📘 গল্পে আঁকা মহীয়সী খাদিজা রাঃ > 📄 আশা

📄 আশা


শুরু হলো পুরোদমে খাদিজার ব্যবসা। বাণিজ্য-কাফেলা যখন যেখানে পাঠানো দরকার সেখানেই পাঠাচ্ছেন। কখনো ইয়েমেনে কখনো শামে.। অনেক শ্রমিক তাঁর এখানে কাজ করে। কারও মনে কোনো খটকা নেই.. ক্ষেদ নেই.. কষ্ট নেই.. অনুযোগ নেই.. অভিযোগ নেই। সবাই মন-প্রাণ সঁপে দিয়ে খাদিজাকে শ্রম দেয় আর গুনে গুনে লাভ নেয়। ন্যায্য মজুরির ঢের বেশি পায়, সব সময়। সবাই খাদিজার প্রতি সন্তুষ্ট। খাদিজাও সবার প্রতি সন্তুষ্ট। বরং খাদিজার এখানে যারা কাজ করে তারা একটা গর্ব অনুভব করে।

অমন মহীয়সী দয়ালু সুদক্ষ ও বুদ্ধিমতি নারী মক্কায় কয়জন পাবে তারা? ব্যবসা-বাণিজ্যের কৌশল ও মূলনীতি বেশ তাঁর জানা। কোন পণ্যের চাহিদা বেশি আর কোন পণ্যের বাজার মন্দা। ব্যবসা-সংক্রান্ত বিষয়ে তাঁর অভিমত এখন ব্যবসায়িক মহলে ভীষণ গুরুত্ব বহন করে। বড় বড় সওদাগররা পরামর্শের জন্যে তাঁর দিকনির্দেশনার অপেক্ষা করে। সে অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং লাভবান হয়।

মক্কার বড় সওদাগর কে? সবচেয়ে বড় পণ্যশালাটা কার? খাদিজার এবং খাদিজার! খাদিজার এ ব্যবসা দিনে দিনে কেবল বিস্তৃতই হচ্ছিল। বাড়ছিলই। কারণ আছে, তাঁর ব্যবসার সমস্ত আয়-ব্যয় ও ক্রয়-বিক্রয় হালাল উপায়ে হয়। ন্যায়সঙ্গত পন্থায় হয়। ওজনে কম দেওয়া হয় না। মাপে বেশকম করা হয় না। সরস বলে নিরস মাল দেওয়া হয় না। সর্বপ্রকার লেনদেন সুদমুক্ত। অথচ সেকালে সুদের বাজারটা ছিল বেশ রমরমা। পাশাপাশি খাদিজার ব্যবসায় যতো লাভ হতো তাঁর দান ও দয়াও ততো বেড়ে যেত। অসহায় দরিদ্র ও মুখাপেক্ষীদের কেউই তাঁর কাছে এসে শূন্য হাতে ফিরে যেত না। খাদিজা তাঁদের দিতেন উদার মনে। মুক্তহস্তে। আনন্দচিত্তে। যারা বড় ও মহৎ, দান করতে.. অপরের দুঃখ ঘুচাতে.. বিপদ দূর করতে– সব সময় অগ্রগামী।

খাদিজা বিশ্বাস করেন- ব্যবসার এই যে লাভ, তা গভীরভাবে সম্পর্কিত ওই দানের সাথে! যার দান যতো বেশি হবে তার লাভও ততো বেশি আসবে। এটা দানের বরকত। এটা দানের মহিমা। এটা দানের অনিবার্য ফল। দান আসলে এক ধরনের ব্যবসা। এ ব্যবসায় পুঁজি খাটালে লাভ– নিশ্চিত। দুনিয়ার প্রচলিত ব্যবসায় পুঁজি নষ্ট হয়ে যায়। লোকসান হয়। কিন্তু দানের এ ব্যবসায় লোকসানের কোনো সম্ভাবনা নেই। এ জন্যেই খাদিজা দানের পরিমাণ বাড়িয়ে দেন, অনেক বাড়িয়ে দেন। অন্যরা এতে বিস্মিত হয়, ভীষণ বিস্মিত! যেমন বিস্মিত তারা তাঁর ব্যবসার ক্রমোন্নতিতে। সবাই বুঝতে পারে না দানের বরকত ও মহিমা। তাই ওরা বিস্মিত হয়– এতো দান করলে কেমনে ব্যবসা হবে! পুঁজিই তো খতম হয়ে যাবে?! অথচ খাদিজার ব্যাপারটা একেবারেই উল্টো! খাদিজা কেবল দান করেন, রাতে-দিনে। একে-ওকে—সবাইকে! প্রকাশ্যে গোপনে। কিন্তু কী আশ্চর্য! তাঁর ব্যবসার কোনো ক্ষতি তো হচ্ছেই না, বরং দিনে দিনে তা আরও বাড়ছে, বাড়ছেই!! বড় বড় ব্যবসায়ীরা সামান্য লাভ তুলে আনতে কী পরিশ্রম করে! অথচ খাদিজা অন্তঃপুরবাসিনী হয়েও কেমন ‘তরতর’ করে এগিয়ে যাচ্ছেন! এমন কি সবাইকে ছাড়িয়ে যাচ্ছেন!

