📄 গীবতের সংজ্ঞা
اَلْغِيبَةُ শব্দটি আরবি। غیب মূল অক্ষর থেকে এর উৎপত্তি। غ বর্ণে যবর দিয়ে পড়লে এর অর্থ হয়, লুকিয়ে যাওয়া, অনুপস্থিত থাকা ইত্যাদি। আর غ বর্ণে যের দিয়ে পড়লে এর অর্থ হয়- পরনিন্দা করা, পরের দোষ চর্চা করা, কুৎসা রটানো ইত্যাদি।
যেহেতু গীবত সম্পর্কিত আলোচনা অনুপস্থিত ব্যক্তি সম্পর্কে করা হয় তাই উক্ত আলোচনাকে গীবত বলে। আর গীবত দ্বারা পরের সমালোচনা করা হয় বিধায় তাকে পরনিন্দাও বলা হয়।
বিখ্যাত আরবি অভিধান কামুসে বলা হয়েছে-
غَابَهُ أَيْ عَابَهُ وَذَكَرَهُ بِمَا فِيهِ مِنَ السُّوءِ
“কেউ কারো গীবত করল, তার মানে তার দোষ আলোচনা করল, তার মধ্যে যে সকল মন্দ অভ্যাস রয়েছে তা বর্ণনা করল।”
গীবতের পরিচয় সংক্রান্ত হাদীস :
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ « اَتَدْرُونَ مَا الْغِيْبَةُ ». قَالُوا اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ . قَالَ « ذِكْرُكَ أَخَاكَ بِمَا يَكْرَهُ » . قِيلَ أَفَرَأَيْتَ إِنْ كَانَ فِي أَخِي مَا أَقُولُ قَالَ « إِنْ كَانَ فِيْهِ مَا تَقُوْلُ فَقَدِ اغْتَبْتَهُ وَإِنْ لَمْ يَكُنْ فِيْهِ فَقَدْ بَهَتَهُ »
আবূ হুরায়রা হতে বর্ণিত, রাসূল ﷺ উপস্থিত সাহাবাগণকে লক্ষ্য করে বললেন, তোমরা কি জানো গীবত কী? সাহাবাগণ উত্তরে বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। রাসূল ﷺ বললেন, “গীবত হল তোমার ভাই সম্পর্কে এমন কথা বলা যা সে অপছন্দ করে। জিজ্ঞেস করা হল, আমি যা বলি তা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে বিদ্যমান থাকে, তাহলে এটাও কি গীবত হবে? রাসূল ﷺ বললেন, তুমি যা বল তা যদি তার মধ্যে বিদ্যমান থাকে তাহলে সেটাই গীবত। আর তুমি যা বল তা যদি তার মধ্যে না থাকে, তাহলে সেটা হবে তোহমাত। অর্থাৎ মিথ্যা অপবাদ।” (মুসলিম হা: ৬৭৫৮, তিরমিযী হা: ১৮৮৪, মেশকাত হা: ৪৬১৭)
এখানে 'ভাই' শব্দটি উল্লেখ করার বিশেষ তাৎপর্য এই যে, মানুষ সাধারণত আপন ভাইয়ের দোষ অন্য কারো কাছে প্রকাশ করে না; বরং যথাসম্ভব তা গোপন রাখতে চেষ্টা করে। তদ্রূপ অন্য মানুষের গীবত ও দোষচর্চা করাও উচিত নয়। কেননা ইসলামের সূত্রে সকলেই ভাই ভাই।
ইমাম নববী (রহ.) বলেন-
ذِكْرُ الْمَرْءِ بِمَا يَكْرَهُهُ سَوَاءٌ ذَكَرْتَهُ بِاللَّفْظِ أَوْ بِالْإِشَارَةِ وَالرَّمْنِ
“গীবত হল কোন ব্যক্তিকে এমনভাবে উল্লেখ করা যা সে অপছন্দ করে, চাই তা প্রকাশ্যে হোক বা ইশারা-ইংঙ্গিতে হোক।”
ইমাম রাগিব (রহ.) বলেন-
هِيَ أَنْ يَذْكُرَ الْإِنْسَانُ عَيْبَ غَيْرِهِ مِنْ غَيْرِ مَحُوجٍ إِلَى ذِكْرِ ذَلِكَ
“গীবত হল বিনা প্রয়োজনে কোন ব্যক্তির দোষ বর্ণনা করা।”
📄 গীবত সম্পর্কে ভুল ধারণা
প্রচলিত সমাজে যদি কাউকে এ কথা বলে যে, তুমি অমুকের গীবত করছ কেন? তখন সে বলে, আমি যা বলছি তাতো সকলেই জানে। এমন তো নয় যে, আমি বলার কারণেই মানুষ জানতে পারছে। অতএব এটা গীবত হবে কেন?
