সেখানে কোনো অস্বাভাবিকতার ছাপ-পাগলামির চিহ্ন?! কই! চোখে পড়ছে না তো! আগে যে-খাদিজাকে তারা চিনতেন এখনো তো সে-ই খাদিজাই কথা বলছেন! আচরণে-আন্তরিকতায় .. বুদ্ধিতে-দীপ্তিতে কোনো তফাত নেই! কোনো পরিবর্তন নেই! যেই খাদিজা সে-ই খাদিজা!! বরং এখন খাদিজা আরও দীপ্তিময়ী! তাঁর কথায় আচরণে কী অপূর্ব উচ্ছলতা!

সবাই ফিরে গেলো গৃহে—রাজ্যের বিস্ময় চোখে নিয়ে! হাজারো প্রশ্ন বুকে নিয়ে—কী শুনলাম আমরা? কী দেখলাম আমরা? গৃহে ফিরে সবাই জানালো দেখে-আসা.. শুনে-আসা কথা-একে একে সব! সবাইকে! তারা শুনেছে যে-বিস্ময় নিয়ে, বলেছে আরও বেশি বিস্ময় নিয়ে! তারা দেখেছে যে মুগ্ধতা নিয়ে, বলেছে আরও অনেক বেশি মুগ্ধতা ছড়িয়ে!

না, সেদিনের পর থেকে খাদিজার গৃহ-আঙিনার ভিড় আর কমে নি, দিনে দিনে বেড়েছে, কেবল বেড়েছে! সবাই জানতে চেয়েছে, নাযিল হয়েছে কি কোনো নতুন ওহী-আসমানি বার্তা?! কিন্তু হঠাৎ তারা লক্ষ করলো, খাদিজা আগের মতো উচ্ছল না! মুখে ছাপ ফেলেছে একটা ছায়া! সে ছায়া কিছুটা দুশ্চিন্তার.. কিছুটা উদ্বেগের! কারণ ওহী বন্ধ বেশ কয়দিন হয়ে গেলো! এখন কী বলবেন খাদিজা ওদের? ওদের প্রশ্নের মুখে বেশ অস্বস্তিতেই তাঁকে পড়তে হচ্ছে। এদিকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়েছেন!

খাদিজার দুশ্চিন্তা রীতিমত উদ্বেগে রূপ নিলো! তাঁর মনে হানা দেয় এ-ভাবনাও- আল্লাহ কি তাঁর নবীকে ‘ভুলে’ গেছেন? আর কি ওহী নাযিল হবে না?! ‘নবী-পত্নী’ হওয়ার ধারাবাহিকতা কি তাহলে থেমে যাবে?! যে জন্যে তিনি সব বিলিয়ে দিয়েছেন? জান-মাল-সব?

খাদিজার এ-দুশ্চিন্তার সাথে যোগ হয় আরও বড় দুশ্চিন্তা। যখন রাসূলকে দেখেন তিনি দুশ্চিন্তায় তখন তাঁর নিজের দুশ্চিন্তা আরও অনেক বেড়ে যায়। অস্থির হয়ে পড়েন তিনি! ভুলে যান নিজের দুশ্চিন্তা। পাশে বসে রাসূলকে দিয়ে যান সান্ত্বনা। মনে করিয়ে দিতে থাকেন আল্লাহর অফুরান অনুগ্রহের কথা। আরও শুনিয়ে যান অভয়বাণী-প্রিয়! দুশ্চিন্তার কিছু নেই! আল্লাহর অনুগ্রহ অফুরান! আঁধার কেটে যাবেই! ঊষা হাসবেই! ওহী আসবেই! প্রয়োজন শুধু একটু অপেক্ষার। একটু সবরের।

