📄 তওবার শর্তাবলী
তওবা করার জন্য কিছু শর্ত অনুসরণ করতে হবে। সেগুলো হল :
১. বর্তমানে যে গুনাহে লিপ্ত রয়েছে, তা অবিলম্বে বর্জন করতে হবে।
২. অতীতের কৃত গুনাহের জন্য আল্লাহর শাস্তিকে ভয় করে অনুতপ্ত হতে হবে।
৩. ভবিষ্যতে আর কখনো উক্ত পাপ কাজ না করার সুদৃঢ় অঙ্গীকার করতে হবে।
৪. যেসব ফরজ ও ওয়াজিবের কাজা আদায় করা ওয়াজিব সেগুলোর কাজা আদায় করা।
৫. তওবাকারীর গুনাহের সাথে যদি বান্দার হক সম্পৃক্ত থাকে, তবে তার মীমাংসা করতে হবে। প্রাপক জীবিত থাকলে তাকে তার হক ফেরত দিতে হবে অথবা মাফ চেয়ে নিতে হবে। প্রাপক জীবিত না থাকলে তার ওয়ারিসদেরকে তা ফেরত দিতে হবে।
৬. কাউকে হাত বা মুখ দিয়ে কষ্ট দিয়ে থাকলে বা গালি দিয়ে থাকলে বা কারো গীবত করে থাকলে যেভাবে সম্ভব তাকে সন্তুষ্ট করে ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে।
৭. এসব শর্ত ছাড়াও আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে। আর তা হল, শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য পাপ ছেড়ে দেয়া এবং তাঁর জন্যই তওবা করা, অন্য কোন উদ্দেশ্যে নয়।
📄 তওবা করার পদ্ধতি
প্রতিটি কাজের কিছু নিয়ম পদ্ধতি রয়েছে, ঠিক সেভাবে তওবা করারও কিছু নিয়ম রয়েছে। নিম্নে তওবা করার পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করা হল :
তাড়াতাড়ি তওবা করা
নিজের তওবা নিজেকেই করতে হয়, আর তা করতে হয় পাপ করার পর পরই। আর তওবা হচ্ছে পাপকাজ ছেড়ে দিয়ে নেকআমল শুরু করা। যে ব্যক্তি মৃত্যুর নিকটবর্তী হয়ে যায় তার আর নেকআমল করার সুযোগ থাকে না। তাই প্রতিটি মানুষের উচিত কোন পাপ হয়ে গেলে, তাড়াতাড়ি তওবা করা এবং গুনাহের কাজ ছেড়ে দিয়ে ভাল কাজ করা। কারণ মানুষের জীবনের কোন নিশ্চয়তা নেই। কতদিন জীবিত থাকবে এবং কখন মারা যাবে এ সম্পর্কে সে অবগত নয়। বিধায় তার উচিত যত দ্রুত সম্ভব নিজ গুনাহের জন্য আল্লাহর কাছে তওবা করা। কেননা সে যদি আল্লাহর হক ও বান্দার হক নিয়ে মারা যায় তবে তাকে জাহান্নামের আগুনে জ্বলতে হবে। বান্দাকে এ পরিণতি থেকে রক্ষা করার জন্য আল্লাহ পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে তাড়াতাড়ি তওবা করার জন্য তাগিদ দিয়েছেন। তিনি বলেন-
إِنَّمَا التَّوْبَةُ عَلَى اللهِ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السُّوءَ بِجَهَالَةٍ ثُمَّ يَتُوبُونَ مِنْ قَرِيبٍ فَأُولَئِكَ يَتُوبُ اللهُ عَلَيْهِمْ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيمًا حَكِيمًا
“আল্লাহ কেবল তাদের তওবাই কবুল করেন, যারা অজ্ঞতাবশত পাপ করে ফেলে, অতঃপর তাড়াতাড়ি তওবা করে নেয়। এসব লোকের তওবাই আল্লাহ কবুল করেন। আর আল্লাহ জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাময়।” (সূরা নিসা- ১৭)
তাছাড়া মৃত্যু আসার পূর্বে এবং সূর্য পশ্চিম দিক হতে উদিত হওয়ার পূর্বেই তওবা করতে হবে। কেননা, এ দু'সময় আল্লাহ তা'আলা কারো কোন তওবা কবুল করবেন না। রাসূল ﷺ বলেছেন-
مَنْ تَابَ قَبْلَ أَنْ تَطْلُعَ الشَّمْسُ مِنْ مَغْرِبِهَا تَابَ اللَّهُ عَلَيْهِ
“যে ব্যক্তি পশ্চিম দিক থেকে সূর্য ওঠার আগেই তওবা করবে আল্লাহ তার তওবা কবুল করবেন।” (মুসলিম হা: ৭০৩৬)
নেক আমলের ওসীলা নিয়ে তওবা করা
