📘 গীবত ও তওবা > 📄 গীবত

📄 গীবত


ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে গীবত করা এবং তা শ্রবণ করা উভয়টিই হারাম। স্বয়ং আল্লাহ তা'আলাই গীবকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন এবং এটাকে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সাথে তুলনা করেছেন যা সকলের কাছে অপছন্দনীয় এবং ঘৃণীত।
আল্লাহ তা'আলা কুরআন মাজীদে বলেন-
وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابٌ رَّحِيمٌ
“তোমরা একে অপরের গোপন বিষয় তালাশ করো না এবং তোমাদের মধ্যে কেউ যেন কারো গীবত না করে। তোমাদের মধ্যে কি এমন কেউ আছে যে, তার মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়া পছন্দ করে? তোমরা তো তা ঘৃণা করে থাক। আল্লাহকে ভয় কর। আল্লাহ বড়ই তওবা কবুলকারী ও পরম দয়ালু।” (সূরা হুজরাত- ১২)

গীবতকে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সাথে উপমা দেয়ার কারণ
আল্লাহ তা'আলা গীবতকে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সাথে তুলনা করেছেন। এর কিছু কারণ নিম্নে আলোচনা করা হল :
১. কারো সামনে তার দোষ বর্ণনা করা হলে সে তা প্রতিরোধ করতে পারে। কিন্তু গীবতের সময় ব্যক্তি উপস্থিত না থাকায় তা প্রতিরোধ করতে পারে না। যেমন মৃত ব্যক্তির গোশত খাওয়া হলে সে প্রতিরোধ করতে পারে না।
২. মৃত মানুষের গোশত খাওয়া যেমন নিকৃষ্ট কাজ, অনুরূপভাবে কারো গীবত করাও তেমন নিকৃষ্ট কাজ।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ « لَا تَحَاسَدُوا وَلَا تَنَاجَشُوا وَلَا تَبَاغَضُوا وَلَا تَدَابَرُوا وَلَا يَبعُ بَعْضُكُمْ عَلَى بَيْعِ بَعْضٍ وَكُونُوا عِبَادَ اللَّهِ إِخْوَانًا. الْمُسْلِمُ أَخُو الْمُسْلِمِ لَا يَظْلِمُهُ وَلَا يَخْذُلُهُ وَلَا يَحْقِرُهُ التَّقْوَى هَا هُنَا. وَيُشِيرُ إِلَى صَدْرِهِ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ بِحَسْبِ امْرِي مِنَ الشَّرِّ أَنْ يَحْقِرَ أَخَاهُ الْمُسْلِمَ كُلُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُస్ْلِمِ حَرَامٌ دَمُهُ وَمَالُهُ وَعِرْضُهُ »

আবু হুরায়রা বলেন, রাসূল বলেছেন- “তোমরা পরস্পর হিংসা করো না, দোষ অন্বেষণ করো না, ক্রোধ প্রকাশ করো না, একে অপরের উপর গর্ব করো না, ক্রয়-বিক্রয়ে এক জনের দামের উপর দাম করো না। আর তোমরা সকলে আল্লাহর বান্দা হিসেবে পরস্পর ভাই ভাই হয়ে যাও। এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাইস্বরূপ। কাজেই সে তার ভাইয়ের প্রতি যুলুম করবে না, তাকে হেয় প্রতিপন্ন করবে না এবং তাকে তুচ্ছজ্ঞান করবে না। তাকওয়া এখানে, একথা বলে তিনি নিজের বক্ষের দিকে তিনবার ইঙ্গিত করলেন। (তারপর নবী বললেন) কোন ব্যক্তি খারাপ হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, সে তার অপর মুসলিম ভাইকে হেয় প্রতিপন্ন করে। আর প্রত্যেক মুসলমানের রক্ত, সম্পদ ও সম্মান অপর মুসলমানের উপর হারাম। অর্থাৎ সম্মানীত। তাই এগুলোর সম্মান রক্ষা করতে হবে।” (মুসলিম হা: ৬৭০৬)

কাজেই গীবত কী? গীবত কেন হয়, কীভাবে হয়? গীবত আমাদের জন্য কী কী ক্ষতি করে? কীভাবে আমরা গীবত থেকে বাঁচতে পারি? গীবত সংক্রান্ত এসব বিষয় নিয়ে নিম্নে আলোচনা করা হল :

