📄 কুৎসা রটানো গীবত থেকেও নিকৃষ্ট
কুৎসা রটানোর উপর কুরআন ও হাদীসে তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে। এটা গীবত অপেক্ষাও মারাত্মক। কেননা, গীবতে নিয়ত খারাপ থাকা শর্ত না। অর্থাৎ যার গীবত করা হয়, তার ক্ষতি হোক গীবতে এমন উদ্দেশ্য নাও থাকতে পারে। কিন্তু কুৎসা রটনায় ক্ষতি সাধনই মূখ্য হয়ে থাকে। ফলে তাতে দ্বিগুণ গুনাহ। গীবতের গুনাহ এবং অন্য মুসলিমের ক্ষতি সাধন করার গুনাহ। এই দ্বিবিধ গুনাহের কারণে কুরআন ও হাদীসে এ সম্পর্কে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারিত হয়েছে। কুরআন মাজিদে কুৎসা রটনাকারীর বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে।
هَمَّارٍ مَشَّاءٍ بِنَمِيمٍ
‘পশ্চাতে নিন্দাকারী, যে একের কথা অপরের কাছে লাগিয়ে বেড়ায়’। (সূরা কলম-১১)
এমর্মে হযরত আবু ওয়াইল থেকে বর্ণিত আছে। হুযাইফা রাযি. এর নিকট সংবাদ পৌঁছল যে, এক ব্যক্তি চোগলখোরী করে বেড়ায়। তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি:
لا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ نَمَّامُ
অর্থাৎ, চোগলখোর জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (মুসলিম-৩০৩, ১৯১, ইফা.-১৯২, তিরমিযী-২০২৬, আবু দাউদ-৪৮৭১, আহমাদ-২২৭৩৬, ২২৭৯৪, ২২৮১৪, ২২৮৫০, ২২৮৫৯, ২২৮৭৮, ২২৯১১, ২২৯২৪, ২২৯৪০, হাদীসের শব্দাবলী মুসলিমের)
চোগলখোরের কবরে ভয়াবহ শাস্তি দেয়া হবে
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ: مَرَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِحَائِطٍ مِنْ حِيطَانِ المَدِينَةِ ، أَوْ مَكَّةَ ، فَسَمِعَ صَوْتَ إِنْسَانَيْنِ يُعَذِّبَانِ فِي قُبُورِهِمَا، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : يُعَذِّبَانِ، وَمَا يُعَذِّبَانِ فِي كَبِيرٍ ثُمَّ قَالَ: بَلَى، كَانَ أَحَدُهُمَا لا يَسْتَتِرُ مِنْ بَوْلِهِ ، وَكَانَ الْآخَرُ يَمْشِي بِالنَّمِيمَةِ
অর্থ: ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: একবার নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনা অথবা মক্কার কোনো একটি বাগানের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। তিনি এমন দু'ব্যক্তির আওয়াজ শুনতে পেলেন যাদের কবরে আজাব হচ্ছিল। তখন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: এদের দু'জনকে আজাব দেয়া হচ্ছে অথচ কোনো বড় গুনাহের জন্য এদের আজাব দেয়া হচ্ছে না। তারপর তিনি বললেন: হ্যাঁ, এদের একজন তার পেশাবের নাপাকি থেকে সতর্কতা অবলম্বন করতো না। আরেকজন চোগলখুরী (গীবত) করতো। (বুখারী-২১৬, ২১৮, ১৩৬১, ১৩৭৮, ৬০৫২, ৬০৫৫, ইফা.-২১৬, মুসলিম- ২৯২, ৫৬৪, তিরমিযী-৭০, নাসাঈ-৩১, ২০৬৮, আবু দাউদ-২০, ইবনে মাজাহ-৩৪৭, আহমাদ- ১৯৮০, দারিমী-৭৩৯, হাদীসের শব্দাবলী বুখারীর)
ব্যাখ্যা: আলোচ্য হাদীসে কবরে শাস্তি প্রদানের দু'টি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে- (ক). একজন পেশাবের নাপাকী থেকে পূর্ণ সতর্কতা অবলম্বন করতো না অর্থাৎ, পেশাবের সময় পূর্ণ সতর্কতা অবলম্বন না করার দরুন পেশাবের ছিঁটা শরীরে লাগতো। তবে অপর বর্ণনায় সতর খুলে রাখার কথা উল্লেখ আছে। এ জন্যে পেশাবের সময় যথাসম্ভব সতর ঢেকে পূর্ণ সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরী। (খ). অপরজন চোগলখোরী করে বেড়াতো অর্থাৎ, একজনের কথা আরেকজনের কাছে বলে দু'জনের মাঝে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে দিতো।