অনেকে খাদিজার এ উন্নতি সইতে পারে না। হিংসায় জ্বলে আর বলে- নারীরা কেন অমন করে ‘পুরুষের ময়দানে’ ঝাঁপিয়ে পড়বে?! কিন্তু সমালোচকদের নিন্দাবাক্যে খাদিজা কান দেন না, আপন মনে ব্যবসা পরিচালনা করে যেতে লাগলেন। অন্তঃপুরে বসেও বাইরের বড় বড় ব্যবসায়ীদের পেছনে ফেলে তিনি আপন মহিমায় জ্বলে উঠলেন। খাদিজার একমাত্র কাজ এখন দু’টি। নিজের সন্তানদের লালন-প্রতিপালনে ব্যস্ত থাকা এবং ব্যবসা পরিচালনা করা। এর বাইরে আর কোনো চিন্তা তাঁর নেই। বিশেষত নতুন করে ঘর-সংসার করার কথা মাথা থেকে একেবারেই ঝেড়ে ফেলে দিয়েছেন তিনি। অনেক সময় খাদিজার ভাইয়েরা এসে তাঁকে অনুরোধ করেন— আবার নতুন করে ঘর বাঁধতে, উপযুক্ত পাত্র দেখে বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হতে। তাহলে তাঁকে আর ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে অমন কষ্ট করতে হবে না, স্বামীই সবকিছু দেখাশোনা করবেন। কিন্তু খাদিজা রাজি হন নি, হতে পারেন নি। তিনি বরং ভাইদের বুঝিয়েছেন যে নারীও কর্মের ময়দানে একেবারে মেধাশূন্য নয়। পুরুষের আকল থাকলে নারীরও আকল আছে। পুরুষের প্রজ্ঞা থাকলে নারীরও প্রজ্ঞা আছে। পুরুষের দক্ষতা ও পারদর্শিতা থাকলে নারীরও আছে। নারী ইচ্ছে করলে.. সংকল্পে স্থির থাকলে, সেও পারে দুর্গম পথ পাড়ি দিতে। তখন পথের দূরত্ব কমে যায়—দূর চলে আসে একেবারে কাছে। কঠিন হয়ে যায় সহজ। কাঁটা হয়ে যায় ফুল। তারপর খাদিজা ভাইদের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বলতেন:

—তোমরা আমাকে নিয়ে কিচ্ছুটি ভেবো না, আমি সেসব পুরুষের সামনে একটা দৃষ্টান্ত পেশ করতে চাই, যারা নারীদের কেবলই ‘ভোগ্যপণ্য’ মনে করে।

ভাইয়েরা খাদিজার সাথে কথা ও যুক্তিতে পেরে উঠতেন না; অনেকটা রাগ করেই চলে যেতেন। কিন্তু যখন খাদিজাকে নিয়ে মানুষের বক্র-উক্তি কানে আসতো— ‘খোআইলিদ কন্যার যে কী হলো, আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না! কেন ও অমন করে পুরুষের কর্মকে বেছে নিলো? মহিলাদের কি আর কোনো কাজ নেই?’ তখন ভাইয়েরা আবার এসে বোনকে পূর্বের মতো অনুরোধ করতেন। কিন্তু খাদিজা যেনো ‘বধির’—কিছুই শোনেন না। আপন মনে আপন পথে কেবলই এগিয়ে চলা, দৃঢ় অবিচলতায়। ‘পাছে লোকে কিছু বলে’র কোনো পরোয়া নেই। এ ব্যস্ততার ভেতরেই তিনি খুঁজে পেয়েছেন এমন এক মজা, যা তাঁকে ভুলিয়ে দিয়েছে পেছনের সব ব্যথা-বেদনা। ভুলিয়ে রাখছেন সামনের ‘নতুন জীবন’এর চিন্তা থেকেও।

শেষ পর্যন্ত সকল আলোচনা ও সমালোচনা পেছনে ফেলে তিনি পৌঁছে গেলেন এমন এক অবস্থানে, যেখানে পৌঁছলে মানুষ মানুষের চোখে বড় হয়ে যায়! দিন যতো গড়াচ্ছে খাদিজার এ অবস্থান ততো মহিমান্বিত হচ্ছে। তাঁর সম্মান ও মর্যাদাও ততো বাড়ছে। সবাই তাঁকে এখন সমীহ করতে লাগলো। তারা মুগ্ধ, সন্তানদের প্রতি তাঁর অপরিসীম সেবা-যত্ন ও তারবিয়াত দেখে। যে-কোনো মহৎ কাজে খরচ করেন তিনি অকাতরে। একটি দিরহামও খরচ করেন না তিনি অকারণে। খাদিজা নারীজাতির গর্বে পরিণত হয়েছেন। সব নারীই তাঁকে নিয়ে গর্ব করে স্বামীদের কাছে। তাদের কাছে তুলে ধরে নারীর শক্তি ও ক্ষমতার গল্প।

খাদিজার প্রাচুর্য যতো বাড়ছিল.. তাঁর খ্যাতি যতো ছড়াচ্ছিল, মক্কার নেতৃস্থানীয়রা এবং যুবকেরা ততোই উদগ্রীব হয়ে উঠছিল খাদিজাকে ‘বউ হিসাবে’ পেতে। যে যার মতো করে এ জন্যে চেষ্টা করে যাচ্ছিল। কেউ কেউ মাধ্যমও ধরছিল। কিন্তু আগেই যেমনটা বলে এসেছি, খাদিজা এ দিকটায় ফিরেও তাকাচ্ছেন না। কারও কথায় কোনো কান দিচ্ছেন না। কারও প্রস্তাবে কোনো সাড়া দিচ্ছেন না। এভাবে সময় আরও পেরিয়ে গেল। মক্কার ‘মানুষ’ খাদিজাকে পাওয়ার জন্যে আরও ব্যাকুল হয়ে উঠলো। কেননা, খাদিজার বয়স যতো বাড়ছিল মানুষের কাছে তাঁর মূল্যায়নও ততো বাড়ছিল।

