📄 মক্কার ধর্মযাজক
উচ্ছ্বাসমাখা হাসি-আনন্দে আর মন ছুঁয়ে-যাওয়া সঙ্গীতে সবাই মুগ্ধ। সবার চেহারায় ঝলমল করছে স্বল্পালোকিত রাতের মায়াবি দ্যুতি। কিন্তু একজন বসে আছেন তাদের কাছে, একটু দূরে গম্ভীর হয়ে। এই গণআনন্দেও তাঁর যেন আনন্দ নেই। এই গণজোয়ারেও তাঁর যেন কোনো প্রবহমানতা নেই। কেমন নীরব নিস্তব্ধ ভাবলেশহীন। আপন ভুবনে নিমজ্জিত। নিজের চিন্তায় সমাহিত। কখনো তাকাচ্ছেন গভীর দৃষ্টিতে এদের দিকে.. ওদের দিকে। আসরের কাছে তিনি যে অপরিচিত তা নয়, মক্কার সবাই তাঁকে জানে, চেনে। মক্কার পাহাড়-পর্বত-উপত্যকা—সব তাঁকে চেনে। এ জন্যে সবাই তাঁকে কাছে আসতে বললো। আজকের এ আনন্দে শরিক হতে বললো। পান করতে বললো। সঙ্গীত উপভোগ করতে বললো। খোআইলিদ তাঁকে ডেকে উঠলেন এই বলে:
—ওয়ারাকা! অমন গম্ভীর হয়ে বসে আছো যে! এসো, কাছে এসো! আজ আনন্দের দিন। চাচাতো বোন খাদিজার আনন্দে কেন তুমি অংশ নেবে না?!
ওয়ারাকা চাচার কথায় মৃদু হেসে বললেন:
—চাচা! আপনি তো জানেন, এসব গান-আনন্দ আমার ভালো লাগে না। আপনাদের জগৎ থেকে আমার জগৎ আলাদা!
খোআইলিদের পাশের একজন বলে উঠলো:
—ওয়ারাকা! তুমি যে কী! তুমি কি বদলাবে না? এক কাজ করো তাহলে, মক্কা ছেড়ে চলে যাও! সমাজ থেকে আলাদা হয়ে যাও! মক্কার মানুষের সাথে তোমার কী সম্পর্ক? মক্কার ধর্ম মানো না তুমি! মক্কার সমাজ মানো না তুমি!
তার সাথে যোগ দিলো আরেক লোক:
—ওয়ারাকা! তুমি মক্কার নও, মক্কাও তোমার নয়! তোমার দীন-ধর্ম ভিনদেশি—রোম থেকে পাওয়া! আমাদের উপাস্যদের সাথে তোমার কোনো সম্পর্ক আছে বলে মনে হয় না। কেন তুমি পড়ে আছো এখানে? আমাদের উপাস্যরা তোমার চোখে মূল্যহীন? মোটেই তা ভেবো না! আমাদের উপাস্যরা আমাদের সাহায্য করে। দেখে দেখে রাখে। বিপদে সাহায্য করে। আমাদের ‘গায়ে’ মঙ্গল ও কল্যাণ ঢেলে দেয়। ওয়ারাকা! এই যে দেখতে পাচ্ছো না, আজ আমাদের কী আনন্দ? এ আনন্দ আমাদের উপাস্যদেরই দয়া ও দান! আজ তো খোআইলিদ-কন্যা খাদিজার বিবাহ-অনুষ্ঠান। আজ খাদিজা চলে যাবে আতিক বিন আবিদের গৃহে। এ উপলক্ষে তুমি যে খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন দেখছো, তাতে কে মজা ও রস ঢেলে দিয়েছে—জানো? সে আমাদেরই এই উপাস্যরা! আমাদের এই যে আজকার হাসি-আনন্দ, তাও বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে এই উপাস্যদেরই বরকতে! সুতরাং হে ওয়ারাকা! তুমি তোমার নিরস জগৎ ছেড়ে আমাদের সরস জগতে প্রবেশ করো! ভোগ করো আনন্দ, আমাদের সাথে মিশে যাও! নইলে তুমি পস্তাবে, কঠিন মাশুল দেবে! অনেক কল্যাণ তোমার হাতছাড়া হয়ে যাবে!
আরেকটা বিদ্রূপ-কণ্ঠ বেজে উঠলো পাশ থেকে:
—ওয়ারাকা! কবে থেকে তুমি অমন সাধু বনে গেলে? কেন ‘ধর্ম নিয়ে’ এতো খোঁজাখুঁজি করছো? কেন দেশে-দেশে এতো ঘোরাঘুরি করছো? এ সবই আত্মপ্রতারণা, বুঝলে হে ওয়ারাকা? আশ্চর্য! বাপ-চাচাদের কাছ থেকে কিছুই তুমি শিখলে না! তুমি কী চাও আসলে? তুমি কি আমাদের সবকিছু নষ্ট করে দিতে চাও?
আরও অনেকেই এ বিদ্রূপমাখা আলোচনায় অংশ নিলো। কিন্তু ওয়ারাকা তেমন কিছুই বললেন না। দীর্ঘশ্বাসজড়িত কণ্ঠে কেবল উচ্চারণ করলেন:
—করো, যতো পারো বিদ্রূপ করো আমাকে নিয়ে! এমন একদিন আসবে, যখন আমি বিদ্রূপ করবো তোমাদের নিয়ে! জানো, সে সময়টা কখন? সে সময়টা হলো নবীর আগমনের মহালগ্ন! হ্যাঁ.. সে নবী আসবেন এই তোমাদেরই মধ্য থেকে! তিনি এসে তোমাদের এ-সব মূর্তি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবেন! তোমাদের বাতুলতাকে ধূলোয় মিশিয়ে দেবেন!
ওয়ারাকার কথা শুনে সবাই অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো, ওয়ারাকা যেন পাগল! তার মুখে যেন পাগলের অসংলগ্ন উক্তি! একজন চিৎকার করে বলে উঠলো—কে সেই নবী, ওয়ারাকা? কোন বংশে তাঁর আগমন? তুমিই তো নও?! তুমি পাগল হয়ে গেছো ওয়ারাকা, তুমি পাগল হয়ে গেছো! তুমি দ্রুত মক্কা ছাড়ো, আবার তোমার ‘দেশভ্রমণে’ বের হও! ধর্মচর্চা করোগে গিয়ে! কিন্তু মনে রাখবে, অন্য কোনো ধর্মটর্ম মক্কায় আমদানি করলে আমরা তোমাকে ছাড়বো না! আমাদের ধর্ম শুধু আমাদের বাপ-দাদাদের ধর্ম!
হঠাৎ শোনা গেল একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির গম্ভীর কণ্ঠ, এই.. থামো তো! কী তর্ক শুরু করলে তোমরা? তোমরা তো দেখছি আজকের আনন্দের রাতটাকেই বাসি করে দিচ্ছো! সাবধান! আর একটা কথাও নয়! এখন চলবে শুধু গান! শুধু পান!
আবার শুরু হলো গান আর পান! হর্ষোল্লাস আর দফের আওয়াজে আবার নেমে এলো আসরীয় মাদকতা!