যেসব গুনাহ সংঘটিত হয়ে গেছে, সেগুলোর উপর খাঁটি মনে লজ্জিত হয়ে ভবিষ্যতে আর কোন গুনাহ না করার দৃঢ় অঙ্গীকার পোষণ করে যদি তওবা করা হয়, তাহলে আশা করা যায়, তা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ হবে। তবে যদি কোন নেক আমলের ওসীলা নিয়ে তওবা করা হয়, তাহলে তওবা আরও অধিক কবুলের আশা করা যায়। যেমন বনী ইসরাঈলের তিন ব্যক্তি বিপদে পড়ে নেক আমলের ওসীলা নিয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়েছিল। তাই আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। হাদীসে এসেছে-
عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا : أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : " بَيْنَمَا ثَلَاثَةُ نَفَرٍ مِمَّنْ كَانَ قَبْلَكُمْ يَمْشُونَ إِذْ أَصَابَهُمْ مَطَرْ ، فَأَوَوْا إِلى غَارٍ فَانْطَبَقَ عَلَيْهِمْ ، فَقَالَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ : إِنَّهُ وَاللَّهِ يَا هَؤُلَاءِ لَا يُنْجِيكُمْ إِلَّا الصِّدْقُ ، فَلْيَدْعُ كُلُّ رَجُلٍ مِنْكُمْ بِمَا يَعْلَمُ أَنَّهُ قَدْ صَدَقَ فِيهِ . فَقَالَ وَاحِدٌ مِنْهُمُ : اللَّهُمَّ إِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّهُ كَانَ لِي أَجِيرٌ عَمِلَ لِي عَلَى فَرَقٍ مِنْ أَرْ، فَذَهَبَ وَتَرَكَهُ وَأَنِّي عَمَدْتُ إِلَى ذَلِكَ الْفَرَقِ فَزَرَعْتُهُ فَصَارَ مِنْ أَمْرِهِ أَنِّي اشْتَرَيْتُ مِنْهُ بَقَرًا. وَأَنَّهُ أَتَانِي يَطْلُبُ أَجْرَةً فَقُلْتُ لَهُ : اعْمِدُ إِلى تِلْكَ الْبَقَرِ . فَسُقُهَا، فَقَالَ لِي: إِنَّمَا لِي عِنْدَكَ فَرَقٌ مِنْ أَرْز . فَقُلْتُ لَهُ : اعْمِدُ إِلى تِلْكَ الْبَقَرِ فَإِنَّهَا مِنْ ذَلِكَ الْفَرَقِ، فَسَاقَهَا، فَإِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنِّي فَعَلْتُ ذَلِكَ مِنْ خَشْيَتِكَ، فَفَرِجُ عَنَا . فَانْسَاحَتْ عَنْهُمُ الصَّخْرَةُ ، فَقَالَ الْآخَرُ: اللَّهُمَّ إِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّهُ كَانَ لِي أَبَوَانِ شَيْخَانِ كَبِيرَانِ، وَكُنْتُ أَتِيهِمَا كُلَ لَيْلَةٍ بِلَبَنِ غَنَمٍ لِي، فَأَبْطَأْتُ عَنْهَا لَيْلَةٌ فَجِئْتُ وَقَدْ رَقَدًا وَأَهْلِي وَعِيَالِي يَتَضَاغَوْنَ مِنَ الْجُوعِ، وَكُنْتُ لَا أُسْقِيهِمْ حَتَّى يَشْرَبَ أَبَوَايَ، فَكَرِهْتُ أَنْ أُوقِظَهُمَا ، وَكَرِهْتُ أَنْ أَدَعَهُمَا، فَيَسْتَكِنَا لِشَرْبَتِهِمَا، فَلَمْ أَزَلْ أَنْتَظِرُ حَتَّى طَلَعَ الْفَجْرُ ، فَإِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنِّي فَعَلْتُ ذَلِكَ مِنْ خَشْيَتِكَ، فَفَرِجُ عَنَّا فَانْسَاخَتْ عَنْهُمُ الصَّخْرَةُ حَتَّى نَظَرُوا إِلَى السَّمَاءِ ، فَقَالَ الْآخَرُ: اللَّهُمَّ إِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّهُ كَانَ لِي ابْنَةُ عَةٍ مِنْ أَحَبِّ النَّاسِ إِلَى، وَأَنِّي رَاوَدْتُهَا عَنْ نَفْسِهَا فَأَبَتْ إِلَّا أَنْ أُتِيَهَا بِمِائَةِ دِينَارٍ، فَطَلَبْتُهَا حَتَّى قَدَرْتُ ، فَأَتَيْتُهَا بِهَا فَدَفَعْتُهَا إِلَيْهَا، فَأَمْكَنَتْنِي مِنْ نَفْسِهَا ، فَلَمَّا فَعَدْتُ بَيْنَ رِجْلَيْهَا. قَالَتِ : اتَّقِ اللهَ وَلَا تَفُضَ الْخَاتَمَ إِلَّا بِحَقِّهِ . فَقُمْتُ وَتَرَكْتُ الْمِائَةَ دِينَارٍ ، فَإِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنِّي فَعَلْتُ ذَلِكَ مِنْ خَشْyَتِكَ فَفَرِّجْ عَنَّا فَفَرَّجَ اللَّهُ عَنْهُمْ فَخَرَجُوا
