📘 গল্পে আঁকা মহীয়সী খাদিজা রাঃ > 📄 মুখোমুখি

📄 মুখোমুখি


মুহাম্মদ চাচাজানের মুখে সব শুনে ভীষণ আনন্দিত হলেন। মক্কার উপকণ্ঠে মেষ-চরানো-জীবন থেকে এখন তাঁর যাত্রা হবে সুদূর শাম মুলুকে, খাদিজার ব্যবসা নিয়ে! এখন চাচাজানকে আগের চেয়ে অনেক বেশি সহযোগিতা করা যাবে! এখন একবার যেতে হবে খাদিজার সাথে দেখা করতে। দায়িত্ব বুঝে নিতে একদিন চাচাজানের নির্দেশে মুহাম্মদ গিয়ে উপস্থিত হলেন খাদিজার সাথে দেখা করতে। মুহাম্মদ আগে কখনো এ দিকে আসেন নি।

খাদিজার বাড়ি যেনো রাজপুরী। বিশাল দ্বিতল ভবন। অনেক মানুষ ভেতরে-বাইরে আসা-যাওয়া করছিল। কেউ বড়, কেউ ছোট। কেউ নারী, কেউ পুরুষ। কেউ বের হচ্ছে শূন্য হাতে, কেউ-বা বোঝা নিয়ে। বাঁদি ও খাদেমদের ব্যস্ত আনাগোনা ছিল চোখে পড়ার মতো। ওদের পোশাক-পরিচ্ছদ বেশ সুন্দর পরিপাটি। চেহারা যেনো নূর-ছাওয়া। খাদিজার মহলের পরিবেশ মক্কার অন্য ‘মহলের’ পরিবেশের সাথে মিলছে না। এখানে ক্রীতদাসকে ক্রীতদাস মনে হয় না, মনে হয় ওরাও যেনো বাড়ির কেউ! মুহাম্মদ ভেতরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। একটু পরই অনুমতি পেয়ে তিনি ভেতরে প্রবেশ করলেন!

সদর দরোজা পেরিয়ে তিনি একটা খোলা আঙিনায় প্রবেশ করলেন। তারপর এক খাদেম তাঁকে নিয়ে গেল একটা প্রশস্ত আলিশান কামরায়। মেঝেতে মূল্যবান ফিরাশ বিছানো। কারুকার্যময়। দেয়ালের গায়ে আঁকা সুন্দর সুন্দর নকশা। সূক্ষ্ম হাতের কারু-নৈপুণ্য।

মুহাম্মদকে বসিয়ে খাদেম চলে গিয়েছিল। মুহাম্মদ এখন একা। কামরার এক পাশে তিনি বসা। মুহাম্মদ সুন্দর কামরাটা চোখভরে দেখতে লাগলেন আর মনে মনে খাদিজার অপেক্ষা করতে লাগলেন।

বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। এইমাত্র খাদিজা প্রবেশ করেছেন। গোলগাল চেহারা। দীর্ঘদেহী। বড় বড় চোখ। গভীর মায়াময় দৃষ্টি। দীর্ঘ কেশ। গায়ের রঙ উজ্জ্বল। ঠোঁটে লেগে ছিল এক টুকরো মিষ্টি হাসি। পরে আছেন কারুকার্যময় মূল্যবান রেশমি পোশাক। পায়ে দামি চামড়ার মোজা। কানে মুক্তার দুল।

খাদিজা মুহাম্মদকে সাদর সম্ভাষণ জানালেন। মুহাম্মদ সশ্রদ্ধ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে গেলেন.। প্রতিসম্ভাষণ জানালেন.। খাদিজা মুহাম্মদকে বসতে বললেন.। নিজেও বসলেন অনেকটা দূরে.। খাদিজা ভুলেই গিয়েছিলেন–কিংবা ভুলতেই বসেছিলেন– তাঁর সেই স্বপ্নটা, যা তিনি দেখেছিলেন এই কয়বছর আগে! আর ব্যাখ্যা শুনেছিলেন চাচাতো ভাই ওয়ারাকার মুখে। কী ব্যাখ্যা?

খাদিজার আবার বিবাহ হবে! কার সাথে? একজন নবীর সাথে হবে!! মুহাম্মদকে দেখে.. মুহাম্মদকে সামনে পেয়ে.. মুহাম্মদকে নিজের মহলের ভেতরে পেয়ে খাদিজার আবার মনে পড়ে গেল সেই ভুলে-যাওয়া—প্রায় ভুলে-যাওয়া—স্বপ্নটা! এখন তাঁর মনে হচ্ছে; তিনি যেনো আছেন সেই স্বপ্নের ঘোরে! সেই স্বপ্নের মধুময় আবেশে!! এখন যেনো তিনি রয়েছেন ঘুমে। দেখছেন সেই সূর্যটাকে। এগিয়ে আসছে তাঁর গৃহপানে-আকাশের ঠিকানা ছেড়ে! সারাটা গৃহ কী আলোকময়। সেই আলো ছড়িয়ে পড়ছে এখানে-ওখানে—সবখানে! সারা পৃথিবীতে!!

