📄 গীবতের ব্যাপারে মহিলাদের সাবধানতা
গীবত হচ্ছে মহিলাদের চারণভূমি। মহিলারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে অধিক হারে গীবতে জড়িয়ে পড়ে। যেমন- যখনই কয়েকজন মহিলা একত্রিত হয়, তখন তারা প্রায়ই সমালোচনা বা গীবতে লিপ্ত হয়ে যায়। তারা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নিয়ে সমালোচনা করে। বিশেষ করে তাদের স্বামীদের ব্যাপারেও তারা নানা মন্তব্য করে থাকে। যেমন- একে অপরকে বলতে থাকে আমার স্বামী এরকম এরকম, আমাকে এটা দিয়েছে ওটা দেয়নি ইত্যাদি ইত্যাদি। এমনকি অনেক মহিলা তাদের স্বামীদের গোপনীয় বিষয় পর্যন্ত বলাবলি করতে লজ্জাবোধ করে না। এ কাজের পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ। স্বামীর অকৃতজ্ঞ হওয়া এবং বেশি বেশি অভিশাপ দেয়া, এটা মহিলাদের জাহান্নামী হওয়ার প্রধান কারণ।
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ ، قَالَ : خَرَجَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي أَضْحَى أَوْ فِطْرٍ - إِلَى الْمُصَلَّى، فَمَرَّ عَلَى النِّسَاءِ فَقَالَ: يَا مَعْشَرَ النِّسَاءِ تَصَدَّقْنَ، فَإِنِّي أُرِيتُكُنَّ أَكْثَرَ أَهْلِ النَّارِ ، فَقُلْنَ : وَبِمَ يَا رَسُولَ اللهِ ؟ قَالَ : تُكْثِرْنَ اللَّعْنَ، وَتَكْفُرْنَ الْعَشِيرَ
আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ ঈদুল আযহা অথবা ঈদুল ফিতরের দিন ঈদগাহে গেলেন। তিনি মহিলাদের নিকট আগমন করলেন, অতঃপর তাদেরকে সম্বোধন করে বললেন, হে মহিলারা! তোমরা সদকা কর, কারণ তোমাদেরকে সবচেয়ে বেশি জাহান্নামী হিসেবে আমাকে দেখানো হয়েছে। তখন তাঁরা আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! কী কারণে আমাদের এ অবস্থা? নবী ﷺ বললেন, তোমরা বেশি বেশি লানত (অভিশাপ) কর এবং স্বামীদের অকৃজ্ঞতা প্রকাশ কর। (বুখারী হা: ৩০৪)
বর্তমান সময়ে দেখা যায় যে, মহিলা অভিভাবকরা যখন ছেলে-মেয়েদেরকে নিয়ে স্কুলে যায় তখন তারা অনেকে একত্রে জমা হয় এবং তারা গীবতের মত জঘন্য কাজে লিপ্ত হয়ে থাকে। এভাবে তারা জীবনের অনেক মূল্যবান সময়কে গুনাহের কাজে ব্যয় করে থাকে। তাই এক্ষেত্রে মহিলাদের সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। তারা যখন অবসর পায় তখন তাদের উচিত ইসলামী বই-পুস্তক পড়ে দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করা এবং নেক আমলে লিপ্ত থাকা। তাহলে তারা অনেক কল্যাণ লাভ করতে পারবে।
📄 গীবতে লিপ্ত হওয়ার কারণ
গীবত মূলত শয়তানের ওয়াসওয়াসা। এ কারণে মানুষ অনিচ্ছায় গীবতে লিপ্ত হয়। কিন্তু খুব কম লোকই তা ধরতে পারে। তাছাড়া মানুষ সাধারণভাবে যেসব কারণে গীবতে লিপ্ত হয়ে থাকে তা হল :
১. ক্রোধের কারণে:
গীবতের সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে ক্রোধ। মানুষ যখন কোন কারণে কারো উপর রাগান্বিত হয় তখনই তার গীবত শুরু করে দেয়। কোন ব্যক্তি অপর ব্যক্তির প্রতি রুষ্ট হলে উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে মনের ঝাল মিটানোর জন্য অপরের দোষচর্চা করে থাকে।
২. শত্রুতার কারণে :
