📄 ঘরের শোভা
খোআইলিদের বাড়িটি যেনো হাসি-আনন্দ, স্নেহ-মমতা ও প্রেম-ভালোবাসার এক শ্রেষ্ঠ ‘নীড়’। কারণ একটাই; এ-বাড়ির শোভা তদীয় তনয়া খাদিজা। সবার চোখের মণি। সবার আদরের দুলালি। এ-বাড়ির সবাই তাঁকে ভালোবাসে। তাঁর কাছ-ঘেঁষে বসতে আনন্দ পায়। দাসী ও পরিচারিকারা পর্যন্ত তাঁর নামে আপনহারা। হবেই তো; খাদিজা যে আদর দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে, সখ্যতা দিয়ে ওদের হৃদয়-রানি হয়ে আছেন! খাদিজার ডাকতে দেরি কিন্তু ওদের ‘লাব্বাইক মালিকা!’ বলতে দেরি হয় না!
খাদিজার সান্নিধ্য ওদের মনের খোরাক। খাদিজার নির্দেশ ওদের আত্মার প্রশান্তি। অমন মালিকা কে পায়? অমন মহীয়সী নারী আর আছে কোথায়? খাদিজা তাই এ বাড়ির শোভা। এ বাড়ির অহঙ্কার। এ বাড়ির অলঙ্কার।
কুরাইশ গোত্রে বাবা খোআইলিদের অবস্থান অনেক ওপরে। তিনি গোত্রের সশ্রদ্ধ নেতা। তাঁর আদেশ-নিষেধ সবাই মেনে চলে। তাঁর মতামত কেউ উপেক্ষা করতে পারে না। তাঁকে বাদ দিয়ে কিছুই হয় না। সবাই তাঁকে সহযোগিতা করে পাশে থেকে। তাঁর পাশে আছে ঐতিহ্যবাহী বড় পরিবারের অকুণ্ঠ সমর্থন ও সহযোগিতা। অসহায় দরিদ্রদের প্রতি খোআইলিদ ছিলেন দয়াদিল, মায়াদিল, উদারহস্ত। সব সময় তাঁর বাড়িতে করুণা ও সাহায্যপ্রার্থীদের ভিড় লেগেই থাকে।
অমন অতিথিপরায়ণ, অমন উদার মমতা-ঢাকা বাড়ির আঙিনাতেই বেড়ে উঠছিলেন খাদিজা। বেড়ে উঠছিলেন বাড়ির অতিথিবৎসল পরিবেশের ছায়ায়-মায়ায়। দু’চোখ ভরে দেখেছেন তিনি প্রাচুর্য। দেখেছেন বাবার দানবৃষ্টি। দেখেছেন মানুষের প্রতি তাঁর মমতা ও ভালোবাসা। এসব দেখতে দেখতে নিজের অজান্তে তিনিও হয়ে উঠেছিলেন বাবার মতন, মায়ের মতন—দানবতী, মায়াবতী। না; এ-প্রাচুর্যের ভিড়ে কখনো তিনি অহংকারী হয়ে ওঠেন নি। কেন করবেন অহংকার? সম্পদ ও প্রাচুর্য নিয়ে অহংকার করবেন? নাহ! সে তো শুধুই আল্লাহর দান! সম্পদ নিয়ে অহংকার করা মানুষের সাজে না। যদিও অনেক মানুষ সম্পদ পেলে অন্যের কথা ভুলে যায়। শুধু নিজের কথাই মনে রাখে। গর্ব ও অহংকারে ‘গাল ফুলায়’। কিন্তু খাদিজা এ বিশাল প্রাচুর্যের ছায়ায় বসে একটুও অহংকার করেন না, শুধু আল্লাহর শোকর আদায় করেন। আল্লাহ না-দিলে তিনি এবং তাঁর পরিবার কোথায় পেতেন এ-সম্পদ? কোথায় পেতেন এতো সুখ ও আনন্দ?
অসহায় বঞ্চিতদের সহযোগিতায়, অভাবীদের দুঃখ মোচনে ভীষণ তৃপ্তিবোধ করতেন খাদিজা। তিনি বিশ্বাস করতেন—এ-ই আল্লাহর নেয়ামতের শোকর! তাই তিনি কাউকে ফিরিয়ে দিতে পারতেন না। সবাইকে দিতেন। হাসিমুখে। উদার হাতে। তাঁর মন ছিল আকাশ-উদার। তাঁর স্বভাব ছিল মায়ায়-মোড়ানো। অভাবী যখন হাত পাততো, তখন তিনি একটুও বিরক্ত হতেন না। এমন হবেই, তিনিও যে বাবার গুণাবলি পেয়েছেন! হয়েছেন ঠিক তাঁর অবিকল ছায়া। কী মায়া, কী দয়া! সব সময়, সবার জন্যে!
বাবা খোআইলিদ জানেন খাদিজা অনেক গুণী। মেয়ের গুণ দেখে দেখে তাঁর চোখ জুড়ায়, মন জুড়ায়। মেয়ের প্রতি তাঁর স্নেহ-ভালোবাসা আরও অনেক বেড়ে যায়। মেয়ের অসীম উদারতায় তিনি বারবার মুগ্ধ হন। মেয়ের উন্নত নৈতিকতায় তিনি আপ্লুত হন। মেয়ের জ্বলন্ত মেধা ও বুদ্ধিদীপ্তি তাঁকে স্বপ্ন দেখায়। মেয়ের সাংকল্পিক মানসিকতা, তাঁর উজ্জ্বল প্রতিভা, তাঁর প্রখর ধী তাঁকে ভীষণ অভিভূত করে।
ব্যবসায়িক বিষয়-আশয় পরিচালনায়ও মেয়ে তাঁর সচেতন এবং সফল। সব মিলিয়ে মেয়ে খাদিজার প্রতি তিনি খুব সন্তুষ্ট। তাঁর কাজে তিনি আনন্দ পান। খাদিজা তাঁর ঘরের শোভা। খাদিজার ‘হ্যাঁ’ যেমন সুন্দর, খাদিজার ‘না’-ও সুন্দর। খাদিজার সবকিছু সুন্দর। সুন্দর মিশে আছে ওর সবকিছুতে। চলায়-বলায়-আচরণে।
বাবা খোআইলিদ মেয়েকে অনেক সময় দেন। সুযোগ পেলেই তাঁকে কাছে নিয়ে বসেন। কথা বলেন। মেয়ের সাথে কথা বললে মেয়ে ভীষণ খুশি হন। কিন্তু খোআইলিদের খুশি যেন আরও বেশি। খাদিজার চাঁদমুখের দিকে মায়া-মায়া দৃষ্টিতে কেবল তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছে করে। তাঁর চপল-চলা, তাঁর চকিত-চাহনি, তাঁর কুদরতি রূপ-লাবণ্য ও অঙ্গ-সৌষ্ঠব তাঁকে মনে করিয়ে দেয়—আল্লাহর নিপুণ সৃষ্টিশীল কুদরতের কথা। কতো সুন্দর অবয়বে তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। খোআইলিদ কথা বলতে বলতে এবং মেয়ের কথা শুনতে শুনতে উদ্বেলিত হয়ে ওঠেন।
