📄 যেসব বিষয়ে গীবত সংঘটিত হয়
যেসব বিষয়কে কেন্দ্র করে মানুষ গীবত বা পরনিন্দায় লিপ্ত হয় তা হল :
১. কারো বংশ নিয়ে সমালোচনা করা:
তুচ্ছ ও হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে কেউ যদি বলে, অমুক ব্যক্তির বংশ ভাল নয় বা অমুক ব্যক্তির গোষ্ঠি খারাপ বা অমুক নীচু বংশের লোক বা অমুক ব্যক্তির বংশের বৈশিষ্ট্যই এরকম তবে তা গীবত হবে। কারণ এভাবে বলার দ্বারা উক্ত বংশ বা গোত্রের সকলকে দোষারূপ করা হয়। আর এভাবে দোষী সাব্যস্ত করাটা ইসলামী শরীয়তে একেবারেই নিষিদ্ধ। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَاثْمًا مُّبِينًا
“নিশ্চয় যারা মুমিন নর-নারীকে এমন ব্যাপারে কষ্ট দেয় যে ব্যাপারে তারা দোষী নয়, তাহলে তারা মিথ্যা অপবাদ ও স্পষ্ট পাপ অর্জন করল।” (সূরা আহযাব : ৫৮)
বংশ নিয়ে গর্ব করা জায়েয নয়। রাসূল ﷺ বলেন-
اثْنَتَانِ فِي النَّاسِ هُمَا بِهِمْ كُفْرُ الطَّعْنُ فِي النَّسَبِ وَالنِّيَاحَةُ عَلَى الْمَيِّتِ
“মানুষের মধ্যে দু'টি কাজ রয়েছে যা কুফরী। একটি হচ্ছে বংশের গর্ব করা। আর অপরটি হচ্ছে মৃত ব্যক্তির জন্য বিলাপ করা।” (মুসলিম হা: ২৩৬)
عَنِ بْنِ عُمَرَ : أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّmَ خَطَبَ النَّاسَ يَوْمَ فَتْحِ مَكَّةَ فَقَالَ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَذْهَبَ عَنْكُمْ عُبِيَّةَ الجَاهِلِيَّةِ وَتَعَامَهَا بِأَبَائِهَا ، فَالنَّاسُ رَجُلَانِ : بَرِّ تَقِي كَرِيمٌ عَلَى اللهِ ، وَفَاجِرٌ شَقِيٌّ هَيِّنٌ عَلَى اللهِ ، وَالنَّاسُ بَنُو أَدَمَ ، وَخَلَقَ اللَّهُ أَدَمَ مِنْ تُرَابٍ ، قَالَ اللهُ : {يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُمْ مِنْ ذَكَرٍ وَأُنْثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ
আবদুল্লাহ ইবনে উমর হতে বর্ণিত, রাসূল ﷺ মক্কা বিজয়ের দিন খুতবা প্রদানকালে বলেছিলেন, “হে লোকসকল! আল্লাহ তা'আলা জাহেলী যুগের সকল গর্ব ও অহংকার দূর করে দিয়েছেন। এখন মানুষ দুই প্রকার- এক প্রকার হচ্ছে সৎ ও পরহেযগার; তারা আল্লাহর কাছে সম্মানিত। আর এক প্রকার হচ্ছে অপরাধী ও হতভাগা। তারা আল্লাহর কাছে ঘৃণিত। আর সকল মানুষ আদম থেকে সৃষ্ট। আর আদমকে আল্লাহ মাটি থেকে বানিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, “হে মানুষ সকল! আমি তোমাদেরকে একই নারী ও পুরুষ থেকে সৃষ্টি করেছি এবং আমি তোমাদেরকে বিভিন্ন গোত্রে ও বংশে বিভক্ত করে দিয়েছি যাতে তোমরা পরিচিতি লাভ করতে পার।” (তিরমিযী হা: ৩২৭০)
দ্বীনদারী ও সৎকর্ম ব্যতীত কোন ব্যক্তির উপর অপর ব্যক্তির শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কাজেই নিজেকে ও নিজের বংশকে উচ্চ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে অপরের বংশের দোষ-ত্রুটি বের করে তা প্রকাশ করা বা অপরের বংশকে গালি দেয়া ইসলামে বৈধ নয়।
