📄 হতাশ হওয়ার কোনই কারণ নেই
সুতরাং হতাশার কোনো কারণ নেই। বান্দার হক নষ্ট হওয়ার পর হকদার ব্যক্তির ইন্তিকাল হয়ে গেলে একথা ভাবা ঠিক নয় যে, এখন আর ক্ষমা পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টা আদৌ সে রকম নয়। প্রথমে সচেতন থাকুন যাতে কোনো বান্দার হক নষ্ট না হয়। বরং তা যথাযথভাবে আদায়ের চেষ্টা করুন। তারপরও যদি কারো কোনো হক নষ্ট হয়ে যায়, তবে দ্রুত তা মাফ করিয়ে নিন। যদি মাফ করানোর কোনো সুযোগ না থাকে, তাতেও নিরাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। এ অবস্থায়ও ক্ষমাপ্রাপ্তির সুযোগ আছে। সেই ব্যক্তির জন্য ইসতিগফার করতে থাকুন এবং দুআ করতে থাকুন- হে আল্লাহ! আমার দ্বারা যার কোনো হক নষ্ট হয়েছে, আপনি স্বীয় অনুগ্রহে তাদেরকে আমার প্রতি রাজি-খুশি করে দিন। হে আল্লাহ! তার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিন এবং তাকে জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করুন। দুআ করতে থাকুন, যতদিন না মন সাক্ষ্য দেয় যে, এখন তারা খুশি হয়ে গেছে।
আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন-
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
অর্থাৎ, বলুন, 'হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজেদের উপর যুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। অবশ্যই আল্লাহ সকল পাপ ক্ষমা করে দিবেন। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু'। (সূরা যুমার-৫৩)
ফায়দা: গুনাহ যতো বড় ও বেশি হোক না কেন নিরাশ হওয়ার কিছুই নেই। আল্লাহ অতি মহান ও দয়ালু। তার কাছে খাঁটি দিলে তাওবাহ করতে দেরী, তিনি ক্ষমা করতে দেরী করবেন না। দুনিয়ার লাখো-কোটি পাপি বান্দকে তিনি ক্ষমা করে দিয়েছেন। হাজারো খুনি, মদ্যপায়ী, ব্যভিচারীকে তিনি ওলী বানিয়ে নিয়েছেন। এমনকি রাসূলের চাচা হযরত হামযা রাযি. এর খুনি ওয়াহশীকেও তিনি সাহাবীর মর্তবা দান করেছেন।
তিনি তো আমাদের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ! ভয় পাবার কিছু নেই। হাজারো গুনাহ করেছেন? মদ্যপান করেছেন? ব্যভিচার করেছেন? খুন করেছেন? এর চেয়ে আল্লাহর রহমত অনেক বেশি। একবার শুধু চোঁখের পানি ছেড়ে বলুন, হে দয়াময় আল্লাহ! আমি অপরাধী, আমি ভুল করেছি, তুমি আমাকে মাফ করে দাও, আজ থেকে তাওবাহ করলাম, জীবনে আর কখনো এই পাপ করবো না।” ইনশাআল্লাহ, আল্লাহ অবশ্যই মাফ করে দিবেন।
📄 কুফর ও শিরক থেকে তাওবা
দেখুন! কুফর ও শিরক অপেক্ষা গুরুতর অপরাধ জগতে আর কিছুই নেই। এ অপরাধ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালার ঘোষণা হলো- আমি এই গুনাহ ক্ষমা করবো না। এ ছাড়া অন্যসব গুনাহ ক্ষমা করে দিব। কিন্তু সেই কুফর ও শিরক থেকেও তো তাওবার পথ খোলা রেখেছেন। সত্তর বছরের একজন কাফের যদি তার কুফর ও শিরক থেকে তাওবা করে, আল্লাহ তায়ালা তাকে ক্ষমা করে দেন।
📄 শয়তানের ধোঁকা
