📄 নিজ দোষ-ত্রুটির হিসাব রাখুন
নিজের মধ্যে বিনয় সৃষ্টি করার উপায় হলো, নিজ দোষ-ত্রুটির চিন্তা করা ও সর্বদা তা স্মরণ রাখা। আমরা প্রত্যেকে নিজেকে বড় মনে করি। ভাবি আমার মত কেউ নেই। আমি বড় জ্ঞানী। অনেক বড় মুত্তাকী, পরহেযগার। আমার অনেক টাকা-পয়সা আছে। আমি সবল-স্বাস্থ্যবান। আমার চেহারা-সুরাত অনেক ভালো। এভাবে একেকজন একেকটা জিনিস নিয়ে গর্বিত। এই গর্ব ও অহঙ্কার মানুষকে ধ্বংস করছে।
📄 মানুষের প্রকৃত অবস্থা কী?
একবার এক যুবক জনৈক বুযুর্গকে লক্ষ্য করে বললো, আপনি জানেন আমি কে? বুযুর্গ বললেন, কেন জানব না? অবশ্যই জানি তুমি কে? যদি চাও তাহলে বলে দেই। অতঃপর বললেন-
اُولَئِكَ نُطْفَةٌ قَذِرَةٌ وَاخِرُكَ جِيْفَةً قَذِرَةٌ وَأَنْتَ فِيمَا بَيْنَ ذَلِكَ تَحْمِلُ الْعُذْرَةَ
'অর্থাৎ, তোমার শুরুটা হলো নাপাক পানি, শেষটা হলো পঁচা লাশ আর এ দু'য়ের মাঝখানে তুমি মলমূত্র বয়ে বেড়াচ্ছ'।
আল্লাহ তায়ালা মেহেরবান। তিনি মানবদেহের উপরে চামড়া বিছিয়ে তার সব দোষ ঢেকে দিয়েছেন। এ চামড়া সরিয়ে দিলে ভেতরে দেখা যাবে শুধু নাপাকী। তার রক্ত নাপাক, পেশাব নাপাক, পায়খানা নাপাক, পুঁজ নাপাক। এতসব অপবিত্রতা মানুষের ভেতর। সে সর্বক্ষণ এগুলো বয়ে বেড়াচ্ছে। এই হলো মানুষের স্বরূপ। তা সত্ত্বেও সে নিজেকে বড় মনে করে। এই বড়ত্ববোধই মানুষকে পরনিন্দায় প্ররোচিত করছে। কাজেই গীবত ও পরনিন্দার মূলোৎপাটন করতে চাইলে নিজের মধ্যে বিনয় সৃষ্টি করতে হবে। বিনয় সৃষ্টি হয়ে গেলে ইনশাআল্লাহ কখনো মুখে কারো গীবত আসবে না। হ্যাঁ, দ্বীনি কোনো প্রয়োজন দেখা দিলে ভিন্ন কথা।
সেক্ষেত্রে গীবত জায়েয। উদাহরণত কাউকে কারো ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে চাইলে বলে দিন, অমুক ব্যক্তির ব্যাপারে সাবধান থেক। তার লেনদেন স্বচ্ছ নয়। এটা নিষিদ্ধ গীবত হবে না। এতে গুনাহ নেই।
📄 বিনয়ের জন্য শায়েখের সহচার্য
অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, দমন-নিপীড়ন ছাড়া বিনয় সৃষ্টি হয় না। মানুষের মাথায় খন্নাস বাসা বেঁধে আছে। সে খন্নাস হলো এই যে, মানুষ নিজ মতকে শ্রেষ্ঠ গণ্য করে। নিজ চিন্তাকে নির্ভুল মনে করে। ভাবে আমি যা চিন্তা করি তাই সঠিক। অন্যের চিন্তা-ভাবনা সব ভুল। নিজেকে সঠিক মনে করার এ খন্নাস যতক্ষণ দূর না হবে, ততক্ষণ আত্মশুদ্ধি সম্ভব নয়। এটা দূর করতে হলে নিজেকে এমন কারো হাতে সমর্পণ করতে হবে, যার কাছে পাওয়া যাবে নিজেকে মিটিয়ে দেয়ার তা'লীম। যেখানে ভাবনার গতি উল্টে যাবে। ভাববে, আমি যা চিন্তা করি তা ভুল। তিনি যা চিন্তা করেন তাই সঠিক। তাতে আমার চোখে তার চিন্তা-ভাবনা যতই বেঠিক মনে হোক না কেন। এমনকি দলিল-প্রমাণ ও স্পষ্ট বুদ্ধি-বিবেচনারও পরিপন্থী মনে হোক না কেন। নিজেকে তার হাতে সমর্পণ করতে হবে। বলতে হবে আমি সর্বাবস্থায় আপনার কথা মেনে চলবো। তাতে সে কথা আমার বুঝ-বুদ্ধির যত বিপরীতই মনে হোক না কেন। যতক্ষণ পর্যন্ত এভাবে নিজ চিন্তা-ভাবনাকে বিলীন করা না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাকাব্বুর খতম হবে না এবং তাওয়াযু জন্ম নেবে না।
📄 হযরত শায়খুল হাদীস রহ.-এর নসীহত
আল্লাহ তায়ালা হযরত শায়খুল হাদীস যাকারিয়া রহ.-কে আখেরাতের উচ্চ মর্যাদা দান করুন। আমার শ্রদ্ধেয় পিতা হযরত মুফতি মুহাম্মাদ শফী রহ.-এর ইন্তিকাল হয়ে গেলে তিনি আমাকে ও আমার ভাই হযরত মাওলানা মুফতি মুহাম্মাদ রফী উছমানীকে সমবেদনা জানিয়ে দীর্ঘ একখানি চিঠি লেখেন। তাতে তিনি আমাদেরকে বিভিন্ন বিষয়ে নসীহত করেন। তার মধ্যে একটা নসীহত ছিল এরকম 'আমি আমার বুযুর্গদের মুখে শুনেছি, সাহেবযাদাত্বের শূকর (মন-মস্তিষ্ক থেকে) বের হতে অনেক দিন লাগে'।
অর্থাৎ কোন ব্যক্তির পুত্র হওয়ার কারণে মন-মস্তিষ্কে এক ধরনের খন্নাস জন্ম নেয়। তাকেও তিনি শূকর শব্দে ব্যক্ত করেছেন। এই খন্নাস হলো, অহমিকা। এ শূকর বের হয় অনেক দেরিতে। অর্থাৎ অন্যান্য রোগের চিকিৎসা অল্পতেই হয়ে যায়, কিন্তু এ রোগের চিকিৎসা সময় লাগে।
যা হোক হযরত শায়खুল হাদীস রহ. সেই পত্রের মাধ্যমে এই রোগের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং কিভাবে এর এলাজ হতে পারে সেই দিকে মনোযোগী হতে উৎসাহ দেন। তারপর বলেন, 'কেউ যখন নিজেকে কারো সামনে ফানা করে (মিটিয়ে) দেয় এবং নফসের উপর দমন-নিপীড়ন চালায়, তারপরেই এ রোগ দূর হয়। এটা দূর না হওয়া পর্যন্ত উন্নতির পথ উন্মুক্ত হয় না।