খাদিজা খুব লাজুক মেয়ে। এতো কথা হয় ওর সাথে খোআইলিদের, তবুও সব কথা ওকে বলতে পারেন না। এই যে বেশ কিছুদিন ধরে অনেক কুরাইশ যুবক আসছে। একের পর এক খাদিজার জন্যে প্রস্তাব দিয়ে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে খাদিজাকে এখনো কিছুই বলা হয় নি।
অপরদিকে ওদের কাউকে খোআইলিদের মনেও ধরছে না। কথা বললে মনে হয় ওরা যেন শুধুই দুনিয়া চায়। তাঁর অঢেল প্রাচুর্যের ওপর বুঝি ওদের চোখ পড়েছে। অবশ্য লাজুক স্বভাবের খাদিজার কানেও যে এদের কথা একেবারে আসতো না—তা নয়। বাঁদিরা এসে বলতো। সখীরা এসে জানাতো। কিন্তু খুব কান দিতেন না। মন দিতেন না। এসব এড়িয়ে খাদিজা মশগুল হয়ে যেতেন নিজের কাজে, ঘরের কাজে। বাবা যেখানে আছেন সেখানে খাদিজা কেন ভাববেন—মাথা ঘামাবেন? বাবাই ভাববেন, বর পছন্দ করবেন—শ্রেষ্ঠ বর। আদর্শ বর। দাম্পত্য-জীবন কোনো খেলনা নয়, এখানে আছে অনেক দায়-দায়িত্বের ব্যাপার। বাবা খোআইলিদের মুখে খাদিজা শুনেছেন—আদর্শ মানুষ ছাড়া আদর্শ পরিবার হয় না। আদর্শ পরিবার ছাড়া আদর্শ সমাজ হয় না। আদর্শ মানুষ সব জায়গায় আদর্শ হয়। এমন কখনো হতে পারে না যে একজন মানুষ পারিবারিকভাবে আদর্শ নয় কিন্তু সামাজিকভাবে আদর্শ। না, এটা হতে পারে না। কখনো হয় না। ঘরের মানুষই বাইরে প্রতিবিম্বিত হয়। পরিবারই সমাজে প্রতিবিম্বিত হয়। সমাজই দেশে ও রাষ্ট্রে প্রতিবিম্বিত হয়। এভাবে পরিবার ভালো হলে সমাজ ও দেশ-রাষ্ট্র ভালো হয়ে যায়। কিন্তু মানুষ ভুল করে। আগে নিজে ঠিক হয় না। আগে পরিবার ঠিক করে না। সমাজ ঠিক হবে কীভাবে?
খোআইলিদের বাড়িতে আজ অনেক ভিড়। বনু মাখযূম-এর নেতৃবৃন্দ এখানে ‘ভিড়’ করেছেন। খুব আনন্দঘন পরিবেশে গৃহস্বামী খোআইলিদের সঙ্গে তারা আলাপ-আলোচনা করছেন। গভীর রাত পর্যন্ত চললো কথার ওপর কথা; অনেক কথা। একসময় মজলিস ভাঙলো। বনু মাখযূম প্রসন্নচিত্তেই বেরিয়ে গেল। খোআইলিদকেও বেশ আনন্দিত দেখাচ্ছিল। সবাইকে বিদায় দিয়ে তিনি নিজের কামরায় চলে গেলেন। বেশ কিছুক্ষণ স্ত্রী ফাতেমার সাথে কথা বললেন। তাঁরা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে মতবিনিময় করছিলেন। একটু পর দুজনই বেরিয়ে এলেন। তাঁদের চেহারায় খুশির আভা। আনন্দের দীপ্তি। স্বস্তির ছায়া। অনেক খোঁজার পর কিছু পেলে যেমন হয়!
খোআইলিদ স্ত্রীকে নিয়ে বাড়ির আঙিনায় এসে বসলেন—তাঁর জন্যে পেতে-রাখা একটা নরম বিছানায়। হেলান দিয়ে বসলেন সুসজ্জিত একটা রেশমি তাকিয়ায়। পাশেই বসলেন ফাতেমা। খোআইলিদ খাদিজাকে ডাকলেন। খাদিজা এসে বাবা-মায়ের পাশে দাঁড়ালেন। খোআইলিদ হাসিমুখে খাদিজার দিকে তাকালেন। খাদিজা দাঁড়িয়ে আছেন। খোআইলিদ জানেন, বসতে না বললে মেয়ে বসবে না। স্নেহঝরা কণ্ঠে খোআইলিদ বললেন:
—বসো মা! তোমার সাথে কথা আছে; অনেক গুরুত্বপূর্ণ! আমি তোমার স্পষ্ট মতামত জানতে চাইবো একটা ব্যাপারে। নির্দ্বিধায় তুমি মতামত প্রকাশ করো। এখন শোনো আমি কী বলছি, তারপর চিন্তা করে উত্তর দেবে!
📄 সুসংবাদ
খাদিজা বিষয়টি আঁচ করতে পারলেন। লাজরাঙা মুখে দাঁড়িয়ে রইলেন। মুখে মৃদু হাসির স্নিগ্ধ প্রভা। খোআইলিদ খাদিজার দিকে তাকালেন, তার কাজল-কালো ডাগর চোখের দিকে তাকালেন। মৃদু হাসির উজ্জ্বল দ্যুতিতে দ্যোতিত তার সুবিন্যস্ত দন্তরাজির দিকে তাকালেন। তারপর স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন:
—খাদিজা! কয়েক দিনের মধ্যেই তো আমাদের বাণিজ্য-কাফেলা শাম যাচ্ছে বিপুল পণ্য নিয়ে। তুমি তো সবকিছুর ওপর চোখ রাখছো। আমাদের সার্বিক প্রস্তুতি ও অবস্থা নিয়ে তোমার মন্তব্য কী?
খাদিজার মণিমুক্তা-সদৃশ দন্তরাজি ঝলমল করে উঠলো। মৃদুল হাসির পরাগে পরাগে বিনয়-নম্রতা ও আদবের সৌরভ ছড়িয়ে খাদিজা বললেন:
—চমৎকার এক কাফেলা! সাফল্য বয়ে আনবেই! লাভজনক ব্যবসা, কিছুতেই ব্যর্থ হবে না! আমাদের দক্ষ শ্রমিকরা ওখানে যে-সব পণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে তার সবই নিয়েছে। সব মিলিয়ে চমৎকার প্রস্তুতি। সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা।
খোআইলিদ অপলক তাকিয়ে মেয়ের কথা শুনলেন। তাঁর ঠোঁটে তৃপ্তির, সন্তুষ্টির মৃদু হাসি! বললেন:
—খাদিজা! আমাদের কাফেলায় যে-সব শ্রমিক ও ব্যবস্থাপক যাচ্ছে তাদের ব্যাপারে তোমার মত কী?