ইসলামে সকলেই সমান। প্রত্যেক মুসলমান অপর মুসলামানের ভাই। তাই কেউ কারো উপর প্রাধান্যযোগ্য নয়। কেননা প্রত্যেক মানুষ একই সত্ত্বা থেকে সৃষ্ট। প্রত্যেকেই আদম এর সন্তান। তবুও ইসলাম কোন কোন ব্যক্তিকে প্রাধান্য দিয়েছে, তবে সেটা তাকওয়ার দিক থেকে। যে যত বেশি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে মান্য করবে সে তত বেশি মর্যাদা পাবে। স্বয়ং রাসূল ﷺ নিজ ক্রীতদাস যায়েদের সাথে এমন ব্যবহার করতেন যে, উভয়ের মধ্যে মনিব-ক্রীতদাস সম্পর্ক তা বুঝাই যেত না। যার কারণে সমগ্র আরবের মধ্যে তিনি যায়েদ ইবনে মুহাম্মদ (মুহাম্মদের ছেলে যায়েদ) নামে পরিচিত ছিলেন।
ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন বিলাল একজন হাবশী ক্রীতদাস হওয়া সত্ত্বেও আরবের মুসলিমরা তাকে ঘৃণা না করে নিজেদের ভাই মনে করত। উমর তাকে يَأْسَيِّدِي 'হে আমাদের সরদার' বলে সম্বোধন করতেন।
অনেক সাহাবী ক্রীতদাস ছিলেন। তারা ইসলাম গ্রহণের পর ইসলাম তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেয় এবং সমাজের বংশীয় ভেদাভেদ চিরতরে দূর করে দেয়। ধনী-গরীব, সাদা-কালো সকলের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি করে দেয়। তাই কোন মুমিন ব্যক্তির জন্য উচিত নয় যে, কারো বংশকে নীচু মনে করা এবং নিজের বংশকে বড় মনে করে অহংকার করা।
২. কারো শারীরিক দোষ বর্ণনা করা :
আল্লাহ তা'আলা মানবজাতিকে নানাভাবে নানা আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন। কেউ সাদা, কেউ কালো, কেউ খাটো, কেউ লম্বা, কেউ মোটা, কেউ চিকন ইত্যাদি। আর আল্লাহর সৃষ্টিতে ভুল ধরা কারো জন্য বৈধ নয়। তেমনিভাবে আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে হাসি-তামাশা করাও হারাম। আর যার বৈশিষ্ট্য নিয়ে হাসি-তামাশা করা হচ্ছে সে শুনলে মনে কষ্ট পাবে বলে এটা গীবতের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং কেউ যদি কোন ব্যক্তিকে কানা, খোরা, অন্ধ, বেটে, লম্বো, চিকনা ইত্যাদি বলে সম্বোধন করে; আর এতে যদি সম্বোধিত ব্যক্তি মনে কষ্ট পায় তবে তা গীবত বলে গণ্য হবে। হাদীসে এসেছে-
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ : حَكَيْتُ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَجُلًا . فَقَالَ : مَا يَسُرُّنِي أَنِّي حَكَيْتُ رَجُلًا وَأَنَّ لِي كَذَا وَكَذَا ، قَالَتْ : فَقُلْتُ : يَارَسُولَ اللهِ ، إِنَّ صَفِيَّةَ امْرَاةٌ ، وَقَالَتْ بِيَدِهَا هُكَذَا كَانَهَا تَعْنِي قَصِيرَةً ، فَقَالَ : لَقَدْ مَزَجْتِ بِكَلِمَةٍ لَوْ مَزَجْتِ بِهَا مَاءَ الْبَحْرِ لَمُزِجَ
