📄 শোকের উপর শোক, আড়ালে তার কী হাসে
নতুন জীবনে প্রবেশ করলেন আবার খাদিজা। আতিকের মতো এ স্বামীকেও শ্রদ্ধার আসনে বসালেন খাদিজা। ভালোবাসলেন হৃদয় দিয়ে। বাবার কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। আসলেই নাব্বাশ ছিলেন আতিকের প্রতিচ্ছবি। কথায় কাজে আচরণে। নাব্বাশও খাদিজার মাঝে খুঁজে পেলেন এক মহীয়সী বধূ। সুখের ও আনন্দের অনুভূতি তার ভেতরে কলরব করে ওঠে। খাদিজাকেও তিনি ভালোবাসলেন। হৃদয়ের রানী বানালেন। শান্তি-স্বস্তি লাভের ঠিকানা হয়ে গেলেন খাদিজা।
নাব্বাশ ছিলেন অনেক জ্ঞানী ও গুণী। আরও ছিলেন সুবিশাল ব্যবসার মালিক। তার ব্যবসা ছড়িয়ে ছিল দেশে-বিদেশে। ব্যবসায়ী হিসাবে সর্বত্রই তার সুনাম। এ ছাড়া তিনি ছিলেন একজন খ্যাতিমান বীরপুরুষ। তাকে ঢাল-তলোয়ারে সজ্জিত হতে দেখলেই দুশমনের বুকে কাঁপন ধরে যেত। লড়াইয়ে অবতীর্ণ হওয়ার আগেই দুশমন হেরে যেত। নাব্বাশ ছিলেন এমনই শত্রুর কলিজায় কাঁপন-ধরানো জাত-বীর।
এসব গুণের অধিকারী মানুষটিকে পেয়ে খাদিজার ভাঙা মনও জোড়া লাগলো। তাঁকে পেয়ে ভীষণ খুশি তিনি। সব কাজে তিনি তাঁকে সহযোগিতা করেন হৃদয়-মন উজাড় করে। তাঁকে পরামর্শ দেন ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে। নাব্বাশও স্ত্রীর অভিজ্ঞতা কাজে লাগান। তার কাছে পরামর্শ চান নির্দ্বিধায়। খাদিজা আবার সুখী হলেন নাব্বাশের এ নীড়ে। যেমন সুখী হয়েছিলেন আতিকের ওই নীড়ে।
মানুষের দৃষ্টি আকৃষ্ট হতে লাগলো সুখ ও আনন্দঘেরা এ গৃহের দিকে। অমন সুখী পরিবার কয়টি আছে মক্কায়? সবদিক দিয়েই সুখী। স্নেহ-মমতা-ভালোবাসার অমন দ্যোতিত সংসার তো চোখেই পড়ে না! ধন-সম্পদেরও কোনো অভাব নেই। কী সাজানো-গোছানো পরিবার! মক্কার শ্রেষ্ঠ বাড়ি কোনটি? নাব্বাশ-খাদিজার বাড়ি! মক্কার শ্রেষ্ঠ নারী কে? মুখে মুখে উঠে আসে খাদিজার নাম!
এক বছর পর খাদিজার কোলে এলো এক পুত্র-সন্তান। আরও দৃঢ় হলো বন্ধন। পুত্র-সন্তানের জন্যে তখন আরবের লোকেরা ভীষণ ব্যাকুলচিত্ত ছিল। পুত্র-সন্তানের জন্মে উৎসবের আমেজ সৃষ্টি হতো। আর পুত্র-সন্তান না-হলে দুঃখে-কষ্টে, মর্ম-যাতনায় তাদের চেহারা কালো হয়ে যেত। শূন্যতা ও অভাববোধ ঠিকরে ঠিকরে বের হতো তাদের চোখে-মুখে।
আদর করে ছেলের নাম রাখলেন তারা—হালা। যার অর্থ—চাঁদকে ঘিরে রাখা আলোকবৃত্ত। নাব্বাশ-খাদিজা যেন আলো-বিলানো চাঁদ। হালা যেন তাদের ঘিরে রাখা আলোকবৃত্ত। কী সুন্দর অর্থবহ নাম! আদরে-সোহাগে বেড়ে উঠতে লাগলো হালা। হালার পেছনে খাদিজা অনেক সময় দেন। তাকে আদর্শ সন্তান হিসাবে গড়ে তুলতে সবকিছুই করেন। সন্তানের পেছনে অমন সীমাহীন গুরুত্ব দিতে দেখে সবাই খাদিজার প্রশংসা করে, গুণগান গায়। স্বামীর খেদমতেও খাদিজা অদ্বিতীয়া। সে কথাও এখন মানুষের মুখে মুখে।
চারপাশের এ সুনাম নাব্বাশের ভেতরে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি করলো। তার কর্মতৎপরতা আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেল। তার সম্পদও অনেক অনেক বেড়ে গেল। শুধু কি বেড়ে গেল? স্রোতের মতো ধেয়ে আসতে লাগলো! ওই বাণিজ্যবহর কার? নাব্বাশের! ইয়েমেনমুখী ওই উটবহর কি নাব্বাশের? হ্যাঁ, সব নাব্বাশের।
খাদিজা এখন প্রিয়স্বামীকে আর নাম ধরে ডাকেন না, বলেন—আবু হালা। অন্যরাও এখন তাকে ‘আবু হালা’ বলে ডাকে। এ উপনাম শুনতে নাব্বাশের খুব ভালো লাগে, খুব গর্ব হয়! তার মনের ভেতর আনন্দরা কলকলিয়ে ওঠে।
দ্বিতীয় বছর আরেক ছেলের জন্ম হলো! নাম তার ‘হিন্দ’। নাব্বাশের আনন্দ আর ধরে না! খুশি ও কৃতজ্ঞতায় আল্লাহর সামনে তাঁর মাথা নুইয়ে আসে! অসহায় দরিদ্রদের দাওয়াত দিয়ে ঘটা করে খাওয়ালেন। কা’বা তাওয়াফ করলেন। আল্লাহর সকাশে সঁপে দিলেন অযুত নিযুত কৃতজ্ঞতা। খাদিজাকেও তিনি জানালেন—হৃদয়ছোঁয়া মুবারকবাদ ও কৃতজ্ঞতা! আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেল তাঁর কাছে প্রিয় খাদিজার মান-মর্যাদা-সম্মান-ভালোবাসা! আবার পাশাপাশি ভয়ও করতে লাগলেন—তাঁদের এ সৌভাগ্যে কেউ ‘কষ্ট’ পাচ্ছে না তো!
খাদিজার মনেও থেকে থেকে উঁকি দেয় ভয় ও শঙ্কা—আমাদের এ সৌভাগ্য স্থায়ী হবে তো! অদৃশ্যে কোনো দুঃখ লুকিয়ে নেই তো!
