📄 ক্ষমা চাওয়া ও ক্ষমা করার ফযীলত
হাদীস শরীফে এসেছে, কেউ যদি কারো কাছে ক্ষমা চায় ও সত্যিকারভাবে অনুতপ্ত হয়, আর তার ক্ষমাপ্রার্থনা ও লজ্জা-অনুতাপ দেখে সেই ব্যক্তি তাকে ক্ষমা করে দেয়, তবে আল্লাহ তায়ালা যেদিন ক্ষমালাভের প্রয়োজন সর্বাপেক্ষা বেশি হবে, সেই কিয়ামতের দিন এই ক্ষমাকারীকেও ক্ষমা করে দিবেন। পক্ষান্তরে, কেউ যদি অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে, কিন্তু সেই লোক তাকে ক্ষমা করতে অস্বীকার করে, তাহলে আল্লাহ তায়ালা বলে দেন যে, যেদিন ক্ষমালাভের প্রয়োজন সর্বাপেক্ষা বেশি হবে, সেই কিয়ামতের দিন আমিও তাকে ক্ষমা করবো না। আমার বান্দাকে যখন তুমি ক্ষমা করনি, তখন তোমাকে আমি কিভাবে ক্ষমা করি? সুতরাং ব্যাপারটা খুবই বিপজ্জনক। কেউ লজ্জিত-অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চাইলে, তাকে অবশ্যই ক্ষমা করা উচিত। ক্ষমা চেয়ে সে নিজ দায়িত্ব আদায় করে ফেলেছে। সে দায়মুক্ত হয়ে গেছে, তাতে দ্বিতীয় ব্যক্তি তাকে ক্ষমা করুক বা না করুক। কাজেই বান্দার হক নষ্ট করা হলে সে ব্যাপারে ক্ষমাপ্রার্থনা করতে লজ্জাবোধ করা উচিত নয়। বরং সর্বদা ক্ষমা চাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত এবং সাথীদেরও উচিত খুশি মনে তাকে মাফ করে দেওয়া।
আল্লাহর জন্য কাউকে ক্ষমা করে দেয়ার ফযীলত
হযরত আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
مَا نَقَصَتْ صَدَقَةٌ مِنْ مَالٍ, وَمَا زَادَ اللَّهُ عَبْدًا بِعَفُو إِلَّا عِزَّا, وَمَا تَوَاضَعَ أَحَدٌ لِلَّهِ إِلا رَفَعَهُ اللهُ
অর্থাৎ, দান-সদকা করলে সম্পদের ঘাটতি হয় না (বরং আল্লাহ আরো বৃদ্ধি করে দেন)। যে ব্যক্তি অন্যকে ক্ষমা করে দেয় আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন। আর যে কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে বিনীত হলে আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। (মুসলিম-৬৭৫৭, ইফা.-৬৩৫৬, তিরমিযী-২০২৯, আহমাদ-৭১৬৫, ৮৭৮২, মালিক-১৮৮৫, দারিমী-১৬৭৬, বায়হাকী-২১০৯০, তারগীব-৮৫৮, জামি'-৫৮০৯, ইবনে খুযাইমাহ-২৪৩৮, হাদীসের শব্দাবলী মুসলিমের)
ব্যাখ্যা: এখানে মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি গুণের কথা বলা হয়েছে- (১). মুমিন কখনো কার্পণ্য করবে না, বরং উদার মনে আল্লাহর রাস্তায় খরচ করবে। আর কৃপণ ব্যক্তি কখনো আল্লাহর ওলী হতে পারে না এবং সমাজের নেতৃত্বও দিতে পারে না। (২). মুমিন সর্বদা মানুষের সাথে আন্তরিকতাপূর্ণ আচরণ করবে। সাধারণ কোনো ভুল-ত্রুটি হলে তা নিয়ে বাড়াবাড়ি করবে না এবং ফিতনা-ফাসাদও সৃষ্টি করবে না; বরং সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করবে। আলোচ্য হাদীসে বলা হয়েছে, অন্যকে ক্ষমা করলে আল্লাহও তাকে ক্ষমা করে দিবেন। (৩). প্রকৃত মুমিন কখনো ক্ষমতা ও পদের বড়াই করবে না; বরং সর্বদা নিজেকে উম্মতের খাদেম মনে করবে। এতে আল্লাহ তার মর্যাদা আরো বৃদ্ধি করে দিবেন।
প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ক্ষমা প্রার্থনা
একদা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে দাঁড়িয়ে উপস্থিত সাহাবীদের লক্ষ্য করে বললেন, আজ আমি নিজেকে তোমাদের হাতে সমার্পণ করছি। আমার দ্বারা যদি কেউ কোন কষ্ট পেয়ে থাক বা আমি কারো জান-মালের কোন ক্ষতি করে থাকি, তাহলে আজ আমি তোমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। কেউ প্রতিশোধ নিতে চাইলে নিতে পারো। আর যতি ক্ষমা করতে চাও করতে পার। যাতে কিয়ামতের দিন আমার উপর তোমাদের কারো কোন হক বাকি না থাকে।