আয়েশা বলেন, আমি নবী ﷺ এর কাছে এক ব্যক্তি সম্পর্কে মন্তব্য করলাম। তখন নবী ﷺ বললেন, অনেক কিছুর বিনিময়ে হলেও কারো সম্পর্কে খারাপ মন্তব্য করাটা আমাকে আনন্দিত করতে পারবে না। আয়েশা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি সাফিয়ার বেঁটে হওয়াটা অপছন্দ করেন না? তিনি বললেন, হে আয়েশা! তুমি এমন একটি কথা বললে যা নদীর পানির সাথে মিশিয়ে দিলে তার উপরও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। (তিরমিযী হা: ২৫০২)
শারীরিকভাবে মানুষের কিছু দোষ থাকতেই পারে। তাই কারো সেসব দোষ উল্লেখ করে তার মনে কষ্ট দেয়া কোন মুসলমানের কাজ নয়। তার চিন্তা করা উচিত, আমি যে দোষটি নিয়ে তাকে ঠাট্টা করছি তা যদি আমার মাঝে থাকত তবে কেমন হত। তাই নিজের উপর আল্লাহর রহমতের কথা চিন্তা করে তাঁর প্রশংসা করা উচিত।
বর্তমান সমাজে মানুষের বিভিন্ন শারীরিক দোষ-ত্রুটি নিয়ে রসিয়ে আলাপ করা এবং চোখ টিপে হাসাহাসি করাটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তখন এ কথা মনে থাকে না যে, একদিন আমাদেরকে মহান রাব্বুল আলামীনের দরবারে জীবনের প্রতিটি মুহুর্তের হিসাব দিতে হবে। সর্বদা আমলনামা লেখক ফেরেশতারা আমাদের প্রতিটি মুহুর্তের কথা ও কাজের নিখুঁত হিসাব রাখছেন।
৩. দারিদ্র্যতার কারণে কারো সমালোচনা করা :
দারিদ্র্যতার কারণে কোন মুমিনকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করা ও অপরের কাছে বলে বেড়ানো এটাও এক প্রকার গীবত। সমাজে ধনী-গরীব সবধরণের লোক বসবাস করে। অনেক ধনী রয়েছে যারা সমাজের গরীব ব্যক্তিদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করে থাকে। এমনকি তাদের সম্পর্কে নানা ধরণের অহেতুক সমালোচনাও করে থাকে, এটা বৈধ নয়। কেননা দারিদ্র্যতা তো আল্লাহই দিয়েছেন। এর মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা কিছু কিছু বান্দাকে পরীক্ষা করে থাকেন। এ ব্যাপারে দোষ ধরা আল্লাহর সৃষ্টিতে দোষ ধরার শামিল। অপর দিকে ব্যক্তি মনে কষ্ট পাবে বলে এটা গীবতের পর্যায়েও পড়ে। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِّنْ قَوْمٍ عَسَى أَنْ يَكُونُوا خَيْرًا مِنْهُمْ وَلَا نِسَاءٌ مِّنْ نِّسَاءٍ عَسَى أَنْ يَكُنَّ خَيْرًا مِنْهُنَّ
“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের পুরুষেরা যেন অপর পুরুষদের বিদ্রূপ না করে। হতে পারে যে, তারা এদের তুলনায় অনেক ভাল। আর মহিলারাও যেন অপর মহিলাদের বিদ্রূপ না করে। কেননা হতে পারে তারা এদের তুলনায় ভাল।” (সূরা হুজরাত : ১১)
ইসলামের প্রথম যুগের অধিকাংশ মুসলিমই দরিদ্র ছিলেন। তাদেরকে নিয়ে কাফেররা উপহাস করত। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
زُيِّنَ لِلَّذِينَ كَفَرُوا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا وَيَسْخَرُونَ مِنَ الَّذِينَ آمَنُوا وَالَّذِينَ اتَّقَوْا فَوْقَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَاللهُ يَرْزُقُ مَنْ يَشَاءُ بِغَيْرِ حِسَابٍ