সম্পদ ও সুখ বাড়ে, খাদিজার আশঙ্কাও বাড়ে। ভীষণ চিন্তায় পড়ে যান তিনি। অথচ তাঁর সামনে স্পষ্ট কোনো বিপদ সংকেত নেই।
খাদিজার আশঙ্কা সত্যে পরিণত হলো! হঠাৎ আবু হালা চলে গেলেন!! খাদিজা আবার বৈধব্যের কোলে নিক্ষিপ্ত হলেন!! খাদিজা আবার শোকের মরুতে দিশেহারা হলেন!! পুরোনো শোকের ওপর নতুন শোক!! ক্ষতের ওপর আরেক ক্ষত!! অঝোরধারায় কেঁদে চললেন খাদিজা! শোকের দহনে জ্বলতে লাগলেন খাদিজা!! বেদনা-নিঃসৃত অশ্রু-প্রবাহে ভিজতে লাগলেন খাদিজা!! আতিক-নাব্বাশের সুখ-স্মৃতির আঘাতে আক্রান্ত হতে লাগলেন খাদিজা।
শোকের ওপর শোক—অমন তো হয় না! বিপদের পর তো আসে মুক্তি! সুখ?! তাহলে কেন আবার এই বিচ্ছেদ? এই মহাশোক? আড়ালে কিছু লুকিয়ে নেই তো!
স্বামী আবু হালার রেখে যাওয়া অঢেল সম্পদ ও বিপুল ব্যবসার দিকে ফিরে তাকানোর কোনো তাগিদ অনুভব করলেন না বিরহ-কাতর খাদিজা.। জীবন যেন কেমন! যেখানে সৌভাগ্য সেখানেই ‘রূঢ় হাসি’! তাই এ সম্পদ ও ব্যবসার কথা মনে পড়তেই যেন জ্বলে উঠলো তাঁর শোকানুভূতি– কী হবে অঢেল সম্পদ দিয়ে.. বিপুল ব্যবসা দিয়ে? এসব কি আবু হালার কোনো উপকার করেছে? মৃত্যুর হাত থেকে তাঁকে বাঁচাতে পেরেছে? না আতিককে বাঁচাতে পেরেছিল?!
খাদিজা তাকান মেয়ের দিকে, দুই ছেলের দিকে। ওদের এতিমী তাঁর হৃদয়ে ঢেউ তোলে— শোকের ঢেউ! দুঃখের ঢেউ! বারবার বিধবা হওয়ার কষ্টের ঢেউ!
এ ঢেউয়ের আছড়ে পড়ার আঘাতে তিনি এখন জর্জরিত। দেহে নেমে এসেছে দুর্বলতার প্রকটিত দৃশ্য। চেহারায় দৃশ্যমান বিবর্ণতা।
কিছুদিন পর নড়াচড়াই বন্ধ হয়ে গেল তাঁর! কেবল ‘অশ্রুনদীতে শোকের তরী ভাসিয়ে ভেসে চলা’! তাঁর গৃহটা যেন এখন বিশাল এক শোক-তাঁবুতে ছাওয়া!!
খোআইলিদ আবার কষ্ট পেলেন, আবার দুঃখ পেলেন। এ কষ্ট ও দুঃখ খাদিজা ও তাঁর মায়ের কষ্ট ও দুঃখের চেয়ে মোটেই কম নয়। খোআইলিদের মুখাবয়ব এখন ছেয়ে থাকে দুঃখ-দুঃখ ছাপে! কোন বাবা দেখতে পারেন পর পর দুইবার এক মেয়ের বৈধব্য-স্বামী বিয়োগ? কোন বাবা সইতে পারেন বার বার মেয়ের বিধবা হওয়ার কষ্ট?
কিন্তু খোআইলিদ একেবারে ভেঙে পড়লেন না, খাদিজার বাড়িতে আসা-যাওয়া বাড়িয়ে দিলেন। নিজে ধৈর্যে বুক বাঁধলেন। খাদিজাকেও সান্ত্বনা দিয়ে যেতে লাগলেন। দুঃখটাকে চেপে রেখে আনন্দ প্রকাশ করতে লাগলেন। তাঁর স্বামীর সুবিশাল ব্যবসার হাল ধরলেন। নাতি-নাতনির সাথে সময় কাটাতে লাগলেন। ওদের আনন্দ দেওয়ার চেষ্টা করতে লাগলেন—কখনো ওদের খেলার সাথী হয়ে, কখনো গল্প শুনিয়ে শুনিয়ে।
কিন্তু খাদিজা শোকাতুর মনটা নিয়ে রোগশয্যা থেকে উঠতে পারলেন না! তাঁর অসুখটা বরং দিনে দিনে বেড়েই চললো। এক সময় খোআইলিদের আশঙ্কাই হলো, মা কি আমার চলে যাবে, সবাইকে একলা রেখে?! খোআইলিদ এবং ফাতেমা খাদিজার শয্যাপাশে এসে বসে থাকেন। তাঁর শুশ্রূষা চালিয়ে যেতে থাকেন। আর সান্ত্বনার পর সান্ত্বনা দিয়ে যেতে থাকেন। নিজের প্রতি.. নিজের সন্তানদের প্রতি ‘সদয়’ হওয়ার উপদেশ দিয়ে যেতে থাকেন। মা ছাড়া আর কে ওদের সঠিক পরিচর্যায় গড়ে তুলবেন? সুযোগ পেলেই ফাতেমা মেয়েকে বলতেন:
—মা খাদিজা! তুমি স্বামীর প্রতি সর্বদাই ছিলে অনুগত ও কর্তব্যপরায়ণ। কিন্তু কী করবে, আল্লাহর হুকুমের সামনে তো আমাদের কিছুই করার নেই! এখন ধৈর্যে বুক বাঁধো! ছেলে-মেয়ের দায়িত্ব এখন তোমাকে একাই পালন করতে হবে। এ এক বিশাল দায়িত্ব। এ এক বিরাট আমানত। এ দায়িত্ব পালনে.. এ আমানত সংরক্ষণে বিন্দুমাত্র অসচেতন হলে চলবে না! এদের মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তুলতে হবে। তবেই কবরে বসে আতিক ও আবু হালা শান্তি পাবে। যেমন তারা শান্তি পেয়েছিল বেঁচে থাকতে.। তুমি অমন ভেঙে পড়লে চলবে না মা! তাহলে কে পালন করবে এদের লালন-প্রতিপালনের মহাদায়িত্ব? তুমি তো এমনটি কখনো চাইতে পারো না যে তোমার সন্তানেরা বাবা-মা ছাড়া অন্যের হাতে গিয়ে পড়ুক!