কিন্তু এদের কেউই সরাসরি খাদিজার সাথে কথা বলার সাহস পাচ্ছিল না। তাঁর সীমাহীন ব্যক্তিত্বের সামনে সবাই ছিল নিষ্প্রভ ও ম্লান। তাঁর সামনে যেতে ও মুখোমুখি হতে যে সৎ-সাহস ও সুব্যক্তিত্বের প্রয়োজন, তা কারোই ছিল না। তাই সবাই আশ্রয় নিয়েছিল ছোট-বড় মাধ্যমের, যাদের কেউ নারী, কেউ-বা পুরুষ। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। কারও সুপারিশই কাজে লাগলো না। মহীয়সী খাদিজাকে কেউ রাজি করাতে পারলো না। তিনি নিজের কাজে ব্যস্ত। নিজের পথচলায় অবিচল। নিজের সাধনায় আচ্ছন্ন। তিনি সন্তানদের প্রকৃত লালন-প্রতিপালন নিয়ে ব্যস্ত। তিনি নিজের ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত। তিনি অনেক বার কষ্ট ও আঘাত পাওয়ার পর এখন আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরস্কার লাভ করার জন্যে নীরবে অপেক্ষা করছেন! এ অপেক্ষার ভাষা ও শব্দ শুধু তিনিই শুনতে পান। শুধু তাঁর কানেই গুঞ্জরিত হয়। আর কেউ শুনতে পায় না। বুঝতে পারে না। উপলব্ধি করতে পারে না। অন্যরা কেবলই ভাবে- খাদিজার এ নীরবতা এবং এ ভাবলেশহীনতা কেন! আর খাদিজা নীরবে ভাবেন, এবার আশা- মিলবেই পুরস্কার!

📘 গল্পে আঁকা মহীয়সী খাদিজা রাঃ > 📄 আবেদন

📄 আবেদন


ইয়েমেনে পাঠানো বাণিজ্য-কাফেলা ফিরে আসার সময় হলো যখন, সুসংবাদদাতা এসে একদিন জানালো— শিগগিরই আমাদের বাণিজ্য-কাফেলা মক্কায় পৌঁছবে।

কাফেলার আগমনের খবর পেয়ে খাদিজার মহলে সাড়া পড়ে গেল। সবাই কর্মব্যস্ত হয়ে উঠলো। নতুন নতুন পণ্যের জন্যে প্রস্তুত হতে লাগলো পণ্যশালা। এ খবর ছড়িয়ে পড়লো সারা মক্কায়। মানুষ দলে দলে আসতে লাগলো খাদিজার বাড়িতে, খাদিজার কাছে। এরা এমন উপলক্ষে সব সময় আসে, ভিড় জমায়। খাদিজার কাছে। দানের আশায়। খাদিজা এদেরকে দেন অকাতরে, এদের মন ভরে। ধারণার চেয়ে অনেক বেশি করে।

খাদিজার বাঁদিরাও উল্লসিত। ওদের কপালও এখন খুলবে। আগে থেকেই খাদিজার কাছে বায়না ধরে রেখেছিল এরা সবাই— আমার জন্যে চাই এবার একটা সেরা উপহার! খাদিজা কাউকে ‘না’ করেন না, ‘না’ করতে পারেন না। কাফেলা পৌঁছলে সবাই সবার উপহার পেয়ে যাবে— এটাই ওরা ধরে নেয়। তাই কাফেলার আগমন-সংবাদে সবাই আনন্দে মেতে ওঠে!

কাফেলা মক্কায় পৌঁছে গেছে। খাদিজার পণ্য খালাস করা হচ্ছে। সব নিয়ে রাখা হচ্ছে গুদামঘরে। কাফেলার দায়িত্বে নিয়োজিত লোকদের মুখ থেকে খাদিজা শুনছিলেন বিভিন্ন অবস্থা। কী কী আনা হয়েছে, কোথাও কোনো সমস্যা হয়েছিল কি না—ইত্যাদি। সবাই খাদিজাকে আশ্বস্ত করলো, খুব চমৎকার সব পণ্য এ যাত্রা আনা হয়েছে। কোথাও কোনো সমস্যা বা জটিলতা সৃষ্টি হয় নি। সবই ঠিক-ঠাক মতো সম্পন্ন হয়েছে।

কথা শেষ করার পর সবাই খাদিজাকে সশ্রদ্ধ অভিবাদন জানালো। তারপর মুগ্ধদৃষ্টিতে খাদিজার হাসিভরা মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। খাদিজা শ্রমিকদের মুখে সব শুনে সন্তোষ প্রকাশ করলেন। সবাইকে উপযুক্ত পারিশ্রমিক দিলেন। চাহিদার চেয়ে সবাইকে বাড়িয়ে বাড়িয়ে দিলেন। ধারণার চেয়ে বেশি ‘সম্মানী’ পেয়ে সবাই আনন্দচিত্তে বেরিয়ে গেল, খাদিজার প্রতি কৃতজ্ঞতার ‘পশলা পশলা বৃষ্টি বর্ষাতে বর্ষাতে’!

সবাইকে বিদায় দিয়ে খাদিজা এলেন ইয়েমেন থেকে আনা পণ্য পরিদর্শনে। ঘুরে ঘুরে তিনি দেখতে লাগলেন বিভিন্ন পণ্যের বহর ও বাহার। বাঁদিরা আছে তাঁর সঙ্গে। খাদিজা কিছু মূল্যবান অলঙ্কার তুলে নিয়ে বাঁদিদের হাতে তুলে দিচ্ছিলেন একে একে। ওরা অভাবিতভাবে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি পেয়ে আনন্দে ভাসতে লাগলো! একে অপরকে নিজেরটা দেখিয়ে গর্বভরে বলতে লাগলো— এই যে দেখো, আমারটা সবচেয়ে সুন্দর.. সবচেয়ে দামি! ইশ্, দেখতে কী সাদা!! আরেকজন বলছিল– আমারটা সবচেয়ে সেরা! দেখো না কী লাল!