এভাবে অনেকেই গীবত সম্পর্কে ভুল ধারণা করে থাকে। আবার অনেকেই গীবতকে নিজেদের মনমত সংজ্ঞায়িত করে থাকে। অথচ প্রকৃতপক্ষে সেগুলোও গীবতের অন্তর্ভুক্ত। যেমন-
১. কেউ বলে, যে দোষ ব্যক্তির সামনে বলা যায় তা গীবত নয়।
২. কেউ বলে, নিজের অধীনে যারা আছে তাদের দোষচর্চা গীবত নয়।
৩. কেউ বলে, যে দোষ ব্যক্তির মাঝে আছে তা বলা গীবত নয়।
এভাবে গীবতকে সংজ্ঞায়িত করা কু-প্রবৃত্তি ছাড়া আর কিছু নয়। তারা এগুলো বলে থাকে শুধুমাত্র নিজেদের মনের ধারণা অনুযায়ী, অথচ ধারণা দ্বারা সঠিক জ্ঞান লাভ হয় না। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
وَإِنَّ الظَّنَّ لَا يُغْنِي مِنَ الْحَقِّ شَيْئًا
“ধারণা দ্বারা সঠিক জ্ঞান অর্জিত হয় না (প্রকৃত অবস্থা জানা যায় না)।” (সূরা নজম- ২৮)
মোটকথা, বিনা প্রয়োজনে কোন ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার এমন দোষ-ত্রুটি বর্ণনা করা যা শুনলে সে অসন্তুষ্ট হবে, তাকেই শরীয়তের পরিভাষায় গীবত বা পরনিন্দা বলে। এটা বিভিন্নভাবে হতে পারে। যেমন, মুখের দ্বারা, লেখনির দ্বারা, অঙ্গ-প্রতঙ্গের দ্বারা। আবার এটা মুসলিম-অমুসলিম যে কারো ব্যাপারে হতে পারে। যদি বর্ণিত দোষগুলো ব্যক্তির মধ্যে বিদ্যমান থাকে তবে তা গীবত হবে, আর যদি তা ব্যক্তির মধ্যে বিদ্যমান না থাকে তবে তা হবে অপবাদ। সুতরাং জায়েয ক্ষেত্র ছাড়া কারো যেকোন প্রকারের দোষ অপরের কাছে বর্ণনা করা থেকে বিরত থাকা কর্তব্য।
📄 যেসব সমালোচনা গীবত নয়
যদি সৎ ও শরীয়তসম্মত উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে কারো অনুপস্থিতিতে তার সমালোচনা করা জরুরী হয়ে যায় তবে তা গীবত হবে না। যেমন :
১. যালিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা :
মাযলুম ব্যক্তি যালিমের বিরুদ্ধে দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, বিচারক বা এমনসব ব্যক্তির কাছে অভিযোগ উপস্থাপন করতে পারবে যারা যালিমকে দমন করার শক্তি এবং মাযলুমের প্রতি ন্যায়বিচার করার ক্ষমতা রাখেন। সুবিচার লাভের উদ্দেশ্যে শাসকদের কাছে অধিনস্ত কর্মচারির বিরুদ্ধে অভিযোগ করার অনুমতি রয়েছে। এটা গীবত হবে না। কেননা এরূপ ক্ষেত্রে নিশ্চুপ থেকে যুলুম মেনে নিলে নিজের হক তো নষ্ট হবেই তাছাড়া যালিমকে প্রশ্রয় দেয়ার ফলে যুলুমও বৃদ্ধি পাবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
لَا يُحِبُّ اللَّهُ الْجَهْرَ بِالسُّوءِ مِنَ الْقَوْلِ إِلَّا مَنْ ظُلِمَ وَكَانَ اللَّهُ سَمِيعًا عَلِيمًا
“আল্লাহ কারো দোষ প্রকাশ করে দেয়া পছন্দ করেন না, তবে মাযলুম ব্যক্তি ছাড়া। (সুবিচার লাভের প্রত্যাশায় তার জন্য অত্যাচারের অভিযোগ তুলে ধরার অবকাশ রয়েছে।) আর আল্লাহ সবকিছু দেখেন এবং সবকিছু জানেন।" (সূরা নিসা- ১৪৮)
২. ইসলাম বিরোধী কার্যকলাপ প্রতিরোধ করা:
ইসলাম বিরোধী কার্যকলাপ প্রতিরোধ এবং গুনাহের কাজের সুযোগ বন্ধ করার জন্য সহযোগিতা পাওয়ার উদ্দেশ্যে পরস্পর আলোচনা করা গীবত নয়। যার দ্বারা আল্লাহদ্রোহী কার্যকলাপ সংঘটিত হওয়ার আশংকা রয়েছে তার বিরুদ্ধে এভাবে বলা যে, অমুক ব্যক্তি এমন এমন কাজ করছে। তাকে শাসন করা প্রয়োজন। তবে এর উদ্দেশ্য হবে শুধুমাত্র অবৈধ কার্যকলাপ প্রতিরোধ করা।