এভাবে ফাতেমা খাদিজাকে অনেক সান্ত্বনা দিলেন। খাদিজা মায়ের কথায় শক্তি অনুভব করলেন। মনে। তারপর গায়ে। আস্তে আস্তে খাদিজা উঠে বসলেন। তাঁর কাঁধে অর্পিত দায়িত্ব পালনের জন্যে নিজেকে প্রস্তুত করতে লাগলেন। খাদিজার দেহ-মনের পরিবর্তনে খোআইলিদ ও ফাতেমা খুশি হলেন। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। খোআইলিদ ভালো করে মন দিলেন খাদিজার ব্যবসা-বাণিজ্যের দিকে। নাব্বাশ বেঁচে থাকতে ব্যবসা যেমন চলছিলো খোআইলিদের পরিচালনায় এখন সেভাবেই চলতে লাগলো।
কিন্তু বাঁধ সাধলো খোআইলিদের বার্ধক্য। অনেক বয়স হয়েছে, চাইলেই এখন সবকিছু করে ফেলতে পারেন না। আস্তে আস্তে খোআইলিদ নিস্তেজ হয়ে এলেন।
হঠাৎ খাদিজা শুনলেন, বাবা আর নেই! চলে গেছেন চিরতরে!! এ ছিল খাদিজার জীবনে তৃতীয় আঘাত! তাঁকে সইতে হয়েছে আতিকের মৃত্যুর আঘাত! তারপর নাব্বাশের আঘাত! এখন সইতে হচ্ছে প্রিয়তম বাবার আঘাত! কেমন করে সইবেন তিনি এতো আঘাত?! আশ্চর্য! এতো আঘাত কী করে একজন মানবীর জীবনে একত্রিত হতে পারে?
খাদিজা শোক-মেশানো বিস্ময় নিয়ে ভাবতে লাগলেন— আল্লাহ কী চাইছেন? তার জীবনটা কি একে একে কেবল আঘাতই পেয়ে যাবে? কেমন করে কোত্থেকে এতো সহ্যক্ষমতা আসবে তার? আল্লাহ আসলে কী চাইছেন?
এতো আঘাতের পর আসবে কি কোনো পুরস্কার? এতো আঘাত ও কষ্ট তো আল্লাহ একসাথে একত্রিত করেন না?! কঠিনের পাশে তো কঠিন থাকে না। তাহলে বার বার কঠিন আসবে কেন? কেন এখন সহজ আসবে না? এতো কান্নার পর এবার আসবে কি হাসি?
খাদিজার গৃহের কাছেই আরেক গৃহে বাস করেন এক সম্ভ্রান্ত নারী। আমেনা বিনতে ওয়াহ্। তাঁর স্বামীও বিবাহের কিছুদিন পর ইন্তেকাল করেন। একমাত্র পুত্র মুহাম্মদকে নিয়ে আমেনা একাই থাকেন। নতুন করে বিবাহের কোনো ইচ্ছে তাঁর নেই। মুহাম্মদের বয়স ছ’ বছর। এর লালন-প্রতিপালনেই কেটে যায় আমেনার সারা বেলা। ধৈর্য ও সহনশীলতার এক প্রতীক তিনি।
খাদিজা দৃঢ় সংকল্প করেন, আমেনার মতো তিনিও এখন কেবল সন্তানদের লালন-প্রতিপালনেই মন দেবেন। আর কারও প্রস্তাবে ‘হ্যাঁ’ বলবেন না। সন্তানদের মুখ চেয়েই কাটিয়ে দেবেন বাকি জীবন। হ্যাঁ, স্বামীর ব্যবসা-বাণিজ্য আগে অনেকটাই দেখতেন বাবা। তিনি এখন নেই, তাই বলে এই অঢেল সম্পদ ও বিপুল ব্যবসা তো আর হেলায় নষ্ট করা যায় না। তিনি নিজেই এখন এর হাল ধরবেন। ইয়েমেন ও সিরিয়ায় ক্রয়-বিক্রয় চালিয়ে যাবেন। এ জন্যে যতো লোক প্রয়োজন, ততো লোকই নিয়োজিত করবেন।
না, খাদিজা ভেঙে পড়বেন না। নতুন করে জীবনের হাল ধরবেন। ছেলে-মেয়ের হাল ধরবেন। আবু হালার ব্যবসা-বাণিজ্যের হাল ধরবেন। অতীতের দুঃখ-স্মৃতির কথা মনে করে শুধু শুধু আর কষ্ট পাবেন না। আল্লাহর ফায়সালা মেনে নেবেন তিনি সর্বান্তকরণে।
📄 আশা
শুরু হলো পুরোদমে খাদিজার ব্যবসা। বাণিজ্য-কাফেলা যখন যেখানে পাঠানো দরকার সেখানেই পাঠাচ্ছেন। কখনো ইয়েমেনে কখনো শামে.। অনেক শ্রমিক তাঁর এখানে কাজ করে। কারও মনে কোনো খটকা নেই.. ক্ষেদ নেই.. কষ্ট নেই.. অনুযোগ নেই.. অভিযোগ নেই। সবাই মন-প্রাণ সঁপে দিয়ে খাদিজাকে শ্রম দেয় আর গুনে গুনে লাভ নেয়। ন্যায্য মজুরির ঢের বেশি পায়, সব সময়। সবাই খাদিজার প্রতি সন্তুষ্ট। খাদিজাও সবার প্রতি সন্তুষ্ট। বরং খাদিজার এখানে যারা কাজ করে তারা একটা গর্ব অনুভব করে।
অমন মহীয়সী দয়ালু সুদক্ষ ও বুদ্ধিমতি নারী মক্কায় কয়জন পাবে তারা? ব্যবসা-বাণিজ্যের কৌশল ও মূলনীতি বেশ তাঁর জানা। কোন পণ্যের চাহিদা বেশি আর কোন পণ্যের বাজার মন্দা। ব্যবসা-সংক্রান্ত বিষয়ে তাঁর অভিমত এখন ব্যবসায়িক মহলে ভীষণ গুরুত্ব বহন করে। বড় বড় সওদাগররা পরামর্শের জন্যে তাঁর দিকনির্দেশনার অপেক্ষা করে। সে অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং লাভবান হয়।
মক্কার বড় সওদাগর কে? সবচেয়ে বড় পণ্যশালাটা কার? খাদিজার এবং খাদিজার! খাদিজার এ ব্যবসা দিনে দিনে কেবল বিস্তৃতই হচ্ছিল। বাড়ছিলই। কারণ আছে, তাঁর ব্যবসার সমস্ত আয়-ব্যয় ও ক্রয়-বিক্রয় হালাল উপায়ে হয়। ন্যায়সঙ্গত পন্থায় হয়। ওজনে কম দেওয়া হয় না। মাপে বেশকম করা হয় না। সরস বলে নিরস মাল দেওয়া হয় না। সর্বপ্রকার লেনদেন সুদমুক্ত। অথচ সেকালে সুদের বাজারটা ছিল বেশ রমরমা। পাশাপাশি খাদিজার ব্যবসায় যতো লাভ হতো তাঁর দান ও দয়াও ততো বেড়ে যেত। অসহায় দরিদ্র ও মুখাপেক্ষীদের কেউই তাঁর কাছে এসে শূন্য হাতে ফিরে যেত না। খাদিজা তাঁদের দিতেন উদার মনে। মুক্তহস্তে। আনন্দচিত্তে। যারা বড় ও মহৎ, দান করতে.. অপরের দুঃখ ঘুচাতে.. বিপদ দূর করতে– সব সময় অগ্রগামী।