বাবার এ প্রশ্নটায় খাদিজা একটু অবাক হলেও মুখে হাসি ছড়িয়ে বললেন:
—তারা দক্ষ। তারা জানে কী করণীয় আর কী বর্জনীয়। পাশাপাশি সবাই আমানতদার ও বিশ্বস্ত।
খোআইলিদ পাশে-বসা স্ত্রীর দিকে একবার দেখলেন তারপর মেয়ের দিকে গভীর করে তাকালেন। তারপর মমতাঝরা কণ্ঠে বললেন:
—খাদিজা! তুমি কি জানো, মক্কার সবচেয়ে সুদক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী কে? জানো, কে পারে অনায়াসে লাভ তুলে আনতে?
খাদিজা একটু ভাবলেন। তারপর বিনয়ের সাথে জানতে চাইলেন:
—কোন লাভের কথা বলছেন বাবা! হারাম না হালাল?
—নিঃসন্দেহে হালাল! হারাম তো বিলীয়মান ছায়া, কোনো স্থায়িত্ব নেই! হারাম-পথে একবার কেউ লাভের মুখ দেখে ফেললেও পরবর্তীতে তা কেবল তার ক্ষতিকেই টেনে আনে! মূলধনের বরকতটাও সেই সাথে নষ্ট হয়ে যায়! আমি হালাল লাভের কথাই বলছি! এ-হালাল ব্যবসায় মক্কায় কে সবচেয়ে বেশি সফল ও অগ্রগণ্য, তা-ই আমাকে বলো!
খাদিজা এবার একে একে নাম বলে যেতে লাগলেন মক্কার সৎ ও আমানতদার সফল ব্যবসায়ীদের। খাদিজা চুপ করলেই খোআইলিদ ‘আরও বলে যাও’ বলে তাগিদ দিয়ে যেতে লাগলেন। এভাবে খাদিজা যখন ‘কাঙ্ক্ষিত’ নামটাও বলে ফেললেন এবং বলা শেষ করে থেমে পড়লেন তখন খোআইলিদ স্ত্রী-ফাতেমার দিকে তাকালেন। আবার খাদিজার দিকে তাকালেন। তারপর মুখে মিষ্টি হাসির টুকরো নিয়ে খাদিজাকে বললেন:
—খাদিজা! আতিক বিন আবিদের ব্যাপারে তোমার কী মত?
খাদিজা বেশ আস্থার সাথে জবাব দিলেন:
—তিনি বনু মাখযূমের সফল ব্যবসায়ী। কোন পথে লাভ আসে তা তাঁর বেশ জানা। এখন তিনি সুসচ্ছল। তার ব্যবসায় সাফল্য বেড়েই চলেছে।
খোআইলিদ মাঝখানে জানতে চাইলেন:
—তার সব আয় কি হালাল পথেই?
খাদিজা এবার বাস্তব-জানা মানুষের মতোই উত্তর দিলেন:
—আমার বিশ্বাস, হালাল পথেই এসেছে তাঁর এ-খ্যাতি। হারামের ধারে-কাছেও তাঁর যাওয়ার কথা না। তা ছাড়া তিনি একজন বীরপুরুষ। আমার জানামতে, পরিবারের কাছে তিনি যেমন প্রিয়, আত্মীয়-অনাত্মীয় সবার কাছেই তেমন প্রিয়।
খাদিজা থামলেন। কিছুক্ষণ পর অবাক-কণ্ঠে জানতে চাইলেন:
—বাবা! তুমি কি আমাদের বাণিজ্য-কাফেলার দায়িত্বটা এবার তাঁর ওপরই ন্যস্ত করতে চাইছো?
খোআইলিদ মেয়ের দিকে তাকালেন গুণমুগ্ধ চোখে, বললেন মমতাভরে:
—হ্যাঁ, তাঁর ওপর একটা দায়িত্ব আমি অর্পণ করবো, সেটা এ-ব্যবসার চেয়ে, সম্পদের চেয়ে অনেক দামি! সম্পদ দিয়ে এর মূল্যমান নির্ধারণ সম্ভব নয়!
খাদিজা আনত-মুখে আকাশ-পাতাল ভাবতে লাগলেন। তাঁর মনে পড়ে গেল গত রাতের অতিথিদের দীর্ঘ বৈঠকের কথা! খাদিজার আর বুঝতে বাকি রইলো না—বাবার কথার কী অর্থ! লজ্জায় তাঁর রাঙা চেহারা আরও রবিরাঙা হয়ে উঠলো! তাঁর নতমুখ আরও নত হয়ে গেল! তাঁর মুখে কোনো কথাই সরলো না!
খাদিজার মা ফাতেমা ভাঙতে চাইলেন সে লাজরাঙা নীরবতা!
—মা খাদিজা! বলো না, আতিকের ব্যাপারে তোমার কী মত!
খাদিজার চেহারা আরও লাজরাঙা হয়ে উঠলো। সকাল বেলার টুকটুকে লাল সূর্যের মতো। মাথা নিচু করে নীরবে দাঁড়িয়ে রইলেন। অনায়াসে ভাবপ্রকাশের যে-স্বভাবজাত গুণটি তাঁর ভেতরে সযত্নে রক্ষিত আছে, তার প্রতিটি কিনারা ধরেই তিনি টান দিলেন, শক্তি ও সাহস সঞ্চয়ের চেষ্টা করলেন, তবুও আজ কথা বলতে পারলেন না। কী যেনো বার বার তাঁর কথা বলার শক্তি কেড়ে কেড়ে নিয়ে যাচ্ছে। উচ্চারণের পূর্বলগ্নেই সব কথা যেনো জড়িয়ে যাচ্ছে! এদিকে মা-বাবা অনিমেষ তাকিয়ে আছেন তাঁর দিকে, তাঁর সাহসী মতামত শুনতে।
এভাবে কেটে গেল আরও অনেকগুলো নীরব প্রহর। খাদিজা সেই নিশ্চুপ দাঁড়িয়েই আছেন। খোআইলিদ কোমলকণ্ঠে আবার জানতে চাইলেন তাঁর ইচ্ছের কথা। খাদিজাও আবার লাজুকতার লালিমার ছায়ায় একটু শক্তি সঞ্চয়ের চেষ্টা করলেন। ক্ষীণকণ্ঠে পিতাকে বললেন:
—বাবার মতই আমার মত!
খোআইলিদ অমন জওয়াবই আশা করছিলেন। তিনি মেয়েকে কাছে বসালেন। তাঁর লাজ-রক্তিম কপালে স্নেহ-চুম্বন এঁকে দিলেন! আনন্দঝরা কণ্ঠে বললেন:
—আমি আস্থার সাথেই বলতে পারি, তুমি আতিকের উপযুক্ত! আতিকও তোমার উপযুক্ত! আল্লাহই সব কল্যাণের আধার। তিনিই মানুষকে জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছেন, শ্রেষ্ঠ নারীর জন্যে শ্রেষ্ঠ বর। শ্রেষ্ঠ বরের জন্যে শ্রেষ্ঠ নারী। আমি তোমার জন্যে তাঁকে নির্বাচন করেছি আল্লাহ তাঁকে তোমার জন্যে নির্বাচন করার পর! আল্লাহর নির্বাচনই বড় নির্বাচন। আশা করছি, ‘এ বন্ধনে’ তিনি বরকত দান করবেন। আমি আরও আশা করছি, আল্লাহর ইচ্ছায় তুমি আতিককে নিয়ে সুখী হবে!
