📄 কুফর ও শিরক থেকে তাওবা
দেখুন! কুফর ও শিরক অপেক্ষা গুরুতর অপরাধ জগতে আর কিছুই নেই। এ অপরাধ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালার ঘোষণা হলো- আমি এই গুনাহ ক্ষমা করবো না। এ ছাড়া অন্যসব গুনাহ ক্ষমা করে দিব। কিন্তু সেই কুফর ও শিরক থেকেও তো তাওবার পথ খোলা রেখেছেন। সত্তর বছরের একজন কাফের যদি তার কুফর ও শিরক থেকে তাওবা করে, আল্লাহ তায়ালা তাকে ক্ষমা করে দেন।
📄 শয়তানের ধোঁকা
কাজেই বান্দার হক বিষয়টা যদিও কঠিন, কিন্তু তারপরও সে ব্যাপারে হতাশ হওয়ার কারণ নেই। শয়তান মানুষের অন্তরে হতাশা সৃষ্টির চেষ্টা করে। সে এই বলে প্ররোচনা দেয় যে, দেখ, তুমি কিন্তু গুনাহ করে মারদুদ ও অভিশপ্ত হয়ে গেছ। তোমার ক্ষমার কোনো পথ বাকি নেই। এখন জাহান্নামই তোমার ঠিকানা। সুতরাং এখন শুধু শুধু চেষ্টা করে লাভ নেই? তার চেয়ে নিজ মর্জিমত চলো। ফুর্তি করো, মজা লোটো, যত ইচ্ছা গুনাহ করতে থাক। এভাবে শয়তান হতাশার ফাঁদে ফেলে আরো বেশি গুনাহে লিপ্ত করে। দেখা যাচ্ছে হতাশাও শয়তানের একটা ফাঁদ। এ কারণেই হতাশাকে মনে একদম স্থান দেয়া উচিত নয়। হতাশ হওয়া মুমিনের কাজ নয়। যত বড় গুনাহই হয়ে যাক না কেন, তা আল্লাহ তায়ালার রহমত অপেক্ষা তো বড় হতে পারে না। তাঁর রহমতে ক্ষমাপ্রাপ্তির একটা না একটা উপায় লাভ হবেই।
📄 আবু নাওয়াসের ক্ষমার ঘটনা
আবু নাওয়াস নামে আরবে এক প্রসিদ্ধ কবি ছিল। স্বাধীন প্রকৃতির লোক ছিল। যেসব কবি সব ধরণের পাপাচারে লিপ্ত থাকত, আবু নাওয়াসও তাদের একজন। সারাটা জীবন পাপকর্মেই কাটিয়েছে। মদ্যপান তো ছিলই। মৃত্যুর পর তার সাথে স্বপ্নযোগে এক ব্যক্তির সাক্ষাত হয়। সে তাকে জিজ্ঞেস করলো, আল্লাহ তায়ালা তোমার সাথে কি আচরণ করেছেন? সে বললো, কি বলবো ভাই! মৃত্যুকালে ভয় পেয়েছিলাম যে, আল্লাহ তায়ালার সাথে যখন সাক্ষাত হবে, তখন না জানি কত কঠিন শাস্তি আমাকে দেয়া হয়। বড়ই দুশ্চিন্তায় ছিলাম। এই দুশ্চিন্তার ভেতর আমি তিনটি শ্লোক তৈরি করি এবং তারই ওসিলায় আল্লাহ তায়ালা আমাকে ক্ষমা করে দেন। স্বপ্নে কবি তাকে শ্লোক তিনটি শুনিয়ে দেয়। বড় চমৎকার এক কবিতা। আল্লাহ তায়ালা তাওফিক দিলে কবিরাও তাদের কবিতায় অনেক মূল্যবান কথা বলে থাকেন। কবিতাটি নিম্নরূপ-
يارب إن عظمت ذنوبي كثرة
فلقد علمت بأن عفوك أعظم
إن كان لا يرجوك إلا محسن
فيمن يلوذ ويستجير المجرم
ومددت يدي إليك تضرعا
فلين رددت يدي فمن ذا يرحم
প্রভু হে! যদিও গুনাহ আমার বেশুমার, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি তোমার ক্ষমা তারচেয়ে অনেক বড় * যদি কেবল নেককার বান্দারাই তোমার রহমতের আশা করতে পারে, তবে বলো, অপরাধী বান্দা কার আশ্রয় নেবে, তারা যাবে কার দুয়ারে? * বিনয় কাতরভাবে হে মালিক! হাত বাড়ালাম তোমার কাছে, এখন যদি তুমি ফিরিয়ে দাও, তবে বলো, আর কে দয়া করবে?