খাদিজা বিশ্বাস করেন- ব্যবসার এই যে লাভ, তা গভীরভাবে সম্পর্কিত ওই দানের সাথে! যার দান যতো বেশি হবে তার লাভও ততো বেশি আসবে। এটা দানের বরকত। এটা দানের মহিমা। এটা দানের অনিবার্য ফল। দান আসলে এক ধরনের ব্যবসা। এ ব্যবসায় পুঁজি খাটালে লাভ– নিশ্চিত। দুনিয়ার প্রচলিত ব্যবসায় পুঁজি নষ্ট হয়ে যায়। লোকসান হয়। কিন্তু দানের এ ব্যবসায় লোকসানের কোনো সম্ভাবনা নেই। এ জন্যেই খাদিজা দানের পরিমাণ বাড়িয়ে দেন, অনেক বাড়িয়ে দেন। অন্যরা এতে বিস্মিত হয়, ভীষণ বিস্মিত! যেমন বিস্মিত তারা তাঁর ব্যবসার ক্রমোন্নতিতে। সবাই বুঝতে পারে না দানের বরকত ও মহিমা। তাই ওরা বিস্মিত হয়– এতো দান করলে কেমনে ব্যবসা হবে! পুঁজিই তো খতম হয়ে যাবে?! অথচ খাদিজার ব্যাপারটা একেবারেই উল্টো! খাদিজা কেবল দান করেন, রাতে-দিনে। একে-ওকে—সবাইকে! প্রকাশ্যে গোপনে। কিন্তু কী আশ্চর্য! তাঁর ব্যবসার কোনো ক্ষতি তো হচ্ছেই না, বরং দিনে দিনে তা আরও বাড়ছে, বাড়ছেই!! বড় বড় ব্যবসায়ীরা সামান্য লাভ তুলে আনতে কী পরিশ্রম করে! অথচ খাদিজা অন্তঃপুরবাসিনী হয়েও কেমন ‘তরতর’ করে এগিয়ে যাচ্ছেন! এমন কি সবাইকে ছাড়িয়ে যাচ্ছেন!
অনেকে খাদিজার এ উন্নতি সইতে পারে না। হিংসায় জ্বলে আর বলে- নারীরা কেন অমন করে ‘পুরুষের ময়দানে’ ঝাঁপিয়ে পড়বে?! কিন্তু সমালোচকদের নিন্দাবাক্যে খাদিজা কান দেন না, আপন মনে ব্যবসা পরিচালনা করে যেতে লাগলেন। অন্তঃপুরে বসেও বাইরের বড় বড় ব্যবসায়ীদের পেছনে ফেলে তিনি আপন মহিমায় জ্বলে উঠলেন। খাদিজার একমাত্র কাজ এখন দু’টি। নিজের সন্তানদের লালন-প্রতিপালনে ব্যস্ত থাকা এবং ব্যবসা পরিচালনা করা। এর বাইরে আর কোনো চিন্তা তাঁর নেই। বিশেষত নতুন করে ঘর-সংসার করার কথা মাথা থেকে একেবারেই ঝেড়ে ফেলে দিয়েছেন তিনি। অনেক সময় খাদিজার ভাইয়েরা এসে তাঁকে অনুরোধ করেন— আবার নতুন করে ঘর বাঁধতে, উপযুক্ত পাত্র দেখে বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হতে। তাহলে তাঁকে আর ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে অমন কষ্ট করতে হবে না, স্বামীই সবকিছু দেখাশোনা করবেন। কিন্তু খাদিজা রাজি হন নি, হতে পারেন নি। তিনি বরং ভাইদের বুঝিয়েছেন যে নারীও কর্মের ময়দানে একেবারে মেধাশূন্য নয়। পুরুষের আকল থাকলে নারীরও আকল আছে। পুরুষের প্রজ্ঞা থাকলে নারীরও প্রজ্ঞা আছে। পুরুষের দক্ষতা ও পারদর্শিতা থাকলে নারীরও আছে। নারী ইচ্ছে করলে.. সংকল্পে স্থির থাকলে, সেও পারে দুর্গম পথ পাড়ি দিতে। তখন পথের দূরত্ব কমে যায়—দূর চলে আসে একেবারে কাছে। কঠিন হয়ে যায় সহজ। কাঁটা হয়ে যায় ফুল। তারপর খাদিজা ভাইদের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বলতেন:
—তোমরা আমাকে নিয়ে কিচ্ছুটি ভেবো না, আমি সেসব পুরুষের সামনে একটা দৃষ্টান্ত পেশ করতে চাই, যারা নারীদের কেবলই ‘ভোগ্যপণ্য’ মনে করে।
ভাইয়েরা খাদিজার সাথে কথা ও যুক্তিতে পেরে উঠতেন না; অনেকটা রাগ করেই চলে যেতেন। কিন্তু যখন খাদিজাকে নিয়ে মানুষের বক্র-উক্তি কানে আসতো— ‘খোআইলিদ কন্যার যে কী হলো, আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না! কেন ও অমন করে পুরুষের কর্মকে বেছে নিলো? মহিলাদের কি আর কোনো কাজ নেই?’ তখন ভাইয়েরা আবার এসে বোনকে পূর্বের মতো অনুরোধ করতেন। কিন্তু খাদিজা যেনো ‘বধির’—কিছুই শোনেন না। আপন মনে আপন পথে কেবলই এগিয়ে চলা, দৃঢ় অবিচলতায়। ‘পাছে লোকে কিছু বলে’র কোনো পরোয়া নেই। এ ব্যস্ততার ভেতরেই তিনি খুঁজে পেয়েছেন এমন এক মজা, যা তাঁকে ভুলিয়ে দিয়েছে পেছনের সব ব্যথা-বেদনা। ভুলিয়ে রাখছেন সামনের ‘নতুন জীবন’এর চিন্তা থেকেও।
শেষ পর্যন্ত সকল আলোচনা ও সমালোচনা পেছনে ফেলে তিনি পৌঁছে গেলেন এমন এক অবস্থানে, যেখানে পৌঁছলে মানুষ মানুষের চোখে বড় হয়ে যায়! দিন যতো গড়াচ্ছে খাদিজার এ অবস্থান ততো মহিমান্বিত হচ্ছে। তাঁর সম্মান ও মর্যাদাও ততো বাড়ছে। সবাই তাঁকে এখন সমীহ করতে লাগলো। তারা মুগ্ধ, সন্তানদের প্রতি তাঁর অপরিসীম সেবা-যত্ন ও তারবিয়াত দেখে। যে-কোনো মহৎ কাজে খরচ করেন তিনি অকাতরে। একটি দিরহামও খরচ করেন না তিনি অকারণে। খাদিজা নারীজাতির গর্বে পরিণত হয়েছেন। সব নারীই তাঁকে নিয়ে গর্ব করে স্বামীদের কাছে। তাদের কাছে তুলে ধরে নারীর শক্তি ও ক্ষমতার গল্প।
