📄 গীবত থেকে বাঁচার উপায়
১. রাগ ও ক্রোধকে সংযত রাখা :
সর্বাবস্থায় রাগ ও ক্রোধকে সংযত রাখতে হবে। কেননা মানুষ যখন কারো প্রতি রাগান্বিত হয়, তখন তার সম্পর্কে এমন সব কথা বলে থাকে যার অধিকাংশই গীবতের অন্তর্ভুক্ত।
২. হিংসা-বিদ্বেষ থেকে দূরে থাকা:
হিংসা-বিদ্বেষ থেকে দূরে থাকতে হবে। কেননা হিংসা-বিদ্বেষের কারণেই মানুষ একে অপরকে ঘৃণার চোখে দেখে। আর যখন একে অপরের সাথে খারাপ মনোভাব তৈরি হয়, তখনই মানুষ গীবতে লিপ্ত হয়। অতএব আমাদের উচিত গীবতকে পরিহার করার জন্য হিংসা-বিদ্বেষ থেকে নিজেকে দূরে রাখা।
৩. অহংকার থেকে বিরত থাকা :
অহংকার থেকে বিরত থাকতে হবে এবং আল্লাহর কাছে তওবা করতে হবে। কেননা আগুন যেমনিভাবে কাঠকে খেয়ে ফেলে ঠিক তেমনিভাবে অহংকার মানুষকে ধ্বংস করে দেয়। অহংকারের কারণে মানুষ অপরকে তুচ্ছ জ্ঞান করে এবং গীবতে জড়িয়ে পড়ে।
৪. অপরকে তুচ্ছ না ভাবা :
নিজেকে আল্লাহর নগণ্য বান্দা ভাবতে হবে এবং অপরকে বড় হিসেবে দেখতে হবে। কেননা নিজেকে বড় ভাবা এবং অপরকে ছোট ভাবা থেকে অনেক সময় গীবত হয়ে থাকে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, “হে ঈমানদারগণ, কেউ যেন অপর কাউকে উপহাস না করে, কেননা সে উপহাসকারী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে এবং কোন নারী অপর নারীকেও যেন উপহাস না করে। কেননা সে উপহাসকারিণী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হতে পারে।” (সূরা হুজরাত- ১১)
৫. অহেতুক ঠাট্টা-বিদ্রূপ না করা:
কারো কোন বিষয়কে কেন্দ্র করে ঠাট্টা, উপহাস করা থেকে দূরে থাকতে হবে। বন্ধু-বান্ধব বা অন্য কারো সাথে হাসি-ঠাট্টা করতে গিয়েও লক্ষ্য রাখতে হবে যে, আমি যে বিষয় নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করছি তা গীবতের মধ্যে পড়ছে কি না। যদি তা গীবতের অন্তর্ভুক্ত হয় তবে তা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে হবে এবং যারা এসব করছে তাদেরকেও তা থেকে বিরত থাকার জন্য উপদেশ দিতে হবে। এভাবে নিজেকেও গীবত থেকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে এবং নিজের কর্ণকেও গীবত থেকে বিরত রাখা যাবে। এ রকম চলতে থাকলে একসময় গীবত বা দোষচর্চা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ইন্শা আল্লাহ!