এভাবে সবাই নিজের উপহার নিয়ে গর্ব করতে লাগলো। যদিও মানে ও গুণে সবগুলো উপহারই ছিল ভালো ও সেরা। এ ছিল ইয়েমেনী বাণিজ্য-কাফেলার গল্প। এবার বলি সিরিয়ার বাণিজ্য-কাফেলার কথা। কয়দিন পরই এ বাণিজ্য-কাফেলা যাত্রা করবে।

এখন যাত্রা হবে গ্রীষ্মকালীন বাণিজ্য-কাফেলার.। এ কাফেলা যাবে শামে-সিরিয়ায়। শীতকালীন বাণিজ্য-কাফেলা যায় ইয়েমেনে আর গ্রীষ্মকালীন বাণিজ্য-কাফেলা যায় শামে। ইয়েমেন থেকে বয়ে আনা পণ্য যাবে এখন শামের বাজারে.। এক বাজারের জিনিস লুফে নেয় আরেক বাজারের ব্যবসায়ীরা। এটাই ব্যবসার নিয়ম.। উত্তরে যা থাকবে দক্ষিণে তা থাকবে না বা কম থাকবে.। আবার দক্ষিণের জিনিস পাওয়া যাবে না উত্তরে.। আনতে হলে আনতে হবে দক্ষিণ থেকে.। এভাবেই আল্লাহ এক জায়গার অপ্রয়োজনীয় জিনিসকে আরেক জায়গায় প্রয়োজনীয় করে তোলেন.। মানুষের জীবন-জীবিকার পথ সহজ করে দেন.।

খাদিজা ভীষণ ব্যস্ত হয়ে উঠলেন শামের কাফেলার আয়োজন নিয়ে। খাদিজার এখানে লোকজনের প্রচণ্ড ভিড়। সবাই চায়, খাদিজার কাফেলায় কাজ করতে। খাদিজার মহানুভবতা ও দয়ার অংশ থেকে একটু সিক্ত হতে। কেউ-ই বঞ্চিত হতে চায় না।

কাফেলা রওয়ানা হওয়ার সময় একদম কাছে। শ্রমিকরা অষ্টপ্রহর কর্মব্যস্ত। কেউ পণ্যের আঁটি বাঁধছে। কেউ সওয়ারি প্রস্তুত করছে। কেউ পানির মশক ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পাথেয়-সামগ্রী প্রস্তুত করছে। সব মিলিয়ে খাদিজার মহলে সার্বক্ষণিক কর্ম-কোলাহল। খাদিজা নিজে সব তদারক করছিলেন। প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছিলেন। প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন, কয়দিনের মধ্যেই কাফেলার যাত্রা হবে।

এর মধ্যেই একদিন আবু তালিব এলেন খাদিজার কাছে। খাদিজা আবু তালিবকে সসম্মানে স্বাগত জানালেন। তারপর দু’জন বসে ব্যবসা নিয়ে কথা বললেন। কথা বললেন আরবের বিভিন্ন বাণিজ্য-কাফেলা নিয়ে। লাভ-ক্ষতি নিয়ে। দু’জনের মাঝে আরও অনেক বিষয় নিয়েই কথা হলো। শ্রমিকদের বিশেষত আমানতদার ও দক্ষ শ্রমিকদের নিয়ে তাঁদের মাঝে দীর্ঘ আলাপ হলো। খাদিজা নিজের শ্রমিকদের খুব প্রশংসা করলেন। শ্রমিকদের বিশ্বস্ততা ও একনিষ্ঠতায় তাঁর ব্যবসায় অনেক বরকত হচ্ছে-সে কথাও বললেন খাদিজা। তিনি যে নিজের শ্রমিকদের পারিশ্রমিক বেশ পুষিয়ে দেন, সে কথাও শোনালেন আবু তালিবকে। খাদিজা ব্যবসার ক্ষেত্রে সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম বিষয়ে পূর্ণ জ্ঞান রাখেন দেখে আবু তালিব আপ্লুত হলেন। খাদিজার অনেক প্রশংসা করলেন। শ্রমিকদের সাথে তাঁর মহানুভব আচরণেরও ভূয়সী প্রশংসা করলেন।

কথা শেষ হচ্ছিলো না। দু’জনই কথা বলে যেনো খুব মজা অনুভব করছিলেন। শ্রদ্ধাভাজন আবু তালিবের সম্মানের প্রতি লক্ষ রেখে বুদ্ধিমতী খাদিজা উৎফুল্লচিত্তে আবু তালিবকে সঙ্গ দিয়ে যাচ্ছিলেন। কথা বাঁক নিচ্ছিল বিভিন্ন দিকে। কখনো কথা হচ্ছিল হরেক রকম পণ্য নিয়ে। কখনো নানান কিসিমের মানুষ নিয়ে। এবার আবু তালিব যেনো একটু সুযোগ পেয়ে গেলেন-মূল কথাটা উপস্থাপনের, যে উদ্দেশ্যে মূলত তিনি এসেছেন।

আবু তালিবের প্রিয় ভাই-পো-মুহাম্মদ এখন পঁচিশ বছরের যুবক। তিনি এখনো বিবাহ করেন নি। কারণ, আবু তালিবের এতোটা আর্থিক সচ্ছলতা নেই যে ভাতিজাকে আয়োজন করে বিবাহ করাবেন। মুহাম্মদ কিছুদিন মেষ চরিয়ে চাচাজানকে সহযোগিতা করেছেন। এখন মেষ চরানো আর উপযোগী মনে হচ্ছে না। আবু তালিব চাইছেন মুহাম্মদকে আরও লাভজনক ও সুবিধাজনক কোনো কাজে লাগাতে, যাতে আয়-রোজগারে তাঁদের দিন কিছুটা ফিরে আসে। মুহাম্মদের ঘরে ‘সুন্দর একজন বউ’ আসতে পারেন। তাই এসেছেন আবু তালিব খাদিজার কাছে, মুহাম্মদের উপযোগী একটা কাজের আবদার নিয়ে। সেই আবদার এখনো মনের ভেতরে। কথার মাঝখানে আবু তালিব খাদিজাকে বললেন মৃদু হেসে:

—খাদিজা! আমার ভাতিজা মুহাম্মদের ব্যাপারে তোমার মত কী? তুমি কি মনে করো ও তোমার শামের কাফেলায় কোনো কাজে লাগতে পারে?

খাদিজা উৎকর্ণ হয়ে আবু তালিবকে শুনছিলেন। আবু তালিব থেমে যাওয়ায় কিসের যেন একটা ছন্দপতন ঘটলো। মরুর বুকে একটা উচ্ছল ঝরনাধারা হঠাৎ যেন থেমে গেল। সেই ঝরনাধারার কুলকুল রব যেন নেই হয়ে গেল-থেমে গেল। সব মিলিয়ে খাদিজার হৃদয়ে কিসের যেন একটা আলোড়ন সৃষ্টি হলো!

