📄 বুযুর্গদের বিভিন্ন রং
হযরত থানভী রহ. 'আরওয়াহে ছালাছা' নামক কিতাবে একটা ঘটনা লিখেছেন। এক ব্যক্তি জনৈক বুযুর্গের কাছে গিয়ে বললো, হযরত! শুনেছি বুযুর্গদের বিভিন্ন রং হয়ে থাকে। একজনের এক রং, অন্যজনের অন্য রং। সে রঙের বিভিন্নতা আমি দেখতে চাই। বুযুর্গ বললেন, ভাই কোন্ চক্করে তুমি পড়ে গেলে? রাখ এসব। কিন্তু সে লোক নাছোড় বান্দা। পীড়াপীড়ি করতে থাকল যে, তাকে তা জানাতেই হবে। শেষে বুযুর্গ বললেন, ঠিক আছে তুমি অমুক গ্রামে যাও। সেখানে মসজিদে তিনজন বুযুর্গ পাবে। তারা ইবাদত-বন্দেগীতে মশগুল। তুমি গিয়ে পেছন থেকে প্রত্যেককে একটা করে ঘুষি মারবে। তারপর কি প্রতিক্রিয়া হয় এসে আমাকে জানাবে। কথামত লোকটি সেই গ্রামে গেল এবং এক-এক করে তিনও বুযুর্গকে তিনটি ঘুষি মারলো। ফিরে আসলে বুযুর্গ জিজ্ঞেস করলেন, কি হয়েছে বলো? সে বললো, আজব ঘটনা ঘটেছে। আমি যখন প্রথম বুযুর্গকে ঘুষি মারলাম, তিনি ফিরেও তাকালেন না। যথারীতি আপন যিকিরে মশগুল থাকলেন। যখন দ্বিতীয়জনকে ঘুষি মারলাম, তিনি সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন এবং আমাকেও একটা ঘুষি মেরে দিলেন। তৃতীয়জনকে ঘুষি মারার পর দেখা গেল, অন্য আচরণ। তিনি উঠে আমার হাত টিপতে শুরু করলেন এবং বললেন, ভাই! আপনার হাতে ব্যাথা পেয়েছেন কি? ঘটনা শোনার পর বুযুর্গ বললেন, তুমি যে বুযুর্গদের রংয়ের ভিন্নতা দেখতে চাচ্ছিলে, এটাই সেই ভিন্নতা। একই আচরণের বিপরীতে তুমি তিনজন থেকে তিন ধরণের প্রতিক্রিয়া পেলে। একেই বুযুর্গদের রংয়ের পার্থক্য বলে।
📄 হারিয়ে যাবে গন্তব্য
প্রথম বুযুর্গের রং ছিল এই যে, তিনি চিন্তা করেছেন, আমি আল্লাহ তায়ালার যিকিরে রত আছি। এ অবস্থায় কোনো লোক আমাকে মেরে থাকলে তাতে কি আসে যায়। কে মেরেছে; কেন মেরেছে, যদি ফিরে দেখতে যাই এবং তার থেকে প্রতিশোধ নিই, তাতে আমার লাভ কি? বরং এতে আমার সময় নষ্ট হবে এবং আমার যিকিরে ব্যাঘাত ঘটবে। তার চেয়ে বরং আপন কাজে লেগে থাকি সেটাই ভালো। এ জন্য তিনি ফিরেও দেখেননি কে মেরেছে। এই ছিল এক রং।
📄 সহানুভূতির উপর ভিত্তি করে প্রতিশোধ
দ্বিতীয় বুযুর্গ ঘুরে দাঁড়িয়েছেন এবং প্রতিশোধ নিয়ে নিয়েছেন, তার আরেক রং। আচ্ছা বলো তো তিনি কি তোমার মত সমান ঘুষি মেরেছেন? না তোমার চেয়ে জোরে? সে বললো, আমি যেমন জোরে মেরেছি তেমনই জোরে সে আমাকে মেরেছে। তিনি বললেন, এটাই তার রং। তিনি চিন্তা করেছেন, আল্লাহ তায়ালা প্রতিশোধ নিতে অনুমতি দিয়েছেন। কাজেই আমি তা নিয়ে নেই। অনেক সময় প্রতিশোধ নেয়াটাও আল্লাহওয়ালাদের পক্ষ থেকে মমতা হয়ে থাকে। কেননা, ক্ষেত্রবিশেষ তাদের সবর আঘাতকারীদের পক্ষে অশুভ পরিণাম বয়ে আনে। হাদীসে কুদসীতে আছে, আল্লাহ তায়ালা বলেন,
مَنْ عَادَى لِي وَلِيًّا فَقَدْ أَذَنْتُهُ بِالْحَرْبِ
অর্থাৎ, যে ব্যক্তি আমার কোনো ওলীর সাথে শত্রুতা রাখবে, আমি তার সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করি। (বুখারী-৬৫০২, ইফা.-৬০৫৮, সহীহহা-১৬৪০, জামিউস সগীর-১৭৮২, মিশকাত-২২৬৬, হাদীসের শব্দাবলী বুখারীর)
অনস্বীকার্য, বান্দার প্রতিশোধ অপেক্ষা আল্লাহর শাস্তি অনেক কঠোর হয়ে থাকে। সেই কঠোর শাস্তি থেকে রক্ষার উদ্দেশ্যেই বুযুর্গগণ অনেক সময় প্রতিশোধ নিয়ে থাকেন। এটা তাদের মমতা বৈকি? এই বুযুর্গ সেই কারণেই বদলা নিয়েছেন। এটা ছিল দ্বিতীয় রং।
📄 তৃতীয় রং
তৃতীয় বুযুর্গ চিন্তা করেছেন, আমার আর কতটুকু ব্যথা লেগেছে, আমাকে ঘুষি মেরে সেও কি ব্যথা পায়নি? এ চিন্তাতেই তিনি উঠে তার হাত টিপতে শুরু করেছেন। এটা হলো তৃতীয় রং।
কথা হচ্ছিল, অন্যের দূর্ব্যবহারে রাগ উঠলে বা অন্তরে মলিনতা জন্ম নিলে তাতে দোষ নেই এবং তা কোনো গুনাহও নোই। তবে সেই রাগের বশবর্তীতে যদি প্রতিশোধ নিতে যান এবং তাতে সীমালংঘন করে ফেলেন, তাহলে অবশ্যই গুনাহ হবে এবং সেজন্য আপনাকে জবাবদিহী করতে হবে। তাই প্রতিশোধ না নিয়ে ক্ষমা ক েদেয়া উত্তম। তাতে নিজেকে ঝুঁকিতেও ফেলা হলো না, আবার সবর ও ক্ষমার জন্য সাওয়াবও পেয়ে যাবেন।