📘 গীবত ও তওবা > 📄 গীবতের সংজ্ঞা

📄 গীবতের সংজ্ঞা


اَلْغِيبَةُ শব্দটি আরবি। غیب মূল অক্ষর থেকে এর উৎপত্তি। غ বর্ণে যবর দিয়ে পড়লে এর অর্থ হয়, লুকিয়ে যাওয়া, অনুপস্থিত থাকা ইত্যাদি। আর غ বর্ণে যের দিয়ে পড়লে এর অর্থ হয়- পরনিন্দা করা, পরের দোষ চর্চা করা, কুৎসা রটানো ইত্যাদি।
যেহেতু গীবত সম্পর্কিত আলোচনা অনুপস্থিত ব্যক্তি সম্পর্কে করা হয় তাই উক্ত আলোচনাকে গীবত বলে। আর গীবত দ্বারা পরের সমালোচনা করা হয় বিধায় তাকে পরনিন্দাও বলা হয়।
বিখ্যাত আরবি অভিধান কামুসে বলা হয়েছে-
غَابَهُ أَيْ عَابَهُ وَذَكَرَهُ بِمَا فِيهِ مِنَ السُّوءِ
“কেউ কারো গীবত করল, তার মানে তার দোষ আলোচনা করল, তার মধ্যে যে সকল মন্দ অভ্যাস রয়েছে তা বর্ণনা করল।”

গীবতের পরিচয় সংক্রান্ত হাদীস :
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ « اَتَدْرُونَ مَا الْغِيْبَةُ ». قَالُوا اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ . قَالَ « ذِكْرُكَ أَخَاكَ بِمَا يَكْرَهُ » . قِيلَ أَفَرَأَيْتَ إِنْ كَانَ فِي أَخِي مَا أَقُولُ قَالَ « إِنْ كَانَ فِيْهِ مَا تَقُوْلُ فَقَدِ اغْتَبْتَهُ وَإِنْ لَمْ يَكُنْ فِيْهِ فَقَدْ بَهَتَهُ »
আবূ হুরায়রা হতে বর্ণিত, রাসূল ﷺ উপস্থিত সাহাবাগণকে লক্ষ্য করে বললেন, তোমরা কি জানো গীবত কী? সাহাবাগণ উত্তরে বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। রাসূল ﷺ বললেন, “গীবত হল তোমার ভাই সম্পর্কে এমন কথা বলা যা সে অপছন্দ করে। জিজ্ঞেস করা হল, আমি যা বলি তা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে বিদ্যমান থাকে, তাহলে এটাও কি গীবত হবে? রাসূল ﷺ বললেন, তুমি যা বল তা যদি তার মধ্যে বিদ্যমান থাকে তাহলে সেটাই গীবত। আর তুমি যা বল তা যদি তার মধ্যে না থাকে, তাহলে সেটা হবে তোহমাত। অর্থাৎ মিথ্যা অপবাদ।” (মুসলিম হা: ৬৭৫৮, তিরমিযী হা: ১৮৮৪, মেশকাত হা: ৪৬১৭)

এখানে 'ভাই' শব্দটি উল্লেখ করার বিশেষ তাৎপর্য এই যে, মানুষ সাধারণত আপন ভাইয়ের দোষ অন্য কারো কাছে প্রকাশ করে না; বরং যথাসম্ভব তা গোপন রাখতে চেষ্টা করে। তদ্রূপ অন্য মানুষের গীবত ও দোষচর্চা করাও উচিত নয়। কেননা ইসলামের সূত্রে সকলেই ভাই ভাই।

ইমাম নববী (রহ.) বলেন-
ذِكْرُ الْمَرْءِ بِمَا يَكْرَهُهُ سَوَاءٌ ذَكَرْتَهُ بِاللَّفْظِ أَوْ بِالْإِشَارَةِ وَالرَّمْنِ
“গীবত হল কোন ব্যক্তিকে এমনভাবে উল্লেখ করা যা সে অপছন্দ করে, চাই তা প্রকাশ্যে হোক বা ইশারা-ইংঙ্গিতে হোক।”

ইমাম রাগিব (রহ.) বলেন-
هِيَ أَنْ يَذْكُرَ الْإِنْسَانُ عَيْبَ غَيْرِهِ مِنْ غَيْرِ مَحُوجٍ إِلَى ذِكْرِ ذَلِكَ
“গীবত হল বিনা প্রয়োজনে কোন ব্যক্তির দোষ বর্ণনা করা।”