কিন্তু ওহী এলো না! রাসূলের দুশ্চিন্তাও কাটলো না! কিন্তু খাদিজা ছিলেন গভীর আস্থাশীল! রাসূলের পাশে দাঁড়ালেন তিনি-কখনো দিচ্ছেন সান্ত্বনা! কখনো শোনাচ্ছেন অভয়বাণী! আর রাসূলের দুশ্চিন্তার মাত্রাটা যখন একটু বেড়ে যেতো তখন বলতেন;
—হে আল্লাহর রাসূল! দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগের কী আছে! সংকটের পাশেই তো সমাধান! কঠিনের আড়ালেই তো সহজ! নিশ্চয় এ বিরতির মাঝে (ওহী না-আসার ভেতরে) লুকিয়ে আছে কোনো হিকমত ও রহস্য!

সান্ত্বনার পাশাপাশি খাদিজা আল্লাহর কাছে দু'আও করতে লাগলেন আল্লাহ যেনো তাঁর নবীকে ভুলে না যান। ওহী যেনো বন্ধ না হয়ে যায়। নবীর দুশ্চিন্তা যেনো তড়িৎ কেটে যায়।

একদিন খাদিজা আল্লাহর রাসূলের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাঁকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। ভেঙে না পড়ার জন্যে উৎসাহ দিচ্ছেন। এর মাঝেই খাদিজা দেখলেন, প্রিয় নবীর শরীরটা কেঁপে কেঁপে উঠছে! কপাল বেয়ে বেয়ে ঘামও পড়ছে! খাদিজার মনটাও কেঁপে উঠলো! নবীজীর দিকে গভীর মমতায় উৎকণ্ঠাভরে তাকিয়ে রইলেন। না, ভয়ের কিছু নেই! নবীজী শান্ত হয়েছেন! খাদিজা কোমলকণ্ঠে উচ্চারণ করলেন :
—আবুল কাসেম! আপনার রব আপনাকে ভুলে যেতে পারেন না, কখনো না!

খাদিজার কথায় নবীজী মৃদু হাসলেন! সে হাসিতে ঝরে ঝরে পড়ছে খাদিজার প্রতি সন্তুষ্টি ও কৃতজ্ঞতা! এবার আল্লাহর নবী এইমাত্র নাযিল-হওয়া ওহী তাঁকে শোনাতে লাগলেন :
‘শপথ পূর্বাহ্নের। শপথ রাত্রির, যখন তা নিঝুম হয়। তোমার রব তোমাকে ত্যাগ করেন নি। তোমার প্রতি বিরূপও হন নি। নিশ্চয়ই পরকাল তোমার জন্যে ইহকাল থেকে উত্তম। তোমার পালনকর্তা সত্বরই তোমাকে দান করবেন, তখন হবে তুমি সন্তুষ্ট। তিনি কি পান নি তোমাকে এতিমরূপে? তখন দিয়েছেন আশ্রয়। তিনি পেয়েছেন তোমাকে পথহারা (বেখবর)। তখন দেখিয়েছেন পথ। তোমাকে পেয়েছেন নিঃস্ব অসহায়। তখন দূর করেছেন তোমার অভাব। সুতরাং তুমি এতিমের প্রতি কঠোর হয়ো না। আর যে সওয়াল করে (ভিক্ষা চায়) তাকে ধমক দিয়ো না। প্রকাশ করে যাও তোমার পালনকর্তার নেয়ামতের কথা।’ (সূরা দুহা)

খাদিজার মনে আনন্দ আর ধরে না! নবীজীর মুখের হাসি তাঁর মুখের হাসিকে আলোকিত করলো! নবীজীর মনের আনন্দ তাঁর মনের আনন্দকে বাড়িয়ে দিলো! অপেক্ষার কঠিন প্রহর শেষে সুসংবাদ এলে মনের অবস্থা কী হতে পারে-তা বোঝানো আসলেই মুশকিল!

