📄 তওবা
তওবা আল্লাহ তা'আলার নিকট অত্যন্ত পছন্দনীয় ও প্রশংসনীয় কাজ। মানুষ যখন পাপ করে আন্তরিকভাবে লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয় এবং আল্লাহ তা'আলার দরবারে ক্ষমাপ্রার্থনা করে, তখন এটা তাকে আনন্দিত ও গর্বিত করে থাকে। তাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা পবিত্র কুরআনে বার বার বান্দাদেরকে তওবা করার জন্য উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি বলেন-
وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَا الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْنَ
“হে মুমিনগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। (সূরা নূর- ৩১)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَصُوحًا
“হে মুমিনগণ! তোমরা একান্ত খালিসভাবে আল্লাহর নিকট তওবা কর।” (তাহরীম- ৮)
এ কারণে তওবাটাই হচ্ছে মুমিন ব্যক্তির সর্বত্তোম গুণ। আর সাধারণত মুমিনরাই বেশি বেশি তওবা করে থাকে। কেননা মুমিনরা মনে করে যে, প্রতিদিন তার দ্বারা অনেক অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
التَّائِبُونَ الْعَابِدُونَ الْحَامِدُونَ السَّائِحُونَ الرَّاكِعُونَ السَّاجِدُونَ الْأَمِرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَالنَّاهُونَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَالْحَافِظُونَ لِحُdُودِ اللَّهِ وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ
“তারা তওবাকারী, ইবাদাতকারী, আল্লাহর প্রশংসাকারী, সিয়াম পালনকারী, রুকুকারী, সিজদাকারী, সৎকার্যের আদেশ দানকারী, অসৎকার্যে নিষেধকারী এবং আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা সংরক্ষণকারী; এ মুমিনদেরকে তুমি সুসংবাদ দাও।” (সূরা তওবা- ১১২)
📄 তওবার পরিচিতি
'তওবা' আরবি শব্দ। এর শাব্দিক অর্থ হল- ফিরে আসা। এ শব্দটি আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত হয় আবার বান্দার দিকেও সম্পৃক্ত হয়। বান্দার দিকে সম্পৃক্ত হলে এর অর্থ হয়, গুনাহের কাজ ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর আনুগত্যের দিকে ফিরে আসা। এটা বান্দার তওবা। আর আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত হলে এর অর্থ হয়, পাপের কারণে আল্লাহ ঐ বান্দাকে শাস্তি দিতে চান, কিন্তু তওবা করার কারণে আল্লাহ শাস্তির দিকে না গিয়ে বান্দাকে ক্ষমা করার দিকে ফিরে আসেন।
'তওবা' শব্দের আরো একটি অর্থ হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার প্রতি মনোযোগী হওয়া। যবান দ্বারা তওবার শব্দ উচ্চারণ করা হোক বা না হোক- যদি পাপী ব্যক্তি আন্তরিক লজ্জা ও অনুতাপ এবং ভবিষ্যতে আর পাপ না করার দৃঢ়- সংকল্পের সাথে পাপ কাজ থেকে ফিরে আসে তবেই তা তওবা বলে গণ্য হবে।
নিচের ছয়টি বিষয়ের সমন্বয়ে তওবা পূর্ণতা লাভ করে।
১. অতীত মন্দকর্মের জন্য অনুতপ্ত হওয়া।
২. যেসব ফরয তরক করা হয়েছে, সেগুলোর কাজা আদায় করা।
৩. কারো ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রহণ করে থাকলে তা ফেরত দেয়া, অথবা তার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নেয়া।
৪. কাউকে হাতে বা মুখে কষ্ট দিয়ে থাকলে সেজন্য ক্ষমা চেয়ে নেয়া।
৫. ভবিষ্যতে সেই গুনাহের কাছে না যাওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় সংকল্প করা।
৬. নিজেকে যেমন আল্লাহ তা'আলা নাফরমানী করতে দেখেছিল, তেমনি এখন আনুগত্য করতে দেখা।
মানুষ তার নিজের প্রতি দৃষ্টিপাত করবে এবং চিন্তা করবে যে, আল্লাহ তা'আলা আমার স্রষ্টা ও মালিক। তিনি আমাকে অস্তিত্ত্ব দান করেছেন, নানা প্রকার নিয়ামত দ্বারা পুরস্কৃত করেছেন, অঙ্গ-প্রতঙ্গসমূহ দান করেছেন, সম্পদশালী করেছেন। আর আমি তাঁর নিয়ামতসমূহকে আনুগত্যের বদলে পাপকর্মসমূহে ব্যবহার করেছি! এটা কত বড় অকৃতজ্ঞতা!! তাই লজ্জার সাথে দৃঢ় সংকল্প চিত্তে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে যে, ভবিষ্যতে আর এসব পাপ করব না এটাই হবে যথার্থ তওবা। শুধুমাত্র যবান দ্বারা তওবা করলেই তওবা হয় না।
📄 তওবার গুরুত্ব