খাদিজা স্বপ্নের আবেশ থেকে ফিরে এলেন। মুহাম্মদের দিকে তাকালেন। মনে হলো; এ যুবক সাধারণ কোনো যুবক নয়। এর আছে ব্যক্তিত্বের দ্যোতিত বিচ্ছুরণ। মাহাত্ম্যে ঢাকা অনন্য আত্মিক ক্ষমতা।

খাদিজা কথা বলা শুরু করলেন। বাণিজ্য-কাফেলা নিয়ে। তাঁর ব্যবসা নিয়ে। মুহাম্মদের নতুন দায়িত্ব নিয়ে। সম্ভাব্য লাভ নিয়েও তিনি কথা বললেন। তিনি মুহাম্মদকে তাঁর দায়িত্ব সুন্দর করে বুঝিয়ে দিলেন।

পথ কেমন? নিরাপত্তা আছে কি? কোনো ভয় নেই তো! আগের বাণিজ্য-কাফেলা থেকে কেমন লাভ এসেছে? পথে কোথায় কোথায় থামতে হবে? থামার পর কাজ কী হবে? নতুন করে পাথেয় সংগ্রহের প্রশ্ন আছে কি? চলার পথে ক্রয়-বিক্রয়ের কোনো ব্যাপার আছে কি? নাকি একেবারে শামে গিয়েই শুরু করতে হবে বেচা-কেনা? খাদিজা সবই বলে দিলেন একে একে মুহাম্মদকে।

মুহাম্মদ নিবিষ্টচিত্তে কান পেতে খাদিজার কথা শুনলেন। শুধু খাদিজাকেই বলতে দিলেন। খাদিজার কথা যখন শেষ, তখন দাঁড়িয়ে খাদিজার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করলেন তারপর তাঁর অনুমতি নিয়ে গৃহে ফিরে এলেন!

মুহাম্মদকে বিদায় দিয়ে এবার খাদিজা ভালো করে ভাবতে বসলেন। ভেবে ভেবে খাদিজা স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেলেন যে মুহাম্মদ সম্পর্কে এতোদিন লোকমুখে তিনি যা শুনে এসেছেন তা সবই বর্ণে-বর্ণে সত্যি। খাদিজা অনুভব করলেন, মুহাম্মদের প্রতি স্নেহ-ভালোবাসায় তাঁর হৃদয় বারবার দুলে উঠছে! তিনি সামনে বেড়ে আরও ভাবলেন- এই মুহাম্মদই কি তাঁর সেই স্বপ্নসূর্য? মুহাম্মদই সেই নবী কি না! মুহাম্মদই তাঁর ভাবী স্বামী কি না!

📘 গল্পে আঁকা মহীয়সী খাদিজা রাঃ > 📄 প্রতিজ্ঞা

📄 প্রতিজ্ঞা


কাফেলা রওয়ানা হওয়ার দিন খাদিজা মুহাম্মদের হাতে তাঁর ব্যবসায়িক পণ্য সম্ভার তুলে দিলেন। প্রয়োজনীয় উপদেশ দিলেন। তাঁর সঙ্গে দিলেন এক সুবোধ গোলাম, নাম মায়সারা। মায়সারাকে খাদিজা নির্দেশ দিলেন, মুহাম্মদের প্রতি সর্বোচ্চ খেয়াল রাখতে এবং তাঁর যে-কোনো নির্দেশ নতশিরে পালন করতে। খাদিজা মুহাম্মদকে বিদায় জানালেন। সবাইকে বিদায় জানালেন। কাফেলা দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যাওয়া পর্যন্ত তিনি তাকিয়ে রইলেন।

মুহাম্মদ আরোহণ করেছেন তাঁর বিশেষ উটটিতে। মায়সারা আছে তাঁর পাশেই আরেকটা উটে। কাফেলা এগিয়ে চলেছে মরু বিয়াবান ও বালিয়াড়ি পেরিয়ে। মুহাম্মদের বেশ লাগছিল। আনন্দে আনন্দে সময় বয়ে যাচ্ছিল। রাতের বেলা মুক্ত অবারিত আকাশের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে তিনি দেখেছেন-সৌর-সৌন্দর্য-চাঁদ-সিতারার আলোর মাহফিল। আল্লাহর অপার কুদরত। তাঁর সৃষ্টি-সুষমা। মুহাম্মদের দিবসও কাটতো এ-চিন্তায়। কী বিশাল মরু! কতো বালিরাশি! পথের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে কী বিশাল বিশাল পাহাড়! এরা জমিনের প্রহরী! জমিনকে স্থির রাখে, নড়তে দেয় না! আল্লাহর কোনো সৃষ্টিই নিরর্থক নয়।

সফরের পদে-পদে মুহাম্মদকে নতুন নতুন রূপে আবিষ্কার করছিল মায়সারা। একদিন মায়সারা দেখলো, একখণ্ড মেঘ মুহাম্মদকে ছায়া দিচ্ছে। হ্যাঁ, শুধু তাঁকেই-নাহ্! আর কাউকে নয়! মরুভূমির প্রচণ্ড সূর্যতাপে তাঁকে ছায়া দিতে কেন এই আকাশ-আয়োজন? কে এর আয়োজক? কাফেলায় তো তিনিই একা নন, আরও কতোজনই তো আছে!) কিন্তু ছায়া কেন তাহলে শুধুই তাঁকে?... বুদ্ধিমান মায়সারার বুঝতে বাকি রইলো না কেন মালিকা তাঁকে মুহাম্মদের প্রতি বিশেষ নজর রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। সারাটা গৃহ কী আলোকময়!

