📄 চিকিৎসা কঠিন হওয়ার আপত্তি ও তার জবাব
এ ঘটনা বর্ণনা করার পর হযরত থানভী রহ. বলেন, কারো মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, সেই শিক্ষার্থীরা তো বড় জোর একটা ভুল কাজ করেছিল। ভুল-চুক না হলে তাদের আসারই বা কি প্রয়োজন ছিল? তারা এসেছিল নিজেদের ইসলাহ ও সংশোধন করতে। আগে থেকে কামেল হয়ে থাকলে, জবানের উপর নিয়ন্ত্রণ থাকলে এবং চিন্তা-ভাবনা নিজ শাসনে থাকলে, শায়েখের কাছে আসার কোনো প্রয়োজন ছিল না। কাজেই এ ত্রুটির কারণে শায়েখ তাদের বাইআত করতে অস্বীকার করলেন কেন? প্রথমে বাইআত করে নিতেন, তারপর চিকিৎসা করতেন। সেটাই তো যুক্তিযুক্ত ছিল। হযরত থানভী রহ. এর জবাবে বলেন যে, এখানে দু'টো বিষয় আছে। প্রথমত: এই অস্বীকৃতি দ্বারা বোঝানো উদ্দেশ্য ছিল যে, কিছু বিষয়ের প্রতি সালেক ও মুরীদের প্রথম থেকেই লক্ষ্য থাকা দরকার। প্রথমে যদি বড়-বড় ও স্থুল বিষয়াদির প্রতি সতর্ক দৃষ্টি থাকে, তবেই মুরীদের পক্ষে শায়েখ দ্বারা উপকার লাভ সম্ভব হবে। হ্যাঁ, যে সব জিনিস সূক্ষ্ম ও গভীর সাধারণত মুরীদের দৃষ্টি সেদিকে যায় না। শায়েখ দ্বারা সে গুলোকেই সংশোধন করাতে হয়। তো শায়েখ এস্থলে বাইআত করতে অস্বীকার এ জন্যই করেছেন যে, এখনো পর্যন্ত স্থুল ভুল-ত্রুটির দিকেও তাদের লক্ষ্য যায় নি। যে কারণে তারা বাইআতের উপযুক্ত হয়ে উঠেনি।
📄 প্রত্যেকের চিকিৎসা ভিন্ন ভিন্ন হয়
দ্বিতীয়ত: কার সাথে কী আচরণ করতে হবে, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে শায়েখের অন্তরে জাগ্রত করা হয়। একেক জনের এলাজ বা চিকিৎসা একেক ধরণের হয়ে থাকে। কারো চিকিৎসা করতে হয় থাপ্পর মেরে, কারো চিকিৎসা করতে হয় ধমক দিয়ে, কারো বা হয় আদর-স্নেহ দিয়ে। এখন কার জন্য কোন্ পন্থা উপযোগী তা আল্লাহ তায়ালা শায়েখের অন্তরে উদয় করে দেন। অন্যরা দেখে মনে করে শায়েখ তার সাথে একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে। কিন্তু প্রকৃত রহস্য থাকে তার অগোচরে। সে জানেনা যে, আল্লাহ তায়ালা এরই মধ্যে তার সংশোধন নিহিত রেখেছেন।
📄 আমার শ্রদ্ধেয় পিতা রহ.-এর অভ্যাস
আমি আমার শ্রদ্ধেয় পিতার মধ্যেও এ ব্যাপারটি বারবার লক্ষ্য করেছি। এমনিতে তো তিনি অত্যন্ত নম্র স্বভাবের মানুষ ছিলেন। রাগ করতেন না বললেই চলে। প্রত্যেকের সাথে তাঁর ব্যবহার ছিল কোমল ও বিনীত। কিন্তু কখনো কখনো এমনও হত যে, হঠাৎ কারো উপর তুচ্ছ কোন বিষয় নিয়ে খুব রেগে গেছেন। উপস্থিতদর্শীদের কাছে তা বেখাপ্পা মনে হত। তাদের ধারণা হত, লোকটির সাথে বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাঁর নেক বান্দাদের অন্তরে এই বোধ জাগিয়ে দেন যে, কখন কার প্রতি কী আচরণ করতে হবে। অন্যরা তা বুঝতে পারে না বলেই ভুল ধারণা করে।
📄 এক ভদ্রলোককে তিরস্কারের ঘটনা
এরকম একটা ঘটনা শুনুন। একবার একজন খ্যাতিমান উচ্চ শিক্ষিত ও গুরুত্বপূর্ণ লোক তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত করতে আসে। কথাবার্তা শুরু হলো। কিন্তু তিনি হয়ত দুই-তিনটি বাক্যই বলতে পেরেছিলেন, এরই মধ্যে আব্বাজী রহ. তাকে কঠিনভাবে তিরষ্কার করতে শুরু করলেন। আমি অবাক হলাম। আজ পর্যন্ত তাকে এমন কঠিনভাবে কাউকে ধমকাতে দেখিনি। এমনকি তিনি তাকে এ পর্যন্তও বললেন যে, 'এখান থেকে বের হও'। এভাবে তিনি তাকে অফিস থেকে বের করে দিলেন। আজ পর্যন্ত আমি এমন দৃশ্য দেখিনি। আমি ভাবলাম, ইয়া আল্লাহ! এই লোক তো বিগড়ে যাবে। কারণ, সে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত। কোর্ট-প্যান্ট পরিহিত ভদ্রলোক। দাঁড়ি আছে নামমাত্র। আব্বাজী রহ. তাকে যেভাবে ধমকি দিয়েছেন, তাতে সে চিরতরে দূরে সরে যাবে। কিন্তু আমার সে ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। সেই ব্যক্তি নিজেই আমাকে একদিন বললেন, মুফতি সাহেবের সেই ধমক আমার জীবনকে সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়েছে। সেই ধমক আমার উপর এমনই প্রভাব বিস্তার করে যে, তাতে আমার চিন্তা-চেতনার কেন্দ্রবিন্দু একদম বদলে যায়।
যা হোক, কার সাথে কখন কি আচরণ করতে হবে, তা আল্লাহ তাআলাই তাঁর নেক বান্দাদের অন্তরে ঢেলে দেন। কাজেই কোনো আল্লাহ ওয়ালাকে যদি দেখেন কাউকে ধমকাচ্ছেন, কাউকে শাসন করছেন ও কাউকে স্নেহ করছেন, তবে সাবধান! কোনো রকম খারাপ ধারণাকে অন্তরে ঠাই দিবেন না। কেননা, প্রকৃত দাতা তো আল্লাহ তাআলাই। তিনিই সমস্ত কল্যাণ ও উপকারের উৎস। শায়েখ মাধ্যম মাত্র। আল্লাহ তাআলাই শায়েখকে অলক্ষ্যে বুঝিয়ে দেন যে, কার জন্য ইসলাহের কোন পদ্ধতি সমীচিন। সকলকে একই ব্যবস্থাপত্র দেয়া হয় না। তাই আল্লাহ ওয়ালাদের কর্মপন্থায় কখনো আপত্তি করা উচিত নয়।