📄 তওবার গুরুত্ব
বান্দা কর্তৃক পাপ সংঘটিত হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু পাপ সংঘটিত হয়ে গেলে লজ্জিত হয়ে আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা চেয়ে পাপ থেকে ফিরে আসতে হবে তাহলে আল্লাহ তা'আলা বান্দার সেই পাপকে ক্ষমা করে দেবেন। এজন্য তওবার গুরুত্ব অপরিসীম।
যেসব বান্দারা আল্লাহর কাছে তওবা করে না আল্লাহ তাদেরকে ভালবাসেন না। বরং তিনি সেসব বান্দাদের বেশি ভালবাসেন, যারা সর্বদা নিজেদের ভুল স্বীকার করে এবং বেশি বেশি তওবা করে থাকে।
আনাস বলেন, রাসূল ﷺ বলেছেন-
كُلُّ بَنِي آدَمَ خَطَّاءٌ ، وَخَيْرُ الْخَطَّائِينَ التَّوَّابُونَ
“প্রত্যেক লোকই পাপী। আর সর্বোত্তম পাপী হচ্ছে যারা বেশি বেশি তওবা করে থাকে।” (তিরমিযী হা: ২৪৯৯)
পাপ মোচনের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হচ্ছে তওবা। এমন কোন পাপ নেই যা আল্লাহ তা'আলা তওবার মাধ্যমে ক্ষমা করেন না। বান্দার পাপের পরিমাণ যদি আকাশচুম্বী হয় তবুও তিনি তওবার কারণে তাকে ক্ষমা করে দেন। তিনি বলেন-
قُلْ يَا عِبَادِي الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
“বল হে আমার বান্দারা! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ তারা আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হয়ো না; আল্লাহ সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দেবেন। তিনি তো ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।” (সূরা যুমার- ৫৩)
তওবা হচ্ছে একটি ইবাদাত। কেননা এর দ্বারা আল্লাহর আদেশকে মান্য করা হয়। আর যা দ্বারা আল্লাহর আদেশ মান্য করা হয় তাই ইবাদাত।
সর্বোপরি বান্দার পাপকর্মের শাস্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তওবার গুরুত্ব অপরিসীম। যেহেতু আল্লাহ তা'আলা নিজেই তওবা কবুলের ঘোষণা দিয়েছেন, সেহেতু প্রত্যেক মুমিন বান্দার কর্তব্য হল সবসময় তওবা ও ইস্তেগফার করা। কেননা জীবনের কোন নিশ্চয়তা নেই। মানুষ হিসেবে তাকে যেকোন সময় মৃত্যুবরণ করতে হবে। আর সে যদি তওবা না করেই মৃত্যুবরণ করে তাহলে কবরে ভীষণ আযাব ভোগ করতে হবে। আর পরকালেও এজন্য ভয়াবহ পরিণতির সম্মুখীন হতে হবে। তাই সকল মুসলিম নর-নারীর জন্য প্রতিদিনই খালিস নিয়তে তওবা করা অতীব জরুরি। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আমাদেরকে সে তাওফীক দান করুন। আমীন!
📄 তওবা করার জন্য আল্লাহর নির্দেশ
আল্লাহ তা'আলা বলেন-
وَاسْتَغْفِرِ اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ غَفُورًا رَّحِيمًا
“তোমরা আল্লাহর নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা কর। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।” (সূরা নিসা- ১০৬)
وَاسْتَغْفِرُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
“তোমরা আল্লাহর নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা কর। নিশ্চয় আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল ও দয়ালু।” (সূরা মুয্যাম্মিল- ২০)
فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَاسْتَغْفِرْهُ إِنَّهُ كَانَ تَوَّابًا
“অতঃপর তুমি তোমার মালিকের প্রশংসা কর এবং তাঁর কাছেই ক্ষমাপ্রার্থনা কর। অবশ্যই তিনি তওবা কবুলকারী।” (সূরা নাসর- ৩)
আল্লাহ ক্ষমার ওয়াদা দিয়েছেন :
وعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَهُمْ مَغْفِرَةٌ وَأَجْرٌ عَظِيمٌ
“যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে আল্লাহ তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তাদের জন্য ক্ষমা এবং মহাপুরস্কার রয়েছে।” (সূরা মায়িদা- ৯)
وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ مِنْهُمْ مَغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا
“এ লোকদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে আল্লাহ তাদের সাথে মাগফিরাত ও মহাপুরস্কারের ওয়াদা করেছেন।” (সূরা ফাত্হ- ২৯)
আল্লাহ মানুষকে ক্ষমার দিকে ডাকেন :
وَاللهُ يَدْعُو إِلَى الْجَنَّةِ وَالْمَغْفِرَةِ بِإِذْنِهِ وَيُبَيِّنُ آيَاتِهِ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ
“আল্লাহ স্বেচ্ছায় জান্নাত ও ক্ষমার দিকে ডাকেন। এবং তাঁর আয়াতসমূহ মানুষদের জন্য বর্ণনা করেন যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করতে পারে।” (সূরা বাকারা- ২২১)
📄 তওবার মর্যাদা
তওবা একটি মহৎ কাজ। তওবার মাহাত্ম্যের ব্যাপারে রাসূল ﷺ একটি উদাহরণ দিয়ে বলেন-
اللهُ اَشَدُّ فَرَحًا بِتَوْبَةِ أَحَدِكُمْ مِنْ أَحَدِكُمْ بِضَالَّتِهِ إِذَا وَجَدَهَا
তোমাদের কেউ হারানো জিনিস পেয়ে যে পরিমাণ খুশি হয়, আল্লাহ তা'আলা তার চেয়ে অনেক বেশি খুশি হন যখন কোন বান্দা তাঁর কাছে তওবা করে। (মুসলিম হা: ৭১২৯)
অন্য এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, যখন কোন বান্দা গুনাহ করে ফেলে তারপর বলে اَللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي ذَنْبِي “হে আল্লাহ! আমার পাপ সমুহ্ ক্ষমা করে দাও।” তখন আল্লাহ তা'আলা বলেন, আমার বান্দা গুনাহ করেছে আর সে এটাও জানে যে, তার একজন রব আছেন যিনি গুনাহ ক্ষমা করে দেন! এভাবে যে বান্দা গুনাহ করে এবং আমার কাছে ক্ষমা চায় আমি আমার সে বান্দাকে ক্ষমা করে দেই। (মুসলিম হা: ৭১৬২)
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তওবার মাহাত্ম্যের কারণে এর সময়সীমাও শেষ দিন পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছেন। হাদীসে এসেছে-
عَنْ مُعَاوِيَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ لَا تَنْقَطِعُ الْهِجْرَةُ حَتَّى تَنْقَطِعَ التَّوْبَةُ وَلَا تَنْقَطِعُ التَّوْبَةُ حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ مِنْ مَغْرِبِهَا
মুয়াবিয়া রাসূল ﷺ কে বলতে শুনেছেন যে, হিজরত বন্ধ হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তওবা বন্ধ না হবে। আর তওবার দরজা বন্ধ হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত না হবে। (আবু দাউদ হা: ২৪৮১)
আল্লাহ তা'আলা প্রতিদিনই বান্দার তওবা কবুল করেন :
عَنْ أَبِي مُوسَى رَضِيَ اللهُ عَنْهُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ « إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يَبْسُطُ يَدَهُ بِاللَّيْلِ لِيَتُوبَ مُسِيءُ النَّهَارِ وَيَبْسُطُ يَدَهُ بِالنَّهَارِ لِيَتُوبَ مُسِيءُ اللَّيْلِ حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ مِنْ مَغْرِبِهَا ».
আবু মূসা বলেন, রাসূল ﷺ বলেছেন, নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা সেসব লোকের তওবা কবুল করার জন্য রাত্রিবেলায় হাত প্রসারিত করে থাকেন, যারা দিনের বেলায় পাপাচারে লিপ্ত হয়েছিল এবং সেসব লোকের তওবা কবুল করার জন্য দিনের বেলায় হাত প্রসারিত করে থাকেন, যারা রাত্রিবেলায় পাপাচারে লিপ্ত হয়েছিল। পশ্চিম দিগন্ত হতে সূর্য উদিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত (এরূপ হতে থাকবে)। (মুসলিম হা: ৭১৬৫)
📄 তওবা কবুলের দৃষ্টান্ত
আল্লাহ আদম এর তওবা কবুল করেছেন :
অভিশপ্ত শয়তান যখন আল্লাহর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে আদমকে সিজদা করল না এবং লজ্জিত ও অনুতপ্ত হল না। বরং তার পরিবর্তে যুক্তি উপস্থাপন করে সে আল্লাহ তা'আলার আদেশকেই অশুদ্ধ প্রমাণ করতে চেয়েছিল। যার কারণে সে অভিশপ্ত ও বিতাড়িত হয়েছে।
পক্ষান্তরে আদম যখন শয়তানের ধোঁকায় পড়ে আল্লাহ তা'আলার নিষিদ্ধ গাছের ফল ভক্ষণ করে ফেলেন, তখন তিনি যুক্তি প্রদর্শন করার পরিবর্তে লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়েছিলেন এবং আল্লাহ তা'আলার দরবারে ক্ষমাপ্রার্থনা করেছিলেন। তাই আল্লাহ তাঁর তওবা কবুল করেছিলেন। পরবর্তীতে আল্লাহ তা'আলা এ ঘটনাকে মানুষের জন্য তওবা কবুলের এক দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন-
فَتَلَقَّى آدَمُ مِنْ رَّبِّهِ كَلِمَاتٍ فَتَابَ عَلَيْهِ إِنَّهُ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
“অতঃপর আদম তাঁর রবের পক্ষ হতে কতিপয় বাক্য শিক্ষা করলেন (তওবা করলেন), আল্লাহ তাঁর তওবা কবুল করলেন, তাঁকে ক্ষমা করলেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল ও পরম করুণাময়।” (সূরা বাকারা- ৩৭)