মান্যবর কুরাইশ সরদার আবদুল মুত্তালিবও এ আনন্দ-অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন। আজকের এ আনন্দ-অনুষ্ঠানের পূর্বে কুরাইশ কোনো আনন্দ-অনুষ্ঠান করে নি। আর এর কারণ ছিল আবদুল মুত্তালিবের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ। প্রিয় ছেলে আবদুল্লাহকে তিনি খুব ঘটা করে বিবাহ করিয়েছিলেন। কিন্তু কিছুদিন যেতে না-যেতেই আবদুল্লাহ চলে গেলেন! আবদুল্লাহর শোকে আবদুল মুত্তালিব ভীষণ কাতর হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর শোকে সারা মক্কা শোকের চাদর পরলো। সব আনন্দ-অনুষ্ঠান থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিলো। নেতা যদি শোক-বিহ্বল থাকে, অন্যরা কেমন করে আনন্দ করবে? আজ অনেক দিন পর মক্কা আবার আনন্দ দেখলো। আনন্দের পরিবেশ উপভোগ করলো। স্বয়ং আবদুল মুত্তালিবও তাতে অংশ না নিয়ে পারলেন না। কিসের টানে শোকাকুল আবদুল মুত্তালিব এখানে আকুলচিত্তে ছুটে এলেন—তা নিজেও পুরোপুরি বুঝতে পারলেন না। এখানে এসে যেন সব শোক তিনি কাটিয়ে উঠেছেন! নাহ! শুধু শোক কাটিয়ে উঠেছেন বলছি কেন? তিনি অফুরন্ত আনন্দও অনুভব করছেন! হৃদয়টা ভরে গেছে স্বস্তি ও প্রশান্তিতে। কারণ আছে। এখানে এসেছেন বলেই যে তাঁর মনটা শান্ত ও প্রশান্ত হয়েছে, কেবল তা-ই না, আরও কারণ আছে। তা হলো আল্লাহ আবদুল্লাহর বিনিময় দান করেছেন তাঁকে। আবদুল্লাহর স্ত্রী আমেনার গর্ভে জন্ম নিয়েছে এক শিশু। তার নাম রেখেছেন তিনি আদর করে—মুহাম্মদ।
এ মুহাম্মদের বরকতেই এখন তাঁর শোক পরিণত হয়েছে আনন্দে। স্বস্তিতে। প্রশান্তিতে। সবাই মুহাম্মদের আগমনে আবদুল মুত্তালিবকে মুবারকবাদ জানাচ্ছিল। আর খাদিজার এ বিবাহ-অনুষ্ঠানে বসে সবাই আবদুল মুত্তালিবের উদ্দেশে এ কামনাও করছিল যে আল্লাহ যেন তাঁর হায়াতকে দারাজ করে দেন, যেন তিনি প্রিয় নাতি মুহাম্মদের বিবাহ-অনুষ্ঠানেও উপস্থিত থাকতে পারেন! জবাবে আবদুল মুত্তালিব হাসেন কৃতজ্ঞতার হাসি, যে হাসিতে লুকোনো আছে এই নীরব ভাষা—সে কী করে হবে! আমার যে এখন অনেক বয়স হয়েছে! আমি পারবো এই দুধশিশুর বিবাহ দেখে যেতে? আহ! আল্লাহ যদি এমনটি করতেন!
নৈশালাপ চললো ফজর-অবধি। এর মধ্যে নববধূ বনু মাখযূমে আতিক-গৃহে যাত্রা করেছেন। আতিক অনেক সুন্দর করে সাজিয়েছেন নিজের বাড়িটি, খাদিজার উপযুক্ত করে। এদিকে ধীরে ধীরে অন্যরাও চলে গেল নিজেদের বাড়িতে, খুশির রাঙা আবির মেখে।
খাদিজা প্রবেশ করলেন নতুন জীবনে। এ জীবনের কতো স্বপ্ন এঁকেছেন তিনি মনে মনে। এ জীবন নিয়ে কতো আশা বাসনা লুকিয়ে ছিল তাঁর মনোজগতে। কিন্তু তবুও তিনি স্বস্তি অনুভব করতে পারছেন না, কোনো অদৃশ্য ইশারা কি তাঁর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে বাঁকা চোখে হাসছে?! আল্লাহই ভালো জানেন। তিনিই সবকিছুর খবর রাখেন—আল্লামুল গয়ুব।
📄 তাকদীর
খাদিজা এখন স্বামীগৃহে। পিত্রালয়ের শৈশব-কৈশোরের মধুময় স্মৃতি থেকে-থেকে তাঁকে হাতছানি দিয়ে ডাকলেও এখন এ গৃহই তাঁর আসল গৃহ। এখানে এখন বাসা বেঁধেছেন তিনি আর তাঁর হৃদয়ে বাসা বেঁধেছেন তাঁর স্বামী। স্নেহ-মমতা ও ভালোবাসা-আনুগত্য দিয়ে স্বামীর মন জয় করতে একটুও বেগ পেতে হয় নি, কষ্ট করতে হয় নি। বিনিময়ে স্বামীর কাছেও পেয়েছেন তিনি সম্মান ও ভালোবাসা। পেয়েছেন স্বস্তির ঠিকানা। প্রশান্তির ‘সবুজ’ নীড়।
স্বামী আতিক বিন আবিদ খাদিজাকে পেয়ে সীমাহীন আনন্দিত। পুলকিত। তিনি স্ত্রী হিসাবে খাদিজার কাছে যা যা আশা করেছিলেন তা পেয়েছেন, যা আশা করেন নি তাও পেয়েছেন। মুগ্ধ ও তৃপ্ত হয়েছেন। স্বস্তি ও প্রশান্তিতে আপ্লুত হয়েছেন।
আতিকের এ বাড়ি যেন তাঁর আগের সেই নিজেরই বাড়ি। সব তাঁর অনুকূল। আগে ছিলেন তিনি ওই বাড়ির শোভা। এখন তিনি এ বাড়িরও শোভা। খাদিজারা সব বাড়িরই শোভা। শুধু ঘরের প্রতিই খাদিজার মন নেই, বাইরেও তিনি চোখ রাখেন। সতর্ক দৃষ্টি রাখেন। আতিকের বিশাল ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনায় প্রধান পরামর্শক তিনিই।
খাদিজা ও আতিক দাম্পত্য একটি আদর্শ দাম্পত্য। সবার জন্যে আদর্শ। এ দাম্পত্য এখন মক্কার গর্ব। সুখ-শান্তি-আনন্দ-ভালোবাসায় প্লাবিত এ দম্পতি। নেই অশ্রদ্ধা। নেই অবহেলা। নেই অভিযোগ ও বিরোধ।
মেয়ের জন্যে এ সুন্দর নীড় রচিত হওয়াতে বাবা খোআইলিদও খুশি। বারবার তিনি ছুটে যান খাদিজাকে দেখতে—তাঁর ভালোবাসায়, তার মায়ায়। অনেকক্ষণ বসে থেকে.. অনেক কথা বলে তারপর রওনা হন নিজের বাড়িতে, নিজের কাজে। বের হতে হতে মেয়েকে কৃতজ্ঞতা জানান তাঁর স্বামীভক্তির জন্যে.. স্বামীর সর্বানুগত্যের জন্যে। আতিকের সাথে কথা বললেই তিনি বুঝতে পারেন—মেয়ে খাদিজা আনুগত্য ও ভালোবাসা দিয়ে আতিকের মন ‘দখল’ করে নিয়েছেন! এই তো চান তিনি! এই তো দাম্পত্যের সুখ রচনার কেন্দ্রবিন্দু! এসব ভাবতে ভাবতে তাঁর আনন্দ আরও শতগুণ বেড়ে যায়! গৃহে ঢুকতে ঢুকতেই তিনি প্রিয় স্ত্রীর নাম ধরে ডেকে ওঠেন তাঁকে সুখের খবর বলতে—ফাতেমা!
