📄 অনর্থক কথার উপর দু’জন শিক্ষার্থীর ঘটনা
দিল্লীতে হযরত মির্যা জানে জান রহ. নামে একজন উচ্চস্তরের বুযুর্গ ছিলেন। খুবই নাজুক স্বভাবের ছিলেন। তার সম্পর্কে বহু ঘটনা আছে। একবার আফগানিস্তানের বলখ থেকে দু'জন লোক তাঁর কাছে মুরীদ হওয়ার জন্য আসলেন। তারা সেখান থেকেই তাঁর বুযুর্গীর সুখ্যাতি শুনেছিলেন এবং তাতে তাদের অন্তরে তাঁর প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা জন্মেছিল। তাই মনস্থির করে ফেলেছিলেন তাঁর কাছে মুরীদ হবে।
বলখ থেকে দিল্লী অনেক দূরের পথ। কিন্তু মুরীদ হওয়ার উদ্দিপনায় পথের দূরত্ব তাদের কাছে কোনো বাধা মনে হয়নি। হযরত মির্যা সাহেব রহ. যে মসজিদে নামায পড়তেন তারা এসে সেখানে উপস্থিত হলেন। তখন নামাযেরও সময় হয়ে যাচ্ছিল। তাই তারা দু'জন হাওযে ওযু করতে বসে গেল। তারা ওযু করছিল আর হাওয নিয়ে পরস্পর কথা বলছিল। একজন প্রশ্ন করলেন, হাওয কোন্টি বড়? এটি, না আমাদের বলখের জামে মসজিদেরটি? অপরজন বললেন, এটিই বড়।
প্রশ্নকর্তা বললেন, না বলখেরটি বড়। পরস্পর এ নিয়ে বাহস চলছিল। ঠিক এমন সময়ে হযরত মির্যা সাহেব রহ. সে পথে মসজিদে আসছিলেন। তিনি তাদের কথাবার্তা শুনে ফেলেন। নামাযের পর তারা তাঁর কাছে উপস্থিত হলেন এবং সবিনয়ে জানালেন যে, আমরা বলখ থেকে এসেছি। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কী উদ্দেশ্যে? তারা বললেন, আপনার হাতে বাইআতের উদ্দেশ্যে।
হযরত মির্যা সাহেব রহ. বললে, বাইআতের জন্য এসেছেন ভালো কথা, কিন্তু হাওয কোন্টি বড় তার সমাধান কি হয়ে গেছে? একথা শুনে তারা লজ্জায় শেষ! আমাদের এই ফালতু আলাপ হযরত শুনে ফেলেছেন! কেউ কোনো কথা বললেন না। শেষে হযরত বললেন, এখনো যদি মীমাংসা না হয়ে থাকে, তবে একটা কাজ করুন। বাইআতের ব্যাপারটা পরে হোক। তার আগে বলখ চলে যান। গিয়ে সেই হাওযটি মাপুন। তারপর আবার এখানে চলে আসুন এবং এই হাওযটি মাপুন। এভাবে আগে ফায়সালা করে নিন হাওয কোন্টি বড়, আর কোন্টি ছোট। তারপর বাইআত হোন। কেননা, আপনাদের কথাবার্তা দ্বারা বোঝা গেছে, যে বিষয়ে আলোচনা করছিলেন, তার সঠিক জ্ঞান আপনাদের কারো নেই। সেই সঙ্গে নেই সতর্কতাও। একজন মাপজোখ ছাড়াই দাবি করে বসলেন হাওয এইটি বড়। দ্বিতীয়জনও একইভাবে দাবি করলেন ঐটি বড়। এভাবে না জেনে একটি বিষয়ে বাহাস শুরু করে দিলেন। এর দ্বারা জানা গেল আপনাদের স্বভাবে সতর্কতা নেই। দ্বিতীয়ত জানা গেল, আপনারা ফুযূল (অনর্থক) কথাবার্তায় অভ্যস্ত। যদি জানাও থাকত কোন্টি বড়, তাতে দুনিয়া বা আখেরাতের কি ফায়দা হত? কাজেই আপনাদের আলোচনা ফালতু নয়ত কি? সুতরাং আপনারা বলখ চলে যান এবং হাওযটা মেপে আসুন। তার আগে আমি বাইআত করবো না।
📄 চিকিৎসার উপকারিতা