খাদিজার প্রাচুর্য যতো বাড়ছিল.. তাঁর খ্যাতি যতো ছড়াচ্ছিল, মক্কার নেতৃস্থানীয়রা এবং যুবকেরা ততোই উদগ্রীব হয়ে উঠছিল খাদিজাকে ‘বউ হিসাবে’ পেতে। যে যার মতো করে এ জন্যে চেষ্টা করে যাচ্ছিল। কেউ কেউ মাধ্যমও ধরছিল। কিন্তু আগেই যেমনটা বলে এসেছি, খাদিজা এ দিকটায় ফিরেও তাকাচ্ছেন না। কারও কথায় কোনো কান দিচ্ছেন না। কারও প্রস্তাবে কোনো সাড়া দিচ্ছেন না। এভাবে সময় আরও পেরিয়ে গেল। মক্কার ‘মানুষ’ খাদিজাকে পাওয়ার জন্যে আরও ব্যাকুল হয়ে উঠলো। কেননা, খাদিজার বয়স যতো বাড়ছিল মানুষের কাছে তাঁর মূল্যায়নও ততো বাড়ছিল।
কিন্তু এদের কেউই সরাসরি খাদিজার সাথে কথা বলার সাহস পাচ্ছিল না। তাঁর সীমাহীন ব্যক্তিত্বের সামনে সবাই ছিল নিষ্প্রভ ও ম্লান। তাঁর সামনে যেতে ও মুখোমুখি হতে যে সৎ-সাহস ও সুব্যক্তিত্বের প্রয়োজন, তা কারোই ছিল না। তাই সবাই আশ্রয় নিয়েছিল ছোট-বড় মাধ্যমের, যাদের কেউ নারী, কেউ-বা পুরুষ। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। কারও সুপারিশই কাজে লাগলো না। মহীয়সী খাদিজাকে কেউ রাজি করাতে পারলো না। তিনি নিজের কাজে ব্যস্ত। নিজের পথচলায় অবিচল। নিজের সাধনায় আচ্ছন্ন। তিনি সন্তানদের প্রকৃত লালন-প্রতিপালন নিয়ে ব্যস্ত। তিনি নিজের ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত। তিনি অনেক বার কষ্ট ও আঘাত পাওয়ার পর এখন আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরস্কার লাভ করার জন্যে নীরবে অপেক্ষা করছেন! এ অপেক্ষার ভাষা ও শব্দ শুধু তিনিই শুনতে পান। শুধু তাঁর কানেই গুঞ্জরিত হয়। আর কেউ শুনতে পায় না। বুঝতে পারে না। উপলব্ধি করতে পারে না। অন্যরা কেবলই ভাবে- খাদিজার এ নীরবতা এবং এ ভাবলেশহীনতা কেন! আর খাদিজা নীরবে ভাবেন, এবার আশা- মিলবেই পুরস্কার!
📄 আবেদন
ইয়েমেনে পাঠানো বাণিজ্য-কাফেলা ফিরে আসার সময় হলো যখন, সুসংবাদদাতা এসে একদিন জানালো— শিগগিরই আমাদের বাণিজ্য-কাফেলা মক্কায় পৌঁছবে।
কাফেলার আগমনের খবর পেয়ে খাদিজার মহলে সাড়া পড়ে গেল। সবাই কর্মব্যস্ত হয়ে উঠলো। নতুন নতুন পণ্যের জন্যে প্রস্তুত হতে লাগলো পণ্যশালা। এ খবর ছড়িয়ে পড়লো সারা মক্কায়। মানুষ দলে দলে আসতে লাগলো খাদিজার বাড়িতে, খাদিজার কাছে। এরা এমন উপলক্ষে সব সময় আসে, ভিড় জমায়। খাদিজার কাছে। দানের আশায়। খাদিজা এদেরকে দেন অকাতরে, এদের মন ভরে। ধারণার চেয়ে অনেক বেশি করে।
খাদিজার বাঁদিরাও উল্লসিত। ওদের কপালও এখন খুলবে। আগে থেকেই খাদিজার কাছে বায়না ধরে রেখেছিল এরা সবাই— আমার জন্যে চাই এবার একটা সেরা উপহার! খাদিজা কাউকে ‘না’ করেন না, ‘না’ করতে পারেন না। কাফেলা পৌঁছলে সবাই সবার উপহার পেয়ে যাবে— এটাই ওরা ধরে নেয়। তাই কাফেলার আগমন-সংবাদে সবাই আনন্দে মেতে ওঠে!
কাফেলা মক্কায় পৌঁছে গেছে। খাদিজার পণ্য খালাস করা হচ্ছে। সব নিয়ে রাখা হচ্ছে গুদামঘরে। কাফেলার দায়িত্বে নিয়োজিত লোকদের মুখ থেকে খাদিজা শুনছিলেন বিভিন্ন অবস্থা। কী কী আনা হয়েছে, কোথাও কোনো সমস্যা হয়েছিল কি না—ইত্যাদি। সবাই খাদিজাকে আশ্বস্ত করলো, খুব চমৎকার সব পণ্য এ যাত্রা আনা হয়েছে। কোথাও কোনো সমস্যা বা জটিলতা সৃষ্টি হয় নি। সবই ঠিক-ঠাক মতো সম্পন্ন হয়েছে।
কথা শেষ করার পর সবাই খাদিজাকে সশ্রদ্ধ অভিবাদন জানালো। তারপর মুগ্ধদৃষ্টিতে খাদিজার হাসিভরা মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। খাদিজা শ্রমিকদের মুখে সব শুনে সন্তোষ প্রকাশ করলেন। সবাইকে উপযুক্ত পারিশ্রমিক দিলেন। চাহিদার চেয়ে সবাইকে বাড়িয়ে বাড়িয়ে দিলেন। ধারণার চেয়ে বেশি ‘সম্মানী’ পেয়ে সবাই আনন্দচিত্তে বেরিয়ে গেল, খাদিজার প্রতি কৃতজ্ঞতার ‘পশলা পশলা বৃষ্টি বর্ষাতে বর্ষাতে’!
সবাইকে বিদায় দিয়ে খাদিজা এলেন ইয়েমেন থেকে আনা পণ্য পরিদর্শনে। ঘুরে ঘুরে তিনি দেখতে লাগলেন বিভিন্ন পণ্যের বহর ও বাহার। বাঁদিরা আছে তাঁর সঙ্গে। খাদিজা কিছু মূল্যবান অলঙ্কার তুলে নিয়ে বাঁদিদের হাতে তুলে দিচ্ছিলেন একে একে। ওরা অভাবিতভাবে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি পেয়ে আনন্দে ভাসতে লাগলো! একে অপরকে নিজেরটা দেখিয়ে গর্বভরে বলতে লাগলো— এই যে দেখো, আমারটা সবচেয়ে সুন্দর.. সবচেয়ে দামি! ইশ্, দেখতে কী সাদা!! আরেকজন বলছিল– আমারটা সবচেয়ে সেরা! দেখো না কী লাল!
