📄 তওবার মর্যাদা
তওবা একটি মহৎ কাজ। তওবার মাহাত্ম্যের ব্যাপারে রাসূল ﷺ একটি উদাহরণ দিয়ে বলেন-
اللهُ اَشَدُّ فَرَحًا بِتَوْبَةِ أَحَدِكُمْ مِنْ أَحَدِكُمْ بِضَالَّتِهِ إِذَا وَجَدَهَا
তোমাদের কেউ হারানো জিনিস পেয়ে যে পরিমাণ খুশি হয়, আল্লাহ তা'আলা তার চেয়ে অনেক বেশি খুশি হন যখন কোন বান্দা তাঁর কাছে তওবা করে। (মুসলিম হা: ৭১২৯)
অন্য এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, যখন কোন বান্দা গুনাহ করে ফেলে তারপর বলে اَللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي ذَنْبِي “হে আল্লাহ! আমার পাপ সমুহ্ ক্ষমা করে দাও।” তখন আল্লাহ তা'আলা বলেন, আমার বান্দা গুনাহ করেছে আর সে এটাও জানে যে, তার একজন রব আছেন যিনি গুনাহ ক্ষমা করে দেন! এভাবে যে বান্দা গুনাহ করে এবং আমার কাছে ক্ষমা চায় আমি আমার সে বান্দাকে ক্ষমা করে দেই। (মুসলিম হা: ৭১৬২)
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তওবার মাহাত্ম্যের কারণে এর সময়সীমাও শেষ দিন পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছেন। হাদীসে এসেছে-
عَنْ مُعَاوِيَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ لَا تَنْقَطِعُ الْهِجْرَةُ حَتَّى تَنْقَطِعَ التَّوْبَةُ وَلَا تَنْقَطِعُ التَّوْبَةُ حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ مِنْ مَغْرِبِهَا
মুয়াবিয়া রাসূল ﷺ কে বলতে শুনেছেন যে, হিজরত বন্ধ হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তওবা বন্ধ না হবে। আর তওবার দরজা বন্ধ হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত না হবে। (আবু দাউদ হা: ২৪৮১)
আল্লাহ তা'আলা প্রতিদিনই বান্দার তওবা কবুল করেন :
عَنْ أَبِي مُوسَى رَضِيَ اللهُ عَنْهُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ « إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يَبْسُطُ يَدَهُ بِاللَّيْلِ لِيَتُوبَ مُسِيءُ النَّهَارِ وَيَبْسُطُ يَدَهُ بِالنَّهَارِ لِيَتُوبَ مُسِيءُ اللَّيْلِ حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ مِنْ مَغْرِبِهَا ».
আবু মূসা বলেন, রাসূল ﷺ বলেছেন, নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা সেসব লোকের তওবা কবুল করার জন্য রাত্রিবেলায় হাত প্রসারিত করে থাকেন, যারা দিনের বেলায় পাপাচারে লিপ্ত হয়েছিল এবং সেসব লোকের তওবা কবুল করার জন্য দিনের বেলায় হাত প্রসারিত করে থাকেন, যারা রাত্রিবেলায় পাপাচারে লিপ্ত হয়েছিল। পশ্চিম দিগন্ত হতে সূর্য উদিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত (এরূপ হতে থাকবে)। (মুসলিম হা: ৭১৬৫)
📄 তওবা কবুলের দৃষ্টান্ত
আল্লাহ আদম এর তওবা কবুল করেছেন :
অভিশপ্ত শয়তান যখন আল্লাহর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে আদমকে সিজদা করল না এবং লজ্জিত ও অনুতপ্ত হল না। বরং তার পরিবর্তে যুক্তি উপস্থাপন করে সে আল্লাহ তা'আলার আদেশকেই অশুদ্ধ প্রমাণ করতে চেয়েছিল। যার কারণে সে অভিশপ্ত ও বিতাড়িত হয়েছে।