আগের দিনে তো চিকিৎসা এভাবে করা হতো। কিন্তু বর্তমানে রূহানী চিকিৎসাকে অত্যন্ত শক্ত ও তিক্ত মনে করা হয়। তা যতই তিক্ত হোক নিশ্চিত করেই বলা যায়, তাদের সারা জীবনের জন্য এই এক চিকিৎসাই যথেষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এরপর আর তারা না জেনে কোনো কথা বলবে কিংবা অনর্থক আলোচনায় লিপ্ত হবে, তা ভাবাই যায় না। যা হোক, এক সময় এভাবে চিকিৎসা করা হতো। কেবল যিকির ও তাসবীহ বলে দেয়া আর বসে বসে ওজীফা পাঠ করাকেই যথেষ্ট মনে করা হতো না। কেবল ওজীফা আদায় দ্বারা কামেল বুযুর্গ হয়ে যাবে এরূপ ধারণা সেকালে ছিলো না। বরং এভাবে দালাই-মাড়াই করা হতো এবং তার ফলশ্রুতিতে তাদের ইসলাহ ও আত্মিক পরিশুদ্ধি লাভ হতো।
📄 চিকিৎসা কঠিন হওয়ার আপত্তি ও তার জবাব
এ ঘটনা বর্ণনা করার পর হযরত থানভী রহ. বলেন, কারো মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, সেই শিক্ষার্থীরা তো বড় জোর একটা ভুল কাজ করেছিল। ভুল-চুক না হলে তাদের আসারই বা কি প্রয়োজন ছিল? তারা এসেছিল নিজেদের ইসলাহ ও সংশোধন করতে। আগে থেকে কামেল হয়ে থাকলে, জবানের উপর নিয়ন্ত্রণ থাকলে এবং চিন্তা-ভাবনা নিজ শাসনে থাকলে, শায়েখের কাছে আসার কোনো প্রয়োজন ছিল না। কাজেই এ ত্রুটির কারণে শায়েখ তাদের বাইআত করতে অস্বীকার করলেন কেন? প্রথমে বাইআত করে নিতেন, তারপর চিকিৎসা করতেন। সেটাই তো যুক্তিযুক্ত ছিল। হযরত থানভী রহ. এর জবাবে বলেন যে, এখানে দু'টো বিষয় আছে। প্রথমত: এই অস্বীকৃতি দ্বারা বোঝানো উদ্দেশ্য ছিল যে, কিছু বিষয়ের প্রতি সালেক ও মুরীদের প্রথম থেকেই লক্ষ্য থাকা দরকার। প্রথমে যদি বড়-বড় ও স্থুল বিষয়াদির প্রতি সতর্ক দৃষ্টি থাকে, তবেই মুরীদের পক্ষে শায়েখ দ্বারা উপকার লাভ সম্ভব হবে। হ্যাঁ, যে সব জিনিস সূক্ষ্ম ও গভীর সাধারণত মুরীদের দৃষ্টি সেদিকে যায় না। শায়েখ দ্বারা সে গুলোকেই সংশোধন করাতে হয়। তো শায়েখ এস্থলে বাইআত করতে অস্বীকার এ জন্যই করেছেন যে, এখনো পর্যন্ত স্থুল ভুল-ত্রুটির দিকেও তাদের লক্ষ্য যায় নি। যে কারণে তারা বাইআতের উপযুক্ত হয়ে উঠেনি।
📄 প্রত্যেকের চিকিৎসা ভিন্ন ভিন্ন হয়
দ্বিতীয়ত: কার সাথে কী আচরণ করতে হবে, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে শায়েখের অন্তরে জাগ্রত করা হয়। একেক জনের এলাজ বা চিকিৎসা একেক ধরণের হয়ে থাকে। কারো চিকিৎসা করতে হয় থাপ্পর মেরে, কারো চিকিৎসা করতে হয় ধমক দিয়ে, কারো বা হয় আদর-স্নেহ দিয়ে। এখন কার জন্য কোন্ পন্থা উপযোগী তা আল্লাহ তায়ালা শায়েখের অন্তরে উদয় করে দেন। অন্যরা দেখে মনে করে শায়েখ তার সাথে একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে। কিন্তু প্রকৃত রহস্য থাকে তার অগোচরে। সে জানেনা যে, আল্লাহ তায়ালা এরই মধ্যে তার সংশোধন নিহিত রেখেছেন।