৩. কোন বিষয়ে ফতওয়া চাওয়া :
যিনি ফতওয়া দেয়ার ক্ষমতা রাখেন তার কাছে কোন বিষয়ের সমাধানের উদ্দেশ্যে কারো দোষ বর্ণনা করা বৈধ। এক্ষেত্রে সর্বোত্তম উপায় হল কারো নাম উল্লেখ না করে এভাবে বলা যে, কোন ব্যক্তি বা কোন স্বামী যদি এমন আচরণ করে তাহলে তার ব্যাপারে ইসলামের সমাধান কী? এভাবে কাউকে নির্দিষ্ট না করেই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। তবে কাউকে চিহ্নিত করা জরুরি হলে সে ব্যক্তির নাম উল্লেখ করাও জায়েয।
৪. মুসলমানকে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া থেকে বাঁচানো:
কোন মুসলমানকে ক্ষতি থেকে বাঁচানোর জন্য কারো প্রকৃত অবস্থা বর্ণনা করা গীবত নয়। যেমন, বিয়ের ব্যাপারে, কোন বিষয়ে অংশীদার হওয়ার ব্যাপারে, আমানত ও লেনদেনের ব্যাপারে কিংবা কাউকে প্রতিবেশী বানানোর ব্যাপারে অন্য পক্ষের খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করা হলে তার কর্তব্য হল তাকে সঠিক কথা বলে দেয়া। এক্ষেত্রে যদি সে অন্য পক্ষের দোষ-ত্রুটি গোপন রাখে তবে অপর মুসলিম ভাই ক্ষতির সম্মুখীন হবে। ফাতেমা বিনতে কায়েস নবী ﷺ এর নিকট এসে পরামর্শ চেয়ে বললেন, আবু জাহাম ও মুয়াবিয়া উভয়ে আমাকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছে। তখন নবী ﷺ বললেন, নিশ্চয় মুয়াবিয়া তোমাকে কষ্ট দেবে, তার কোন মাল নেই। আর আবু জাহামের হাত থেকে কখনো লাঠি নামে না। (মুসলিম হা: ৩৭৮৫)
অনুরূপভাবে কোন লোককে কোন বিষয়ের যিম্মাদার বা দায়িত্বশীল বানানো হলে তার কর্তব্য হল সে দায়িত্ব যথাযথ পালন করা। কোন লোক যদি দায়িত্ব পালনে গড়িমসি করে অথবা সে ঐ পদের উপযুক্ত না হয় অথবা সে ফাসিক বা অলস হয় তবে কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়টি অবহিত করা জরুরি, যাতে তারা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে কিংবা অন্য কোন যোগ্য লোককে দায়িত্ব দিতে পারে।
৫. হাদীস যাচাই করার জন্য বর্ণনাকারীদের সমালোচনা করা :
হাদীসের রাবী বা বর্ণনাকারীদের যেসব দোষ-ত্রুটি আছে তা যাচাই করা জরুরি। এটা শুধু জায়েযই নয়, বরং বিশেষ প্রয়োজন। কেননা এর মধ্যে মুসলমানদের বৃহত্তম স্বার্থ রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا
“হে ঈমানদারগণ! কোন ফাসিক ব্যক্তি যদি তোমাদের নিকট কোন খবর নিয়ে আসে তবে তার সত্যতা যাচাই করে নাও।” (সূরা হুজরাত- ৬)
এ আয়াত দ্বারা এ কথা প্রমাণিত হয় যে, কোন ফাসিক ব্যক্তি যদি কোন সংবাদ নিয়ে আসে তবে তা গ্রহণের পূর্বে সে খবরের সত্যতা কতটুকু তা যাচাই করতে হবে। যেন সে অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণের পর কোন বিপদে না পড়তে হয়। তাই দ্বীনের হেফাযতের উদ্দেশ্যে মুহাদ্দিসগণ হাদীসের রাবীদের দোষ-ত্রুটি পর্যালোচনা করে যয়ীফ ও জাল হাদীস থেকে সহীহ হাদীস বাছাই করে থাকেন।
৬. প্রকাশ্য ফাসিক ও বিদআতীর সমালোচনা করা :
যদি কোন ব্যক্তি প্রকাশ্যে ফাসিকী ও বিদআতী কাজকর্ম করে বেড়ায় যেমন, প্রকাশ্যে মদ পান করে, মানুষের উপর যুলুম করে, কারো ধন-সম্পদ। জোরপূর্বক আত্মসাৎ করে বা অবৈধ কার্যকলাপে লিপ্ত হয় তবে ঐ ব্যক্তির কার্যকলাপের সমালোচনা করা যাবে, যাতে লোকজন সতর্ক হতে পারে। বিদআত ইসলামে একটি হারাম কাজ। রাসূল ﷺ বলেন-
مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدُّ
“যে ব্যক্তি এমন কোন আমল করবে যার উপর আমাদের সমর্থন নেই তা পরিত্যাজ্য।” (বুখারী, মুসলিম হা: ৪৫৯০)
অতএব বিদআতীদের ডাকে সাড়া দেয়া উচিত নয়। আর জনসাধারণ যাতে বিদআতীদের দ্বারা প্রতারিত না হয় সেজন্য প্রত্যেক বিদআতীকে চিহ্নিত করে দেয়া উচিত।
৭. পরিচয় দেয়া :
কোন ব্যক্তির বিশেষ উপাধি বা কোন শারীরিক ত্রুটির উল্লেখ করে তার পরিচয় দেয়া জায়েয। তবে অপমান বা অসম্মান করার উদ্দেশ্যে এসব শব্দ ব্যবহার করা হারাম। এসব ত্রুটি উল্লেখ ছাড়া অন্য কোনভাবে পরিচয় করিয়ে দিতে পারলে সেটাই উত্তম। কিন্তু সম্বোধিত ব্যক্তি যদি মনে কষ্ট না নেয় এবং সে এ নামেই সমাজে পরিচিত হয় তবে তাকে ঐ নামে পরিচয় দেয়া জায়েয রয়েছে।
৮. যালিম সরকারের সমালোচনা করা :
সরকারকে দায়িত্ব দেয়া হয় দেশ সুষ্ঠভাবে পরিচালনা করার জন্য। কিন্তু সরকার যদি তা সুষ্ঠভাবে পরিচালনা না করে জনসাধারণের উপর যুলুম বা অত্যাচার শুরু করে দেয় তবে সে সরকারের সমালোচনা করাতে দোষ নেই। কারণ সরকারের সাথে সকলের স্বার্থ জড়িত। সরকার যখন জনগণের উপর যুলুম শুরু করে দেয় তখন সরকারের যুলুমের কথা জনগণের মাঝে তুলে ধরা বৈধ।
৯. সংশোধনের উদ্দেশ্যে :
রাসূল ﷺ বলেন-
الدِّينُ النَّصِيحَةُ
“দ্বীন হচ্ছে একে অপরের কল্যাণ কামনা করা।” (মসলিম হা: ২০৫)
এক মুসলিম অপর মুসলিম ব্যক্তিকে ভুল করতে দেখলে তাকে সংশোধন করার দায়িত্ব তারই। কারো দোষ এমন ব্যক্তির নিকট প্রকাশ করার অনুমতি রয়েছে যার দ্বারা উক্ত ব্যক্তিকে সংশোধন করা যায়। যেমন, সন্তানের কোন দোষ পিতা-মাতার কর্ণগোচর করা, ছাত্রের দোষ শিক্ষকের কাছে প্রকাশ করা ইত্যাদি। এটা উক্ত ব্যক্তিকে হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে নয় বরং তার কল্যাণ কামনাই মুখ্য উদ্দেশ্য।
এসব ক্ষেত্র ব্যতীত পরনিন্দা করা থেকে প্রত্যেক মুসলিমের অবশ্যই বিরত থাকতে হবে।
📄 যেসব বিষয়ে গীবত সংঘটিত হয়
যেসব বিষয়কে কেন্দ্র করে মানুষ গীবত বা পরনিন্দায় লিপ্ত হয় তা হল :
১. কারো বংশ নিয়ে সমালোচনা করা:
তুচ্ছ ও হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে কেউ যদি বলে, অমুক ব্যক্তির বংশ ভাল নয় বা অমুক ব্যক্তির গোষ্ঠি খারাপ বা অমুক নীচু বংশের লোক বা অমুক ব্যক্তির বংশের বৈশিষ্ট্যই এরকম তবে তা গীবত হবে। কারণ এভাবে বলার দ্বারা উক্ত বংশ বা গোত্রের সকলকে দোষারূপ করা হয়। আর এভাবে দোষী সাব্যস্ত করাটা ইসলামী শরীয়তে একেবারেই নিষিদ্ধ। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَاثْمًا مُّبِينًا
“নিশ্চয় যারা মুমিন নর-নারীকে এমন ব্যাপারে কষ্ট দেয় যে ব্যাপারে তারা দোষী নয়, তাহলে তারা মিথ্যা অপবাদ ও স্পষ্ট পাপ অর্জন করল।” (সূরা আহযাব : ৫৮)
বংশ নিয়ে গর্ব করা জায়েয নয়। রাসূল ﷺ বলেন-
اثْنَتَانِ فِي النَّاسِ هُمَا بِهِمْ كُفْرُ الطَّعْنُ فِي النَّسَبِ وَالنِّيَاحَةُ عَلَى الْمَيِّتِ
“মানুষের মধ্যে দু'টি কাজ রয়েছে যা কুফরী। একটি হচ্ছে বংশের গর্ব করা। আর অপরটি হচ্ছে মৃত ব্যক্তির জন্য বিলাপ করা।” (মুসলিম হা: ২৩৬)