হ্যাঁ, ফাতেমাও ছিলেন মেয়েকে নিয়ে ভীষণ খুশি। মেয়েকে তিনি ছোটবেলা থেকেই সব শিখিয়েছেন। শেখাতে শেখাতে তাকে রত্ন বানিয়েছেন। এ রত্ন যে স্বামীগৃহেও রত্ন হবে, সে ব্যাপারে ফাতেমার কোনো সন্দেহ কোনো কালেই ছিল না। ফাতেমা লক্ষ করেছেন কতোবার, ছোটবেলা থেকেই খাদিজা তাঁদের খুশি ও সন্তুষ্ট রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করতো। তাহলে এখন কেন স্বামীর সন্তুষ্টি তাঁর লক্ষ হবে না? এখন ও-বাড়ি থেকে খাদিজার প্রশংসা শুনলে গর্বে তাঁর বুক ফুলে যায়। কৃতজ্ঞতায় আল্লাহর দরবারে তাঁর মাথা নুয়ে আসে। এমন মেয়ে জন্ম দিতে পেরে তিনি ভীষণ গর্ব অনুভব করেন। কেবলই আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করেন।
দেখতে দেখতে খাদিজা-আতিকের দাম্পত্যের বছর পার হয়ে গেল, সুখে-শান্তিতে মমতার বন্ধনে। এর মধ্যেই খাদিজার কোল আলোকিত করে জন্ম নিয়েছে এক মেয়ে। দৃঢ় বন্ধন আরও দৃঢ় হলো। স্নেহ-মমতা-ভালোবাসার বন্ধন আরও মধুময় হলো। মেয়েটি ছিল দেখতে অনেকটাই খাদিজার মতো।
কিন্তু খাদিজা-আতিকের এ দাম্পত্য-সুখ স্থায়ী হলো না। বিবাহের দ্বিতীয় বছরটি অর্ধেকটা পেরুতে না-পেরুতেই আতিক চলে গেলেন আখেরাতের অনন্ত সফরে, খাদিজার মনে শোকের দগদগে ঘা রেখে। আহ! অমন দায়িত্বশীল একনিষ্ঠ ওফাদার স্বামীর ওফাত কেমন করে সইবেন খাদিজা? রেখে-যাওয়া এ বিশাল সম্পদ ও ব্যবসা এখন কে সামলাবে? স্বামীর আকস্মিক মৃত্যুতে খাদিজা ভীষণ দুঃখ পেলেন। খাদিজার মায়ের দুঃখও খাদিজার দুঃখের চেয়ে কম নয়। তিনি নীরবে অশ্রু ফেলেন আর ভাবেন—আহা, মেয়েটা একটু থিতু না হতেই বিধবা হয়ে গেল! কুরাইশের নারী-পুরুষ খাদিজার স্বামীর অঢেল সম্পদ ও বিরাট ব্যবসা নিয়ে আলোচনা করলে কী হবে, মেয়ে তো বিধবা এখন!
এদিকে যারা সৌন্দর্য মাল ও বংশের পূজারি তাদের চোখ পড়লো—খাদিজার ওপর। অনেকেই কামনা করতে লাগলো স্ত্রী হিসাবে খাদিজাকে। উত্তরাধিকারসূত্রে লাভ করা তার সম্পদের ওপরও পড়লো ওদের লোলুপ দৃষ্টি। তারা খোআইলিদের কাছে আনাগোনা বাড়িয়ে দিলো। শোক প্রকাশের ছদ্মাবরণে তার ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করতে লাগলো। আতিকের মৃত্যুর পর কিছুদিন না-পেরুতেই এদের ভিড় ক্রমে ক্রমে বাড়তে লাগলো। মক্কার ধনীদের বারংবার প্রস্তাব ও বিরক্তিকর পীড়াপীড়িতে খোআইলিদের কান ঝালাপালা হয়ে গেল। সবাই খাদিজার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে বলছিল যে খাদিজা তার গৃহে এলে সব বদলে যাবে তাঁর ছোঁয়ায়।
খোআইলিদ যদিও চাচ্ছিলেন আতিকের ওফাতের পর বেশিদিন খাদিজা একাকী না থাকুক, কিন্তু পাশাপাশি তিনি উপযুক্ত পাত্র ছাড়া তাকে যে-কারও হাতে তুলে দিতেও মোটেই রাজি ছিলেন না তিনি। এদিকে এ বিষয়ে তিনি খাদিজার সাথে কথা বলতে পারছেন না। খাদিজা এখনো ভীষণ শোকাহত। ফাতেমাও নতুন কোনো প্রস্তাব নিয়ে মেয়ের মুখোমুখি হতে পারছেন না। কেননা তিনি ভালো করেই জানেন, তার মেয়ের এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এমন একটি কোমল কণ্ঠের, যা তার মন থেকে শোক-দাহ নিভিয়ে দিতে পারবে। তাকে শোনাবে সমবেদনা ও সান্ত্বনার শীতল বাণী। এমন কণ্ঠের এখন প্রয়োজন, যা খাদিজাকে গিয়ে বলবে—খাদিজা! আবার তোমাকে বিবাহের জন্য প্রস্তুত হতে হবে। ফাতেমা জানেন, খাদিজা আর নতুন করে বিবাহে আগ্রহী নয়। নিজের মেয়েটিকে মানুষ করা আর আতিকের ব্যবসার হাল ধরাই এখন খাদিজার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মেয়েটাকে নিয়ে আরেকজন অপরিচিত মানুষের মুখোমুখি হতে তিনি অপ্রস্তুত।
এভাবেই কেটে যেতে লাগলো দিনের পর দিন.. মাসের পর মাস। খাদিজা এখনো সেই শোকের চাদরটা গা থেকে সরাতে পারছেন না, জীবন নিয়ে নতুন করে কিছু ভাবতে পারছেন না। মেয়েটিকে নিয়েই কাটে তাঁর সারাবেলা। ঘর থেকেও বের হন না। তাঁর মুখের আগের সেই হাসিটি এখন আর নেই, কোথাও যেন হারিয়ে গেছে। দুঃখের সংবাদ কানে এলেই চোখ ছলছল করে ওঠে। আনন্দের সংবাদ শুনলে মন দুরুদুরু করে ওঠে। কেননা আনন্দ-বেদনা তাঁর হৃদয়ে তোলপাড় সৃষ্টি করে, স্বামীর হাজারো স্মৃতি তখন তাঁর মনকে স্মৃতিকাতর করে তোলে।
এদিকে খোআইলিদের কাছে অনবরত প্রস্তাব আসছেই। কিন্তু খাদিজাকে গিয়ে সে কথা বলতে পারছেন না তিনি। খাদিজার অবস্থা এখনো আগের মতোই। মেয়ের শোকতপ্ত শুকনো মুখটা দেখলেই খোআইলিদের মন খারাপ হয়ে যায়। ভেতরটা হু হু করে ওঠে। ফাতেমাকে বলেন নিজের মনের কথা। নিজের খারাপ লাগার কথা। ফাতেমাও তাঁকে শোনান একই কথা। বাবা ব্যথিত হলে মা তো আরও ব্যথিত! মেয়ের ব্যথা তো বাবার আগে মাকেই বেশি স্পর্শ করে! কিন্তু মা খাদিজাকে গিয়ে মুখ ফুটে কিছুই বলতে পারছেন না।
কিন্তু কতোদিন আর? সময় তো গড়িয়ে যাচ্ছে! খোআইলিদ আর মানতে পারছেন না খাদিজার নিঃসঙ্গ জীবন। কেন মেয়েটা দুঃখে-বেদনায়-শোকে অমন ম্রিয়মাণ হয়ে থাকবে? কেন ও আগের মতো হাসবে না? উচ্ছলতায় বাবা-মাকে এবং নিজেকে প্রাণবন্ত করে রাখবে না? না, এ কিছুতেই হতে দেওয়া যায় না!