📘 গীবত ও তওবা > 📄 গীবত সম্পর্কে ভুল ধারণা

📄 গীবত সম্পর্কে ভুল ধারণা


প্রচলিত সমাজে যদি কাউকে এ কথা বলে যে, তুমি অমুকের গীবত করছ কেন? তখন সে বলে, আমি যা বলছি তাতো সকলেই জানে। এমন তো নয় যে, আমি বলার কারণেই মানুষ জানতে পারছে। অতএব এটা গীবত হবে কেন?
এভাবে অনেকেই গীবত সম্পর্কে ভুল ধারণা করে থাকে। আবার অনেকেই গীবতকে নিজেদের মনমত সংজ্ঞায়িত করে থাকে। অথচ প্রকৃতপক্ষে সেগুলোও গীবতের অন্তর্ভুক্ত। যেমন-
১. কেউ বলে, যে দোষ ব্যক্তির সামনে বলা যায় তা গীবত নয়।
২. কেউ বলে, নিজের অধীনে যারা আছে তাদের দোষচর্চা গীবত নয়।
৩. কেউ বলে, যে দোষ ব্যক্তির মাঝে আছে তা বলা গীবত নয়।

এভাবে গীবতকে সংজ্ঞায়িত করা কু-প্রবৃত্তি ছাড়া আর কিছু নয়। তারা এগুলো বলে থাকে শুধুমাত্র নিজেদের মনের ধারণা অনুযায়ী, অথচ ধারণা দ্বারা সঠিক জ্ঞান লাভ হয় না। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
وَإِنَّ الظَّنَّ لَا يُغْنِي مِنَ الْحَقِّ شَيْئًا
“ধারণা দ্বারা সঠিক জ্ঞান অর্জিত হয় না (প্রকৃত অবস্থা জানা যায় না)।” (সূরা নজম- ২৮)

মোটকথা, বিনা প্রয়োজনে কোন ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার এমন দোষ-ত্রুটি বর্ণনা করা যা শুনলে সে অসন্তুষ্ট হবে, তাকেই শরীয়তের পরিভাষায় গীবত বা পরনিন্দা বলে। এটা বিভিন্নভাবে হতে পারে। যেমন, মুখের দ্বারা, লেখনির দ্বারা, অঙ্গ-প্রতঙ্গের দ্বারা। আবার এটা মুসলিম-অমুসলিম যে কারো ব্যাপারে হতে পারে। যদি বর্ণিত দোষগুলো ব্যক্তির মধ্যে বিদ্যমান থাকে তবে তা গীবত হবে, আর যদি তা ব্যক্তির মধ্যে বিদ্যমান না থাকে তবে তা হবে অপবাদ। সুতরাং জায়েয ক্ষেত্র ছাড়া কারো যেকোন প্রকারের দোষ অপরের কাছে বর্ণনা করা থেকে বিরত থাকা কর্তব্য।

📘 গীবত ও তওবা > 📄 যেসব সমালোচনা গীবত নয়

📄 যেসব সমালোচনা গীবত নয়


যদি সৎ ও শরীয়তসম্মত উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে কারো অনুপস্থিতিতে তার সমালোচনা করা জরুরী হয়ে যায় তবে তা গীবত হবে না। যেমন :
১. যালিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা :
মাযলুম ব্যক্তি যালিমের বিরুদ্ধে দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, বিচারক বা এমনসব ব্যক্তির কাছে অভিযোগ উপস্থাপন করতে পারবে যারা যালিমকে দমন করার শক্তি এবং মাযলুমের প্রতি ন্যায়বিচার করার ক্ষমতা রাখেন। সুবিচার লাভের উদ্দেশ্যে শাসকদের কাছে অধিনস্ত কর্মচারির বিরুদ্ধে অভিযোগ করার অনুমতি রয়েছে। এটা গীবত হবে না। কেননা এরূপ ক্ষেত্রে নিশ্চুপ থেকে যুলুম মেনে নিলে নিজের হক তো নষ্ট হবেই তাছাড়া যালিমকে প্রশ্রয় দেয়ার ফলে যুলুমও বৃদ্ধি পাবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
لَا يُحِبُّ اللَّهُ الْجَهْرَ بِالسُّوءِ مِنَ الْقَوْلِ إِلَّا مَنْ ظُلِمَ وَكَانَ اللَّهُ سَمِيعًا عَلِيمًا
“আল্লাহ কারো দোষ প্রকাশ করে দেয়া পছন্দ করেন না, তবে মাযলুম ব্যক্তি ছাড়া। (সুবিচার লাভের প্রত্যাশায় তার জন্য অত্যাচারের অভিযোগ তুলে ধরার অবকাশ রয়েছে।) আর আল্লাহ সবকিছু দেখেন এবং সবকিছু জানেন।" (সূরা নিসা- ১৪৮)