عَنِ بْنِ عُمَرَ : أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّmَ خَطَبَ النَّاسَ يَوْمَ فَتْحِ مَكَّةَ فَقَالَ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَذْهَبَ عَنْكُمْ عُبِيَّةَ الجَاهِلِيَّةِ وَتَعَامَهَا بِأَبَائِهَا ، فَالنَّاسُ رَجُلَانِ : بَرِّ تَقِي كَرِيمٌ عَلَى اللهِ ، وَفَاجِرٌ شَقِيٌّ هَيِّنٌ عَلَى اللهِ ، وَالنَّاسُ بَنُو أَدَمَ ، وَخَلَقَ اللَّهُ أَدَمَ مِنْ تُرَابٍ ، قَالَ اللهُ : {يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُمْ مِنْ ذَكَرٍ وَأُنْثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ
আবদুল্লাহ ইবনে উমর হতে বর্ণিত, রাসূল ﷺ মক্কা বিজয়ের দিন খুতবা প্রদানকালে বলেছিলেন, “হে লোকসকল! আল্লাহ তা'আলা জাহেলী যুগের সকল গর্ব ও অহংকার দূর করে দিয়েছেন। এখন মানুষ দুই প্রকার- এক প্রকার হচ্ছে সৎ ও পরহেযগার; তারা আল্লাহর কাছে সম্মানিত। আর এক প্রকার হচ্ছে অপরাধী ও হতভাগা। তারা আল্লাহর কাছে ঘৃণিত। আর সকল মানুষ আদম থেকে সৃষ্ট। আর আদমকে আল্লাহ মাটি থেকে বানিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন, “হে মানুষ সকল! আমি তোমাদেরকে একই নারী ও পুরুষ থেকে সৃষ্টি করেছি এবং আমি তোমাদেরকে বিভিন্ন গোত্রে ও বংশে বিভক্ত করে দিয়েছি যাতে তোমরা পরিচিতি লাভ করতে পার।” (তিরমিযী হা: ৩২৭০)
দ্বীনদারী ও সৎকর্ম ব্যতীত কোন ব্যক্তির উপর অপর ব্যক্তির শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কাজেই নিজেকে ও নিজের বংশকে উচ্চ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে অপরের বংশের দোষ-ত্রুটি বের করে তা প্রকাশ করা বা অপরের বংশকে গালি দেয়া ইসলামে বৈধ নয়।
ইসলামে সকলেই সমান। প্রত্যেক মুসলমান অপর মুসলামানের ভাই। তাই কেউ কারো উপর প্রাধান্যযোগ্য নয়। কেননা প্রত্যেক মানুষ একই সত্ত্বা থেকে সৃষ্ট। প্রত্যেকেই আদম এর সন্তান। তবুও ইসলাম কোন কোন ব্যক্তিকে প্রাধান্য দিয়েছে, তবে সেটা তাকওয়ার দিক থেকে। যে যত বেশি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে মান্য করবে সে তত বেশি মর্যাদা পাবে। স্বয়ং রাসূল ﷺ নিজ ক্রীতদাস যায়েদের সাথে এমন ব্যবহার করতেন যে, উভয়ের মধ্যে মনিব-ক্রীতদাস সম্পর্ক তা বুঝাই যেত না। যার কারণে সমগ্র আরবের মধ্যে তিনি যায়েদ ইবনে মুহাম্মদ (মুহাম্মদের ছেলে যায়েদ) নামে পরিচিত ছিলেন।
ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন বিলাল একজন হাবশী ক্রীতদাস হওয়া সত্ত্বেও আরবের মুসলিমরা তাকে ঘৃণা না করে নিজেদের ভাই মনে করত। উমর তাকে يَأْسَيِّدِي 'হে আমাদের সরদার' বলে সম্বোধন করতেন।
অনেক সাহাবী ক্রীতদাস ছিলেন। তারা ইসলাম গ্রহণের পর ইসলাম তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেয় এবং সমাজের বংশীয় ভেদাভেদ চিরতরে দূর করে দেয়। ধনী-গরীব, সাদা-কালো সকলের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি করে দেয়। তাই কোন মুমিন ব্যক্তির জন্য উচিত নয় যে, কারো বংশকে নীচু মনে করা এবং নিজের বংশকে বড় মনে করে অহংকার করা।
২. কারো শারীরিক দোষ বর্ণনা করা :
