📄 প্রত্যেকের চিকিৎসা ভিন্ন ভিন্ন হয়
দ্বিতীয়ত: কার সাথে কী আচরণ করতে হবে, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে শায়েখের অন্তরে জাগ্রত করা হয়। একেক জনের এলাজ বা চিকিৎসা একেক ধরণের হয়ে থাকে। কারো চিকিৎসা করতে হয় থাপ্পর মেরে, কারো চিকিৎসা করতে হয় ধমক দিয়ে, কারো বা হয় আদর-স্নেহ দিয়ে। এখন কার জন্য কোন্ পন্থা উপযোগী তা আল্লাহ তায়ালা শায়েখের অন্তরে উদয় করে দেন। অন্যরা দেখে মনে করে শায়েখ তার সাথে একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে। কিন্তু প্রকৃত রহস্য থাকে তার অগোচরে। সে জানেনা যে, আল্লাহ তায়ালা এরই মধ্যে তার সংশোধন নিহিত রেখেছেন।
📄 আমার শ্রদ্ধেয় পিতা রহ.-এর অভ্যাস
আমি আমার শ্রদ্ধেয় পিতার মধ্যেও এ ব্যাপারটি বারবার লক্ষ্য করেছি। এমনিতে তো তিনি অত্যন্ত নম্র স্বভাবের মানুষ ছিলেন। রাগ করতেন না বললেই চলে। প্রত্যেকের সাথে তাঁর ব্যবহার ছিল কোমল ও বিনীত। কিন্তু কখনো কখনো এমনও হত যে, হঠাৎ কারো উপর তুচ্ছ কোন বিষয় নিয়ে খুব রেগে গেছেন। উপস্থিতদর্শীদের কাছে তা বেখাপ্পা মনে হত। তাদের ধারণা হত, লোকটির সাথে বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাঁর নেক বান্দাদের অন্তরে এই বোধ জাগিয়ে দেন যে, কখন কার প্রতি কী আচরণ করতে হবে। অন্যরা তা বুঝতে পারে না বলেই ভুল ধারণা করে।
📄 এক ভদ্রলোককে তিরস্কারের ঘটনা
এরকম একটা ঘটনা শুনুন। একবার একজন খ্যাতিমান উচ্চ শিক্ষিত ও গুরুত্বপূর্ণ লোক তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত করতে আসে। কথাবার্তা শুরু হলো। কিন্তু তিনি হয়ত দুই-তিনটি বাক্যই বলতে পেরেছিলেন, এরই মধ্যে আব্বাজী রহ. তাকে কঠিনভাবে তিরষ্কার করতে শুরু করলেন। আমি অবাক হলাম। আজ পর্যন্ত তাকে এমন কঠিনভাবে কাউকে ধমকাতে দেখিনি। এমনকি তিনি তাকে এ পর্যন্তও বললেন যে, 'এখান থেকে বের হও'। এভাবে তিনি তাকে অফিস থেকে বের করে দিলেন। আজ পর্যন্ত আমি এমন দৃশ্য দেখিনি। আমি ভাবলাম, ইয়া আল্লাহ! এই লোক তো বিগড়ে যাবে। কারণ, সে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত। কোর্ট-প্যান্ট পরিহিত ভদ্রলোক। দাঁড়ি আছে নামমাত্র। আব্বাজী রহ. তাকে যেভাবে ধমকি দিয়েছেন, তাতে সে চিরতরে দূরে সরে যাবে। কিন্তু আমার সে ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। সেই ব্যক্তি নিজেই আমাকে একদিন বললেন, মুফতি সাহেবের সেই ধমক আমার জীবনকে সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়েছে। সেই ধমক আমার উপর এমনই প্রভাব বিস্তার করে যে, তাতে আমার চিন্তা-চেতনার কেন্দ্রবিন্দু একদম বদলে যায়।