কাফেলা গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলেছে। খাদিজার অবসরকালকে দখল করে বসে আছে এখন সেই সূর্য-স্বপ্নের সূর্য। ওয়ারাকার ব্যাখ্যা আবার মনে পড়লো খাদিজার। ওয়ারাকা শেষনবীর যতো গুণাবলি ও বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন, সবই তো মুহাম্মদের মাঝে বিদ্যমান মনে হচ্ছে!

আত্মিক পরিচ্ছন্নতা- মুহাম্মদের চেয়ে পরিচ্ছন্ন হৃদয়ের অধিকারী আর কে আছে? সততা-বিশ্বস্ততা- মুহাম্মদের চেয়ে অধিক সৎ ও বিশ্বস্ত কেউ আছে বলে তো মনে হয় না!

হ্যাঁ, মুহাম্মদকে দেখার পর থেকেই খাদিজা হিসাব মেলাতে শুরু করেছিলেন। আশ্চর্য! কী মজা!! স-ব হিসাব ঠিক ঠিক মিলে যাচ্ছে! কোথাও কোনো গরমিল ধরা পড়ছে না! তাঁর গৃহে মুহাম্মদের আগমনের পর থেকে মনে হয়েছে– এ-ই তো সে-ই!! এই মুহাম্মদই তাঁর সেই স্বপ্নসূর্য!!

খাদিজা একলা বসে নীরবে শুধু মুহাম্মদের কথাই ভাবতে লাগলেন। তাঁকে স্বপ্নের সূর্যের সাথে তুলনা করতে লাগলেন। খাদিজার হৃদয়ে মুহাম্মদ-ভাবনা এতোটাই ‘ঝড়’ সৃষ্টি করলো যে তিনি আর সইতে পারলেন না, একবার তো তাঁর এক বান্ধবীর কাছে সে কথা বলেই দিতে চাইছিলেন। কিন্তু অনেক ভেবে-চিন্তে তা আরও কিছুদিন গোপন রাখার সিদ্ধান্ত নিলেন। আরেকটু দেখতে চান তিনি- মুহাম্মদই তাঁর প্রতীক্ষিত মানুষ কি না! মুহাম্মদই সেই স্বপ্নসূর্য কি না! মুহাম্মদই সেই নবী কি না! মুহাম্মদই তাঁর ভাবী স্বামী কি না!

কিন্তু মন মানতে চায় না! তাঁর প্রতি আকর্ষণ দিনে দিনে বাড়ছেই! কাফেলা যখন ফিরে আসার সময় ঘনিয়ে এলো মুহাম্মদের প্রতি তাঁর মন আরও ব্যাকুল হয়ে উঠতে লাগলো। কয়দিন আগেই তাঁর সংকল্পটা ছিল ‘চিরসংকল্প’— ‘বিবাহের পিঁড়িতে’ তিনি আর বসবেন না! না! না! না!

কিন্তু এখন যে সে সংকল্পের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার উপক্রম! মুহাম্মদ-প্রেমে তাঁর হৃদয় যে এখন বাঁধনহারা? খাদিজা মনের কাছে জানতে চাইলেন :

—মন! তোমার কী হয়েছে? পুরুষকে এড়িয়ে চলেছো, বিবাহ থেকে বিরত থেকেছো! এভাবে তোমার জীবন তো বেশ চলছিলো! মক্কার কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তি.. কোনো নেতা.. কোনো ঐশ্বর্যিক তোমার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে নি! অথচ এ যুবকের প্রতি তুমি ঝুঁকে পড়ছো — সীমাহীন! আসলে কী হয়েছে তোমার?!

খাদিজা আত্মবিশ্লেষণে বসলেন.। কেন এই ঝোঁক? ভেবেচিন্তে দেখলেন- এটি সাধারণ কোনো ঝোঁক নয়.। নারী-হৃদয়ে পুরুষের প্রতি স্বাভাবিক যে-ঝোঁক ও ভালোবাসা জন্ম নেয়, এটি তেমন নয়-সে ধরনের নয়! মুহাম্মদের প্রতি তাঁর যে-ঝোঁক ও ভালোবাসা– তার কারণ ও উৎস খাদিজার অজানা! খাদিজা শুধু অনুভব করতে পারছেন, মুহাম্মদ প্রচণ্ডভাবে তাঁকে আকর্ষণ করছেন! গভীরভাবে তিনি মুহাম্মদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে চলেছেন! ওয়ারাকা যদিও বলছে খাদিজার আবার বিবাহ হবে এবং স্বামী হবেন একজন নবী, কিন্তু খাদিজা বুঝতে পারছেন না কীভাবে তা হবে! এর মানে কি এই যে-মুহাম্মদের প্রতি তাঁর এই ঝোঁক বিবাহ পর্যন্ত গড়াবে আর মুহাম্মদ অচিরেই নবী হতে যাচ্ছেন?! আল্লাহ! আল্লাহ! তা-ই যদি হতো!!