শত্রুতা হচ্ছে গীবত সংঘটিত হওয়ার অন্যতম কারণ। যখন কেউ কারো উপর শত্রুতা পোষণ করে তখনই সে তার শত্রুর গীবতে লিপ্ত হয়।
৩. কাউকে অপমান করার জন্য :
যখন কোন ব্যক্তি কারো উপর নাখোশ হয় তখনই তাকে সে অপমান করার ইচ্ছা পোষণ করে। কোন ব্যক্তিকে অপমান করার উদ্দেশ্যে মানুষ গীবতে লিপ্ত হয়ে পড়ে।
৪. কথার তাল মিলানোর জন্য :
কাউকে গীবত করতে দেখলে অনেক সময় কথার তাল মিলাতে গিয়ে অন্যরাও গীবতে লিপ্ত হয়ে পড়ে।
৫. অহংকার ও আত্মগর্বের কারণে :
গীবতের আরেকটি বড় উৎস হচ্ছে গর্ব ও অহংকার। অহংকারের কারণেই মানুষ নিজেকে বড় ও অন্যকে ছোট ভাবতে শুরু করে। নিজের সব কিছুকেই মনে করে গুণ, আর অন্যের সবকিছুই মনে করে দোষ। যেমন কারো এ কথা বলা যে, অমুক ব্যক্তি একবারেই মূর্খ, তার কোন বোধশক্তি নেই। এ কথার দ্বারা সে বুঝাতে চায় যে, সেই সত্যিকারের জ্ঞানী এবং অন্যরা খুব কমই জ্ঞাত। এভাবে ব্যক্তি নিজের এহেন অহংকার ও আত্মগর্বের কারণে গীবতের মত নিকৃষ্ট কাজে জড়িয়ে পড়ে।
৬. হিংসার কারণে :
হিংসার কারণেও মানুষ গীবত করে থাকে। কোন ব্যক্তির মধ্যে যখন কোন ভাল গুণ থাকে এবং এর মাধ্যমে সে সমাজে খ্যাতি লাভ করে তখন তার হিংসুকরা তার সমালোচনা শুরু করে দেয়।
৯. হাসি-তামাশা ও ঠাট্টাচ্ছলে :
হাসি-তামাশা ও ঠাট্টাচ্ছলে মানুষ গীবতে লিপ্ত হতে পারে। তবে সময় কাটানোই এর মূল লক্ষ্য হয়ে থাকে।
১০. অন্যের কাজকে খারাপ মনে করার কারণে :
অন্যের কোন কাজ খারাপ লাগলে মানুষ ঐ কাজের সমালোচানা করতে গিয়ে গীবতে লিপ্ত হয়ে পড়ে।
১১. পার্থিব সম্মান লাভের আশায় :
কারো কাছে প্রিয় পাত্র হওয়ার জন্যও মানুষ অনেক সময় অন্যের গীবতে লিপ্ত হয়ে থাকে।
📄 গীবত করার পরিণাম
আল্লাহ তা'আলার কাছে গীবত একটি বড় ধরণের অপরাধ। তাই এর পরিণামও বড় ভয়াবহ। এর পরিণাম উভয় জগতেই হয়ে থাকে। গীবতের কারণে ব্যক্তি যেভাবে দুনিয়ার জীবনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, পরকালের জীবনেও তার চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মানুষ গীবতের মাধ্যমে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে। যেমন :
১. গীবতের ফলে বিদ্বেষ ও বিভেদ সৃষ্টি হয়
গীবতের অন্যতম বড় কুফল হচ্ছে, এর ফলে মুসলমানদের একতা বিনষ্ট হয়ে যায়। প্রত্যেকের অন্তরে অন্যের প্রতি সন্দেহ ও অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়। ভালবাসা ও প্রীতি বিলুপ্ত হয়।
২. গীবতের কারণে গীবতকৃত ব্যক্তির প্রতি অনাস্থা জন্মে :
যার গীবত করা হয় তার দোষগুলো মানুষের মাঝে প্রকাশ হয়ে যাওয়ার ফলে তার প্রতি মানুষের অনাস্থা জন্ম নেয়। তাছাড়া অপরের দোষ বর্ণনা করার কারণে গীবতকারীর প্রতিও মানুষের অনাস্থা তৈরি হয়।
৩. গীবতকারী মানুষের নিকট আস্থা হারিয়ে ফেলে :
দুনিয়াতে গীবতের একটা বড় কুফল হচ্ছে গীবতকারী সকলের আস্থা হারিয়ে ফেলে। কেউ তার উপর আস্থা স্থাপন করতে ভরসা পায় না। কেননা সকলেই একথা মনে করে যে, আজ যেমন সে আমাদের সামনে অন্য মানুষের দোষ আলোচনা করছে তেমনি সে যে কাল অন্যের সামনে আমাদের দোষ আলোচনা করবে না তার কি নিশ্চয়তা আছে?