একদিন খোআইলিদ গিয়ে নীরবে বসলেন মেয়ের কাছে। অনেকক্ষণ বসে রইলেন। এতো সময় কখনো তিনি মেয়ের কাছে বসেন না। তারপর নীরবতা ভেঙে.. সংকোচ ও জড়তা কাটিয়ে বললেন:
—মা আমার! আর কতো পড়ে থাকবে এ শোকের চাদর, খুলবে না আর? অনেক দিন তো হলো আতিক মারা গেছে। তুমি জীবনে যেমন তার হক আদায় করেছো, করে যাচ্ছো। আমি মনে করি, মরণেও তুমি তার হক পুরোপুরি আদায় করেছো। জীবনে-মরণে ও ছিল তোমার শ্রদ্ধার পাত্র। ভালোবাসার মানুষ। কিন্তু তাই বলে তো জীবিতরাও জীবিত থেকে মৃতের জন্যে মরে যেতে পারে না!!
বুদ্ধিমতি খাদিজার মনকে ছুঁয়ে গেল বাবার কান্নাভেজা ও দরদমাখা এসব কথা। খাদিজা বাবার দিকে তাকালেন বড় বড় চোখে। ছলো-ছলো দৃষ্টিতে। তারপর বললেন ভেজা ভেজা আওয়াজে:
—প্রিয়-বিচ্ছেদের পর কিসের আবার জীবন! আতিক নেই তো কী হয়েছে, তাঁর স্মৃতি (মেয়ে) তো আছে!
খাদিজা তারপর আদর করে মেয়ের মাথায় হাত বুলাতে থাকেন। নিজের উদ্গত অশ্রুকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেন না, ঝরঝর করে কপোল বেয়ে বয়ে চললো অশ্রুধারা! বললেন খোআইলিদকে লক্ষ করে:
—আতিকের রেখে যাওয়া এ রত্নই এখন আমার সবকিছু! সারাজীবন একে নিয়েই আমি বাঁচতে চাই! বাবা বিনে ওকে আর কার কাছে তুলে দেবো আমি? না, আমি একে কোনো অজানা মানুষের দয়ামায়ার ওপর ছেড়ে দিতে পারি না! কিছুতেই না!!
খোআইলিদ মেয়ের ভেজা চোখের কাঁদানে কথায় প্রভাবিত হলেন। কোনোভাবে অশ্রু নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করলেন। তারপর স্নেহঝরা কণ্ঠে বললেন:
—কিন্তু মা আমার! তুমি যে বড্ড একা! আমার মনে হয় সময় এসেছে তোমার এ সীমাহীন একাকীত্ব ঘোচানোর! মা! তুমি ‘না’ করো না, এ বুড়ো বাবাকে ফিরিয়ে দিয়ো না!
খোআইলিদ একটু দম নিয়ে আবার বলতে লাগলেন:
—জানো মা! আমি এমন একজন মানুষের নাম এখন তোমাকে বলবো, যার ভেতরে আতিকের ছায়া দেখেছি আমি! আশা করি এ ব্যাপারে আমার সাথে একমত হবে! বলবো তার নামটা? একটু শুনবে কি? নিশ্চয়ই তুমি তার নাম অনেক শুনেছো, নাব্বাশ ইবনে যুরারাহ আত তামিমী! বড়ো উঁচু মাপের মানুষ ও! মক্কাসহ সর্বত্র মশহুর—একজন দানবীর যুদ্ধবীর হিসাবে। হাজার মানুষের ভিড়ে ওকে অনায়াসেই আলাদা করা যাবে! ও হতে পারে শ্রেষ্ঠ স্বামী শ্রেষ্ঠ মেয়ের! সুতরাং এবার তুমি ‘হ্যাঁ’ বলো!
খাদিজা নিরুত্তর! খোআইলিদ আবার কথা বললেন। আবার বললেন। আবার মেয়েকে ‘হ্যাঁ’ বলতে বললেন। অবশেষে খাদিজা ‘হ্যাঁ’ বললেন!!
📄 শোকের উপর শোক, আড়ালে তার কী হাসে
নতুন জীবনে প্রবেশ করলেন আবার খাদিজা। আতিকের মতো এ স্বামীকেও শ্রদ্ধার আসনে বসালেন খাদিজা। ভালোবাসলেন হৃদয় দিয়ে। বাবার কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। আসলেই নাব্বাশ ছিলেন আতিকের প্রতিচ্ছবি। কথায় কাজে আচরণে। নাব্বাশও খাদিজার মাঝে খুঁজে পেলেন এক মহীয়সী বধূ। সুখের ও আনন্দের অনুভূতি তার ভেতরে কলরব করে ওঠে। খাদিজাকেও তিনি ভালোবাসলেন। হৃদয়ের রানী বানালেন। শান্তি-স্বস্তি লাভের ঠিকানা হয়ে গেলেন খাদিজা।
নাব্বাশ ছিলেন অনেক জ্ঞানী ও গুণী। আরও ছিলেন সুবিশাল ব্যবসার মালিক। তার ব্যবসা ছড়িয়ে ছিল দেশে-বিদেশে। ব্যবসায়ী হিসাবে সর্বত্রই তার সুনাম। এ ছাড়া তিনি ছিলেন একজন খ্যাতিমান বীরপুরুষ। তাকে ঢাল-তলোয়ারে সজ্জিত হতে দেখলেই দুশমনের বুকে কাঁপন ধরে যেত। লড়াইয়ে অবতীর্ণ হওয়ার আগেই দুশমন হেরে যেত। নাব্বাশ ছিলেন এমনই শত্রুর কলিজায় কাঁপন-ধরানো জাত-বীর।
এসব গুণের অধিকারী মানুষটিকে পেয়ে খাদিজার ভাঙা মনও জোড়া লাগলো। তাঁকে পেয়ে ভীষণ খুশি তিনি। সব কাজে তিনি তাঁকে সহযোগিতা করেন হৃদয়-মন উজাড় করে। তাঁকে পরামর্শ দেন ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে। নাব্বাশও স্ত্রীর অভিজ্ঞতা কাজে লাগান। তার কাছে পরামর্শ চান নির্দ্বিধায়। খাদিজা আবার সুখী হলেন নাব্বাশের এ নীড়ে। যেমন সুখী হয়েছিলেন আতিকের ওই নীড়ে।
মানুষের দৃষ্টি আকৃষ্ট হতে লাগলো সুখ ও আনন্দঘেরা এ গৃহের দিকে। অমন সুখী পরিবার কয়টি আছে মক্কায়? সবদিক দিয়েই সুখী। স্নেহ-মমতা-ভালোবাসার অমন দ্যোতিত সংসার তো চোখেই পড়ে না! ধন-সম্পদেরও কোনো অভাব নেই। কী সাজানো-গোছানো পরিবার! মক্কার শ্রেষ্ঠ বাড়ি কোনটি? নাব্বাশ-খাদিজার বাড়ি! মক্কার শ্রেষ্ঠ নারী কে? মুখে মুখে উঠে আসে খাদিজার নাম!