খাদিজা এবার ভাবতে বসলেন সদ্য নাযিল হওয়া সূরার বাণী নিয়ে- আয়াত নিয়ে। আল্লাহ এ সূরায় রাসূলের সামনে তুলে ধরেছেন অনেক শিক্ষা। তাঁকে নির্দেশ দিয়েছেন কী করণীয় আর কী বর্জনীয়। আখেরাতের জন্যে তাঁকে আমল করতে বলেছেন। কেননা আখেরাত দুনিয়ার চেয়ে অনেক শ্রেষ্ঠ। অতুলনীয় উত্তম। আল্লাহ তাঁর রাসূলকে আরও মনে করিয়ে দিয়েছেন তাঁর প্রতি বর্ষিত নেয়ামতের কথা। কর্মের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ার কথা। এতিম-মিসকিনের সাথে সদয় আচরণের কথা।

এরপর খাদিজা মিষ্টি করে হাসলেন, এ সূরায় তো আছে তাঁর প্রতি ইশারাও! তিনি প্রিয় আল-আমীনের পাশে দাঁড়িয়েছেন—তা আল্লাহ পছন্দ করেছেন! এটিকে নেয়ামত হিসাবে আখ্যা দিয়েছেন, আল-আমীনের জন্যে! খাদিজার জন্যে! আল্লাহর নবী খাদিজার দিকে তাকিয়ে বললেন আনন্দ-উদ্বেল কণ্ঠে :
—খাদিজা! তোমার অনুগ্রহ অনেক! আল্লাহ তা নষ্ট করবেন না! যদিও অনুগ্রহ ও দয়ার একমাত্র উৎস আল্লাহ, তবুও তিনিই তো তোমাকে মিলিয়ে দিয়েছেন আমাকে! আমাকে তীব্র প্রয়োজনের মুহূর্তে তিনি অভাবমুক্ত করেছেন তোমার সম্পদ দিয়ে.. তোমার মন-প্রাণ দিয়ে! হ্যাঁ.. আল্লাহ এখন সেই অনুগ্রহের কথাই আমাকে মনে করিয়ে দিলেন! খাদিজা! তুমি কি শোনো নি আয়াত?

খাদিজা ছলোছলো চোখে বললেন :
—আমার জান আমার মাল-স-ব আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের জন্যে! হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আপনার দায়িত্ব পালনে ঝাঁপিয়ে পড়ুন! আল্লাহ আছেন আপনার সাথে! আমি আছি আপনার পাশে!

আল্লাহর রাসূল খাদিজাকে জবাবে বললেন:
—খাদিজা! আমি নবুওতের দায়িত্ব পালনের জন্যে পূর্ণ প্রস্তুত! মানুষকে ডাকবো আল্লাহর পথে.. সত্যের পথে.. সরল সঠিক দীনের পথে!

একটু চুপ থেকে আল্লাহর রাসূল বললেন:
—আমার সম্প্রদায় কি গোমরাহি থেকে ফিরে আসবে? জুলুম নিপীড়ন কি ওরা ছাড়তে পারবে? খাদিজা! আমার তো মনে হচ্ছে; ওরা আমাদের মানবে না! আমাদের কথা শুনবে না! উল্টো রুখে দাঁড়াবে! জানি না, কোথায় গিয়ে ঠেকবে আমাদের জিহাদ-সংগ্রাম!

একটু আগে আল্লাহর কালামের মধুরিমায় বিমুগ্ধ খাদিজা বললেন:
—ওয়ালি রাব্বিকা ফাসবির! আপনার রব আপনাকে যা আদেশ করেছেন তা নির্ভয়ে পালন করে যান! সেই বুক থেকে বাতিলকে বের করা তো একটু শক্ত হবেই, যে বুকে বাতিল ছড়িয়ে দিয়েছে শাখা-প্রশাখা! বিছিয়েছে শক্ত শেকড়! আপনার রব-এর কসম! যিনি আপনাকে নবী করে পাঠিয়েছেন, তিনি আপনার সাথে থাকবেন, থাকবেনই। সব সময় আপনাকে সাহায্য করবেন!

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00