ইবনে উমর থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তোমাদের পূর্বযুগের লোকদের মাঝে তিনজন লোক ছিল। তারা পথ চলতে চলতে হঠাৎ ঝড়বৃষ্টির মাঝে পড়ে গেল। কোন দিক নির্দেশনা না পেয়ে তারা এক গুহায় আশ্রয় নিল। গুহায় প্রবেশ করার কিছুক্ষণ পরই তাদের গুহার মুখ একটি পাথর চাপা পড়ে বন্ধ হয়ে গেল। পাথর চাপা পড়তেই তারা বিপদে পড়ে গেল, এত বড় পাথর তারা কীভাবে সরাবে। তাদের একজন অন্যদেরকে বলল, বন্ধুগণ! আল্লাহর শপথ! এখন সত্য ব্যতীত আর কিছুই তোমাদেরকে রেহাই দিতে পারবে না। কাজেই তোমাদের প্রত্যেকের সে জিনিসের ওসীলায় দো'আ করা দরকার, যে ব্যাপারে জানা আছে যে, এ কাজটিতে সে সততা বহাল রেখেছে। তখন তাদের একজন এই বলে দো'আ করতে লাগল, হে আল্লাহ! তুমি ভাল করেই জান যে, আমার একজন চাকর ছিল। সে এক ফারাক (একটি পরিমাপ) চালের বদলে আমার কাজ করে দিয়েছিল। কিন্তু সে মজুরি না নিয়েই চলে গিয়েছিল। তারপর আমি তার মজুরি দিয়ে কিছু একটা করতে ইচ্ছা করলাম এবং কৃষি কাজে লাগালাম। এতে যা উৎপাদন হয়েছে তার বদলে আমি একটি গাভী ক্রয় করলাম। অনেক দিন পর সে চাকরটি আমার কাছে এসে তার মজুরি দাবী করল। আমি তাকে বললাম, এ গাভীগুলোর দিকে তাকাও এবং তা তাড়িয়ে নিয়ে যাও। সে জবাব দিল, ঠাট্টা করবেন না। আমার তো আপনার নিকট মাত্র এক ফারাক চাল পাওনা। আমি তাকে বললাম গাভীগুলো নিয়ে যাও। কারণ তোমার সেই এক ফারাক চাল দ্বারা যা উৎপাদিত হয়েছে, তারই বদলে এটি ক্রয় করা হয়েছে। তখন সে গাভীগুলো তাড়িয়ে নিয়ে গেল। হে আল্লাহ! যদি তুমি মনে কর তা আমি একমাত্র তোমার ভয়েই করেছি, তাহলে আমাদের গুহার মুখ থেকে এ পাথরটি সরিয়ে দাও। অতঃপর পাথরটি কিছুটা সরে গেল।
দ্বিতীয় যুবক দো'আ করল, হে আল্লাহ! তোমার ভাল করে জানা আছে যে, আমার মা-বাবা খুব বুড়ো ছিলেন। আমি প্রত্যেক রাত্রে তাঁদের জন্য আমার ছাগলের দুধ নিয়ে যেতাম। ঘটনাক্রমে এক রাতে তাদের কাছে (দুধ নিয়ে) যেতে আমি বিলম্ব করে ফেললাম। তারপর এমন সময় গেলাম, যখন তাঁরা উভয়ে ঘুমিয়ে পড়ে ছিলেন। আর আমার স্ত্রী ও ছেলে মেয়ে ক্ষুধায় ছটফট করছে। কিন্তু আমি আমার মা-বাবাকে দুধ পান না করানো পর্যন্ত আমার (ক্ষুধায় কাতর) ছেলে মেয়েকে দুধ পান করাইনি। কারণ তাঁদেরকে ঘুম থেকে জাগানোটা আমি ভাল মনে করিনি। অপরদিকে তাঁদেরকে বাদ দিতেও ভাল লাগেনি। কারণ, এ দুধটুকু পান না করালে তাঁরা উভয়েই খুব দুর্বল হয়ে যাবেন। তাই (দুধ হাতে) আমি (সারা রাত) সকাল হয়ে যাওয়া পর্যন্ত তাঁদের জাগ্রত হওয়ার অপেক্ষা করছিলাম। যদি তুমি জেনে থাক যে, আমি এটা করেছি একমাত্র তোমারই ভয়ে তাহলে আমাদের থেকে (পাথরটি) সরিয়ে দাও। অতঃপর পাথরটি তাদের থেকে আরেকটু সরে গেল। এমনকি তারা আকাশ দেখতে পেল।
সর্বশেষ এক যুবক দো'আ করল, হে আল্লাহ! তুমি জান যে, আমার একটি চাচাত বোন ছিল। সে আমার নিকট সবার চেয়ে প্রিয় ছিল। আমি তার সঙ্গে (যৌন মিলনের) ইচ্ছা করেছিলাম। কিন্তু আমি তাকে একশত দীনার না দেয়া পর্যন্ত সে রাজী হল না। তখন আমি তা সংগ্রহে লেগে গেলাম। শেষ পর্যন্ত তা অর্জনে সক্ষম হলাম। তা নিয়ে তার কাছে আসলাম এবং এ একশ' দীনার তাকে দিয়ে দিলাম। তখন সে নিজেই নিজেকে আমার কাছে সোপর্দ করল। আমি যখন তার দু'পায়ের মাঝখানে বসলাম, তখনি সে বলে উঠল, আল্লাহকে ভয় কর এবং (শরীয়তের বিধান মতে) অধিকার লাভ করা ব্যতীত আমার সতীত্বকে নষ্ট করো না। আমি তৎক্ষণাৎ উঠে গিয়েছিলাম এবং একশত দীনারও ত্যাগ করেছিলাম। তুমি যদি জান যে, আমি প্রকৃতই তোমার ভয়ে তা করেছি তাহলে তুমি পাথরটি সরিয়ে দাও। তখন আল্লাহ তা'আলা তাদের গুহার মুখ থেকে পাথরটি সরিয়ে দিলেন। অতঃপর তারা বেরিয়ে আসল। (বুখারী হা: ৩৪৬৫)
নামাযের ওসীলা নিয়ে তওবা করা:
قَالَ أَبُو بَكْرٍ سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُوْلُ مَا مِنْ رَجُلٍ يَذْنُبُ ذَنْبًا ثُمَّ يَقُوْمُ فَيَتَطَهَّرُ ثُمَّ يُصَلِّي ثُمَّ يَسْتَغْfِرِ اللَّهَ إِلَّا غُفِرَ لَهُ