“যারা কুফরী করেছে তাদের দুনিয়ার জীবনকে সুশোভিত করা হয়েছে। আর তারা মুমিনদেরকে নিয়ে উপহাস করে থাকে। অথচ মুত্তাক্বীরা কিয়ামতের দিন তাদের উপরে থাকবে। আর আল্লাহ যাকে চান অগণিত রিযিক দান করেন।” (সূরা বাকারা: ২১২)
৪. কারো পোষাক নিয়ে সমালোচনা করা:
প্রত্যেকেই নিজ নিজ সাধ্য ও রুচী অনুযায়ী নানা ধরণের পোষাক পরিধান করে থাকে। এতে কারো পোষাক নিম্ন মানের হয়, আবার কারো পোষাক হয় উচ্চ মানের। এক্ষেত্রে কারো পছন্দের সাথে অপরের পছন্দের মিল থাকে না। তাই কেউ কারো পোষাক সম্পর্কে অসৎ উদ্দেশ্যে সমালোচনা করা উচিত নয়। যেহেতু এ ধরণের আলোচনা মানুষের মনে কষ্ট দেয় তাই এটাও গীবতের মধ্যে গণ্য হবে।
৫. কারো বদভ্যাসের সমালোচনা করা :
সমাজ, পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য কারণে মানুষের মধ্যে রুচি ও অভ্যাস বিভিন্ন রকম হয়, যা অন্যান্যদের কাছে দৃষ্টি কটু মনে হয়। কিন্তু এ নিয়ে গীবত ও দোষচর্চায় লিপ্ত হওয়া আরো গর্হিত অন্যায়। হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে কাউকে তার অনুপস্থিতিতে পেটুক, বাঁচাল, ভীরু, অলস, নির্বোধ, বেয়াদব এসব বলে মন্তব্য করা গীবতের অন্তর্ভুক্ত।
৬. কারো পাপ কাজের সমালোচনা করা:
কারো পাপ কাজ নিয়ে তার অনুপস্থিতিতে সমালোচনা করাও গীবতের অন্তর্ভুক্ত। যেমন, যদি কেউ বলে যে, অমুক ব্যক্তি এই পাপ কাজ করে বেড়ায় বা এই এই খারাপ কাজে অভ্যস্ত; তবে তাও গীবত বলে গণ্য হবে। মানুষ হিসেবে সকলের দ্বারাই কমবেশি পাপ কাজ সংঘটিত হয়ে থাকে। আর তাই পাপের কথা পাপীকে না বলে অন্য মানুষকে বলে বেড়ানো গীবত বলে গণ্য হবে। যারা গীবতের মাধ্যমে এসব পাপকাজ লোক সমাজে ছড়িয়ে দেয় তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন-
إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَنْ تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
“যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে তাদের জন্য রয়েছে দুনিয়া ও আখিরাতে মর্মান্তিক শাস্তি এবং আল্লাহ সবই জানেন; কিন্তু তোমরা জান না।” (সূরা নূর: ১৯)
মুমিন ব্যক্তি পথভ্রষ্ট হওয়ার জন্য তিনটি জিনিসই যথেষ্ট।
১. মানুষের এমন দোষ আলোচনা করা যা তার নিজের মধ্যেও রয়েছে।
২. নিজের দোষ বের না করে মানুষের দোষ খুজে বের করা।
৩. সঙ্গীকে অনর্থক কষ্ট দেয়া।
ইবলিস মানুষের শত্রু হিসেবে সর্বদা মানুষের পরকালের ক্ষতি করার জন্য সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। যখনই সুযোগ পায় তখনই সে মানুষকে নানা ধরণের অপরাধমূলক কাজে লিপ্ত করে থাকে। আর তাই মানুষের দ্বারা হাজার রকম গুনাহের কাজ সংঘটিত হয়। কোন মানুষকে কখনও কোন পাপ কাজে লিপ্ত দেখলে তা অন্যের কাছে না বলে উচিত হল সংশোধনের উদ্দেশ্যে তাকে তার পাপ কাজটি ধরিয়ে দেয়া। যাতে সে পরবর্তীতে এ পাপ কাজে লিপ্ত না হয়।