📄 ইসলামের একটি মূলনীতি
লক্ষ্য করুন, ইসলামের একটি মূলনীতি হলো- 'নিজের জন্য যা পছন্দ করবে অন্যের জন্য তাই পছন্দ করবে এবং নিজের জন্য যা অপছন্দ করবে, তা অপরের জন্য অপছন্দ করবে। এ মূলনীতিটা স্বয়ং নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন। এবার বলুন তো, কেউ যদি আপনার আড়ালে আপনার বদনাম করে। তাহলে আপনার কেমন লাগবে? আপনার কি তা ভালো লাগবে, নাকি খারাপ লাগবে? নিশ্চয় তা আপনার কাছে খারাপ লাগবে। যদি খারাপই লাগে এবং নিজের জন্য তা অপছন্দ করেন। তাহলে এই কাজটি আপনার ভাইয়ের জন্য পছন্দ করছেন কিভাবে? নিজের জন্য এক রকম আর অন্যের জন্য আরেক রকম এটা কেমন নীতি। একেই তো বলে মুনাফিকী। দেখা যায় গীবতের মধ্যে মুনাফিকীও থাকে। যদি এসব বিষয় চিন্তা করেন এবং গীবতের জন্য আখেরাতে যে আযাবের ব্যবস্থা আছে তাও ভাবতে থাকেন, তাহলে ইনশাআল্লাহ গীবতের অভ্যাস দুর হয়ে যাবে।
📄 গীবত থেকে বাঁচার সহজ উপায়
হাকিমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ. এ পর্যন্ত বলতেন যে, গীবত থেকে বাঁচার সর্বাপেক্ষা সহজ উপায় হলো- অন্যের সম্পর্কে কোনো রকম আলোচনা না করা। তার প্রশংসা করারও দরকার নেই এবং বদনাম করারও দরকার নেই। কেননা, শয়তান বড় খারাপ। তুমি যখন কারো প্রশংসা করে বলবে, অমুক বড় ভালো মানুষ। তার মধ্যে এই গুণ আছে, ঐ গুণ আছে। তখন মাথায় তো এটাই থাকবে যে, আমি তার কোন গীবত করছি না বরং তার প্রশংসাই করছি। তখন শয়তান সেই প্রশংসার মধ্যে এমন একটা বাক্য জুড়ে দিবে- যদ্দরুন সমস্ত প্রশংসা দূর্ণামে পরিণত হয়ে যাবে। যেমন, তুমি প্রশংসার একপর্যায়ে বলে ফেললে অমুক ব্যক্তি তো বড় ভালো মানুষ, কিন্তু তার মধ্যে এই একটা ব্যাপারও আছে। ব্যাস! শুধুমাত্র 'কিন্তু' শব্দটা সকল প্রশংসায় পেশাব ঢেলে দেয়ার মতো।
এ কারণে হযরত থানভী রহ. বলেন, অন্যের সম্পর্কে আলোচনা করারই দরকার নেই। তার গুণকীর্তনও করতে যেও না এবং তার দোষ-ত্রুটিও বলার দরকার নেই। অহেতুক আলোচনাই লিপ্ত হয়ে গুনাহের পথ তৈরি করার কী দরকার। একান্ত যদি কারো প্রশংসায় লিপ্ত হয়েও পড়, তবে খুব সতর্ক থাকবে, যাতে শয়তান ভুল পথে টেনে নিতে না পারে।
📄 নিজ অপরাধের প্রতি লক্ষ্য করুন
প্রিয় ভাই! অন্যের বদনাম কি করবেন, নিজের দোষ-ত্রুটির কি অভাব আছে? নিজের দোষ-ত্রুটির প্রতি লক্ষ করুন। অন্যের মধ্যে কোনো দোষ-ত্রুটি থাকলে সে কারণে তোমাকে শাস্তি ভোগ করতে হবে না। তার দোষ-গুণের জন্য শাস্তি বা পুরস্কার পেলে সে-ই পাবে। কাজেই তার যা আছে, তা নিয়ে সে থাকুক এবং তার হিসাবও আল্লাহ তায়ালা নিবেন। তোমাকে তোমার নিজ কর্মফলই ভোগ করতে হবে। ভালো হলে ভালো ফল পাবে, আর মন্দ হলে মন্দ ফল পাবে। কাজেই নিজের ফিকির নিজে করো।
تجھ کو پرائی کیا پڑی اپنی نیڑ تو 'পর কে নিয়ে চিন্তা ছেড়ে, নিজের পরিণতি নিয়ে ভাবুন। নিজের দিকে ধ্যান দিন এবং নিজ দোষ-ত্রুটি লক্ষ্য করুন।
মানুষ নিজ সম্পর্কে যখন গাফেল হয়ে যায় এবং নিজ দোষ-ত্রুটির ব্যাপারে উদাসীন হয়ে পড়ে- তখনই সে অন্যের দোষ-ত্রুটি খোঁজে। নিজ অপরাধের কথা মাথায় থাকলে কেউ কখনো অন্যের দোষের দিকে নজর দিতে পারে না। ফলে অন্যের দোষ চর্চারও কোনো অবকাশ তার হয় না। সম্রাট বাহাদুর শাহ জুফার খুবই চমৎকার কথা বলেছেন;
نہ تھی حال کی جب ہمیں اپنی خبر رہے ڈھونڈتے اور وں کے عیب و ہنر پڑی اپنی برائیوں پر جو نظر تو نگاہ میں کوئی برا نہ رہا
নিজ অবস্থা সম্পর্কে কোন সচেতনতা ছিল না যখন, তখন তো বেড়াতাম খুঁজে অন্যের যত দোষ-গুণ * নজর পড়ল খেনই নিজ দোষের উপর, তখনই আড়াল হয়ে গেল অন্যের যত দোষ।