খাদিজা অনেক চেষ্টা করলেন এই তোলপাড় করা অনুভূতি থেকে দূরে সরে থাকতে এবং বিশ বছর ধরে বিবাহ না-করার যে সংকল্প ছিল তার ওপর অটল থাকতে। কিন্তু তাঁর চেষ্টা কোনো ফল বয়ে আনে না, আনতে পারে না। বারবার তিনি ফিরে যান বাণিজ্য-কাফেলার স্মৃতিতে.. মুহাম্মদের ভাবনাতে। তখন আবার ফিরে আসে সেই অনুভূতি। সেই স্বপ্নসূর্য! আবার শুরু হয় হৃদয়ের তোলপাড়। আগের চেয়ে আরও বেশি করে, প্রবল আকারে। কাফেলা মক্কায় পৌঁছার দিনক্ষণ যতো এগিয়ে আসতে থাকে মুহাম্মদের ব্যাপারে তিনি কী সিদ্ধান্ত নেবেন, সে চিন্তাও ততো বাড়তে থাকে।

খাদিজার এক মন বলে, মুহাম্মদ! জলদি এসো! আর তর সইছে না.! এই যে আমি দিন গুনছি.। ক্ষণ গুনছি! খাদিজার আরেক মন বলে, মুহাম্মদ! তোমার আসতে আরও দেরি হোক.। আমি তোমার ভাবনায় আরও আচ্ছন্ন হয়ে থাকতে চাই.। তোমার ভাবনায় আরও আত্মসমাহিত হয়ে থাকতে চাই.। আহা! তোমাকে নিয়ে ভাবতে.. তোমাকে নিয়ে আচ্ছন্ন থাকতে কী মজা! কী মিষ্টি! হৃদয়-মনে পবিত্র একটা বাতাস বয়ে যায়.। দুঃখ-কষ্ট-সব দূর হয়ে যায়.

📘 গল্পে আঁকা মহীয়সী খাদিজা রাঃ > 📄 অথৈ চিন্তা এবং সবুজ থৈ

📄 অথৈ চিন্তা এবং সবুজ থৈ


খাদিজা ভাবতে লাগলেন মুহাম্মদকে নিয়ে। সেই ভবিষ্যৎ-নবীকে নিয়ে, যিনি প্রেরিত হয়ে সব অন্ধকার দূর করবেন। জালিমকে প্রতিহত করবেন। মাজলুমকে উদ্ধার করবেন। বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করবেন। কা'বা হবে আবার শান্তি ও নিরাপত্তার ঠিকানা। এখান থেকে দূর হয়ে যাবে সকল কালো। সব জুলুম-অনাচার। থাকবে না ছোট আর বড়তে কোনো ভেদাভেদ।

খাদিজার আর বুঝতে বাকি রইলো না যে সেই নবীর আগমনকাল অতি নিকটে এবং মুহাম্মদই সেই নবী। মুহাম্মদই তাঁর স্বপ্নসূর্য-ঘর আলোকিত করা.. আশপাশ আলোকিত করা.. সারা জাহান আলোকিত করা সূর্য। যে-ই মুহাম্মদকে স্বামী হিসাবে পাবে সে চিরসৌভাগ্যবতী। নবীর কাজের সহযাত্রী। সহকর্মী। নবীকে নবুওতের দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা করতে পারার সৌভাগ্য কী দিয়ে মাপা যাবে? আছে কি কোনো নিক্তি? নেই, একদম নেই! এ শুধুই এক মহাপ্রাপ্তি!

খাদিজা কেমন করে চাইবেন-চাইতে পারেন এ মহাপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হতে?

কী হবে এই অঢেল সম্পদ দিয়ে, যদি অমন সৌভাগ্য হাতছাড়া হয়ে যায়?

এ সৌভাগ্যের সামনে বিলীন হয়ে যাক খাদিজার বিপুল বাণিজ্য! খাদিজা চান না সম্পদ-বাণিজ্য, তিনি চান শুধু মুহাম্মদকে! মুহাম্মদ এখন তাঁর সব! তাঁর সম্পদ, তাঁর ব্যবসা, তাঁর সব! মুহাম্মদের পায়ের নিচে সব তিনি বিলিয়ে দেবেন, দিতে চান! দেবেনই!! আহা! সেই মহাসৌভাগ্য থেকে তিনি আর কতো দূরে?! কখন উদিত হবে তাঁর জীবনে এই মহাসূর্য? হে উদয়াচল! প্রস্তুত হও!

কিন্তু মুশকিল হলো, কেমন করে তিনি মনের কথা জানাবেন মুহাম্মদকে? কেমন করে বলবেন— আল-আমীন! আমি তোমার স্ত্রী হয়ে ধন্য হতে চাই!

খাদিজা ভাবনায় পড়ে গেলেন। এ বিষয়ে মুহাম্মদের সঙ্গে খুব দ্রুত কথা বলা দরকার! তাঁর মনের অবস্থা তো এখন এই যে এই মুহূর্তেই তিনি আল-আমীনের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ব্যাকুলতা পারলে তুলে ধরেন নিজেই, কিন্তু সে কেমন করে হবে! লজ্জা ও সংকোচ যে বাধা! আল-আমীনের মহাব্যক্তিত্ব যে বাধা! এ ব্যক্তিত্বের সামনে কোনো কথাই তো মুখে সরে না, আবার অমন কথা! না-হয় খাদিজা বললেন তাঁকে মনের কথা, কিন্তু যদি তিনি ‘না’ বলে দেন?! তখন লজ্জায় অনুশোচনায় কোথায় মুখ লুকোবেন তিনি? লোকেরাই বা কী বলবে, যখন শুনবে যে খাদিজা মুহাম্মদকে বিবাহের পয়গাম দিয়েছিলেন, কিন্তু মুহাম্মদ ‘না’ বলে দিয়েছেন! অথচ এর আগে খাদিজা কুরাইশ নেতৃবৃন্দ ও ধনী যুবকদেরকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন! বারবার!