যে ব্যক্তি তোমার সামনে অন্যের নিন্দা করছে তার কাছে এ আশা তুমি করো না যে, অন্যের কাছে সে তোমার সুনাম করবে। কেননা দোষচর্চা করাটাই হচ্ছে তার মজ্জাগত পেশা।
এক জ্ঞানী ব্যক্তির সামনে এক মূর্খ ব্যক্তি মানুষের গীবত ও দোষচর্চা শুরু করল। জ্ঞানী ব্যক্তিটি তখন তাকে উপদেশ দিয়ে বললেন, “দেখ ভাই! মানুষের গীবত করে তুমি তোমার প্রতি আমার আস্থা নষ্ট করে দিও না।”
৪. গীবত করলে শয়তান আনন্দিত হয় :
আল্লাহ তা'আলা বলেন-
إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمْ عَدُوٌّ فَاتَّخِذُوهُ عَدُوًّا
“নিশ্চয় শয়তান তোমাদের শত্রু। অতএব তাকে তোমরা শত্রুই মনে করো।” (সূরা ফাতির- ৬)
পাপ কাজ মাত্রই শয়তানকে আনন্দ দেয়। কিন্তু শয়তান এ কথা নিজেই স্বীকার করেছে যে, গীবতেই তাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দেয়।
যারা গীবত করে শয়তান তাদের মুখে মধু মিশিয়ে দেয়।
৫. গীবত করলে আল্লাহ ও তার নবীর অবাধ্যতা করা হয় :
আল্লাহ তা'আলা বলেন-
وَمَا أَتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا
“রাসূল তোমাদের নিকট যা কিছু নিয়ে আসেন তোমরা তা গ্রহণ কর, আর যা কিছু নিষেধ করেন তা হতে তোমরা বিরত থাক।” (সূরা হাশর- ৭)
সুতরাং যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদেশ অমান্য করে গীবত করা হয়, তবে তা আল্লাহর ও নবীর অবাধ্যতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
৬. পাপের দিকে মন আকৃষ্ট হয় :
কিছু কিছু পাপ আছে যা সংঘটিত হওয়ার কারণে আরো কতগুলো পাপ সংঘটিত হয়ে পাপকে আরো শক্তিশালী করে। গীবত তার মধ্যে একটি।
চারটি জিনিস হচ্ছে পাপের মূল :
(১) গীবত,
(২) মিথ্যা,
(৩) চোগলখোরি,
(৪) কোন নারীর সতীত্বের দিকে তাকানো।
৭. গীবতকারীর শত্রুর সংখ্যা বৃদ্ধি পায় :
গীবতকারী ব্যক্তি যতজন লোকের গীবত করে ততজন লোকের ঘৃণার পাত্র ও শত্রুতে পরিণত হয়। তাই তার শত্রুর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।
৮. গীবতকারী আল্লাহর অসন্তুষ্টির শিকার হয় :
আল্লাহ তা'আলা বান্দাদেরকে গীবত করতে নিষেধ করা সত্ত্বেও বান্দা যদি তাঁর নিষেধ অমান্য করে গীবতের মত ঘৃণিত অপরাধ করে বেড়ায় তবে আল্লাহ তা'আলা তার উপর খুবই অসন্তুষ্ট হন।
৯. গীবত বড় ধরনের সুদ :
আমরা মনে করি যে, শুধু টাকা-পয়সাতেই সুদ রয়েছে, কিন্তু তা নয়। গীবতের মাধ্যমেও সুদের সমান অপরাধ হয়ে থাকে। নবী ﷺ বলেন-
إِنَّ مِنْ أَرْبَيَ الرِّبَا الْاِسْتِطَالَةُ فِي عِرْضِ الْمُسْلِمِ بِغَيْرِ حَقٍ
সবচেয়ে বড় সুদ হচ্ছে অন্যায়ভাবে কোন মানুষের মান-সম্মানের উপর আঘাত করা। (আবু দাউদ হা: ৪৮৭৮)
১০. গীবতের কারণে আমল নষ্ট হয়ে যায় :