পক্ষান্তরে আদম যখন শয়তানের ধোঁকায় পড়ে আল্লাহ তা'আলার নিষিদ্ধ গাছের ফল ভক্ষণ করে ফেলেন, তখন তিনি যুক্তি প্রদর্শন করার পরিবর্তে লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়েছিলেন এবং আল্লাহ তা'আলার দরবারে ক্ষমাপ্রার্থনা করেছিলেন। তাই আল্লাহ তাঁর তওবা কবুল করেছিলেন। পরবর্তীতে আল্লাহ তা'আলা এ ঘটনাকে মানুষের জন্য তওবা কবুলের এক দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন-
فَتَلَقَّى آدَمُ مِنْ رَّبِّهِ كَلِمَاتٍ فَتَابَ عَلَيْهِ إِنَّهُ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
“অতঃপর আদম তাঁর রবের পক্ষ হতে কতিপয় বাক্য শিক্ষা করলেন (তওবা করলেন), আল্লাহ তাঁর তওবা কবুল করলেন, তাঁকে ক্ষমা করলেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল ও পরম করুণাময়।” (সূরা বাকারা- ৩৭)
📄 আল্লাহই একমাত্র তওবা কবুলকারী
তওবা গ্রহণের অধিকার আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নেই। তওবা কবুল করার অধিকার একমাত্র আল্লাহর। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
وَمَنْ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا اللَّهُ
“আল্লাহ ব্যতীত এমন কে আছে, যে পাপ মোচন করতে পারে?” (সূরা আলে ইমরান- ১৩৫)
غَافِرِ الذَّنْبِ وَقَابِلِ التَّوْبِ شَدِيدِ الْعِقَابِ ذِي الطَّوْلِ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ إِلَيْهِ الْمَصِيرُ
“যিনি পাপ ক্ষমাকারী, তওবা কবুলকারী, যিনি শাস্তিদানে কঠোর ও শক্তিশালী। তিনি ব্যতীত (সত্য) কোন মাবুদ নেই। তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তন করতে হবে।” (সূরা মু'মিন- ৩)
أَلَمْ يَعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ هُوَ يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ وَيَأْخُذُ الصَّدَقَاتِ وَأَنَّ اللَّهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
“তারা কি জানে না যে, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের তওবা কবুল করেন এবং সাদকা গ্রহণ করেন? নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।” (সূরা তওবা- ১০৪)
وَهُوَ الَّذِي يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ وَيَعْفُو عَنِ السَّيِّئَاتِ وَيَعْلَمُ مَا تَفْعَلُونَ
“তিনিই তাঁর বান্দাদের তওবা কবুল করেন এবং পাপ মোচন করেন এবং তোমরা যা কর তিনি তা জানেন।" (সূরা শূরা- ২৫)
يُرِيدُ اللهُ لِيُبَيِّنَ لَكُمْ وَيَهْدِيكُمْ سُنَنَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَيَتُوبَ عَلَيْكُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ
“আল্লাহ ইচ্ছা করেন তোমাদের নিকট (সবকিছুর) বিশদভাবে বর্ণনা করতে, তোমাদের পূর্ববর্তীদের রীতিনীতি তোমাদেরকে অবহিত করতে এবং তোমাদের ক্ষমা করতে। আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়।” (সূরা নিসা- ২৬)
📄 আল্লাহর ক্ষমাপরায়ণতা
আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল। তাঁর ক্ষমা ও দয়া মানুষ কল্পনাও করতে পারে না। কুরআনের মধ্যে আল্লাহ তা'আলা বলেন-
وَإِنْ تَعُدُوا نِعْمَةَ اللَّهِ لَا تُحْصُوهَا إِنَّ اللَّهَ لَغَفُورٌ رَّحِيمٌ
“তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ গণনা করলে এর সংখ্যা নির্ণয় করতে পারবে না। নিশ্চয় আল্লাহ অধিক ক্ষমাপরায়ণ ও পরম দয়ালু।” (সূরা নাহল- ১৮)
