📄 গীবতের কারণে নিজের প্রতি শাস্তি আরোপা করা
হযরত থানভী রহ. গীবত থেকে বাঁচার জন্য নিজের প্রতি দন্ডারোপকে সহায়ক বলেছেন। অর্থাৎ ধার্য করে নেবে যে, ভবিষ্যতে কখনো গীবত হয়ে গেলে নিজেকে শান্তি দিব। অন্যত্র তিনি বলেন, শান্তিদানে পরিমিতবোধের পরিচয় দিতে হবে। অর্থাৎ শাস্তি এত লঘু হলে চলবে না, যাকে মানুষ গ্রাহ্যই করে না।
আমার শ্রদ্ধেয় পিতা রহ. ঘটনা শোনাতেন যে, যখন 'আলীগড় কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন নিয়ম করে দেয়া হয়েছিল, প্রত্যেক ছাত্রকে অবশ্যই জামাতে নামায পড়তে হবে। কারো জামাত ছুটে গেলে প্রতি নামাযের জন্য দু'আনা পয়সা জরিমানা দিতে হবে। কিন্তু এ জরিমানা এতটাই হালকা ছিল যে, জামাতে অবহেলাকারীরা এর কোরো পরোয়া করত না। কোনো কোনো ছাত্র শুরুতেই সারা মাসের জরিমানা একত্রে দিয়ে দিত। অর্থাৎ জরিমানা অন্ততপক্ষে এতটুকু হতে হবে যা আদায় করতে কিছুটা কষ্ট হয়।
আবার এত বেশিও হবে না, যা আদায় করা অত্যন্ত কষ্টকর। কেননা, সে ক্ষেত্রে দু'টোই হাতছাড়া হবে। গাফেল ব্যক্তি যথারীতি গাফলতিই করে যাবে, আমলে মনোযোগী হবে না, আবার জরিমানাও দেবে না। কাজেই জরিমানা হতে হবে মধ্যম ধরণের।
📄 গীবত হয়ে গেলে অনাহারে থাকা
জরিমানার বিষয়টাও সকলের জন্য অভিন্ন হবে না। কেননা, একই জরিমানা সকলের জন্য ফলপ্রসূ নাও হতে পারে। সুতরাং অর্থদন্ড উপকার হবে কেবল তাদেরই জন্য, যাদের পক্ষে দান-খয়রাত করা কঠিন। তারা যদি নিজের উপর জরিমানা আরোপ করে যে, কখনো আমার দ্বারা গীবত হয়ে গেলে এই পরিমাণ টাকা সদকাহ করবো। তাহলে সেই সদকার ভয়ে তারা গীবত হতে বিরত থাকবে। যেহেতু সদকাহ দিলে নফস ও মন শান্তি পাবে।
অপরদিকে যারা টাকা-পয়সার কোনো হিসাব করে না, তাদের জন্য এ জরিমানায় কোন কাজ হবে না। তাদের উচিত এমন কোনো জরিমানা স্থির করা যাতে মন কষ্ট পায়। হযরত থানভী রহ. এ স্থলে পরামর্শ দিয়েছেন যে, তারা সিদ্ধান্ত নিবে, আর কখনো গীবত হয়ে গেলে এক বেলা না খেয়ে থাকবো। অনশন করবো।
আজকাল লোকে অনশন ধর্মঘটকে উল্টো কাজে ব্যবহার করছে। যখন অন্যের উপর চাপ সৃষ্টি করার ইচ্ছা হয়, তখন অনশন ধর্মঘট করে। সংকল্প থাকে সে ব্যক্তি চাপ গ্রহণ না করলে না খেয়ে মারা যাবে। এরূপ অনশন জায়েয নেই। হযরত থানভী রহ. যে অনশনের পরামর্শ দিয়েছেন, সেটা অন্যের উপর নয়; বরং নিজের উপর চাপ সৃষ্টির জন্য। অর্থাৎ একবার গীবত হয়ে গেলে এই লক্ষ্যে অনশন করবে যাতে ভবিষ্যতে আর কখনো গীবত না হয়। নফসকে ভয় দেখাবে যে, আবারও গীবত করলে এরকম অনশনের শাস্তি ভোগ করতে হবে। এটা খুবই কার্যকারী ব্যবস্থা। মানুষ এটা গ্রহণ করলে অল্পদিনের মধ্যেই সুফল পেতে পারে। নফসের উপর যখন অনাহারের কষ্ট হবে, তখন এক পর্যায়ে গীবত ছেড়েই দিবে।