রাসূল ﷺ একবার সাহাবাগণকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি জানো, প্রকৃত দরিদ্র ও নিঃস্ব কে? সাহাবাগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা তো মনে করি যার কাছে অর্থ-কড়ি নেই, সে-ই নিঃস্ব ও দরিদ্র। তখন রাসূল ﷺ বললেন, নিঃস্ব ও দরিদ্র ঐ ব্যক্তি যে কিয়ামতের দিন অনেক নেক আমল নিয়ে উপস্থিত হবে। কিন্তু একদল লোক আল্লাহর দরবারে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করবে। কারো অর্থ সে আত্মসাৎ করেছে, কাউকে গালি দিয়েছে, কারো গীবত ও দোষচর্চা করেছে। কিংবা কারো বিরুদ্ধে মিথ্যা স্বাক্ষী দিয়েছে ইত্যাদি। আল্লাহ সকলের মধ্যে তার নেক আমল বণ্টন করা শুরু করবেন। তার নেক আমল শেষ হয়ে যাওয়ার পরও যদি অভিযোগকারীদের পাওনা শেষ না হয় তখন সকলের গুনাহ ও বদ-আমলের বোঝা তার উপর চাপিয়ে দেবেন। সে সকলের বদ-আমলের বোঝা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। সে-ই হল সত্যিকারের দরিদ্র ও নিঃস্ব ব্যক্তি। (মুসলিম হা: ৬৭৪৪)
দুনিয়াতে কেউ বিপদে পড়লে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন ছুটে আসে সাহায্যের জন্য। কিন্তু কিয়ামতের দিন তার উল্টা হবে, পিতা-মাতা সন্তান থেকে আর সন্তান পিতা-মাতা থেকে পালিয়ে যাবে। স্বামী স্ত্রীকে এবং স্ত্রী স্বামীকে দেখে পালিয়ে যাবে। প্রত্যেকেই সেদিন নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। শুধু ইয়া নাফসী, ইয়া নাফসী বলবে।
১২. পরকালে গীবতকারীদের করুণ পরিণতি :
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ « لَمَّا عُرِجَ بِي مَرَرْتُ بِقَوْمٍ لَهُمْ أَظْفَارٌ مِنْ نُحَاسٍ يَخْمِشُونَ وُجُوهَهُمْ وَصُدُورَهُمْ فَقُلْتُ مَنْ هَؤُلاَءِ يَا جِبْرِيلُ قَالَ هَؤُلاءِ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ لُحُومَ النَّاسِ وَيَقَعُونَ فِي أَعْرَاضِهِمْ
আনাস বিন মালিক বলেন, রাসূল ﷺ বলেন, যখন আমার প্রতিপালক আমাকে মেরাজে নিয়েছিলেন, তখন আমি এমন এক শ্রেণীর লোকদের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলাম যাদের নখগুলো ছিল পিতলের নখের মত। যা দ্বারা তারা নিজেদের চেহারা ও বক্ষ খামচাচ্ছিল। আমি তাদের সম্পর্কে জিবরাঈল কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, এরা সেসব ব্যক্তি যারা দুনিয়াতে মানুষের গোশত খেত এবং তাদের ইজ্জত নষ্ট করত। অর্থ্যাৎ তারা গীবত করত। (আবু দাউদ হা: ৪৮৭৮)
📄 গীবত থেকে বাঁচার উপায়
১. রাগ ও ক্রোধকে সংযত রাখা :
সর্বাবস্থায় রাগ ও ক্রোধকে সংযত রাখতে হবে। কেননা মানুষ যখন কারো প্রতি রাগান্বিত হয়, তখন তার সম্পর্কে এমন সব কথা বলে থাকে যার অধিকাংশই গীবতের অন্তর্ভুক্ত।
২. হিংসা-বিদ্বেষ থেকে দূরে থাকা:
হিংসা-বিদ্বেষ থেকে দূরে থাকতে হবে। কেননা হিংসা-বিদ্বেষের কারণেই মানুষ একে অপরকে ঘৃণার চোখে দেখে। আর যখন একে অপরের সাথে খারাপ মনোভাব তৈরি হয়, তখনই মানুষ গীবতে লিপ্ত হয়। অতএব আমাদের উচিত গীবতকে পরিহার করার জন্য হিংসা-বিদ্বেষ থেকে নিজেকে দূরে রাখা।
৩. অহংকার থেকে বিরত থাকা :
অহংকার থেকে বিরত থাকতে হবে এবং আল্লাহর কাছে তওবা করতে হবে। কেননা আগুন যেমনিভাবে কাঠকে খেয়ে ফেলে ঠিক তেমনিভাবে অহংকার মানুষকে ধ্বংস করে দেয়। অহংকারের কারণে মানুষ অপরকে তুচ্ছ জ্ঞান করে এবং গীবতে জড়িয়ে পড়ে।