এক বছর পর খাদিজার কোলে এলো এক পুত্র-সন্তান। আরও দৃঢ় হলো বন্ধন। পুত্র-সন্তানের জন্যে তখন আরবের লোকেরা ভীষণ ব্যাকুলচিত্ত ছিল। পুত্র-সন্তানের জন্মে উৎসবের আমেজ সৃষ্টি হতো। আর পুত্র-সন্তান না-হলে দুঃখে-কষ্টে, মর্ম-যাতনায় তাদের চেহারা কালো হয়ে যেত। শূন্যতা ও অভাববোধ ঠিকরে ঠিকরে বের হতো তাদের চোখে-মুখে।
আদর করে ছেলের নাম রাখলেন তারা—হালা। যার অর্থ—চাঁদকে ঘিরে রাখা আলোকবৃত্ত। নাব্বাশ-খাদিজা যেন আলো-বিলানো চাঁদ। হালা যেন তাদের ঘিরে রাখা আলোকবৃত্ত। কী সুন্দর অর্থবহ নাম! আদরে-সোহাগে বেড়ে উঠতে লাগলো হালা। হালার পেছনে খাদিজা অনেক সময় দেন। তাকে আদর্শ সন্তান হিসাবে গড়ে তুলতে সবকিছুই করেন। সন্তানের পেছনে অমন সীমাহীন গুরুত্ব দিতে দেখে সবাই খাদিজার প্রশংসা করে, গুণগান গায়। স্বামীর খেদমতেও খাদিজা অদ্বিতীয়া। সে কথাও এখন মানুষের মুখে মুখে।
চারপাশের এ সুনাম নাব্বাশের ভেতরে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি করলো। তার কর্মতৎপরতা আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেল। তার সম্পদও অনেক অনেক বেড়ে গেল। শুধু কি বেড়ে গেল? স্রোতের মতো ধেয়ে আসতে লাগলো! ওই বাণিজ্যবহর কার? নাব্বাশের! ইয়েমেনমুখী ওই উটবহর কি নাব্বাশের? হ্যাঁ, সব নাব্বাশের।
খাদিজা এখন প্রিয়স্বামীকে আর নাম ধরে ডাকেন না, বলেন—আবু হালা। অন্যরাও এখন তাকে ‘আবু হালা’ বলে ডাকে। এ উপনাম শুনতে নাব্বাশের খুব ভালো লাগে, খুব গর্ব হয়! তার মনের ভেতর আনন্দরা কলকলিয়ে ওঠে।
দ্বিতীয় বছর আরেক ছেলের জন্ম হলো! নাম তার ‘হিন্দ’। নাব্বাশের আনন্দ আর ধরে না! খুশি ও কৃতজ্ঞতায় আল্লাহর সামনে তাঁর মাথা নুইয়ে আসে! অসহায় দরিদ্রদের দাওয়াত দিয়ে ঘটা করে খাওয়ালেন। কা’বা তাওয়াফ করলেন। আল্লাহর সকাশে সঁপে দিলেন অযুত নিযুত কৃতজ্ঞতা। খাদিজাকেও তিনি জানালেন—হৃদয়ছোঁয়া মুবারকবাদ ও কৃতজ্ঞতা! আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেল তাঁর কাছে প্রিয় খাদিজার মান-মর্যাদা-সম্মান-ভালোবাসা! আবার পাশাপাশি ভয়ও করতে লাগলেন—তাঁদের এ সৌভাগ্যে কেউ ‘কষ্ট’ পাচ্ছে না তো!
খাদিজার মনেও থেকে থেকে উঁকি দেয় ভয় ও শঙ্কা—আমাদের এ সৌভাগ্য স্থায়ী হবে তো! অদৃশ্যে কোনো দুঃখ লুকিয়ে নেই তো!
সম্পদ ও সুখ বাড়ে, খাদিজার আশঙ্কাও বাড়ে। ভীষণ চিন্তায় পড়ে যান তিনি। অথচ তাঁর সামনে স্পষ্ট কোনো বিপদ সংকেত নেই।
খাদিজার আশঙ্কা সত্যে পরিণত হলো! হঠাৎ আবু হালা চলে গেলেন!! খাদিজা আবার বৈধব্যের কোলে নিক্ষিপ্ত হলেন!! খাদিজা আবার শোকের মরুতে দিশেহারা হলেন!! পুরোনো শোকের ওপর নতুন শোক!! ক্ষতের ওপর আরেক ক্ষত!! অঝোরধারায় কেঁদে চললেন খাদিজা! শোকের দহনে জ্বলতে লাগলেন খাদিজা!! বেদনা-নিঃসৃত অশ্রু-প্রবাহে ভিজতে লাগলেন খাদিজা!! আতিক-নাব্বাশের সুখ-স্মৃতির আঘাতে আক্রান্ত হতে লাগলেন খাদিজা।
শোকের ওপর শোক—অমন তো হয় না! বিপদের পর তো আসে মুক্তি! সুখ?! তাহলে কেন আবার এই বিচ্ছেদ? এই মহাশোক? আড়ালে কিছু লুকিয়ে নেই তো!
স্বামী আবু হালার রেখে যাওয়া অঢেল সম্পদ ও বিপুল ব্যবসার দিকে ফিরে তাকানোর কোনো তাগিদ অনুভব করলেন না বিরহ-কাতর খাদিজা.। জীবন যেন কেমন! যেখানে সৌভাগ্য সেখানেই ‘রূঢ় হাসি’! তাই এ সম্পদ ও ব্যবসার কথা মনে পড়তেই যেন জ্বলে উঠলো তাঁর শোকানুভূতি– কী হবে অঢেল সম্পদ দিয়ে.. বিপুল ব্যবসা দিয়ে? এসব কি আবু হালার কোনো উপকার করেছে? মৃত্যুর হাত থেকে তাঁকে বাঁচাতে পেরেছে? না আতিককে বাঁচাতে পেরেছিল?!