এভাবে সবাই নিজের উপহার নিয়ে গর্ব করতে লাগলো। যদিও মানে ও গুণে সবগুলো উপহারই ছিল ভালো ও সেরা। এ ছিল ইয়েমেনী বাণিজ্য-কাফেলার গল্প। এবার বলি সিরিয়ার বাণিজ্য-কাফেলার কথা। কয়দিন পরই এ বাণিজ্য-কাফেলা যাত্রা করবে।
এখন যাত্রা হবে গ্রীষ্মকালীন বাণিজ্য-কাফেলার.। এ কাফেলা যাবে শামে-সিরিয়ায়। শীতকালীন বাণিজ্য-কাফেলা যায় ইয়েমেনে আর গ্রীষ্মকালীন বাণিজ্য-কাফেলা যায় শামে। ইয়েমেন থেকে বয়ে আনা পণ্য যাবে এখন শামের বাজারে.। এক বাজারের জিনিস লুফে নেয় আরেক বাজারের ব্যবসায়ীরা। এটাই ব্যবসার নিয়ম.। উত্তরে যা থাকবে দক্ষিণে তা থাকবে না বা কম থাকবে.। আবার দক্ষিণের জিনিস পাওয়া যাবে না উত্তরে.। আনতে হলে আনতে হবে দক্ষিণ থেকে.। এভাবেই আল্লাহ এক জায়গার অপ্রয়োজনীয় জিনিসকে আরেক জায়গায় প্রয়োজনীয় করে তোলেন.। মানুষের জীবন-জীবিকার পথ সহজ করে দেন.।
খাদিজা ভীষণ ব্যস্ত হয়ে উঠলেন শামের কাফেলার আয়োজন নিয়ে। খাদিজার এখানে লোকজনের প্রচণ্ড ভিড়। সবাই চায়, খাদিজার কাফেলায় কাজ করতে। খাদিজার মহানুভবতা ও দয়ার অংশ থেকে একটু সিক্ত হতে। কেউ-ই বঞ্চিত হতে চায় না।
কাফেলা রওয়ানা হওয়ার সময় একদম কাছে। শ্রমিকরা অষ্টপ্রহর কর্মব্যস্ত। কেউ পণ্যের আঁটি বাঁধছে। কেউ সওয়ারি প্রস্তুত করছে। কেউ পানির মশক ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পাথেয়-সামগ্রী প্রস্তুত করছে। সব মিলিয়ে খাদিজার মহলে সার্বক্ষণিক কর্ম-কোলাহল। খাদিজা নিজে সব তদারক করছিলেন। প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছিলেন। প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন, কয়দিনের মধ্যেই কাফেলার যাত্রা হবে।
এর মধ্যেই একদিন আবু তালিব এলেন খাদিজার কাছে। খাদিজা আবু তালিবকে সসম্মানে স্বাগত জানালেন। তারপর দু’জন বসে ব্যবসা নিয়ে কথা বললেন। কথা বললেন আরবের বিভিন্ন বাণিজ্য-কাফেলা নিয়ে। লাভ-ক্ষতি নিয়ে। দু’জনের মাঝে আরও অনেক বিষয় নিয়েই কথা হলো। শ্রমিকদের বিশেষত আমানতদার ও দক্ষ শ্রমিকদের নিয়ে তাঁদের মাঝে দীর্ঘ আলাপ হলো। খাদিজা নিজের শ্রমিকদের খুব প্রশংসা করলেন। শ্রমিকদের বিশ্বস্ততা ও একনিষ্ঠতায় তাঁর ব্যবসায় অনেক বরকত হচ্ছে-সে কথাও বললেন খাদিজা। তিনি যে নিজের শ্রমিকদের পারিশ্রমিক বেশ পুষিয়ে দেন, সে কথাও শোনালেন আবু তালিবকে। খাদিজা ব্যবসার ক্ষেত্রে সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম বিষয়ে পূর্ণ জ্ঞান রাখেন দেখে আবু তালিব আপ্লুত হলেন। খাদিজার অনেক প্রশংসা করলেন। শ্রমিকদের সাথে তাঁর মহানুভব আচরণেরও ভূয়সী প্রশংসা করলেন।
কথা শেষ হচ্ছিলো না। দু’জনই কথা বলে যেনো খুব মজা অনুভব করছিলেন। শ্রদ্ধাভাজন আবু তালিবের সম্মানের প্রতি লক্ষ রেখে বুদ্ধিমতী খাদিজা উৎফুল্লচিত্তে আবু তালিবকে সঙ্গ দিয়ে যাচ্ছিলেন। কথা বাঁক নিচ্ছিল বিভিন্ন দিকে। কখনো কথা হচ্ছিল হরেক রকম পণ্য নিয়ে। কখনো নানান কিসিমের মানুষ নিয়ে। এবার আবু তালিব যেনো একটু সুযোগ পেয়ে গেলেন-মূল কথাটা উপস্থাপনের, যে উদ্দেশ্যে মূলত তিনি এসেছেন।
আবু তালিবের প্রিয় ভাই-পো-মুহাম্মদ এখন পঁচিশ বছরের যুবক। তিনি এখনো বিবাহ করেন নি। কারণ, আবু তালিবের এতোটা আর্থিক সচ্ছলতা নেই যে ভাতিজাকে আয়োজন করে বিবাহ করাবেন। মুহাম্মদ কিছুদিন মেষ চরিয়ে চাচাজানকে সহযোগিতা করেছেন। এখন মেষ চরানো আর উপযোগী মনে হচ্ছে না। আবু তালিব চাইছেন মুহাম্মদকে আরও লাভজনক ও সুবিধাজনক কোনো কাজে লাগাতে, যাতে আয়-রোজগারে তাঁদের দিন কিছুটা ফিরে আসে। মুহাম্মদের ঘরে ‘সুন্দর একজন বউ’ আসতে পারেন। তাই এসেছেন আবু তালিব খাদিজার কাছে, মুহাম্মদের উপযোগী একটা কাজের আবদার নিয়ে। সেই আবদার এখনো মনের ভেতরে। কথার মাঝখানে আবু তালিব খাদিজাকে বললেন মৃদু হেসে:
—খাদিজা! আমার ভাতিজা মুহাম্মদের ব্যাপারে তোমার মত কী? তুমি কি মনে করো ও তোমার শামের কাফেলায় কোনো কাজে লাগতে পারে?
খাদিজা উৎকর্ণ হয়ে আবু তালিবকে শুনছিলেন। আবু তালিব থেমে যাওয়ায় কিসের যেন একটা ছন্দপতন ঘটলো। মরুর বুকে একটা উচ্ছল ঝরনাধারা হঠাৎ যেন থেমে গেল। সেই ঝরনাধারার কুলকুল রব যেন নেই হয়ে গেল-থেমে গেল। সব মিলিয়ে খাদিজার হৃদয়ে কিসের যেন একটা আলোড়ন সৃষ্টি হলো!