আবু বকর বলেন, আমি রাসূল ﷺ কে বলতে শুনেছি, “কোন বান্দা যদি কোন গুনাহের কাজ করে সাথে সাথে ওযূ করে দু'রাকাত নামায আদায় করে, অতঃপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় তাহলে আল্লাহ তা'আলা তাকে অবশ্যই ক্ষমা করে দেবেন।” (তিরমিযী হা: ৩০০৬)
নামাযের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা গুনাহ ক্ষমা করে দেন :
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ ، رَضِيَ اللهُ عَنْهُ ، قَالَ : كُنْتُ عِنْدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَجَاءَهُ رَجُلٌ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي أَصَبْتُ حَدًّا فَأَقِمْهُ عَلَيَّ قَالَ وَلَمْ يَسْأَلُهُ عَنْهُ قَالَ وَحَضَرَتِ الصَّلَاةُ فَصَلَّى مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَلَمَّا قَضَى النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الصَّلَاةَ قَامَ إِلَيْهِ الرَّجُلُ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي أَصَبْتُ حَدًّا فَأَقِمْ فِي كِتَابَ اللهِ قَالَ أَلَيْسَ قَدْ صَلَّيْتَ مَعَنَا قَالَ نَعَمْ قَالَ فَإِنَّ اللَّهَ قَدْ غَفَرَ لَكَ ذَنْبَكَ
আনাস ইবনে মালিক বলেন, নবী ﷺ এর নিকট এক ব্যক্তি এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি হদ্দ যোগ্য অপরাধ (শাস্তিযোগ্য অপরাধ) করে ফেলেছি, সুতরাং আমার উপর শাস্তি প্রয়োগ করুন। এ সময় নামাযের ওয়াক্ত হয়ে গেল। রাসূল ﷺ যখন নামায শেষ করলেন, তখন সে দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি হদ্দ এর কাজ করে ফেলেছি। আমার প্রতি আল্লাহর কিতাবে নির্ধারিত শাস্তি প্রয়োগ করুন। উত্তরে রাসূল ﷺ বললেন, তুমি কি আমাদের সাথে নামায পড়নি? সে বলল, হ্যাঁ; তখন রাসূল ﷺ বললেন, আল্লাহ তা'আলা তোমার গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন।
মু'য়ায বললেন, উমার এর বর্ণনায় আছে, হে আল্লাহর রাসূল! এটি কী শুধু তার জন্যই প্রযোজ্য না সকল মানুষের জন্য? তখন তিনি বললেন, এটি বরং সকল লোকের জন্য। (বুখারী হা: ৬৪২৩, মুসলিম হা: ৭১৮৩)
পাপের জন্য ক্রন্দন করা
عَنْ عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ : قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا النَّجَاةُ ؟ قَالَ أَمْسِكْ عَلَيْكَ لِسَانَكَ وَلْيَسَعُكَ بَيْتُكَ وَابْكِ عَلَى خَطِيئَتِكَ
উকবা ইবনে আমের হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূল ﷺ এর সাথে সাক্ষাতের সময় আমি বললাম, নাজাতের পথ কী? তিনি বললেন তুমি তোমার জিহ্বাকে আয়ত্তে রাখবে, তোমার গৃহে যেন তোমার অবস্থান থাকে এবং তুমি তোমার পাপের জন্য কান্নাকাটি করতে থাকবে। (তিরমিযী হা: ২৪০৬)
অত্র হাদীসে নবী ﷺ মানবজাতির মুক্তি লাভের কয়েকটি দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রথমে তিনি গুনাহ সংঘটিত হওয়ার সবচেয়ে বড় মাধ্যম যবানকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে বলেছেন যে, যাতে করে জিহ্বা দ্বারা কোন রকম গুনাহ সংঘটিত হওয়ার সুযোগ না থাকে।
তারপর তিনি গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার একটি সুন্দর পরামর্শ দিয়েছেন। আর তা হল, সর্বদা নিজের গৃহে অবস্থান করা। কেননা বাইরে লোক সমাজে গেলেই জিহ্বার দ্বারা পাপ সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাই যদি প্রয়োজন ছাড়া বাকি সময় নিজ ঘরে অবস্থান করা হয় তবে গুনাহ সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে।