খাদিজা তাকান মেয়ের দিকে, দুই ছেলের দিকে। ওদের এতিমী তাঁর হৃদয়ে ঢেউ তোলে— শোকের ঢেউ! দুঃখের ঢেউ! বারবার বিধবা হওয়ার কষ্টের ঢেউ!
এ ঢেউয়ের আছড়ে পড়ার আঘাতে তিনি এখন জর্জরিত। দেহে নেমে এসেছে দুর্বলতার প্রকটিত দৃশ্য। চেহারায় দৃশ্যমান বিবর্ণতা।
কিছুদিন পর নড়াচড়াই বন্ধ হয়ে গেল তাঁর! কেবল ‘অশ্রুনদীতে শোকের তরী ভাসিয়ে ভেসে চলা’! তাঁর গৃহটা যেন এখন বিশাল এক শোক-তাঁবুতে ছাওয়া!!
খোআইলিদ আবার কষ্ট পেলেন, আবার দুঃখ পেলেন। এ কষ্ট ও দুঃখ খাদিজা ও তাঁর মায়ের কষ্ট ও দুঃখের চেয়ে মোটেই কম নয়। খোআইলিদের মুখাবয়ব এখন ছেয়ে থাকে দুঃখ-দুঃখ ছাপে! কোন বাবা দেখতে পারেন পর পর দুইবার এক মেয়ের বৈধব্য-স্বামী বিয়োগ? কোন বাবা সইতে পারেন বার বার মেয়ের বিধবা হওয়ার কষ্ট?
কিন্তু খোআইলিদ একেবারে ভেঙে পড়লেন না, খাদিজার বাড়িতে আসা-যাওয়া বাড়িয়ে দিলেন। নিজে ধৈর্যে বুক বাঁধলেন। খাদিজাকেও সান্ত্বনা দিয়ে যেতে লাগলেন। দুঃখটাকে চেপে রেখে আনন্দ প্রকাশ করতে লাগলেন। তাঁর স্বামীর সুবিশাল ব্যবসার হাল ধরলেন। নাতি-নাতনির সাথে সময় কাটাতে লাগলেন। ওদের আনন্দ দেওয়ার চেষ্টা করতে লাগলেন—কখনো ওদের খেলার সাথী হয়ে, কখনো গল্প শুনিয়ে শুনিয়ে।
কিন্তু খাদিজা শোকাতুর মনটা নিয়ে রোগশয্যা থেকে উঠতে পারলেন না! তাঁর অসুখটা বরং দিনে দিনে বেড়েই চললো। এক সময় খোআইলিদের আশঙ্কাই হলো, মা কি আমার চলে যাবে, সবাইকে একলা রেখে?! খোআইলিদ এবং ফাতেমা খাদিজার শয্যাপাশে এসে বসে থাকেন। তাঁর শুশ্রূষা চালিয়ে যেতে থাকেন। আর সান্ত্বনার পর সান্ত্বনা দিয়ে যেতে থাকেন। নিজের প্রতি.. নিজের সন্তানদের প্রতি ‘সদয়’ হওয়ার উপদেশ দিয়ে যেতে থাকেন। মা ছাড়া আর কে ওদের সঠিক পরিচর্যায় গড়ে তুলবেন? সুযোগ পেলেই ফাতেমা মেয়েকে বলতেন:
—মা খাদিজা! তুমি স্বামীর প্রতি সর্বদাই ছিলে অনুগত ও কর্তব্যপরায়ণ। কিন্তু কী করবে, আল্লাহর হুকুমের সামনে তো আমাদের কিছুই করার নেই! এখন ধৈর্যে বুক বাঁধো! ছেলে-মেয়ের দায়িত্ব এখন তোমাকে একাই পালন করতে হবে। এ এক বিশাল দায়িত্ব। এ এক বিরাট আমানত। এ দায়িত্ব পালনে.. এ আমানত সংরক্ষণে বিন্দুমাত্র অসচেতন হলে চলবে না! এদের মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তুলতে হবে। তবেই কবরে বসে আতিক ও আবু হালা শান্তি পাবে। যেমন তারা শান্তি পেয়েছিল বেঁচে থাকতে.। তুমি অমন ভেঙে পড়লে চলবে না মা! তাহলে কে পালন করবে এদের লালন-প্রতিপালনের মহাদায়িত্ব? তুমি তো এমনটি কখনো চাইতে পারো না যে তোমার সন্তানেরা বাবা-মা ছাড়া অন্যের হাতে গিয়ে পড়ুক!
এভাবে ফাতেমা খাদিজাকে অনেক সান্ত্বনা দিলেন। খাদিজা মায়ের কথায় শক্তি অনুভব করলেন। মনে। তারপর গায়ে। আস্তে আস্তে খাদিজা উঠে বসলেন। তাঁর কাঁধে অর্পিত দায়িত্ব পালনের জন্যে নিজেকে প্রস্তুত করতে লাগলেন। খাদিজার দেহ-মনের পরিবর্তনে খোআইলিদ ও ফাতেমা খুশি হলেন। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। খোআইলিদ ভালো করে মন দিলেন খাদিজার ব্যবসা-বাণিজ্যের দিকে। নাব্বাশ বেঁচে থাকতে ব্যবসা যেমন চলছিলো খোআইলিদের পরিচালনায় এখন সেভাবেই চলতে লাগলো।
কিন্তু বাঁধ সাধলো খোআইলিদের বার্ধক্য। অনেক বয়স হয়েছে, চাইলেই এখন সবকিছু করে ফেলতে পারেন না। আস্তে আস্তে খোআইলিদ নিস্তেজ হয়ে এলেন।
হঠাৎ খাদিজা শুনলেন, বাবা আর নেই! চলে গেছেন চিরতরে!! এ ছিল খাদিজার জীবনে তৃতীয় আঘাত! তাঁকে সইতে হয়েছে আতিকের মৃত্যুর আঘাত! তারপর নাব্বাশের আঘাত! এখন সইতে হচ্ছে প্রিয়তম বাবার আঘাত! কেমন করে সইবেন তিনি এতো আঘাত?! আশ্চর্য! এতো আঘাত কী করে একজন মানবীর জীবনে একত্রিত হতে পারে?
খাদিজা শোক-মেশানো বিস্ময় নিয়ে ভাবতে লাগলেন— আল্লাহ কী চাইছেন? তার জীবনটা কি একে একে কেবল আঘাতই পেয়ে যাবে? কেমন করে কোত্থেকে এতো সহ্যক্ষমতা আসবে তার? আল্লাহ আসলে কী চাইছেন?
এতো আঘাতের পর আসবে কি কোনো পুরস্কার? এতো আঘাত ও কষ্ট তো আল্লাহ একসাথে একত্রিত করেন না?! কঠিনের পাশে তো কঠিন থাকে না। তাহলে বার বার কঠিন আসবে কেন? কেন এখন সহজ আসবে না? এতো কান্নার পর এবার আসবে কি হাসি?