এখান থেকে প্রতীয়মান হয় যে, এ দুটি কাজই অন্যায় ও নিন্দনীয়। বিশেষত আরো বহু হাদীসে চোগলখোরদের কবরে ভীষণ শাস্তির উল্লেখ আছে। এমনিক এক হাদীসে তাদের জিহ্বা করাত দিয়ে চিরে ফেলার কথাও বলা হয়েছে। আল্লাহ এই রোগ থেকে আমাদের হিফাজত করুন।
📄 গোপন কথা প্রকাশ করাও কুৎসা রটানোর শামিল
ইমাম গাযালী রহ. 'ইহয়াউল উলূম' কিতাবে লিখেন, অন্যের কোনো গোপন বিষয় ফাঁস করে দেয়াও কুৎসা রটানোর অর্ন্তভুক্ত। কেউ চায়না যে, তার গোপন বিষয় ফাঁস হয়ে যাক। বিষয়টা ভালো না মন্দ তা বিবেচ্য নয়। ভালো ব্যাপারও কারো গোপন রাখার ইচ্ছা থাকতে পারে। উদাহরণত, একজন লোক বেশ সম্পদশালী। সে তার সম্পদের কথা অন্যদের কাছে গোপন রাখতে চায়। তার কী পরিমাণ সম্পদ আছে তা কেউ জেনে ফেলুক এটা তার ইচ্ছা নয়। আপনি কোনো উপায়ে জেনে ফেললেন যে, তার কাছে এত এত পরিমাণ সম্পদ আছে। এখন যদি আপনি তা অন্যদের কাছে গেয়ে বেড়ান এবং মানুষকে জানিয়ে দেন যে, সে এই পরিমাণ অর্থের মালিক। তবে আপনি তার গোপন কথা ফাঁস করে দিলেন। এই ফাঁস করে দেয়াটাও সম্পূর্ণ হারাম।
অথবা, এক ব্যক্তি তার পারিবারিক কোনো বিষয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করে রেখেছে। আপনি যে কোনো উপায়ে তার পারিবারিক পরিকল্পনার কথা জেনে ফেলেছেন। এখন যদি আপনি তা অন্যদের কাছে প্রকাশ করে দেন, তবে তা হবে কুৎসা রটানো। অনুরুপভাবে মানুষের যে কোনো গোপন বিষয় বিনা অনুমতিতে প্রকাশ করাটা কুৎসা রটানোর অর্ন্তভুক্ত হবে। সুতরাং তা অবশ্যই পরিত্যাজ্য।
এক হাদীসে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
الْمَجَالِسُ بِالْآمَانَةِ
‘মজলিস আমানতের সাথে সম্পৃক্ত’।
অর্থাৎ, মজলিসে যে সব কথা হয় তাও আমানত। মজলিসে কোনো একজন আপনাকে গোপনীয়তা রক্ষাকারী ভেবে একটা কথা বললো। এখন আপনি যদি মজলিস থেকে বের হয়ে তা অন্যকে বলে দেন, তবে সেটা আমানতের খেয়ানত হবে। সেই সঙ্গে এটা কুৎসা রটানোর মধ্যেও পড়বে।
📄 যবানের দু’টি মারাত্মক গুনাহ
যা হোক আমরা মুখ দিয়ে যে সব গুনাহ করি তার মধ্যে গীবত ও কুৎসা রটানো সর্বাপেক্ষা মারাত্মক। আজ এ দু'টো সম্পর্কে আলোচনা করা উদ্দেশ্য ছিল। এ দু'টো যে কত গুরুতর আলোচনায় বর্ণিত হাদীস দ্বারা আপনারা তা বুঝতে পেরেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এ দু'টো যত গুরুতর, বর্তমানে আমাদের মধ্যে এর প্রতি উদাসীনতাও তত বেশি। ঘরে-বাইরে সর্বত্র সমানে এ দু'টো চলছে। জবান চলছে কাচির মত। থামার কোনো চেষ্টা নেই। আল্লাহর ওয়াস্তে জিহবায় লাগাম পরিয়ে নিন। আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হুকুম মোতাবেক তাকে চালানোর ফিকির করুন। তা না করার দরুন আজ ঘরে-ঘরে অশান্তি। পরস্পরে ঝগড়া-ফাসাদ। আপনজনদের মধ্যে শত্রুতা। আল্লাহ তায়ালাই জানেন এর ফলে কত রকমের গুনাহ ও কত প্রকারের ফাসাদ সৃষ্টি হচ্ছে। আর আখিরাতে এর জন্য যে শাস্তির ব্যবস্থা আছে, তা তো যথাস্থানে আছেই। আল্লাহ তায়ালা নিজ ফজল ও করমে আমাদেরকে এর মন্দত্ব ও কদর্যতা বোঝার তাওফিক দিন এবং আজকের আলোচনা অনুযায়ী আমল করার সাহায্য করুন।
واخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين
টিকাঃ
¹ আবূ দাউদ: ৪২২৬