আবু তালিবের মুখে উচ্চারিত এ নামটা এতো মিষ্টি মিষ্টি লাগছিল কেন? এ নামের পরশ এতো যাদুমাখা কেন? এতো মধুমাখা কেন? আহা! মুহাম্মদ! মুহাম্মদ!! মুহাম্মদ!! কী সুন্দর নাম! খাদিজার কানে যেন মধু ঝরলো!

খাদিজার অনুভবের গভীরে যেন ‘বসন্ত-কলরব’ জেগে উঠলো! খাদিজার হৃদয়-কাননে যেন একসঙ্গে হাজার হাজার ফুল ফুটে উঠলো। সে সব ফুলের সৌরভে যেন তার ভেতরের সব সুরভিত হয়ে উঠলো। অমন কেন হলো? মুহাম্মদ নামটি এত্তো মধুর লাগলো?

মুহাম্মদ সম্পর্কে আগে তো কতোই শুনেছেন। তিনি মক্কার আদর্শ যুবক। সবাই তাঁকে ভালোবাসে, সম্মান করে। সবাই মুগ্ধ তাঁর সততা-বিশ্বস্ততায়। খাদিজা হাসিমুখে বললেন:

—মুহাম্মদের মতো আদর্শ যুবকের কাছে অনায়াসেই আমানতের দায়িত্ব অর্পণ করা যায়! মুহাম্মদ বিশ্বস্ততার প্রতীক। তাঁর প্রতি আমার অগাধ বিশ্বাস আছে। যে-কোনো দায়িত্ব পালনের জন্যেই মুহাম্মদ উপযুক্ত। তবে তাঁর কোনো পূর্ব-অভিজ্ঞতা নেই!

আবু তালিব খাদিজাকে আশ্বস্ত করে বললেন:

—মুহাম্মদের পূর্ব-অভিজ্ঞতা যে নেই তা নয়! ওর বয়স যখন দশ তখন আমার সাথে বাণিজ্য-কাফেলায় শাম সফর করেছে। ব্যবসার কলা-কৌশল অন্যদের চেয়ে মুহাম্মদের বেশ জানা। সফরের দূরত্ব ও ক্লান্তিও আশা করি ওকে কাবু করতে পারবে না। উত্তপ্ত মরুর বুকে অনেকদিন মেষ চরানোয় ওর অর্জিত হয়েছে অনেক গুণ। এর অন্যতম হলো, কর্ম-নৈপুণ্য, ধৈর্য ও সুপরিচালনা।

খাদিজা আবার আপ্লুত হলেন। খাদিজা আবার আগের সেই ছন্দপতন অনুভব করলেন। কেন থামলেন আবু তালিব! খাদিজা বিমুগ্ধচিত্তে শুনে যাচ্ছিলেন আবু তালিবের মুখে মুহাম্মদের উচ্ছ্বসিত গুণগাথা। খাদিজা স্মৃতিকাতর হয়ে পড়লেন।

তাঁর মনে পড়ছে মুহাম্মদের জন্মলগ্নের কথা। সেদিন দাদা আবদুল মুত্তালিব কী যে খুশি হয়েছিলেন! তাঁর খুশিতে সারা মক্কায় খুশির ‘ঢল’ নেমেছিল। তখন খাদিজার বয়স চৌদ্দ।

খাদিজার আরও মনে পড়ছে মুহাম্মদের পিতা আবদুল্লাহর কথা। আবদুল মুত্তালিব যখন আবদুল্লাহকে কুরবানী করতে উদ্যত হলেন তখন মক্কার মানুষের সে কী সকাতর— ‘না! না!!’। আবদুল্লাহ যেনো তাদের সবার সন্তান! তাদের হৃদয়েরই টুকরো!

খাদিজার আরও মনে পড়ে আবদুল্লাহর সাথে আমেনার বিবাহের সেই ঐতিহাসিক দিনটির কথা। সেদিন সারা মক্কা যেন মহাআনন্দ-উৎসবে মেতে উঠেছিল।

খাদিজার আরও মনে পড়ে ছোট্ট মুহাম্মদের কথা। আহা! কী দুঃখের জীবন! জন্মের আগেই বাবাহারা-পিতৃহীন! মা-ও চলে গেছেন একেবারে ছোট্টবেলায়! তবুও কী সুন্দর করে মুহাম্মদ বেড়ে উঠেছেন। ছায়া দিয়েছেন তাঁকে মহানুভব দাদা! তারপর এই হৃদয়বান চাচা!!

খাদিজার হৃদয়ে মুহাম্মদের প্রতি এই বৈঠকেই কোমল একটা ভালোবাসা জন্ম নিলো! আবু তালিবকে লক্ষ করে তিনি বলে উঠলেন:

—আবু তালিব! আমি সানন্দে রাজি! আপনি তো আপনার এক প্রিয় মানুষের জন্যে প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন, দূরের কারও জন্যে প্রস্তাব নিয়ে এলেও তো আমি ‘না’ বলতে পারতাম না!

খাদিজার কথায় আবু তালিবের চেহারা ঝলমল করে উঠলো। তিনি আনন্দে তাকিয়ে রইলেন খাদিজার দিকে, কৃতজ্ঞতাভরা চোখে! এরপর আবু তালিব আরেকটা বিষয়ে একটু কথা বলতে চাইলেন। বুদ্ধিমতী প্রজ্ঞাবতী খাদিজা বিষয়বস্তু বুঝে ফেললেন! আবু তালিবের মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে হাসতে হাসতে বললেন:

—আবু তালিব! এ ব্যাপারে আপনাকে কিছুই ভাবতে হবে না! অবশ্যই তাঁর বিনিময় অন্য কারও সমান হবে না, অনেক বেশি হবে!