আবু তালিবের মুখে উচ্চারিত এ নামটা এতো মিষ্টি মিষ্টি লাগছিল কেন? এ নামের পরশ এতো যাদুমাখা কেন? এতো মধুমাখা কেন? আহা! মুহাম্মদ! মুহাম্মদ!! মুহাম্মদ!! কী সুন্দর নাম! খাদিজার কানে যেন মধু ঝরলো!
খাদিজার অনুভবের গভীরে যেন ‘বসন্ত-কলরব’ জেগে উঠলো! খাদিজার হৃদয়-কাননে যেন একসঙ্গে হাজার হাজার ফুল ফুটে উঠলো। সে সব ফুলের সৌরভে যেন তার ভেতরের সব সুরভিত হয়ে উঠলো। অমন কেন হলো? মুহাম্মদ নামটি এত্তো মধুর লাগলো?
মুহাম্মদ সম্পর্কে আগে তো কতোই শুনেছেন। তিনি মক্কার আদর্শ যুবক। সবাই তাঁকে ভালোবাসে, সম্মান করে। সবাই মুগ্ধ তাঁর সততা-বিশ্বস্ততায়। খাদিজা হাসিমুখে বললেন:
—মুহাম্মদের মতো আদর্শ যুবকের কাছে অনায়াসেই আমানতের দায়িত্ব অর্পণ করা যায়! মুহাম্মদ বিশ্বস্ততার প্রতীক। তাঁর প্রতি আমার অগাধ বিশ্বাস আছে। যে-কোনো দায়িত্ব পালনের জন্যেই মুহাম্মদ উপযুক্ত। তবে তাঁর কোনো পূর্ব-অভিজ্ঞতা নেই!
আবু তালিব খাদিজাকে আশ্বস্ত করে বললেন:
—মুহাম্মদের পূর্ব-অভিজ্ঞতা যে নেই তা নয়! ওর বয়স যখন দশ তখন আমার সাথে বাণিজ্য-কাফেলায় শাম সফর করেছে। ব্যবসার কলা-কৌশল অন্যদের চেয়ে মুহাম্মদের বেশ জানা। সফরের দূরত্ব ও ক্লান্তিও আশা করি ওকে কাবু করতে পারবে না। উত্তপ্ত মরুর বুকে অনেকদিন মেষ চরানোয় ওর অর্জিত হয়েছে অনেক গুণ। এর অন্যতম হলো, কর্ম-নৈপুণ্য, ধৈর্য ও সুপরিচালনা।
খাদিজা আবার আপ্লুত হলেন। খাদিজা আবার আগের সেই ছন্দপতন অনুভব করলেন। কেন থামলেন আবু তালিব! খাদিজা বিমুগ্ধচিত্তে শুনে যাচ্ছিলেন আবু তালিবের মুখে মুহাম্মদের উচ্ছ্বসিত গুণগাথা। খাদিজা স্মৃতিকাতর হয়ে পড়লেন।
তাঁর মনে পড়ছে মুহাম্মদের জন্মলগ্নের কথা। সেদিন দাদা আবদুল মুত্তালিব কী যে খুশি হয়েছিলেন! তাঁর খুশিতে সারা মক্কায় খুশির ‘ঢল’ নেমেছিল। তখন খাদিজার বয়স চৌদ্দ।
খাদিজার আরও মনে পড়ছে মুহাম্মদের পিতা আবদুল্লাহর কথা। আবদুল মুত্তালিব যখন আবদুল্লাহকে কুরবানী করতে উদ্যত হলেন তখন মক্কার মানুষের সে কী সকাতর— ‘না! না!!’। আবদুল্লাহ যেনো তাদের সবার সন্তান! তাদের হৃদয়েরই টুকরো!
খাদিজার আরও মনে পড়ে আবদুল্লাহর সাথে আমেনার বিবাহের সেই ঐতিহাসিক দিনটির কথা। সেদিন সারা মক্কা যেন মহাআনন্দ-উৎসবে মেতে উঠেছিল।
খাদিজার আরও মনে পড়ে ছোট্ট মুহাম্মদের কথা। আহা! কী দুঃখের জীবন! জন্মের আগেই বাবাহারা-পিতৃহীন! মা-ও চলে গেছেন একেবারে ছোট্টবেলায়! তবুও কী সুন্দর করে মুহাম্মদ বেড়ে উঠেছেন। ছায়া দিয়েছেন তাঁকে মহানুভব দাদা! তারপর এই হৃদয়বান চাচা!!
খাদিজার হৃদয়ে মুহাম্মদের প্রতি এই বৈঠকেই কোমল একটা ভালোবাসা জন্ম নিলো! আবু তালিবকে লক্ষ করে তিনি বলে উঠলেন:
—আবু তালিব! আমি সানন্দে রাজি! আপনি তো আপনার এক প্রিয় মানুষের জন্যে প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন, দূরের কারও জন্যে প্রস্তাব নিয়ে এলেও তো আমি ‘না’ বলতে পারতাম না!
খাদিজার কথায় আবু তালিবের চেহারা ঝলমল করে উঠলো। তিনি আনন্দে তাকিয়ে রইলেন খাদিজার দিকে, কৃতজ্ঞতাভরা চোখে! এরপর আবু তালিব আরেকটা বিষয়ে একটু কথা বলতে চাইলেন। বুদ্ধিমতী প্রজ্ঞাবতী খাদিজা বিষয়বস্তু বুঝে ফেললেন! আবু তালিবের মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে হাসতে হাসতে বললেন:
—আবু তালিব! এ ব্যাপারে আপনাকে কিছুই ভাবতে হবে না! অবশ্যই তাঁর বিনিময় অন্য কারও সমান হবে না, অনেক বেশি হবে!
আবু তালিব খাদিজাকে অনেক ধন্যবাদ জানালেন। বিদায় নিয়ে ছুটে গেলেন প্রিয় ভাতিজাকে সুসংবাদ দিতে! মুহাম্মদ নিশ্চয়ই তাঁর পথ চেয়ে আছে!! অপেক্ষা করো হে চাচাভক্ত মুহাম্মদ! চাচা আসছেন! তোমার জন্যে মিষ্টি সুসংবাদ নিয়ে! তোমার মুখে এখন হাসি ফুটবে, মিষ্টি হাসি! তৃপ্তির হাসি! অভাবী চাচার সংসারে বাতি জ্বালানোর হাসি!