যা হোক, কার সাথে কখন কি আচরণ করতে হবে, তা আল্লাহ তাআলাই তাঁর নেক বান্দাদের অন্তরে ঢেলে দেন। কাজেই কোনো আল্লাহ ওয়ালাকে যদি দেখেন কাউকে ধমকাচ্ছেন, কাউকে শাসন করছেন ও কাউকে স্নেহ করছেন, তবে সাবধান! কোনো রকম খারাপ ধারণাকে অন্তরে ঠাই দিবেন না। কেননা, প্রকৃত দাতা তো আল্লাহ তাআলাই। তিনিই সমস্ত কল্যাণ ও উপকারের উৎস। শায়েখ মাধ্যম মাত্র। আল্লাহ তাআলাই শায়েখকে অলক্ষ্যে বুঝিয়ে দেন যে, কার জন্য ইসলাহের কোন পদ্ধতি সমীচিন। সকলকে একই ব্যবস্থাপত্র দেয়া হয় না। তাই আল্লাহ ওয়ালাদের কর্মপন্থায় কখনো আপত্তি করা উচিত নয়।
📄 আগে ভাবুন পরে বলুন
কাজেই হযরত মির্যা মাজহার জানে জান রহ. যে সেই দুই শিক্ষার্থীকে বলখ ফেরত গিয়ে সেখানকার হাওয মেপে আসার শাস্তি দিলেন। এটা নিজ ইচ্ছামত দেননি। হয়তো আল্লাহ তাআলাই তাঁর অন্তরে এ ব্যবস্থা উদয় করে দিয়েছেন। একবার যখন ধাক্কা লেগে যাবে তা সারা জীবনের জন্য উপকার দেবে। উপকার ঠিকই দিয়েছিল। হযরত মির্যা সাহেব রহ. এর দ্বারা শিক্ষা দিয়েছেন যে, জবানের ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন জরুরী।
সতর্কতা কিভাবে অবলম্বন করা যাবে? হযরত থানভী রহ. সে সম্পর্কে বলেন, প্রথমে চিন্তা করবে, আমি যে কথা বলতে চাচ্ছি তা সঠিক কিনা? এতে কোনো সীমালংঘন নেই তো? কোনো রকম মিথ্যার সংমিশ্রণ বা অতিরঞ্জন কিংবা অসতর্কতা হয়ে যাচ্ছে না তো?
আমরা আজকাল এসব চিন্ত-ভাবনা ছেড়ে দিয়েছি। আর এ কারণেই যতসব ঝগড়া-বিবাদ ও অনর্থ-অশান্তির উৎপত্তি। কোনো একজন না জেনে, না শুনে চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই একটা কথা বলে ফেলে। সে ঠিক বলছে না বেঠিক, প্রকৃত ঘটনা স্মরণে রাখতে পেরেছে, নাকি ভুলে গেছে তার কোনো খবর নেই। বলে দিল আর তাই নিয়ে সকলে লেগে পড়ল। শুরু হয়ে গেল আত্মকলহ ও পরিবারে পরিবারে দ্বন্দ্ব। কাজেই প্রথমে চিন্তা করুন আসলে ব্যাপারটা কি ছিল, কী বলা হয়েছিল এবং কী পরিমাণে বলা হয়েছিল। তারপর কোথাও সেটা বলতে হলে সেই পরিমাণই বলুন যতটুকু প্রথম ব্যক্তি বলেছিল। নিজের পক্ষ থেকে একটি কথাও যেন যোগ করা না হয়।
হযরত থানভী রহ. বলেন, জবান তো সর্বক্ষণই চলছে, তা বকবক করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। থামার কোনো নাম নেই। এ অবস্থায় সর্বক্ষণ চিন্তা করবেই বা কিভাবে? এর ভাব হচ্ছে, যে কোনো কাজ অনুশীলন দ্বারাই আয়ত্ত করা যায়। তাই অনুশীলন করতে হবে। প্রথমদিকে তো চিন্তা করার কথা খিয়ালই হবে না। কিন্তু চিন্তা করার প্রতি একটু মনোযোগ দিলে ক্রমে অভ্যাস গড়ে উঠবে। প্রথম দিকে চিন্তা করার কথা ভুলে গেলে অসুবিধা নেই। পরে যখনই মনে পড়বে চিন্তা করে নিবে। আবারও ভুলবে, আবারও মনে পড়বে। এভাবে দিন যেতে থাকবে আর অভ্যাসও গড়তে থাকবে। পরিশেষে একদিন এমন আসবে যে, ব্যাপারটা আয়ত্তে এসে যাবে। তখন চিন্তার জন্য বিশেষ যত্নের দরকার হবে না, চিন্তা আপনা-আপনিই এসে যাবে এবং তখন যে কথাই বলা হবে সঠিকই বলা হবে। গীবত, মিথ্যা কথা, অপ্রীতিকর কথা, অনর্থক কথা প্রভৃতি গুনাহ থেকে বাঁচার তাওফিক হবে।