২. ইসলাম বিরোধী কার্যকলাপ প্রতিরোধ করা:
ইসলাম বিরোধী কার্যকলাপ প্রতিরোধ এবং গুনাহের কাজের সুযোগ বন্ধ করার জন্য সহযোগিতা পাওয়ার উদ্দেশ্যে পরস্পর আলোচনা করা গীবত নয়। যার দ্বারা আল্লাহদ্রোহী কার্যকলাপ সংঘটিত হওয়ার আশংকা রয়েছে তার বিরুদ্ধে এভাবে বলা যে, অমুক ব্যক্তি এমন এমন কাজ করছে। তাকে শাসন করা প্রয়োজন। তবে এর উদ্দেশ্য হবে শুধুমাত্র অবৈধ কার্যকলাপ প্রতিরোধ করা।

৩. কোন বিষয়ে ফতওয়া চাওয়া :
যিনি ফতওয়া দেয়ার ক্ষমতা রাখেন তার কাছে কোন বিষয়ের সমাধানের উদ্দেশ্যে কারো দোষ বর্ণনা করা বৈধ। এক্ষেত্রে সর্বোত্তম উপায় হল কারো নাম উল্লেখ না করে এভাবে বলা যে, কোন ব্যক্তি বা কোন স্বামী যদি এমন আচরণ করে তাহলে তার ব্যাপারে ইসলামের সমাধান কী? এভাবে কাউকে নির্দিষ্ট না করেই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। তবে কাউকে চিহ্নিত করা জরুরি হলে সে ব্যক্তির নাম উল্লেখ করাও জায়েয।

৪. মুসলমানকে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া থেকে বাঁচানো:
কোন মুসলমানকে ক্ষতি থেকে বাঁচানোর জন্য কারো প্রকৃত অবস্থা বর্ণনা করা গীবত নয়। যেমন, বিয়ের ব্যাপারে, কোন বিষয়ে অংশীদার হওয়ার ব্যাপারে, আমানত ও লেনদেনের ব্যাপারে কিংবা কাউকে প্রতিবেশী বানানোর ব্যাপারে অন্য পক্ষের খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করা হলে তার কর্তব্য হল তাকে সঠিক কথা বলে দেয়া। এক্ষেত্রে যদি সে অন্য পক্ষের দোষ-ত্রুটি গোপন রাখে তবে অপর মুসলিম ভাই ক্ষতির সম্মুখীন হবে। ফাতেমা বিনতে কায়েস নবী ﷺ এর নিকট এসে পরামর্শ চেয়ে বললেন, আবু জাহাম ও মুয়াবিয়া উভয়ে আমাকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছে। তখন নবী ﷺ বললেন, নিশ্চয় মুয়াবিয়া তোমাকে কষ্ট দেবে, তার কোন মাল নেই। আর আবু জাহামের হাত থেকে কখনো লাঠি নামে না। (মুসলিম হা: ৩৭৮৫)

অনুরূপভাবে কোন লোককে কোন বিষয়ের যিম্মাদার বা দায়িত্বশীল বানানো হলে তার কর্তব্য হল সে দায়িত্ব যথাযথ পালন করা। কোন লোক যদি দায়িত্ব পালনে গড়িমসি করে অথবা সে ঐ পদের উপযুক্ত না হয় অথবা সে ফাসিক বা অলস হয় তবে কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়টি অবহিত করা জরুরি, যাতে তারা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে কিংবা অন্য কোন যোগ্য লোককে দায়িত্ব দিতে পারে।

৫. হাদীস যাচাই করার জন্য বর্ণনাকারীদের সমালোচনা করা :
হাদীসের রাবী বা বর্ণনাকারীদের যেসব দোষ-ত্রুটি আছে তা যাচাই করা জরুরি। এটা শুধু জায়েযই নয়, বরং বিশেষ প্রয়োজন। কেননা এর মধ্যে মুসলমানদের বৃহত্তম স্বার্থ রয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا
“হে ঈমানদারগণ! কোন ফাসিক ব্যক্তি যদি তোমাদের নিকট কোন খবর নিয়ে আসে তবে তার সত্যতা যাচাই করে নাও।” (সূরা হুজরাত- ৬)
এ আয়াত দ্বারা এ কথা প্রমাণিত হয় যে, কোন ফাসিক ব্যক্তি যদি কোন সংবাদ নিয়ে আসে তবে তা গ্রহণের পূর্বে সে খবরের সত্যতা কতটুকু তা যাচাই করতে হবে। যেন সে অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণের পর কোন বিপদে না পড়তে হয়। তাই দ্বীনের হেফাযতের উদ্দেশ্যে মুহাদ্দিসগণ হাদীসের রাবীদের দোষ-ত্রুটি পর্যালোচনা করে যয়ীফ ও জাল হাদীস থেকে সহীহ হাদীস বাছাই করে থাকেন।