সর্বশেষে তিনি পাপ মোচনের জন্য কান্নাকাটি করতে বলেছেন। উপরের উল্লেখিত দু'টি ব্যবস্থার পরও যদি পাপ সংঘটিত হয়ে যায়, তবে ঐ পাপ মোচনের জন্য নিজেকে অপরাধী ভেবে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করতে হবে। পাপ সংঘটিত হলে কান্নাকাটি করা তওবার গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। যে ব্যক্তিই আল্লাহকে ভয় করে এবং পাপের দরুন কান্নাকাটি করে নিজের পাপ মার্জনা করার চেষ্টা করে, আল্লাহ তা'আলা তাকে ক্ষমা করে দেন।
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ : سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُوْلُ عَيْنَانِ لَا تَمُسُّهُمَا النَّارُ عَيْنٌ بَكَتْ مِنْ خَشْيَةِ اللهِ وَعَيْنٌ بَاتَتْ تَحْرِسُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস হতে বর্ণিত, রাসূল ﷺ বলেছেন, দু'টি চক্ষু এমন যে, তাদেরকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না। একটি সেই চক্ষু যা আল্লাহ তা'আলার ভয়ে ক্রন্দন করেছে এবং দ্বিতীয়টি সেই চক্ষু যা আল্লাহ তা'আলার রাস্তায় পাহারাদার হিসেবে রাত্রি অতিবাহিত করেছে। (তিরমিযী হা: ১৬৩৯)
একদা রাসূল ﷺ নামায পড়তেছিলেন এবং তার বক্ষ হতে চাক্কি পেষার শব্দের ন্যায় ক্রন্দনের তীব্র শব্দ অনুভূত হচ্ছিল। কোন কোন বর্ণনাকারী বর্ণনা করেছেন যে, ফুটন্ত হাঁড়ি হতে যেরূপ টগবগ শব্দ শুনা যায়, তদ্রূপ শব্দ শুনা যাচ্ছিল। (নাসাঈ হা: ১২১৪)
রাসূল ﷺ তো সম্পূর্ণ নিষ্পাপ ছিলেন। তা সত্ত্বেও তার কান্নাকাটির এ অবস্থা ছিল। আমাদের মত পাপীদেরকে যে কত বেশি কান্নাকাটি করতে হবে, তা আমাদের নিজেদেরই চিন্তা করা উচিত। যে ব্যক্তি পৃথিবীতে তার গুনাহের জন্য নিজেকে অপরাধী ভেবে তা মোচনের জন্য কান্নাকাটি করবে; আল্লাহ তা'আলা তার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেবেন এবং মৃত্যুর পর তাকে জাহান্নামের কঠিন শাস্তি থেকে মুক্তি দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।
বেশি বেশি নেক আমল করা
গুনাহ কারার পর আরেকটি বিকল্প পদ্ধতির আমল হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের ভাল কাজ করা, যাতে তা ঐ পাপের ক্ষতিপূরণ হয়ে যায়। ভাল কাজ পাপীকে পাপের জেলখানা থেকে মুক্ত করে আনুগত্যের বিশাল জগতে নিয়ে যায়।
আবূ যর বলেন, রাসূল ﷺ আমাকে বলেছেন-
اتَّقِ اللهَ حَيْثُمَا كُنْتَ وَاتْبِعِ السَّيِّئَةَ الْحَسَنَةَ تَمْحُهَا وَخَالِقِ النَّاسَ بِخُلُقٍ حَسَنٍ
“তুমি যেখানেই থাক আল্লাহকে ভয় করে চল। আর যখন কোন গুনাহের কাজ হয়ে যায় তখনই একটি সওয়াবের কাজ করে নাও। তা তোমার পূর্ববর্তী গুনাহকে মিটিয়ে দেবে। আর মানুষের সাথে উত্তম আচরণ কর।” (তিরমিযী হা: ১৯৮৭)
যদি কোন লোক শয়তানের ধোঁকায় পড়ে অনেকদিন আল্লাহর হুকুম পালন করা ছেড়ে দিয়ে থাকে তাহলে তার কর্তব্য হল বিগত জীবনের ছেড়ে দেয়া আমল গুলোর জন্য বিনীতভাবে তওবা করা এবং ভবিষ্যতে আর কখনো ফরজ আমল ছেড়ে না দেয়া। বিশেষ করে বেশি বেশি নফল নামায আদায় করা। কেননা আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন নফল নামায দ্বারা ফরজ নামাযের ত্রুটিসমূহ পূর্ণ করে দেবেন। রাসূল ﷺ বলেন-
إِنَّ أَوَّلَ مَا يُحَاسَبُ بِهِ الْعَبْدُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ عَمَلِهِ صَلَاتُهُ فَإِنْ صَلُحَتْ فَقَدْ أَفْلَحَ وَانْجَحَ وَإِنْ فَسَدَتْ فَقَدْ خَابَ وَخَسَرَ فَإِنِ انْتَقَصَ مِنْ فَرِيضَتِهِ شَيْءٌ قَالَ الرَّبُّ عَزَّ وَ جَلَّ انْظُرُوا هَلْ لِعَبْدِي مِنْ تَطَوُّع ؟ فَيُكْمَلُ بِهَا مَا انْتَقَصَ مِنَ الْفَرِيضَةِ ثُمَّ يَكُونُ سَائِرِ عَمَلِهِ عَلَى ذَلِكَ
নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন বান্দার আমলের ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম নামাযের হিসাব নেবেন। যদি তার নামায সঠিক হয় তবে সে সফল হবে এবং মুক্তি লাভ করবে। আর যদি তার নামায নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে সে ব্যর্থ হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যদি তার ফরজ নামাযের মধ্যে কোন ত্রুটি ধরা পড়ে তবে আল্লাহ তা'আলা ফেরেশতাদেরকে বলবেন, “দেখ, আমার এ বান্দার আমলনামায় কোন নফল নামায আছে কি না।” যদি থাকে তবে সেই নফল নামাযের দ্বারা ফরজের ঘাটতি পূর্ণ করে দেয়া হবে। এভাবে সকল আমলের হিসাব নেয় হবে। (তিরমিযী হা: ৪১৩)
📄 তাড়াতাড়ি তওবা করা
নিজের তওবা নিজেকেই করতে হয়, আর তা করতে হয় পাপ করার পর পরই। আর তওবা হচ্ছে পাপকাজ ছেড়ে দিয়ে নেকআমল শুরু করা। যে ব্যক্তি মৃত্যুর নিকটবর্তী হয়ে যায় তার আর নেকআমল করার সুযোগ থাকে না। তাই প্রতিটি মানুষের উচিত কোন পাপ হয়ে গেলে, তাড়াতাড়ি তওবা করা এবং গুনাহের কাজ ছেড়ে দিয়ে ভাল কাজ করা। কারণ মানুষের জীবনের কোন নিশ্চয়তা নেই। কতদিন জীবিত থাকবে এবং কখন মারা যাবে এ সম্পর্কে সে অবগত নয়। বিধায় তার উচিত যত দ্রুত সম্ভব নিজ গুনাহের জন্য আল্লাহর কাছে তওবা করা। কেননা সে যদি আল্লাহর হক ও বান্দার হক নিয়ে মারা যায় তবে তাকে জাহান্নামের আগুনে জ্বলতে হবে। বান্দাকে এ পরিণতি থেকে রক্ষা করার জন্য আল্লাহ পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে তাড়াতাড়ি তওবা করার জন্য তাগিদ দিয়েছেন। তিনি বলেন-
إِنَّمَا التَّوْبَةُ عَلَى اللهِ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السُّوءَ بِجَهَالَةٍ ثُمَّ يَتُوبُونَ مِنْ قَرِيبٍ فَأُولَئِكَ يَتُوبُ اللهُ عَلَيْهِمْ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيمًا حَكِيمًا
“আল্লাহ কেবল তাদের তওবাই কবুল করেন, যারা অজ্ঞতাবশত পাপ করে ফেলে, অতঃপর তাড়াতাড়ি তওবা করে নেয়। এসব লোকের তওবাই আল্লাহ কবুল করেন। আর আল্লাহ জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাময়।” (সূরা নিসা- ১৭)
তাছাড়া মৃত্যু আসার পূর্বে এবং সূর্য পশ্চিম দিক হতে উদিত হওয়ার পূর্বেই তওবা করতে হবে। কেননা, এ দু'সময় আল্লাহ তা'আলা কারো কোন তওবা কবুল করবেন না। রাসূল ﷺ বলেছেন-
مَنْ تَابَ قَبْلَ أَنْ تَطْلُعَ الشَّمْسُ مِنْ مَغْرِبِهَا تَابَ اللَّهُ عَلَيْهِ
“যে ব্যক্তি পশ্চিম দিক থেকে সূর্য ওঠার আগেই তওবা করবে আল্লাহ তার তওবা কবুল করবেন।” (মুসলিম হা: ৭০৩৬)
📄 নেক আমলের ওসীলা নিয়ে তওবা করা
যেসব গুনাহ সংঘটিত হয়ে গেছে, সেগুলোর উপর খাঁটি মনে লজ্জিত হয়ে ভবিষ্যতে আর কোন গুনাহ না করার দৃঢ় অঙ্গীকার পোষণ করে যদি তওবা করা হয়, তাহলে আশা করা যায়, তা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ হবে। তবে যদি কোন নেক আমলের ওসীলা নিয়ে তওবা করা হয়, তাহলে তওবা আরও অধিক কবুলের আশা করা যায়। যেমন বনী ইসরাঈলের তিন ব্যক্তি বিপদে পড়ে নেক আমলের ওসীলা নিয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়েছিল। তাই আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। হাদীসে এসেছে-
عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا : أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : " بَيْنَمَا ثَلَاثَةُ نَفَرٍ مِمَّنْ كَانَ قَبْلَكُمْ يَمْشُونَ إِذْ أَصَابَهُمْ مَطَرْ ، فَأَوَوْا إِلى غَارٍ فَانْطَبَقَ عَلَيْهِمْ ، فَقَالَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ : إِنَّهُ وَاللَّهِ يَا هَؤُلَاءِ لَا يُنْجِيكُمْ إِلَّا الصِّدْقُ ، فَلْيَدْعُ كُلُّ رَجُلٍ مِنْكُمْ بِمَا يَعْلَمُ أَنَّهُ قَدْ صَدَقَ فِيهِ . فَقَالَ وَاحِدٌ مِنْهُمُ : اللَّهُمَّ إِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّهُ كَانَ لِي أَجِيرٌ عَمِلَ لِي عَلَى فَرَقٍ مِنْ أَرْ، فَذَهَبَ وَتَرَكَهُ وَأَنِّي عَمَدْتُ إِلَى ذَلِكَ الْفَرَقِ فَزَرَعْتُهُ فَصَارَ مِنْ أَمْرِهِ أَنِّي اشْتَرَيْتُ مِنْهُ بَقَرًا. وَأَنَّهُ أَتَانِي يَطْلُبُ أَجْرَةً فَقُلْتُ لَهُ : اعْمِدُ إِلى تِلْكَ الْبَقَرِ . فَسُقُهَا، فَقَالَ لِي: إِنَّمَا لِي عِنْدَكَ فَرَقٌ مِنْ أَرْز . فَقُلْتُ لَهُ : اعْمِدُ إِلى تِلْكَ الْبَقَرِ فَإِنَّهَا مِنْ ذَلِكَ الْفَرَقِ، فَسَاقَهَا، فَإِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنِّي فَعَلْتُ ذَلِكَ مِنْ خَشْيَتِكَ، فَفَرِجُ عَنَا . فَانْسَاحَتْ عَنْهُمُ الصَّخْرَةُ ، فَقَالَ الْآخَرُ: اللَّهُمَّ إِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّهُ كَانَ لِي أَبَوَانِ شَيْخَانِ كَبِيرَانِ، وَكُنْتُ أَتِيهِمَا كُلَ لَيْلَةٍ بِلَبَنِ غَنَمٍ لِي، فَأَبْطَأْتُ عَنْهَا لَيْلَةٌ فَجِئْتُ وَقَدْ رَقَدًا وَأَهْلِي وَعِيَالِي يَتَضَاغَوْنَ مِنَ الْجُوعِ، وَكُنْتُ لَا أُسْقِيهِمْ حَتَّى يَشْرَبَ أَبَوَايَ، فَكَرِهْتُ أَنْ أُوقِظَهُمَا ، وَكَرِهْتُ أَنْ أَدَعَهُمَا، فَيَسْتَكِنَا لِشَرْبَتِهِمَا، فَلَمْ أَزَلْ أَنْتَظِرُ حَتَّى طَلَعَ الْفَجْرُ ، فَإِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنِّي فَعَلْتُ ذَلِكَ مِنْ خَشْيَتِكَ، فَفَرِجُ عَنَّا فَانْسَاخَتْ عَنْهُمُ الصَّخْرَةُ حَتَّى نَظَرُوا إِلَى السَّمَاءِ ، فَقَالَ الْآخَرُ: اللَّهُمَّ إِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّهُ كَانَ لِي ابْنَةُ عَةٍ مِنْ أَحَبِّ النَّاسِ إِلَى، وَأَنِّي رَاوَدْتُهَا عَنْ نَفْسِهَا فَأَبَتْ إِلَّا أَنْ أُتِيَهَا بِمِائَةِ دِينَارٍ، فَطَلَبْتُهَا حَتَّى قَدَرْتُ ، فَأَتَيْتُهَا بِهَا فَدَفَعْتُهَا إِلَيْهَا، فَأَمْكَنَتْنِي مِنْ نَفْسِهَا ، فَلَمَّا فَعَدْتُ بَيْنَ رِجْلَيْهَا. قَالَتِ : اتَّقِ اللهَ وَلَا تَفُضَ الْخَاتَمَ إِلَّا بِحَقِّهِ . فَقُمْتُ وَتَرَكْتُ الْمِائَةَ دِينَارٍ ، فَإِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنِّي فَعَلْتُ ذَلِكَ مِنْ خَشْyَتِكَ فَفَرِّجْ عَنَّا فَفَرَّجَ اللَّهُ عَنْهُمْ فَخَرَجُوا
ইবনে উমর থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তোমাদের পূর্বযুগের লোকদের মাঝে তিনজন লোক ছিল। তারা পথ চলতে চলতে হঠাৎ ঝড়বৃষ্টির মাঝে পড়ে গেল। কোন দিক নির্দেশনা না পেয়ে তারা এক গুহায় আশ্রয় নিল। গুহায় প্রবেশ করার কিছুক্ষণ পরই তাদের গুহার মুখ একটি পাথর চাপা পড়ে বন্ধ হয়ে গেল। পাথর চাপা পড়তেই তারা বিপদে পড়ে গেল, এত বড় পাথর তারা কীভাবে সরাবে। তাদের একজন অন্যদেরকে বলল, বন্ধুগণ! আল্লাহর শপথ! এখন সত্য ব্যতীত আর কিছুই তোমাদেরকে রেহাই দিতে পারবে না। কাজেই তোমাদের প্রত্যেকের সে জিনিসের ওসীলায় দো'আ করা দরকার, যে ব্যাপারে জানা আছে যে, এ কাজটিতে সে