৬. যার দোষ তাকেই বলা :
কারো কোন ভুল-ত্রুটি হতে দেখলে সাহস করে দ্রুত তাকে তা জানাতে হবে যাতে করে সে নিজেকে সংশোধন করে নিতে পারে।
৭. অনর্থক কথা বলা থেকে বিরত থাকা :
বেহুদা কথা ও অযথা সময় নষ্ট করা থেকেই গীবতের সূত্রপাত। তাই গীবত বা পর দোষচর্চার মত মারাত্মক অপরাধ থেকে বাঁচার জন্য বেহুদা কথা ও অযথা সময় নষ্ট করা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা বলা থেকে যতটা সম্ভব নিজেকে বিরত রাখতে হবে। যে সময়টুকু অবসর পাওয়া যায় সে সময়টুকু আল্লাহর যিকিরে কাটানোর চেষ্টা করতে হবে। তাহলে দেখা যাবে এর দ্বারা একদিকে নিজেকে গীবত থেকে বিরত রাখা যাবে, আবার অপরদিকে আল্লাহর যিকির করার কারণে অসংখ্য সওয়াবও অর্জিত হবে।
৮. গীবত সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান অর্জন করা :
কুরআন-হাদীস ও ইসলামী বই-পুস্তক নিয়মিত পাঠ করতে হবে, যাতে করে কোনটা গীবত আর কোনটা গীবত না তা যথাযথভাবে নির্ণয় করা যায় এবং এর মাধ্যমে আল্লাহর ভয় মনে জাগ্রত করে গীবতের মত বড় অপরাধ থেকে বেঁচে থাকার ব্যাপারে সাহায্য পাওয়া যায়।
৯. আত্মপ্রশংসা থেকে বিরত থাকা :
আত্মপ্রশংসা না করে নিজের অসংখ্য ভুলের বা গুনাহের কথা স্মরণ করে বার বার তাওবা করতে হবে।
১০. প্রতিটি কথা রেকর্ড হয় এ কথা মনে রাখা :
মনে রাখতে হবে যে, আমরা যাই বলিনা কেন তা আল্লাহর ফেরেশতারা যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। আর এ জন্য আমাদেরকে আল্লাহর নিকট হিসাব দিতে হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
إِذْ يَتَلَقَّى الْمُتَلَقِّيَانِ عَنِ الْيَمِينِ وَعَنِ الشِّمَالِ قَعِيدٌ - مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ
"স্মরণ রেখো! দুই ফেরেশতা তার ডানে ও বামে বসে তার কর্ম লিপিবদ্ধ করে। মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে তা লিপিবদ্ধ করার জন্য অতন্দ্র প্রহরী তার নিকটেই রয়েছে।” (সূরা কাফ- ১৭, ১৮)
১১. কথা কম বলা ও চিন্তা-গবেষণা বেশি করা :
কথা কম বলে চিন্তা-গবেষণা করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে এবং অতিরিক্ত হাসি-তামাশা থেকে দূরে থেকে রাসূলের চরিত্রের অধিকারী হতে হবে।
সেমাক বলেন, আমি জাবির বিন সামুরা কে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি রাসূল ﷺ এর মজলিসে উপস্থিত থাকতেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ! তারপর বললেন, রাসূল ﷺ দীর্ঘক্ষণ চুপ থাকতেন, অল্প হাসতেন, তাঁর সাথীরা কবিতা এবং অন্যান্য আনুসাঙ্গিক বিষয়ে আলোচনাকালীন সময়ে তিনি হাসতেন, তবে মুচকি হাসতেন। (সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী হা: ২১৬৪৮)
সুতরাং যারা রাসূলের উম্মত এবং রাসূল ﷺ কে ভালবাসে ও তাকে অনুসরণ করে তাদের উচিত ভাল কথা বলা, অন্যথায় চুপ থাকা।
১২. কুরআনের সাথে সময় ব্যয় করা :