আরেকটি কথা মনে রাখা দরকার যে, প্রত্যেকের মধ্যেই রয়েছে কিছু না কিছু দোষ। মানুষের গীবত ও দোষচর্চায় আমরা সুখ অনুভব করি অথচ আমাদের নিজেদের মধ্যেই রয়েছে অসংখ্য দোষ-ত্রুটি। নিজেদের দোষ সম্পর্কে গাফেল থাকা আর শুধু পরের দোষ খুঁজতে থাকা নির্বুদ্ধিতার পরিচায়ক।
৮. কারো ইবাদাতের সমালোচনা করা :
ইবাদাতের মধ্যে কমবেশি প্রায় সকলের কোন না কোন ত্রুটি থেকে যায়। তা না জানার কারণেও হতে পারে অথবা অলসতার কারণেও হতে পারে। তাই বলে কারো ইবাদাতের মধ্যে কী কী ভুল-ত্রুটি রয়েছে তা তাকে না জানিয়ে অন্যের সাথে সমালোচনা করে মনে প্রশান্তি লাভের চেষ্টা করা গীবত। সুতরাং কেউ যদি কারো ইবাদাতে কোন ভুল-ত্রুটি দেখতে পায় তাহলে তার কর্তব্য হল, এটা নিয়ে নিজে পাপের সাথে না জড়িয়ে ঐ ব্যক্তিকে সংশোধন করে দেয়া।
১০. অমুসলিমের সমালোচনা করা :
অনেকে মনে করতে পারে শুধুমাত্র মুসলিমদের গীবত করা হারাম। এটি একটি ভুল ধারণা। অমুসলিমদেরও এমন দোষ অপরের কাছে বলে বেড়ানো বৈধ নয় যার ফলে সামাজিক শৃঙ্খলা ব্যহত হয়। তবে ইসলামের স্বার্থে অমুসলিমদের ইসলাম বিরোধী বা সামাজিক শৃঙ্খলা বিবর্জিত কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আলোচনা করা যায়।
১৩. মৃত ব্যক্তির সমালোচনা করা :
জীবিত ব্যক্তিদের গীবত যেমনি হারাম তেমনি কোন মৃত ব্যক্তির দোষচর্চা করাও হারাম। রাসূল ﷺ বিভিন্ন হাদীসে এ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন-
إِذَا مَاتَ صَاحِبُكُمْ فَدَعُوهُ وَلَا تَقَعُوا فِيهِ
“তোমাদের কোন সাথী যখন মারা যায় তখন তাকে ছেড়ে দাও আর তার সমালোচনায় লিপ্ত হয়ো না।” (আবু দাউদ হা- ৪৯০১)
তাছাড়া মানুষের সুস্থ বিবেক-বুদ্ধিও মৃত ব্যক্তির গীবত করাকে সমর্থন করে না। যেমন-
প্রথমত : আমরা মৃতদের গীবত করতে পারি; কিন্তু তারা আমাদের গীবত করতে পারে না। যারা আমাদের গীবত করছে না আমরা কেন তাদের গীবত করব?
দ্বিতীয়ত : মৃত ব্যক্তির দ্বারা আমরা সর্বদা উপকৃত হই। কেননা কবর আমাদেরকে মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। অন্তরে আল্লাহর ভয় জাগ্রত করে। তাই তাদের এ উপকারের প্রতিদানস্বরূপ আমাদেরও উচিত মৃতদের দোষচর্চা না করে তাদের জন্য দো'আ করা।
তৃতীয়ত: মৃত ব্যক্তির গীবত স্বভাবতই তার বন্ধু-বান্ধব ও স্বজনদের মনে কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আর কোন মুসলিমের পক্ষে উচিত নয় অপর মুসলিমকে কষ্ট দেয়া। এটা রাসূল ﷺ নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন-
الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ
“মুসলিম সেই ব্যক্তি যার হাত ও জ্বিহ্বা থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে।” (মুসলিম হা: ১৭১)