খাদিজা ভাবতে লাগলেন, ভেবেই চললেন। অবশেষে খাদিজা একটা কিনারা পেলেন! মনে পড়লো তাঁর এক সখীর কথা! তাঁর এক বান্ধবীর কথা! তাকে সব খুলে বলা যায়! তাকে এ দায়িত্বটাও অর্পণ করা যায়! বিশ্বস্ত, খুব আমানতদার। পেটের কথা তিনি পেটেই রাখেন! হৃদয়ের কথা শোনেন হৃদয়ের কান দিয়ে!

খাদিজার আর তর সইলো না, ডেকে পাঠালেন প্রিয় নাফিসাকে!

📘 গল্পে আঁকা মহীয়সী খাদিজা রাঃ > 📄 নাফিসার অভিযান

📄 নাফিসার অভিযান


এখন রাত। আঁধারে আচ্ছন্ন পৃথিবী। নাফিসার গন্তব্য মুহাম্মদের বাড়ি। পৌঁছেই নাফিসা প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। নাফিসা দেখলেন, মুহাম্মদ গৃহে বসে আপন মনে কী যেনো ভাবছেন, মাথা নিচু করে। নাফিসা আগে কতোই তো মুহাম্মদকে দেখেছেন। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, এ যেন অন্য মুহাম্মদ, এ মুহাম্মদের সাথে যেন নাফিসার বিশেষ পরিচয় নেই।

এখন তাঁর সামনে বসে আছেন যে মুহাম্মদ তাঁর ছবিটা আঁকা যায় এভাবে- দৃষ্টিকাড়া সুন্দর চেহারা। আকর্ষণীয় মাঝারি গড়ন। সুন্দর পরিপাটি চুল, গাঢ় কালো। বড় বড় চোখ, তার উপর লম্বা ভ্রু। মুখাবয়ব যেন আলোর আধার।

নাফিসা মুহাম্মদকে সালাম ও অভিবাদন জানালেন। মুহাম্মদ মাথা ওঠালেন। তাকালেন নাফিসার দিকে। নাফিসা ‘জালালে মুহাম্মদী’ দেখে ঘাবড়ে গেলেন বুঝি-এতো সুন্দর মুহাম্মদ! মুহাম্মদও নাফিসাকে প্রতিউত্তর করলেন। কোমলকণ্ঠে বললেন:
—নাফিসা! শুভাগমন! এই মুহূর্তে তুমি!

নাফিসা হাসিমুখে বললেন:
—আমি এসেছি আপনাকে মুবারকবাদ জানাতে, যেহেতু আপনি ফিরে এসেছেন শাম থেকে নিরাপদে!

নাফিসা এরপর আশপাশে তাকালেন। দেখলেন গৃহে উম্মে আয়মান ছাড়া আর কেউ নেই! উম্মে আয়মান গৃহকর্মে ব্যস্ত। নাফিসা উম্মে আয়মানের দিকে ইশারা করে বললেন:
—ও এবং আপনি কেমন করে থাকেন এ ‘শূন্য’ গৃহে! একাকীত্ব অনুভব হয় না?!

মুহাম্মদ হাসিমুখে বললেন:
—কেমন করে এ একাকীত্ব দূর করবো? আমি তো ‘স্বল্প’ আয়ের মানুষ! চাইলেই কাউকে ঘরে আনতে পারবো না! তা ছাড়া সব মহিলাই তো ‘উপযুক্ত’ না। বিবাহ কোনো ‘খেলা’ নয়-একটা গুরুদায়িত্ব! এ দায়িত্ব পালনে চাই উপায়-উপকরণ! হ্যাঁ, উপযুক্ত নারীর উপযুক্ত মোহর আমার হাতে এলে আমি সামনে বাড়বো, ইন-শা আল্লাহ!

নাফিসা আলাপের ভালো একটা সূত্র পেয়ে গেলেন! অল্পতেই তিনি মূল কথা উপস্থাপনের সুযোগ পেয়ে গেলেন! একটু আগে যেমন সুযোগ পেয়ে গিয়েছিলেন খাদিজা। মহিমান্বিত সেই সত্তা, যিনি অমন সুন্দর সুযোগ সৃষ্টি করে দেন! সবই আল্লাহর ইচ্ছে! নাফিসা মুগ্ধচিত্তে আস্থাভরা কণ্ঠে বললেন:
—আমি যদি আপনাকে সন্ধান দিই কোনো অভিজাত ও সম্মানিত নারীর, যার রয়েছে রূপ-সৌন্দর্য, অর্থকড়ি-সব!