نَبِي عِبَادِي أَنِّي أَنَا الْغَفُورُ الرَّحِيم - وَأَنَّ عَذَابِي هُوَ الْعَذَابُ الْأَلِيمُ
“আমার বান্দাদেরকে বলে দাও যে, আমি তো অধিক ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। আর নিশ্চয় আমার শাস্তিও যন্ত্রণাদায়ক” (সূরা হিজর- ৪৯)
وَإِنَّ رَبَّكَ لَذُو مَغْفِرَةٍ لِلنَّاسِ عَلَى ظُلْمِهِمْ وَإِنَّ رَبَّكَ لَشَدِيدُ الْعِقَابِ
“মানুষের সীমালঙ্ঘন সত্ত্বেও তোমার প্রতিপালক মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল এবং তোমার প্রতিপালক শাস্তি দানেও কঠোর।” (সূরা রা'দ-৬)
وَرَبُّكَ الْغَفُورُ ذُو الرَّحْمَةِ لَوْ يُؤَاخِذُهُمْ بِمَا كَسَبُوا لَعَجَّلَ لَهُمُ الْعَذَابَ بَلْ لَهُمْ مَوْعِدٌ لَّنْ يَجِدُوا مِنْ دُونِهِ مَوْثِلًا
“তোমার প্রতিপালক পরম ক্ষমাশীল ও দয়াবান। তাদের (মানুষের) কৃতকর্মের জন্য যদি তিনি তাদেরকে পাকড়াও করতে চাইতেন, তবে তিনি অবশ্যই তাদের শাস্তি ত্বরান্বিত করতেন। কিন্তু তাদের জন্য রয়েছে এক প্রতিশ্রুতি মুহুর্ত, যা হতে তারা কখনই কোন আশ্রয়স্থল পাবে না।” (সূরা কাহ্ফ্ফ- ৫৮)
إِنَّ رَبَّكَ وَاسِعُ الْمَغْفِرَةِ هُوَ أَعْلَمُ بِكُمْ إِذْ أَنْشَاكُمْ مِنَ الْأَرْضِ وَإِذْ أَنْتُمْ أَجِنَّةٌ فِي بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ فَلَا تُرَكُوا أَنْفُسَكُمْ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنِ اتَّقُى
“তোমার প্রতিপালকের ক্ষমা অপরিসীম; তিনি তোমাদের সম্পর্কে সম্যক অবগত, যখন তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছিলেন মাটি হতে এবং এক সময় তোমরা মাতৃগর্ভে ভ্রুণরূপে ছিলে। অতএব তোমরা আত্মপ্রশংসা করো না; তিনিই ভাল জানেন কে মুত্তাকী।” (সূরা নাজম- ৩২)
আল্লাহর ক্ষমা সীমাহীন :
حَدَّثَنَا أَنَسُ bْنُ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ قَالَ اللهُ يَا ابْنَ آدَمَ إِنَّكَ مَا دَعَوْتَنِي وَرَجَوْتَنِي غَفَرْتُ لَكَ عَلَى مَا كَانَ فِيكَ وَلَا أُبَالِي يَا ابْنَ آدَمَ لَوْ بَلَغَتْ ذُنُوبُكَ عَنَانَ السَّمَاءِ ثُمَّ اسْتَغْفَرْ تَنِي غَفَرْتُ لَكَ وَلَا أُبَالِي يَا ابْنَ آدَمَ إِنَّكَ لَوْ أَتَيْتَنِي بِقُرَابِ الْأَرْضِ خَطَايَا ثُمَّ لَقِيتَنِي لَا تُشْرِكْ بِي شَيْئًا لَأَتَيْتُكَ بِقُرَا بِهَا مَغْفِرَةٌ
আনাস বলেন, আমি রাসূল ﷺ কে বলতে শুনেছি যে, আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, হে আদমসন্তান! তুমি যতক্ষণ আমার নিকট প্রার্থনা করতে থাকবে এবং আমার প্রতি আশা পোষণ করতে থাকবে, আমি তোমাকে ক্ষমা করতে থাকব। তোমার পাপের পরিমাণ যতই হোক না কেন আমি পরোওয়া করি না। হে আদমসন্তান! যদি তোমার পাপ আকাশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়, আর তুমি আমার নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা কর তাহলেও আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেব। হে আদমসন্তান! তুমি যদি আমার নিকট এতবেশি পাপ নিয়ে আগমন কর যে, তার দ্বারা সমগ্র পৃথিবী ভরেও যায়, আর তুমি কাউকে আমার সাথে শরীক না কর, তা হলে আমিও পৃথিবী পরিমাণ ক্ষমা নিয়ে তোমার দিকে আসব। (তিরমিযী: ৩৫৪০)