আল্লাহ তা'আলা মানবজাতিকে নানাভাবে নানা আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন। কেউ সাদা, কেউ কালো, কেউ খাটো, কেউ লম্বা, কেউ মোটা, কেউ চিকন ইত্যাদি। আর আল্লাহর সৃষ্টিতে ভুল ধরা কারো জন্য বৈধ নয়। তেমনিভাবে আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে হাসি-তামাশা করাও হারাম। আর যার বৈশিষ্ট্য নিয়ে হাসি-তামাশা করা হচ্ছে সে শুনলে মনে কষ্ট পাবে বলে এটা গীবতের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং কেউ যদি কোন ব্যক্তিকে কানা, খোরা, অন্ধ, বেটে, লম্বো, চিকনা ইত্যাদি বলে সম্বোধন করে; আর এতে যদি সম্বোধিত ব্যক্তি মনে কষ্ট পায় তবে তা গীবত বলে গণ্য হবে। হাদীসে এসেছে-
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ : حَكَيْتُ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَجُلًا . فَقَالَ : مَا يَسُرُّنِي أَنِّي حَكَيْتُ رَجُلًا وَأَنَّ لِي كَذَا وَكَذَا ، قَالَتْ : فَقُلْتُ : يَارَسُولَ اللهِ ، إِنَّ صَفِيَّةَ امْرَاةٌ ، وَقَالَتْ بِيَدِهَا هُكَذَا كَانَهَا تَعْنِي قَصِيرَةً ، فَقَالَ : لَقَدْ مَزَجْتِ بِكَلِمَةٍ لَوْ مَزَجْتِ بِهَا مَاءَ الْبَحْرِ لَمُزِجَ
আয়েশা বলেন, আমি নবী ﷺ এর কাছে এক ব্যক্তি সম্পর্কে মন্তব্য করলাম। তখন নবী ﷺ বললেন, অনেক কিছুর বিনিময়ে হলেও কারো সম্পর্কে খারাপ মন্তব্য করাটা আমাকে আনন্দিত করতে পারবে না। আয়েশা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি সাফিয়ার বেঁটে হওয়াটা অপছন্দ করেন না? তিনি বললেন, হে আয়েশা! তুমি এমন একটি কথা বললে যা নদীর পানির সাথে মিশিয়ে দিলে তার উপরও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। (তিরমিযী হা: ২৫০২)
শারীরিকভাবে মানুষের কিছু দোষ থাকতেই পারে। তাই কারো সেসব দোষ উল্লেখ করে তার মনে কষ্ট দেয়া কোন মুসলমানের কাজ নয়। তার চিন্তা করা উচিত, আমি যে দোষটি নিয়ে তাকে ঠাট্টা করছি তা যদি আমার মাঝে থাকত তবে কেমন হত। তাই নিজের উপর আল্লাহর রহমতের কথা চিন্তা করে তাঁর প্রশংসা করা উচিত।
বর্তমান সমাজে মানুষের বিভিন্ন শারীরিক দোষ-ত্রুটি নিয়ে রসিয়ে আলাপ করা এবং চোখ টিপে হাসাহাসি করাটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তখন এ কথা মনে থাকে না যে, একদিন আমাদেরকে মহান রাব্বুল আলামীনের দরবারে জীবনের প্রতিটি মুহুর্তের হিসাব দিতে হবে। সর্বদা আমলনামা লেখক ফেরেশতারা আমাদের প্রতিটি মুহুর্তের কথা ও কাজের নিখুঁত হিসাব রাখছেন।
৩. দারিদ্র্যতার কারণে কারো সমালোচনা করা :
দারিদ্র্যতার কারণে কোন মুমিনকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করা ও অপরের কাছে বলে বেড়ানো এটাও এক প্রকার গীবত। সমাজে ধনী-গরীব সবধরণের লোক বসবাস করে। অনেক ধনী রয়েছে যারা সমাজের গরীব ব্যক্তিদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করে থাকে। এমনকি তাদের সম্পর্কে নানা ধরণের অহেতুক সমালোচনাও করে থাকে, এটা বৈধ নয়। কেননা দারিদ্র্যতা তো আল্লাহই দিয়েছেন। এর মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা কিছু কিছু বান্দাকে পরীক্ষা করে থাকেন। এ ব্যাপারে দোষ ধরা আল্লাহর সৃষ্টিতে দোষ ধরার শামিল। অপর দিকে ব্যক্তি মনে কষ্ট পাবে বলে এটা গীবতের পর্যায়েও পড়ে। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِّنْ قَوْمٍ عَسَى أَنْ يَكُونُوا خَيْرًا مِنْهُمْ وَلَا نِسَاءٌ مِّنْ نِّسَاءٍ عَسَى أَنْ يَكُنَّ خَيْرًا مِنْهُنَّ