আবু তালিব খাদিজাকে অনেক ধন্যবাদ জানালেন। বিদায় নিয়ে ছুটে গেলেন প্রিয় ভাতিজাকে সুসংবাদ দিতে! মুহাম্মদ নিশ্চয়ই তাঁর পথ চেয়ে আছে!! অপেক্ষা করো হে চাচাভক্ত মুহাম্মদ! চাচা আসছেন! তোমার জন্যে মিষ্টি সুসংবাদ নিয়ে! তোমার মুখে এখন হাসি ফুটবে, মিষ্টি হাসি! তৃপ্তির হাসি! অভাবী চাচার সংসারে বাতি জ্বালানোর হাসি!

📘 গল্পে আঁকা মহীয়সী খাদিজা রাঃ > 📄 মুখোমুখি

📄 মুখোমুখি


মুহাম্মদ চাচাজানের মুখে সব শুনে ভীষণ আনন্দিত হলেন। মক্কার উপকণ্ঠে মেষ-চরানো-জীবন থেকে এখন তাঁর যাত্রা হবে সুদূর শাম মুলুকে, খাদিজার ব্যবসা নিয়ে! এখন চাচাজানকে আগের চেয়ে অনেক বেশি সহযোগিতা করা যাবে! এখন একবার যেতে হবে খাদিজার সাথে দেখা করতে। দায়িত্ব বুঝে নিতে একদিন চাচাজানের নির্দেশে মুহাম্মদ গিয়ে উপস্থিত হলেন খাদিজার সাথে দেখা করতে। মুহাম্মদ আগে কখনো এ দিকে আসেন নি।

খাদিজার বাড়ি যেনো রাজপুরী। বিশাল দ্বিতল ভবন। অনেক মানুষ ভেতরে-বাইরে আসা-যাওয়া করছিল। কেউ বড়, কেউ ছোট। কেউ নারী, কেউ পুরুষ। কেউ বের হচ্ছে শূন্য হাতে, কেউ-বা বোঝা নিয়ে। বাঁদি ও খাদেমদের ব্যস্ত আনাগোনা ছিল চোখে পড়ার মতো। ওদের পোশাক-পরিচ্ছদ বেশ সুন্দর পরিপাটি। চেহারা যেনো নূর-ছাওয়া। খাদিজার মহলের পরিবেশ মক্কার অন্য ‘মহলের’ পরিবেশের সাথে মিলছে না। এখানে ক্রীতদাসকে ক্রীতদাস মনে হয় না, মনে হয় ওরাও যেনো বাড়ির কেউ! মুহাম্মদ ভেতরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। একটু পরই অনুমতি পেয়ে তিনি ভেতরে প্রবেশ করলেন!

সদর দরোজা পেরিয়ে তিনি একটা খোলা আঙিনায় প্রবেশ করলেন। তারপর এক খাদেম তাঁকে নিয়ে গেল একটা প্রশস্ত আলিশান কামরায়। মেঝেতে মূল্যবান ফিরাশ বিছানো। কারুকার্যময়। দেয়ালের গায়ে আঁকা সুন্দর সুন্দর নকশা। সূক্ষ্ম হাতের কারু-নৈপুণ্য।

মুহাম্মদকে বসিয়ে খাদেম চলে গিয়েছিল। মুহাম্মদ এখন একা। কামরার এক পাশে তিনি বসা। মুহাম্মদ সুন্দর কামরাটা চোখভরে দেখতে লাগলেন আর মনে মনে খাদিজার অপেক্ষা করতে লাগলেন।

বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। এইমাত্র খাদিজা প্রবেশ করেছেন। গোলগাল চেহারা। দীর্ঘদেহী। বড় বড় চোখ। গভীর মায়াময় দৃষ্টি। দীর্ঘ কেশ। গায়ের রঙ উজ্জ্বল। ঠোঁটে লেগে ছিল এক টুকরো মিষ্টি হাসি। পরে আছেন কারুকার্যময় মূল্যবান রেশমি পোশাক। পায়ে দামি চামড়ার মোজা। কানে মুক্তার দুল।

খাদিজা মুহাম্মদকে সাদর সম্ভাষণ জানালেন। মুহাম্মদ সশ্রদ্ধ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে গেলেন.। প্রতিসম্ভাষণ জানালেন.। খাদিজা মুহাম্মদকে বসতে বললেন.। নিজেও বসলেন অনেকটা দূরে.। খাদিজা ভুলেই গিয়েছিলেন–কিংবা ভুলতেই বসেছিলেন– তাঁর সেই স্বপ্নটা, যা তিনি দেখেছিলেন এই কয়বছর আগে! আর ব্যাখ্যা শুনেছিলেন চাচাতো ভাই ওয়ারাকার মুখে। কী ব্যাখ্যা?

খাদিজার আবার বিবাহ হবে! কার সাথে? একজন নবীর সাথে হবে!! মুহাম্মদকে দেখে.. মুহাম্মদকে সামনে পেয়ে.. মুহাম্মদকে নিজের মহলের ভেতরে পেয়ে খাদিজার আবার মনে পড়ে গেল সেই ভুলে-যাওয়া—প্রায় ভুলে-যাওয়া—স্বপ্নটা! এখন তাঁর মনে হচ্ছে; তিনি যেনো আছেন সেই স্বপ্নের ঘোরে! সেই স্বপ্নের মধুময় আবেশে!! এখন যেনো তিনি রয়েছেন ঘুমে। দেখছেন সেই সূর্যটাকে। এগিয়ে আসছে তাঁর গৃহপানে-আকাশের ঠিকানা ছেড়ে! সারাটা গৃহ কী আলোকময়। সেই আলো ছড়িয়ে পড়ছে এখানে-ওখানে—সবখানে! সারা পৃথিবীতে!!