ফাতেমা খাদিজাকে স্নেহ-পরশে টেনে আদর করলেন। সোহাগভরে চুমু খেলেন। তারপর স্বামী খোআইলিদের দিকে তাকিয়ে স্পষ্টকণ্ঠে বললেন:
—কিন্তু আমরা এক্ষুনি বিবাহ-অনুষ্ঠান করতে পারবো না, যেমনটা চাইছে আতিকের খানদান। একটু সময় নিতে হবে। অনেক জাঁকজমকের সাথে আমি মেয়ের বিবাহ দিতে চাই। এ জন্যে আমাদের অনেক পূর্ব-প্রস্তুতির প্রয়োজন!
খোআইলিদ বললেন:
—আমি দুয়েক মাস পেছানোর চেষ্টা করবো আতিককে বুঝিয়ে। যাতে আমাদের শাম ও ইয়ামেনের বাণিজ্য-কাফেলা আমাদের চাহিদামতো সবকিছু নিয়ে আসতে পারে। তা ছাড়া আমাদের সঞ্চয়-ভাণ্ডারে তো কম নেই! আল্লাহ অনেক দিয়েছেন! সুতরাং হে ফাতেমা, মেয়ের বিবাহের প্রস্তুতি নিতে হাত খুলে খরচ করো। আমার সব সম্পদ খাদিজার জন্যে!
এরপর তিনি হাসতে হাসতে বললেন:
—আমি এরচে’ বেশি দেরি করতে চাই না!
ফাতেমা এ কথা শুনে হাসলেন। এদিকে খাদিজার গাল গোলাপরাঙা হয়ে উঠলো। এরপর খোআইলিদ ও ফাতেমা বিশ্রামে চলে গেলেন, মেয়ের আগামী দিনের নতুন জীবনের কথা ভাবতে ভাবতে। আহারে! মেয়েকে এখন অন্যের হাতে তুলে দিতে হবে। মেয়েকে এখন অন্যের বাড়িতে পাঠাতে হবে! যার সাথে এবং যে বাড়ির সাথে তার বিশেষ কোনো পূর্ব-পরিচয় নেই।
এদিকে খাদিজার মনে তখন না-জানি আগামী জীবনের কতো ছবি ভেসে উঠছিল। পিত্রালয়ের হাজারো সুখ-স্মৃতি নিশ্চয়ই তাঁর মনে ভেসে ভেসে উঠছিল। শৈশব-কৈশোরের কতো স্মৃতি মিশে আছে এ বাড়িতে। এ বাড়ির আঙিনায়। একটু দূরের ওই পাহাড়টার কাছে। এ-সব ছেড়ে এখন চলে যেতে হবে আরেক নতুন ঠিকানায়। প্রায় অজানা, অচেনা। কিন্তু কী আর করা! মেয়ে হয়ে জন্মালে পিত্রালয় ছাড়তেই হয়। স্বামীগৃহই হয়ে যায় আসল ঠিকানা। সেখানে পরজনকেই করে তুলতে হয় আপনজন। এ-ই নিয়ম। আল্লাহর অমোঘ বিধান।
📄 কুরাইশের নববধু
একদিন মক্কার বাণিজ্য-কাফেলা ফিরে এলো। সাথে নিয়ে এলো রঙ-বেরঙের পণ্য। খাদ্য, ফল, সুগন্ধি, পরিধেয় বস্ত্র, নানা রকমের অলঙ্কার। আরও কতো কী! এ কাফেলায় খোআইলিদ ও আতিকের উট-বহরও ছিল। বয়ে-আনা পণ্যের ভেতরে সবচেয়ে দামি ও মূল্যবান পণ্য ছিল—খাদিজার বিবাহ উপলক্ষে নিয়ে আসা অভিনব সব পাত্র, পোশাক ও বিছানা, পারসিক বিছানা, নানা রকমের সুগন্ধি ও গালিচা, এ-সবই বিবাহ উপলক্ষে খোআইলিদের ফরমায়েশি মালামাল। সব তিনি পাঠিয়ে দিয়েছেন আতিকের বাড়িতে। অপরদিকে আতিকও খাদিজার উপযোগী মহামূল্যবান সামগ্রী এনেছেন। পাঠিয়ে দিয়েছেন খাদিজাদের বাড়িতে।
সারা মক্কা অধীরচিত্তে অপেক্ষা করছিল আতিক-খাদিজার বন্ধন-রজনী—লাইলাতুয যাফাফের! দরিদ্র ও অসহায়রাও অপেক্ষা করছে এ-কাঙ্ক্ষিত দিনটির। ওদের চিন্তায় কাজ করছে কেবল এ চিন্তা—কয়েকদিন খুব মজা করে খাওয়া যাবে। খাবার-দাবারের একটা আচ্ছা ধুম পড়বে। মোটা মোটা উট জবাই হবে। গোশত যেমন খাওয়া যাবে, সাথে করে নিয়েও যাওয়া যাবে। অবাধে। কেউ বাধা দেবে না। এ বাড়ির দরোজা আগে যেমন খোলা ছিল, এখনো খোলা। এখন আরও বেশি করে খুলে যাবে। মুক্ত অবারিত হয়ে যাবে।
তরুণ-যুবারাও ওই দিনটির জন্যে অধীর প্রতীক্ষায় সময় কাটাচ্ছে। এ ধরনের অনুষ্ঠানে ওদের মজাটাই তো সবচেয়ে বেশি হয়! তৃপ্তিভরে খাওয়া-দাওয়া শেষে অসি-চালনায় নিজের যোগ্যতা ও দক্ষতা উজাড় করে দাও! আঘাত করো! আবার আঘাত করো! আঘাতের জবাবে পাল্টা আঘাত করো, আরও জোরে, আরও শাণিতভাবে। আনন্দঘন রুপোলি রাতের মায়াবি পর্দায় বসে খুলে দাও নৈশালাপের ঝুলি। পিপাসায় পান করো তৃপ্তিভরে। ধনীদের বিবাহ-অনুষ্ঠানগুলো অমন জাঁকজমকপূর্ণই হয়ে থাকে। থাকে সাজ-সজ্জার বাহার! খাওয়া-দাওয়ার ধুম! আনন্দ-উল্লাসের অবাধ প্রকাশ! নির্ঘুম রাতের আনন্দভরা গল্পের আসর জমে ওঠেই! আকাশে রুপালি জোছনা থাকুক কিংবা না থাকুক!
বুড়োরাও খাদিজা-আতিকের অনুষ্ঠানের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। তারাও বাদ পড়তে চায় না এ ধরনের অনুষ্ঠানের প্রাণময়তা থেকে। তারাও চায় প্রাণোচ্ছ্বলতায় একটু ‘সিক্ত’ হতে। তা ছাড়া খোআইলিদের অমন উদার সুন্দর নিমন্ত্রণ কি ‘বয়কট’ করা যায়? মক্কায় অমন সুন্দর করে কে আর দাওয়াত দেবে?