মুহাম্মদ না-ভেবেই বললেন:
—তাহলে অবশ্যই অনেক মোহর লাগবে?! নাফিসা! তুমি তো জানোই, প্রাচুর্যশীলাদের মোহর বেশ চড়া! কেউ চাইলেই তা উসুল করতে পারবে না! আমি পাবো তবে কোত্থেকে?!

নাফিসা আরও আনন্দিত হলেন। তিনি অনুভব করলেন, তাঁর অভিযান এই বুঝি সফল হতে চললো! আনন্দকে চাপা দিয়ে নাফিসা কৃত্রিম গাম্ভীর্য নিয়ে বললেন:
—আপনার জন্যে যদি অমন সুন্দর ও সম্ভ্রান্ত এবং কৌলিন ও পুণ্যবতী মহিলার সন্ধান আমি দিতে পারি এবং সেটা অতিরিক্ত মোহর ছাড়াই, তাহলে! সামনে বাড়বেন?!

মুহাম্মদ মিষ্টি করে হাসলেন। বললেন:
—নাফিসা! যদি অমন হতো! তুমি কি আমায় একটু বলবে, তিনি কে?

নাফিসা প্রচণ্ড উত্তেজনা অনুভব করলেন! উত্তর দেওয়ার জন্যে শক্তি সঞ্চয় করলেন! তারপর আনন্দের নীরব-প্লাবনে প্লাবিত হতে হতে বললেন:
—তিনি খাদিজা! খাদিজা বিনতে খোআইলিদ!!

মুহাম্মদ নাফিসার দিকে তাকালেন! সে দৃষ্টিতে আকুলতা! সে দৃষ্টিতে ব্যাকুলতা! আরও আছে অনেক কৃতজ্ঞতা! আরও আছে অবিশ্বাসের একটু মিশ্রণ- এ-ও কি হয়? কী করে হতে পারে!

খাদিজার প্রতি মুহাম্মদের হৃদয়-টান আছে। কিংবা সৃষ্টি হয়েছে তাঁকে দেখার পর থেকেই। কিন্তু তাই বলে এমন করে সামনে বাড়া- কেমন করে সম্ভব? হায়! তাঁর কাছে মোহরের প্রয়োজনীয় দিরহাম থাকলে অবশ্যই তিনি খাদিজাকে গিয়ে প্রস্তাব দিতেন! খাদিজার প্রতি মনটা তাঁকে বড়ো টানে! খাদিজা কতো গুণী! খাদিজা কতো মায়াবতী!

কিছুক্ষণ কেটে গেলো মুহাম্মদের- নীরব স্তব্ধতায়! তারপর নীরব মুহাম্মদ সরব হলেন! আশার আলো কণ্ঠে মাখলেন, চোখে মাখলেন! তারপর বললেন:
—কিন্তু নাফিসা! খাদিজা কি তা মানবেন? রাজি হবেন?! কে-ইবা তাঁকে জানাবে আমার ইচ্ছের কথা এবং আমার বর্তমান অবস্থার কথা?!

বার বার আলোড়িত আনন্দ-উত্তেজনা দমন করে কাঁপা আওয়াজে নাফিসা বললেন:
—আমি, হে মুহাম্মদ! আমি!! আশা করি আমি খাদিজাকে মানাতে পারবো! আশা করি আমি তাঁকে রাজি করাতে পারবো! খাদিজার মতো মহীয়সী নারীর আপনিই হতে পারেন আদর্শ বর, হে মুহাম্মদ! কেন তাহলে খাদিজা মানবেন না? বিবাহের ব্যাপারে অনীহা ও আগের অবস্থান থেকে কেন তিনি সরে আসবেন না? অবশ্যই আসবেন! অবশ্যই আমি পারবো! আমার বিশ্বাস, আপনার আগ্রহের কথা জানতে পারলে তিনি অবশ্যই ‘হ্যাঁ’ বলবেন! অবশ্যই তিনি আল-আমীনের মর্যাদা দেবেন!!

নাফিসা চলে গেলেন! এসেছিলেন খাদিজার মহল থেকে মুহাম্মদের ‘কুটিরে’! এখন ফিরে গেলেন মুহাম্মদের ‘কুটির’ থেকে খাদিজার মহলে! আসার সময় নিয়ে এসেছিলেন কিছুটা আশা, অনেক শঙ্কা! যাওয়ার সময় নিয়ে গেলেন শুধুই আশা! সবই আল্লাহর ইচ্ছা!

নাফিসার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিলো— এতো সহজে এতোকিছু হয়ে গেলো?! ইয়া আল্লাহ! এতো দ্রুত তাঁর অভিযান সফল হয়ে গেলো?! সব খাদিজার বরকত, বরং মুহাম্মদের বরকত! নাফিসা আনন্দ-প্লাবিত হয়ে খাদিজার মহলে প্রবেশ করলেন!

খাদিজা তো নাফিসার পথ চেয়েই ছিলেন। অধীর প্রতীক্ষার কঠিন কঠিন প্রহর বয়ে যাচ্ছিলো। ধীরলয়ে। কখন আসবে নাফিসা? কী নিয়ে আসবে? সুসংবাদ? আহা! তা-ই যেনো হয়! দুঃসংবাদ? না! না! না! অবশেষে নাফিসাকে আসতে দেখা গেলো! আলো-ঝলমলে নাফিসা! তাহলে কি সুসংবাদ?! এ-ই তো নাফিসার চোখ হাসছে! মুখ হাসছে! আল-হামদুলিল্লাহ!!