৪. অপরকে তুচ্ছ না ভাবা :
নিজেকে আল্লাহর নগণ্য বান্দা ভাবতে হবে এবং অপরকে বড় হিসেবে দেখতে হবে। কেননা নিজেকে বড় ভাবা এবং অপরকে ছোট ভাবা থেকে অনেক সময় গীবত হয়ে থাকে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, “হে ঈমানদারগণ, কেউ যেন অপর কাউকে উপহাস না করে, কেননা সে উপহাসকারী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে এবং কোন নারী অপর নারীকেও যেন উপহাস না করে। কেননা সে উপহাসকারিণী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হতে পারে।” (সূরা হুজরাত- ১১)
৫. অহেতুক ঠাট্টা-বিদ্রূপ না করা:
কারো কোন বিষয়কে কেন্দ্র করে ঠাট্টা, উপহাস করা থেকে দূরে থাকতে হবে। বন্ধু-বান্ধব বা অন্য কারো সাথে হাসি-ঠাট্টা করতে গিয়েও লক্ষ্য রাখতে হবে যে, আমি যে বিষয় নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করছি তা গীবতের মধ্যে পড়ছে কি না। যদি তা গীবতের অন্তর্ভুক্ত হয় তবে তা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে হবে এবং যারা এসব করছে তাদেরকেও তা থেকে বিরত থাকার জন্য উপদেশ দিতে হবে। এভাবে নিজেকেও গীবত থেকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে এবং নিজের কর্ণকেও গীবত থেকে বিরত রাখা যাবে। এ রকম চলতে থাকলে একসময় গীবত বা দোষচর্চা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ইন্শা আল্লাহ!
৬. যার দোষ তাকেই বলা :
কারো কোন ভুল-ত্রুটি হতে দেখলে সাহস করে দ্রুত তাকে তা জানাতে হবে যাতে করে সে নিজেকে সংশোধন করে নিতে পারে।
৭. অনর্থক কথা বলা থেকে বিরত থাকা :
বেহুদা কথা ও অযথা সময় নষ্ট করা থেকেই গীবতের সূত্রপাত। তাই গীবত বা পর দোষচর্চার মত মারাত্মক অপরাধ থেকে বাঁচার জন্য বেহুদা কথা ও অযথা সময় নষ্ট করা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা বলা থেকে যতটা সম্ভব নিজেকে বিরত রাখতে হবে। যে সময়টুকু অবসর পাওয়া যায় সে সময়টুকু আল্লাহর যিকিরে কাটানোর চেষ্টা করতে হবে। তাহলে দেখা যাবে এর দ্বারা একদিকে নিজেকে গীবত থেকে বিরত রাখা যাবে, আবার অপরদিকে আল্লাহর যিকির করার কারণে অসংখ্য সওয়াবও অর্জিত হবে।
৮. গীবত সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান অর্জন করা :
কুরআন-হাদীস ও ইসলামী বই-পুস্তক নিয়মিত পাঠ করতে হবে, যাতে করে কোনটা গীবত আর কোনটা গীবত না তা যথাযথভাবে নির্ণয় করা যায় এবং এর মাধ্যমে আল্লাহর ভয় মনে জাগ্রত করে গীবতের মত বড় অপরাধ থেকে বেঁচে থাকার ব্যাপারে সাহায্য পাওয়া যায়।
৯. আত্মপ্রশংসা থেকে বিরত থাকা :
আত্মপ্রশংসা না করে নিজের অসংখ্য ভুলের বা গুনাহের কথা স্মরণ করে বার বার তাওবা করতে হবে।
১০. প্রতিটি কথা রেকর্ড হয় এ কথা মনে রাখা :
মনে রাখতে হবে যে, আমরা যাই বলিনা কেন তা আল্লাহর ফেরেশতারা যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। আর এ জন্য আমাদেরকে আল্লাহর নিকট হিসাব দিতে হবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