এ-সকল মানুষের বাইরে আরও একটা দল অপেক্ষা করছিল এ দিনটির। এরা আতিকের প্রতি হিংসাপরায়ণ। ওরা খাদিজাকে পাওয়ার জন্যে অনেক দৌড়ঝাঁপ করেছে। কিন্তু শেষটায় আতিক সবাইকে পেছনে ফেলে আগে চলে গেছেন। এ জন্যে দুঃখে-আফসোসে হৃদয় ওদের কেবলই পুড়ছিল—হিংসার আগুনে। দিনক্ষণ যতোই এগিয়ে আসছিল ওদের জ্বলনও ততোই বাড়ছিল। অবশ্য বাইরে বাইরে ওরাও সবাইকে এ কথা বোঝানোর চেষ্টা করছিল যে খাদিজার শুভদিনটির অপেক্ষায় আমরাও প্রহর গুনছি। আমরাও চাই এ আনন্দে অংশ নিতে।
হ্যাঁ.. অপেক্ষা ছিল পুরুষের মতো নারীমহলেও। কেমন পোশাকে খাদিজার অনুষ্ঠানে ওরা যাবে? কেমন পোশাকে গেলে মান রক্ষা হবে? এ ভাবনাই হয়ে দাঁড়ালো ওদের নিত্যভাবনা। আরেকদল নারী ভাবছিল অন্য কথা। এরা অভাবী। দারিদ্র্যপীড়িত। এই আনন্দের দিনে নিশ্চয়ই ফাতেমা তাদের কথা ভুলবেন না। তাঁর দান ও দয়া পাওয়ার অমন উপযুক্ত উপলক্ষ আর কী হতে পারে? সব সময়ই তো তিনি তাদেরকে দিয়ে এসেছেন! আজ আরও দেবেন; ভরে দেবেন! আজ তো ভরে দেবারই দিন! আজ তো মনভরে পাবারই দিন! আজ আকাশে মেঘ না থাকলেও বৃষ্টি নামবে, কেঁপে কেঁপে! আজ ফাতেমার আকাশ শুধুই দানের আকাশ! দানবৃষ্টিতে আজ তারা সিক্ত হবে, ভিজে যাবে! আজ ভিজে যাবারই দিন!
ফাতেমা বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপলক্ষে যাদেরকে মূল্যবান উপহার দিয়েছেন তারাও এখন সে ঋণ শোধ করতে চাইছে। এ জন্যে খাদিজাকে দেয়ার জন্যে দামি দামি উপহার ক্রয় করছে। আজ তো বদলা দেবার দিন! আজ ফাতেমার মতো মহীয়সীর কৃতজ্ঞতা আদায় করার দিন। আজ দাতাকে ফেরত দেবার দিন। আজ বিনিময়ের বিনিময় দেওয়ার দিন।
না, শেষ হয়নি! অপেক্ষার তালিকায় আরও কিছু মানুষ আছে! ওরা হলো কা’বার খাদেম! ওরা কেন বঞ্চিত হবে? সাধারণত সব ধনীদের বিবাহ-অনুষ্ঠানেই কিছু না-কিছু ওরা পায়। কিন্তু খোআইলিদ-তনয়ার বিবাহ অনুষ্ঠানটা ওদের চোখে একদম ভিন্ন। আজ প্রাপ্তির দেখা মিলবে না শুধু। আজ প্রাপ্তির রিমঝিম বৃষ্টি নামবে! নাহ! ঢল নামবে! নাকি বন্যাই বয়ে যাবে?! হোক সে ‘বন্যা’ মরু-মক্কাতেই!
ওরা ফুরফুরে মেজাজে কা’বাকে সাজাতে লাগলো সে দিনটির জন্যে!
খাদিজার আম্মা ফাতেমা এখন কী করছেন? কী ভাবছেন? একটু খোঁজ নেয়া যাক! তাঁর অনেক কাজ! দায়িত্বটা যে বিশাল! তিনি দু’হাতে সব গুছাচ্ছিলেন। অনুষ্ঠানের আয়োজন ও উপকরণ—সব! ভাবছিলেন ছোট-বড় সব বিষয় নিয়ে। মনে মনে তিনি রচনা করছিলেন প্রিয় মেয়ে খাদিজার ঘর-সংসারের কতো লাল-সবুজ চিত্র! আর বাস্তবেও তিনি তা থরে থরে সাজাতে লাগলেন। তাঁর একটাই চিন্তা, খাদিজার যেন কষ্ট না হয়। খাদিজার যেন আরাম হয়। খাদিজার মনে যেন না থাকে কোনো অভাব ও শূন্যতাবোধ। পারিবারিক সুখ-শান্তি ও স্বস্তি হোক খাদিজার নিত্য পাওয়া। তিনি এসব নিয়ে ভাবেন, ভাবতেই থাকেন। মেয়ে খাদিজার আসবাবপত্রে কোনো কমতি থাকতে পারবে না। তাহলে মানুষ বলাবলি করবে, খাদিজার চেয়ে ‘ঐ মেয়ের’ বিবাহ-আয়োজনটা আরও সুন্দর ছিল। উপায়-উপকরণ অনেক বেশি ছিল। আরও জাঁকজমকপূর্ণ ছিল।
ভাবছিলেন খাদিজাও—নতুন জীবনের দায়িত্বভারের কথা। আরও ভাবছিলেন কেমন হবে আগামী দিনগুলো; সুখের না দুঃখের। কারও কারও জীবনে তো দুঃখও আসে। কেউ হাসে সুখের হাসি। কেন এ দুঃখ? কেন ওই সুখ? কারণ আছে। দুঃখের যেমন কারণ আছে, সুখেরও কারণ আছে। দুঃখের কারণ বর্জন করতে হয়, সুখের কারণ অর্জন করতে হয়। খাদিজা বর্জন করবেন দুঃখের কারণ। অর্জন করবেন সুখের কারণ।
এবার বলি খাদিজার বাঁদিদের কথা। ওরা সীমাহীন আনন্দিত। একবার আসছে একবার যাচ্ছে। খাদিজাকে উপলক্ষ করে ওরা সুরেলাকণ্ঠে গুনগুন করছে, সময়ের ধারায় সময়ের ভাষায়। খাদিজাদের বাড়িটি সুরময় হয়ে উঠেছে। সুরের গুঞ্জরন কখনো বাড়ে দুতলায়, কখনো তিনতলায়। কখনো মূর্ছনা ছুঁয়ে যায় আঙিনায় বিচরণ করা মানুষের কান। ওদের কেউ যখন খাদিজার কাছে চলে আসে, ওর কণ্ঠটা তখন আরও বেশি বেজে ওঠে, বাঙ্ময় হয়ে ওঠে। ওরা যেন খাদিজার বাঁদি নয়, সখী! যেন কেন? খাদিজা তো ওদের সঙ্গে সখীর মতোই আচরণ করেন! হ্যাঁ, ঠিক সখীই ভাবেন! কে বলতে পারবে—খাদিজার দুর্ব্যবহার কারও চোখে আঁসু এনেছে? মনের আকাশে জমিয়েছে কারও কালো মেঘ?
এ জন্যেই খাদিজার এইসব ‘সখীদের’ প্রত্যেকই এখন কামনা করছে—হায়! খাদিজা যদি আমাকে, শুধু আমাকে নিয়ে যেতেন স্বামীগৃহে—আতিকালয়ে!