৬. প্রকাশ্য ফাসিক ও বিদআতীর সমালোচনা করা :
যদি কোন ব্যক্তি প্রকাশ্যে ফাসিকী ও বিদআতী কাজকর্ম করে বেড়ায় যেমন, প্রকাশ্যে মদ পান করে, মানুষের উপর যুলুম করে, কারো ধন-সম্পদ। জোরপূর্বক আত্মসাৎ করে বা অবৈধ কার্যকলাপে লিপ্ত হয় তবে ঐ ব্যক্তির কার্যকলাপের সমালোচনা করা যাবে, যাতে লোকজন সতর্ক হতে পারে। বিদআত ইসলামে একটি হারাম কাজ। রাসূল ﷺ বলেন-
مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدُّ
“যে ব্যক্তি এমন কোন আমল করবে যার উপর আমাদের সমর্থন নেই তা পরিত্যাজ্য।” (বুখারী, মুসলিম হা: ৪৫৯০)

অতএব বিদআতীদের ডাকে সাড়া দেয়া উচিত নয়। আর জনসাধারণ যাতে বিদআতীদের দ্বারা প্রতারিত না হয় সেজন্য প্রত্যেক বিদআতীকে চিহ্নিত করে দেয়া উচিত।

৭. পরিচয় দেয়া :
কোন ব্যক্তির বিশেষ উপাধি বা কোন শারীরিক ত্রুটির উল্লেখ করে তার পরিচয় দেয়া জায়েয। তবে অপমান বা অসম্মান করার উদ্দেশ্যে এসব শব্দ ব্যবহার করা হারাম। এসব ত্রুটি উল্লেখ ছাড়া অন্য কোনভাবে পরিচয় করিয়ে দিতে পারলে সেটাই উত্তম। কিন্তু সম্বোধিত ব্যক্তি যদি মনে কষ্ট না নেয় এবং সে এ নামেই সমাজে পরিচিত হয় তবে তাকে ঐ নামে পরিচয় দেয়া জায়েয রয়েছে।

৮. যালিম সরকারের সমালোচনা করা :
সরকারকে দায়িত্ব দেয়া হয় দেশ সুষ্ঠভাবে পরিচালনা করার জন্য। কিন্তু সরকার যদি তা সুষ্ঠভাবে পরিচালনা না করে জনসাধারণের উপর যুলুম বা অত্যাচার শুরু করে দেয় তবে সে সরকারের সমালোচনা করাতে দোষ নেই। কারণ সরকারের সাথে সকলের স্বার্থ জড়িত। সরকার যখন জনগণের উপর যুলুম শুরু করে দেয় তখন সরকারের যুলুমের কথা জনগণের মাঝে তুলে ধরা বৈধ।

৯. সংশোধনের উদ্দেশ্যে :
রাসূল ﷺ বলেন-
الدِّينُ النَّصِيحَةُ
“দ্বীন হচ্ছে একে অপরের কল্যাণ কামনা করা।” (মসলিম হা: ২০৫)
এক মুসলিম অপর মুসলিম ব্যক্তিকে ভুল করতে দেখলে তাকে সংশোধন করার দায়িত্ব তারই। কারো দোষ এমন ব্যক্তির নিকট প্রকাশ করার অনুমতি রয়েছে যার দ্বারা উক্ত ব্যক্তিকে সংশোধন করা যায়। যেমন, সন্তানের কোন দোষ পিতা-মাতার কর্ণগোচর করা, ছাত্রের দোষ শিক্ষকের কাছে প্রকাশ করা ইত্যাদি। এটা উক্ত ব্যক্তিকে হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে নয় বরং তার কল্যাণ কামনাই মুখ্য উদ্দেশ্য।
এসব ক্ষেত্র ব্যতীত পরনিন্দা করা থেকে প্রত্যেক মুসলিমের অবশ্যই বিরত থাকতে হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00