📄 সময়মত নামায পড়া ফরয
তার উদাহরণ পেশ করা যায় জনৈক ডাক্তার সাহেবকে দিয়ে। তার স্ত্রী আমাকে জানান যে, এমনিতে তো আমার স্বামী খুব ভালো মানুষ। কিন্তু ক্লিনিকে কর্মরত থাকা অবস্থায় নামায পড়েন না। আমি তাকে নামাযের সময়ে নামায আদায় করে নিতে বললে উত্তরে তিনি বলেন, আমি তো মানুষের সেবা করছি। এটা বান্দার হক। রোগী চিকিৎসার অপেক্ষায় বসে থাকবে আর আমি নামাযে দাঁড়াব? তিনি কর্মরত সময়টা এভাবে পার করেন। অতঃপর বাসায় ফিরে আসর, মাগরিব ও ইশার নামায একত্রে আদায় করে নেন। তার কথা হলো, আমি মানবসেবায় নিয়োজিত আছি। মানুষের সেবা করতে যেয়ে নামায কাযা হলে কোনো ক্ষতি নেই।
ভাই! মানবসেবা অতি উত্তম কাজ তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সেটা তো আমার উপর নামাযের মত ফরযে আইন নয়। তা ছাড়া মানবসেবার সাথে নামাযের কোনো বিরোধও নেই। আসরের ৪ রাকআত ফরয নামায পড়ার পর আবার রোগী দেখা শুরু করলে এমন কী ক্ষতি হয়ে যাবে? আসলে নামায কাযা করানোর জন্য নফস ও শয়তান মানবসেবাকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এসবই প্রান্তিকতা ও দ্বিমুখী নীতি। দ্বীনের সঠিক বুঝ না থাকার কারণেই এসব হয়ে থাকে। এ কারণেই হযরত থানভী রহ. বলেন, অন্যের মন রক্ষার খাতিরে নিজের দ্বীনকে ক্ষতিগ্রস্ত করা উচিত নয়। কাজেই গীবতকালে বাধা দিলে গীবতকারী মনে কষ্ট পাবে কিংবা মজলিস থেকে উঠে গেলে সে আহত হবে, এসব চিন্তা একদম বাদ দিয়ে দিন। গুনাহ থেকে আত্মরক্ষার ফলে কেউ মনে কষ্ট পেলে তা পেতে দিন। অন্যের মন রক্ষা করা কেবল ততক্ষণই কর্তব্য, যতক্ষণ তা বৈধতার সীমার মধ্যে থাকে। সেই সীমার মধ্যে আপনার দ্বারা যাতে কারো মনে আঘাত না লাগে সেদিকে অবশ্যই লক্ষ্য রাখুন। কিন্তু অন্যের মন রক্ষা করতে গিয়ে যদি গুনাহে লিপ্ত হতে হয়, তবে সে মন রক্ষার কোনো বৈধতা নেই। গুনাহ থেকে অবশ্যই বাঁচতে হবে। সে জন্য কেউ মনে কষ্ট পেলে পাক, এতে আপনার কিছু আসে-যায় না; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টই কাম্য।
📄 অপরের জন্য নিজের আখেরাত বরবাদ করা চরম বোকামি
হাদীস শরীফে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি অন্যের পার্থিব স্বার্থে নিজ আখেরাত নষ্ট করে, আল্লাহ তায়ালা তার উপর দুনিয়ার সেই ব্যক্তির আধিপত্য দান করেন। ফলে যার জন্য সে নিজ আখেরাত বরবাদ করেছিল, সেই ব্যক্তি তার দুনিয়াও বরবাদ করে দেয়। এটা একটা পরিক্ষিত বিষয়। দেখা যায়, যে ব্যক্তি স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততির ভোগ-বিলাসিতার জন্য অবৈধ উপার্জনে লিপ্ত হয়, তার মাথার উপর সেই স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিই এমনভাবে চেপে বসে যে, তাদের উৎপাতে তার সব আরাম হারাম হয়ে যায়। তা তো হারাম হবেই, যেহেতু সে স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিকে খুশি করার জন্য আল্লাহ তায়ালাকে নাখোশ করেছিল এবং তাদের পার্থিব স্বার্থে নিজ আখেরাত বরবাদ করেছিল। সুতরাং সাবধান! অন্যের মন রক্ষার খাতিরে যেন নিজের দ্বীন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
📄 গীবত থেকে বাঁচার জন্য দৃঢ় মনোবল প্রয়োজন
হযরত আলী রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
لَاطَاعَةَ فِي مَعْصِيَةِ اللَّهِ إِنَّمَا الطَّاعَةُ فِي الْمَعْرُوفِ