খাদিজার মনে বাজছে চিরন্তন ‘বিরহ-সুর’! উদাস (হয়তো ছলছল) চোখে দেখছিলেন তিনি বাবার বিশাল বাড়ি। তার আশপাশ। সবকিছু। আহা, সবকিছু কী মায়া-জড়ানো! স্মৃতি-মোড়ানো! এখন সবকিছু ছেড়ে চলে যেতে হবে এমন এক বাড়িতে, যা তাঁর কাছে অজানা অচেনা! এমন এক মানুষের কাছে, যাঁর সঙ্গে তাঁর পরিচয় নেই—কেবল দূর থেকে শোনা-শোনা! কেমন হবে সেই বাড়ি? কেমন হবে সেই মানুষটি? খাদিজার একটু ভয়ভয় করে। কিন্তু খাদিজা সে ভয়কে মনে জায়গা দেন না। মনে শক্তি সঞ্চয় করেন। ভয়কে ঠেলে অনেক দূরে সরিয়ে দেন। তারপর মনের সাথে কথা বলেন ফিসফিস কণ্ঠে:
—কেন আমি অমন ভয় পাচ্ছি ভবিষ্যৎ নিয়ে? ভবিষ্যৎ তো আল্লাহর হাতে! দাম্পত্যজীবনে আমার কাছে কী চাওয়া হবে? বিবাহ হলো স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সহযোগিতা। আমি মনেপ্রাণে আমার স্বামীকে সহযোগিতা করবো। আমি নিজেকে তাঁর কাছে সঁপে দেবো। আমি তাঁর বাঁদি হয়ে যাবো! অপরদিকে আমার আনুগত্যের ‘যাদু’ দিয়ে তাঁকে বশীভূত করে ফেলবো, আমার ‘গোলামে’ পরিণত করবো! তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনই হবে আমার সাধনা। আমি তাঁর প্রতি থাকবো চিরবিশ্বস্ত, সবকিছুতে। আমার হাতে তাঁর কিছুই নষ্ট হবে না। না মাল নষ্ট হবে, না বিশ্বাস নষ্ট হবে।
খাদিজা থামলেন। কিছুক্ষণের জন্যে তাঁর ‘নিজেরে নিয়ে নিজের কথা’ বন্ধ হলো। একটু পর আবার তিনি সবাক হলেন। আবার তিনি মনকে লক্ষ করে বললেন:
—কেন আমি ভয় পাবো? পিত্রালয়ে সবকিছু তো আমিই আঞ্জাম দিয়ে এ পর্যন্ত এসেছি! বাবার আস্থা ও বিশ্বাস কুড়িয়েছি! সবকিছুতেই ঝিলমিল করছে আমার কর্ম ও কর্মপরিচালনার ছাপ! এতোদিন এখানে যা শিখেছি তা-ই ওখানে গিয়ে প্রয়োগ করবো। কাজে লাগাবো। এখানে যেমন আমি সফল হয়েছি ওখানেও আমি সফল হবো! এখানে যেমন আমি সন্তুষ্টি অর্জনে সফলকাম হয়েছি ওখানেও আমি সফলকাম হতে পারবো! আমাকে আল্লাহ দান করেছেন বুদ্ধি। দিয়েছেন বিচারক্ষমতা। প্রবল অনুভূতিশক্তি। সব আমি কাজে লাগাবো। সব কাজে লাগালে কেন আমার স্বামী আমার ওপর রাগ করবেন? কেন আমি তাঁকে অসন্তুষ্ট করবো? তাঁর জন্যে সমস্যা হয়ে দাঁড়াবো? তাঁর জীবন-যাপনকে সুখঘেরা না-করে কেবল বিষিয়ে তুলবো?
খাদিজা এমন অনেক যুবতীর কথাই ভাবেন, যারা দাম্পত্যজীবনে সফল হয় নি। খাদিজা এ জন্যে ওদেরই দোষ দেন, স্বামীদের নয়। কেননা, এ যুবতীরা স্বামীদের আরাম ও স্বস্তি দিতে পারে নি, ব্যর্থ হয়েছে। ওরা ভাবে নি, ভেবে দেখে নি, কেন এ বিবাহ-বন্ধন? কেন ওরা পিত্রালয় ছেড়ে অজানা অচেনা পরিবেশে এসেছে।
হ্যাঁ এসব ভাবতে ভাবতে খাদিজা এখন অনেক স্বস্তি অনুভব করছেন। না, ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই। আর কোনো ভয় নেই। আল্লাহই সব সহজ করে দেবেন। ভয় নেই আর ‘লাইলাতুয যাফাফ’ (দু’টি পৃথক মানুষ আল্লাহর নামে এক হয়ে যাওয়ার রাত) নিয়ে, যা এখন খুবই কাছে, হাতে গোনা কয়েকটা দিনরাত্রি।
খাদিজার মা ফাতেমা খাদিজাকে সুযোগ পেলেই বলে দিচ্ছেন দাম্পত্যজীবনের ছোট-বড় সব কর্তব্যের কথা। কী করণীয় এবং কেন করণীয়, কী বর্জনীয় এবং কেন বর্জনীয়—সব খুলে-খুলে তিনি মেয়েকে বুঝিয়ে দিচ্ছেন। বিবাহের বাকি এ দিনগুলো যেন হয়ে উঠেছে—‘পাঠশালা’। ছাত্রী হলেন খাদিজা আর শিক্ষিকা হলেন ফাতেমা। কী সুন্দর পাঠশালা! কী উত্তম বিষয়বস্তু! সুবোধিনী খাদিজার সামনে সুহাসিনী ফাতেমা সব মেলে ধরছেন। খাদিজার সামনে খুলে যেতে লাগলো একের পর এক বদ্ধ কপাট। অস্পষ্ট ভবিষ্যৎ এখন কী স্পষ্ট! খাদিজার মন এখন শান্ত-প্রশান্ত। খাদিজার হৃদয় এখন আলোকোদ্ভাসিত। কেননা একের সাথে এখন আরেক মিলিত হয়ে যোগ সংখ্যা দুই হয়েছে! অর্থাৎ খাদিজা যা যা ভাবছিলেন করণীয় ও বর্জনীয় সম্পর্কে, মা-ও ঠিক তা-ই তা-ই বলেছেন। তার চিন্তার সাথে মিলে গেছে, বরং মিশে গেছে মায়ের চিন্তা।
অবশেষে এলো বিবাহের প্রতীক্ষিত সেই দিন। অনুষ্ঠানের কাঙ্ক্ষিত লগ্ন। খোআইলিদ-গৃহ পূর্ণ হয়ে গেল আত্মীয়-স্বজনে। সখী ও বান্ধবীদের ভিড়ে ভরে গেল। বনু মাখযূমের মহিলারা এলো আতিক-প্রেরিত মূল্যবান উপঢৌকন নিয়ে। এলো কুরাইশ নারীরাও নিজেদের উপহারসামগ্রী নিয়ে। তারপর কতো-যে উট জবাই হলো, সারা মক্কার কতো-যে মানুষ খেতে এলো, তার কোনো হিসাব রইলো না।