📄 যেভাবে গীবত হয়ে থাকে
১. যবানের মাধ্যমে গীবত :
যবানই হচ্ছে গীবত করার সবচেয়ে বড় মাধ্যম। বর্তমান সমাজে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গীবত সংঘটিত হয় এ যবান দ্বারাই। এজন্য নিজেদের যবানের হেফাযত করা প্রতিটি মুমিনের একান্ত কর্তব্য। রাসূল ﷺ বলেন-
مَنْ يَضْمَنْ لِي مَا بَيْنَ لِحْيَيْهِ وَمَا بَيْنَ رِجُلَيْهِ أَضْمَنْ لَهُ الْجَنَّةَ
“যে ব্যক্তি তার দু'পা ও দু'চোয়ালের মধ্যবর্তী স্থানের দায়িত্ব নিতে পারবে অর্থাৎ মুখ ও লজ্জাস্থানের হেফাযত করবে, আমি তার জন্য জান্নাতের যামিনদার হব।” (বুখারী হা: ৬৪৭৪)
অপর হাদীসে তিনি বলেন-
مَنْ صَمَتَ نَجَا
“যে ব্যক্তি চুপ থাকল সে মুক্তি পেল।” (তিরমিযী হা: ২৫০১)
অন্য হাদীসে নবী ﷺ বলেন-
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتُ
“যে আল্লাহ এবং পরকালকে বিশ্বাস করে সে যেন উত্তম কথা বলে অথবা নিরবতা পালন করে।” (বুখারী হা: ৬০১৮, মুসলিম হা: ৪৭)
২. শারীরিক অভিনয়ের মাধ্যমে গীবত করা :
কোন ব্যক্তি যদি অপর কোন ব্যক্তির দোষণীয় অবস্থা বুঝাতে শরীরের কোন অঙ্গ-প্রতঙ্গ ব্যবহার করে, তবে তাও গীবত বলে গণ্য হবে। যেমন কেউ কোন ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে নিজের শরীরের অঙ্গ-প্রতঙ্গ ব্যবহার করে বলল, অমুক ব্যক্তি এ রকম করে হাঁটে বা এভাবে কথা বলে। এরূপ করাটাও গীবত। রাসূল ﷺ বলেছেন-
مَا يَسُرُّنِي أَنِّي حَكَيْتُ رَجُلًا وَأَنَّ لِي كَذَا وَكَذَا
“আমি এত এত সম্পদের বিনিময়ে হলেও অপরের অনুকরণ পছন্দ করি না।” (তিরমিযী হা: ২৫০২)
৩. ইশারা-ইঙ্গিতে গীবত করা :
ইশারা-ইঙ্গিতের মাধ্যমে অন্যের দোষ প্রকাশ করাও গীবত। যে কোন কারণে সরাসরি নাম উল্লেখ না করে যদি এমনভাবে ব্যক্তির দোষ-ত্রুটি প্রকাশ করা হয় যাতে বুঝা যায় যে, সে অমুক ব্যক্তির সমালোচনা করছে তবে তা গীবত বলে গণ্য হবে। যেমন- কাল তার নিকট এই এই স্বভাবের লোক এসেছিল, আর শ্রবণকারী ব্যক্তিও চিনে নিল যে, সে কোন ব্যক্তি; তখন এটাও ঐ ব্যক্তির জন্য গীবত হয়ে যাবে। কোন মুসলমানের জন্য জায়েয নয় যে, সে তার অন্য ভাইয়ের দিকে এমনভাবে ইঙ্গিত করবে যা তাকে কষ্ট দেয়।
৪. অন্তরের মাধ্যমে গীবত করা :
কোন প্রমাণ ছাড়াই সন্দেহ বা অন্য কোন কিছুর ভিত্তিতে কারো সম্পর্কে অহেতুক খারাপ ধারণা করা ইসলামী শরীয়তে হারাম। আল্লাহ তা'আলা মুমিনদেরকে এটা নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা অধিক ধারণা হতে বিরত থাক। নিশ্চয় কতক ধারণা এমন রয়েছে যা গুনাহ।” (সূরা হুজরাত : ১২)
৫. লেখনীর মাধ্যমে :
মানুষের মনের ভাব প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে লেখনী। অনেক সময় এ লেখনীর দ্বারাও গীবত সংঘটিত হয়ে থাকে। লেখনীর দ্বারা যদি কারো দোষ বর্ণনা করা হয় তবে তা ব্যক্তির মনে বড় ধরণের প্রভাব ফেলে। লেখনীর মাধ্যমে যে গীবত করা হয় তার স্থায়িত্ব অনেক বেশি হয়। কেননা লিখিত বস্তু অনেক দিন টিকে থাকে।