খাদিজা স্বপ্নের আবেশ থেকে ফিরে এলেন। মুহাম্মদের দিকে তাকালেন। মনে হলো; এ যুবক সাধারণ কোনো যুবক নয়। এর আছে ব্যক্তিত্বের দ্যোতিত বিচ্ছুরণ। মাহাত্ম্যে ঢাকা অনন্য আত্মিক ক্ষমতা।

খাদিজা কথা বলা শুরু করলেন। বাণিজ্য-কাফেলা নিয়ে। তাঁর ব্যবসা নিয়ে। মুহাম্মদের নতুন দায়িত্ব নিয়ে। সম্ভাব্য লাভ নিয়েও তিনি কথা বললেন। তিনি মুহাম্মদকে তাঁর দায়িত্ব সুন্দর করে বুঝিয়ে দিলেন।

পথ কেমন? নিরাপত্তা আছে কি? কোনো ভয় নেই তো! আগের বাণিজ্য-কাফেলা থেকে কেমন লাভ এসেছে? পথে কোথায় কোথায় থামতে হবে? থামার পর কাজ কী হবে? নতুন করে পাথেয় সংগ্রহের প্রশ্ন আছে কি? চলার পথে ক্রয়-বিক্রয়ের কোনো ব্যাপার আছে কি? নাকি একেবারে শামে গিয়েই শুরু করতে হবে বেচা-কেনা? খাদিজা সবই বলে দিলেন একে একে মুহাম্মদকে।

মুহাম্মদ নিবিষ্টচিত্তে কান পেতে খাদিজার কথা শুনলেন। শুধু খাদিজাকেই বলতে দিলেন। খাদিজার কথা যখন শেষ, তখন দাঁড়িয়ে খাদিজার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করলেন তারপর তাঁর অনুমতি নিয়ে গৃহে ফিরে এলেন!

মুহাম্মদকে বিদায় দিয়ে এবার খাদিজা ভালো করে ভাবতে বসলেন। ভেবে ভেবে খাদিজা স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেলেন যে মুহাম্মদ সম্পর্কে এতোদিন লোকমুখে তিনি যা শুনে এসেছেন তা সবই বর্ণে-বর্ণে সত্যি। খাদিজা অনুভব করলেন, মুহাম্মদের প্রতি স্নেহ-ভালোবাসায় তাঁর হৃদয় বারবার দুলে উঠছে! তিনি সামনে বেড়ে আরও ভাবলেন- এই মুহাম্মদই কি তাঁর সেই স্বপ্নসূর্য? মুহাম্মদই সেই নবী কি না! মুহাম্মদই তাঁর ভাবী স্বামী কি না!

📘 গল্পে আঁকা মহীয়সী খাদিজা রাঃ > 📄 প্রতিজ্ঞা

📄 প্রতিজ্ঞা


কাফেলা রওয়ানা হওয়ার দিন খাদিজা মুহাম্মদের হাতে তাঁর ব্যবসায়িক পণ্য সম্ভার তুলে দিলেন। প্রয়োজনীয় উপদেশ দিলেন। তাঁর সঙ্গে দিলেন এক সুবোধ গোলাম, নাম মায়সারা। মায়সারাকে খাদিজা নির্দেশ দিলেন, মুহাম্মদের প্রতি সর্বোচ্চ খেয়াল রাখতে এবং তাঁর যে-কোনো নির্দেশ নতশিরে পালন করতে। খাদিজা মুহাম্মদকে বিদায় জানালেন। সবাইকে বিদায় জানালেন। কাফেলা দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যাওয়া পর্যন্ত তিনি তাকিয়ে রইলেন।

মুহাম্মদ আরোহণ করেছেন তাঁর বিশেষ উটটিতে। মায়সারা আছে তাঁর পাশেই আরেকটা উটে। কাফেলা এগিয়ে চলেছে মরু বিয়াবান ও বালিয়াড়ি পেরিয়ে। মুহাম্মদের বেশ লাগছিল। আনন্দে আনন্দে সময় বয়ে যাচ্ছিল। রাতের বেলা মুক্ত অবারিত আকাশের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে তিনি দেখেছেন-সৌর-সৌন্দর্য-চাঁদ-সিতারার আলোর মাহফিল। আল্লাহর অপার কুদরত। তাঁর সৃষ্টি-সুষমা। মুহাম্মদের দিবসও কাটতো এ-চিন্তায়। কী বিশাল মরু! কতো বালিরাশি! পথের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে কী বিশাল বিশাল পাহাড়! এরা জমিনের প্রহরী! জমিনকে স্থির রাখে, নড়তে দেয় না! আল্লাহর কোনো সৃষ্টিই নিরর্থক নয়।

সফরের পদে-পদে মুহাম্মদকে নতুন নতুন রূপে আবিষ্কার করছিল মায়সারা। একদিন মায়সারা দেখলো, একখণ্ড মেঘ মুহাম্মদকে ছায়া দিচ্ছে। হ্যাঁ, শুধু তাঁকেই-নাহ্! আর কাউকে নয়! মরুভূমির প্রচণ্ড সূর্যতাপে তাঁকে ছায়া দিতে কেন এই আকাশ-আয়োজন? কে এর আয়োজক? কাফেলায় তো তিনিই একা নন, আরও কতোজনই তো আছে!) কিন্তু ছায়া কেন তাহলে শুধুই তাঁকে?... বুদ্ধিমান মায়সারার বুঝতে বাকি রইলো না কেন মালিকা তাঁকে মুহাম্মদের প্রতি বিশেষ নজর রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। সারাটা গৃহ কী আলোকময়!

কাফেলা গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলেছে। খাদিজার অবসরকালকে দখল করে বসে আছে এখন সেই সূর্য-স্বপ্নের সূর্য। ওয়ারাকার ব্যাখ্যা আবার মনে পড়লো খাদিজার। ওয়ারাকা শেষনবীর যতো গুণাবলি ও বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন, সবই তো মুহাম্মদের মাঝে বিদ্যমান মনে হচ্ছে!

আত্মিক পরিচ্ছন্নতা- মুহাম্মদের চেয়ে পরিচ্ছন্ন হৃদয়ের অধিকারী আর কে আছে? সততা-বিশ্বস্ততা- মুহাম্মদের চেয়ে অধিক সৎ ও বিশ্বস্ত কেউ আছে বলে তো মনে হয় না!