অর্থাৎ, আল্লাহ তায়ালার নাফরমানীমূলক কোনো কাজে আনুগত্য করা জায়েয নেই। বরং আনুগত্য কেবলমাত্র ন্যায় ও সৎ কাজেই হবে। (বুখারী-৭২৫৭, ৪৩৪০, ইফা.-৬৭৬৩, মুসলিম-৪৬৫৯, ইফা.-৪৬১৩, হাদীসের শব্দাবলী উভয়ের)
কাজেই গীবত করা যেহেতু নাফরমানীর কাজ, যা করলে আল্লাহ তায়ালা নাখোশ হন, তাই তার জন্য কোনো মানুষের মন রক্ষার প্রয়োজন নেই এবং তা করার কোনো বৈধতাও নেই। মনে রাখতে হবে, কোনো কাজই হিম্মত ও দৃঢ় মনোবল ছাড়া হয় না। সব কাজেই কিছু না কিছু কষ্ট-ক্লেশ করতেই হয়। যেকোনো ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ফল কেবল শ্রম-সাধনার পরই পাওয়া যায়। এখন আপনি যদি বিশ্বাস করেন, গীবত করা মন্দ কাজ ও কঠিন গুনাহ। সেই সঙ্গে এ কথাও স্বীকার করেন যে, এর দ্বারা আখেরাত বরবাদ হয়, তবে এর থেকে বাঁচার জন্য আপনাকে শ্রম-সাধনা করতেই হবে। আপনি যখন হিম্মত করে কাজে লেগে পড়বেন, তখন আল্লাহ তায়ালার আপনাকে সাহায্য করবেন। ফলে এই গুরুতর পাপ থেকে আত্মরক্ষা করা সহজ হয়ে যাবে।
📄 বধ গীবত করার শর্ত হলো ঘৃণা করা
এক ব্যক্তি হযরত থানভী রহ. কে জিজ্ঞেস করলো, কেউ যদি অন্তরঙ্গতার কারণে কারো সম্পর্কে এমন কোনো কথা বলে, যা আপাতদৃষ্টিতে তার পক্ষে মনঃক্ষুণ্ণতার কারণ হলেও অন্তরঙ্গতা বা রসিকতা হিসেবে বলার কারণে মনঃক্ষুণ্ণতার দিকে লক্ষ্য থাকে না। এরূপ কথাও কি নিষিদ্ধ গীবত ও নাজায়েয হবে?
প্রশ্নকর্তা বুঝাতে চাচ্ছিল যে, কোনো কোনো লোকের সাথে গভীর হৃদ্যতা থাকায় তাদের সাথে খোলামেলা কথাবার্তা বলা হয়। রসিকতা করা হয় ও সহজ-সরল আচরণ করা হয়। এরূপ কারো সম্পর্কে যদি তার অনুপস্থিতিতে এমন কোনো কথা বলা হয়, যা আপাতদৃষ্টিতে গীবতই হয়ে থাকে এবং তা অন্য কারো সম্পর্কে বলা হলে সে তাকে সহজভাবে নেবে না; বরং পেছনে সমালোচনা করা হচ্ছে ভেবে মনে কষ্টই পাবে, কিন্তু এখানে যেহেতু মনে কষ্ট পাবে এমনটা চিন্তা করা হয় না। এক্ষেত্রে কি সে রকম কথা গীবত হিসেবে গণ্য হবে এবং সে কারণে তা নাজায়েয হবে?
হযরত থানভী রহ. বলেন, 'যেহেতু তা মনঃক্ষুণ্ণতার কারণ, তাই যেভাবে বলা হোক না কেন নাজায়েয হবে। এমনকি সে মনক্ষুন্ন হবে কি না তা নিয়ে যদি সন্দেহও থাকে, তবুও তা পরিত্যাজ্য। অবশ্য মনে কষ্ট পাবে না বলে নিশ্চিত বিশ্বাস থাকলে তখন আর তা গীবতের মধ্যে পড়বে না। অর্থাৎ আমি যার সম্পর্কে বলছি সে আমার এসব কথা শুনলে যে মনে কষ্ট পাবে না, এ ব্যাপারে আমি শতভাগ নিশ্চিত, যেহেতু তার সাথে আমর সম্পর্ক এমনই। তখন তা গীবতের অন্তর্ভুক্ত হবে না।
উদাহরণত, আপনি আপনার কোনো বন্ধুকে একবার কথা প্রসঙ্গে বলে দিলেন, 'তুমি বড় অকৃতজ্ঞ।' পরে কোনো মজলিসে তার সম্পর্কে কথা উঠল আর তখন আপনি বলে উঠলেন, আরে ঐ অকৃতজ্ঞের কথার কোনো মূল্য আছে? এই অকৃতজ্ঞ শব্দটা এমন যে, তৃতীয় কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে বলা হলে তার কাছে অত্যন্ত অপ্রীতিকর বোধ হবে। কিন্তু বন্ধুদের মাঝে এ জাতীয় শব্দ হর-হামেশাই ব্যবহৃত হয় এবং তাতে কেউ কিছু মনে করে না। এই কিছু মনে না করার ব্যাপারটি যদি নিশ্চিত হয়। অর্থাৎ যদি এই বিশ্বাস থাকে যে, আমার একথাটি বন্ধু শুনলে এটাকে সহজভাবে নেবে, মন খারাপ করবে না। তবে এটা গীবতের মধ্যে পড়বে না। কিন্তু সেই নিশ্চয়তা যদি না থাকে; বরং মনে কষ্ট পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং না পাওয়ারও সম্ভাবনা থাকে, তখন একে নাজায়েয গণ্য করতে হবে।