কাজেই বান্দার হক বিষয়টা যদিও কঠিন, কিন্তু তারপরও সে ব্যাপারে হতাশ হওয়ার কারণ নেই। শয়তান মানুষের অন্তরে হতাশা সৃষ্টির চেষ্টা করে। সে এই বলে প্ররোচনা দেয় যে, দেখ, তুমি কিন্তু গুনাহ করে মারদুদ ও অভিশপ্ত হয়ে গেছ। তোমার ক্ষমার কোনো পথ বাকি নেই। এখন জাহান্নামই তোমার ঠিকানা। সুতরাং এখন শুধু শুধু চেষ্টা করে লাভ নেই? তার চেয়ে নিজ মর্জিমত চলো। ফুর্তি করো, মজা লোটো, যত ইচ্ছা গুনাহ করতে থাক। এভাবে শয়তান হতাশার ফাঁদে ফেলে আরো বেশি গুনাহে লিপ্ত করে। দেখা যাচ্ছে হতাশাও শয়তানের একটা ফাঁদ। এ কারণেই হতাশাকে মনে একদম স্থান দেয়া উচিত নয়। হতাশ হওয়া মুমিনের কাজ নয়। যত বড় গুনাহই হয়ে যাক না কেন, তা আল্লাহ তায়ালার রহমত অপেক্ষা তো বড় হতে পারে না। তাঁর রহমতে ক্ষমাপ্রাপ্তির একটা না একটা উপায় লাভ হবেই।
📄 আবু নাওয়াসের ক্ষমার ঘটনা
আবু নাওয়াস নামে আরবে এক প্রসিদ্ধ কবি ছিল। স্বাধীন প্রকৃতির লোক ছিল। যেসব কবি সব ধরণের পাপাচারে লিপ্ত থাকত, আবু নাওয়াসও তাদের একজন। সারাটা জীবন পাপকর্মেই কাটিয়েছে। মদ্যপান তো ছিলই। মৃত্যুর পর তার সাথে স্বপ্নযোগে এক ব্যক্তির সাক্ষাত হয়। সে তাকে জিজ্ঞেস করলো, আল্লাহ তায়ালা তোমার সাথে কি আচরণ করেছেন? সে বললো, কি বলবো ভাই! মৃত্যুকালে ভয় পেয়েছিলাম যে, আল্লাহ তায়ালার সাথে যখন সাক্ষাত হবে, তখন না জানি কত কঠিন শাস্তি আমাকে দেয়া হয়। বড়ই দুশ্চিন্তায় ছিলাম। এই দুশ্চিন্তার ভেতর আমি তিনটি শ্লোক তৈরি করি এবং তারই ওসিলায় আল্লাহ তায়ালা আমাকে ক্ষমা করে দেন। স্বপ্নে কবি তাকে শ্লোক তিনটি শুনিয়ে দেয়। বড় চমৎকার এক কবিতা। আল্লাহ তায়ালা তাওফিক দিলে কবিরাও তাদের কবিতায় অনেক মূল্যবান কথা বলে থাকেন। কবিতাটি নিম্নরূপ-
يارب إن عظمت ذنوبي كثرة
فلقد علمت بأن عفوك أعظم
إن كان لا يرجوك إلا محسن
فيمن يلوذ ويستجير المجرم
ومددت يدي إليك تضرعا
فلين رددت يدي فمن ذا يرحم
প্রভু হে! যদিও গুনাহ আমার বেশুমার, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি তোমার ক্ষমা তারচেয়ে অনেক বড় * যদি কেবল নেককার বান্দারাই তোমার রহমতের আশা করতে পারে, তবে বলো, অপরাধী বান্দা কার আশ্রয় নেবে, তারা যাবে কার দুয়ারে? * বিনয় কাতরভাবে হে মালিক! হাত বাড়ালাম তোমার কাছে, এখন যদি তুমি ফিরিয়ে দাও, তবে বলো, আর কে দয়া করবে?
বিদায় বেলার কবিতা। তিনি একথাগুলো বলছিলেন আর দুনিয়া ছেড়ে যাচ্ছিলেন। আল্লাহ তায়ালাই জানেন, তখন তার মনের অবস্থা কি ছিল। ছাড়পত্র দিয়েই দিলেন। যা, এই কবিতার দৌলতে তোকে ক্ষমা করে দিলাম। এ কবিতাটি আবু নাওয়াসের লিখিত পাণ্ডুলিপিতে ছিল না। থাকার অবকাশও ছিল না। কারণ, এটি তো বলেইছিলেন জীবনের একদম শেষ মূহূর্তে- দুনিয়া থেকে যেতে যেতে। তাই পাণ্ডুলিপিতে লেখার অবকাশ পাননি। এজন্য স্বপ্নযোগে জানিয়ে দেন যে, আমি এই কবিতা বলেছিলাম। যে ব্যক্তি স্বপ্নে দেখেছিল, সে স্বপ্নেরই বরাতে আবু নাওয়াসের দীওয়ান (কাব্য গ্রন্থ)-এ লেখে দিয়েছেন।¹