“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের পুরুষেরা যেন অপর পুরুষদের বিদ্রূপ না করে। হতে পারে যে, তারা এদের তুলনায় অনেক ভাল। আর মহিলারাও যেন অপর মহিলাদের বিদ্রূপ না করে। কেননা হতে পারে তারা এদের তুলনায় ভাল।” (সূরা হুজরাত : ১১)
ইসলামের প্রথম যুগের অধিকাংশ মুসলিমই দরিদ্র ছিলেন। তাদেরকে নিয়ে কাফেররা উপহাস করত। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
زُيِّنَ لِلَّذِينَ كَفَرُوا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا وَيَسْخَرُونَ مِنَ الَّذِينَ آمَنُوا وَالَّذِينَ اتَّقَوْا فَوْقَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَاللهُ يَرْزُقُ مَنْ يَشَاءُ بِغَيْرِ حِسَابٍ
“যারা কুফরী করেছে তাদের দুনিয়ার জীবনকে সুশোভিত করা হয়েছে। আর তারা মুমিনদেরকে নিয়ে উপহাস করে থাকে। অথচ মুত্তাক্বীরা কিয়ামতের দিন তাদের উপরে থাকবে। আর আল্লাহ যাকে চান অগণিত রিযিক দান করেন।” (সূরা বাকারা: ২১২)
৪. কারো পোষাক নিয়ে সমালোচনা করা:
প্রত্যেকেই নিজ নিজ সাধ্য ও রুচী অনুযায়ী নানা ধরণের পোষাক পরিধান করে থাকে। এতে কারো পোষাক নিম্ন মানের হয়, আবার কারো পোষাক হয় উচ্চ মানের। এক্ষেত্রে কারো পছন্দের সাথে অপরের পছন্দের মিল থাকে না। তাই কেউ কারো পোষাক সম্পর্কে অসৎ উদ্দেশ্যে সমালোচনা করা উচিত নয়। যেহেতু এ ধরণের আলোচনা মানুষের মনে কষ্ট দেয় তাই এটাও গীবতের মধ্যে গণ্য হবে।
৫. কারো বদভ্যাসের সমালোচনা করা :
সমাজ, পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য কারণে মানুষের মধ্যে রুচি ও অভ্যাস বিভিন্ন রকম হয়, যা অন্যান্যদের কাছে দৃষ্টি কটু মনে হয়। কিন্তু এ নিয়ে গীবত ও দোষচর্চায় লিপ্ত হওয়া আরো গর্হিত অন্যায়। হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে কাউকে তার অনুপস্থিতিতে পেটুক, বাঁচাল, ভীরু, অলস, নির্বোধ, বেয়াদব এসব বলে মন্তব্য করা গীবতের অন্তর্ভুক্ত।
৬. কারো পাপ কাজের সমালোচনা করা:
কারো পাপ কাজ নিয়ে তার অনুপস্থিতিতে সমালোচনা করাও গীবতের অন্তর্ভুক্ত। যেমন, যদি কেউ বলে যে, অমুক ব্যক্তি এই পাপ কাজ করে বেড়ায় বা এই এই খারাপ কাজে অভ্যস্ত; তবে তাও গীবত বলে গণ্য হবে। মানুষ হিসেবে সকলের দ্বারাই কমবেশি পাপ কাজ সংঘটিত হয়ে থাকে। আর তাই পাপের কথা পাপীকে না বলে অন্য মানুষকে বলে বেড়ানো গীবত বলে গণ্য হবে। যারা গীবতের মাধ্যমে এসব পাপকাজ লোক সমাজে ছড়িয়ে দেয় তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন-
إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَنْ تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
“যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে তাদের জন্য রয়েছে দুনিয়া ও আখিরাতে মর্মান্তিক শাস্তি এবং আল্লাহ সবই জানেন; কিন্তু তোমরা জান না।” (সূরা নূর: ১৯)
মুমিন ব্যক্তি পথভ্রষ্ট হওয়ার জন্য তিনটি জিনিসই যথেষ্ট।
১. মানুষের এমন দোষ আলোচনা করা যা তার নিজের মধ্যেও রয়েছে।
২. নিজের দোষ বের না করে মানুষের দোষ খুজে বের করা।
৩. সঙ্গীকে অনর্থক কষ্ট দেয়া।