বান্দা কর্তৃক পাপ সংঘটিত হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু পাপ সংঘটিত হয়ে গেলে লজ্জিত হয়ে আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা চেয়ে পাপ থেকে ফিরে আসতে হবে তাহলে আল্লাহ তা'আলা বান্দার সেই পাপকে ক্ষমা করে দেবেন। এজন্য তওবার গুরুত্ব অপরিসীম।
যেসব বান্দারা আল্লাহর কাছে তওবা করে না আল্লাহ তাদেরকে ভালবাসেন না। বরং তিনি সেসব বান্দাদের বেশি ভালবাসেন, যারা সর্বদা নিজেদের ভুল স্বীকার করে এবং বেশি বেশি তওবা করে থাকে।
আনাস বলেন, রাসূল ﷺ বলেছেন-
كُلُّ بَنِي آدَمَ خَطَّاءٌ ، وَخَيْرُ الْخَطَّائِينَ التَّوَّابُونَ
“প্রত্যেক লোকই পাপী। আর সর্বোত্তম পাপী হচ্ছে যারা বেশি বেশি তওবা করে থাকে।” (তিরমিযী হা: ২৪৯৯)
পাপ মোচনের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হচ্ছে তওবা। এমন কোন পাপ নেই যা আল্লাহ তা'আলা তওবার মাধ্যমে ক্ষমা করেন না। বান্দার পাপের পরিমাণ যদি আকাশচুম্বী হয় তবুও তিনি তওবার কারণে তাকে ক্ষমা করে দেন। তিনি বলেন-
قُلْ يَا عِبَادِي الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
“বল হে আমার বান্দারা! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ তারা আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হয়ো না; আল্লাহ সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দেবেন। তিনি তো ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।” (সূরা যুমার- ৫৩)
তওবা হচ্ছে একটি ইবাদাত। কেননা এর দ্বারা আল্লাহর আদেশকে মান্য করা হয়। আর যা দ্বারা আল্লাহর আদেশ মান্য করা হয় তাই ইবাদাত।
সর্বোপরি বান্দার পাপকর্মের শাস্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তওবার গুরুত্ব অপরিসীম। যেহেতু আল্লাহ তা'আলা নিজেই তওবা কবুলের ঘোষণা দিয়েছেন, সেহেতু প্রত্যেক মুমিন বান্দার কর্তব্য হল সবসময় তওবা ও ইস্তেগফার করা। কেননা জীবনের কোন নিশ্চয়তা নেই। মানুষ হিসেবে তাকে যেকোন সময় মৃত্যুবরণ করতে হবে। আর সে যদি তওবা না করেই মৃত্যুবরণ করে তাহলে কবরে ভীষণ আযাব ভোগ করতে হবে। আর পরকালেও এজন্য ভয়াবহ পরিণতির সম্মুখীন হতে হবে। তাই সকল মুসলিম নর-নারীর জন্য প্রতিদিনই খালিস নিয়তে তওবা করা অতীব জরুরি। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আমাদেরকে সে তাওফীক দান করুন। আমীন!
📄 তওবা করার জন্য আল্লাহর নির্দেশ
আল্লাহ তা'আলা বলেন-
وَاسْتَغْفِرِ اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ غَفُورًا رَّحِيمًا
“তোমরা আল্লাহর নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা কর। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।” (সূরা নিসা- ১০৬)
وَاسْتَغْفِرُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
“তোমরা আল্লাহর নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা কর। নিশ্চয় আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল ও দয়ালু।” (সূরা মুয্যাম্মিল- ২০)
فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَاسْتَغْفِرْهُ إِنَّهُ كَانَ تَوَّابًا
“অতঃপর তুমি তোমার মালিকের প্রশংসা কর এবং তাঁর কাছেই ক্ষমাপ্রার্থনা কর। অবশ্যই তিনি তওবা কবুলকারী।” (সূরা নাসর- ৩)
আল্লাহ ক্ষমার ওয়াদা দিয়েছেন :
وعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَهُمْ مَغْفِرَةٌ وَأَجْرٌ عَظِيمٌ
“যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে আল্লাহ তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তাদের জন্য ক্ষমা এবং মহাপুরস্কার রয়েছে।” (সূরা মায়িদা- ৯)
وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ مِنْهُمْ مَغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا
“এ লোকদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে আল্লাহ তাদের সাথে মাগফিরাত ও মহাপুরস্কারের ওয়াদা করেছেন।” (সূরা ফাত্হ- ২৯)
আল্লাহ মানুষকে ক্ষমার দিকে ডাকেন :
وَاللهُ يَدْعُو إِلَى الْجَنَّةِ وَالْمَغْفِرَةِ بِإِذْنِهِ وَيُبَيِّنُ آيَاتِهِ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ
“আল্লাহ স্বেচ্ছায় জান্নাত ও ক্ষমার দিকে ডাকেন। এবং তাঁর আয়াতসমূহ মানুষদের জন্য বর্ণনা করেন যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করতে পারে।” (সূরা বাকারা- ২২১)