📘 গীবত ও তার ভয়াবহ ক্ষতি > 📄 গীবতের গুনাহের ভয়াবহতা

📄 গীবতের গুনাহের ভয়াবহতা


গীবত বা পরনিন্দা করা সম্পূর্ণ হারাম। এটা মাদক সেবন করা, যিনা করা, শূকরের গোশত খাওয়া, চুরি-ডাকাতি করার মতোই কবিরাহ গুনাহ। বরং তদপেক্ষাও মারাত্মক। কেননা, মাদক সেবন ও শূকরের গোশত খাওয়ার সম্পর্ক আল্লাহর হকের সাথে। কেউ যদি মাদক সেবন করে বা শূকরের গোশত খায়, তবে সে অপরাধ তার নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। বান্দার হকের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। যার ফলে কখনো খাঁটি অন্তরে তাওবা করলে আল্লাহ তায়ালা তা ক্ষমা করে দিবেন। কিন্তু গীবতের ব্যাপারটা এমন নয়। এর সম্পর্ক বান্দার হকের সাথে। বান্দার হকের নিয়ম আল্লাহর হকের মতো নয়। এটা যতক্ষণ পর্যন্ত বান্দার পক্ষ হতে ক্ষমা করা না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালা ক্ষমা করবেন না। যত নামায-রোযা করুক, যতই তাওবা-ইসতেগফার করুক তা ক্ষমা হওয়ার নয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমি নিজের হক তো ক্ষমা করে দিব, কিন্তু তোমাদের কেউ যদি অন্যের জান-মালের ক্ষতি করে, তার মান-সম্মানের উপর আঘাত করে কিংবা অন্য কোনো ভাবে তার কোনো হক নষ্ট করে, তবে যতক্ষণ পর্যন্ত সেই বান্দা তা ক্ষমা না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি তাকে ক্ষমা করবো না। বান্দার হকের বিষয়টা এমনই মারাত্মক। কিন্তু আমরা তা খুবই মামুলি মনে করি। যেন নাকের উপর মাছি বসল, আর আমরা তা আঙ্গুল নেড়ে তাকে উড়িয়ে দিলাম। মনে রাখতে হবে, গীবতের ব্যাপার এতটা তুচ্ছ নয়। এর সম্পর্ক বান্দার হকের সাথে। তাই সতর্ক হওয়া আবশ্যক।

📘 গীবত ও তার ভয়াবহ ক্ষতি > 📄 গীবতের সংজ্ঞা

📄 গীবতের সংজ্ঞা


গীবত অর্থ কারো পিছনে তার নিন্দা করা। অর্থাৎ কারো সম্পর্কে এমন কথা বলা, যা শুনলে সে কষ্ট পায়। এটা গুরুতর গুনাহ। এত মারাত্মক গুনাহ আমরা নিশ্চিন্তে করে যাচ্ছি। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পরস্পর যেসব কথাবার্তা বলে থাকি, লক্ষ্য করে দেখুন, তার মধ্যে কতগুলো গীবত থাকে? আর গীবত করে না, এমন লোক খুঁজে পাওয়া-ই মুশকিল। কেউ কেউ এমন আছে, যে সহজে স্বীকার করতে চায় না যে, আমি গীবত করি। সাফাই দেয়ার জন্য বলে, আমি এ কথা তার মুখের উপর বলতে পারবো। বোঝাতে চায়, যে কথা মুখের উপর বলা যায়, সে কথা তার অগোচরে বললে গীবত হয় না। এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। মুখের উপর বলতে পারা না পারা কোনো বিষয় না। কথাটি যদি তার অসন্তুষ্টির কারণ হয়, তবে তা অবশ্যই গীবত। এরূপ কথা তার সামনে বললেও তা গীবত হবে। সুতরাং কারো পিছনে যদি আপনি তার সম্পর্কে কোনো অপ্রীতিকর কথা বলেন, তবে আপনি তার গীবত করলেন। আপনি মৃত ভাইয়ের গোশত খেয়ে ফেললেন। (নাউযুবিল্লাহ)