বেশি বেশি কুরআন তেলাওয়াত করতে হবে। প্রতিদিন বুঝে বুঝে কুরআন পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে এবং যতটুকু সম্ভব মুখস্থ করার চেষ্টা করতে হবে। আবদুল্লাহ ইবনে উমর হতে বর্ণিত, রাসূল ﷺ বলেছেন, কুরআন পাঠকারীকে বলা হবে, পড় যেভাবে দুনিয়াতে তারতিলের সাথে পড়তে। তোমার স্থান শেষ আয়াত পর্যন্ত হবে, যা তুমি পড়েছিলে। যখনই কুরআন শুনতে পাওয়া যাবে তখনই কথা না বলে তা শ্রবণ করা উচিত। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنْصِتُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ
“যখন কুরআন পাঠ করা হয়, তখন তোমরা তা মনোযোগসহকারে শ্রবণ কর এবং চুপ থাক, যাতে করে তোমাদের উপর করুণা বর্ষিত হয়। (সূরা আরাফ- ২০৪)
১৩. যাচাই বাছাই করে কথা বলা :
আমাদের নিকট শুনা বা লিখিতভাবে যেসব খবর পৌঁছে থাকে তা যথাযথভাবে যাচাই বাছাই করে বৈধ পন্থায় অপরের কাছে বলার এবং পৌঁছানোর চেষ্টা করতে হবে। কেননা এতে মিথ্যা কথা হওয়ার আশংকা রয়েছে। আবু হুরায়রা হতে বর্ণিত, রাসূল ﷺ বলেন-
كَفَى بِالْمَرْءِ كَذِبًا أَنْ يُحَدِّثَ بِكُلِّ مَا سَمِعَ
“কোন ব্যক্তির মিথ্যুক হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শুনে তা-ই প্রচার করে।” (মুসলিম হা: ৭)
১৪. গীবত প্রতিহত করা এবং তা শুনা থেকে বিরত থাকা :
যখন কোন ব্যক্তি কারো গীবত শুরু করে তখনই শ্রোতার উচিত হল গীবতকারীকে গীবতের পরিণতির কথা জানিয়ে দেয়া এবং এ থেকে বিরত থাকার উপদেশ দেয়া। যাতে করে গীবত শুনার অপরাধ থেকে নিজেকে বাঁচানো যায়। কেননা কিয়ামতের দিন গীবত শ্রবণের অপরাধেও মানুষকে পাকড়াও করা হবে।
📄 গীবত শুনলে যা করা উচিত
যখন তোমার সামনে কেউ গীবত করতে থাকবে তখন তোমার উচিত হবে,
১. ক্ষমতা থাকলে সরাসরি বাধা দেওয়া।
২. গীবতকৃত ব্যক্তির প্রশংসা করা, যাতে গীবতকারী তার কথা বন্ধ করতে বাধ্য হয়।
৩. গীবতকারীকে বিশ্বাস না করা। কেননা গীবত একটি মহাপাপ। তাই গীবতকারী কখনো বিশ্বস্ত হতে পারে না।
৪. গীবতকৃত ব্যক্তির প্রতি খারাপ ধারণা না করা।
৫. গীবতের কথা শুনে এগুলো অন্যের কাছে প্রচার না করা।
📄 গীবত প্রতিহত করার ফযীলত
অন্যায় কাজকে প্রতিহত করা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুগত্যেরই নামান্তর। আর গীবত যেহেতু একটি বিশেষ অন্যায় কাজ, তাই তা প্রতিহত করার ফযীলতও বিশেষ ধরণের। যে ব্যক্তি কোন মুসলমান ভাইকে সাহায্য করবে আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন তাকে সাহায্য করবেন। রাসূল ﷺ বলেন-
مَنْ رَدَّ عَنْ عِرْضِ أَخِيهِ رَدَّ اللَّهُ عَنْ وَجْهِهِ النَّارَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
“যে ব্যক্তি কোন মুসলমান ভাইয়ের ইজ্জত রক্ষা করবে অর্থাৎ গীবত হতে থাকলে তা বন্ধ করার চেষ্টা করবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে জাহান্নামের আগুণ থেকে রক্ষা করবেন।” (তিরমিযী হা: ২০৫৬)
রাসূল ﷺ বলেন-
مَنْ نَفْسَ عَنْ مُسْلِمٍ كُرْبَةٌ مِنْ كُرَبِ الدُّنْيَا نَفَسَ اللَّهُ عَنْهُ كُرْبَةً مِنْ كُرَبِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَمَنْ يَشَرَ عَلَى مُعْسِرٍ فِي الدُّنْيَا يَسَّرَ اللهُ عَلَيْهِ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَمَنْ سَتَرَ عَلَى مُسْلِمٍ فِي الدُّنْيَا سَتَرَ اللهُ عَلَيْهِ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَاللَّهُ فِي عَوْنِ الْعَبْدِ مَا كَانَ الْعَبْدُ فِي عَوْنِ أَخِيهِ
যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের উপর থেকে দুনিয়ার কোন কষ্ট দূর করবে, আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন তার কষ্ট দূর করবেন। আর যে ব্যক্তি দুনিয়াতে কোন অভাবগ্রস্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে সহজ পন্থা অবলম্বন করবে, আল্লাহ তা'আলা দুনিয়া ও আখেরাতে তার সাথে সহজ ব্যবহার করবেন। আর যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের দোষ-ত্রুটি ঢেকে রাখবে আল্লাহ তা'আলা দুনিয়া ও আখেরাতে তার দোষ-ত্রুটি ঢেকে রাখবেন। আর যতক্ষণ কোন বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্যে নিয়োজিত থাকবে ততক্ষণ আল্লাহ তা'আলাও তাকে সাহায্য করবেন। (তিরমিযী হা: ২০৫৫)
📄 গীবত ত্যাগের উপকারিতা
গীবত পরিত্যাগের কিছু উপকারিতা নিম্নে উল্লেখ করা হল :
১. কোন ব্যক্তি গীবত ত্যাগ করে নিজের অন্তরাত্মাকে নির্মল ও পরিচ্ছন্ন রাখতে পারে। কারণ কোন মুমিন ব্যক্তি যখন কোন গুনাহের কাজ করে তখন তার অন্তরাত্মায় একটি কালো দাগ পড়ে যায়। অতএব কোন ব্যক্তি গীবত পরিহার করলে তার অন্তর নির্মল ও স্বচ্ছ থাকে।
২. গীবত করা অপর মুসলিম ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সমতুল্য। অতএব যে ব্যক্তি গীবত ত্যাগ করল সে এ অন্যায় কাজ থেকে বেঁচে থাকল।
৩. গীবতের ফলে ইবাদাত নষ্ট হয়ে যায়। অতএব যে ব্যক্তি گীবত পরিহার করল সে তার আমলকে রক্ষা করল।
৪. গীবতের মাধ্যমে অপর ব্যক্তিকে আহত করে। অতএব যে ব্যক্তি গীবত ত্যাগ করল সে অন্যকে আহত করা থেকে বিরত থাকল।
৫. যে ব্যক্তি নিজের যবানকে নিয়ন্ত্রণ করে না সে অপমানিত হয়। অতএব গীবত ত্যাগ করলে নিজেকে অপমান থেকে বাঁচানো যায়।
৬. গীবত করলে অপর মুসলিম ভাইয়ের প্রতি খারাপ ধারণা জন্ম নেয়। তাই গীবত থেকে বেঁচে থাকলে, অপর মুসলিম ভাইয়ের প্রতি খারাপ ধারণা জন্মাবে না এবং মুসলিম ঐক্যে সৃষ্টি হয়।
৭. প্রত্যেক মুসলমানের নিকট অপর মুসলিম ভাইয়ের মান-সম্মান তার নিকট আমানতস্বরূপ। আর গীবত করলে সে আমানতের খিয়ানত করা হয়। অতএব গীবত না করলে অপর মুসলিম ভাইয়ের আমানত রক্ষা করা হয়।
৮. যে ব্যক্তি দুনিয়াতে অন্যের দোষ প্রকাশ করবে না আল্লাহ তা'আলাও কিয়ামতের দিন তার দোষ প্রকাশ করবেন না। অতএব যে গীবত হতে দূরে থাকবে সে কিয়ামতের দিন লজ্জিত হবে না।
৯. গীবত করলে সামাজিক শৃংখলা বিঘ্নিত হয়। তাই গীবত না করলে সামাজিক শৃংখলা অটুট থাকবে।
১০. কবরের আযাবের অন্যতম কারণ হচ্ছে গীবত। অতএব গীবত ত্যাগ করলে কবরের আযাব থেকে মুক্তি লাভ করতে পারবে।
১১. গীবত করলে শয়তান আনন্দিত হয় এবং সে তার প্রতি দ্রুত প্রাধান্য লাভ করে। আর গীবত ত্যাগ করলে শয়তান সে সুযোগ পায় না।
১২. গীবতকারীর শত্রু সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, আর গীবত ত্যাগ করলে শত্রুতা কমে যায়।