📄 'যবান নিয়ন্ত্রণ করার গুরুত্ব
মানুষের ভাল-মন্দ নির্ভরশীল তার যবানের উপর। সে যদি নিজের যবানকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে, তবে তা তার দুনিয়া ও আখেরাতের জন্য কল্যাণকর হবে। সকল প্রকার ঝগড়া-বিবাদ, মারামারি-কাটাকাটি ও বিশৃংখলার মূল হচ্ছে এ যবান। আবার সকল প্রকার বন্ধুত্ব ও সহনশীলতার মূলও হচ্ছে যবান।
যারা মুমিন তারা বুঝে-শুনে পরিণতির কথা চিন্তা করে কথা বলবে। কারণ মহাবিচারের দিন মানুষের প্রতিটি কথা ও কাজের হিসাব নেয়া হবে। আর মানুষের কথা রেকর্ড করার জন্য আল্লাহ তা'আলা ফেরেশতা নিযুক্ত করে রেখেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
إِذْ يَتَلَقَّى الْمُتَلَقِّيَانِ عَنِ الْيَمِينِ وَعَنِ الشِّمَالِ قَعِيدٌ - مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ
“যখন দুই ফেরেশতা ডানে ও বামে বসে তার আমল গ্রহণ করে। সে যে কথাই উচ্চারণ করে, তা সংরক্ষণ করার জন্য তার কাছে সদা প্রস্তুত প্রহরী রয়েছে।” (সূরা কাফ- ১৭,১৮)
যবান মানুষের জন্য এমন একটি হাতিয়ার যা তলোওয়ার থেকেও ধারালো। তলোওয়ার দ্বারা আঘাত করলে যতখানি ক্ষতি হয়, কথার দ্বারা আঘাত করলে তার চেয়েও হাজারগুণ বেশি ক্ষতি হয়। তাই রাসূল ﷺ প্রত্যেক মুসলিমকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন-
الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ
“মুসলিম সেই ব্যক্তি যার হাত ও জিহ্বা থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে।” (মুসলিম হা: ১৭১)
আবু হুরায়রা বলেন, রাসূল ﷺ বলেছেন-
إِنَّ الْعَبْدَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ مِنْ رِضْوَانِ اللهِ لَا يُلْقِي لَهَا بَالًا يَرْفَعُ اللَّهُ بِهَا دَرَجَاتٍ وَإِنَّ الْعَبْدَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ مِنْ سَخَطِ اللَّهِ لَا يُلْقِي لَهَا بَالًا يَهْوِي بِهَا فِي جَهَنَّمَ
“বান্দা কখনো কখনো এমন কথা বলে যাতে আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি রয়েছে, অথচ সে এর গুরুত্ব জানে না, কিন্তু আল্লাহ তা'আলা এর দ্বারা তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন। পক্ষান্তরে বান্দা কোন কোন সময় এমন কথাও বলে যাতে আল্লাহ তা'আলার অসন্তুষ্টি রয়েছে, অথচ সে তার অনিষ্টতা সম্পর্কে জানে না। কিন্তু ঐ কথার কারণেই সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। (বুখারী হা: ৪৬৭৮)
সকল অঙ্গের মধ্যে জিহ্বা সবচেয়ে বেশি ভয়ংকর :
সুফিয়ান হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে এমন একটি বিষয়ের কথা বলুন যার উপর আমি আমল করব। তিনি বললেন, তুমি বল, আমার রব আল্লাহ, অতঃপর এর উপর অটল থাক। তারপর আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি কোন জিনিসের ভয় করেন? তখন রাসূল ﷺ তার জিহ্বা ধরে বললেন, এটা। (তিরমিযী হা: ২৪১০)
তাই প্রত্যেক মুসলিমের উচিত, কেবল সেসব কথা বলা যেসব কথার মধ্যে কল্যাণ নিহিত আছে। যদি কোন কথার মধ্যে উপকারিতা না থাকে তবে উত্তম হল সে কথা বলা থেকে বিরত থাকা। কারণ অনেক সময় জায়েয কথার মধ্য দিয়ে হারামের মধ্যে লিপ্ত হতে হয়। আর অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটাই হয়ে থাকে।
📄 যবান ব্যবহারের উত্তম ক্ষেত্রসমূহ
যেসব স্থানে কথা বলা উত্তম তার কয়েকটি হল :
১. শিক্ষামূলক আলোচনা বা বক্তৃতার ক্ষেত্রে।
