📄 চোগলখোরির ভয়াবহ পরিণাম
চোগলখোরের অনুসরণ করতে আল্লাহ নিষেধ করেছেন :
যারা চোগলখোরি করে বেড়ায়, বন্ধুদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে তারা আল্লাহর নিকট নিকৃষ্ট বান্দা। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
وَلَا تُطِعْ كُلَّ حَلَّافٍ مَّهِينٍ - هَمَّازٍ مَشَاءٍ بِنَمِيمٍ
“তার অনুসরণ করো না যে কথায় কথায় শপথ করে, যে অতি নগণ্য, দোষারোপকারী ও চোগলখোরি করে বেড়ায়।” (সূরা কালাম- ১০, ১১)
চোগলখোর জান্নাতে প্রবেশ করবে না :
قَالَ حُذَيْفَةُ سَمِعْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُوْلُ لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ قَتَاتْ
হুযায়ফা বললেন, আমি রাসূল ﷺ কে বলতে শুনেছি, চোগলখোর জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (বুখারী হা: ৫৬২১, মুসলিম হা: ২০০)
চোগলখোরির কারণে কবরে ভয়াবহ শাস্তি হবে :
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ مَرَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِقَبْرَيْنِ فَقَالَ إِنَّهُمَا لَيُعَذِّبَانِ وَمَا يُعَذِّبَانِ فِي كَبِيرٍ أَمَّا أَحَدُهُمَا فَكَانَ لَا يَسْتَتِرُ مِنَ الْبَوْلِ ، وَأَمَّا الْآخَرُ فَكَانَ يَمْشِي بِالنَّمِيمَةِ ثُمَّ أَخَذَ جَرِيدَةً رَطْبَةً فَشَقَهَا نِصْفَيْنِ فَغَرَزَ فِي كُلِّ قَبْرٍ وَاحِدَةً قَالُوا : يَا رَسُولَ اللَّهِ لِمَ فَعَلْتَ هُذَا قَالَ لَعَلَّهُ يُخَفَّفُ عَنْهُمَا مَا لَمْ يَيْبَسَا
ইবনে আব্বাস হতে বর্ণিত, রাসূল ﷺ দু'টি কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেন, কবরের এ দু'ব্যক্তিকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে। তবে কোন মারাত্মক গুনাহের কারণে তারা শাস্তি ভোগ করছে না। তাদের একজনের অপরাধ হল, সে প্রস্রাব থেকে পর্দা করত না অথবা প্রস্রাবের ছিটা থেকে সর্তক থাকত না এবং অপরজনের অপরাধ হল, সে চোগলখোরি করে বেড়াত। অতঃপর নবী ﷺ একটি তাজা খেজুরের ডাল হাতে নিলেন এবং এটাকে দু'ভাগে ভাগ করে দু'কবরে পুঁতে দিলেন। সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এমনটি কেন করলেন? তখন তিনি বললেন, আমি আশা রাখি যতক্ষণ পর্যন্ত এ দু'টি ডাল তাজা থাকবে ততক্ষণ কবরের শাস্তি হালকা থাকবে।” (বুখারী হা: ২১৮)
📄 চোগলখোর সম্পর্কে কতিপয় সাবধানতা
এসব হাদীস থেকে জানা গেল যে, চোগলখোরি মারাত্মক গুনাহের কাজ। চোগলখোরির কারণে কবরেও শাস্তি ভোগ করতে হবে এবং চোগলখোর জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। তাই আমাদের উচিত চোগলখোরি থেকে বিরত থাকা।
১. চোগলখোরকে বিশ্বাস করবে না। কেননা চোগলখোরের খবর গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন "যদি কোন ফাসিক তোমাদের নিকট কোন সংবাদ নিয়ে আসে তবে তোমরা তা পরীক্ষা করে দেখবে যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোন সম্প্রদায়কে আঘাত না কর এবং পরে তোমাদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত না হও।” (সূরা হুজরাত- ৬)
২. চোগলখোরকে এ কাজ থেকে বিরত থাকার উপদেশ দিতে হবে এবং তার কাজ যে খারাপ তা তাকে বুঝাতে হবে।
৩. যার সম্পর্কে চোগলখোরি করা হবে তার সম্পর্কে খারাপ ধারণা করা উচিত নয়। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ
“তোমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনুমান হতে দূরে থাক। কারণ কোন কোন ক্ষেত্রে অনুমান পাপ।” (সূরা হুজরাত- ১২)
📄 'যবান নিয়ন্ত্রণ করার গুরুত্ব