৬. কানের মাধ্যমে গীবত করা :
শুধুমাত্র অন্যের দোষ বলে বেড়ানোকেই গীবত বলে না বরং অন্যের দোষ শুনে প্রতিবাদ না করাটাও এক ধরণের গীবত। গীবত করা যেমন গর্হিত কাজ তেমনি তা শ্রবণ করাও গর্হিত কাজ। কেননা গীবত শ্রবণকারী গীবত না শুনলে পাপ সংঘঠিত হত না। তাই দু'জনেই অপরাধি। মুমিনের উচিত কানের হেফাযত করা। কারণ আল্লাহ বান্দার কান সম্পর্কে কিয়ামতের দিন জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। মহান আল্লাহ বলেন-
إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا
“কর্ণ, চক্ষু ও অন্তর এগুলোর প্রত্যেকটির বিষয়ে অবশ্যই জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।” (সূরা বনী ইসরাঈল- ৩৬)
📄 গীবতের ব্যাপারে মহিলাদের সাবধানতা
গীবত হচ্ছে মহিলাদের চারণভূমি। মহিলারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে অধিক হারে গীবতে জড়িয়ে পড়ে। যেমন- যখনই কয়েকজন মহিলা একত্রিত হয়, তখন তারা প্রায়ই সমালোচনা বা গীবতে লিপ্ত হয়ে যায়। তারা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নিয়ে সমালোচনা করে। বিশেষ করে তাদের স্বামীদের ব্যাপারেও তারা নানা মন্তব্য করে থাকে। যেমন- একে অপরকে বলতে থাকে আমার স্বামী এরকম এরকম, আমাকে এটা দিয়েছে ওটা দেয়নি ইত্যাদি ইত্যাদি। এমনকি অনেক মহিলা তাদের স্বামীদের গোপনীয় বিষয় পর্যন্ত বলাবলি করতে লজ্জাবোধ করে না। এ কাজের পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ। স্বামীর অকৃতজ্ঞ হওয়া এবং বেশি বেশি অভিশাপ দেয়া, এটা মহিলাদের জাহান্নামী হওয়ার প্রধান কারণ।
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ ، قَالَ : خَرَجَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي أَضْحَى أَوْ فِطْرٍ - إِلَى الْمُصَلَّى، فَمَرَّ عَلَى النِّسَاءِ فَقَالَ: يَا مَعْشَرَ النِّسَاءِ تَصَدَّقْنَ، فَإِنِّي أُرِيتُكُنَّ أَكْثَرَ أَهْلِ النَّارِ ، فَقُلْنَ : وَبِمَ يَا رَسُولَ اللهِ ؟ قَالَ : تُكْثِرْنَ اللَّعْنَ، وَتَكْفُرْنَ الْعَشِيرَ
আবূ সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ ঈদুল আযহা অথবা ঈদুল ফিতরের দিন ঈদগাহে গেলেন। তিনি মহিলাদের নিকট আগমন করলেন, অতঃপর তাদেরকে সম্বোধন করে বললেন, হে মহিলারা! তোমরা সদকা কর, কারণ তোমাদেরকে সবচেয়ে বেশি জাহান্নামী হিসেবে আমাকে দেখানো হয়েছে। তখন তাঁরা আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! কী কারণে আমাদের এ অবস্থা? নবী ﷺ বললেন, তোমরা বেশি বেশি লানত (অভিশাপ) কর এবং স্বামীদের অকৃজ্ঞতা প্রকাশ কর। (বুখারী হা: ৩০৪)