২. পরস্পর ইলম তাকরার বা চর্চা করার ক্ষেত্রে।
৩. অপরকে ইলম শিক্ষা দেয়ার ক্ষেত্রে।
৪. পরস্পরের মধ্যে ঝগড়া মীমাংসা করার ক্ষেত্রে।
৫. সৎ কাজের আদেশ দেয়ার ক্ষেত্রে।
৬. অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করার ক্ষেত্রে।
৭. কাউকে উত্তম পরামর্শ দেয়ার ক্ষেত্রে।
৮. মানুষকে সঠিক পথের দিক নির্দেশনা দেয়ার ক্ষেত্রে।
📄 যবান ব্যবহারের নিষিদ্ধ ক্ষেত্রসমূহ
যেসব ক্ষেত্রে কথা বলা থেকে যবানকে হেফাযত করতে হবে সেগুলোর মধ্যে কয়েকটি হল :
১. মিথ্যা কথা বলা।
২. হাসি-ঠাট্টা করা।
৩. অশ্লীল কথা-বার্তা বলা।
৪. কাউকে গালি-গালাজ করা।
৫. পরের দোষচর্চা বা গীবত করা।
৬. কারো উপর অপবাদ দেয়া।
৭. চোগলখোরি করা।
৮. কারো গোপন বিষয় প্রকাশ করা।
৯. দু'মুখী নীতি গ্রহণ করা।
১০. পরস্পর ঝগড়া করা।
১১. অতিরিক্ত কথা বলা।
১২. হারাম আলোচনায় লিপ্ত হওয়া।
১৩. কাউকে অভিশাপ দেয়া।
১৪. কারো সামনে তার প্রশংসা করা।
১৫. মানুষকে হাসানোর জন্য কথা বলা।
১৬. অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।
১৭ খোঁটা দেয়া।
📄 কথা বলার আদব
কথা বলার কিছু আদব বা নিয়ম আছে যা মেনে চললে কথার মধ্যে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। নিম্নে এসব নিয়ম সম্পর্কে আলোচনা করা হল :
১. যেসব কথার দ্বারা দ্বীন ও দুনিয়ার কোন লাভ নেই সেসব কথা মুখ দিয়ে বের করা উচিত নয়।
২. সর্বাবস্থায় উত্তেজনামূলক কথা পরিহার করতে হবে।
৩. কথা বলার আগে চিন্তা করে নিতে হবে যে, আমি কী বলছি আর এর প্রভাব কী হবে? কেননা, কোন কোন সময় হালকাভাবে এমন কথা মুখ দিয়ে বের হয়ে যায়, যার কারণে ফাসাদ সৃষ্টি হয়। সবসময় পরিবেশ ও পরিস্থিতি বুঝে কথা বলতে হবে।
৪. যাচাই বাছাই ও প্রমাণ ব্যতীত কোন কথা বলা উচিত নয়। কেননা এর প্রভাব বহুদূর পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছতে পারে।
৫. কোন প্রসঙ্গ বুঝাতে গিয়ে অতিরিক্ত কথা বলা পরিহার করতে হবে।
৬. কথা বলার সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন কথা এত দীর্ঘ না হয়, যাতে শ্রোতা বিরক্ত হয় আবার এত সংক্ষিপ্ত যেন না হয় যে, শ্রোতা কথার অর্থই বুঝবে না।
৭. কথা পরিপূর্ণ ও স্পষ্ট করে বলতে হবে। যাতে অন্যরা সহজে বুঝতে পারে।
৮. কেউ কেউ কিছু কথা খুব জোরে বলে, আবার কিছু কথা আস্তে বলে। এতে কোনটা শুনা যায় আবার কোনটা শুনা যায় না, শ্রোতারা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে যায়। তাই কথার প্রতিটি অংশকেই স্পষ্ট করে বলতে হবে।
আনাস বলেছেন, রাসূল ﷺ যখন কথা বলতেন তখন তিন বার পুনরাবৃত্তি করতেন (যেন সবাই বুঝতে পারে)। (বুখারী হা: ৯৪)
৯. গীবত, চোগলখোরী ও মুনাফিকী পরিহার করতে হবে।
১০. যদি কেউ গালি দেয় বা কটু কথা বলে তাহলে তার জওয়াব সেভাবে দেয়া যাবে না বরং উত্তম কথায় তার জওয়াব দিতে হবে, যাতে সে আরো উত্তেজিত না হয় এবং নিজের ভুল বুঝতে পারে।
১১. কারো সাথে অহেতুক বিতর্কে জড়ানো যাবে না। যদি প্রতিপক্ষ যুক্তিপ্রমাণ না মানে তাহলে সেখানে চুপ থাকতে হবে।
১২. কেউ কথা বলার সময় তার কথার মাঝখানে কথা বলবে না বরং শ্রবণ করবে, পরে সুন্দর ভাষায় এর উত্তর দেবে।
১৩. আস্তে কথা বলতে হবে। কেননা আস্তে কথা বলা তাকওয়ার পরিচয় বহন করে। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
وَاقْصِدُ فِي مَشْيِكَ وَاغْضُضْ مِنْ صَوْتِكَ إِنَّ أَنْكَرَ الْأَصْوَاتِ لَصَوْتُ الْحَمِيرِ