📘 গীবত ও তার ভয়াবহ ক্ষতি > 📄 গীবত ও অপবাদের মাঝে পার্থক্য

📄 গীবত ও অপবাদের মাঝে পার্থক্য


হাদীস শরীফের মধ্যে আছে, এক সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! গীবত কী? তিনি বললেন, তুমি যদি তোমার ভাইয়ের সম্পর্কে এমন কোনো কথা বলো, যা সে পছন্দ করে না, তবে সেটাই গীবত। সে সাহাবী পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি যা বলি তা যদি সত্যিই আমার ভাইয়ের মধ্যে থাকে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তবেই তো তুমি তার গীবত করলে। অর্থাৎ তার মধ্যে বাস্তবেই যে দোষ আছে, সেটা তার অগোচরে বললেই তা গীবত হয় এবং কবীরা গুনাহ হয়। পক্ষান্তরে, সে দোষ যদি তার মধ্যে না থাকে, বরং তুমি মিথ্যা বানিয়ে তার নামে তা বলে থাক, তবে তা হবে অপবাদ। তাতে গীবতের গুনাহ তো আছেই, সাথে সাথে মিথ্যা বলার গুনাহও যুক্ত হবে। কাজেই তার পাপ হবে দ্বিগুণ। (মুসলিম-৬৭৫৮, ৬৪৮৭, ইফা.-৬৩৫৭, আবু দাউদ-৪৮৩৪, ৪৮৭৬, তিরমিযী-১৯৩৪, আহমাদ-৭১০৬, ৮৭৫৯, ৯৫৮৬, ২৭৪৭৩, দারিমী-২৭১৪, হাদীসের শব্দাবলী মুসলিমের)
একজন লোকের একটা দোষ আছে। আপনি এক মজলিসে সেটা উল্লেখ করলেন। হয়ত বললেন, অমুক লোকটি বড় মিথ্যুক। বাস্তবেও সে মিথ্যা বলে। তা সত্ত্বেও তার অগোচরে যে বললেন, সে মিথ্যুক। এটাই গীবত। গীবত করে আপনি গুনাহগার হলেন- যদি মিথ্যুক বলাটা তার কাছে অপ্রীতিকর হয়। পক্ষান্তরে, সে যদি বাস্তবই মিথ্যাবাদী না হয়, আর আপনি তার অগোচরে তাকে মিথ্যাবাদী বলেন, তবে আপনি দু'টো গুনাহ করলেন। গীবতের গুনাহ আর অপবাদ দেয়ার গুনাহ। কাজেই নিজ জিহ্বাকে সংযত রাখুন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান।

📘 গীবত ও তার ভয়াবহ ক্ষতি > 📄 জনৈক প্রফেসর সাহেবের পর্যালোচনা

📄 জনৈক প্রফেসর সাহেবের পর্যালোচনা


একবার আমি গীবত সম্পর্কে একটি প্রবন্ধ লিখলে সেটি এক ইউনির্ভাসিটির প্রফেসর সাহেবের নজরে আসল। তিনি সেটি পড়ার পর আমার কাছে চিঠি লিখলেন। তাতে বললেন, আপনি গীবত সম্পর্কে যে প্রবন্ধটি লিখেছেন, তাতে বলেছেন, গীবত একটি কবীরা গুনাহ এবং হারাম ও নাজায়েয কাজ। আপনি নানাভাবে এর মন্দত্ব তুলে ধরেছেন এবং একে একটি মারাত্মক নিন্দনীয় কাজ সাব্যস্ত করেছেন। কিন্তু আমি বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভেবেছি। শেষ পর্যন্ত আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, গীবতকে জীবন থেকে ছাটাই করা সম্ভব নয়। কেননা, গীবতবিহীন জীবনের মজা কোথায়? যে জীবনে গীবত নেই তা বিলকুল নিরানন্দ।
আমরা যখন দু'চারজন লোক কোথাও একত্রিত হই এবং কোনো কথাবার্তায় লিপ্ত হই, তখন সে কথাবার্তায় গীবত তো থাকতেই হবে। না হলে কথা চলবে কোন্ বিষয়? যা চলবে তা কেবল আল্লাহ আল্লাহ যিকির। তাতে না থাকবে কোনো আনন্দ-ফুর্তি, না বিনোদন ও মজা। আপনি এ সম্পর্কে যে লম্বা- চওড়া প্রবন্ধ লিখেছেন এবং এর যে নিন্দা করেছেন, তার অর্থ হলো আপনার মতে মানব-জীবনে আনন্দ-ফুর্তির কোনো স্থান নেই। সকলের উচিত এসব ঝেড়ে ফেলে সম্পূর্ণ শুষ্ক জীবন-যাপন করা। যেই জীবনের সূধা ও মাধূর্য বলতে কিছুই থাকবে না।
তিনি যেহেতু একজন প্রফেসর, তাই নিজ চিন্তা-চেতনা অনুযায়ী এই বলে চিঠি শেষ করলেন যে, আমার মোটেই বুঝে আসছে না মানুষ সর্বদা যেই কাজে লিপ্ত এবং যা ছাড়া জীবনের কোনো আনন্দ থাকে না, ইসলাম সেটাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করবে? আমি তার চিঠির উত্তরে লিখেছিলাম, আপনি যে বলছেন, গীবত না থাকলে জীবনের আনন্দই শেষ হয়ে যাবে। তাহলে আমার প্রশ্ন হচ্ছে, গীবত না করলে যদি আপনার জীবনের মাধূর্য শুকিয়ে যায়- তবে অপর যে ব্যক্তি আপনার গীবত করছে, তার সম্পর্কে আপনি কি বলবেন? আপনি যখন জানতে পারবেন, অমুক ব্যক্তি অমুক মজলিসে এবং অমুক অমুক মজলিসে আপনার গীবত করে করে জীবনের রস গ্রহণ করছে, তখনো কি আপনি জীবনের মাধূর্য উপভোগ করবেন? না ভিন্ন কোনো অবস্থা তৈরি হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00