বর্তমান সময়ে দেখা যায় যে, মহিলা অভিভাবকরা যখন ছেলে-মেয়েদেরকে নিয়ে স্কুলে যায় তখন তারা অনেকে একত্রে জমা হয় এবং তারা গীবতের মত জঘন্য কাজে লিপ্ত হয়ে থাকে। এভাবে তারা জীবনের অনেক মূল্যবান সময়কে গুনাহের কাজে ব্যয় করে থাকে। তাই এক্ষেত্রে মহিলাদের সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। তারা যখন অবসর পায় তখন তাদের উচিত ইসলামী বই-পুস্তক পড়ে দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করা এবং নেক আমলে লিপ্ত থাকা। তাহলে তারা অনেক কল্যাণ লাভ করতে পারবে।
📄 গীবতে লিপ্ত হওয়ার কারণ
গীবত মূলত শয়তানের ওয়াসওয়াসা। এ কারণে মানুষ অনিচ্ছায় গীবতে লিপ্ত হয়। কিন্তু খুব কম লোকই তা ধরতে পারে। তাছাড়া মানুষ সাধারণভাবে যেসব কারণে গীবতে লিপ্ত হয়ে থাকে তা হল :
১. ক্রোধের কারণে:
গীবতের সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে ক্রোধ। মানুষ যখন কোন কারণে কারো উপর রাগান্বিত হয় তখনই তার গীবত শুরু করে দেয়। কোন ব্যক্তি অপর ব্যক্তির প্রতি রুষ্ট হলে উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে মনের ঝাল মিটানোর জন্য অপরের দোষচর্চা করে থাকে।
২. শত্রুতার কারণে :
শত্রুতা হচ্ছে গীবত সংঘটিত হওয়ার অন্যতম কারণ। যখন কেউ কারো উপর শত্রুতা পোষণ করে তখনই সে তার শত্রুর গীবতে লিপ্ত হয়।
৩. কাউকে অপমান করার জন্য :
যখন কোন ব্যক্তি কারো উপর নাখোশ হয় তখনই তাকে সে অপমান করার ইচ্ছা পোষণ করে। কোন ব্যক্তিকে অপমান করার উদ্দেশ্যে মানুষ গীবতে লিপ্ত হয়ে পড়ে।
৪. কথার তাল মিলানোর জন্য :
কাউকে গীবত করতে দেখলে অনেক সময় কথার তাল মিলাতে গিয়ে অন্যরাও গীবতে লিপ্ত হয়ে পড়ে।
৫. অহংকার ও আত্মগর্বের কারণে :
গীবতের আরেকটি বড় উৎস হচ্ছে গর্ব ও অহংকার। অহংকারের কারণেই মানুষ নিজেকে বড় ও অন্যকে ছোট ভাবতে শুরু করে। নিজের সব কিছুকেই মনে করে গুণ, আর অন্যের সবকিছুই মনে করে দোষ। যেমন কারো এ কথা বলা যে, অমুক ব্যক্তি একবারেই মূর্খ, তার কোন বোধশক্তি নেই। এ কথার দ্বারা সে বুঝাতে চায় যে, সেই সত্যিকারের জ্ঞানী এবং অন্যরা খুব কমই জ্ঞাত। এভাবে ব্যক্তি নিজের এহেন অহংকার ও আত্মগর্বের কারণে গীবতের মত নিকৃষ্ট কাজে জড়িয়ে পড়ে।
৬. হিংসার কারণে :
হিংসার কারণেও মানুষ গীবত করে থাকে। কোন ব্যক্তির মধ্যে যখন কোন ভাল গুণ থাকে এবং এর মাধ্যমে সে সমাজে খ্যাতি লাভ করে তখন তার হিংসুকরা তার সমালোচনা শুরু করে দেয়।
৯. হাসি-তামাশা ও ঠাট্টাচ্ছলে :
হাসি-তামাশা ও ঠাট্টাচ্ছলে মানুষ গীবতে লিপ্ত হতে পারে। তবে সময় কাটানোই এর মূল লক্ষ্য হয়ে থাকে।
১০. অন্যের কাজকে খারাপ মনে করার কারণে :
অন্যের কোন কাজ খারাপ লাগলে মানুষ ঐ কাজের সমালোচানা করতে গিয়ে গীবতে লিপ্ত হয়ে পড়ে।
১১. পার্থিব সম্মান লাভের আশায় :
কারো কাছে প্রিয় পাত্র হওয়ার জন্যও মানুষ অনেক সময় অন্যের গীবতে লিপ্ত হয়ে থাকে।