বিদায় বেলার কবিতা। তিনি একথাগুলো বলছিলেন আর দুনিয়া ছেড়ে যাচ্ছিলেন। আল্লাহ তায়ালাই জানেন, তখন তার মনের অবস্থা কি ছিল। ছাড়পত্র দিয়েই দিলেন। যা, এই কবিতার দৌলতে তোকে ক্ষমা করে দিলাম। এ কবিতাটি আবু নাওয়াসের লিখিত পাণ্ডুলিপিতে ছিল না। থাকার অবকাশও ছিল না। কারণ, এটি তো বলেইছিলেন জীবনের একদম শেষ মূহূর্তে- দুনিয়া থেকে যেতে যেতে। তাই পাণ্ডুলিপিতে লেখার অবকাশ পাননি। এজন্য স্বপ্নযোগে জানিয়ে দেন যে, আমি এই কবিতা বলেছিলাম। যে ব্যক্তি স্বপ্নে দেখেছিল, সে স্বপ্নেরই বরাতে আবু নাওয়াসের দীওয়ান (কাব্য গ্রন্থ)-এ লেখে দিয়েছেন।¹
📄 বাহ্যিক অবস্থার উপর ফায়সালা করিও না
এ কারনেই বুযুর্গানে দ্বীন বলেন, কোনো ব্যক্তির বাহ্যিক অবস্থা দেখে সে জান্নাতী না জাহান্নামী এই ফায়সালা দিয়ে বসো না। কে জানে কার কোন্ আমল আল্লাহ তায়ালার কছে পছন্দ হয়ে যায় বা কার মৃত্যু কোন্ আমলের উপর হয়, আর সে কারণে আল্লাহ তায়ালা তাকে ক্ষমা করে দেন। ফলে সে কোথা থেকে কোথায় পৌঁছে যায়।
হযরত থানভী রহ. বলেন, আমি নগদে প্রত্যেক মুসলিমকে এবং সম্ভাব্য পর্যায়ে প্রত্যেক কাফেরকে নিজের চেয়ে উত্তম মনে করি। সম্ভাব্য পর্যায় দ্বারা বোঝাচ্ছেন, হতে পারে আল্লাহ তায়ালা তাকে ঈমানের তাওফিক দেবেন এবং তারপর সে আমাকে ছাড়িয়ে যাবে। কাজেই বাহ্যিক অবস্থার দিক থেকে যে যেমনই হোক না কেন, তাকে কখনো ঘৃণার চোখে দেখ না। হ্যাঁ, মন্দ কাজ করলে সেই কাজকে ঘৃণা করো এবং বলো, মদ্যপান একটা নিকৃষ্ট কাজ। চুরি করা একটা খারাপ কাজ ইত্যাদি। কিন্তু ব্যক্তিকে ঘৃণা কিছুতেই নয়। কেননা, এমন তো হতেই পারে যে, আল্লাহ তাকে তাওবার তাওফিক দিবেন, ফলে সে ঈমান ও আমলের পথে বহুদূর এগিয়ে যাবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সঠিকভাবে দ্বীনের উপর চলার তাওফিক দান করুন।
গীবত বৈধ অবস্থায়
হযরত থানভী রহ. বলেন, দ্বীনি প্রয়োজন দেখা দিলে গীবতও বৈধ হয়ে যায়। যেমন মুহাদ্দিসগণ হাদীস বর্ণনাকারীদের (স্তর বিন্যাস করত: কোনো কোনো বর্ণনকারীর) সমালোচনা করেছেন। যদি দ্বীনি কোনো প্রয়োজন না থাকে, বরং কেবল ইন্দ্রিয় বশত নিন্দা করা হয়ে থাকে, তবে সত্যিকারের দোষ বর্ণনাও নিষিদ্ধ গীবত সাব্যস্ত হবে। আর যাচাই ছাড়া কোনো কথা বলা হলে তা অপবাদ গণ্য হবে। মিথ্যার ভিত্তি মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ার উপর নয়; বরং সত্য প্রমাণিত না হওয়ার উপর।
টিকাঃ
¹ মুখতাসারু তারীখি দিমাশক, ২য় খন্ড ৪২২ পৃষ্ঠা