সততা বহাল রেখেছে। তখন তাদের একজন এই বলে দো'আ করতে লাগল, হে আল্লাহ! তুমি ভাল করেই জান যে, আমার একজন চাকর ছিল। সে এক ফারাক (একটি পরিমাপ) চালের বদলে আমার কাজ করে দিয়েছিল। কিন্তু সে মজুরি না নিয়েই চলে গিয়েছিল। তারপর আমি তার মজুরি দিয়ে কিছু একটা করতে ইচ্ছা করলাম এবং কৃষি কাজে লাগালাম। এতে যা উৎপাদন হয়েছে তার বদলে আমি একটি গাভী ক্রয় করলাম। অনেক দিন পর সে চাকরটি আমার কাছে এসে তার মজুরি দাবী করল। আমি তাকে বললাম, এ গাভীগুলোর দিকে তাকাও এবং তা তাড়িয়ে নিয়ে যাও। সে জবাব দিল, ঠাট্টা করবেন না। আমার তো আপনার নিকট মাত্র এক ফারাক চাল পাওনা। আমি তাকে বললাম গাভীগুলো নিয়ে যাও। কারণ তোমার সেই এক ফারাক চাল দ্বারা যা উৎপাদিত হয়েছে, তারই বদলে এটি ক্রয় করা হয়েছে। তখন সে গাভীগুলো তাড়িয়ে নিয়ে গেল। হে আল্লাহ! যদি তুমি মনে কর তা আমি একমাত্র তোমার ভয়েই করেছি, তাহলে আমাদের গুহার মুখ থেকে এ পাথরটি সরিয়ে দাও। অতঃপর পাথরটি কিছুটা সরে গেল।
দ্বিতীয় যুবক দো'আ করল, হে আল্লাহ! তোমার ভাল করে জানা আছে যে, আমার মা-বাবা খুব বুড়ো ছিলেন। আমি প্রত্যেক রাত্রে তাঁদের জন্য আমার ছাগলের দুধ নিয়ে যেতাম। ঘটনাক্রমে এক রাতে তাদের কাছে (দুধ নিয়ে) যেতে আমি বিলম্ব করে ফেললাম। তারপর এমন সময় গেলাম, যখন তাঁরা উভয়ে ঘুমিয়ে পড়ে ছিলেন। আর আমার স্ত্রী ও ছেলে মেয়ে ক্ষুধায় ছটফট করছে। কিন্তু আমি আমার মা-বাবাকে দুধ পান না করানো পর্যন্ত আমার (ক্ষুধায় কাতর) ছেলে মেয়েকে দুধ পান করাইনি। কারণ তাঁদেরকে ঘুম থেকে জাগানোটা আমি ভাল মনে করিনি। অপরদিকে তাঁদেরকে বাদ দিতেও ভাল লাগেনি। কারণ, এ দুধটুকু পান না করালে তাঁরা উভয়েই খুব দুর্বল হয়ে যাবেন। তাই (দুধ হাতে) আমি (সারা রাত) সকাল হয়ে যাওয়া পর্যন্ত তাঁদের জাগ্রত হওয়ার অপেক্ষা করছিলাম। যদি তুমি জেনে থাক যে, আমি এটা করেছি একমাত্র তোমারই ভয়ে তাহলে আমাদের থেকে (পাথরটি) সরিয়ে দাও। অতঃপর পাথরটি তাদের থেকে আরেকটু সরে গেল। এমনকি তারা আকাশ দেখতে পেল।
সর্বশেষ এক যুবক দো'আ করল, হে আল্লাহ! তুমি জান যে, আমার একটি চাচাত বোন ছিল। সে আমার নিকট সবার চেয়ে প্রিয় ছিল। আমি তার সঙ্গে (যৌন মিলনের) ইচ্ছা করেছিলাম। কিন্তু আমি তাকে একশত দীনার না দেয়া পর্যন্ত সে রাজী হল না। তখন আমি তা সংগ্রহে লেগে গেলাম। শেষ পর্যন্ত তা অর্জনে সক্ষম হলাম। তা নিয়ে তার কাছে আসলাম এবং এ একশ' দীনার তাকে দিয়ে দিলাম। তখন সে নিজেই নিজেকে আমার কাছে সোপর্দ করল। আমি যখন তার দু'পায়ের মাঝখানে বসলাম, তখনি সে বলে উঠল, আল্লাহকে ভয় কর এবং (শরীয়তের বিধান মতে) অধিকার লাভ করা ব্যতীত আমার সতীত্বকে নষ্ট করো না। আমি তৎক্ষণাৎ উঠে গিয়েছিলাম এবং একশত দীনারও ত্যাগ করেছিলাম। তুমি যদি জান যে, আমি প্রকৃতই তোমার ভয়ে তা করেছি তাহলে তুমি পাথরটি সরিয়ে দাও। তখন আল্লাহ তা'আলা তাদের গুহার মুখ থেকে পাথরটি সরিয়ে দিলেন। অতঃপর তারা বেরিয়ে আসল। (বুখারী হা: ৩৪৬৫)
নামাযের ওসীলা নিয়ে তওবা করা:
قَالَ أَبُو بَكْرٍ سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُوْلُ مَا مِنْ رَجُلٍ يَذْنُبُ ذَنْبًا ثُمَّ يَقُوْمُ فَيَتَطَهَّرُ ثُمَّ يُصَلِّي ثُمَّ يَسْتَغْfِرِ اللَّهَ إِلَّا غُفِرَ لَهُ
আবু বকর বলেন, আমি রাসূল ﷺ কে বলতে শুনেছি, “কোন বান্দা যদি কোন গুনাহের কাজ করে সাথে সাথে ওযূ করে দু'রাকাত নামায আদায় করে, অতঃপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় তাহলে আল্লাহ তা'আলা তাকে অবশ্যই ক্ষমা করে দেবেন।” (তিরমিযী হা: ৩০০৬)