ইবলিস মানুষের শত্রু হিসেবে সর্বদা মানুষের পরকালের ক্ষতি করার জন্য সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। যখনই সুযোগ পায় তখনই সে মানুষকে নানা ধরণের অপরাধমূলক কাজে লিপ্ত করে থাকে। আর তাই মানুষের দ্বারা হাজার রকম গুনাহের কাজ সংঘটিত হয়। কোন মানুষকে কখনও কোন পাপ কাজে লিপ্ত দেখলে তা অন্যের কাছে না বলে উচিত হল সংশোধনের উদ্দেশ্যে তাকে তার পাপ কাজটি ধরিয়ে দেয়া। যাতে সে পরবর্তীতে এ পাপ কাজে লিপ্ত না হয়।
আরেকটি কথা মনে রাখা দরকার যে, প্রত্যেকের মধ্যেই রয়েছে কিছু না কিছু দোষ। মানুষের গীবত ও দোষচর্চায় আমরা সুখ অনুভব করি অথচ আমাদের নিজেদের মধ্যেই রয়েছে অসংখ্য দোষ-ত্রুটি। নিজেদের দোষ সম্পর্কে গাফেল থাকা আর শুধু পরের দোষ খুঁজতে থাকা নির্বুদ্ধিতার পরিচায়ক।
৮. কারো ইবাদাতের সমালোচনা করা :
ইবাদাতের মধ্যে কমবেশি প্রায় সকলের কোন না কোন ত্রুটি থেকে যায়। তা না জানার কারণেও হতে পারে অথবা অলসতার কারণেও হতে পারে। তাই বলে কারো ইবাদাতের মধ্যে কী কী ভুল-ত্রুটি রয়েছে তা তাকে না জানিয়ে অন্যের সাথে সমালোচনা করে মনে প্রশান্তি লাভের চেষ্টা করা গীবত। সুতরাং কেউ যদি কারো ইবাদাতে কোন ভুল-ত্রুটি দেখতে পায় তাহলে তার কর্তব্য হল, এটা নিয়ে নিজে পাপের সাথে না জড়িয়ে ঐ ব্যক্তিকে সংশোধন করে দেয়া।
১০. অমুসলিমের সমালোচনা করা :
অনেকে মনে করতে পারে শুধুমাত্র মুসলিমদের গীবত করা হারাম। এটি একটি ভুল ধারণা। অমুসলিমদেরও এমন দোষ অপরের কাছে বলে বেড়ানো বৈধ নয় যার ফলে সামাজিক শৃঙ্খলা ব্যহত হয়। তবে ইসলামের স্বার্থে অমুসলিমদের ইসলাম বিরোধী বা সামাজিক শৃঙ্খলা বিবর্জিত কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আলোচনা করা যায়।
১৩. মৃত ব্যক্তির সমালোচনা করা :
জীবিত ব্যক্তিদের গীবত যেমনি হারাম তেমনি কোন মৃত ব্যক্তির দোষচর্চা করাও হারাম। রাসূল ﷺ বিভিন্ন হাদীসে এ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন-
إِذَا مَاتَ صَاحِبُكُمْ فَدَعُوهُ وَلَا تَقَعُوا فِيهِ
“তোমাদের কোন সাথী যখন মারা যায় তখন তাকে ছেড়ে দাও আর তার সমালোচনায় লিপ্ত হয়ো না।” (আবু দাউদ হা- ৪৯০১)
তাছাড়া মানুষের সুস্থ বিবেক-বুদ্ধিও মৃত ব্যক্তির গীবত করাকে সমর্থন করে না। যেমন-
প্রথমত : আমরা মৃতদের গীবত করতে পারি; কিন্তু তারা আমাদের গীবত করতে পারে না। যারা আমাদের গীবত করছে না আমরা কেন তাদের গীবত করব?
দ্বিতীয়ত : মৃত ব্যক্তির দ্বারা আমরা সর্বদা উপকৃত হই। কেননা কবর আমাদেরকে মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। অন্তরে আল্লাহর ভয় জাগ্রত করে। তাই তাদের এ উপকারের প্রতিদানস্বরূপ আমাদেরও উচিত মৃতদের দোষচর্চা না করে তাদের জন্য দো'আ করা।
তৃতীয়ত: মৃত ব্যক্তির গীবত স্বভাবতই তার বন্ধু-বান্ধব ও স্বজনদের মনে কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আর কোন মুসলিমের পক্ষে উচিত নয় অপর মুসলিমকে কষ্ট দেয়া। এটা রাসূল ﷺ নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন-
الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ
“মুসলিম সেই ব্যক্তি যার হাত ও জ্বিহ্বা থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে।” (মুসলিম হা: ১৭১)