নাফিসা এসে বসলেন পাশে। শোনালেন অভিযান সাফল্যের মহাবার্তা! মুহাম্মদের সবুজ সংকেত বার্তা! খাদিজা নাফিসাকে জড়িয়ে ধরলেন! কৃতজ্ঞতার চুমুতে সিক্ত করলেন! আর আরেকবার পণ্যভাণ্ডার থেকে আরেকটা সেরা উপহার বেছে নিয়ে তাঁকে এগিয়ে দিলেন! দাসী-বাঁদিদের কথাও এই আনন্দঘন মুহূর্তে খাদিজা ভুললেন না, ওদেরও খুশি করলেন! রাতটা কাটলো খাদিজার স্বপ্নময় মধুময় হয়ে! এতো সুন্দর রাত কি তাঁর জীবনে আর এসেছিলো?

রাতশেষে নেমে এলো সকাল। আনন্দভরা রাতের মতোই আশাভরা সকাল। সারা পৃথিবী এখন সূর্যালোকে যেমন ঝলমল করছে খাদিজার হৃদয়-জগৎও এখন ঝলমল করছে—‘মুহাম্মদ-প্রাপ্তি’র সবুজ স্বপ্ন পূরণ হতে চলায়!

খাদিজা চাচাজানকে খবর পাঠালেন। বাবার অনুপস্থিতিতে তিনিই খাদিজার অভিভাবক। প্রিয় ভাতিজির ‘তলব’ পেয়ে যথাসময়ে চাচাজান হাজির হয়ে গেলেন। এ-আলাপ সে-আলাপের পর মজলিস যখন প্রাণময় হয়ে উঠলো তখন খাদিজা সারা মুখে গোলাপময় লজ্জার আবির ছড়িয়ে ছড়িয়ে বললেন:
—চাচাজান! এই-যে আমি আমার প্রতিজ্ঞায় অটল আছি এ ব্যাপারে আপনার খোলাখুলি মন্তব্য কী?!

চাচাজান কী আর বলবেন! একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চিন্তিত ভঙ্গিতে বললেন:
—খাদিজা! এ ব্যাপারে আমার মন্তব্য নেতিবাচক! আমার মনে হয়, তোমার বাবা বেঁচে থাকলে তিনিও আমার সাথে ভিন্নমত পোষণ করতেন না। তোমার বয়সের এক প্রাচুর্যশীলা নারী- বিবাহ থেকে দূরে থাকবে .. একাকিনী জীবন কাটিয়ে দেবে .. মক্কার সম্ভ্রান্ত নেতাদের প্রস্তাব একের পর এক ফিরিয়ে দেবে .. রাতদিন নিজের ব্যবসা নিয়ে পড়ে থাকবে-এটা আমি কী করে মেনে নিতে পারি, না কেউ মেনে নেবে?! অথচ বর এলে একাই সে তোমার এসব কাজের দায়িত্ব মাথায় তুলে নিতে পারতো, তোমাকে এতো পরিশ্রম করতে হতো না, এতো ভাবতে হতো না!

হাসিমুখে বরং অম্লানবদনে চাচাজানের কথা শুনে গেলেন খাদিজা! চাচাজানের তেতো-তেতো উপদেশ আজ কী মিষ্টি-মিষ্টি লাগছে! এবার খাদিজা সারা মুখে লজ্জার সাথে আনন্দের রাঙা আভা ছড়িয়ে বললেন:
—চাচাজান! খাদিজা যদি এখন মত বদলায় এবং বিবাহের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তাহলে আপনার বক্তব্য কী?!

চাচাজান বুঝি একটু চমকেই উঠলেন! ভাতিজিকে ভালো করে দেখলেন! তারপর বিস্মিত কণ্ঠে বললেন:
—সে যে অনেক ভালো সিদ্ধান্ত হবে রে মা! তা কি আর বলতে হয়?! তবে স্বামী হবে যে, অবশ্যই তাকে উপযুক্ত হতে হবে! কুরাইশের মধ্য থেকে কাকে তুমি বেছে নেবে, সে তোমার বিষয়টি।

খাদিজা এবার চাচাজানের কাছে জানতে চাইলেন মক্কার সবচেয়ে ভালো ‘বর’ কে হতে পারেন?

চাচাজান একটু ভেবে নিয়ে বললেন:
—খাদিজা! ভালো পাওয়া সে বড়ো মুশকিল! সবাই লোভী! কেউ আছে যৌবন পেরুনো প্রবীণ। কেউ আছে যৌবনের প্রথম ধাপে। কেউবা তাদের আশপাশে। এরা সবাই তোমার দরোজায় ধরনা দেবে! দাঁড়িয়ে থাকবে তোমার সাড়া পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা! তোমার পদতলে লুটিয়ে পড়তে পারলে তারা নিজেদের সৌভাগ্যবান মনে করবে! কিন্তু সেই বর কোথায় পাবে বলো, যে বিবাহের মর্ম বোঝে .. স্ত্রীর সম্মান বোঝে? পরিবারের স্বার্থকে বড় করে দেখে? মক্কায় এ ধরনের লোকের ভীষণ আকাল! যদি পাওয়া যায়, আমি বলবো, সে-ই মক্কার প্রকৃত নেতা! সব নেতার সেরা নেতা!!