খোআইলিদ-গৃহে গীত হতে লাগলো নারীকণ্ঠের বিবাহ ও আনন্দ সঙ্গীত। কন্যা-সাজানেরা লেগে গেল সাজানোয়। সুন্দর নববধূকে আরও সুন্দর ও রূপবতী করে তুলতে। সুন্দরের ওপর আরও সুন্দর। দিনটাও ছিল আশ্চর্য সুন্দর। প্রকৃতি ছিল স্থির শান্ত। চারদিকে বইছিল ঝিরঝিরে বাতাস। সারা মক্কা আজ উৎসবে মেতে উঠেছে। খোআইলিদ-গৃহকে কেন্দ্র করে তা আবর্তিত হচ্ছে। মক্কার উৎসবমুখর সময় এগিয়ে চলেছে সামনে।
দিবাবসানে এলো সন্ধ্যা। চারদিক ছেয়ে গেল রাতের আঁধারে। আজকের আঁধারেও যেন আলোর ঝিলিমিলি। অবশ্য আকাশেও আছে তারকার মিটিমিটি। এ সময়েই কা’বার সন্নিকটে ‘আকদ’ সম্পন্ন হলো। আক্দের পর সবার মুখাবয়বে খুশির আলো ঝলমলিয়ে উঠলো। সবাই আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে কা’বা তাওয়াফ করতে লাগলো। খাদিজা-আতিকের সুখময় শান্তিময় দাম্পত্যজীবনের জন্যে দু’আ করতে লাগলো। খোআইলিদ-গৃহ থেকে ভেসে আসছে মিষ্টি-মধুর হর্ষোল্লাসধ্বনি। মক্কার এখানে ওখানে তা গড়িয়ে পড়ছে। মক্কার মানুষের মনে আনন্দের হিল্লোল বইয়ে দিচ্ছে।
খাওয়া-দাওয়ার পর্ব শেষ হলে সবাই আসর জমিয়ে বসলো। গোল আসরের মধ্যমণি হয়ে বসলো মক্কার নেতা ও সরদারেরা। মধ্যিখানে এসে হাজির হলো মক্কার বীর সন্তানেরা, অসি ও নেযা চালনায় যাদের জুড়ি মেলা ভার। শুরু হলো যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা। চললো আক্রমণ প্রতিআক্রমণ। পাশাপাশি জ্বলে জ্বলে উঠলো প্রতিরোধ। প্রকৃত লড়াইয়ের মতো এখানেও ছিল ‘হারজিত’। যারা জিতলো তারা পেল উষ্ণ অভিনন্দন ও বাহবা। যারা হারলো তারা মাথাটা নিচু করে বাইরে বেরিয়ে এলো। হতাশ-ছাওয়া চেহারা নিয়ে। কপালের দরদর ঘাম মুছতে মুছতে। পরবর্তী লড়াইয়ে লজ্জার আবির থেকে মুক্তি পাওয়ার গজগজে (ক্রুদ্ধতা মেশানো) সংকল্প নিয়ে।
📄 মক্কার ধর্মযাজক
উচ্ছ্বাসমাখা হাসি-আনন্দে আর মন ছুঁয়ে-যাওয়া সঙ্গীতে সবাই মুগ্ধ। সবার চেহারায় ঝলমল করছে স্বল্পালোকিত রাতের মায়াবি দ্যুতি। কিন্তু একজন বসে আছেন তাদের কাছে, একটু দূরে গম্ভীর হয়ে। এই গণআনন্দেও তাঁর যেন আনন্দ নেই। এই গণজোয়ারেও তাঁর যেন কোনো প্রবহমানতা নেই। কেমন নীরব নিস্তব্ধ ভাবলেশহীন। আপন ভুবনে নিমজ্জিত। নিজের চিন্তায় সমাহিত। কখনো তাকাচ্ছেন গভীর দৃষ্টিতে এদের দিকে.. ওদের দিকে। আসরের কাছে তিনি যে অপরিচিত তা নয়, মক্কার সবাই তাঁকে জানে, চেনে। মক্কার পাহাড়-পর্বত-উপত্যকা—সব তাঁকে চেনে। এ জন্যে সবাই তাঁকে কাছে আসতে বললো। আজকের এ আনন্দে শরিক হতে বললো। পান করতে বললো। সঙ্গীত উপভোগ করতে বললো। খোআইলিদ তাঁকে ডেকে উঠলেন এই বলে:
—ওয়ারাকা! অমন গম্ভীর হয়ে বসে আছো যে! এসো, কাছে এসো! আজ আনন্দের দিন। চাচাতো বোন খাদিজার আনন্দে কেন তুমি অংশ নেবে না?!
ওয়ারাকা চাচার কথায় মৃদু হেসে বললেন:
—চাচা! আপনি তো জানেন, এসব গান-আনন্দ আমার ভালো লাগে না। আপনাদের জগৎ থেকে আমার জগৎ আলাদা!
খোআইলিদের পাশের একজন বলে উঠলো:
—ওয়ারাকা! তুমি যে কী! তুমি কি বদলাবে না? এক কাজ করো তাহলে, মক্কা ছেড়ে চলে যাও! সমাজ থেকে আলাদা হয়ে যাও! মক্কার মানুষের সাথে তোমার কী সম্পর্ক? মক্কার ধর্ম মানো না তুমি! মক্কার সমাজ মানো না তুমি!
তার সাথে যোগ দিলো আরেক লোক:
—ওয়ারাকা! তুমি মক্কার নও, মক্কাও তোমার নয়! তোমার দীন-ধর্ম ভিনদেশি—রোম থেকে পাওয়া! আমাদের উপাস্যদের সাথে তোমার কোনো সম্পর্ক আছে বলে মনে হয় না। কেন তুমি পড়ে আছো এখানে? আমাদের উপাস্যরা তোমার চোখে মূল্যহীন? মোটেই তা ভেবো না! আমাদের উপাস্যরা আমাদের সাহায্য করে। দেখে দেখে রাখে। বিপদে সাহায্য করে। আমাদের ‘গায়ে’ মঙ্গল ও কল্যাণ ঢেলে দেয়। ওয়ারাকা! এই যে দেখতে পাচ্ছো না, আজ আমাদের কী আনন্দ? এ আনন্দ আমাদের উপাস্যদেরই দয়া ও দান! আজ তো খোআইলিদ-কন্যা খাদিজার বিবাহ-অনুষ্ঠান। আজ খাদিজা চলে যাবে আতিক বিন আবিদের গৃহে। এ উপলক্ষে তুমি যে খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন দেখছো, তাতে কে মজা ও রস ঢেলে দিয়েছে—জানো? সে আমাদেরই এই উপাস্যরা! আমাদের এই যে আজকার হাসি-আনন্দ, তাও বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে এই উপাস্যদেরই বরকতে! সুতরাং হে ওয়ারাকা! তুমি তোমার নিরস জগৎ ছেড়ে আমাদের সরস জগতে প্রবেশ করো! ভোগ করো আনন্দ, আমাদের সাথে মিশে যাও! নইলে তুমি পস্তাবে, কঠিন মাশুল দেবে! অনেক কল্যাণ তোমার হাতছাড়া হয়ে যাবে!
