📄 সকলের কাছে সাধারণ ক্ষমা চাওয়া উচিত
প্রশ্ন হচ্ছে, ক্ষমা কার কার কাছে চাইবো? আগে তো এদিকে লক্ষ্য ছিল না। কতজনের গীবত হয়ে গেছে তার ঠিক নেই। এখন কি চিন্তা করে করে তাদের তালিকা তৈরি করবো এবং তারপর এক একজন করে প্রত্যেকের কাছে ক্ষমা চাইবো? আমার শ্রদ্ধেয় পিতা রহ. বলতেন, ভাই জান্নাত তো এত সস্তা নয়। তা পেতে হলে যাদের হক নষ্ট করা হয়েছে তাদের কাছে মাফ চাইতে হবে। কাজেই নিজের আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, আরো যত সম্পৃক্তজন আছে সকলের তালিকা তৈরি করো। অতঃপর তাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নাও।
📄 আমার শ্রদ্ধেয় পিতার ক্ষমা চাওয়া
আমার শ্রদ্ধেয় পিতা হযরত মাওলানা মুফতি মুহাম্মাদ শফী রহ. যখন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি সেই সময়কার কথা। একবার চেতনা ফিরে এলে তিনি সর্বপ্রথম যে কথা আমাকে বলেছিলেন তা হলো-
'যত লোকের সাথে আমার সম্পর্ক আছে, তাদের সকলের কাছে আমার পক্ষ থেকে একটি চিঠি পাঠাও। লিখে দাও যে, আমার কাছে যদি কারো কোনো হক থেকে থাকে, কারো গীবত করে থাকি বা কারো কারো সাথে কোনো মন্দ আচরণ করে থকি, সে যেন তার বদলা নিয়ে নেয় অথবা আমাকে ক্ষমা করে দেয়। নির্দেশিত মোতাবেক আমি একখানা পত্র লিখে এবং 'তালাফি মা ফাতা' নামে প্রথমে 'আল বালাগ' পত্রিকায় ছেপে দেই। তারপর হ্যান্ডবিল আকারেও ছেপে তাঁর সাথে যাদের সম্পর্ক ছিল তাদের সকলের কাছে পাঠিয়ে দেই।
যা হোক বান্দার হকের প্রতিকার কেবল মৌখিক তাওবা দ্বারা হয় না; বরং হকদারের কাছ থেকেও ক্ষমা নেয়া জরুরী। গীবত করলে বান্দার হক নষ্ট করা হয়। তাই যার গীবত হয়ে গেছে, তার কাছেও ক্ষমা চাওয়া আবশ্যক।
📄 যার গীবত হয়েছে তার প্রশংসা করুন
হযরত থানভী রহ. বলেন, সেই সঙ্গে এটাও জরুরী যে, যাদের সামনে গীবত করা হয়েছিল, এখন তাদের সামনে সেই ব্যক্তির প্রশংসা করুন এবং আগের কথা যে ভুল ছিল তা বুঝিয়ে দিন। কেননা, আপনি তার কাছে তো ক্ষমা চাইলেন এবং আল্লাহ তায়ালার কাছে তাওবা-ইসতিগফার করে সম্পর্ক ঠিক করে নিলেন। কিন্তু গীবত দ্বারা মানুষের অন্তরে তার সম্পর্কে যে ভুল ধারণা সৃষ্টি করেছিলেন, তা তো যথারীতি রয়ে গেল। তারও প্রতিকার অপরিহার্য। সে জন্য এখন তার প্রশংসা করুন এবং আগের কথা ভুল প্রমাণ করে দিন। তাদেরকে বলুন, আমি আগে তার সম্পর্কে যা বলেছিলাম, তা সঠিক ছিল না।
অতঃপর হযরত থানভী রহ. বলেন, সে কথা যদি ভুল না হয়ে সঠিক হয়ে থাকে, তবে বলে দিন ভাই! সেই কথার ভিত্তিতে ওই ব্যক্তিকে খারাপ মনে করো না। কেননা, ওহী ছাড়া সত্য কথার উপরও পরিপূর্ণ বিশ্বাস হতে পারে না। অর্থাৎ গীবতকালে যদি কারো সত্যিকারের দোষের কথা বলা হয়, আর গীবত তো অনেক সময় সত্য কথারও হয়ে থাকে। তবে তো এখন একথা বলা যাবে না যে, সে কথা সঠিক ছিল না। কারণ তা বললে তো মিথ্যা বলা হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে বলে দিন যে, আমার সে কথার উপর বিশ্বাস রেখে তুমি অমুক সম্পর্কে কুধারণা করো না। কেননা, আমার নিজেরও এখন সে কথার উপর বিশ্বাস নেই।
কারণ, সত্যকথার উপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস ওহী ছাড়া সম্ভব নয়। পরিপূর্ণ বিশ্বাসের জন্য চাই প্রত্যক্ষকরণ বা ওহী। এ ছাড়া শতভাগ বিশ্বাসের অন্য কোনো উপায় নেই। কাজেই এ কথা বলতে কোনো দোষ নেই যে, এখন সেই কথার উপর আমার নিজেরও বিশ্বাস ও আস্থা নেই। ইনশাআল্লাহ এর দ্বারা সেই গীবতের প্রতিকার হয়ে যাবে।
📄 গীবত কৃত ব্যক্তির মৃত্যু হলে করনীয়
হযরত থানভী রহ. বলেন, যার গীবত করা হয়েছে, সেই ব্যক্তি যদি মারা গিয়ে থাকে, তবে এখন ক্ষমালাভের উপায় হলো, তার জন্য দুআ ও ইসতিগফার করতে থাকা। যতক্ষণ পর্যন্ত মন সাক্ষ্য না দেবে যে, এখন সে রাজি-খুশি হয়ে গেছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এ আমল চালিয়ে যাবে।
অর্থাৎ যে ব্যক্তির গীবত করা হয়েছে তার জীবদ্দশায় তো ক্ষমা চাওয়া হয়নি। মৃত্যুর পর হুঁশ হয়েছে যে, গীবত দ্বারা আমি তার যে হক নষ্ট করেছি, তা তো মাফ করানো হলো না। এখন মাফ করানোর উপায় কী? উপায় হলো, তার জন্য দুআ করতে থাকা এবং তার দ্বারা যে সব গুনাহ হয়ে গেছে সে, জন্য আল্লাহ তায়ালার কাছে ক্ষমা চাওয়া যে, হে আল্লাহ! তার গুনাহসমূহ মাফ করে দিন। এ আমল যথারীতি চালিয়ে যাবে যতক্ষণ না মন সাক্ষ্য দেয় যে, সে এখন রাজি-খুশি হয়ে গেছে।
মোটকথা, বান্দার হকের বিষয়টি অত্যন্ত জটিল। বান্দা যতক্ষণ ক্ষমা না করে ততক্ষণ পর্যন্ত তা ক্ষমা হয় না। যার হক নষ্ট করা হয় তার ইন্তিকাল হয়ে গেলে ব্যাপারটা আরো কঠিন হয়ে যায়। তবে কোনো অবস্থাতেই হতাশার কারণ নেই। আল্লাহ তায়ালা ক্ষমা প্রাপ্তি কোনো অবস্থায়ই এমনভাবে বন্ধ করে দেন না যে, তারপর আর ক্ষমা লাভের কোনো সুযোগ থাকে না।