খাদিজা বললেন:
—যদি অমন লোক পাওয়া যায়, যিনি বিবাহের মর্ম বোঝেন .. পরিবারের সম্মান ও স্বার্থও বোঝেন, কিন্তু দরিদ্র?! তাহলে আপনার রায় কী?!

চাচাজান বিস্ময় ও আনন্দের মিশেলে বলে উঠলেন:
—দরিদ্র! দরিদ্র!

একটু চুপ থেকে চাচাজান আবার বললেন:
—হোক দরিদ্র, যার এসব গুণ আছে হোক সে দরিদ্র, তবুও সে উপযুক্ত! তবুও সে সেরা! ধন-সম্পদ তো আল্লাহর হাতে! বুদ্ধিমান মানুষ যখন কাজে হাত দেয়, ঘামঝরা শ্রম দেয়, তার হাতে সম্পদ চলেই আসে! সুতরাং বর হিসাবে তাকে বেছে নিতে কোনো সমস্যা নেই! তা ছাড়া আল্লাহ তো মা, তোমাকে অনেক দিয়েছেন! আচ্ছা এখন বলো তো, কার দিকে তুমি ইশারা করছো?! কে তোমার পছন্দের ‘দরিদ্র’ মানুষটি?!!

খাদিজা সেই লজ্জা ও আনন্দের সাথে মিষ্টি করে হাসলেন! মধুকণ্ঠে উচ্চারণ করলেন:
—মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ!

চাচাজানের কণ্ঠে এখন বিস্ময় থাকলেও তা চাপা পড়ে গেলো আনন্দের নিচে:
—ইয়া আল্লাহ! চমৎকার! চমৎকার! শ্রেষ্ঠ বর! লুফে নাও অবিলম্বে!! কোনো কালক্ষেপণ নয়!!

খাদিজা বললেন:
—গত রাতে তিনি সম্মতির কথা জানিয়ে দিয়েছেন, আপনি কি রাজি, চাচাজান? আপনার অমতে আমি কিছুই করবো না!

চাচাজান বড়ো প্রীত হলেন! প্রিয় ভাতিজির জন্যে তাঁর মনটা দয়া ও দরদে ভরে উঠলো! স্নেহ-মমতায় উথলে উঠলো!
—খাদিজা! আল্লাহ তোমায় দীর্ঘ সবরের পুরস্কার দান করতে যাচ্ছেন! সবার কাছ থেকে আল্লাহ তোমাকে দূরে রেখেছেন মুহাম্মদের কাছে নেয়ার জন্যে! তোমাকে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার ও মহাদৌলত দান করার জন্যে! মা আমার! বিশ্বাস করো; মুহাম্মদের তুলনা শুধু মুহাম্মদই! অমন সোনার মানুষ মক্কায় খুঁজে পাবে না! হায়! এখন তোমার বাবা বেঁচে থাকলে কী খুশি-যে হতেন!! মা খাদিজা! আমি রাজি, তুমি প্রস্তুত হও!!

এদিকে মুহাম্মদ চাচাজান আবু তালিবকে নাফিসার আগমনের কথা জানালেন। আরও জানালেন খাদিজাকে বিবাহ করার আগ্রহের কথা। সব শুনে আবু তালিবের আনন্দের কোনো সীমা রইলো না! তিনি আনন্দে চিৎকার করে উঠলেন:
—কী বলছো তুমি ভাতিজা! খাদিজা সত্যি রাজি?!

মুহাম্মদের বিনয়ভরা হাসিমাখা উত্তর:
—জ্বী চাচাজান, তিনি রাজি!

আবু তালিব মাথা দুলিয়ে বললেন:
—তিনি বুদ্ধিমতী, অনেক দূরদর্শী! সারা মক্কার ধনীদের নেতৃত্বস্থানীয়দের ‘না’ করে এ ‘দরিদ্র’কে বরণ করে নিচ্ছেন! তিনি আসলে মানুষ চেনেন! মানুষের মূল্য বোঝেন! সম্পদ-প্রচুর্যের উপর তিনি প্রাধান্য দিচ্ছেন হৃদয়-প্রাচুর্যকে!!

আবু তালিব মুহাম্মদকে মুবারকবাদ জানালেন! খাদিজার সঙ্গে তাঁর বিবাহকে আল্লাহর একটি বিশেষ নেয়ামত হিসাবে আখ্যা দিলেন! মুহাম্মদও খুশি, আল্লাহর সকাশে অর্পণ করছেন অযুত নিযুত কৃতজ্ঞতা!

সারা মক্কায় এ খবর ছড়িয়ে পড়লো। খাদিজা-মুহাম্মদের বিবাহের আলোচনায় সবাই সবখানে মুখর হয়ে উঠলো। কারও মুখে বিস্ময়! কারও কন্ঠে বিস্ময়! কারও চোখে বিস্ময়! সত্যি হতে যাচ্ছে এ? খাদিজা রাজি এখন বিবাহতে? তারপর আবার মুহাম্মদের সাথে!! দেখতে দেখতেই নির্দিষ্ট দিনটা চলে এলো!

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00