খাদিজার গৃহের কাছেই আরেক গৃহে বাস করেন এক সম্ভ্রান্ত নারী। আমেনা বিনতে ওয়াহ্। তাঁর স্বামীও বিবাহের কিছুদিন পর ইন্তেকাল করেন। একমাত্র পুত্র মুহাম্মদকে নিয়ে আমেনা একাই থাকেন। নতুন করে বিবাহের কোনো ইচ্ছে তাঁর নেই। মুহাম্মদের বয়স ছ’ বছর। এর লালন-প্রতিপালনেই কেটে যায় আমেনার সারা বেলা। ধৈর্য ও সহনশীলতার এক প্রতীক তিনি।
খাদিজা দৃঢ় সংকল্প করেন, আমেনার মতো তিনিও এখন কেবল সন্তানদের লালন-প্রতিপালনেই মন দেবেন। আর কারও প্রস্তাবে ‘হ্যাঁ’ বলবেন না। সন্তানদের মুখ চেয়েই কাটিয়ে দেবেন বাকি জীবন। হ্যাঁ, স্বামীর ব্যবসা-বাণিজ্য আগে অনেকটাই দেখতেন বাবা। তিনি এখন নেই, তাই বলে এই অঢেল সম্পদ ও বিপুল ব্যবসা তো আর হেলায় নষ্ট করা যায় না। তিনি নিজেই এখন এর হাল ধরবেন। ইয়েমেন ও সিরিয়ায় ক্রয়-বিক্রয় চালিয়ে যাবেন। এ জন্যে যতো লোক প্রয়োজন, ততো লোকই নিয়োজিত করবেন।
না, খাদিজা ভেঙে পড়বেন না। নতুন করে জীবনের হাল ধরবেন। ছেলে-মেয়ের হাল ধরবেন। আবু হালার ব্যবসা-বাণিজ্যের হাল ধরবেন। অতীতের দুঃখ-স্মৃতির কথা মনে করে শুধু শুধু আর কষ্ট পাবেন না। আল্লাহর ফায়সালা মেনে নেবেন তিনি সর্বান্তকরণে।
📄 আশা
শুরু হলো পুরোদমে খাদিজার ব্যবসা। বাণিজ্য-কাফেলা যখন যেখানে পাঠানো দরকার সেখানেই পাঠাচ্ছেন। কখনো ইয়েমেনে কখনো শামে.। অনেক শ্রমিক তাঁর এখানে কাজ করে। কারও মনে কোনো খটকা নেই.. ক্ষেদ নেই.. কষ্ট নেই.. অনুযোগ নেই.. অভিযোগ নেই। সবাই মন-প্রাণ সঁপে দিয়ে খাদিজাকে শ্রম দেয় আর গুনে গুনে লাভ নেয়। ন্যায্য মজুরির ঢের বেশি পায়, সব সময়। সবাই খাদিজার প্রতি সন্তুষ্ট। খাদিজাও সবার প্রতি সন্তুষ্ট। বরং খাদিজার এখানে যারা কাজ করে তারা একটা গর্ব অনুভব করে।
অমন মহীয়সী দয়ালু সুদক্ষ ও বুদ্ধিমতি নারী মক্কায় কয়জন পাবে তারা? ব্যবসা-বাণিজ্যের কৌশল ও মূলনীতি বেশ তাঁর জানা। কোন পণ্যের চাহিদা বেশি আর কোন পণ্যের বাজার মন্দা। ব্যবসা-সংক্রান্ত বিষয়ে তাঁর অভিমত এখন ব্যবসায়িক মহলে ভীষণ গুরুত্ব বহন করে। বড় বড় সওদাগররা পরামর্শের জন্যে তাঁর দিকনির্দেশনার অপেক্ষা করে। সে অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং লাভবান হয়।
মক্কার বড় সওদাগর কে? সবচেয়ে বড় পণ্যশালাটা কার? খাদিজার এবং খাদিজার! খাদিজার এ ব্যবসা দিনে দিনে কেবল বিস্তৃতই হচ্ছিল। বাড়ছিলই। কারণ আছে, তাঁর ব্যবসার সমস্ত আয়-ব্যয় ও ক্রয়-বিক্রয় হালাল উপায়ে হয়। ন্যায়সঙ্গত পন্থায় হয়। ওজনে কম দেওয়া হয় না। মাপে বেশকম করা হয় না। সরস বলে নিরস মাল দেওয়া হয় না। সর্বপ্রকার লেনদেন সুদমুক্ত। অথচ সেকালে সুদের বাজারটা ছিল বেশ রমরমা। পাশাপাশি খাদিজার ব্যবসায় যতো লাভ হতো তাঁর দান ও দয়াও ততো বেড়ে যেত। অসহায় দরিদ্র ও মুখাপেক্ষীদের কেউই তাঁর কাছে এসে শূন্য হাতে ফিরে যেত না। খাদিজা তাঁদের দিতেন উদার মনে। মুক্তহস্তে। আনন্দচিত্তে। যারা বড় ও মহৎ, দান করতে.. অপরের দুঃখ ঘুচাতে.. বিপদ দূর করতে– সব সময় অগ্রগামী।
খাদিজা বিশ্বাস করেন- ব্যবসার এই যে লাভ, তা গভীরভাবে সম্পর্কিত ওই দানের সাথে! যার দান যতো বেশি হবে তার লাভও ততো বেশি আসবে। এটা দানের বরকত। এটা দানের মহিমা। এটা দানের অনিবার্য ফল। দান আসলে এক ধরনের ব্যবসা। এ ব্যবসায় পুঁজি খাটালে লাভ– নিশ্চিত। দুনিয়ার প্রচলিত ব্যবসায় পুঁজি নষ্ট হয়ে যায়। লোকসান হয়। কিন্তু দানের এ ব্যবসায় লোকসানের কোনো সম্ভাবনা নেই। এ জন্যেই খাদিজা দানের পরিমাণ বাড়িয়ে দেন, অনেক বাড়িয়ে দেন। অন্যরা এতে বিস্মিত হয়, ভীষণ বিস্মিত! যেমন বিস্মিত তারা তাঁর ব্যবসার ক্রমোন্নতিতে। সবাই বুঝতে পারে না দানের বরকত ও মহিমা। তাই ওরা বিস্মিত হয়– এতো দান করলে কেমনে ব্যবসা হবে! পুঁজিই তো খতম হয়ে যাবে?! অথচ খাদিজার ব্যাপারটা একেবারেই উল্টো! খাদিজা কেবল দান করেন, রাতে-দিনে। একে-ওকে—সবাইকে! প্রকাশ্যে গোপনে। কিন্তু কী আশ্চর্য! তাঁর ব্যবসার কোনো ক্ষতি তো হচ্ছেই না, বরং দিনে দিনে তা আরও বাড়ছে, বাড়ছেই!! বড় বড় ব্যবসায়ীরা সামান্য লাভ তুলে আনতে কী পরিশ্রম করে! অথচ খাদিজা অন্তঃপুরবাসিনী হয়েও কেমন ‘তরতর’ করে এগিয়ে যাচ্ছেন! এমন কি সবাইকে ছাড়িয়ে যাচ্ছেন!