হ্যাঁ, মুহাম্মদকে দেখার পর থেকেই খাদিজা হিসাব মেলাতে শুরু করেছিলেন। আশ্চর্য! কী মজা!! স-ব হিসাব ঠিক ঠিক মিলে যাচ্ছে! কোথাও কোনো গরমিল ধরা পড়ছে না! তাঁর গৃহে মুহাম্মদের আগমনের পর থেকে মনে হয়েছে– এ-ই তো সে-ই!! এই মুহাম্মদই তাঁর সেই স্বপ্নসূর্য!!

খাদিজা একলা বসে নীরবে শুধু মুহাম্মদের কথাই ভাবতে লাগলেন। তাঁকে স্বপ্নের সূর্যের সাথে তুলনা করতে লাগলেন। খাদিজার হৃদয়ে মুহাম্মদ-ভাবনা এতোটাই ‘ঝড়’ সৃষ্টি করলো যে তিনি আর সইতে পারলেন না, একবার তো তাঁর এক বান্ধবীর কাছে সে কথা বলেই দিতে চাইছিলেন। কিন্তু অনেক ভেবে-চিন্তে তা আরও কিছুদিন গোপন রাখার সিদ্ধান্ত নিলেন। আরেকটু দেখতে চান তিনি- মুহাম্মদই তাঁর প্রতীক্ষিত মানুষ কি না! মুহাম্মদই সেই স্বপ্নসূর্য কি না! মুহাম্মদই সেই নবী কি না! মুহাম্মদই তাঁর ভাবী স্বামী কি না!

কিন্তু মন মানতে চায় না! তাঁর প্রতি আকর্ষণ দিনে দিনে বাড়ছেই! কাফেলা যখন ফিরে আসার সময় ঘনিয়ে এলো মুহাম্মদের প্রতি তাঁর মন আরও ব্যাকুল হয়ে উঠতে লাগলো। কয়দিন আগেই তাঁর সংকল্পটা ছিল ‘চিরসংকল্প’— ‘বিবাহের পিঁড়িতে’ তিনি আর বসবেন না! না! না! না!

কিন্তু এখন যে সে সংকল্পের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার উপক্রম! মুহাম্মদ-প্রেমে তাঁর হৃদয় যে এখন বাঁধনহারা? খাদিজা মনের কাছে জানতে চাইলেন :

—মন! তোমার কী হয়েছে? পুরুষকে এড়িয়ে চলেছো, বিবাহ থেকে বিরত থেকেছো! এভাবে তোমার জীবন তো বেশ চলছিলো! মক্কার কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তি.. কোনো নেতা.. কোনো ঐশ্বর্যিক তোমার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে নি! অথচ এ যুবকের প্রতি তুমি ঝুঁকে পড়ছো — সীমাহীন! আসলে কী হয়েছে তোমার?!

খাদিজা আত্মবিশ্লেষণে বসলেন.। কেন এই ঝোঁক? ভেবেচিন্তে দেখলেন- এটি সাধারণ কোনো ঝোঁক নয়.। নারী-হৃদয়ে পুরুষের প্রতি স্বাভাবিক যে-ঝোঁক ও ভালোবাসা জন্ম নেয়, এটি তেমন নয়-সে ধরনের নয়! মুহাম্মদের প্রতি তাঁর যে-ঝোঁক ও ভালোবাসা– তার কারণ ও উৎস খাদিজার অজানা! খাদিজা শুধু অনুভব করতে পারছেন, মুহাম্মদ প্রচণ্ডভাবে তাঁকে আকর্ষণ করছেন! গভীরভাবে তিনি মুহাম্মদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে চলেছেন! ওয়ারাকা যদিও বলছে খাদিজার আবার বিবাহ হবে এবং স্বামী হবেন একজন নবী, কিন্তু খাদিজা বুঝতে পারছেন না কীভাবে তা হবে! এর মানে কি এই যে-মুহাম্মদের প্রতি তাঁর এই ঝোঁক বিবাহ পর্যন্ত গড়াবে আর মুহাম্মদ অচিরেই নবী হতে যাচ্ছেন?! আল্লাহ! আল্লাহ! তা-ই যদি হতো!!

খাদিজা অনেক চেষ্টা করলেন এই তোলপাড় করা অনুভূতি থেকে দূরে সরে থাকতে এবং বিশ বছর ধরে বিবাহ না-করার যে সংকল্প ছিল তার ওপর অটল থাকতে। কিন্তু তাঁর চেষ্টা কোনো ফল বয়ে আনে না, আনতে পারে না। বারবার তিনি ফিরে যান বাণিজ্য-কাফেলার স্মৃতিতে.. মুহাম্মদের ভাবনাতে। তখন আবার ফিরে আসে সেই অনুভূতি। সেই স্বপ্নসূর্য! আবার শুরু হয় হৃদয়ের তোলপাড়। আগের চেয়ে আরও বেশি করে, প্রবল আকারে। কাফেলা মক্কায় পৌঁছার দিনক্ষণ যতো এগিয়ে আসতে থাকে মুহাম্মদের ব্যাপারে তিনি কী সিদ্ধান্ত নেবেন, সে চিন্তাও ততো বাড়তে থাকে।

খাদিজার এক মন বলে, মুহাম্মদ! জলদি এসো! আর তর সইছে না.! এই যে আমি দিন গুনছি.। ক্ষণ গুনছি! খাদিজার আরেক মন বলে, মুহাম্মদ! তোমার আসতে আরও দেরি হোক.। আমি তোমার ভাবনায় আরও আচ্ছন্ন হয়ে থাকতে চাই.। তোমার ভাবনায় আরও আত্মসমাহিত হয়ে থাকতে চাই.। আহা! তোমাকে নিয়ে ভাবতে.. তোমাকে নিয়ে আচ্ছন্ন থাকতে কী মজা! কী মিষ্টি! হৃদয়-মনে পবিত্র একটা বাতাস বয়ে যায়.। দুঃখ-কষ্ট-সব দূর হয়ে যায়.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00