📄 মুখোমুখি
মুহাম্মদ চাচাজানের মুখে সব শুনে ভীষণ আনন্দিত হলেন। মক্কার উপকণ্ঠে মেষ-চরানো-জীবন থেকে এখন তাঁর যাত্রা হবে সুদূর শাম মুলুকে, খাদিজার ব্যবসা নিয়ে! এখন চাচাজানকে আগের চেয়ে অনেক বেশি সহযোগিতা করা যাবে! এখন একবার যেতে হবে খাদিজার সাথে দেখা করতে। দায়িত্ব বুঝে নিতে একদিন চাচাজানের নির্দেশে মুহাম্মদ গিয়ে উপস্থিত হলেন খাদিজার সাথে দেখা করতে। মুহাম্মদ আগে কখনো এ দিকে আসেন নি।
খাদিজার বাড়ি যেনো রাজপুরী। বিশাল দ্বিতল ভবন। অনেক মানুষ ভেতরে-বাইরে আসা-যাওয়া করছিল। কেউ বড়, কেউ ছোট। কেউ নারী, কেউ পুরুষ। কেউ বের হচ্ছে শূন্য হাতে, কেউ-বা বোঝা নিয়ে। বাঁদি ও খাদেমদের ব্যস্ত আনাগোনা ছিল চোখে পড়ার মতো। ওদের পোশাক-পরিচ্ছদ বেশ সুন্দর পরিপাটি। চেহারা যেনো নূর-ছাওয়া। খাদিজার মহলের পরিবেশ মক্কার অন্য ‘মহলের’ পরিবেশের সাথে মিলছে না। এখানে ক্রীতদাসকে ক্রীতদাস মনে হয় না, মনে হয় ওরাও যেনো বাড়ির কেউ! মুহাম্মদ ভেতরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। একটু পরই অনুমতি পেয়ে তিনি ভেতরে প্রবেশ করলেন!
সদর দরোজা পেরিয়ে তিনি একটা খোলা আঙিনায় প্রবেশ করলেন। তারপর এক খাদেম তাঁকে নিয়ে গেল একটা প্রশস্ত আলিশান কামরায়। মেঝেতে মূল্যবান ফিরাশ বিছানো। কারুকার্যময়। দেয়ালের গায়ে আঁকা সুন্দর সুন্দর নকশা। সূক্ষ্ম হাতের কারু-নৈপুণ্য।
মুহাম্মদকে বসিয়ে খাদেম চলে গিয়েছিল। মুহাম্মদ এখন একা। কামরার এক পাশে তিনি বসা। মুহাম্মদ সুন্দর কামরাটা চোখভরে দেখতে লাগলেন আর মনে মনে খাদিজার অপেক্ষা করতে লাগলেন।
বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। এইমাত্র খাদিজা প্রবেশ করেছেন। গোলগাল চেহারা। দীর্ঘদেহী। বড় বড় চোখ। গভীর মায়াময় দৃষ্টি। দীর্ঘ কেশ। গায়ের রঙ উজ্জ্বল। ঠোঁটে লেগে ছিল এক টুকরো মিষ্টি হাসি। পরে আছেন কারুকার্যময় মূল্যবান রেশমি পোশাক। পায়ে দামি চামড়ার মোজা। কানে মুক্তার দুল।
খাদিজা মুহাম্মদকে সাদর সম্ভাষণ জানালেন। মুহাম্মদ সশ্রদ্ধ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে গেলেন.। প্রতিসম্ভাষণ জানালেন.। খাদিজা মুহাম্মদকে বসতে বললেন.। নিজেও বসলেন অনেকটা দূরে.। খাদিজা ভুলেই গিয়েছিলেন–কিংবা ভুলতেই বসেছিলেন– তাঁর সেই স্বপ্নটা, যা তিনি দেখেছিলেন এই কয়বছর আগে! আর ব্যাখ্যা শুনেছিলেন চাচাতো ভাই ওয়ারাকার মুখে। কী ব্যাখ্যা?
খাদিজার আবার বিবাহ হবে! কার সাথে? একজন নবীর সাথে হবে!! মুহাম্মদকে দেখে.. মুহাম্মদকে সামনে পেয়ে.. মুহাম্মদকে নিজের মহলের ভেতরে পেয়ে খাদিজার আবার মনে পড়ে গেল সেই ভুলে-যাওয়া—প্রায় ভুলে-যাওয়া—স্বপ্নটা! এখন তাঁর মনে হচ্ছে; তিনি যেনো আছেন সেই স্বপ্নের ঘোরে! সেই স্বপ্নের মধুময় আবেশে!! এখন যেনো তিনি রয়েছেন ঘুমে। দেখছেন সেই সূর্যটাকে। এগিয়ে আসছে তাঁর গৃহপানে-আকাশের ঠিকানা ছেড়ে! সারাটা গৃহ কী আলোকময়। সেই আলো ছড়িয়ে পড়ছে এখানে-ওখানে—সবখানে! সারা পৃথিবীতে!!
খাদিজা স্বপ্নের আবেশ থেকে ফিরে এলেন। মুহাম্মদের দিকে তাকালেন। মনে হলো; এ যুবক সাধারণ কোনো যুবক নয়। এর আছে ব্যক্তিত্বের দ্যোতিত বিচ্ছুরণ। মাহাত্ম্যে ঢাকা অনন্য আত্মিক ক্ষমতা।
খাদিজা কথা বলা শুরু করলেন। বাণিজ্য-কাফেলা নিয়ে। তাঁর ব্যবসা নিয়ে। মুহাম্মদের নতুন দায়িত্ব নিয়ে। সম্ভাব্য লাভ নিয়েও তিনি কথা বললেন। তিনি মুহাম্মদকে তাঁর দায়িত্ব সুন্দর করে বুঝিয়ে দিলেন।
পথ কেমন? নিরাপত্তা আছে কি? কোনো ভয় নেই তো! আগের বাণিজ্য-কাফেলা থেকে কেমন লাভ এসেছে? পথে কোথায় কোথায় থামতে হবে? থামার পর কাজ কী হবে? নতুন করে পাথেয় সংগ্রহের প্রশ্ন আছে কি? চলার পথে ক্রয়-বিক্রয়ের কোনো ব্যাপার আছে কি? নাকি একেবারে শামে গিয়েই শুরু করতে হবে বেচা-কেনা? খাদিজা সবই বলে দিলেন একে একে মুহাম্মদকে।
মুহাম্মদ নিবিষ্টচিত্তে কান পেতে খাদিজার কথা শুনলেন। শুধু খাদিজাকেই বলতে দিলেন। খাদিজার কথা যখন শেষ, তখন দাঁড়িয়ে খাদিজার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করলেন তারপর তাঁর অনুমতি নিয়ে গৃহে ফিরে এলেন!
মুহাম্মদকে বিদায় দিয়ে এবার খাদিজা ভালো করে ভাবতে বসলেন। ভেবে ভেবে খাদিজা স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেলেন যে মুহাম্মদ সম্পর্কে এতোদিন লোকমুখে তিনি যা শুনে এসেছেন তা সবই বর্ণে-বর্ণে সত্যি। খাদিজা অনুভব করলেন, মুহাম্মদের প্রতি স্নেহ-ভালোবাসায় তাঁর হৃদয় বারবার দুলে উঠছে! তিনি সামনে বেড়ে আরও ভাবলেন- এই মুহাম্মদই কি তাঁর সেই স্বপ্নসূর্য? মুহাম্মদই সেই নবী কি না! মুহাম্মদই তাঁর ভাবী স্বামী কি না!