আরেকটা বিদ্রূপ-কণ্ঠ বেজে উঠলো পাশ থেকে:
—ওয়ারাকা! কবে থেকে তুমি অমন সাধু বনে গেলে? কেন ‘ধর্ম নিয়ে’ এতো খোঁজাখুঁজি করছো? কেন দেশে-দেশে এতো ঘোরাঘুরি করছো? এ সবই আত্মপ্রতারণা, বুঝলে হে ওয়ারাকা? আশ্চর্য! বাপ-চাচাদের কাছ থেকে কিছুই তুমি শিখলে না! তুমি কী চাও আসলে? তুমি কি আমাদের সবকিছু নষ্ট করে দিতে চাও?
আরও অনেকেই এ বিদ্রূপমাখা আলোচনায় অংশ নিলো। কিন্তু ওয়ারাকা তেমন কিছুই বললেন না। দীর্ঘশ্বাসজড়িত কণ্ঠে কেবল উচ্চারণ করলেন:
—করো, যতো পারো বিদ্রূপ করো আমাকে নিয়ে! এমন একদিন আসবে, যখন আমি বিদ্রূপ করবো তোমাদের নিয়ে! জানো, সে সময়টা কখন? সে সময়টা হলো নবীর আগমনের মহালগ্ন! হ্যাঁ.. সে নবী আসবেন এই তোমাদেরই মধ্য থেকে! তিনি এসে তোমাদের এ-সব মূর্তি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবেন! তোমাদের বাতুলতাকে ধূলোয় মিশিয়ে দেবেন!
ওয়ারাকার কথা শুনে সবাই অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো, ওয়ারাকা যেন পাগল! তার মুখে যেন পাগলের অসংলগ্ন উক্তি! একজন চিৎকার করে বলে উঠলো—কে সেই নবী, ওয়ারাকা? কোন বংশে তাঁর আগমন? তুমিই তো নও?! তুমি পাগল হয়ে গেছো ওয়ারাকা, তুমি পাগল হয়ে গেছো! তুমি দ্রুত মক্কা ছাড়ো, আবার তোমার ‘দেশভ্রমণে’ বের হও! ধর্মচর্চা করোগে গিয়ে! কিন্তু মনে রাখবে, অন্য কোনো ধর্মটর্ম মক্কায় আমদানি করলে আমরা তোমাকে ছাড়বো না! আমাদের ধর্ম শুধু আমাদের বাপ-দাদাদের ধর্ম!
হঠাৎ শোনা গেল একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির গম্ভীর কণ্ঠ, এই.. থামো তো! কী তর্ক শুরু করলে তোমরা? তোমরা তো দেখছি আজকের আনন্দের রাতটাকেই বাসি করে দিচ্ছো! সাবধান! আর একটা কথাও নয়! এখন চলবে শুধু গান! শুধু পান!
আবার শুরু হলো গান আর পান! হর্ষোল্লাস আর দফের আওয়াজে আবার নেমে এলো আসরীয় মাদকতা!
মান্যবর কুরাইশ সরদার আবদুল মুত্তালিবও এ আনন্দ-অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন। আজকের এ আনন্দ-অনুষ্ঠানের পূর্বে কুরাইশ কোনো আনন্দ-অনুষ্ঠান করে নি। আর এর কারণ ছিল আবদুল মুত্তালিবের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ। প্রিয় ছেলে আবদুল্লাহকে তিনি খুব ঘটা করে বিবাহ করিয়েছিলেন। কিন্তু কিছুদিন যেতে না-যেতেই আবদুল্লাহ চলে গেলেন! আবদুল্লাহর শোকে আবদুল মুত্তালিব ভীষণ কাতর হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর শোকে সারা মক্কা শোকের চাদর পরলো। সব আনন্দ-অনুষ্ঠান থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিলো। নেতা যদি শোক-বিহ্বল থাকে, অন্যরা কেমন করে আনন্দ করবে? আজ অনেক দিন পর মক্কা আবার আনন্দ দেখলো। আনন্দের পরিবেশ উপভোগ করলো। স্বয়ং আবদুল মুত্তালিবও তাতে অংশ না নিয়ে পারলেন না। কিসের টানে শোকাকুল আবদুল মুত্তালিব এখানে আকুলচিত্তে ছুটে এলেন—তা নিজেও পুরোপুরি বুঝতে পারলেন না। এখানে এসে যেন সব শোক তিনি কাটিয়ে উঠেছেন! নাহ! শুধু শোক কাটিয়ে উঠেছেন বলছি কেন? তিনি অফুরন্ত আনন্দও অনুভব করছেন! হৃদয়টা ভরে গেছে স্বস্তি ও প্রশান্তিতে। কারণ আছে। এখানে এসেছেন বলেই যে তাঁর মনটা শান্ত ও প্রশান্ত হয়েছে, কেবল তা-ই না, আরও কারণ আছে। তা হলো আল্লাহ আবদুল্লাহর বিনিময় দান করেছেন তাঁকে। আবদুল্লাহর স্ত্রী আমেনার গর্ভে জন্ম নিয়েছে এক শিশু। তার নাম রেখেছেন তিনি আদর করে—মুহাম্মদ।
এ মুহাম্মদের বরকতেই এখন তাঁর শোক পরিণত হয়েছে আনন্দে। স্বস্তিতে। প্রশান্তিতে। সবাই মুহাম্মদের আগমনে আবদুল মুত্তালিবকে মুবারকবাদ জানাচ্ছিল। আর খাদিজার এ বিবাহ-অনুষ্ঠানে বসে সবাই আবদুল মুত্তালিবের উদ্দেশে এ কামনাও করছিল যে আল্লাহ যেন তাঁর হায়াতকে দারাজ করে দেন, যেন তিনি প্রিয় নাতি মুহাম্মদের বিবাহ-অনুষ্ঠানেও উপস্থিত থাকতে পারেন! জবাবে আবদুল মুত্তালিব হাসেন কৃতজ্ঞতার হাসি, যে হাসিতে লুকোনো আছে এই নীরব ভাষা—সে কী করে হবে! আমার যে এখন অনেক বয়স হয়েছে! আমি পারবো এই দুধশিশুর বিবাহ দেখে যেতে? আহ! আল্লাহ যদি এমনটি করতেন!
নৈশালাপ চললো ফজর-অবধি। এর মধ্যে নববধূ বনু মাখযূমে আতিক-গৃহে যাত্রা করেছেন। আতিক অনেক সুন্দর করে সাজিয়েছেন নিজের বাড়িটি, খাদিজার উপযুক্ত করে। এদিকে ধীরে ধীরে অন্যরাও চলে গেল নিজেদের বাড়িতে, খুশির রাঙা আবির মেখে।
খাদিজা প্রবেশ করলেন নতুন জীবনে। এ জীবনের কতো স্বপ্ন এঁকেছেন তিনি মনে মনে। এ জীবন নিয়ে কতো আশা বাসনা লুকিয়ে ছিল তাঁর মনোজগতে। কিন্তু তবুও তিনি স্বস্তি অনুভব করতে পারছেন না, কোনো অদৃশ্য ইশারা কি তাঁর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে বাঁকা চোখে হাসছে?! আল্লাহই ভালো জানেন। তিনিই সবকিছুর খবর রাখেন—আল্লামুল গয়ুব।