অনেকে খাদিজার এ উন্নতি সইতে পারে না। হিংসায় জ্বলে আর বলে- নারীরা কেন অমন করে ‘পুরুষের ময়দানে’ ঝাঁপিয়ে পড়বে?! কিন্তু সমালোচকদের নিন্দাবাক্যে খাদিজা কান দেন না, আপন মনে ব্যবসা পরিচালনা করে যেতে লাগলেন। অন্তঃপুরে বসেও বাইরের বড় বড় ব্যবসায়ীদের পেছনে ফেলে তিনি আপন মহিমায় জ্বলে উঠলেন। খাদিজার একমাত্র কাজ এখন দু’টি। নিজের সন্তানদের লালন-প্রতিপালনে ব্যস্ত থাকা এবং ব্যবসা পরিচালনা করা। এর বাইরে আর কোনো চিন্তা তাঁর নেই। বিশেষত নতুন করে ঘর-সংসার করার কথা মাথা থেকে একেবারেই ঝেড়ে ফেলে দিয়েছেন তিনি। অনেক সময় খাদিজার ভাইয়েরা এসে তাঁকে অনুরোধ করেন— আবার নতুন করে ঘর বাঁধতে, উপযুক্ত পাত্র দেখে বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হতে। তাহলে তাঁকে আর ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে অমন কষ্ট করতে হবে না, স্বামীই সবকিছু দেখাশোনা করবেন। কিন্তু খাদিজা রাজি হন নি, হতে পারেন নি। তিনি বরং ভাইদের বুঝিয়েছেন যে নারীও কর্মের ময়দানে একেবারে মেধাশূন্য নয়। পুরুষের আকল থাকলে নারীরও আকল আছে। পুরুষের প্রজ্ঞা থাকলে নারীরও প্রজ্ঞা আছে। পুরুষের দক্ষতা ও পারদর্শিতা থাকলে নারীরও আছে। নারী ইচ্ছে করলে.. সংকল্পে স্থির থাকলে, সেও পারে দুর্গম পথ পাড়ি দিতে। তখন পথের দূরত্ব কমে যায়—দূর চলে আসে একেবারে কাছে। কঠিন হয়ে যায় সহজ। কাঁটা হয়ে যায় ফুল। তারপর খাদিজা ভাইদের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বলতেন:
—তোমরা আমাকে নিয়ে কিচ্ছুটি ভেবো না, আমি সেসব পুরুষের সামনে একটা দৃষ্টান্ত পেশ করতে চাই, যারা নারীদের কেবলই ‘ভোগ্যপণ্য’ মনে করে।
ভাইয়েরা খাদিজার সাথে কথা ও যুক্তিতে পেরে উঠতেন না; অনেকটা রাগ করেই চলে যেতেন। কিন্তু যখন খাদিজাকে নিয়ে মানুষের বক্র-উক্তি কানে আসতো— ‘খোআইলিদ কন্যার যে কী হলো, আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না! কেন ও অমন করে পুরুষের কর্মকে বেছে নিলো? মহিলাদের কি আর কোনো কাজ নেই?’ তখন ভাইয়েরা আবার এসে বোনকে পূর্বের মতো অনুরোধ করতেন। কিন্তু খাদিজা যেনো ‘বধির’—কিছুই শোনেন না। আপন মনে আপন পথে কেবলই এগিয়ে চলা, দৃঢ় অবিচলতায়। ‘পাছে লোকে কিছু বলে’র কোনো পরোয়া নেই। এ ব্যস্ততার ভেতরেই তিনি খুঁজে পেয়েছেন এমন এক মজা, যা তাঁকে ভুলিয়ে দিয়েছে পেছনের সব ব্যথা-বেদনা। ভুলিয়ে রাখছেন সামনের ‘নতুন জীবন’এর চিন্তা থেকেও।
শেষ পর্যন্ত সকল আলোচনা ও সমালোচনা পেছনে ফেলে তিনি পৌঁছে গেলেন এমন এক অবস্থানে, যেখানে পৌঁছলে মানুষ মানুষের চোখে বড় হয়ে যায়! দিন যতো গড়াচ্ছে খাদিজার এ অবস্থান ততো মহিমান্বিত হচ্ছে। তাঁর সম্মান ও মর্যাদাও ততো বাড়ছে। সবাই তাঁকে এখন সমীহ করতে লাগলো। তারা মুগ্ধ, সন্তানদের প্রতি তাঁর অপরিসীম সেবা-যত্ন ও তারবিয়াত দেখে। যে-কোনো মহৎ কাজে খরচ করেন তিনি অকাতরে। একটি দিরহামও খরচ করেন না তিনি অকারণে। খাদিজা নারীজাতির গর্বে পরিণত হয়েছেন। সব নারীই তাঁকে নিয়ে গর্ব করে স্বামীদের কাছে। তাদের কাছে তুলে ধরে নারীর শক্তি ও ক্ষমতার গল্প।
খাদিজার প্রাচুর্য যতো বাড়ছিল.. তাঁর খ্যাতি যতো ছড়াচ্ছিল, মক্কার নেতৃস্থানীয়রা এবং যুবকেরা ততোই উদগ্রীব হয়ে উঠছিল খাদিজাকে ‘বউ হিসাবে’ পেতে। যে যার মতো করে এ জন্যে চেষ্টা করে যাচ্ছিল। কেউ কেউ মাধ্যমও ধরছিল। কিন্তু আগেই যেমনটা বলে এসেছি, খাদিজা এ দিকটায় ফিরেও তাকাচ্ছেন না। কারও কথায় কোনো কান দিচ্ছেন না। কারও প্রস্তাবে কোনো সাড়া দিচ্ছেন না। এভাবে সময় আরও পেরিয়ে গেল। মক্কার ‘মানুষ’ খাদিজাকে পাওয়ার জন্যে আরও ব্যাকুল হয়ে উঠলো। কেননা, খাদিজার বয়স যতো বাড়ছিল মানুষের কাছে তাঁর মূল্যায়নও ততো বাড়ছিল।
কিন্তু এদের কেউই সরাসরি খাদিজার সাথে কথা বলার সাহস পাচ্ছিল না। তাঁর সীমাহীন ব্যক্তিত্বের সামনে সবাই ছিল নিষ্প্রভ ও ম্লান। তাঁর সামনে যেতে ও মুখোমুখি হতে যে সৎ-সাহস ও সুব্যক্তিত্বের প্রয়োজন, তা কারোই ছিল না। তাই সবাই আশ্রয় নিয়েছিল ছোট-বড় মাধ্যমের, যাদের কেউ নারী, কেউ-বা পুরুষ। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। কারও সুপারিশই কাজে লাগলো না। মহীয়সী খাদিজাকে কেউ রাজি করাতে পারলো না। তিনি নিজের কাজে ব্যস্ত। নিজের পথচলায় অবিচল। নিজের সাধনায় আচ্ছন্ন। তিনি সন্তানদের প্রকৃত লালন-প্রতিপালন নিয়ে ব্যস্ত। তিনি নিজের ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত। তিনি অনেক বার কষ্ট ও আঘাত পাওয়ার পর এখন আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরস্কার লাভ করার জন্যে নীরবে অপেক্ষা করছেন! এ অপেক্ষার ভাষা ও শব্দ শুধু তিনিই শুনতে পান। শুধু তাঁর কানেই গুঞ্জরিত হয়। আর কেউ শুনতে পায় না। বুঝতে পারে না। উপলব্ধি করতে পারে না। অন্যরা কেবলই ভাবে- খাদিজার এ নীরবতা এবং এ ভাবলেশহীনতা কেন! আর খাদিজা নীরবে ভাবেন, এবার আশা- মিলবেই পুরস্কার!