মানুষের ভাল-মন্দ নির্ভরশীল তার যবানের উপর। সে যদি নিজের যবানকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে, তবে তা তার দুনিয়া ও আখেরাতের জন্য কল্যাণকর হবে। সকল প্রকার ঝগড়া-বিবাদ, মারামারি-কাটাকাটি ও বিশৃংখলার মূল হচ্ছে এ যবান। আবার সকল প্রকার বন্ধুত্ব ও সহনশীলতার মূলও হচ্ছে যবান।
যারা মুমিন তারা বুঝে-শুনে পরিণতির কথা চিন্তা করে কথা বলবে। কারণ মহাবিচারের দিন মানুষের প্রতিটি কথা ও কাজের হিসাব নেয়া হবে। আর মানুষের কথা রেকর্ড করার জন্য আল্লাহ তা'আলা ফেরেশতা নিযুক্ত করে রেখেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
إِذْ يَتَلَقَّى الْمُتَلَقِّيَانِ عَنِ الْيَمِينِ وَعَنِ الشِّمَالِ قَعِيدٌ - مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ
“যখন দুই ফেরেশতা ডানে ও বামে বসে তার আমল গ্রহণ করে। সে যে কথাই উচ্চারণ করে, তা সংরক্ষণ করার জন্য তার কাছে সদা প্রস্তুত প্রহরী রয়েছে।” (সূরা কাফ- ১৭,১৮)
যবান মানুষের জন্য এমন একটি হাতিয়ার যা তলোওয়ার থেকেও ধারালো। তলোওয়ার দ্বারা আঘাত করলে যতখানি ক্ষতি হয়, কথার দ্বারা আঘাত করলে তার চেয়েও হাজারগুণ বেশি ক্ষতি হয়। তাই রাসূল ﷺ প্রত্যেক মুসলিমকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন-
الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ
“মুসলিম সেই ব্যক্তি যার হাত ও জিহ্বা থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে।” (মুসলিম হা: ১৭১)
আবু হুরায়রা বলেন, রাসূল ﷺ বলেছেন-
إِنَّ الْعَبْدَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ مِنْ رِضْوَانِ اللهِ لَا يُلْقِي لَهَا بَالًا يَرْفَعُ اللَّهُ بِهَا دَرَجَاتٍ وَإِنَّ الْعَبْدَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ مِنْ سَخَطِ اللَّهِ لَا يُلْقِي لَهَا بَالًا يَهْوِي بِهَا فِي جَهَنَّمَ
“বান্দা কখনো কখনো এমন কথা বলে যাতে আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি রয়েছে, অথচ সে এর গুরুত্ব জানে না, কিন্তু আল্লাহ তা'আলা এর দ্বারা তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন। পক্ষান্তরে বান্দা কোন কোন সময় এমন কথাও বলে যাতে আল্লাহ তা'আলার অসন্তুষ্টি রয়েছে, অথচ সে তার অনিষ্টতা সম্পর্কে জানে না। কিন্তু ঐ কথার কারণেই সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। (বুখারী হা: ৪৬৭৮)
সকল অঙ্গের মধ্যে জিহ্বা সবচেয়ে বেশি ভয়ংকর :
সুফিয়ান হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে এমন একটি বিষয়ের কথা বলুন যার উপর আমি আমল করব। তিনি বললেন, তুমি বল, আমার রব আল্লাহ, অতঃপর এর উপর অটল থাক। তারপর আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি কোন জিনিসের ভয় করেন? তখন রাসূল ﷺ তার জিহ্বা ধরে বললেন, এটা। (তিরমিযী হা: ২৪১০)
তাই প্রত্যেক মুসলিমের উচিত, কেবল সেসব কথা বলা যেসব কথার মধ্যে কল্যাণ নিহিত আছে। যদি কোন কথার মধ্যে উপকারিতা না থাকে তবে উত্তম হল সে কথা বলা থেকে বিরত থাকা। কারণ অনেক সময় জায়েয কথার মধ্য দিয়ে হারামের মধ্যে লিপ্ত হতে হয়। আর অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটাই হয়ে থাকে।
📄 যবান ব্যবহারের উত্তম ক্ষেত্রসমূহ
যেসব স্থানে কথা বলা উত্তম তার কয়েকটি হল :
১. শিক্ষামূলক আলোচনা বা বক্তৃতার ক্ষেত্রে।
২. পরস্পর ইলম তাকরার বা চর্চা করার ক্ষেত্রে।
৩. অপরকে ইলম শিক্ষা দেয়ার ক্ষেত্রে।
৪. পরস্পরের মধ্যে ঝগড়া মীমাংসা করার ক্ষেত্রে।
৫. সৎ কাজের আদেশ দেয়ার ক্ষেত্রে।
৬. অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করার ক্ষেত্রে।
৭. কাউকে উত্তম পরামর্শ দেয়ার ক্ষেত্রে।
৮. মানুষকে সঠিক পথের দিক নির্দেশনা দেয়ার ক্ষেত্রে।