📄 জনৈক প্রফেসর সাহেবের পর্যালোচনা
একবার আমি গীবত সম্পর্কে একটি প্রবন্ধ লিখলে সেটি এক ইউনির্ভাসিটির প্রফেসর সাহেবের নজরে আসল। তিনি সেটি পড়ার পর আমার কাছে চিঠি লিখলেন। তাতে বললেন, আপনি গীবত সম্পর্কে যে প্রবন্ধটি লিখেছেন, তাতে বলেছেন, গীবত একটি কবীরা গুনাহ এবং হারাম ও নাজায়েয কাজ। আপনি নানাভাবে এর মন্দত্ব তুলে ধরেছেন এবং একে একটি মারাত্মক নিন্দনীয় কাজ সাব্যস্ত করেছেন। কিন্তু আমি বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভেবেছি। শেষ পর্যন্ত আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, গীবতকে জীবন থেকে ছাটাই করা সম্ভব নয়। কেননা, গীবতবিহীন জীবনের মজা কোথায়? যে জীবনে গীবত নেই তা বিলকুল নিরানন্দ।
আমরা যখন দু'চারজন লোক কোথাও একত্রিত হই এবং কোনো কথাবার্তায় লিপ্ত হই, তখন সে কথাবার্তায় গীবত তো থাকতেই হবে। না হলে কথা চলবে কোন্ বিষয়? যা চলবে তা কেবল আল্লাহ আল্লাহ যিকির। তাতে না থাকবে কোনো আনন্দ-ফুর্তি, না বিনোদন ও মজা। আপনি এ সম্পর্কে যে লম্বা- চওড়া প্রবন্ধ লিখেছেন এবং এর যে নিন্দা করেছেন, তার অর্থ হলো আপনার মতে মানব-জীবনে আনন্দ-ফুর্তির কোনো স্থান নেই। সকলের উচিত এসব ঝেড়ে ফেলে সম্পূর্ণ শুষ্ক জীবন-যাপন করা। যেই জীবনের সূধা ও মাধূর্য বলতে কিছুই থাকবে না।
তিনি যেহেতু একজন প্রফেসর, তাই নিজ চিন্তা-চেতনা অনুযায়ী এই বলে চিঠি শেষ করলেন যে, আমার মোটেই বুঝে আসছে না মানুষ সর্বদা যেই কাজে লিপ্ত এবং যা ছাড়া জীবনের কোনো আনন্দ থাকে না, ইসলাম সেটাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করবে? আমি তার চিঠির উত্তরে লিখেছিলাম, আপনি যে বলছেন, গীবত না থাকলে জীবনের আনন্দই শেষ হয়ে যাবে। তাহলে আমার প্রশ্ন হচ্ছে, গীবত না করলে যদি আপনার জীবনের মাধূর্য শুকিয়ে যায়- তবে অপর যে ব্যক্তি আপনার গীবত করছে, তার সম্পর্কে আপনি কি বলবেন? আপনি যখন জানতে পারবেন, অমুক ব্যক্তি অমুক মজলিসে এবং অমুক অমুক মজলিসে আপনার গীবত করে করে জীবনের রস গ্রহণ করছে, তখনো কি আপনি জীবনের মাধূর্য উপভোগ করবেন? না ভিন্ন কোনো অবস্থা তৈরি হবে।
📄 নিজের ও অন্যদের জন্য একই নীতি গ্রহণ করুন
প্রত্যেকে কেবল নিজের আনন্দটাই দেখে। একথা খুব কম লোকেই চিন্তা করে যে, আমি অন্যের সাথে যে ব্যবহার করছি, অন্য ব্যক্তিও যদি আমার সাথে সেই রকম ব্যবহার করে, তখন আমার কাছে কেমন লাগবে? তখনো কি আমি আনন্দ বোধ করবো, নাকি বিষাদে আমার মন ভেঙ্গে যাবে? হাদীস শরীফে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপারে এমনই এক ব্যবস্থা দান করেছেন, যা কেবল একজন নবীর পক্ষেই সম্ভব। অন্যদের জন্য অসম্ভব। এ ব্যবস্থাপত্র গ্রহণ করলে সমাজের যাবতীয় সমস্যার সমাধান হয়ে যেতে পারে। এটাই পারস্পরিক কলহ-বিবাদ থেকে মুক্তির প্রকৃত ঔষধ। আমরা সে ঔষধ ভুলে গেছি বলেই সবরকম অন্যায়-অনাচার জন্ম নিচ্ছে। নববী জবানে সে প্রদত্ত ব্যবস্থাটি হলো-
لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ لِأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ
অর্থ: তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য তা-ই পছন্দ করবে, যা নিজের জন্য পছন্দ করে। (বুখারী-১৩, ইফা.-১২, মুসলিম-৪৫, তিরমিযী-২৫১৫, নাসাঈ-৫০১৬, ৫০১৭, ইবনে মাজাহ-৬৬, আহমাদ-১১৫৯১, ১২৩৫৪, ১২৩৭২, ১২৩৯০, ১২৭৩৪, ১২৯৯৪, দারিমী-২৭৪০, হাদীসের শব্দাবলী বুখারীর)
ব্যাখ্যা: অপর এক হাদীস দ্বারা এই হাদীসটির তাৎপর্য পরিপূর্ণভাবে অনুধাবন করা যায়। এক ব্যক্তি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে উপস্থিত হয়ে আরজ করলো, আমি ইসলাম গ্রহণ করতে চাই, তবে ব্যভিচার ছাড়তে পারবো না। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কাছে নিয়ে বললেন, তুমি কি এটা পছন্দ করো যে, তোমার মা, তোমার বোন কিংবা তোমার মেয়ের সাথে অন্য কেউ ব্যভিচার করুক? সে সাথে সাথে জবাব দিল কষ্মিণকালেও না। যদি কেউ এরূপ করে আমি তাকে তরবারী দ্বারা দ্বি-খণ্ডিত করে ফেলবো। তখন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে তুমি যে নারীর সঙ্গে ব্যভিচার করবে সেতো অবশ্যই কারো মা, কারো বোন কিংবা কারো মেয়ে হবে! আর তুমি যেহেতু এ কাজটি পছন্দ করো না, সুতরাং তুমি এ কাজটি করলে অন্য মুসলিম কীভাবে পছন্দ করবে?
এ কথা বলার সাথে সাথে সে অনুতপ্ত হলো এবং বললো যে, আমি তাওবাহ করছি জীবনে আর কখনো ব্যভিচার করবো না। কত চমৎকার উপদেশ! যদি মুসলিম জাতি এই একটি মাত্র উপদেশ গ্রহণ করে, তবে সমাজ থেকে ধোঁকা-প্রতারণা, চুরি-ডাকাতি, মারামারি-হানাহানি, যিনা-ব্যভিচার, ঝগড়া-বিবাদ সহ সকল অপকর্মের অবসান হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ। (তোহফাতুল বারী শরহে সহীহ বুখারী-১/৯৪)