إِذْ يَتَلَقَّى الْمُتَلَقِّيَانِ عَنِ الْيَمِينِ وَعَنِ الشِّمَالِ قَعِيدٌ - مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ
"স্মরণ রেখো! দুই ফেরেশতা তার ডানে ও বামে বসে তার কর্ম লিপিবদ্ধ করে। মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে তা লিপিবদ্ধ করার জন্য অতন্দ্র প্রহরী তার নিকটেই রয়েছে।” (সূরা কাফ- ১৭, ১৮)
১১. কথা কম বলা ও চিন্তা-গবেষণা বেশি করা :
কথা কম বলে চিন্তা-গবেষণা করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে এবং অতিরিক্ত হাসি-তামাশা থেকে দূরে থেকে রাসূলের চরিত্রের অধিকারী হতে হবে।
সেমাক বলেন, আমি জাবির বিন সামুরা কে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি রাসূল ﷺ এর মজলিসে উপস্থিত থাকতেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ! তারপর বললেন, রাসূল ﷺ দীর্ঘক্ষণ চুপ থাকতেন, অল্প হাসতেন, তাঁর সাথীরা কবিতা এবং অন্যান্য আনুসাঙ্গিক বিষয়ে আলোচনাকালীন সময়ে তিনি হাসতেন, তবে মুচকি হাসতেন। (সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী হা: ২১৬৪৮)
সুতরাং যারা রাসূলের উম্মত এবং রাসূল ﷺ কে ভালবাসে ও তাকে অনুসরণ করে তাদের উচিত ভাল কথা বলা, অন্যথায় চুপ থাকা।
১২. কুরআনের সাথে সময় ব্যয় করা :
বেশি বেশি কুরআন তেলাওয়াত করতে হবে। প্রতিদিন বুঝে বুঝে কুরআন পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে এবং যতটুকু সম্ভব মুখস্থ করার চেষ্টা করতে হবে। আবদুল্লাহ ইবনে উমর হতে বর্ণিত, রাসূল ﷺ বলেছেন, কুরআন পাঠকারীকে বলা হবে, পড় যেভাবে দুনিয়াতে তারতিলের সাথে পড়তে। তোমার স্থান শেষ আয়াত পর্যন্ত হবে, যা তুমি পড়েছিলে। যখনই কুরআন শুনতে পাওয়া যাবে তখনই কথা না বলে তা শ্রবণ করা উচিত। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنْصِتُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ
“যখন কুরআন পাঠ করা হয়, তখন তোমরা তা মনোযোগসহকারে শ্রবণ কর এবং চুপ থাক, যাতে করে তোমাদের উপর করুণা বর্ষিত হয়। (সূরা আরাফ- ২০৪)
১৩. যাচাই বাছাই করে কথা বলা :
আমাদের নিকট শুনা বা লিখিতভাবে যেসব খবর পৌঁছে থাকে তা যথাযথভাবে যাচাই বাছাই করে বৈধ পন্থায় অপরের কাছে বলার এবং পৌঁছানোর চেষ্টা করতে হবে। কেননা এতে মিথ্যা কথা হওয়ার আশংকা রয়েছে। আবু হুরায়রা হতে বর্ণিত, রাসূল ﷺ বলেন-
كَفَى بِالْمَرْءِ كَذِبًا أَنْ يُحَدِّثَ بِكُلِّ مَا سَمِعَ
“কোন ব্যক্তির মিথ্যুক হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শুনে তা-ই প্রচার করে।” (মুসলিম হা: ৭)
১৪. গীবত প্রতিহত করা এবং তা শুনা থেকে বিরত থাকা :
যখন কোন ব্যক্তি কারো গীবত শুরু করে তখনই শ্রোতার উচিত হল গীবতকারীকে গীবতের পরিণতির কথা জানিয়ে দেয়া এবং এ থেকে বিরত থাকার উপদেশ দেয়া। যাতে করে গীবত শুনার অপরাধ থেকে নিজেকে বাঁচানো যায়। কেননা কিয়ামতের দিন গীবত শ্রবণের অপরাধেও মানুষকে পাকড়াও করা হবে।