📄 অন্যের দোষ প্রকাশ করার হুকুম
এক ব্যক্তি প্রশ্ন করেছিল, যেসব লোক কবীরা গুনাহে লিপ্ত, তাদের দোষ প্রকাশ করলে তা কি গীবত হবে? নফস যুক্তি দাঁড় করায় যে, এরূপ লোকের দোষ প্রকাশ না হলে তো মানুষ তার দ্বারা প্রতারিত হবে। অথচ মুসলিমদেরকে অন্যের ধোঁকা থেকে রক্ষা করা জরুরি।
অর্থাৎ যেসব লোক সম্পর্কে আমরা জানি যে, তাদের মধ্যে এই-এই দোষ আছে, তাদের সে সব দোষ সম্পর্কে মানুষের জানা থাকা দরকার। যাতে তারা তার দ্বারা প্রতারিত না হয়। সুতরাং আমরা এরূপ লোকের গীবত করবো, কি করবো না? যে ব্যক্তি এ প্রশ্ন করেছিল, সে ছিল একজন নবীন সালেক। অর্থাৎ সে আধ্যাত্মিকতার পথে একজন নবাগত। নিজেকে সংশোধন করার জন্য কেবলই এসেছে। প্রাথমিক অবস্থাতেই সে এই প্রশ্ন করে।
📄 প্রথম পর্যায়ে বৈধ গীবতও করবে না
হযরত থানভী রহ. উত্তরে বলেন, এ প্রশ্ন মুনতাহী অর্থাৎ যে ব্যক্তি সাধনাপথের শেষ পর্যায়ে আছে তার জন্য প্রযোজ্য। মুবতাদী অর্থাৎ যে কেবল যাত্রা শুরু করেছে তার উচিত জায়েয গীবত থেকেও বিরত থাকা। যে ব্যক্তি ইসলাহী কার্যক্রমের কেবল সূচনা করেছে, নিজেকে সংশোধন করার পথে যাত্রা শুরু করেছে, এখন তার দরকার নিজেকে গঠন করা। এ পর্যায়ে জায়েয গীবতও তার জন্য সমীচীন নয়।
এ কথাটিই হযরত মাওলানা ইয়াকুব নানুতবী রহ. একটি দৃষ্টান্ত দ্বারা এভাবে বুঝিয়ে ছিলেন যে, কোনো মোড়ানো কাগজ যদি তুমি সোজা করতে চাও, তবে তাকে সোজা ধরে যতই চাপাচাপি কর না কেন কিছুতেই সোজা হবে না। তা সোজা করার একমাত্র উপায় হলো, উল্টো দিকে মুড়িয়ে দেয়া। কিছুক্ষণ উল্টো দিকে মুড়িয়ে রেখে ছেড়ে দাও, দেখবে একদম সোজা হয়ে গেছে। মানবমনও এরূপ উল্টো দিকে মোড়ানো আছে। সে অবৈধ গীবতে অভ্যস্ত হয়ে আছে। সে অভ্যাস সোজাসুজি মোড়ানো যাবে না। এর জন্য দরকার বিপরীত দিকে মোড়ানো। তাকে প্রথম দিকে বৈধ গীবত থেকেও বিরত রাখতে হবে। এর দ্বারা সে সোজা হবে এবং এক পর্যায়ে শুধরে যাবে। পরে আর সে কখনো অবৈধ গীবতে লিপ্ত হবে না। যা হবে তা বৈধটাই হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে আমল করার তাওফিক দান করুন।