“তোমার চলাফেরায় মধ্যম পন্থা অবলম্বণ কর এবং তোমার স্বরকে নীচু কর। নিশ্চয় স্বরের মধ্যে গাঁধার স্বরই সবচেয়ে অপছন্দনীয়।” (সূরা লুকমান- ১৯)
১৪. মেয়েরা পুরুষদের সাথে নরম ভাষায় কথা বলবে না। কারণ এতে ফিতনার আশংকা রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
يَا نِسَاءَ النَّبِيِّ لَسْتُنَّ كَأَحَدٍ مِّنَ النِّسَاءِ إِنِ اتَّقَيْتُنَّ فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي في قَلْبِهِ مَرَضٌ وَقُلْنَ قَوْلًا مَّعْرُوفًا
“হে নবীর স্ত্রীগণ! তোমরা কোন সাধারণ স্ত্রীলোকের মত নও; যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর তবে (পরপুরুষের সাথে) কথা বলার সময় এমনভাবে কোমল কন্ঠে কথা বল না যাতে যার অন্তরে (কু-প্রবৃত্তির) রোগ রয়েছে সে লালায়িত হয়। আর তোমরা ন্যায়সঙ্গত কথা বলবে।” (সূরা আহযাব- ৩২)
১৫. মন্দ কথা পরিহার করতে হবে। কেননা শয়তান মন্দ কথার উস্কানি দেয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
وَقُلْ لِعِبَادِي يَقُولُوا الَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِنَّ الشَّيْطَانَ يَنْزَغُ بَيْنَهُمْ إِنَّ الشَّيْطَانَ كَانَ لِلْإِنْسَانِ عَدُوًّا مُّبِينًا
"আমার বান্দাদেরকে উত্তম কথা বলতে বলো। নিশ্চয় শয়তান তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উস্কানি দেয়; শয়তান তো মানুষের প্রকাশ্য শত্রু।” (সূরা বনী ইসরাঈল- ৫৩)
১৬. অশ্লীল কথাবার্তা পরিহার করতে হবে। কেননা অশ্লীল কথাবার্তা বলা মুনাফিকদের কাজ। আবু উমামা বলেন, রাসূল ﷺ বলেছেন, লজ্জা ও কম কথা বলা ঈমানের দু'টি শাখা। আর অশ্লীল ও অপ্রয়োজনীয় কথা বলা মুনাফিকীর দু'টি শাখা। (তিরমিযী হা: ২০২৭)
১৭. সর্বদা সত্য কথা বলতে হবে, কখনও মিথ্যা বলা যাবে না। কেননা সকল পাপের উৎস হচ্ছে মিথ্যা। যে মিথ্যা বলতে পারে পাপের এমন কোন কাজ নেই যা সে করতে পারে না। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
فَاجْتَنِبُوا الرِّجْسَ مِنَ الْأَوْثَانِ وَاجْتَنِبُوا قَوْلَ الزُّوْرِ
“সুতরাং তোমরা মূর্তিদের অপবিত্রতা থেকে বেঁচে থাক এবং মিথ্যা কথা থেকে দূরে থাক।” (সূরা হাজ্জ- ৩০)
সর্বোপরি, কথা বলার পূর্বে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। সর্বদা ভাল কথা বলার চেষ্টা করতে হবে। আর এমনসব কথা বলা থেকে দূরে থাকতে হবে, যা দ্বারা আল্লাহ রাগান্বিত হন।
১৮. কানাকানি করে কথা বলবে না। কানাকানি কু-ধারণার জন্ম দেয়। তাই রাসূল ﷺ এটা নিষিদ্ধ করেছেন। তিনি বলেন-
إِذَا كُنْتُمْ ثَلَاثَةً فَلَا يَتَنَاجِي رَجُلَانِ دُونَ الْآخَرِ حَتَّى تَخْتَلِطُوا بِالنَّاسِ أَجْلَ أَنْ يُحْزِنَهُ
“যদি তিনজন লোক একসাথে থাকে, তবে দু'জন যেন অপরজনকে বাদ দিয়ে গোপন আলাপ না করে। তাদের উচিত হবে একত্রে মিলে কথা বলা নতুবা যাকে বিচ্ছিন্ন করা হবে সে চিন্তিত হবে।” (বুখারী হা: ৫৮৪৪)
অত্র হাদীসে রাসূল ﷺ কানাকানি করার ব্যাপারে সর্বনিম্ন তিনজন লোক নির্ধারণ করেছেন। সর্বোচ্চের কথা কিছুই বলেননি। তাই তিন বা তিনের অধিক সংখ্যক লোক উপস্থিত থাকা অবস্থায় দু'জন আলাদা হয়ে চুপে চুপে কথা বলা নিষেধ। কারণ, তৃতীয়জন ভাববে তারা হয়ত আমার সম্পর্কে কিছু বলছে। এতে তার কষ্ট হবে এবং তাদের প্রতি বিরূপ ধারণা করার সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে যদি প্রয়োজন হয় তাহলে তৃতীয় জনের অনুমতি নিয়ে কথা বলবে।